দুটি রাজপ্রাসাদ। দুটি রানি। দুজনেই অপরূপা, ক্ষমতাবতী এবং নিজেদের সৌন্দর্য সম্পর্কে প্রবলভাবে সচেতন। অথচ আশ্চর্যভাবে দুজনের কারও নিজের চোখই নিজের সৌন্দর্যের নিশ্চয়তা দেওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়। তাঁদের প্রয়োজন একটি দর্পণ— এমন এক জাদু-দর্পণ, যে শুধু মুখ দেখাবে না, রায়ও দেবে; শুধু প্রতিবিম্ব ফেরত দেবে না, ঘোষণা করবে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরী কে। এক রানি ইউরোপীয় লোককথার তুষারাচ্ছন্ন ভূগোলের বাসিন্দা; অন্যজন রবীন্দ্রনাথের কল্পিত প্রাচ্য রাজপুরীর মহিষী। একজনের সামনে ‘ম্যাজিক মিরর’ , অন্যজনের হাতে ‘মায়াময় কনকদর্পণ’। অথচ দুজনেই দর্পণের কাছে কার্যত একই প্রশ্ন করেন— আমি কি এখনও সকলের চেয়ে সুন্দরী? এবং দুজনেরই বিপর্যয় শুরু হয় সেই মুহূর্তে, যখন দর্পণ আর তাঁদের প্রত্যাশিত উত্তরটি দেয় না।
প্রথম কাহিনিটি গ্রিম ভ্রাতৃদ্বয়ের বিখ্যাত ‘স্নো হোয়াইট’। রাজমহিষী সুন্দরী, কিন্তু সেই সৌন্দর্যের সঙ্গে যুক্ত প্রবল অহংকার। তিনি সহ্য করতে পারেন না যে আর কোনো নারী তাঁর সৌন্দর্যকে অতিক্রম করতে পারে। প্রতিদিন জাদুদর্পণের সামনে দাঁড়িয়ে তাঁর একই জিজ্ঞাসা— “হু ইন দিস ল্যান্ড ইজ ফেয়ারেস্ট অফ অল?” যতদিন দর্পণ তাঁকেই শ্রেষ্ঠ সুন্দরী বলে স্বীকৃতি দেয়, ততদিন তাঁর আত্মপরিচয়ের পৃথিবী স্থিতিশীল। কিন্তু স্নো হোয়াইট বড় হয়ে উঠলে দর্পণের রায় বদলে যায়: রানির চেয়ে স্নো হোয়াইট বহুগুণ সুন্দরী। সঙ্গে সঙ্গে নন্দনের প্রশ্ন পরিণত হয় অস্তিত্বের যুদ্ধে। গ্রিমদের পাঠে ঈর্ষা ও অহংকার রানির হৃদয়ে আগাছার মতো বেড়ে ওঠে এবং তাঁকে দিনরাত শান্তিহীন করে তোলে। তারপর শুরু হয় একের পর এক হত্যার পরিকল্পনা— শিকারির হাতে মৃত্যু, ছদ্মবেশ, বিষাক্ত প্রসাধন, বিষাক্ত চিরুনি এবং শেষ পর্যন্ত বিষমাখা আপেল। সুন্দর হওয়া এখানে আর যথেষ্ট নয়; অন্য সুন্দরীর বেঁচে থাকাই রানির কাছে নিজের অস্তিত্বের অপমান।
দ্বিতীয় কাহিনিটি রবীন্দ্রনাথের ‘বিম্ববতী’। এখানেও এক রাজমহিষী সাজেন— কবরী বাঁধেন, নীলাম্বরী পরেন, প্রবালের হার, মুক্তার হার, রক্তাম্বর, সোনার আঁচল, কনক-রত্নে নিজেকে সজ্জিত করেন; তারপর গোপন আবরণ থেকে বের করেন তাঁর মায়াময় কনকদর্পণ। তাঁর প্রশ্নও গ্রিমদের রানির প্রশ্নের আশ্চর্য প্রতিধ্বনি: “সর্বশ্রেষ্ঠ রূপসী কে ধরায় বিরাজে।” কিন্তু দর্পণ তাঁর নিজের মুখ দেখায় না; সেখানে ভেসে ওঠে সতীনের মেয়ে রাজকন্যা বিম্ববতীর হাসিমুখ। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন— “রাজকন্যা বিম্ববতী সতীনের মেয়ে”— এবং তার পরেই ঘোষিত হয় তার শ্রেষ্ঠ সৌন্দর্য। রানির বুক বিদীর্ণ হয়। এখান থেকেই বিষফুল, বনবাস, বিষফল ও মৃত্যুচেষ্টার পুনরাবৃত্তি। অবশেষে রাজপুত্রের সঙ্গে জীবিত বিম্ববতীর বিবাহবেশী মুখ দর্পণে দেখা দিলে রানি আর প্রতিদ্বন্দ্বীকে আঘাত করতে পারেন না; এবার আক্রমণ করেন সত্যের মাধ্যমটিকেই— দর্পণকে। বালি দিয়ে ঘষেন, কালি লাগান, আগুন দেন, আছাড় মারেন। কিন্তু “প্রতিবিম্ব না হইল দূর”; শেষ পর্যন্ত ভাঙে না দর্পণ, ভেঙে পড়েন রানি নিজেই।
রবীন্দ্রনাথের কবিতাটির নাম ‘বিম্ববতী’ হলেও আত্মমুগ্ধ বা দর্পণাসক্ত চরিত্র বিম্ববতী নন। বিম্ববতী বরং নীরবভাবে বিদ্যমান সেই ‘অপর নারী’, যার সৌন্দর্য রানির আত্মপরিচয়কে সংকটে ফেলে। দর্পণের সামনে দাঁড়ান মহিষী; শ্রেষ্ঠত্ব জানতে চান মহিষী; ঈর্ষায় জ্বলেন মহিষী; বিম্ববতীকে হত্যা করতে চান মহিষী। রবীন্দ্রনাথের পাঠ নিজেই বিষয়টি দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রতিষ্ঠা করে। অতএব তুলনামূলক আলোচনায় প্রকৃত সমান্তরাল চরিত্র দুটি হলেন গ্রিমদের রূপকথার সৎমা রানি এবং রবীন্দ্রনাথের রাজমহিষী; আর স্নো হোয়াইট-এর সমান্তরালে দাঁড়ান বিম্ববতী।
‘বিম্ববতী’ সোনার তরী কাব্যগ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত এবং কবিতার শিরোনামের নিচেই রবীন্দ্রনাথ একে ‘রূপকথা’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। সোনার তরী গ্রন্থটি ১৮৯৪ সালে প্রকাশিত হয়; গ্রন্থটির কবিতাগুলি প্রধানত ১৮৯২ থেকে ১৮৯৩ সালের মধ্যে রচিত। এই ‘রূপকথা’ অভিধাটিই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ রবীন্দ্রনাথ শুরুতেই বাস্তববাদী চরিত্রকাহিনির বদলে এমন এক আদিপ্রতিকবাদী (archetypal) জগতে পাঠককে নিয়ে যান যেখানে জাদুদর্পণ কথা বলে, বিষে নিহত রাজকন্যা ফিরে আসে, প্রেম মৃত্যুকে অতিক্রম করে এবং অপরাধীর মানসিক বিকার শেষ পর্যন্ত নিজের পতন ঘটায়।
কবিতার কাব্যসূত্র নির্মিত হয়েছে পুনরাবৃত্তির এক অসাধারণ ছন্দে। রানি প্রতিবার নতুন করে সাজেন; প্রতিবার মনে করেন তাঁর নতুন পোশাক, নতুন গয়না, নতুন প্রসাধন হয়তো তাঁর রূপের অবস্থান পরিবর্তন করেছে; প্রতিবার দর্পণকে একই প্রকৃতির প্রশ্ন করেন; এবং প্রতিবারই দর্পণে ফিরে আসে বিম্ববতীর মুখ। প্রথমে বিস্ময়, তারপর ঈর্ষা, এরপর হত্যাচেষ্টা এবং শেষে উন্মত্ততা— এই ক্রমেই কবিতার মনস্তাত্ত্বিক টেনশন বৃদ্ধি পায়। কাহিনির গভীরতম বীজ নিহিত সেই প্রথম প্রশ্নেই: নিজের সৌন্দর্য অনুভব করার বদলে কেন রানিকে জানতে হচ্ছে তিনি ‘সর্বশ্রেষ্ঠ’ কি না? প্রশ্নটি আসলে রূপের নয়, অবস্থানিক ক্রমের; সৌন্দর্যের নয়, ক্ষমতার।
