নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের রূপসীতে আজও দাঁড়িয়ে আছে পোড়া সেই ছয়তলা ভবন। ধসে পড়েছে ছাদ, দেয়ালে আগুনের কালো দাগ। ভেতরে এখনো পড়ে আছে অচেনা কিছু মানুষের হাড়গোড়। যা সাক্ষী হয়ে আছে অমীমাংসিত এক ট্র্যাজেডির।
প্রায় দুই বছর আগে এখানেই আগুনে হারিয়ে গিয়েছিল শত শত প্রাণ। তাদের অন্তত ১৮২ জনের তালিকা রয়েছে প্রশাসনের কাছে। কিন্তু তাদের স্বজনরা আজও জানেন না, প্রিয় মানুষটির শেষ পরিণতি কী হয়েছিল!
এ ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠিত হয়। সে কমিটি ৩২ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনও জমা দেয়। তারা ভবন অপসারণ করে অনুসন্ধান, উদ্ধার করা হাড়ের ডিএনএ পরীক্ষা করে হস্তান্তর ও নিখোঁজদের শনাক্তের সুপারিশ দিলেও তার কোনোটিই বাস্তবায়িত হয়নি। এমনকি উদ্ধার হাড়গুলো পরীক্ষার জন্যও পাঠানো হয়নি বলে নিশ্চিত করেছে পুলিশ। প্রশাসনের এমন উদাসীন আচরণে ক্ষুব্ধ নিখোঁজদের স্বজনরা।
যা ঘটেছিল
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর প্রথম দফায় রূপগঞ্জে অবস্থিত নারায়ণগঞ্জ-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজীর উৎপাদনশীল কারখানা ‘গাজী টায়ারসে’ লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এদিন কারখানার কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়।
পরে ২৫ আগস্ট ভোরে গোলাম দস্তগীর গাজীর গ্রেপ্তারের সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে সকাল থেকে কারখানার আশপাশের এলাকায় উত্তেজনা বাড়ে। দুপুরে শুরু হয় লুটপাট। লুটপাট নিয়ন্ত্রণে নেওয়াকে কেন্দ্র করে বিকেলে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে। ক্রমে বাড়তে থাকে লুটপাটের মাত্রা। সন্ধ্যায় শত শত মানুষ কারখানাটিতে প্রবেশ করে।
এ সময় একটি পক্ষ পুড়ে যাওয়া ছয়তলা ভবনটির নিচতলায় আগুন ধরিয়ে গেটের শাটারে তালা লাগিয়ে চলে যায়। ভবনটিতে দাহ্য পদার্থ থাকায় আগুন দ্রুত প্রতিটি তলায় ছড়িয়ে পড়ে। যা নেভাতে ৫ দিন চেষ্টা চালাতে হয়েছিল ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সদস্যদের।
ঘটনার পর থেকে ‘নিখোঁজ’ দাবি করে কারখানার মূল ফটকের সামনে ভিড় করতে থাকেন অনেক মানুষ। দাবির প্রেক্ষিতে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সদস্যরা তালিকা করতে শুরু করেন। এ সংখ্যা ১০০ অতিক্রম করতেই তালিকা করা বন্ধ করে দেয় তারা। পরে শিক্ষার্থীরা এবং শেষে প্রশাসনের পক্ষ থেকে তালিকা করা হয়।
আগুন নেভানোর পর নিখোঁজদের অনুসন্ধানের কথা থাকলেও ৬ তলা ভবনটিকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে অনুসন্ধান বন্ধ করে দেয় প্রশাসন। তবে স্বজনদের দাবি, নিখোঁজরা কারখানায় গিয়েছিল। তাদের লাশ সেখানেই আছে। শেষে প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে পোড়া ভবনে প্রবেশ করে অনেকে। তারা ভবনটির একাধিক তলা ঘুরে নিহতদের কিছু হাড় খুঁজে পান। পরে তা প্রশাসনের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
