শনিবার ২৬ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা। বাগেরহাটের মোল্লাহাটে কোদালিয়া ইউনিয়নের কচুড়িয়া মধ্যপাড়ায় একটি পানের বরজের পাশ থেকে পলিথিনে মোড়ানো বস্তাবন্দি অবস্থায় উদ্ধার হলো ৬ বছরের শিশু মুসলিমার গলাকাটা মরদেহ। বিকেলে বাড়ির আশপাশে সমবয়সী শিশুদের সঙ্গে খেলছিল মেয়েটি। একপর্যায়ে তাকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। নিহত মুসলিমা কচুড়িয়া গ্রামের ইসলাম শেখের মেয়ে। এই খবরটি কোনো চাঞ্চল্য সৃষ্টি করতে পারেনি। কেন পারেনি? কারণ আমরা এখন প্রতিদিনই এমন বস্তাবন্দি লাশ দেখতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। এই অভ্যস্ততাই সবচেয়ে ভয়ংকর।
ঠিক একই রকম অভ্যস্ততার শিকার হতে যাচ্ছিল ১৩ বছরের ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের হত্যাও। ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ বিকেল ৩টা ১২ মিনিটে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে লালমাই পাহাড়ের সানন্দা জঙ্গলে তাকে ডেকে নিয়ে যায় পরিচিত চারজন—তুহিন (১৯), ফাহাদ (১৫), কামরুল (১৬) ও সিয়াম (১৯)। পুলিশের ভাষ্য, একটি আইফোন ছিনতাইয়ের জন্য তাকে নিয়ে যাওয়া হয়। বাধা দিলে বাঁশের লাঠি দিয়ে মাথায় আঘাত করে তাকে হত্যা করা হয়। ছেলেটি সপ্তম শ্রেণির ছাত্র এবং কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. নাহিদা বেগমের সন্তান। ছবিতে যে মুখটি দেখা যায়—ফর্সা, ফুটফুটে, হাসিমাখা—তা দেখলে হৃদয় গলে যায়। এই বয়সে তো তার খেলার মাঠে থাকার কথা, মায়ের হাত ধরে স্কুল থেকে ফেরার কথা।
এখানেই কঠিন প্রশ্নটি আসে। আসল ঘটনা কি শুধু মোবাইল? ১৩ বছরের শিশুর হাতে দামি আইফোন কেন? সে নির্জন পাহাড়ে ছবি তুলতে যাবে কেন? তার চেয়ে ৬ বছরের বড় তরুণদের সঙ্গে ঘুরবে কেন? তার লেখাপড়ার খোঁজ কতটা রাখা হচ্ছিল? সে কি মেধাবী ছাত্র ছিল, নাকি মা-বাবার অমনোযোগে বখাটে ছেলেদের সঙ্গে মিশতে শুরু করেছিল? এটা মা-বাবাকে দোষারোপ নয়, আত্মসমালোচনা। আমরা সন্তানের হাতে ফোন তুলে দিয়ে দায়িত্ব শেষ ভাবি। কিন্তু ফোন তাকে কোন অন্ধকার জগতে টানছে, তার খোঁজ রাখি না। অপ্রতিমের ক্ষেত্রে সেই অবহেলার ছাপ আছে বলেই পুলিশ বলছে, বখাটে তরুণদের সঙ্গে তার সখ্য গড়ে উঠেছিল। শিশুর হাতে আইফোন এখন বিলাসিতা নয়, বিপদ। মুসলিমার ক্ষেত্রেও একই—৬ বছরের শিশুকে বিকেলে খোলা মাঠে ছেড়ে দেওয়া ছাড়া আমাদের আর কোনো নিরাপত্তাবলয় নেই।
এই হত্যা নিয়ে বিতর্ক আরেক দিকে মোড় নিয়েছে তার মায়ের রাজনৈতিক ভূমিকার কারণে। ড. নাহিদা বেগম জুলাই আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। শিক্ষক হিসেবে তিনি আন্দোলনে অংশ নিতেই পারেন। কিন্তু অভিযোগ আছে, সেই সময় ও ৫ আগস্টের পর আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের মৃত্যু নিয়ে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অত্যন্ত অশালীন ভাষায় উপহাস করেছেন। এখন তার