রবীন্দ্রনাথের মূলভাব তাই ‘সুন্দরী বিম্ববতীর বিজয়’ বললে অত্যন্ত সংকুচিত হয়ে যায়। কবিতাটি মূলত আত্মমুগ্ধ অহংকারের সঙ্গে এমন এক সত্যের সংঘর্ষ, যাকে ইচ্ছাশক্তি দিয়ে বদলানো যায় না। রানির ধারণা, সত্যকে হয়তো সাজসজ্জা দিয়ে পরাজিত করা যায়; তা না গেলে প্রতিদ্বন্দ্বীকে হত্যা করে; তাতেও না গেলে সত্য প্রকাশকারী দর্পণটিকেই ধ্বংস করে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ কাব্যিক সিদ্ধান্ত হলো— দর্পণ ধ্বংস হয় না। “মসী লেপি দিল তবু ছবি ঢাকিল না”—এই ক্ষুদ্র পঙ্ক্তির মধ্যে কবিতার জ্ঞানতাত্ত্বিক দর্শন নিহিত। সত্যের বাহককে আঘাত করলে সত্য মুছে যায় না। অতএব কবিতাটি একদিকে ঈর্ষার কাহিনি, অন্যদিকে এটি সত্য-অস্বীকারের ব্যর্থতার অ্যালিগরি।
গ্রিম ভ্রাতৃদ্বয়ের ‘স্নো হোয়াইট’-এর অন্তর্নিহিত বক্তব্যও বহুমাত্রিক। জনপ্রিয় সংস্করণে একে প্রায়ই নিষ্পাপ শুভশক্তির বিজয় ও দুষ্টু বিমাতার পতনের সহজ নৈতিক কাহিনি হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু এর মূল পাঠ আরও অন্ধকারাচ্ছন্ন। সেখানে রানির প্রধান মানসিক চালিকাশক্তি ‘ঈর্ষা’ এবং ‘অহঙ্কার’। স্নো হোয়াইট তার কোনো ক্ষমতা কেড়ে নেয় না, রাজসিংহাসন দাবি করে না, সরাসরি বিরোধও করে না; শুধু অধিক সুন্দর হয়ে ওঠে। সেই সৌন্দর্যই রানির কাছে অপরাধ। দর্পণ ঘোষণা করে স্নো হোয়াইট “আ থাউজান্ট টাইমস ফেয়ারার”; আর এই তুলনামূলক রায়ের পরেই হত্যাবাসনা শুরু হয়। অর্থাৎ কাহিনির কেন্দ্রে রয়েছে এমন এক আত্মরূপ, যা নিজের গুণের ওপর প্রতিষ্ঠিত নয়, অপরের তুলনায় নিজের শ্রেষ্ঠত্বের ওপর প্রতিষ্ঠিত।
এই কারণে ‘স্নো হোয়াইট’-এর প্রকৃত মনস্তাত্ত্বিক কেন্দ্র অনেকাংশেই রানি। হার্ভার্ডের ফোকলোর বিশেষজ্ঞ মারিয়া টাটার ‘স্নো হোয়াইট’ রূপকথাটিকে একজন নিষ্ক্রিয় রাজকন্যার সাধারণ গল্প হিসেবে না দেখে, বরং মা-মেয়ের প্রতিদ্বন্দ্বিতা, নারীর বার্ধক্য এবং মাতৃত্বের ঈর্ষা বিষয়ক একটি গভীর বৈশ্বিক আখ্যান হিসেবে বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি ‘স্নো হোয়াইট’-কেন্দ্রিক বিশ্বের বিভিন্ন কাহিনিকে রূপবতী যুবতী নারী বনাম তার বয়োজ্যেষ্ঠ নারী-প্রতিদ্বন্দ্বীর সংঘাত এবং ‘মাদার-ডটার টেনশন’-এর বৃহত্তর আন্তর্জাতিক ট্রাডিশন-এর মধ্যে স্থাপন করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন গ্রিম-ভ্রাতৃদ্বয়ের রূপকথার ১৮১২ সালের সংস্করণই এই মোটিফের একমাত্র বা আদিরূপ নয়; পৃথিবীর বহু অঞ্চলে সুন্দরী তরুণী এবং ঈর্ষাপরায়ণ মা, সৎমা, শাশুড়ি বা অন্য বয়োজ্যেষ্ঠ নারীর গল্প রয়েছে। ফলে ‘স্নো হোয়াইট’-এর অন্তর্নিহিত বক্তব্য শুধু ‘ভালো বনাম মন্দ’ নয়; ‘জেনারেশন’, ‘ফিমেল রাইভালরি’, ‘বিউটি’, ‘এইজিং’, ‘ম্যাটারনাল হোস্টিলিটি’ এবং ‘সোশ্যাল ভ্যালুয়েশন অফ উইমেন’-এর জটিল ক্ষেত্রও এর মধ্যে কাজ করে।
দুটি রানির মনোজগতকে সাইকো-অ্যানালিটিক দৃষ্টিতে দেখলে প্রথমে সামনে আসে মাত্রারিক্ত আত্ম-আসক্তির বিষয়টি। এখানে দুই রানির আত্ম-আসক্তির বিশেষত্ব হলো তাঁরা কেবল নিজেদের ভালোবাসেন না; তাঁরা নিজেদের এমন একটি আদর্শ প্রতিবিম্বকে ভালোবাসেন যা অন্য সকলের ঊর্ধ্বে। তাদের আত্মমুগ্ধতার সমীকরণ হলো আমি শুধু সুন্দর নই, আমি ‘সবচেয়ে’ সুন্দর। ফলে তাদের নিজেদের সম্পর্কে নিজস্ব আবেগীয় অবস্থান সুস্থির কিংবা সুস্থ নয়, বরং তা মুখ্যত বহির্সমর্থন-এর ওপর নির্ভরশীল।
এখানে লাকাঁর ‘মিরর স্টেজ’ বিশেষভাবে কার্যকর একটি রূপক। লাকাঁ দেখিয়েছিলেন, আয়নায় ঐক্যবদ্ধ নিজের ছবি ইগো নির্মাণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হলেও এই পরিচয় নিজেকে চেনার ক্ষেত্রে এক ধরনের ভুল-বিচার বা méconnaissance— অর্থাৎ নিজেকে একটি বাহ্যিক ইমেজের মাধ্যমে চেনার চেষ্টা এবং সেই ইমেজকেই পূর্ণ সত্তা বলে ভুল করা। দুই রানির ক্ষেত্রেই ‘আয়না’ তাই নিছক চেহারা দেখার দর্পণ নয়, বরং এটি তাদের স্বকপোলকল্পিত আদর্শিক সত্তার নির্ধারক। যেটি তারা হতে চায়— অনন্য, অপরাজেয়, সময়ের ঊর্ধ্বে শ্রেষ্ঠ সুন্দরী— দর্পণকে সেটিই নিশ্চিত করতে হবে। যতদিন দর্পণের উত্তর সেই প্রত্যাশিত ইমেজের সঙ্গে মিলে যায়, সে পর্যন্ত ইগো স্থিতিশীল থাকে। যেই মুহূর্তে দর্পণ তার পরিবর্তে অপর নারীর মুখ বা নাম সামনে আনে, তাদের আত্মমুগ্ধতার স্বাভাবিক ভারসাম্য ভেঙে পড়ে। তখন অপরের শ্রেষ্ঠত্ব নিজের অস্তিত্বের বিরুদ্ধে আঘাত বলে অনুভূত হয়। তখন অন্যের সৌন্দর্য এতটাই অসহনীয় হয়ে ওঠে যে, দুই রানির মনের যুক্তি দাঁড়ায়— ‘সে না থাকলে আমি আবার শ্রেষ্ঠ হব।’ এখান থেকেই আত্মমুগ্ধতা আক্রান্ত হয়ে রূপান্তরিত হয় প্রতিশোধপরায়ণ ক্রোধোন্মত্তায়।
