দেখতে না দেখতেই বছর ঘুরে যায়। তেমনি ঘুরে যায় দু বছর, তিন বছর, পাঁচ বছর, দশ বছর, পনেরো বছর।
আজ সে আমার পাশেই বসে আছে।
ভাত কম খেতে বললেই রাগ করে।
“খোকনরে, মাত্র এতকটা ভাত। তাও আমারে তুই খাইতে দিবি না? আমারে কি না খাওইয়াই মারবি?”
ডাক্তার মেটফরমিন দিয়েছে। প্রতিদিন সকালে আঙুলে সুচ ঢুকিয়ে এক ফোঁটা রক্ত বের করে দেখতে হয় সুগার কত।
তার রক্ত আমি সহ্য করতে পারি না।
সে কিন্তু পারে। সুন্দর করে সুচটা আঙুলে ফুটিয়ে বুড়ো আঙুল দিয়ে চাপ দেয়। টুক করে এক ফোঁটা রক্ত বেরিয়ে আসে। আমার গা শিউরে ওঠে। পায়ু কুঁচকে যায়। গোড়ায় ব্যথা করে।
রক্তটা মেশিনের ছোট্ট মুখে ছোঁয়াতেই একটা সংখ্যা উঠে আসে।
সে সংখ্যাটা দেখে।
আমি তর্জনীর ডগায় রক্তটা দেখি। টিমটিম করছে।
রাতে আমি ঘুমিয়ে পড়লে সে টুকটুক করে দ্বিতীয় তলা থেকে নিচে নামে। আমার মনে হয় আমি টের পাই না। আসলে পাই। এমনভাবে আস্তে আস্তে সুইচটা নামায়, যেন বাতি জ্বাললেও শব্দ হবে। তারপর রান্নাঘরে যায়। অন্য কিছু খায় না। সামান্য একটু মিষ্টি।
কালে আবার আমি তাকে বলি, “সুগার এত বাড়ে কেন?” সে আমার দিকে তাকায় না।
দিকে এক লম্বা ট্রেন, চলছে হুংকার দিতে দিতে।
হুংকারে মাটি কাঁপে কিনা জানি না। তবে আর কিছু কাঁপে না। কয়লা এখনও পোড়ে। তেল পোড়ে। কোটি কোটি বছর আগে মাটির নিচে চাপা পড়ে যাওয়া গাছপালা, জন্তুজানোয়ার, ডাইনোসরের শরীরের রক্তমাংস দিয়ে এখনও ইঞ্জিন চলে। ট্রেনটা চলে যায়।
হুংকারটা থাকে।
এইমাত্র একটা টাইরানোসরাস রেক্স আমার পাশ দিয়ে চলে গেছে, তার পেছনে ট্রাইসেরাটপস। আরও পেছনে ব্র্যাকিওসরাস।
একটু সামনে বিএনকে অটো রিপেয়ার। তার পাশে একটা পুরোনো গাড়ি পড়ে আছে। আরভি। সাত বছর ধরে দেখছি ওখানেই পড়ে আছে। প্রথম যখন দেখেছিলাম, চারটা চাকাই ছিল। পরে একটা নেই। তারপর আরেকটা। একদিন দেখি বনেট খোলা। ইঞ্জিনের ভেতর থেকে কী যেন খুলে নিয়ে গেছে। এখন কাচও নেই। যে কয়টা যন্ত্রপাতি কাজে লাগবে, মানুষ খুলে নেবে। বাকিটা হয়তো কোনোদিন ভাগাড়ে যাবে।
আমারও তো আছে দুটো চোখ। একটা হার্ট। দুটো কিডনি। লিভার। ফুসফুস। কত হাড়। কত শিরা। কত তার। একুশ বছর পর এগুলোর কোনটা থাকবে, কোনটা বদলাতে হবে কে?
রাস্তার মাথায় ল্যাম্পপোস্টটা এখনও জ্বলছে। দিনের আলো হয়ে গেছে, তবু জ্বলছে। বাতিটা টিমটিমে। নামটা বোধহয় সোডিয়াম নিয়ন। অনেক আগেই এসব বাতি বাতিল হয়ে গেছে।
সাঁইত্রিশ দিন আগে মেম্বার জ্যাক খুব উচ্চৈঃস্বরে বলেছিল, “আমাদের বিদ্যুৎ সাশ্রয় করতে হবে। এখন আর সোডিয়াম নিয়নের সময় নেই। সব এলইডি করতে হবে। ভাইয়েরা, আপনারা রাজি আছেন?”