সন্তানের মৃত্যুতে আওয়ামী লীগের পক্ষের কিছু মানুষ প্রতিশোধমূলক ও অমানবিক মন্তব্য করছে। এই প্রতিশোধমূলক কথাবার্তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। একটি শিশুর মৃত্যু নিয়ে উল্লাস সভ্য সমাজে চলতে পারে না। কিন্তু যাদের পরিবারের সদস্যরা জুলাই আন্দোলনে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বা এখন খুন হয়েছেন, তাদের কান্না যখন উপহাসের শিকার হয়, তখন তাদের ক্ষোভ থামানো কঠিন। আপনি যদি অন্যের সন্তানের লাশ নিয়ে উল্লাস করেন, তাহলে নিজের সন্তানের লাশের সামনে সংযম আশা করার নৈতিক জোর থাকে না।
এই প্রতিহিংসার চক্র আজ হঠাৎ তৈরি হয়নি। জুলাই আন্দোলনের সময় থেকে বিচারবহির্ভূত হত্যা, পিটিয়ে মারা, আগুন দিয়ে পোড়ানোর যে সংস্কৃতি শুরু হয়, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তা মব হিসেবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। তখন প্রকাশ্যে বলা হয়েছে, মব করুন, আওয়ামী লীগের লোকদের ধরে নির্যাতন করুন। আর একদল মানুষ আলহামদুলিল্লাহ বলেছে। সেই মব নির্বাচিত বিএনপি সরকারের আমলেও থামেনি, বরং আরও বেপরোয়া হয়েছে। আজ আওয়ামী লীগের লোক মরলে কাল সাধারণ শিশু মরছে। মুসলিমার মরদেহ উদ্ধারের পর বিক্ষুব্ধ জনতা যেমন পানের বরজের মালিকের বাড়িতে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেছে, তেমনি প্রতিটি মৃত্যুর পর আমরা নিজেরাই আইন হাতে তুলে নিচ্ছি। হত্যার লাইসেন্স একবার দিলে তা আর দল দেখে না। ঘুরে ঘুরে সবার ঘরে ঢোকে। অপ্রতিম ও মুসলিমা তারই শিকার।
অপ্রতিম বা মুসলিমা একা নয়। এই সময়ে শিশুর মৃত্যু সর্বত্র। হামে এ বছর হাজারের বেশি শিশু মারা গেছে। এটা টিকার অবহেলায় এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক হত্যা। এই দায় ড. মোহাম্মদ ইউনূস এবং তার অন্তর্বর্তী সরকারের। পুলিশের তথ্য বলছে, এ বছর ১৫ হাজারের বেশি শিশু নিখোঁজের জিডি হয়েছে। যদিও বেশির ভাগ ফিরে এসেছে, তবু ২ হাজারের বেশি এখনও নিখোঁজ। এটা কি কোনো সুস্থ সমাজের পরিচায়ক? রংপুরে একই পরিবারের চারজনকে তালাবদ্ধ ঘরে শ্বাসরোধ করে হত্যার মতো বীভৎস ঘটনা, যেখানে ১২ বছরের শিশু আয়ুষও ছিল, তা আমাদের সমাজের অধঃপতনই দেখায়। মাদারীপুরে এক কলেজছাত্রকে মোবাইলের জন্য প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা, গাজীপুরে এক গার্মেন্টসকর্মীকে বাড়ি ফেরার পথে মেরে ফেলা, রাজশাহীতে এক বৃদ্ধ রিকশাচালককে ২০০ টাকার জন্য হত্যা করে ড্রেনে ফেলে রাখা—এমন শত শত খুন প্রতিনিয়ত হচ্ছে।
এই অধঃপতন চলতে থাকলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হবে বর্তমান বিএনপি সরকারেরই। একদিকে তেল-গ্যাস-বিদ্যুতের চরম সংকট, দফায় দফায় দাম বাড়ছে, অন্যদিকে ছিনতাই, রাহাজানি, কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য। রাজস্ব আদায় কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় হচ্ছে না, জিডিপি প্রবৃদ্ধি খুব কম, প্রতিদিন মানুষ কর্মহীন হচ্ছে। ঘর থেকে বের হয়ে নিরাপদে ফেরার নিশ্চয়তা নেই। খুন আওয়ামী লীগ আমলেও হয়েছে, কিন্তু এত ব্যাপক ও বীভৎস ছিল না। সরকার চলছে ঋণের ওপর। দেশে বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতা থাকলে কোনো উদ্যোক্তা বিনিয়োগ করতে আসবে না। মবই যখন আইন, তখন বিনিয়োগ আসে না। রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য।
এত হত্যার পরও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলে চলেছেন, আগের যেকোনো আমলের চেয়ে আইনশৃঙ্খলা ভালো। সমস্যা স্বীকার না করলে সমাধান হবে কীভাবে? অপ্রতিমের হত্যা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, আমরা একটি প্রতিশোধপরায়ণ সমাজ বানিয়েছি, যেখানে অন্যের মৃত্যুতে উল্লাস করা যায়, আর নিজের সন্তানের মৃত্যুতে আমরা ন্যায়বিচার চাই। এই দ্বিচারিতা থেকে বের হতে হবে। মুসলিমার জন্য, অপ্রতিমের জন্য ন্যায়বিচার মানে শুধু তুহিন-ফাহাদ বা জাহাঙ্গীরদের শাস্তি নয়। ন্যায়বিচার মানে সেই মব সংস্কৃতির বিচার, যা তাদের খুন করতে শিখিয়েছে। ন্যায়বিচার মানে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের মৃত্যু নিয়ে উপহাস বন্ধ করা। না হলে আজ অপ্রতিম, কাল মুসলিমা, পরশু আপনার সন্তান। লাশের ওপর দাঁড়িয়ে কোনো উন্নয়ন হয় না।
(লেখকের নিজস্ব মত)
[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]

রোববার, ০৪ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৪ অক্টোবর ২০২৬
শনিবার ২৬ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা। বাগেরহাটের মোল্লাহাটে কোদালিয়া ইউনিয়নের কচুড়িয়া মধ্যপাড়ায় একটি পানের বরজের পাশ থেকে পলিথিনে মোড়ানো বস্তাবন্দি অবস্থায় উদ্ধার হলো ৬ বছরের শিশু মুসলিমার গলাকাটা মরদেহ। বিকেলে বাড়ির আশপাশে সমবয়সী শিশুদের সঙ্গে খেলছিল মেয়েটি। একপর্যায়ে তাকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। নিহত মুসলিমা কচুড়িয়া গ্রামের ইসলাম শেখের মেয়ে। এই খবরটি কোনো চাঞ্চল্য সৃষ্টি করতে পারেনি। কেন পারেনি? কারণ আমরা এখন প্রতিদিনই এমন বস্তাবন্দি লাশ দেখতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। এই অভ্যস্ততাই সবচেয়ে ভয়ংকর।
ঠিক একই রকম অভ্যস্ততার শিকার হতে যাচ্ছিল ১৩ বছরের ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের হত্যাও। ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ বিকেল ৩টা ১২ মিনিটে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে লালমাই পাহাড়ের সানন্দা জঙ্গলে তাকে ডেকে নিয়ে যায় পরিচিত চারজন—তুহিন (১৯), ফাহাদ (১৫), কামরুল (১৬) ও সিয়াম (১৯)। পুলিশের ভাষ্য, একটি আইফোন ছিনতাইয়ের জন্য তাকে নিয়ে যাওয়া হয়। বাধা দিলে বাঁশের লাঠি দিয়ে মাথায় আঘাত করে তাকে হত্যা করা হয়। ছেলেটি সপ্তম শ্রেণির ছাত্র এবং কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. নাহিদা বেগমের সন্তান। ছবিতে যে মুখটি দেখা যায়—ফর্সা, ফুটফুটে, হাসিমাখা—তা দেখলে হৃদয় গলে যায়। এই বয়সে তো তার খেলার মাঠে থাকার কথা, মায়ের হাত ধরে স্কুল থেকে ফেরার কথা।