গ্রিম ভ্রাতৃদ্বয়ের কাহিনিতে রানির এই আগ্রাসী ক্রোধ বহির্মুখী। তিনি প্রথমে শিকারিকে ব্যবহার করতে চান; পরে নিজেই ছদ্মবেশ ধারণ করে হত্যাকারীতে পরিণত হন। তার এই উন্মত্ততা ক্রমাগত বৃদ্ধি পেতে থাকে। কাহিনিতে তিনি শিকারির আনা অঙ্গপ্রত্যঙ্গ স্নো-হোয়াইট-এর বলে বিশ্বাস করে খেয়ে ফেলেন, তার আচরণিক এই কিম্ভূত উপাদানটি প্রতিদ্বন্দ্বীকে প্রতীকায়িতভাবে গ্রাস করার মাধ্যমে প্রতিদ্বন্দ্বিতার অবসান হিসেবেও সাইকো-অ্যানালেটিক পাঠে ব্যাখ্যাত হতে পারে।
অপরদিকে রবীন্দ্রনাথের কবিতাটিতে রাজমহিষীর আগ্রাসী মনোভাব একই উৎস থেকে জন্ম নিলেও শেষ পর্যায়ে আরও প্রতীকী হয়ে ওঠে। তিনি বিম্ববতীকে বিষফুল দেন, বনে পাঠান, বিষফল খাওয়ান; কিন্তু হত্যার পরিকল্পনা একেরপর এক ব্যর্থ হতে হতে তাঁর আক্রমণের লক্ষ্য স্থানান্তরিত হয়। শেষ পর্যন্ত তিনি বিম্ববতীকে নয়, দর্পণকে ধ্বংস করতে চান। এটি অক্ষমতার পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিশোধস্পৃহার ক্ষেত্রবদলের এক চমৎকার কাব্যিক দৃষ্টান্ত।
গল্প দুটিতে দুই রানির মধ্যে বার্ধক্যের আতঙ্কও সুপ্তভাবে উপস্থিত। ‘সবচেয়ে সুন্দরী’ হওয়া চিরস্থায়ী হতে পারে না, কারণ দেহ সময়ের অধীন। তরুণী স্নো হোয়াইট ও বিম্ববতী এই অর্থে শুধু প্রতিদ্বন্দ্বী নারী নন; তারা জেনারেশনের পরিবর্তনের প্রতীক। তাঁদের যৌবন বয়োজ্যেষ্ঠ রানিকে এমন একটি সত্য মনে করিয়ে দেয় যা তিনি মেনে নিতে চান না— সময় অতিক্রম করছে, সৌন্দর্যের কেন্দ্র অন্য দেহে স্থানান্তরিত হচ্ছে। ফলে তরুণীর বিরুদ্ধে আগ্রাসী মনোভাব আসলে নৈতিকতা ও যৌবনের বিরুদ্ধেও নিষ্ফল বিদ্রোহ।
তবে অনুসন্ধিৎসু পাঠকের মনে একটা প্রশ্ন আসতেই পারে, সেটি হলো— রবীন্দ্রনাথের ‘বিম্ববতী’ এবং গ্রিমদের ‘স্নো হোয়াইট’-এর মধ্যে প্রত্যক্ষ কোনো যোগসূত্র ছিল কি না। সময়ানুক্রমে সম্ভাবনাটি অসম্ভব নয়— বরং যথেষ্ট আকর্ষণীয়। গ্রিম ভ্রাতৃদ্বয়ের Kinder-und Hausmärchen-এর প্রথম সংস্করণ প্রকাশিত হয় ১৮১২ সালে; ১৮১২ থেকে ১৮৫৭ সালের মধ্যে সাতটি সংস্করণ প্রকাশিত হয় এবং কাহিনিগুলি বহুবার সংশোধিত হয়। স্নো হোয়াইট বা Sneewittchen ছিল এই সংকলনের ৫৩ নম্বর কাহিনি। উনিশ শতকেই গ্রিমদের গল্পগুলি ইউরোপের বাইরে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। প্রথম দিকের ইংরেজি অনুবাদও রবীন্দ্রনাথের জন্মের বহু দশক আগে প্রকাশিত হয়েছিল। অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথ জন্মগ্রহণ করেন ১৮৬১ সালে। তাঁর ‘বিম্ববতী’ কবিতা ‘সোনার তরী’ কাব্যগ্রন্থে সঙ্কলিত হয়ে প্রথম প্রকাশিত হয় ১৮৯৪ সালে। অর্থাৎ গ্রিমদের ‘স্নো হোয়াইট’ এবং রবীন্দ্রনাথের ‘বিম্ববতী’-র মধ্যে প্রায় আট দশকের ব্যবধান। কালগত দিক থেকে রবীন্দ্রনাথের গ্রিমদের স্নো হোয়াইট পাঠ বা এর কোনো ইংরেজি/বাংলা/মৌখিক অভিযোজনের সঙ্গে পরিচিত হওয়া অসম্ভব কিছু নয়।
দুটি রচনারই স্টোরিলাইনের মধ্যে রয়েছে অদ্ভুত সাযুজ্য: এক রাজা বা রাজপরিবার; সুন্দর কিন্তু আত্মমুগ্ধ বয়োজ্যেষ্ঠ রানি; তার তুলনায় সুন্দরতর কন্যা বা সতীনের মেয়ে; সত্য বলার যাদু-আয়না; ‘সবার চেয়ে সুন্দরী কে’— এই একই কেন্দ্রীয় প্রশ্ন; দর্পণের উত্তরে তরুণীর শ্রেষ্ঠত্ব; রানির ঈর্ষা; তরুণীকে হত্যার পুনঃ পুনঃ চেষ্টা; বিষপ্রয়োগ; আপাত মৃত্যু; পুনরুজ্জীবন; রাজপুত্র; বিবাহ; এবং শেষে রানির আত্মবিনাশ বা মৃত্যু। রবীন্দ্রনাথের কবিতায় বিষফলের মোটিফ এবং স্নো হোয়াইটে বিষ মেশানো আপেল-এর পারস্পরিক নৈকট্য বিশেষভাবে লক্ষণীয়। শুধু জেনেরিক ‘ঈর্ষাপরায়ণ সৎমা’ মোটিফ নয়, ঘটনাক্রমের এই ঘনিষ্ঠতাই আন্তঃপাঠের সম্ভাবনা বাড়ায়।
কিন্তু সাহিত্য-ইতিহাসের পটভূমিতে ‘সম্ভব’ আর ‘প্রমাণিত’ এক কথা নয়। এখন পর্যন্ত এমন কোনো নির্ভরযোগ্য পাণ্ডুলিপিগত নোট, রবীন্দ্রনাথের পত্রাবলি, স্মৃতিকথা কিংবা তাঁর পঠিত গ্রন্থের নির্ভরযোগ্য তালিকা বা এমন কোনো স্বীকারোক্তি পাওয়া যায় না— যেখান থেকে শতভাগ সুনিশ্চিত হওয়া যাবে যে, ‘বিম্ববতী’ গ্রিমদের ‘স্নো হোয়াইট’ অবলম্বনে রচিত। অতএব সরাসরি অ্যাডাপটেড বলে ঘোষণা করা হলে গবেষণাগতভাবে সেটি অতিরঞ্জিত হবে।
এখানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা রয়েছে। স্নো হোয়াইটসহ অনুরূপ রূপকথাগুলো গ্রিম ভ্রাতৃদ্বয়ের একচ্ছত্র সৃষ্টি নয়। তাঁরা মূলত মুখে মুখে প্রচলিত কাহিনি সংগ্রহ করে পুনর্লিখন করেছিলেন। তাঁদের সংগ্রহের প্রথম সংস্করণ ১৮১২ সালে প্রকাশিত হলেও কাহিনিগুলির মৌখিক ইতিহাস তারও বহু পূর্ববর্তী। National Endowment for the Humanities-এর আলোচনায়ও গ্রিমদের কাজকে জার্মান ওরাল ট্রাডিশন সংরক্ষণের প্রচেষ্টা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রখ্যাত ফোকলোর বিশেষজ্ঞ মারিয়া টাটার আরও দেখিয়েছেন যে, সুন্দরী তরুণী এবং ঈর্ষাপরায়ণ বয়োজ্যেষ্ঠ নারীর অনুরূপ আখ্যান ভারতসহ পৃথিবীর নানা সংস্কৃতিতেই রয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে ‘বিম্ববতী’র রাজমহিষীকে ‘স্নো হোয়াইট’-এর রানির ‘প্রাচ্য সংস্করণ’ বলা যায় কি?
