সংবাদ

শেখ হাসিনাকে ঘিরে নতুন দিল্লির যে জটিল সমীকরণ


সংবাদ ডিজিটাল রিপোর্ট
সংবাদ ডিজিটাল রিপোর্ট
প্রকাশ: ৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:০৬ পিএম

শেখ হাসিনাকে ঘিরে নতুন দিল্লির যে জটিল সমীকরণ
ছবি : সংগৃহীত

২০২৪ সালের আগস্টে গণআন্দোলনের মুখে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির ঘটনা শুধু বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকেই ওলটপালট করে দেয়নি, বরং দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক সম্পর্কেও এক বিশাল মোড় এনে দিয়েছে।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম দ্য ডিপলোম্যাট বলছে, দীর্ঘ দেড় দশক ধরে ভারতের প্রতিবেশী নীতির মূল ভিত্তি ছিল শেখ হাসিনার সরকারকে টিকিয়ে রাখা এবং এর মাধ্যমে নিজেদের পূর্ব সীমান্তে একচ্ছত্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে সেই কৌশলই নয়াদিল্লির জন্য এক জটিল কূটনৈতিক সংকটে রূপ নিয়েছে।

শেখ হাসিনা বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন, আর অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) রাষ্ট্র পরিচালনা করছে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশের আদালত শেখ হাসিনাকে মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ায় তাকে দেশে ফিরিয়ে দিতে আনুষ্ঠানিকভাবে দাবি জানিয়েছে ঢাকা।

এই পরিস্থিতিকে কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা ভারতের জন্য এক কঠিন চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন, যার কোনো সহজ সমাধান নেই। একদিকে ভারতের দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত ও ঘনিষ্ঠ মিত্রকে আশ্রয় দেওয়ার প্রশ্ন, অন্যদিকে বাংলাদেশের নতুন গণতান্ত্রিক সরকারের সঙ্গে পারস্পরিক সুসম্পর্ক বজায় রাখার গভীর তাগিদ; দুটোই নয়াদিল্লিকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে সামলাতে হচ্ছে।

বিগত বছরগুলোতে শেখ হাসিনা সরকার ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোতে যাতায়াতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট ও করিডোর সুবিধা দিয়েছিল। কিন্তু এখন ভারত যদি ঢাকার দাবি মেনে শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠায় এবং সেখানে তার সাজা কার্যকর হয়, তবে ভুটান, নেপাল বা শ্রীলঙ্কার মতো আঞ্চলিক মিত্রদের মনে আস্থার সংকট তৈরি হতে পারে। তারা ভাবতে পারে যে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটলে ভারত শেষ পর্যন্ত তার ঘনিষ্ট অংশীদারদের পাশে থাকে না।

পক্ষান্তরে, শেখ হাসিনাকে ভারতে স্থায়ীভাবে রেখে দেওয়ার মূল্যও কম নয়। এর ফলে বাংলাদেশের সাধারণ জনগণ ও রাজনৈতিক মহলে ভারতবিরোধী মনোভাব আরও তীব্র হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে এবং বিএনপি সরকার নয়াদিল্লিকে তাদের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের অন্তরায় হিসেবে তুলে ধরার সুযোগ পাচ্ছে।

এর স্পষ্ট প্রভাব দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য, ট্রানজিট এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপরেও পড়তে শুরু করেছে। সম্প্রতি নয়াদিল্লিতে আয়োজিত ব্রিকস সম্মেলনে বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আমন্ত্রণ না পাওয়ার বিষয়টি এই টানাপোড়েনকে আরও প্রকাশ্যে এনেছে।

ঢাকার দৃষ্টিতে এটি এক ধরনের কূটনৈতিক অবজ্ঞা হওয়ায় তিনি ওই সফর বাতিল করে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দেন এবং সেখানে পাকিস্তানের নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠক করেন। পাশাপাশি চীনের সঙ্গে বড় অবকাঠামোগত ঋণ ও উন্নয়ন প্রকল্প নিয়েও আলোচনা জোরালো করেছে ঢাকা।

এসব ঘটনার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে যে তারা আর একপাক্ষিক ও স্বয়ংক্রিয়ভাবে কোনো নির্দিষ্ট দেশের পররাষ্ট্রনীতির ওপর নির্ভর করবে না। বরং নিজেদের ভূরাজনৈতিক ও কৌশলগত অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে ভারত, চীন ও পাকিস্তানের সঙ্গে পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক নতুন ভারসাম্য বজায় রাখার নীতি গ্রহণ করেছে।

গত ১৫ বছর ধরে একজন মাত্র রাজনৈতিক নেতার স্থিতিশীলতাকে পুরো দেশের স্থিতিশীলতার সমার্থক ধরে নেওয়ার যে বড় ভুল ভারত করেছিল, বর্তমান পরিস্থিতি তারই এক অনিবার্য পরিণতি। তবে দুই দেশের গভীর বাস্তব প্রয়োজনীয়তা ও নিত্যদিনের আদান-প্রদান পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হওয়ার সুযোগ নেই।

খাদ্য আমদানি, বিদ্যুৎ সরবরাহ, চিকিৎসা ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনার স্বার্থেই উভয় দেশকে শেষ পর্যন্ত প্রাতিষ্ঠানিক ও বাস্তবমুখী সম্পর্কের টেবিলে আসতেই হবে। নীরব কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে অচলাবস্থা কাটানোর চেষ্টা চলছে এবং আগামী দিনে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি নবায়নসহ পারস্পরিক অংশীদারত্ব টিকিয়ে রাখতে দুই দেশকেই ব্যক্তিকেন্দ্রিক কূটনীতি থেকে বেরিয়ে এসে বাস্তবসম্মত ও সমতার ভিত্তিতে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