এখানেই কঠিন প্রশ্নটি আসে। আসল ঘটনা কি শুধু মোবাইল? ১৩ বছরের শিশুর হাতে দামি আইফোন কেন? সে নির্জন পাহাড়ে ছবি তুলতে যাবে কেন? তার চেয়ে ৬ বছরের বড় তরুণদের সঙ্গে ঘুরবে কেন? তার লেখাপড়ার খোঁজ কতটা রাখা হচ্ছিল? সে কি মেধাবী ছাত্র ছিল, নাকি মা-বাবার অমনোযোগে বখাটে ছেলেদের সঙ্গে মিশতে শুরু করেছিল? এটা মা-বাবাকে দোষারোপ নয়, আত্মসমালোচনা। আমরা সন্তানের হাতে ফোন তুলে দিয়ে দায়িত্ব শেষ ভাবি। কিন্তু ফোন তাকে কোন অন্ধকার জগতে টানছে, তার খোঁজ রাখি না। অপ্রতিমের ক্ষেত্রে সেই অবহেলার ছাপ আছে বলেই পুলিশ বলছে, বখাটে তরুণদের সঙ্গে তার সখ্য গড়ে উঠেছিল। শিশুর হাতে আইফোন এখন বিলাসিতা নয়, বিপদ। মুসলিমার ক্ষেত্রেও একই—৬ বছরের শিশুকে বিকেলে খোলা মাঠে ছেড়ে দেওয়া ছাড়া আমাদের আর কোনো নিরাপত্তাবলয় নেই।
এই হত্যা নিয়ে বিতর্ক আরেক দিকে মোড় নিয়েছে তার মায়ের রাজনৈতিক ভূমিকার কারণে। ড. নাহিদা বেগম জুলাই আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। শিক্ষক হিসেবে তিনি আন্দোলনে অংশ নিতেই পারেন। কিন্তু অভিযোগ আছে, সেই সময় ও ৫ আগস্টের পর আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের মৃত্যু নিয়ে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অত্যন্ত অশালীন ভাষায় উপহাস করেছেন। এখন তার সন্তানের মৃত্যুতে আওয়ামী লীগের পক্ষের কিছু মানুষ প্রতিশোধমূলক ও অমানবিক মন্তব্য করছে। এই প্রতিশোধমূলক কথাবার্তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। একটি শিশুর মৃত্যু নিয়ে উল্লাস সভ্য সমাজে চলতে পারে না। কিন্তু যাদের পরিবারের সদস্যরা জুলাই আন্দোলনে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বা এখন খুন হয়েছেন, তাদের কান্না যখন উপহাসের শিকার হয়, তখন তাদের ক্ষোভ থামানো কঠিন। আপনি যদি অন্যের সন্তানের লাশ নিয়ে উল্লাস করেন, তাহলে নিজের সন্তানের লাশের সামনে সংযম আশা করার নৈতিক জোর থাকে না।
এই প্রতিহিংসার চক্র আজ হঠাৎ তৈরি হয়নি। জুলাই আন্দোলনের সময় থেকে বিচারবহির্ভূত হত্যা, পিটিয়ে মারা, আগুন দিয়ে পোড়ানোর যে সংস্কৃতি শুরু হয়, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তা মব হিসেবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। তখন প্রকাশ্যে বলা হয়েছে, মব করুন, আওয়ামী লীগের লোকদের ধরে নির্যাতন করুন। আর একদল মানুষ আলহামদুলিল্লাহ বলেছে। সেই মব নির্বাচিত বিএনপি সরকারের আমলেও থামেনি, বরং আরও বেপরোয়া হয়েছে। আজ আওয়ামী লীগের লোক মরলে কাল সাধারণ শিশু মরছে। মুসলিমার মরদেহ উদ্ধারের পর বিক্ষুব্ধ জনতা যেমন পানের বরজের মালিকের বাড়িতে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেছে, তেমনি প্রতিটি মৃত্যুর পর আমরা নিজেরাই আইন হাতে তুলে নিচ্ছি। হত্যার লাইসেন্স একবার দিলে তা আর দল দেখে না। ঘুরে ঘুরে সবার ঘরে ঢোকে। অপ্রতিম ও মুসলিমা তারই শিকার।