কেউ যদি এভাবে বলতেও উদগ্রীব হন, উল্লিখিত শব্দবন্ধটির সঙ্গে বোধকরি ব্যাখ্যামূলক শর্ত যুক্ত করা অত্যন্ত জরুরি। যদি ‘প্রাচ্য সংস্করণ’ বলতে পোশাক, অলংকার, ভাষা, রাজপ্রাসাদ এবং সাংস্কৃতিক চিত্রকল্পে ভারতীয়কৃত রূপায়ণ বোঝানো হয়, তাহলে সাদৃশ্য এত প্রবল যে এই সংজ্ঞাটি সমালোচনামূলকভাবে ব্যবহার করা যেতেই পারে। তখন গ্রিমদের ‘ম্যাজিক মিরর’ রবীন্দ্রনাথে হয়ে যায় ‘মায়াময় কনকদর্পণ’; ইউরোপীয় রানির সাজ-পোশাকের বদলে আসে কবরী, নীলাম্বরী, প্রবালের হার, মুক্তার হার, সিন্দুরের টিপ, কাজল, রক্তাম্বর, সোনার আঁচল, কনক-রতন। অর্থাৎ একই ফেয়ারিটেল সাইকোলজি থেকে উৎসারিত হলেও কবিগুরুর এ কবিতাটি একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন নান্দনিক ও সাংস্কৃতিক শরীর লাভ করে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, রবীন্দ্রনাথের রানি শুধু গ্রিম-রানির বঙ্গীয় পোশাক পরা প্রতিলিপি নন। রবীন্দ্রনাথ চরিত্রটিকে একটি স্বতন্ত্র পোয়েটিক মনস্তত্ত্বে দাঁড় করিয়েছেন। গ্রিমদের কাহিনিতে জাদুদর্পণ মূলত প্লট মেকানিজম— রানিকে জানায় স্নো হোয়াইট এখনও বেঁচে আছে এবং অধিক সুন্দরী। রবীন্দ্রনাথের কবিতায় দর্পণ ক্রমশ কেন্দ্রীয় দার্শনিক প্রতীকে পরিণত হয়। কবিতার ক্লাইমেক্স স্নো হোয়াইট-এর মতো রাজবিবাহে রানির বাহ্যিক শাস্তিতে নয়; বরং দর্পণের বিরুদ্ধে রানির উন্মত্ত আক্রমণে। গ্রিমদের কাহিনিতে শেষ শাস্তি বহিরাগত এবং নির্মম— রানিকে উত্তপ্ত লোহার জুতো পরে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত নাচতে বাধ্য করা হয়। রবীন্দ্রনাথের কবিতায় শাস্তি অন্তর্জাত: নিজের হিংসা ও সত্য-অস্বীকারের উন্মত্ততায় রানি নিজেই ভেঙে পড়ে মারা যান।
এই পার্থক্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। গ্রিমদের মোরালিটি প্রধানত শাস্তিমূলক আর রবীন্দ্রনাথের মোরালিটি মনস্তাত্বিক, গ্রিমদের রানি অপরাধের জন্য শাস্তি পান; রবীন্দ্রনাথের রানি নিজের মনোজাগতিক প্রাকারের মধ্যেই নিজের শাস্তি বহন করেন। তাই ‘বিম্ববতী’কে শুধু ‘স্নো হোয়াইট’-এর অনুবর্তী রূপকথা বললে রবীন্দ্রনাথের সৃজনশীল রূপান্তরকে ছোট করে দেখা হবে।
আরও গভীরে গেলে বোঝা যায়, রবীন্দ্রনাথ ‘কণকদর্পণ’-কে এক ধরনের ‘জ্ঞানতাত্ত্বিক রূপক’-এ উন্নীত করেছেন। তাঁর রানি প্রথমে নিজেকে বদলে দর্পণের উত্তর বদলাতে চান; তারপর বিম্ববতীকে বদলাতে— অর্থাৎ হত্যা করতে চান; শেষে দর্পণকেই বদলাতে চান। কিন্তু তিনটিই ব্যর্থ। কারণ সত্য হলো এমনই সাজসজ্জা তাকে বদলাতে পারে না, হত্যাচেষ্টা তাকে স্থায়ীভাবে চাপা দিতে পারে না, সত্যের মাধ্যম ধ্বংসের চেষ্টা করেও তাকে মুছে ফেলা যায় না। দর্পণের পাশে মৃত রানি এবং দর্পণে জীবিত বিম্ববতী-রাজপুত্রের হাসিমুখ— দর্পণের এই শেষ প্রতিবিম্বটি রবীন্দ্রনাথের কবিতাকে সাধারণ রূপকথার হিতোপদেশ-মূলক উপলব্ধিকে দার্শনিক রূপক-এ উন্নীত করে।
সাইকো-অ্যানালিসিস-এর দৃষ্টিতেও ‘প্রাচ্য সংস্করণ’ ধারণাটি পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে। দুই রানি কেন পরস্পরের সঙ্গে নয়, অপেক্ষাকৃত তরুণ নারীর সঙ্গে সৌন্দর্যের প্রতিযোগিতায় বন্দি? তাদের মূল্য নির্ধারণের মূল মানদণ্ড ‘কে সবচেয়ে সুন্দর’? পিতৃতান্ত্রিক সংস্কৃতির পুরুষ-দৃষ্টি নারীকে যখন দৃশ্যমান সৌন্দর্যের সোপানে স্থাপন করে, তখন নারী নিজেই কখনও সেই দৃষ্টির অভ্যন্তরীণ এজেন্ট হয়ে উঠতে পারে। দর্পণ তখন পুরুষ নয়, বরং সে পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির নৈর্ব্যক্তিক হাতিয়ার হিসেবে সমুপস্থিত— সে নারী-সৌন্দর্যের ক্রম নির্ধারণ করে, অপর নারীর সঙ্গে প্রতিতুলনা করে, একজনকে প্রথম এবং অন্যজনকে দ্বিতীয় ঘোষণা করে। ফলে দুই রানির অপরাধ ব্যক্তিগত হলেও নিজেদেরকে অনিরাপদ ভাববার সামাজিক জিনিওলজি-ও আছে।
এই জায়গাতেই স্নো হোয়াইট এবং বিম্ববতী বিশেষ তাৎপর্যময়। কেউই প্রতিযোগিতায় অংশ নেয় না। তারা দর্পণকে জিজ্ঞেস করে নিশ্চিত হতে চায় না কে সবচেয়ে সুন্দর। বিপরীতে শ্রেষ্ঠত্বের ডিসকোর্স তৈরি করে বয়োজ্যেষ্ঠ নারী ও দর্পণ। অর্থাৎ তরুণীর সৌন্দর্য নিজের মধ্যে ভায়োলেন্স সৃষ্টি করে না; ভায়োলেন্স জন্ম নেয় যখন সৌন্দর্যকে কম্পারেটিভ-হায়ারার্কিতে রূপান্তরিত করা হয়। রবীন্দ্রনাথ সম্ভবত এখানেই গ্রিমীয় আর্কেটাইপকে আরও অন্তর্মুখী করেছেন: বিম্ববতীর মুখ নীরব, কিন্তু সেই নীরব মুখই রানির মনোজাগতিক স্থাপত্যকে ভেঙে চুরমার দেয়।
অতএব সময়ানুক্রম, মোটিফ করেসপন্ডেন্স এবং গল্পবয়ন কৌশল বিবেচনায় ‘বিম্ববতী’ ‘স্নো হোয়াইট’-এর মধ্যে আন্তঃসম্পর্কের সম্ভাবনা অস্বীকার করা কঠিন। গ্রিমদের কাহিনি রবীন্দ্রনাথের কবিতার প্রায় আট দশক আগে মুদ্রিত ও আন্তর্জাতিকভাবে প্রচারিত; রবীন্দ্রনাথের বহুভাষিক ও বিশ্বসাহিত্য-সচেতন পরিবেশে এ ধরনের ইউরোপীয় রূপকথার মোটিফ তাঁর নাগালের বাইরে ছিল— এমনটি ভাববার কারণ নেই। কিন্তু দালিলিক প্রমাণ ছাড়া সরাসরি গৃহীত কিংবা আত্তীকৃত ঘোষণা করাও সমানভাবে অবৈজ্ঞানিক।
সে কারণে রবীন্দ্রনাথের রাজমহিষীকে স্নো হোয়াইট-এর রানির নিছক ‘প্রাচ্য সংস্করণ’ না বলে ‘প্রাচ্য নন্দনচেতনায় পুনর্নির্মিত এক সমান্তরাল দর্পণ-আর্কিটাইপ’ বলা অধিক যথার্থ। তাঁর মধ্যে গ্রিমভাইদের রানির আত্মপ্রীতি , ঈর্ষা, বার্ধক্যভীতি, জিঘাংসা এবং দর্পণাসক্তির প্রবল প্রতিধ্বনি আছে; কিন্তু রবীন্দ্রনাথ এই আর্কেটাইপকে ভারতীয় অলঙ্কার, কাব্যিক পুনরাবৃত্তি, সত্য-মিথ্যার দর্শন এবং আত্মবিনাশী অহংকারের মনস্তত্ত্বে এমনভাবে পুনর্গঠন করেছেন যে, ফলে চরিত্রটি একটি নতুন সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব লাভ করেছে।