সে সময় প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, নিখোঁজদের অনুসন্ধান ও হাড়গুলোর ডিএনএ টেস্ট করে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে। কিন্তু এখনো তা করা হয়নি।
অগ্নিকাণ্ডের পরপরই আট সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন তৎকালীন নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ মাহমুদুল হক। সে কমিটি পরের বছর, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ৩২ পৃষ্ঠার একটি প্রতিবেদন জমা দেয়।
যা ছিল তদন্ত প্রতিবেদনে
প্রতিবেদনে গাজী টায়ারসের ঘটনাকে ‘অগ্নিসংযোগ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কিছু বলা হয়নি। প্রতিবেদনটিতে নাম, ঠিকানা, বয়স, মুঠোফোন নম্বরসহ ১৮২ জন ব্যক্তির নিখোঁজ থাকার কথা উল্লেখ করা হয়। প্রতিবেদনের ১০টি সুপারিশের মধ্যে প্রথমটিতে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভবনটি অপসারণের মাধ্যমে উদ্ধারকাজ সম্পন্ন করা যায় বলে মতামত দেওয়া হয়। বলা হয়, ভবনটি মালিকপক্ষকেই অপসারণ করতে হবে।
ঘটনার বিষয়ে তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৫ আগস্ট প্রথমবার এই কারখানায় লুটপাট চালানো হয়। ওই সময় কারখানাটির বেশ কয়েকটি স্থাপনায় আগুন দেওয়া হয়। ৮ আগস্ট পর্যন্ত লুটপাট চলে। এর পর থেকে কারখানার ওই ভবনের বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ বন্ধ ছিল। ২৫ আগস্ট গোলাম দস্তগীরের গ্রেপ্তারের খবর ছড়িয়ে পড়লে বেলা ১১টার দিকে মাইকে ঘোষণা দিয়ে বেলা ৩টার দিকে রূপসী বাসস্ট্যান্ডে জড়ো হতে বলা হয়। এরপর দুর্বৃত্তরা কারখানার ভেতরে থাকা শ্রমিক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বের করে দিয়ে লুটপাট চালায়। তখন একাধিক দলের মধ্যে কারখানার বাইরে ও ভেতরে সংঘর্ষ হয়। আবার মসজিদের মাইকে কারখানায় ডাকাত ঢুকেছে ঘোষণা দিয়ে তাদের প্রতিহত করতে আহ্বান জানানো হয়। তাতে লুটপাট আরও বেড়ে যায়।
রাত আনুমানিক সাড়ে ১০টার দিকে লুটপাটকারীদের একটি দল ভবনের নিচতলায় আগুন ধরিয়ে গেটের শাটারে তালা লাগিয়ে চলে যায়। এ সময় অনেকে ভবনটির ওপরের অংশে ছিলেন। ভবনটিতে দাহ্য পদার্থ থাকায় দ্রুত প্রতিটি তলায় আগুন ছড়িয়ে পড়ে। আগুন পুরোপুরি নেভাতে পাঁচ দিন লাগে। দীর্ঘ সময় ধরে জ্বলতে থাকা আগুনে ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় সেখানে উদ্ধার অভিযান চালানো যায়নি।
কমিটি যথাযথ প্রক্রিয়ায় শনাক্ত করে স্বজনদের কাছে হাড়গোড় বুঝিয়ে দেওয়ার সুপারিশ করেছিল। তবে গত দুই বছরে ভবনটিতে উদ্ধার তৎপরতা কিংবা হাড়গোড় বুঝিয়ে দেওয়ার কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এমনকি যেসব হাড় ডিএনএ পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছিল, সেগুলো সম্পর্কেও তেমন কিছু বলতে পারছেন না কর্মকর্তারা।
এখনো অপেক্ষায় নিখোঁজদের স্বজনরা
