দীর্ঘদিনের অযত্ন আর অবহেলা কাটিয়ে অবশেষে সংস্কারের মুখ দেখছে সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার সোনাবাড়িয়া গ্রামের ঐতিহাসিক শ্যামসুন্দর মঠ-মন্দির। পুরাকীর্তিটি সংরক্ষণে খুলনা প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে। প্রাথমিক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা শেষে মূল সংস্কারকাজ শুরুর প্রস্তুতি হিসেবে বুধবার প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের একটি প্রতিনিধিদল মন্দিরটি পরিদর্শন করেছে।
বুধবার (১৯ আগস্ট) দুপুরে মন্দিরটি পরিদর্শন করেন খুলনা প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আঞ্চলিক পরিচালক মো. মহিদুল ইসলাম। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি গবেষক এবং খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক শাপলা সিংহসহ স্থানীয় বিশিষ্ট ব্যক্তিরা।
পরিদর্শনকালে কর্মকর্তারা মন্দিরটির বর্তমান জরাজীর্ণ দশা, দেয়াল ও কার্নিশের পোড়ামাটির অলংকরণ এবং স্থাপত্যের বিভিন্ন কারিগরি দিক পর্যবেক্ষণ করেন। আঞ্চলিক পরিচালক মহিদুল ইসলাম বলেন, ‘শ্যামসুন্দর মন্দিরটি আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ পুরাকীর্তি। মূল সংস্কারকাজের আগে আমরা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ‘প্রি-ডকুমেন্টেশন’ বা তথ্যচিত্রায়নের কাজ শুরু করব। এতে স্থাপনার মূল বৈশিষ্ট্য বজায় রেখে সংস্কার করা সম্ভব হবে।’
তিনি আরও জানান, মন্দিরের গায়ে জন্মানো পরগাছাগুলো অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে অপসারণ করা হবে। আগামী অর্থবছরে প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দ নিয়ে পূর্ণাঙ্গ সংস্কারকাজ শেষ করা হবে বলে তিনি আশ্বাস দেন।
পরিদর্শনকালে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক শাপলা সিংহ একটি ‘ডিজিটাল আর্কাইভ’ তৈরির প্রস্তাব দেন। তিনি বলেন, শুধু অবকাঠামো নয়, মন্দিরটির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা স্থানীয় ইতিহাস ও প্রবীণদের স্মৃতিও সংরক্ষণ করা জরুরি। উপকূলীয় নোনা আবহাওয়ায় এই স্থাপনাটি রক্ষায় তথ্যচিত্র ও ডিজিটাল উপস্থাপনার গুরুত্ব তুলে ধরেন তিনি।
এদিকে সংস্কারের উদ্যোগে স্থানীয়দের মধ্যে স্বস্তি ফিরলেও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন মন্দিরের সেবায়েত সুবপ্রসাদ চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘সংস্কারের পাশাপাশি পুরো মন্দির প্রাঙ্গণটি সীমানাপ্রাচীর দিয়ে সুরক্ষিত করা প্রয়োজন। অরক্ষিত অবস্থায় থাকায় এখানে প্রায়ই বহিরাগতদের আড্ডা বসে।’
ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, ১৭৬৭ সালে হরিরাম দাশ (মতান্তরে দুর্গাপ্রিয় দাশ) এই নবরত্ন স্থাপত্যের মন্দিরটি নির্মাণ করেন। প্রায় ৬০ ফুট উঁচু এই তিনতলা মন্দিরের দেয়ালে চমৎকার পোড়ামাটির শিল্পকর্ম রয়েছে। একসময় এখানে স্বর্ণের বিগ্রহ ও কষ্টিপাথরের শিবলিঙ্গ থাকলেও কয়েক দশক আগে সেগুলো চুরি হয়ে যায়।
সাতক্ষীরার অন্যতম প্রধান এই পর্যটন আকর্ষণটি যথাযথভাবে সংস্কার করা হলে এটি দেশের প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্যের এক অনন্য নিদর্শনে পরিণত হবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
আপনার মতামত লিখুন