শেষ পর্যন্ত দুই রূপকথার রানির ট্র্যাজেডি একই মৌলিক ভ্রান্তিতে নিহিত: তাঁরা সৌন্দর্যকে অনুভব করতে শেখেননি, সৌন্দর্যের ওপর কর্তৃত্ব ফলাতে চেয়েছেন; নিজেকে ভালোবাসতে শেখেননি, অন্যের চেয়ে নিজেকে শ্রেষ্ঠ বলে স্বীকৃত হতে চেয়েছেন। তাঁদের দর্পণাসক্তি তাই আসলে আত্মপ্রেম নয়— আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি ঢাকবার অলীক প্রশ্রয়। প্রকৃত আত্ম-প্রেম কখনোই অলীক দর্পণের মুখাপেক্ষী নয় বলেই দর্পণের অনুসমর্থন তার কাছে অপ্রাসঙ্গিক; অপরদিকে নার্সিসিজম চায় অবিরাম অনুমোদনের নিশ্চয়তা। আর সেই নিশ্চয়তা যখন ভেঙে যায়, তখন অপরের মুখ হয়ে ওঠে অসহনীয়। এই অসহনীয়তা তাকে নিয়ে যায় নির্মমতার দিকে, আহ্বান করে অলীক প্রতিপক্ষকে নির্মূল করার মানসে নির্বিচার ধ্বংসযজ্ঞের দিকে। এসব কারণেই দুই আখ্যানের সবচেয়ে গভীর চরিত্র সম্ভবত স্নো হোয়াইট বা বিম্ববতীও নন, এমনকি রানিও নন— দর্পণ। কারণ সে কথা বলে অথচ পক্ষ নেয় না; সৌন্দর্য সৃষ্টি করে না, কেবল বিদ্যমান বাস্তবতা জানায়। গ্রিমদের দর্পণ সত্যের ঘোষক; রবীন্দ্রনাথের কনকদর্পণ সেই সত্যের ঘোষক থেকে ক্রমশ সত্যের অবিনাশিতার প্রতীকে উত্তীর্ণ হয়। গ্রিমভ্রাতৃদ্বয়ের রানি দর্পণের রায় শুনে অপরকে ধ্বংস করেন; রবীন্দ্রনাথের মহিষী শেষ পর্যন্ত দর্পণকেই ধ্বংস করতে গিয়ে নিজে ধ্বংসপ্রাপ্ত হন। এই সামান্য অথচ মৌলিক রূপান্তরের মধ্যেই

বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২০ আগস্ট ২০২৬
দুটি রাজপ্রাসাদ। দুটি রানি। দুজনেই অপরূপা, ক্ষমতাবতী এবং নিজেদের সৌন্দর্য সম্পর্কে প্রবলভাবে সচেতন। অথচ আশ্চর্যভাবে দুজনের কারও নিজের চোখই নিজের সৌন্দর্যের নিশ্চয়তা দেওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়। তাঁদের প্রয়োজন একটি দর্পণ— এমন এক জাদু-দর্পণ, যে শুধু মুখ দেখাবে না, রায়ও দেবে; শুধু প্রতিবিম্ব ফেরত দেবে না, ঘোষণা করবে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরী কে। এক রানি ইউরোপীয় লোককথার তুষারাচ্ছন্ন ভূগোলের বাসিন্দা; অন্যজন রবীন্দ্রনাথের কল্পিত প্রাচ্য রাজপুরীর মহিষী। একজনের সামনে ‘ম্যাজিক মিরর’ , অন্যজনের হাতে ‘মায়াময় কনকদর্পণ’। অথচ দুজনেই দর্পণের কাছে কার্যত একই প্রশ্ন করেন— আমি কি এখনও সকলের চেয়ে সুন্দরী? এবং দুজনেরই বিপর্যয় শুরু হয় সেই মুহূর্তে, যখন দর্পণ আর তাঁদের প্রত্যাশিত উত্তরটি দেয় না।
প্রথম কাহিনিটি গ্রিম ভ্রাতৃদ্বয়ের বিখ্যাত ‘স্নো হোয়াইট’। রাজমহিষী সুন্দরী, কিন্তু সেই সৌন্দর্যের সঙ্গে যুক্ত প্রবল অহংকার। তিনি সহ্য করতে পারেন না যে আর কোনো নারী তাঁর সৌন্দর্যকে অতিক্রম করতে পারে। প্রতিদিন জাদুদর্পণের সামনে দাঁড়িয়ে তাঁর একই জিজ্ঞাসা— “হু ইন দিস ল্যান্ড ইজ ফেয়ারেস্ট অফ অল?” যতদিন দর্পণ তাঁকেই শ্রেষ্ঠ সুন্দরী বলে স্বীকৃতি দেয়, ততদিন তাঁর আত্মপরিচয়ের পৃথিবী স্থিতিশীল। কিন্তু স্নো হোয়াইট বড় হয়ে উঠলে দর্পণের রায় বদলে যায়: রানির চেয়ে স্নো হোয়াইট বহুগুণ সুন্দরী। সঙ্গে সঙ্গে নন্দনের প্রশ্ন পরিণত হয় অস্তিত্বের যুদ্ধে। গ্রিমদের পাঠে ঈর্ষা ও অহংকার রানির হৃদয়ে আগাছার মতো বেড়ে ওঠে এবং তাঁকে দিনরাত শান্তিহীন করে তোলে। তারপর শুরু হয় একের পর এক হত্যার পরিকল্পনা— শিকারির হাতে মৃত্যু, ছদ্মবেশ, বিষাক্ত প্রসাধন, বিষাক্ত চিরুনি এবং শেষ পর্যন্ত বিষমাখা আপেল। সুন্দর হওয়া এখানে আর যথেষ্ট নয়; অন্য সুন্দরীর বেঁচে থাকাই রানির কাছে নিজের অস্তিত্বের অপমান।
দ্বিতীয় কাহিনিটি রবীন্দ্রনাথের ‘বিম্ববতী’। এখানেও এক রাজমহিষী সাজেন— কবরী বাঁধেন, নীলাম্বরী পরেন, প্রবালের হার, মুক্তার হার, রক্তাম্বর, সোনার আঁচল, কনক-রত্নে নিজেকে সজ্জিত করেন; তারপর গোপন আবরণ থেকে বের করেন তাঁর মায়াময় কনকদর্পণ। তাঁর প্রশ্নও গ্রিমদের রানির প্রশ্নের আশ্চর্য প্রতিধ্বনি: “সর্বশ্রেষ্ঠ রূপসী কে ধরায় বিরাজে।” কিন্তু দর্পণ তাঁর নিজের মুখ দেখায় না; সেখানে ভেসে ওঠে সতীনের মেয়ে রাজকন্যা বিম্ববতীর হাসিমুখ। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন— “রাজকন্যা বিম্ববতী সতীনের মেয়ে”— এবং তার পরেই ঘোষিত হয় তার শ্রেষ্ঠ সৌন্দর্য। রানির বুক বিদীর্ণ হয়। এখান থেকেই বিষফুল, বনবাস, বিষফল ও মৃত্যুচেষ্টার পুনরাবৃত্তি। অবশেষে রাজপুত্রের সঙ্গে জীবিত বিম্ববতীর বিবাহবেশী মুখ দর্পণে দেখা দিলে রানি আর প্রতিদ্বন্দ্বীকে আঘাত করতে পারেন না; এবার আক্রমণ করেন সত্যের মাধ্যমটিকেই— দর্পণকে। বালি দিয়ে ঘষেন, কালি লাগান, আগুন দেন, আছাড় মারেন। কিন্তু “প্রতিবিম্ব না হইল দূর”; শেষ পর্যন্ত ভাঙে না দর্পণ, ভেঙে পড়েন রানি নিজেই।
রবীন্দ্রনাথের কবিতাটির নাম ‘বিম্ববতী’ হলেও আত্মমুগ্ধ বা দর্পণাসক্ত চরিত্র বিম্ববতী নন। বিম্ববতী বরং নীরবভাবে বিদ্যমান সেই ‘অপর নারী’, যার সৌন্দর্য রানির আত্মপরিচয়কে সংকটে ফেলে। দর্পণের সামনে দাঁড়ান মহিষী; শ্রেষ্ঠত্ব জানতে চান মহিষী; ঈর্ষায় জ্বলেন মহিষী; বিম্ববতীকে হত্যা করতে চান মহিষী। রবীন্দ্রনাথের পাঠ নিজেই বিষয়টি দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রতিষ্ঠা করে। অতএব তুলনামূলক আলোচনায় প্রকৃত সমান্তরাল চরিত্র দুটি হলেন গ্রিমদের রূপকথার সৎমা রানি এবং রবীন্দ্রনাথের রাজমহিষী; আর স্নো হোয়াইট-এর সমান্তরালে দাঁড়ান বিম্ববতী।