সময়ের সঙ্গে প্রশাসন ঘটনাটি এড়িয়ে গেলেও হাল ছাড়তে নারাজ নিখোঁজদের স্বজনরা। তারা এখনো অপেক্ষায় আছেন প্রিয়জনের সন্ধানের জন্য। তাই গত দুই বছরে অসংখ্যবার জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, স্থানীয় সংসদ সদস্য, থানা এবং পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে ধরনা দিচ্ছেন। তাদের দাবি, প্রশাসন অন্তত প্রিয়জনের হাড়গুলো হস্তান্তর করুক। যাতে ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী মৃতের শেষ আচার-অনুষ্ঠান তারা সম্পন্ন করতে পারেন।
সেই ভিড়ে রয়েছেন উপজেলার মৈকূলী এলাকার নিখোঁজ দুই ভাই—ইলেকট্রিক মিস্ত্রি সাব্বির শিকদার (২৬) ও শাহাদাত শিকদার (৩০)-এর বাবা-মাও। এ ঘটনায় নিখোঁজ রয়েছেন তাদের মেয়ের জামাতা জামির আলীও।
নিখোঁজদের ছোট বোন সিনথিয়া সিকদার জানান, বাবা-মা, দুই ভাই, বড় ভাই শাহাদাতের দুই স্ত্রী ও তিন সন্তান নিয়ে ছিল তাদের পরিবার। ওই ঘটনার পর জামির আলীর স্ত্রী (মেজ বোন) ও তার তিন সন্তানও তাদের সঙ্গে বসবাস শুরু করেন। এদিকে পরিবারের দুই উপার্জনকারী নিখোঁজ থাকায় খুবই মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছে তাদের। তাদের অনুপস্থিতিতে আত্মীয়দের সহযোগিতাই তাদের একমাত্র ভরসা।
সিনথিয়া বলেন, “ভাইরা নিখোঁজ হওয়ার পর স্থানীয় মেরিল কোম্পানির একটি সাবান কারখানায় চাকরি নিছিলাম। এ বছর রোজায় ভাতিজার হাম আর নিউমোনিয়া হলে এক মাস ঢাকায় দৌড়াইতে হইছিল। সে সময় আমার চাকরিটা চইলা গেসে।”
ক্ষোভ প্রকাশ করে সিনথিয়া শিকদার বলেন, “প্রশাসন সঠিক মতো অনুসন্ধান করতাসে না। আমরা কতবার থানা, ডিসি অফিস, এসপি অফিস গেছি তার কোনো হিসাব নাই। থানায় গেলে ওসি সাহেব কথা বলেন না। সকাল ৮টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত বসে থাকি, তবু আমাদের পাত্তা দেয় না। আমরা যেন মানুষই না। ডিসি অফিসে গেলেও দেখা করতে দেয় না, যাওয়ার সময় বলে অন্যদিন আইসেন। আমরা চাই, তারা সঠিক অনুসন্ধানটা করুক। আমাদের লোকগুলা বাইচ্চা আছে, না মইরা গেছে—কিছু তো জানাক।”
একই গ্রামের পরিবার নিয়ে ভাড়া থাকতেন নিখোঁজ মনির। সেদিন কারখানায় লুটপাটের পর আগুনের খবর শুনে সেদিকে গিয়ে নিখোঁজ হয়েছিলেন মনির। মনিরের গ্রামের বাড়ি সুনামগঞ্জ সদর উপজেলায়। ভাইয়ের নিখোঁজ হওয়ার খবর পেয়ে বাড়ি থেকে রূপগঞ্জে এসেছিলেন বড় ভাই জাকির হোসেন।
মুঠোফোনে জাকির বলেন, “ভাইরে খুঁজতে অনেকদিন রূপগঞ্জ ছিলাম। যখন দেখলাম প্রশাসন কিছু করতাসে না, তখন অনেকের সাথে আমিও পোড়া কারখানায় ঢুকে পড়ছিলাম। আমরা অনেকগুলা হাড্ডি পাইয়া তাদের দিসিলাম। কিন্তু এরপর যখন দেখছি তারা কিছুই করে না। শেষে বাপ-মা কইল, লাশ তো নাই। সবই পুইড়া গেসে, কারখানা থেইক্কা ছাই নিয়া আয়। পরে আবার গিয়া ছাই আর ছোট ভাইয়ের বউ-বাচ্চা নিয়া গ্রামে চলে আসছিলাম।” জাকির জানান, মনির ‘মারা গেছেন’ ধরে নিয়ে গত বছর তাদের গ্রামের বাড়িতে গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
উদাসীন দায়িত্বশীলরা
গাজী টায়ারসের ঘটনার অগ্রগতি জানতে চাইলে নারায়ণগঞ্জের বর্তমান জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রায়হান কবির বলেন, “এ বিষয়ে আমার তেমন কিছু জানা নেই। একটু অপেক্ষা করুন, আমি জেনে জানাচ্ছি। তবে যতটুকু জানি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিখোঁজদের শনাক্তের বিষয়ে তদন্ত করছে।”
অন্তত ৩০ মিনিট অপেক্ষার পর তদন্ত প্রতিবেদন ও বর্তমান অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে ডেকে আনেন। এ সময় তার কাছে প্রতিবেদনে উল্লেখিত সুপারিশগুলো সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “মালিকপক্ষকে ভবনটি অপসারণের কথা বলা হয়েছে। এ সময় ভবনটিতে অনুসন্ধান চালানো হবে। আমি এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির মালিকপক্ষের সঙ্গে কথা বলব এবং অনুসন্ধান এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে আলোচনা করব।”
একই বিষয়ে জানতে চাইলে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার জিমানুর রহমান মুন্সি বলেন, “এ বিষয়ে আমরা তেমন কিছু জানি না। জেনে জানাতে হবে। এ বিষয়ে আপনি অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তারেক আল মেহেদীর সঙ্গে যোগাযোগ করুন।”
যোগাযোগ করা হলে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ ও অপারেশন) তারেক আল মেহেদী জানান, “পুলিশের তদন্তে নিখোঁজ ১৮২ জনের কারোর সন্ধান পাওয়া যায়নি।” তিনি বলেন, “আমরা নিখোঁজদের ব্যবহৃত মুঠোফোন নম্বরের সর্বশেষ লোকেশন এবং নম্বরটি কোথাও সচল আছে কি না, এসব বিষয় খতিয়ে শনাক্তের কাজ করি। তদন্তকাজটি প্রায় শেষ, আমরা প্রতিবেদন জমা দেব। তবে নিখোঁজ কাউকে আমরা খুঁজে পাইনি।”
পোড়া ভবন থেকে উদ্ধার হাড়গুলোর ডিএনএ পরীক্ষা ও হস্তান্তরের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এসব ঘটনায় কেউ এসে হাড়গুলো তার স্বজনের দাবি করলে আমরা তাদের নমুনা নিয়ে হাড়ের ডিএনএ পরীক্ষা করি। কিন্তু এ ঘটনায় কেউ হাড়গুলো তাদের স্বজনের দাবি না করায় এগুলোর ডিএনএ পরীক্ষা হয়নি।”
প্রশাসন বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিখোঁজ দাবি করা স্বজনদের কাছ থেকে ডিএনএ নমুনা আহ্বান করেছিল কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, “না, আমরা কারো কাছে ডিএনএ নমুনা আহ্বান করিনি।”
এদিকে অগ্নিসংযোগের পর থেকে বন্ধ রয়েছে গাজী টায়ারসের কার্যক্রম। তদন্ত কমিটি মালিকপক্ষকে ভবন অপসারণের সুপারিশ করলেও তা করা হয়নি।
গাজী গ্রুপের মালিক গোলাম দস্তগীর গাজী কারাবন্দি থাকায় গ্রুপটির বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও এ বিষয়ে কারও সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি।

রোববার, ২৩ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৩ আগস্ট ২০২৬
নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের রূপসীতে আজও দাঁড়িয়ে আছে পোড়া সেই ছয়তলা ভবন। ধসে পড়েছে ছাদ, দেয়ালে আগুনের কালো দাগ। ভেতরে এখনো পড়ে আছে অচেনা কিছু মানুষের হাড়গোড়। যা সাক্ষী হয়ে আছে অমীমাংসিত এক ট্র্যাজেডির।
প্রায় দুই বছর আগে এখানেই আগুনে হারিয়ে গিয়েছিল শত শত প্রাণ। তাদের অন্তত ১৮২ জনের তালিকা রয়েছে প্রশাসনের কাছে। কিন্তু তাদের স্বজনরা আজও জানেন না, প্রিয় মানুষটির শেষ পরিণতি কী হয়েছিল!
এ ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠিত হয়। সে কমিটি ৩২ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনও জমা দেয়। তারা ভবন অপসারণ করে অনুসন্ধান, উদ্ধার করা হাড়ের ডিএনএ পরীক্ষা করে হস্তান্তর ও নিখোঁজদের শনাক্তের সুপারিশ দিলেও তার কোনোটিই বাস্তবায়িত হয়নি। এমনকি উদ্ধার হাড়গুলো পরীক্ষার জন্যও পাঠানো হয়নি বলে নিশ্চিত করেছে পুলিশ। প্রশাসনের এমন উদাসীন আচরণে ক্ষুব্ধ নিখোঁজদের স্বজনরা।
যা ঘটেছিল
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর প্রথম দফায় রূপগঞ্জে অবস্থিত নারায়ণগঞ্জ-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজীর উৎপাদনশীল কারখানা ‘গাজী টায়ারসে’ লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এদিন কারখানার কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়।
পরে ২৫ আগস্ট ভোরে গোলাম দস্তগীর গাজীর গ্রেপ্তারের সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে সকাল থেকে কারখানার আশপাশের এলাকায় উত্তেজনা বাড়ে। দুপুরে শুরু হয় লুটপাট। লুটপাট নিয়ন্ত্রণে নেওয়াকে কেন্দ্র করে বিকেলে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে। ক্রমে বাড়তে থাকে লুটপাটের মাত্রা। সন্ধ্যায় শত শত মানুষ কারখানাটিতে প্রবেশ করে।
এ সময় একটি পক্ষ পুড়ে যাওয়া ছয়তলা ভবনটির নিচতলায় আগুন ধরিয়ে গেটের শাটারে তালা লাগিয়ে চলে যায়। ভবনটিতে দাহ্য পদার্থ থাকায় আগুন দ্রুত প্রতিটি তলায় ছড়িয়ে পড়ে। যা নেভাতে ৫ দিন চেষ্টা চালাতে হয়েছিল ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সদস্যদের।
ঘটনার পর থেকে ‘নিখোঁজ’ দাবি করে কারখানার মূল ফটকের সামনে ভিড় করতে থাকেন অনেক মানুষ। দাবির প্রেক্ষিতে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সদস্যরা তালিকা করতে শুরু করেন। এ সংখ্যা ১০০ অতিক্রম করতেই তালিকা করা বন্ধ করে দেয় তারা। পরে শিক্ষার্থীরা এবং শেষে প্রশাসনের পক্ষ থেকে তালিকা করা হয়।
আগুন নেভানোর পর নিখোঁজদের অনুসন্ধানের কথা থাকলেও ৬ তলা ভবনটিকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে অনুসন্ধান বন্ধ করে দেয় প্রশাসন। তবে স্বজনদের দাবি, নিখোঁজরা কারখানায় গিয়েছিল। তাদের লাশ সেখানেই আছে। শেষে প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে পোড়া ভবনে প্রবেশ করে অনেকে। তারা ভবনটির একাধিক তলা ঘুরে নিহতদের কিছু হাড় খুঁজে পান। পরে তা প্রশাসনের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
সে সময় প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, নিখোঁজদের অনুসন্ধান ও হাড়গুলোর ডিএনএ টেস্ট করে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে। কিন্তু এখনো তা করা হয়নি।
অগ্নিকাণ্ডের পরপরই আট সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন তৎকালীন নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ মাহমুদুল হক। সে কমিটি পরের বছর, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ৩২ পৃষ্ঠার একটি প্রতিবেদন জমা দেয়।
যা ছিল তদন্ত প্রতিবেদনে
প্রতিবেদনে গাজী টায়ারসের ঘটনাকে ‘অগ্নিসংযোগ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কিছু বলা হয়নি। প্রতিবেদনটিতে নাম, ঠিকানা, বয়স, মুঠোফোন নম্বরসহ ১৮২ জন ব্যক্তির নিখোঁজ থাকার কথা উল্লেখ করা হয়। প্রতিবেদনের ১০টি সুপারিশের মধ্যে প্রথমটিতে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভবনটি অপসারণের মাধ্যমে উদ্ধারকাজ সম্পন্ন করা যায় বলে মতামত দেওয়া হয়। বলা হয়, ভবনটি মালিকপক্ষকেই অপসারণ করতে হবে।
ঘটনার বিষয়ে তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৫ আগস্ট প্রথমবার এই কারখানায় লুটপাট চালানো হয়। ওই সময় কারখানাটির বেশ কয়েকটি স্থাপনায় আগুন দেওয়া হয়। ৮ আগস্ট পর্যন্ত লুটপাট চলে। এর পর থেকে কারখানার ওই ভবনের বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ বন্ধ ছিল। ২৫ আগস্ট গোলাম দস্তগীরের গ্রেপ্তারের খবর ছড়িয়ে পড়লে বেলা ১১টার দিকে মাইকে ঘোষণা দিয়ে বেলা ৩টার দিকে রূপসী বাসস্ট্যান্ডে জড়ো হতে বলা হয়। এরপর দুর্বৃত্তরা কারখানার ভেতরে থাকা শ্রমিক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বের করে দিয়ে লুটপাট চালায়। তখন একাধিক দলের মধ্যে কারখানার বাইরে ও ভেতরে সংঘর্ষ হয়। আবার মসজিদের মাইকে কারখানায় ডাকাত ঢুকেছে ঘোষণা দিয়ে তাদের প্রতিহত করতে আহ্বান জানানো হয়। তাতে লুটপাট আরও বেড়ে যায়।
রাত আনুমানিক সাড়ে ১০টার দিকে লুটপাটকারীদের একটি দল ভবনের নিচতলায় আগুন ধরিয়ে গেটের শাটারে তালা লাগিয়ে চলে যায়। এ সময় অনেকে ভবনটির ওপরের অংশে ছিলেন। ভবনটিতে দাহ্য পদার্থ থাকায় দ্রুত প্রতিটি তলায় আগুন ছড়িয়ে পড়ে। আগুন পুরোপুরি নেভাতে পাঁচ দিন লাগে। দীর্ঘ সময় ধরে জ্বলতে থাকা আগুনে ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় সেখানে উদ্ধার অভিযান চালানো যায়নি।
কমিটি যথাযথ প্রক্রিয়ায় শনাক্ত করে স্বজনদের কাছে হাড়গোড় বুঝিয়ে দেওয়ার সুপারিশ করেছিল। তবে গত দুই বছরে ভবনটিতে উদ্ধার তৎপরতা কিংবা হাড়গোড় বুঝিয়ে দেওয়ার কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এমনকি যেসব হাড় ডিএনএ পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছিল, সেগুলো সম্পর্কেও তেমন কিছু বলতে পারছেন না কর্মকর্তারা।
এখনো অপেক্ষায় নিখোঁজদের স্বজনরা
সময়ের সঙ্গে প্রশাসন ঘটনাটি এড়িয়ে গেলেও হাল ছাড়তে নারাজ নিখোঁজদের স্বজনরা। তারা এখনো অপেক্ষায় আছেন প্রিয়জনের সন্ধানের জন্য। তাই গত দুই বছরে অসংখ্যবার জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, স্থানীয় সংসদ সদস্য, থানা এবং পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে ধরনা দিচ্ছেন। তাদের দাবি, প্রশাসন অন্তত প্রিয়জনের হাড়গুলো হস্তান্তর করুক। যাতে ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী মৃতের শেষ আচার-অনুষ্ঠান তারা সম্পন্ন করতে পারেন।
সেই ভিড়ে রয়েছেন উপজেলার মৈকূলী এলাকার নিখোঁজ দুই ভাই—ইলেকট্রিক মিস্ত্রি সাব্বির শিকদার (২৬) ও শাহাদাত শিকদার (৩০)-এর বাবা-মাও। এ ঘটনায় নিখোঁজ রয়েছেন তাদের মেয়ের জামাতা জামির আলীও।
নিখোঁজদের ছোট বোন সিনথিয়া সিকদার জানান, বাবা-মা, দুই ভাই, বড় ভাই শাহাদাতের দুই স্ত্রী ও তিন সন্তান নিয়ে ছিল তাদের পরিবার। ওই ঘটনার পর জামির আলীর স্ত্রী (মেজ বোন) ও তার তিন সন্তানও তাদের সঙ্গে বসবাস শুরু করেন। এদিকে পরিবারের দুই উপার্জনকারী নিখোঁজ থাকায় খুবই মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছে তাদের। তাদের অনুপস্থিতিতে আত্মীয়দের সহযোগিতাই তাদের একমাত্র ভরসা।