সবাই একসঙ্গে বলেছিল, “জি।”
আমি নিজেও বলেছিলাম।
সাঁইত্রিশ দিন হয়ে গেছে।
মেম্বার সাহেব নিজের বাড়ির সামনের বাতিটা বদলেছেন কিনা জানি না। রাস্তারটা বদলায়নি।
টিমটিম করছে।

বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২০ আগস্ট ২০২৬
দেখতে না দেখতেই বছর ঘুরে যায়। তেমনি ঘুরে যায় দু বছর, তিন বছর, পাঁচ বছর, দশ বছর, পনেরো বছর।
আজ সে আমার পাশেই বসে আছে।
ভাত কম খেতে বললেই রাগ করে।
“খোকনরে, মাত্র এতকটা ভাত। তাও আমারে তুই খাইতে দিবি না? আমারে কি না খাওইয়াই মারবি?”
ডাক্তার মেটফরমিন দিয়েছে। প্রতিদিন সকালে আঙুলে সুচ ঢুকিয়ে এক ফোঁটা রক্ত বের করে দেখতে হয় সুগার কত।
তার রক্ত আমি সহ্য করতে পারি না।
সে কিন্তু পারে। সুন্দর করে সুচটা আঙুলে ফুটিয়ে বুড়ো আঙুল দিয়ে চাপ দেয়। টুক করে এক ফোঁটা রক্ত বেরিয়ে আসে। আমার গা শিউরে ওঠে। পায়ু কুঁচকে যায়। গোড়ায় ব্যথা করে।
রক্তটা মেশিনের ছোট্ট মুখে ছোঁয়াতেই একটা সংখ্যা উঠে আসে।
সে সংখ্যাটা দেখে।
আমি তর্জনীর ডগায় রক্তটা দেখি। টিমটিম করছে।
রাতে আমি ঘুমিয়ে পড়লে সে টুকটুক করে দ্বিতীয় তলা থেকে নিচে নামে। আমার মনে হয় আমি টের পাই না। আসলে পাই। এমনভাবে আস্তে আস্তে সুইচটা নামায়, যেন বাতি জ্বাললেও শব্দ হবে। তারপর রান্নাঘরে যায়। অন্য কিছু খায় না। সামান্য একটু মিষ্টি।
কালে আবার আমি তাকে বলি, “সুগার এত বাড়ে কেন?” সে আমার দিকে তাকায় না।
দিকে এক লম্বা ট্রেন, চলছে হুংকার দিতে দিতে।
হুংকারে মাটি কাঁপে কিনা জানি না। তবে আর কিছু কাঁপে না। কয়লা এখনও পোড়ে। তেল পোড়ে। কোটি কোটি বছর আগে মাটির নিচে চাপা পড়ে যাওয়া গাছপালা, জন্তুজানোয়ার, ডাইনোসরের শরীরের রক্তমাংস দিয়ে এখনও ইঞ্জিন চলে। ট্রেনটা চলে যায়।
হুংকারটা থাকে।
এইমাত্র একটা টাইরানোসরাস রেক্স আমার পাশ দিয়ে চলে গেছে, তার পেছনে ট্রাইসেরাটপস। আরও পেছনে ব্র্যাকিওসরাস।
একটু সামনে বিএনকে অটো রিপেয়ার। তার পাশে একটা পুরোনো গাড়ি পড়ে আছে। আরভি। সাত বছর ধরে দেখছি ওখানেই পড়ে আছে। প্রথম যখন দেখেছিলাম, চারটা চাকাই ছিল। পরে একটা নেই। তারপর আরেকটা। একদিন দেখি বনেট খোলা। ইঞ্জিনের ভেতর থেকে কী যেন খুলে নিয়ে গেছে। এখন কাচও নেই। যে কয়টা যন্ত্রপাতি কাজে লাগবে, মানুষ খুলে নেবে। বাকিটা হয়তো কোনোদিন ভাগাড়ে যাবে।
আমারও তো আছে দুটো চোখ। একটা হার্ট। দুটো কিডনি। লিভার। ফুসফুস। কত হাড়। কত শিরা। কত তার। একুশ বছর পর এগুলোর কোনটা থাকবে, কোনটা বদলাতে হবে কে?
রাস্তার মাথায় ল্যাম্পপোস্টটা এখনও জ্বলছে। দিনের আলো হয়ে গেছে, তবু জ্বলছে। বাতিটা টিমটিমে। নামটা বোধহয় সোডিয়াম নিয়ন। অনেক আগেই এসব বাতি বাতিল হয়ে গেছে।
সাঁইত্রিশ দিন আগে মেম্বার জ্যাক খুব উচ্চৈঃস্বরে বলেছিল, “আমাদের বিদ্যুৎ সাশ্রয় করতে হবে। এখন আর সোডিয়াম নিয়নের সময় নেই। সব এলইডি করতে হবে। ভাইয়েরা, আপনারা রাজি আছেন?”
সবাই একসঙ্গে বলেছিল, “জি।”
আমি নিজেও বলেছিলাম।
সাঁইত্রিশ দিন হয়ে গেছে।
মেম্বার সাহেব নিজের বাড়ির সামনের বাতিটা বদলেছেন কিনা জানি না। রাস্তারটা বদলায়নি।
টিমটিম করছে।

আপনার মতামত লিখুন