‘বিম্ববতী’ সোনার তরী কাব্যগ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত এবং কবিতার শিরোনামের নিচেই রবীন্দ্রনাথ একে ‘রূপকথা’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। সোনার তরী গ্রন্থটি ১৮৯৪ সালে প্রকাশিত হয়; গ্রন্থটির কবিতাগুলি প্রধানত ১৮৯২ থেকে ১৮৯৩ সালের মধ্যে রচিত। এই ‘রূপকথা’ অভিধাটিই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ রবীন্দ্রনাথ শুরুতেই বাস্তববাদী চরিত্রকাহিনির বদলে এমন এক আদিপ্রতিকবাদী (archetypal) জগতে পাঠককে নিয়ে যান যেখানে জাদুদর্পণ কথা বলে, বিষে নিহত রাজকন্যা ফিরে আসে, প্রেম মৃত্যুকে অতিক্রম করে এবং অপরাধীর মানসিক বিকার শেষ পর্যন্ত নিজের পতন ঘটায়।
কবিতার কাব্যসূত্র নির্মিত হয়েছে পুনরাবৃত্তির এক অসাধারণ ছন্দে। রানি প্রতিবার নতুন করে সাজেন; প্রতিবার মনে করেন তাঁর নতুন পোশাক, নতুন গয়না, নতুন প্রসাধন হয়তো তাঁর রূপের অবস্থান পরিবর্তন করেছে; প্রতিবার দর্পণকে একই প্রকৃতির প্রশ্ন করেন; এবং প্রতিবারই দর্পণে ফিরে আসে বিম্ববতীর মুখ। প্রথমে বিস্ময়, তারপর ঈর্ষা, এরপর হত্যাচেষ্টা এবং শেষে উন্মত্ততা— এই ক্রমেই কবিতার মনস্তাত্ত্বিক টেনশন বৃদ্ধি পায়। কাহিনির গভীরতম বীজ নিহিত সেই প্রথম প্রশ্নেই: নিজের সৌন্দর্য অনুভব করার বদলে কেন রানিকে জানতে হচ্ছে তিনি ‘সর্বশ্রেষ্ঠ’ কি না? প্রশ্নটি আসলে রূপের নয়, অবস্থানিক ক্রমের; সৌন্দর্যের নয়, ক্ষমতার।
রবীন্দ্রনাথের মূলভাব তাই ‘সুন্দরী বিম্ববতীর বিজয়’ বললে অত্যন্ত সংকুচিত হয়ে যায়। কবিতাটি মূলত আত্মমুগ্ধ অহংকারের সঙ্গে এমন এক সত্যের সংঘর্ষ, যাকে ইচ্ছাশক্তি দিয়ে বদলানো যায় না। রানির ধারণা, সত্যকে হয়তো সাজসজ্জা দিয়ে পরাজিত করা যায়; তা না গেলে প্রতিদ্বন্দ্বীকে হত্যা করে; তাতেও না গেলে সত্য প্রকাশকারী দর্পণটিকেই ধ্বংস করে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ কাব্যিক সিদ্ধান্ত হলো— দর্পণ ধ্বংস হয় না। “মসী লেপি দিল তবু ছবি ঢাকিল না”—এই ক্ষুদ্র পঙ্ক্তির মধ্যে কবিতার জ্ঞানতাত্ত্বিক দর্শন নিহিত। সত্যের বাহককে আঘাত করলে সত্য মুছে যায় না। অতএব কবিতাটি একদিকে ঈর্ষার কাহিনি, অন্যদিকে এটি সত্য-অস্বীকারের ব্যর্থতার অ্যালিগরি।
গ্রিম ভ্রাতৃদ্বয়ের ‘স্নো হোয়াইট’-এর অন্তর্নিহিত বক্তব্যও বহুমাত্রিক। জনপ্রিয় সংস্করণে একে প্রায়ই নিষ্পাপ শুভশক্তির বিজয় ও দুষ্টু বিমাতার পতনের সহজ নৈতিক কাহিনি হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু এর মূল পাঠ আরও অন্ধকারাচ্ছন্ন। সেখানে রানির প্রধান মানসিক চালিকাশক্তি ‘ঈর্ষা’ এবং ‘অহঙ্কার’। স্নো হোয়াইট তার কোনো ক্ষমতা কেড়ে নেয় না, রাজসিংহাসন দাবি করে না, সরাসরি বিরোধও করে না; শুধু অধিক সুন্দর হয়ে ওঠে। সেই সৌন্দর্যই রানির কাছে অপরাধ। দর্পণ ঘোষণা করে স্নো হোয়াইট “আ থাউজান্ট টাইমস ফেয়ারার”; আর এই তুলনামূলক রায়ের পরেই হত্যাবাসনা শুরু হয়। অর্থাৎ কাহিনির কেন্দ্রে রয়েছে এমন এক আত্মরূপ, যা নিজের গুণের ওপর প্রতিষ্ঠিত নয়, অপরের তুলনায় নিজের শ্রেষ্ঠত্বের ওপর প্রতিষ্ঠিত।
এই কারণে ‘স্নো হোয়াইট’-এর প্রকৃত মনস্তাত্ত্বিক কেন্দ্র অনেকাংশেই রানি। হার্ভার্ডের ফোকলোর বিশেষজ্ঞ মারিয়া টাটার ‘স্নো হোয়াইট’ রূপকথাটিকে একজন নিষ্ক্রিয় রাজকন্যার সাধারণ গল্প হিসেবে না দেখে, বরং মা-মেয়ের প্রতিদ্বন্দ্বিতা, নারীর বার্ধক্য এবং মাতৃত্বের ঈর্ষা বিষয়ক একটি গভীর বৈশ্বিক আখ্যান হিসেবে বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি ‘স্নো হোয়াইট’-কেন্দ্রিক বিশ্বের বিভিন্ন কাহিনিকে রূপবতী যুবতী নারী বনাম তার বয়োজ্যেষ্ঠ নারী-প্রতিদ্বন্দ্বীর সংঘাত এবং ‘মাদার-ডটার টেনশন’-এর বৃহত্তর আন্তর্জাতিক ট্রাডিশন-এর মধ্যে স্থাপন করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন গ্রিম-ভ্রাতৃদ্বয়ের রূপকথার ১৮১২ সালের সংস্করণই এই মোটিফের একমাত্র বা আদিরূপ নয়; পৃথিবীর বহু অঞ্চলে সুন্দরী তরুণী এবং ঈর্ষাপরায়ণ মা, সৎমা, শাশুড়ি বা অন্য বয়োজ্যেষ্ঠ নারীর গল্প রয়েছে। ফলে ‘স্নো হোয়াইট’-এর অন্তর্নিহিত বক্তব্য শুধু ‘ভালো বনাম মন্দ’ নয়; ‘জেনারেশন’, ‘ফিমেল রাইভালরি’, ‘বিউটি’, ‘এইজিং’, ‘ম্যাটারনাল হোস্টিলিটি’ এবং ‘সোশ্যাল ভ্যালুয়েশন অফ উইমেন’-এর জটিল ক্ষেত্রও এর মধ্যে কাজ করে।
দুটি রানির মনোজগতকে সাইকো-অ্যানালিটিক দৃষ্টিতে দেখলে প্রথমে সামনে আসে মাত্রারিক্ত আত্ম-আসক্তির বিষয়টি। এখানে দুই রানির আত্ম-আসক্তির বিশেষত্ব হলো তাঁরা কেবল নিজেদের ভালোবাসেন না; তাঁরা নিজেদের এমন একটি আদর্শ প্রতিবিম্বকে ভালোবাসেন যা অন্য সকলের ঊর্ধ্বে। তাদের আত্মমুগ্ধতার সমীকরণ হলো আমি শুধু সুন্দর নই, আমি ‘সবচেয়ে’ সুন্দর। ফলে তাদের নিজেদের সম্পর্কে নিজস্ব আবেগীয় অবস্থান সুস্থির কিংবা সুস্থ নয়, বরং তা মুখ্যত বহির্সমর্থন-এর ওপর নির্ভরশীল।
এখানে লাকাঁর ‘মিরর স্টেজ’ বিশেষভাবে কার্যকর একটি রূপক। লাকাঁ দেখিয়েছিলেন, আয়নায় ঐক্যবদ্ধ নিজের ছবি ইগো নির্মাণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হলেও এই পরিচয় নিজেকে চেনার ক্ষেত্রে এক ধরনের ভুল-বিচার বা méconnaissance— অর্থাৎ নিজেকে একটি বাহ্যিক ইমেজের মাধ্যমে চেনার চেষ্টা এবং সেই ইমেজকেই পূর্ণ সত্তা বলে ভুল করা। দুই রানির ক্ষেত্রেই ‘আয়না’ তাই নিছক চেহারা দেখার দর্পণ নয়, বরং এটি তাদের স্বকপোলকল্পিত আদর্শিক সত্তার নির্ধারক। যেটি তারা হতে চায়— অনন্য, অপরাজেয়, সময়ের ঊর্ধ্বে শ্রেষ্ঠ সুন্দরী— দর্পণকে সেটিই নিশ্চিত করতে হবে। যতদিন দর্পণের উত্তর সেই প্রত্যাশিত ইমেজের সঙ্গে মিলে যায়, সে পর্যন্ত ইগো স্থিতিশীল থাকে। যেই মুহূর্তে দর্পণ তার পরিবর্তে অপর নারীর মুখ বা নাম সামনে আনে, তাদের আত্মমুগ্ধতার স্বাভাবিক ভারসাম্য ভেঙে পড়ে। তখন অপরের শ্রেষ্ঠত্ব নিজের অস্তিত্বের বিরুদ্ধে আঘাত বলে অনুভূত হয়। তখন অন্যের সৌন্দর্য এতটাই অসহনীয় হয়ে ওঠে যে, দুই রানির মনের যুক্তি দাঁড়ায়— ‘সে না থাকলে আমি আবার শ্রেষ্ঠ হব।’ এখান থেকেই আত্মমুগ্ধতা আক্রান্ত হয়ে রূপান্তরিত হয় প্রতিশোধপরায়ণ ক্রোধোন্মত্তায়।