শনিবার, ০৩ অক্টোবর ২০২৬


শেখ হাসিনাকে ঘিরে নতুন দিল্লির যে জটিল সমীকরণ

প্রকাশের তারিখ : ০৩ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

২০২৪ সালের আগস্টে গণআন্দোলনের মুখে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির ঘটনা শুধু বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকেই ওলটপালট করে দেয়নি, বরং দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক সম্পর্কেও এক বিশাল মোড় এনে দিয়েছে।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম দ্য ডিপলোম্যাট বলছে, দীর্ঘ দেড় দশক ধরে ভারতের প্রতিবেশী নীতির মূল ভিত্তি ছিল শেখ হাসিনার সরকারকে টিকিয়ে রাখা এবং এর মাধ্যমে নিজেদের পূর্ব সীমান্তে একচ্ছত্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে সেই কৌশলই নয়াদিল্লির জন্য এক জটিল কূটনৈতিক সংকটে রূপ নিয়েছে।

শেখ হাসিনা বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন, আর অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) রাষ্ট্র পরিচালনা করছে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশের আদালত শেখ হাসিনাকে মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ায় তাকে দেশে ফিরিয়ে দিতে আনুষ্ঠানিকভাবে দাবি জানিয়েছে ঢাকা।

এই পরিস্থিতিকে কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা ভারতের জন্য এক কঠিন চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন, যার কোনো সহজ সমাধান নেই। একদিকে ভারতের দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত ও ঘনিষ্ঠ মিত্রকে আশ্রয় দেওয়ার প্রশ্ন, অন্যদিকে বাংলাদেশের নতুন গণতান্ত্রিক সরকারের সঙ্গে পারস্পরিক সুসম্পর্ক বজায় রাখার গভীর তাগিদ; দুটোই নয়াদিল্লিকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে সামলাতে হচ্ছে।

বিগত বছরগুলোতে শেখ হাসিনা সরকার ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোতে যাতায়াতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট ও করিডোর সুবিধা দিয়েছিল। কিন্তু এখন ভারত যদি ঢাকার দাবি মেনে শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠায় এবং সেখানে তার সাজা কার্যকর হয়, তবে ভুটান, নেপাল বা শ্রীলঙ্কার মতো আঞ্চলিক মিত্রদের মনে আস্থার সংকট তৈরি হতে পারে। তারা ভাবতে পারে যে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটলে ভারত শেষ পর্যন্ত তার ঘনিষ্ট অংশীদারদের পাশে থাকে না।

পক্ষান্তরে, শেখ হাসিনাকে ভারতে স্থায়ীভাবে রেখে দেওয়ার মূল্যও কম নয়। এর ফলে বাংলাদেশের সাধারণ জনগণ ও রাজনৈতিক মহলে ভারতবিরোধী মনোভাব আরও তীব্র হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে এবং বিএনপি সরকার নয়াদিল্লিকে তাদের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের অন্তরায় হিসেবে তুলে ধরার সুযোগ পাচ্ছে।

এর স্পষ্ট প্রভাব দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য, ট্রানজিট এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপরেও পড়তে শুরু করেছে। সম্প্রতি নয়াদিল্লিতে আয়োজিত ব্রিকস সম্মেলনে বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আমন্ত্রণ না পাওয়ার বিষয়টি এই টানাপোড়েনকে আরও প্রকাশ্যে এনেছে।

ঢাকার দৃষ্টিতে এটি এক ধরনের কূটনৈতিক অবজ্ঞা হওয়ায় তিনি ওই সফর বাতিল করে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দেন এবং সেখানে পাকিস্তানের নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠক করেন। পাশাপাশি চীনের সঙ্গে বড় অবকাঠামোগত ঋণ ও উন্নয়ন প্রকল্প নিয়েও আলোচনা জোরালো করেছে ঢাকা।

এসব ঘটনার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে যে তারা আর একপাক্ষিক ও স্বয়ংক্রিয়ভাবে কোনো নির্দিষ্ট দেশের পররাষ্ট্রনীতির ওপর নির্ভর করবে না। বরং নিজেদের ভূরাজনৈতিক ও কৌশলগত অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে ভারত, চীন ও পাকিস্তানের সঙ্গে পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক নতুন ভারসাম্য বজায় রাখার নীতি গ্রহণ করেছে।

গত ১৫ বছর ধরে একজন মাত্র রাজনৈতিক নেতার স্থিতিশীলতাকে পুরো দেশের স্থিতিশীলতার সমার্থক ধরে নেওয়ার যে বড় ভুল ভারত করেছিল, বর্তমান পরিস্থিতি তারই এক অনিবার্য পরিণতি। তবে দুই দেশের গভীর বাস্তব প্রয়োজনীয়তা ও নিত্যদিনের আদান-প্রদান পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হওয়ার সুযোগ নেই।

খাদ্য আমদানি, বিদ্যুৎ সরবরাহ, চিকিৎসা ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনার স্বার্থেই উভয় দেশকে শেষ পর্যন্ত প্রাতিষ্ঠানিক ও বাস্তবমুখী সম্পর্কের টেবিলে আসতেই হবে। নীরব কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে অচলাবস্থা কাটানোর চেষ্টা চলছে এবং আগামী দিনে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি নবায়নসহ পারস্পরিক অংশীদারত্ব টিকিয়ে রাখতে দুই দেশকেই ব্যক্তিকেন্দ্রিক কূটনীতি থেকে বেরিয়ে এসে বাস্তবসম্মত ও সমতার ভিত্তিতে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত