রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়া মহল্লার একটি বাসা থেকে শনিবার (২২ আগস্ট) রাতে রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী পার্থী ও ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী প্রিয়মের লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। মধ্যরাতে তালাবদ্ধ বাসা থেকে তাদের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।
এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে রোববার (২৩ আগস্ট) ভোরে মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাস নামে দুই যুবককে আটক করেছে পুলিশ। উদ্ধার করা হয় লুট করে নিয়ে যাওয়া বেশ কিছু সোনার অলংকার।
এদিকে, রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী তার ছেলে রংপুর জিলা স্কুলের পঞ্চম শ্রেণীর শিক্ষার্থী প্রিয়াম চক্রবর্তীসহ (১২) চারজনকে নৃশংসভাবে হত্যার প্রতিবাদে ও খুনিদের ফাঁসির দাবিতে দুপুরে রংপুর জিলা স্কুলের শত শত শিক্ষার্থী ক্লাস বর্জন করে বিক্ষোভ করে।
তারা মিছিল নিয়ে রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে গিয়ে পৃথক পৃথক স্মারকলিপি দেয়। পরে তারা আবারো জিলা স্কুলের সামনে রংপুর নগরীর প্রধান সড়কে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করে।
সংবাদ সম্মেলনে যা বললেন পুলিশ কমিশনার: দুপুরে রংপুর নগরীর কাছারী বাজার এলাকায় পুলিশ কমিশনারের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ বলেন, দুই খুনি মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাস বৃহস্পতিবার গভীর রাতে স্কুল শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে বসে ইয়াবা সেবন করছিল। শিক্ষক গণপতি শব্দ শুনে ছাদে গিয়ে খুনিদের দেখতে পেয়ে মাদক সেবন করতে নিষেধ করেন।
এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে খুনিরা প্রথমে গণপতিকে গলায় গামছা পেঁচিয়ে শ্বাস রোধে হত্যা করে। এ সময় তার চিৎকারে স্ত্রী প্রীতিলতা, মেয়ে প্রার্থী চক্রবর্তী সেখানে গেলে তাদের দুজনকেও একই কায়দায় হত্যা করে। এরপর তারা বাসায় ঢুকে একমাত্র ছেলে প্রিয়াম চক্রবর্তীকে হত্যা করে।
এরপর রাতভর বাসার ভেতরে অবস্থান করে। বাথরুমে গোসলও করে। ডাইনিং টেবিলে বসে সেখানে থাকা খেজুর খায়। তাদের সঙ্গে থাকা ইয়াবা সেবন করে। এরপর গণপতি ও তার স্ত্রীর দুটি মোবাইল ফোন বালতির পানিতে ভিজিয়ে রাখে।
শুক্রবার (২১ আগস্ট) সকালে বাসার সামনে লোকসমাগম কমে যাওয়া পর্যন্ত ভেতরেই অবস্থান করে তারা। জুমার নামাজের সময় লোকজন কমে গেলে তারা বাসা থেকে বের হয়ে চলে যায়। খুনিরা ঘটনাটিকে ডাকাতি বলে চালিয়ে দেবার জন্য বাসার মালামাল ও অসবাবপত্র এলোমেলো করে রাখে। এরপর তারা ঘটনাস্থলের অদূরে মন্দিরের পেছনে পরিত্যাক্ত জায়গায় লুট করে নিয়ে যাওয়া গহনা লুকিয়ে রাখে।
হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা দেওয়ার সময় পুলিশ কমিশনার বার বার হাউমাউ করে কাঁদতে থাকেন। তিনি বলেন, আমারও ওই বয়সী একটা ছেলে আছে। খুনিরা আটক হওয়ার পর অকপটে চারজনকে খুন করার কথা স্বীকার করে। সেই সঙ্গে লুট করে নিয়ে যাওয়া সোনার অলংকার উদ্ধারে সহায়তা করে। এঘটনায় থানায় হত্যা মামলা করা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে রংপুর সিআইডির পুলিশ সুপার সুমিত চৌধুরী, রংপুর মহানগর ডিবি পুলিশের ডিসি সনাতন চক্রবর্তীসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। গ্রেপ্তার দুই খুনির সঙ্গে সাংবাদিকদের কথা বলাসহ তারা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক কোনো জবানবন্দি দেবে কিনা, কখন আদালতে আসামিদের তোলা হবে- সে সম্পর্কে কিছু বলা হয়নি সংবাদ সম্মেলনে। এমনকি সাংবাদিকদের বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলার সুযোগও দেয়া হয়নি বলে সাংবাদিকরা জানিয়েছেন।
যেভাবে ৪ জনের লাশ উদ্ধার: পুলিশ নিহতের স্বজনরা ও এলাকাবাসী জানায়, রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়া মহল্লায় নিজ বাড়িতে পরিবার নিয়ে বসবাস করতেন রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী। তিনি অবসর নেওয়ার পর হোমিওপ্যাথি ডাক্তার হিসেবে চেম্বার খুলে প্রাকটিস করতেন। বৃহস্পতিবার রাত থেকে বাসার দরজা ভেতর থেকে তালাবদ্ধ ছিলো।
নিহত গণপতির বোন পুজা চক্রবর্তী জানান, শনিবার দফায় দফায় ফোন দিয়েও তার বোন প্রীতিলতাসহ পরিবারের কারো সঙ্গেই যোগাযোগ করতে পারছিলেন না তারা। বাসার চারটা ফোনই ছিলো বন্ধ। ফলে তাদের কোনো সাড়া শব্দ না পেয়ে তিনি ও তার অন্যান্য স্বজন শনিবার রাতে বাসায় এসে প্রধান গেট বন্ধ থাকায় ও কোনো সাড়া শব্দ না পেয়ে এলাকার লোকজনের সহায়তায় পুলিশকে খবর দেন।
পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা শনিবার রাত পৌনে ১১টার দিকে এসে দরজা ভেঙে বাসায় প্রবেশ করে। ঘরের মধ্যে একজনের লাশ ও বাসার ছাদের কাছে অপর তিনজনের লাশ উদ্ধার করে। এরা হলেন- সাবেক স্কুল শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী (৬৫) তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০) কন্যা মাস্টার্সের শিক্ষার্থী প্রার্থী চক্রবর্তী (২৪) এবং রংপুর জিলা স্কুলের পঞ্চম শ্রেণীর শিক্ষার্থী ছেলে প্রিয়াম চক্রবর্তী (১২)। তাদের লাশ বাসার বিভিন্ন স্থানে পড়ে থাকা অবস্থায় দেখতে পাওয়া যায়।
শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী তার স্ত্রী ও দুই ছেলে-মেয়ে নিয়ে তাদের নিজ বাসায় বসবাস করতেন বলে স্বজন ও এলাকাবাসী জানান।বাসার ভেতরের সব কিছু ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা হয়। সোনার অলংকারের বাক্সসহ মালামাল এলোমেলোভাবে পড়ে থাকায় স্বজনদের ধারণা, বাসায় ডাকাতি করে মালামাল নগদ অর্থ লুট করে নিয়ে যাবার সময় বাধা দেওয়ার কারণে সবাইকে হত্যা করেছে দুবৃর্ত্তরা। তারা খুনিদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন।
এদিকে, সিআইডি পুলিশের একটি ক্রাইম সিন ঘটনাস্থলে এসে আলামত সংগ্রহসহ পুরো বাড়ি কর্ডন করে। এরপর চারজনের লাশ উদ্ধার করে সুরতহাল রিপোর্ট করতে ভোর হয়ে যায়। রোববার ভোরে লাশ উদ্ধার করে ময়না তদন্তের জন্য রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে নিয়ে নিয়ে যায়।
এ ব্যাপারে সিআইডি পুলিশের পুলিশ সুপার সুমিত চৌধুরী জানান, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে এটি ডাকাতির ঘটনা। ঘটনাটি দুদিন আগে এ কারণে মৃত দেহগুলো বিকৃত হয়ে গেছে।
স্বজন ও এলাকাবাসীর নানা সন্দেহ: মাছুয়াপাড়া মহল্লায় নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে, পুরো বাড়ি কর্ডন করে পুলিশ সেখানে অবস্থান করছে। তার বাড়িটি দোতলা হলেও নির্মাণ কাজ শেষ হয়নি। বাড়ির পাশেই মুদি দোকান। সামনেও মুদি দোকান। ১৫ গজ দূরে একটি বড় মন্দির। আশেপাশে অনেক বাড়িঘর। পুরোপুরি ঘিঞ্জি এলাকাতে চার খুন সংঘটিত হলেও আশপাশের কেউ টের পেল না, এটা পুরোপুরি অবিশ্বাস্য বলে মনে করছেন এলাকার অনেকে।এমনকি বাসার লাগোয়া মুদি দোকানি মহেশ চন্দ্র কিছুই বলতে পারছেন না।
জিলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক যা বললেন: রোববার সকালে রংপুর জিলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক আবুল কালাম আজাদের নেতৃত্বে কয়েকজন শিক্ষক ঘটনাস্থলে আসেন। প্রধান শিক্ষক জানান, গণপতি চক্রবর্তী তাদের জিলা স্কুলের জনপ্রিয় শিক্ষক ছিলেন। চলতি বছরের জানুয়ারিতে এলপিআরে গেছেন। অন্যদিকে তার একমাত্র ছেলে প্রিয়াম চক্রবর্তী পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্র। সব শিক্ষক-শিক্ষার্থী গভীরভাবে শোকাহত। নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বিচার চাই। তিনি বলেন, নিহত শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে রোববার ক্লাস বর্জন করে খুনিদের গ্রেপ্তার ও বিচারের দাবিতে পুলিশ কমিশনার ও ডিসির কাছে স্মারক লিপি দিয়েছি।
স্থানীয় সংসদ সদস্য যা বললেন: সকাল সাড়ে ৯ টায় রংপুর সদর ৩ আসনের জামায়াত দলীয় সংসদ সদস্য মাহবুবার রহমান বেলাল, মহানগর জামায়াত আমি এটিএম আযম খানসহ দলের নেতাকর্মীদের নিয়ে নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বাসায় আসেন। তিনি নৃশংস হত্যাকাণ্ডের তীব্র প্রতিবাদ জানান। বলেন, রংপুর নগরীতে এক পরিবারের চারজনকে এভাবে হত্যার ঘটনায় প্রমাণিত হলো রংপুরে আইন-শৃঙখলার পরিস্থিতি চরম অবনতি ঘটেছে। তিনি অবিলম্বে খুনিদের গ্রেপ্তার ও দ্রুত বিচার দাবি করেন।
এদিকে রংপুর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক জেলা পরিষদের প্রশাসক সাইফুল ইসলাম রোববার দুপুরে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে সাংবাদিকদের জানান, যারাই জড়িত থাকুক না কেন গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনতে হবে।

রোববার, ২৩ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৩ আগস্ট ২০২৬
রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়া মহল্লার একটি বাসা থেকে শনিবার (২২ আগস্ট) রাতে রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী পার্থী ও ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী প্রিয়মের লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। মধ্যরাতে তালাবদ্ধ বাসা থেকে তাদের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।
এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে রোববার (২৩ আগস্ট) ভোরে মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাস নামে দুই যুবককে আটক করেছে পুলিশ। উদ্ধার করা হয় লুট করে নিয়ে যাওয়া বেশ কিছু সোনার অলংকার।
এদিকে, রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী তার ছেলে রংপুর জিলা স্কুলের পঞ্চম শ্রেণীর শিক্ষার্থী প্রিয়াম চক্রবর্তীসহ (১২) চারজনকে নৃশংসভাবে হত্যার প্রতিবাদে ও খুনিদের ফাঁসির দাবিতে দুপুরে রংপুর জিলা স্কুলের শত শত শিক্ষার্থী ক্লাস বর্জন করে বিক্ষোভ করে।
তারা মিছিল নিয়ে রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে গিয়ে পৃথক পৃথক স্মারকলিপি দেয়। পরে তারা আবারো জিলা স্কুলের সামনে রংপুর নগরীর প্রধান সড়কে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করে।
সংবাদ সম্মেলনে যা বললেন পুলিশ কমিশনার: দুপুরে রংপুর নগরীর কাছারী বাজার এলাকায় পুলিশ কমিশনারের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ বলেন, দুই খুনি মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাস বৃহস্পতিবার গভীর রাতে স্কুল শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে বসে ইয়াবা সেবন করছিল। শিক্ষক গণপতি শব্দ শুনে ছাদে গিয়ে খুনিদের দেখতে পেয়ে মাদক সেবন করতে নিষেধ করেন।
এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে খুনিরা প্রথমে গণপতিকে গলায় গামছা পেঁচিয়ে শ্বাস রোধে হত্যা করে। এ সময় তার চিৎকারে স্ত্রী প্রীতিলতা, মেয়ে প্রার্থী চক্রবর্তী সেখানে গেলে তাদের দুজনকেও একই কায়দায় হত্যা করে। এরপর তারা বাসায় ঢুকে একমাত্র ছেলে প্রিয়াম চক্রবর্তীকে হত্যা করে।
এরপর রাতভর বাসার ভেতরে অবস্থান করে। বাথরুমে গোসলও করে। ডাইনিং টেবিলে বসে সেখানে থাকা খেজুর খায়। তাদের সঙ্গে থাকা ইয়াবা সেবন করে। এরপর গণপতি ও তার স্ত্রীর দুটি মোবাইল ফোন বালতির পানিতে ভিজিয়ে রাখে।
শুক্রবার (২১ আগস্ট) সকালে বাসার সামনে লোকসমাগম কমে যাওয়া পর্যন্ত ভেতরেই অবস্থান করে তারা। জুমার নামাজের সময় লোকজন কমে গেলে তারা বাসা থেকে বের হয়ে চলে যায়। খুনিরা ঘটনাটিকে ডাকাতি বলে চালিয়ে দেবার জন্য বাসার মালামাল ও অসবাবপত্র এলোমেলো করে রাখে। এরপর তারা ঘটনাস্থলের অদূরে মন্দিরের পেছনে পরিত্যাক্ত জায়গায় লুট করে নিয়ে যাওয়া গহনা লুকিয়ে রাখে।
হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা দেওয়ার সময় পুলিশ কমিশনার বার বার হাউমাউ করে কাঁদতে থাকেন। তিনি বলেন, আমারও ওই বয়সী একটা ছেলে আছে। খুনিরা আটক হওয়ার পর অকপটে চারজনকে খুন করার কথা স্বীকার করে। সেই সঙ্গে লুট করে নিয়ে যাওয়া সোনার অলংকার উদ্ধারে সহায়তা করে। এঘটনায় থানায় হত্যা মামলা করা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে রংপুর সিআইডির পুলিশ সুপার সুমিত চৌধুরী, রংপুর মহানগর ডিবি পুলিশের ডিসি সনাতন চক্রবর্তীসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। গ্রেপ্তার দুই খুনির সঙ্গে সাংবাদিকদের কথা বলাসহ তারা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক কোনো জবানবন্দি দেবে কিনা, কখন আদালতে আসামিদের তোলা হবে- সে সম্পর্কে কিছু বলা হয়নি সংবাদ সম্মেলনে। এমনকি সাংবাদিকদের বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলার সুযোগও দেয়া হয়নি বলে সাংবাদিকরা জানিয়েছেন।
যেভাবে ৪ জনের লাশ উদ্ধার: পুলিশ নিহতের স্বজনরা ও এলাকাবাসী জানায়, রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়া মহল্লায় নিজ বাড়িতে পরিবার নিয়ে বসবাস করতেন রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী। তিনি অবসর নেওয়ার পর হোমিওপ্যাথি ডাক্তার হিসেবে চেম্বার খুলে প্রাকটিস করতেন। বৃহস্পতিবার রাত থেকে বাসার দরজা ভেতর থেকে তালাবদ্ধ ছিলো।
নিহত গণপতির বোন পুজা চক্রবর্তী জানান, শনিবার দফায় দফায় ফোন দিয়েও তার বোন প্রীতিলতাসহ পরিবারের কারো সঙ্গেই যোগাযোগ করতে পারছিলেন না তারা। বাসার চারটা ফোনই ছিলো বন্ধ। ফলে তাদের কোনো সাড়া শব্দ না পেয়ে তিনি ও তার অন্যান্য স্বজন শনিবার রাতে বাসায় এসে প্রধান গেট বন্ধ থাকায় ও কোনো সাড়া শব্দ না পেয়ে এলাকার লোকজনের সহায়তায় পুলিশকে খবর দেন।
পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা শনিবার রাত পৌনে ১১টার দিকে এসে দরজা ভেঙে বাসায় প্রবেশ করে। ঘরের মধ্যে একজনের লাশ ও বাসার ছাদের কাছে অপর তিনজনের লাশ উদ্ধার করে। এরা হলেন- সাবেক স্কুল শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী (৬৫) তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০) কন্যা মাস্টার্সের শিক্ষার্থী প্রার্থী চক্রবর্তী (২৪) এবং রংপুর জিলা স্কুলের পঞ্চম শ্রেণীর শিক্ষার্থী ছেলে প্রিয়াম চক্রবর্তী (১২)। তাদের লাশ বাসার বিভিন্ন স্থানে পড়ে থাকা অবস্থায় দেখতে পাওয়া যায়।
শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী তার স্ত্রী ও দুই ছেলে-মেয়ে নিয়ে তাদের নিজ বাসায় বসবাস করতেন বলে স্বজন ও এলাকাবাসী জানান।বাসার ভেতরের সব কিছু ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা হয়। সোনার অলংকারের বাক্সসহ মালামাল এলোমেলোভাবে পড়ে থাকায় স্বজনদের ধারণা, বাসায় ডাকাতি করে মালামাল নগদ অর্থ লুট করে নিয়ে যাবার সময় বাধা দেওয়ার কারণে সবাইকে হত্যা করেছে দুবৃর্ত্তরা। তারা খুনিদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন।
এদিকে, সিআইডি পুলিশের একটি ক্রাইম সিন ঘটনাস্থলে এসে আলামত সংগ্রহসহ পুরো বাড়ি কর্ডন করে। এরপর চারজনের লাশ উদ্ধার করে সুরতহাল রিপোর্ট করতে ভোর হয়ে যায়। রোববার ভোরে লাশ উদ্ধার করে ময়না তদন্তের জন্য রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে নিয়ে নিয়ে যায়।
এ ব্যাপারে সিআইডি পুলিশের পুলিশ সুপার সুমিত চৌধুরী জানান, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে এটি ডাকাতির ঘটনা। ঘটনাটি দুদিন আগে এ কারণে মৃত দেহগুলো বিকৃত হয়ে গেছে।
স্বজন ও এলাকাবাসীর নানা সন্দেহ: মাছুয়াপাড়া মহল্লায় নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে, পুরো বাড়ি কর্ডন করে পুলিশ সেখানে অবস্থান করছে। তার বাড়িটি দোতলা হলেও নির্মাণ কাজ শেষ হয়নি। বাড়ির পাশেই মুদি দোকান। সামনেও মুদি দোকান। ১৫ গজ দূরে একটি বড় মন্দির। আশেপাশে অনেক বাড়িঘর। পুরোপুরি ঘিঞ্জি এলাকাতে চার খুন সংঘটিত হলেও আশপাশের কেউ টের পেল না, এটা পুরোপুরি অবিশ্বাস্য বলে মনে করছেন এলাকার অনেকে।এমনকি বাসার লাগোয়া মুদি দোকানি মহেশ চন্দ্র কিছুই বলতে পারছেন না।
জিলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক যা বললেন: রোববার সকালে রংপুর জিলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক আবুল কালাম আজাদের নেতৃত্বে কয়েকজন শিক্ষক ঘটনাস্থলে আসেন। প্রধান শিক্ষক জানান, গণপতি চক্রবর্তী তাদের জিলা স্কুলের জনপ্রিয় শিক্ষক ছিলেন। চলতি বছরের জানুয়ারিতে এলপিআরে গেছেন। অন্যদিকে তার একমাত্র ছেলে প্রিয়াম চক্রবর্তী পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্র। সব শিক্ষক-শিক্ষার্থী গভীরভাবে শোকাহত। নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বিচার চাই। তিনি বলেন, নিহত শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে রোববার ক্লাস বর্জন করে খুনিদের গ্রেপ্তার ও বিচারের দাবিতে পুলিশ কমিশনার ও ডিসির কাছে স্মারক লিপি দিয়েছি।
স্থানীয় সংসদ সদস্য যা বললেন: সকাল সাড়ে ৯ টায় রংপুর সদর ৩ আসনের জামায়াত দলীয় সংসদ সদস্য মাহবুবার রহমান বেলাল, মহানগর জামায়াত আমি এটিএম আযম খানসহ দলের নেতাকর্মীদের নিয়ে নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বাসায় আসেন। তিনি নৃশংস হত্যাকাণ্ডের তীব্র প্রতিবাদ জানান। বলেন, রংপুর নগরীতে এক পরিবারের চারজনকে এভাবে হত্যার ঘটনায় প্রমাণিত হলো রংপুরে আইন-শৃঙখলার পরিস্থিতি চরম অবনতি ঘটেছে। তিনি অবিলম্বে খুনিদের গ্রেপ্তার ও দ্রুত বিচার দাবি করেন।
এদিকে রংপুর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক জেলা পরিষদের প্রশাসক সাইফুল ইসলাম রোববার দুপুরে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে সাংবাদিকদের জানান, যারাই জড়িত থাকুক না কেন গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনতে হবে।

আপনার মতামত লিখুন