দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সামনে ফের উঠে এল এক অস্বস্তিকর প্রশ্ন—যারা আইন তৈরি করেন, তাদেরই এক বড় অংশ যদি গুরুতর অপরাধের মামলায় অভিযুক্ত বা বিচারাধীন থাকেন, তাহলে আইনের শাসনের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা কোথায় দাঁড়াবে?
সুপ্রিম কোর্টে পেশ করা সাম্প্রতিক তথ্য এই উদ্বেগকে আরও গভীর করেছে। দেশের ২৮টি রাজ্যের মধ্যে ১৪ জন মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধের মামলা রয়েছে বলে আদালতকে জানানো হয়েছে। তেলেঙ্গানার মুখ্যমন্ত্রী এ রেবন্ত রেড্ডির বিরুদ্ধে সর্বাধিক ৮৯টি মামলা থাকার তথ্য সামনে এসেছে।
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর বিরুদ্ধেও ২৯টি গুরুতর মামলা বিচারাধীন থাকার কথা রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। কর্নাটকের ডি কে শিবকুমার ও অন্ধ্রপ্রদেশের এন চন্দ্রবাবু নায়ডুর বিরুদ্ধে ১৯টি করে এবং কেরালার ভি ডি সতীশনের বিরুদ্ধে ১৮টি মামলা রয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
তবে এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট রাখা জরুরি—মামলা থাকা বা অভিযোগ ওঠা কখনও অপরাধ প্রমাণের সমান নয়। আদালতে বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রত্যেক অভিযুক্তই আইনের চোখে নির্দোষ। কিন্তু প্রশ্নটি অন্য জায়গায়—এত বিপুল সংখ্যক মামলা বছরের পর বছর বিচারাধীন থাকছে কেন?
আর সেই প্রশ্নই আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভাকে ঘিরে।
২০২৬ সালের নির্বাচনে জয়ী ২৯২ জন বিধায়কের হলফনামা বিশ্লেষণ করে এডিআর জানিয়েছে, ১৯০ জন অর্থাৎ প্রায় ৬৫ শতাংশ বিধায়কের বিরুদ্ধে কোনও না কোনও ফৌজদারি মামলা রয়েছে। তাদের মধ্যে ১৭০ জন—প্রায় ৫৮ শতাংশ—গুরুতর অপরাধের মামলা ঘোষণা করেছেন। এই গুরুতর মামলাগুলির মধ্যে খুন, খুনের চেষ্টা এবং মহিলাদের বিরুদ্ধে অপরাধের মতো অভিযোগও রয়েছে।
অর্থাৎ যে বিধানসভায় বসে আইন তৈরি হবে, সেই বিধানসভার প্রায় প্রতি দু’জনের একজনের বিরুদ্ধেই গুরুতর অপরাধের মামলা থাকার তথ্য সামনে আসছে। এটি কোনও একটি দলের বিরুদ্ধে অভিযোগ নয়; এটি গোটা রাজনৈতিক ব্যবস্থার সামনে একটি বৃহত্তর প্রশ্ন।
জাতীয় স্তরের ছবিটিও কম উদ্বেগজনক নয়। লোকসভার ৫৪৩ জন সদস্যের মধ্যে ১৭০ জনের বিরুদ্ধে গুরুতর মামলা বিচারাধীন থাকার তথ্য সামনে এসেছে। রাজ্যসভার ক্ষেত্রেও ২৩৩ জন সদস্যের মধ্যে ৭৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে, যার মধ্যে ৪০ জনের বিরুদ্ধে গুরুতর মামলা বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।
সবচেয়ে বড় সমস্যা অবশ্য মামলার সংখ্যা নয়, বিচারের গতি।
জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে মামলা বছরের পর বছর ঝুলে থাকলে তার দু’দিকেই ক্ষতি। একদিকে, সত্যিই কেউ অপরাধ করে থাকলে বিচার পেতে দেরি হয়। অন্যদিকে, রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় মিথ্যা বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা হয়ে থাকলে অভিযুক্ত জনপ্রতিনিধিও বছরের পর বছর সেই অভিযোগের বোঝা বহন করেন।
সুতরাং প্রয়োজন দ্রুত বিচার—কিন্তু রাজনৈতিক পরিচয় দেখে নয়, একই আইনি মানদণ্ডে প্রত্যেকের বিচার।
সুপ্রিম কোর্টে চলা দীর্ঘদিনের মামলায় সিনিয়র আইনজীবী বিজয় হন্সারিয়ার পেশ করা তথ্য আসলে এই মৌলিক প্রশ্নটিই সামনে এনে দিয়েছে—গণতন্ত্রে জনগণ যাঁদের হাতে আইন তৈরির দায়িত্ব তুলে দেন, তাঁদের বিরুদ্ধে থাকা মামলার বিচার যদি অনির্দিষ্টকাল ঝুলে থাকে, তাহলে আইনের প্রতি মানুষের বিশ্বাস কতটা অটুট থাকবে? আমাদের প্রতিনিধির কাছে এই জানালেন আইনজীবী বিজয় হন্সারিয়া।
গণতন্ত্র শুধু ভোটে সরকার তৈরি হওয়ার নাম নয়। গণতন্ত্রের আসল শক্তি হল—আইন সবার জন্য সমান এবং বিচার সবার জন্য দ্রুত।
আজ তাই প্রশ্ন শুধু কতজন জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে মামলা আছে, তা নয়। আরও বড় প্রশ্ন হল—এই মামলাগুলির বিচার কবে শেষ হবে? এবং শেষ পর্যন্ত আদালতের রায়ে কার বিরুদ্ধে অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হবে, আর কে সম্পূর্ণ নির্দোষ প্রমাণিত হবেন?
এই উত্তরই ঠিক করবে, ভারতের রাজনীতিতে অপরাধের ছায়া কতটা গভীর—আর আইনের শাসন কতটা শক্তিশালী।

বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৮ আগস্ট ২০২৬
দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সামনে ফের উঠে এল এক অস্বস্তিকর প্রশ্ন—যারা আইন তৈরি করেন, তাদেরই এক বড় অংশ যদি গুরুতর অপরাধের মামলায় অভিযুক্ত বা বিচারাধীন থাকেন, তাহলে আইনের শাসনের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা কোথায় দাঁড়াবে?
সুপ্রিম কোর্টে পেশ করা সাম্প্রতিক তথ্য এই উদ্বেগকে আরও গভীর করেছে। দেশের ২৮টি রাজ্যের মধ্যে ১৪ জন মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধের মামলা রয়েছে বলে আদালতকে জানানো হয়েছে। তেলেঙ্গানার মুখ্যমন্ত্রী এ রেবন্ত রেড্ডির বিরুদ্ধে সর্বাধিক ৮৯টি মামলা থাকার তথ্য সামনে এসেছে।
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর বিরুদ্ধেও ২৯টি গুরুতর মামলা বিচারাধীন থাকার কথা রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। কর্নাটকের ডি কে শিবকুমার ও অন্ধ্রপ্রদেশের এন চন্দ্রবাবু নায়ডুর বিরুদ্ধে ১৯টি করে এবং কেরালার ভি ডি সতীশনের বিরুদ্ধে ১৮টি মামলা রয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
তবে এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট রাখা জরুরি—মামলা থাকা বা অভিযোগ ওঠা কখনও অপরাধ প্রমাণের সমান নয়। আদালতে বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রত্যেক অভিযুক্তই আইনের চোখে নির্দোষ। কিন্তু প্রশ্নটি অন্য জায়গায়—এত বিপুল সংখ্যক মামলা বছরের পর বছর বিচারাধীন থাকছে কেন?
আর সেই প্রশ্নই আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভাকে ঘিরে।
২০২৬ সালের নির্বাচনে জয়ী ২৯২ জন বিধায়কের হলফনামা বিশ্লেষণ করে এডিআর জানিয়েছে, ১৯০ জন অর্থাৎ প্রায় ৬৫ শতাংশ বিধায়কের বিরুদ্ধে কোনও না কোনও ফৌজদারি মামলা রয়েছে। তাদের মধ্যে ১৭০ জন—প্রায় ৫৮ শতাংশ—গুরুতর অপরাধের মামলা ঘোষণা করেছেন। এই গুরুতর মামলাগুলির মধ্যে খুন, খুনের চেষ্টা এবং মহিলাদের বিরুদ্ধে অপরাধের মতো অভিযোগও রয়েছে।
অর্থাৎ যে বিধানসভায় বসে আইন তৈরি হবে, সেই বিধানসভার প্রায় প্রতি দু’জনের একজনের বিরুদ্ধেই গুরুতর অপরাধের মামলা থাকার তথ্য সামনে আসছে। এটি কোনও একটি দলের বিরুদ্ধে অভিযোগ নয়; এটি গোটা রাজনৈতিক ব্যবস্থার সামনে একটি বৃহত্তর প্রশ্ন।
জাতীয় স্তরের ছবিটিও কম উদ্বেগজনক নয়। লোকসভার ৫৪৩ জন সদস্যের মধ্যে ১৭০ জনের বিরুদ্ধে গুরুতর মামলা বিচারাধীন থাকার তথ্য সামনে এসেছে। রাজ্যসভার ক্ষেত্রেও ২৩৩ জন সদস্যের মধ্যে ৭৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে, যার মধ্যে ৪০ জনের বিরুদ্ধে গুরুতর মামলা বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।
সবচেয়ে বড় সমস্যা অবশ্য মামলার সংখ্যা নয়, বিচারের গতি।
জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে মামলা বছরের পর বছর ঝুলে থাকলে তার দু’দিকেই ক্ষতি। একদিকে, সত্যিই কেউ অপরাধ করে থাকলে বিচার পেতে দেরি হয়। অন্যদিকে, রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় মিথ্যা বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা হয়ে থাকলে অভিযুক্ত জনপ্রতিনিধিও বছরের পর বছর সেই অভিযোগের বোঝা বহন করেন।
সুতরাং প্রয়োজন দ্রুত বিচার—কিন্তু রাজনৈতিক পরিচয় দেখে নয়, একই আইনি মানদণ্ডে প্রত্যেকের বিচার।
সুপ্রিম কোর্টে চলা দীর্ঘদিনের মামলায় সিনিয়র আইনজীবী বিজয় হন্সারিয়ার পেশ করা তথ্য আসলে এই মৌলিক প্রশ্নটিই সামনে এনে দিয়েছে—গণতন্ত্রে জনগণ যাঁদের হাতে আইন তৈরির দায়িত্ব তুলে দেন, তাঁদের বিরুদ্ধে থাকা মামলার বিচার যদি অনির্দিষ্টকাল ঝুলে থাকে, তাহলে আইনের প্রতি মানুষের বিশ্বাস কতটা অটুট থাকবে? আমাদের প্রতিনিধির কাছে এই জানালেন আইনজীবী বিজয় হন্সারিয়া।
গণতন্ত্র শুধু ভোটে সরকার তৈরি হওয়ার নাম নয়। গণতন্ত্রের আসল শক্তি হল—আইন সবার জন্য সমান এবং বিচার সবার জন্য দ্রুত।
আজ তাই প্রশ্ন শুধু কতজন জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে মামলা আছে, তা নয়। আরও বড় প্রশ্ন হল—এই মামলাগুলির বিচার কবে শেষ হবে? এবং শেষ পর্যন্ত আদালতের রায়ে কার বিরুদ্ধে অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হবে, আর কে সম্পূর্ণ নির্দোষ প্রমাণিত হবেন?
এই উত্তরই ঠিক করবে, ভারতের রাজনীতিতে অপরাধের ছায়া কতটা গভীর—আর আইনের শাসন কতটা শক্তিশালী।

আপনার মতামত লিখুন