গ্রিম ভ্রাতৃদ্বয়ের কাহিনিতে রানির এই আগ্রাসী ক্রোধ বহির্মুখী। তিনি প্রথমে শিকারিকে ব্যবহার করতে চান; পরে নিজেই ছদ্মবেশ ধারণ করে হত্যাকারীতে পরিণত হন। তার এই উন্মত্ততা ক্রমাগত বৃদ্ধি পেতে থাকে। কাহিনিতে তিনি শিকারির আনা অঙ্গপ্রত্যঙ্গ স্নো-হোয়াইট-এর বলে বিশ্বাস করে খেয়ে ফেলেন, তার আচরণিক এই কিম্ভূত উপাদানটি প্রতিদ্বন্দ্বীকে প্রতীকায়িতভাবে গ্রাস করার মাধ্যমে প্রতিদ্বন্দ্বিতার অবসান হিসেবেও সাইকো-অ্যানালেটিক পাঠে ব্যাখ্যাত হতে পারে।
অপরদিকে রবীন্দ্রনাথের কবিতাটিতে রাজমহিষীর আগ্রাসী মনোভাব একই উৎস থেকে জন্ম নিলেও শেষ পর্যায়ে আরও প্রতীকী হয়ে ওঠে। তিনি বিম্ববতীকে বিষফুল দেন, বনে পাঠান, বিষফল খাওয়ান; কিন্তু হত্যার পরিকল্পনা একেরপর এক ব্যর্থ হতে হতে তাঁর আক্রমণের লক্ষ্য স্থানান্তরিত হয়। শেষ পর্যন্ত তিনি বিম্ববতীকে নয়, দর্পণকে ধ্বংস করতে চান। এটি অক্ষমতার পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিশোধস্পৃহার ক্ষেত্রবদলের এক চমৎকার কাব্যিক দৃষ্টান্ত।
গল্প দুটিতে দুই রানির মধ্যে বার্ধক্যের আতঙ্কও সুপ্তভাবে উপস্থিত। ‘সবচেয়ে সুন্দরী’ হওয়া চিরস্থায়ী হতে পারে না, কারণ দেহ সময়ের অধীন। তরুণী স্নো হোয়াইট ও বিম্ববতী এই অর্থে শুধু প্রতিদ্বন্দ্বী নারী নন; তারা জেনারেশনের পরিবর্তনের প্রতীক। তাঁদের যৌবন বয়োজ্যেষ্ঠ রানিকে এমন একটি সত্য মনে করিয়ে দেয় যা তিনি মেনে নিতে চান না— সময় অতিক্রম করছে, সৌন্দর্যের কেন্দ্র অন্য দেহে স্থানান্তরিত হচ্ছে। ফলে তরুণীর বিরুদ্ধে আগ্রাসী মনোভাব আসলে নৈতিকতা ও যৌবনের বিরুদ্ধেও নিষ্ফল বিদ্রোহ।
তবে অনুসন্ধিৎসু পাঠকের মনে একটা প্রশ্ন আসতেই পারে, সেটি হলো— রবীন্দ্রনাথের ‘বিম্ববতী’ এবং গ্রিমদের ‘স্নো হোয়াইট’-এর মধ্যে প্রত্যক্ষ কোনো যোগসূত্র ছিল কি না। সময়ানুক্রমে সম্ভাবনাটি অসম্ভব নয়— বরং যথেষ্ট আকর্ষণীয়। গ্রিম ভ্রাতৃদ্বয়ের Kinder-und Hausmärchen-এর প্রথম সংস্করণ প্রকাশিত হয় ১৮১২ সালে; ১৮১২ থেকে ১৮৫৭ সালের মধ্যে সাতটি সংস্করণ প্রকাশিত হয় এবং কাহিনিগুলি বহুবার সংশোধিত হয়। স্নো হোয়াইট বা Sneewittchen ছিল এই সংকলনের ৫৩ নম্বর কাহিনি। উনিশ শতকেই গ্রিমদের গল্পগুলি ইউরোপের বাইরে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। প্রথম দিকের ইংরেজি অনুবাদও রবীন্দ্রনাথের জন্মের বহু দশক আগে প্রকাশিত হয়েছিল। অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথ জন্মগ্রহণ করেন ১৮৬১ সালে। তাঁর ‘বিম্ববতী’ কবিতা ‘সোনার তরী’ কাব্যগ্রন্থে সঙ্কলিত হয়ে প্রথম প্রকাশিত হয় ১৮৯৪ সালে। অর্থাৎ গ্রিমদের ‘স্নো হোয়াইট’ এবং রবীন্দ্রনাথের ‘বিম্ববতী’-র মধ্যে প্রায় আট দশকের ব্যবধান। কালগত দিক থেকে রবীন্দ্রনাথের গ্রিমদের স্নো হোয়াইট পাঠ বা এর কোনো ইংরেজি/বাংলা/মৌখিক অভিযোজনের সঙ্গে পরিচিত হওয়া অসম্ভব কিছু নয়।
দুটি রচনারই স্টোরিলাইনের মধ্যে রয়েছে অদ্ভুত সাযুজ্য: এক রাজা বা রাজপরিবার; সুন্দর কিন্তু আত্মমুগ্ধ বয়োজ্যেষ্ঠ রানি; তার তুলনায় সুন্দরতর কন্যা বা সতীনের মেয়ে; সত্য বলার যাদু-আয়না; ‘সবার চেয়ে সুন্দরী কে’— এই একই কেন্দ্রীয় প্রশ্ন; দর্পণের উত্তরে তরুণীর শ্রেষ্ঠত্ব; রানির ঈর্ষা; তরুণীকে হত্যার পুনঃ পুনঃ চেষ্টা; বিষপ্রয়োগ; আপাত মৃত্যু; পুনরুজ্জীবন; রাজপুত্র; বিবাহ; এবং শেষে রানির আত্মবিনাশ বা মৃত্যু। রবীন্দ্রনাথের কবিতায় বিষফলের মোটিফ এবং স্নো হোয়াইটে বিষ মেশানো আপেল-এর পারস্পরিক নৈকট্য বিশেষভাবে লক্ষণীয়। শুধু জেনেরিক ‘ঈর্ষাপরায়ণ সৎমা’ মোটিফ নয়, ঘটনাক্রমের এই ঘনিষ্ঠতাই আন্তঃপাঠের সম্ভাবনা বাড়ায়।
কিন্তু সাহিত্য-ইতিহাসের পটভূমিতে ‘সম্ভব’ আর ‘প্রমাণিত’ এক কথা নয়। এখন পর্যন্ত এমন কোনো নির্ভরযোগ্য পাণ্ডুলিপিগত নোট, রবীন্দ্রনাথের পত্রাবলি, স্মৃতিকথা কিংবা তাঁর পঠিত গ্রন্থের নির্ভরযোগ্য তালিকা বা এমন কোনো স্বীকারোক্তি পাওয়া যায় না— যেখান থেকে শতভাগ সুনিশ্চিত হওয়া যাবে যে, ‘বিম্ববতী’ গ্রিমদের ‘স্নো হোয়াইট’ অবলম্বনে রচিত। অতএব সরাসরি অ্যাডাপটেড বলে ঘোষণা করা হলে গবেষণাগতভাবে সেটি অতিরঞ্জিত হবে।
এখানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা রয়েছে। স্নো হোয়াইটসহ অনুরূপ রূপকথাগুলো গ্রিম ভ্রাতৃদ্বয়ের একচ্ছত্র সৃষ্টি নয়। তাঁরা মূলত মুখে মুখে প্রচলিত কাহিনি সংগ্রহ করে পুনর্লিখন করেছিলেন। তাঁদের সংগ্রহের প্রথম সংস্করণ ১৮১২ সালে প্রকাশিত হলেও কাহিনিগুলির মৌখিক ইতিহাস তারও বহু পূর্ববর্তী। National Endowment for the Humanities-এর আলোচনায়ও গ্রিমদের কাজকে জার্মান ওরাল ট্রাডিশন সংরক্ষণের প্রচেষ্টা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রখ্যাত ফোকলোর বিশেষজ্ঞ মারিয়া টাটার আরও দেখিয়েছেন যে, সুন্দরী তরুণী এবং ঈর্ষাপরায়ণ বয়োজ্যেষ্ঠ নারীর অনুরূপ আখ্যান ভারতসহ পৃথিবীর নানা সংস্কৃতিতেই রয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে ‘বিম্ববতী’র রাজমহিষীকে ‘স্নো হোয়াইট’-এর রানির ‘প্রাচ্য সংস্করণ’ বলা যায় কি?