অপ্রতিম বা মুসলিমা একা নয়। এই সময়ে শিশুর মৃত্যু সর্বত্র। হামে এ বছর হাজারের বেশি শিশু মারা গেছে। এটা টিকার অবহেলায় এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক হত্যা। এই দায় ড. মোহাম্মদ ইউনূস এবং তার অন্তর্বর্তী সরকারের। পুলিশের তথ্য বলছে, এ বছর ১৫ হাজারের বেশি শিশু নিখোঁজের জিডি হয়েছে। যদিও বেশির ভাগ ফিরে এসেছে, তবু ২ হাজারের বেশি এখনও নিখোঁজ। এটা কি কোনো সুস্থ সমাজের পরিচায়ক? রংপুরে একই পরিবারের চারজনকে তালাবদ্ধ ঘরে শ্বাসরোধ করে হত্যার মতো বীভৎস ঘটনা, যেখানে ১২ বছরের শিশু আয়ুষও ছিল, তা আমাদের সমাজের অধঃপতনই দেখায়। মাদারীপুরে এক কলেজছাত্রকে মোবাইলের জন্য প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা, গাজীপুরে এক গার্মেন্টসকর্মীকে বাড়ি ফেরার পথে মেরে ফেলা, রাজশাহীতে এক বৃদ্ধ রিকশাচালককে ২০০ টাকার জন্য হত্যা করে ড্রেনে ফেলে রাখা—এমন শত শত খুন প্রতিনিয়ত হচ্ছে।
এই অধঃপতন চলতে থাকলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হবে বর্তমান বিএনপি সরকারেরই। একদিকে তেল-গ্যাস-বিদ্যুতের চরম সংকট, দফায় দফায় দাম বাড়ছে, অন্যদিকে ছিনতাই, রাহাজানি, কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য। রাজস্ব আদায় কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় হচ্ছে না, জিডিপি প্রবৃদ্ধি খুব কম, প্রতিদিন মানুষ কর্মহীন হচ্ছে। ঘর থেকে বের হয়ে নিরাপদে ফেরার নিশ্চয়তা নেই। খুন আওয়ামী লীগ আমলেও হয়েছে, কিন্তু এত ব্যাপক ও বীভৎস ছিল না। সরকার চলছে ঋণের ওপর। দেশে বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতা থাকলে কোনো উদ্যোক্তা বিনিয়োগ করতে আসবে না। মবই যখন আইন, তখন বিনিয়োগ আসে না। রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য।
এত হত্যার পরও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলে চলেছেন, আগের যেকোনো আমলের চেয়ে আইনশৃঙ্খলা ভালো। সমস্যা স্বীকার না করলে সমাধান হবে কীভাবে? অপ্রতিমের হত্যা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, আমরা একটি প্রতিশোধপরায়ণ সমাজ বানিয়েছি, যেখানে অন্যের মৃত্যুতে উল্লাস করা যায়, আর নিজের সন্তানের মৃত্যুতে আমরা ন্যায়বিচার চাই। এই দ্বিচারিতা থেকে বের হতে হবে। মুসলিমার জন্য, অপ্রতিমের জন্য ন্যায়বিচার মানে শুধু তুহিন-ফাহাদ বা জাহাঙ্গীরদের শাস্তি নয়। ন্যায়বিচার মানে সেই মব সংস্কৃতির বিচার, যা তাদের খুন করতে শিখিয়েছে। ন্যায়বিচার মানে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের মৃত্যু নিয়ে উপহাস বন্ধ করা। না হলে আজ অপ্রতিম, কাল মুসলিমা, পরশু আপনার সন্তান। লাশের ওপর দাঁড়িয়ে কোনো উন্নয়ন হয় না।
(লেখকের নিজস্ব মত)
[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]

আপনার মতামত লিখুন