কেউ যদি এভাবে বলতেও উদগ্রীব হন, উল্লিখিত শব্দবন্ধটির সঙ্গে বোধকরি ব্যাখ্যামূলক শর্ত যুক্ত করা অত্যন্ত জরুরি। যদি ‘প্রাচ্য সংস্করণ’ বলতে পোশাক, অলংকার, ভাষা, রাজপ্রাসাদ এবং সাংস্কৃতিক চিত্রকল্পে ভারতীয়কৃত রূপায়ণ বোঝানো হয়, তাহলে সাদৃশ্য এত প্রবল যে এই সংজ্ঞাটি সমালোচনামূলকভাবে ব্যবহার করা যেতেই পারে। তখন গ্রিমদের ‘ম্যাজিক মিরর’ রবীন্দ্রনাথে হয়ে যায় ‘মায়াময় কনকদর্পণ’; ইউরোপীয় রানির সাজ-পোশাকের বদলে আসে কবরী, নীলাম্বরী, প্রবালের হার, মুক্তার হার, সিন্দুরের টিপ, কাজল, রক্তাম্বর, সোনার আঁচল, কনক-রতন। অর্থাৎ একই ফেয়ারিটেল সাইকোলজি থেকে উৎসারিত হলেও কবিগুরুর এ কবিতাটি একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন নান্দনিক ও সাংস্কৃতিক শরীর লাভ করে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, রবীন্দ্রনাথের রানি শুধু গ্রিম-রানির বঙ্গীয় পোশাক পরা প্রতিলিপি নন। রবীন্দ্রনাথ চরিত্রটিকে একটি স্বতন্ত্র পোয়েটিক মনস্তত্ত্বে দাঁড় করিয়েছেন। গ্রিমদের কাহিনিতে জাদুদর্পণ মূলত প্লট মেকানিজম— রানিকে জানায় স্নো হোয়াইট এখনও বেঁচে আছে এবং অধিক সুন্দরী। রবীন্দ্রনাথের কবিতায় দর্পণ ক্রমশ কেন্দ্রীয় দার্শনিক প্রতীকে পরিণত হয়। কবিতার ক্লাইমেক্স স্নো হোয়াইট-এর মতো রাজবিবাহে রানির বাহ্যিক শাস্তিতে নয়; বরং দর্পণের বিরুদ্ধে রানির উন্মত্ত আক্রমণে। গ্রিমদের কাহিনিতে শেষ শাস্তি বহিরাগত এবং নির্মম— রানিকে উত্তপ্ত লোহার জুতো পরে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত নাচতে বাধ্য করা হয়। রবীন্দ্রনাথের কবিতায় শাস্তি অন্তর্জাত: নিজের হিংসা ও সত্য-অস্বীকারের উন্মত্ততায় রানি নিজেই ভেঙে পড়ে মারা যান।
এই পার্থক্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। গ্রিমদের মোরালিটি প্রধানত শাস্তিমূলক আর রবীন্দ্রনাথের মোরালিটি মনস্তাত্বিক, গ্রিমদের রানি অপরাধের জন্য শাস্তি পান; রবীন্দ্রনাথের রানি নিজের মনোজাগতিক প্রাকারের মধ্যেই নিজের শাস্তি বহন করেন। তাই ‘বিম্ববতী’কে শুধু ‘স্নো হোয়াইট’-এর অনুবর্তী রূপকথা বললে রবীন্দ্রনাথের সৃজনশীল রূপান্তরকে ছোট করে দেখা হবে।
আরও গভীরে গেলে বোঝা যায়, রবীন্দ্রনাথ ‘কণকদর্পণ’-কে এক ধরনের ‘জ্ঞানতাত্ত্বিক রূপক’-এ উন্নীত করেছেন। তাঁর রানি প্রথমে নিজেকে বদলে দর্পণের উত্তর বদলাতে চান; তারপর বিম্ববতীকে বদলাতে— অর্থাৎ হত্যা করতে চান; শেষে দর্পণকেই বদলাতে চান। কিন্তু তিনটিই ব্যর্থ। কারণ সত্য হলো এমনই সাজসজ্জা তাকে বদলাতে পারে না, হত্যাচেষ্টা তাকে স্থায়ীভাবে চাপা দিতে পারে না, সত্যের মাধ্যম ধ্বংসের চেষ্টা করেও তাকে মুছে ফেলা যায় না। দর্পণের পাশে মৃত রানি এবং দর্পণে জীবিত বিম্ববতী-রাজপুত্রের হাসিমুখ— দর্পণের এই শেষ প্রতিবিম্বটি রবীন্দ্রনাথের কবিতাকে সাধারণ রূপকথার হিতোপদেশ-মূলক উপলব্ধিকে দার্শনিক রূপক-এ উন্নীত করে।
সাইকো-অ্যানালিসিস-এর দৃষ্টিতেও ‘প্রাচ্য সংস্করণ’ ধারণাটি পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে। দুই রানি কেন পরস্পরের সঙ্গে নয়, অপেক্ষাকৃত তরুণ নারীর সঙ্গে সৌন্দর্যের প্রতিযোগিতায় বন্দি? তাদের মূল্য নির্ধারণের মূল মানদণ্ড ‘কে সবচেয়ে সুন্দর’? পিতৃতান্ত্রিক সংস্কৃতির পুরুষ-দৃষ্টি নারীকে যখন দৃশ্যমান সৌন্দর্যের সোপানে স্থাপন করে, তখন নারী নিজেই কখনও সেই দৃষ্টির অভ্যন্তরীণ এজেন্ট হয়ে উঠতে পারে। দর্পণ তখন পুরুষ নয়, বরং সে পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির নৈর্ব্যক্তিক হাতিয়ার হিসেবে সমুপস্থিত— সে নারী-সৌন্দর্যের ক্রম নির্ধারণ করে, অপর নারীর সঙ্গে প্রতিতুলনা করে, একজনকে প্রথম এবং অন্যজনকে দ্বিতীয় ঘোষণা করে। ফলে দুই রানির অপরাধ ব্যক্তিগত হলেও নিজেদেরকে অনিরাপদ ভাববার সামাজিক জিনিওলজি-ও আছে।
এই জায়গাতেই স্নো হোয়াইট এবং বিম্ববতী বিশেষ তাৎপর্যময়। কেউই প্রতিযোগিতায় অংশ নেয় না। তারা দর্পণকে জিজ্ঞেস করে নিশ্চিত হতে চায় না কে সবচেয়ে সুন্দর। বিপরীতে শ্রেষ্ঠত্বের ডিসকোর্স তৈরি করে বয়োজ্যেষ্ঠ নারী ও দর্পণ। অর্থাৎ তরুণীর সৌন্দর্য নিজের মধ্যে ভায়োলেন্স সৃষ্টি করে না; ভায়োলেন্স জন্ম নেয় যখন সৌন্দর্যকে কম্পারেটিভ-হায়ারার্কিতে রূপান্তরিত করা হয়। রবীন্দ্রনাথ সম্ভবত এখানেই গ্রিমীয় আর্কেটাইপকে আরও অন্তর্মুখী করেছেন: বিম্ববতীর মুখ নীরব, কিন্তু সেই নীরব মুখই রানির মনোজাগতিক স্থাপত্যকে ভেঙে চুরমার দেয়।
অতএব সময়ানুক্রম, মোটিফ করেসপন্ডেন্স এবং গল্পবয়ন কৌশল বিবেচনায় ‘বিম্ববতী’ ‘স্নো হোয়াইট’-এর মধ্যে আন্তঃসম্পর্কের সম্ভাবনা অস্বীকার করা কঠিন। গ্রিমদের কাহিনি রবীন্দ্রনাথের কবিতার প্রায় আট দশক আগে মুদ্রিত ও আন্তর্জাতিকভাবে প্রচারিত; রবীন্দ্রনাথের বহুভাষিক ও বিশ্বসাহিত্য-সচেতন পরিবেশে এ ধরনের ইউরোপীয় রূপকথার মোটিফ তাঁর নাগালের বাইরে ছিল— এমনটি ভাববার কারণ নেই। কিন্তু দালিলিক প্রমাণ ছাড়া সরাসরি গৃহীত কিংবা আত্তীকৃত ঘোষণা করাও সমানভাবে অবৈজ্ঞানিক।
সে কারণে রবীন্দ্রনাথের রাজমহিষীকে স্নো হোয়াইট-এর রানির নিছক ‘প্রাচ্য সংস্করণ’ না বলে ‘প্রাচ্য নন্দনচেতনায় পুনর্নির্মিত এক সমান্তরাল দর্পণ-আর্কিটাইপ’ বলা অধিক যথার্থ। তাঁর মধ্যে গ্রিমভাইদের রানির আত্মপ্রীতি , ঈর্ষা, বার্ধক্যভীতি, জিঘাংসা এবং দর্পণাসক্তির প্রবল প্রতিধ্বনি আছে; কিন্তু রবীন্দ্রনাথ এই আর্কেটাইপকে ভারতীয় অলঙ্কার, কাব্যিক পুনরাবৃত্তি, সত্য-মিথ্যার দর্শন এবং আত্মবিনাশী অহংকারের মনস্তত্ত্বে এমনভাবে পুনর্গঠন করেছেন যে, ফলে চরিত্রটি একটি নতুন সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব লাভ করেছে।
শেষ পর্যন্ত দুই রূপকথার রানির ট্র্যাজেডি একই মৌলিক ভ্রান্তিতে নিহিত: তাঁরা সৌন্দর্যকে অনুভব করতে শেখেননি, সৌন্দর্যের ওপর কর্তৃত্ব ফলাতে চেয়েছেন; নিজেকে ভালোবাসতে শেখেননি, অন্যের চেয়ে নিজেকে শ্রেষ্ঠ বলে স্বীকৃত হতে চেয়েছেন। তাঁদের দর্পণাসক্তি তাই আসলে আত্মপ্রেম নয়— আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি ঢাকবার অলীক প্রশ্রয়। প্রকৃত আত্ম-প্রেম কখনোই অলীক দর্পণের মুখাপেক্ষী নয় বলেই দর্পণের অনুসমর্থন তার কাছে অপ্রাসঙ্গিক; অপরদিকে নার্সিসিজম চায় অবিরাম অনুমোদনের নিশ্চয়তা। আর সেই নিশ্চয়তা যখন ভেঙে যায়, তখন অপরের মুখ হয়ে ওঠে অসহনীয়। এই অসহনীয়তা তাকে নিয়ে যায় নির্মমতার দিকে, আহ্বান করে অলীক প্রতিপক্ষকে নির্মূল করার মানসে নির্বিচার ধ্বংসযজ্ঞের দিকে। এসব কারণেই দুই আখ্যানের সবচেয়ে গভীর চরিত্র সম্ভবত স্নো হোয়াইট বা বিম্ববতীও নন, এমনকি রানিও নন— দর্পণ। কারণ সে কথা বলে অথচ পক্ষ নেয় না; সৌন্দর্য সৃষ্টি করে না, কেবল বিদ্যমান বাস্তবতা জানায়। গ্রিমদের দর্পণ সত্যের ঘোষক; রবীন্দ্রনাথের কনকদর্পণ সেই সত্যের ঘোষক থেকে ক্রমশ সত্যের অবিনাশিতার প্রতীকে উত্তীর্ণ হয়। গ্রিমভ্রাতৃদ্বয়ের রানি দর্পণের রায় শুনে অপরকে ধ্বংস করেন; রবীন্দ্রনাথের মহিষী শেষ পর্যন্ত দর্পণকেই ধ্বংস করতে গিয়ে নিজে ধ্বংসপ্রাপ্ত হন। এই সামান্য অথচ মৌলিক রূপান্তরের মধ্যেই

আপনার মতামত লিখুন