সিনথিয়া বলেন, “ভাইরা নিখোঁজ হওয়ার পর স্থানীয় মেরিল কোম্পানির একটি সাবান কারখানায় চাকরি নিছিলাম। এ বছর রোজায় ভাতিজার হাম আর নিউমোনিয়া হলে এক মাস ঢাকায় দৌড়াইতে হইছিল। সে সময় আমার চাকরিটা চইলা গেসে।”
ক্ষোভ প্রকাশ করে সিনথিয়া শিকদার বলেন, “প্রশাসন সঠিক মতো অনুসন্ধান করতাসে না। আমরা কতবার থানা, ডিসি অফিস, এসপি অফিস গেছি তার কোনো হিসাব নাই। থানায় গেলে ওসি সাহেব কথা বলেন না। সকাল ৮টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত বসে থাকি, তবু আমাদের পাত্তা দেয় না। আমরা যেন মানুষই না। ডিসি অফিসে গেলেও দেখা করতে দেয় না, যাওয়ার সময় বলে অন্যদিন আইসেন। আমরা চাই, তারা সঠিক অনুসন্ধানটা করুক। আমাদের লোকগুলা বাইচ্চা আছে, না মইরা গেছে—কিছু তো জানাক।”
একই গ্রামের পরিবার নিয়ে ভাড়া থাকতেন নিখোঁজ মনির। সেদিন কারখানায় লুটপাটের পর আগুনের খবর শুনে সেদিকে গিয়ে নিখোঁজ হয়েছিলেন মনির। মনিরের গ্রামের বাড়ি সুনামগঞ্জ সদর উপজেলায়। ভাইয়ের নিখোঁজ হওয়ার খবর পেয়ে বাড়ি থেকে রূপগঞ্জে এসেছিলেন বড় ভাই জাকির হোসেন।
মুঠোফোনে জাকির বলেন, “ভাইরে খুঁজতে অনেকদিন রূপগঞ্জ ছিলাম। যখন দেখলাম প্রশাসন কিছু করতাসে না, তখন অনেকের সাথে আমিও পোড়া কারখানায় ঢুকে পড়ছিলাম। আমরা অনেকগুলা হাড্ডি পাইয়া তাদের দিসিলাম। কিন্তু এরপর যখন দেখছি তারা কিছুই করে না। শেষে বাপ-মা কইল, লাশ তো নাই। সবই পুইড়া গেসে, কারখানা থেইক্কা ছাই নিয়া আয়। পরে আবার গিয়া ছাই আর ছোট ভাইয়ের বউ-বাচ্চা নিয়া গ্রামে চলে আসছিলাম।” জাকির জানান, মনির ‘মারা গেছেন’ ধরে নিয়ে গত বছর তাদের গ্রামের বাড়িতে গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
উদাসীন দায়িত্বশীলরা
গাজী টায়ারসের ঘটনার অগ্রগতি জানতে চাইলে নারায়ণগঞ্জের বর্তমান জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রায়হান কবির বলেন, “এ বিষয়ে আমার তেমন কিছু জানা নেই। একটু অপেক্ষা করুন, আমি জেনে জানাচ্ছি। তবে যতটুকু জানি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিখোঁজদের শনাক্তের বিষয়ে তদন্ত করছে।”
অন্তত ৩০ মিনিট অপেক্ষার পর তদন্ত প্রতিবেদন ও বর্তমান অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে ডেকে আনেন। এ সময় তার কাছে প্রতিবেদনে উল্লেখিত সুপারিশগুলো সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “মালিকপক্ষকে ভবনটি অপসারণের কথা বলা হয়েছে। এ সময় ভবনটিতে অনুসন্ধান চালানো হবে। আমি এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির মালিকপক্ষের সঙ্গে কথা বলব এবং অনুসন্ধান এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে আলোচনা করব।”
একই বিষয়ে জানতে চাইলে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার জিমানুর রহমান মুন্সি বলেন, “এ বিষয়ে আমরা তেমন কিছু জানি না। জেনে জানাতে হবে। এ বিষয়ে আপনি অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তারেক আল মেহেদীর সঙ্গে যোগাযোগ করুন।”
যোগাযোগ করা হলে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ ও অপারেশন) তারেক আল মেহেদী জানান, “পুলিশের তদন্তে নিখোঁজ ১৮২ জনের কারোর সন্ধান পাওয়া যায়নি।” তিনি বলেন, “আমরা নিখোঁজদের ব্যবহৃত মুঠোফোন নম্বরের সর্বশেষ লোকেশন এবং নম্বরটি কোথাও সচল আছে কি না, এসব বিষয় খতিয়ে শনাক্তের কাজ করি। তদন্তকাজটি প্রায় শেষ, আমরা প্রতিবেদন জমা দেব। তবে নিখোঁজ কাউকে আমরা খুঁজে পাইনি।”
পোড়া ভবন থেকে উদ্ধার হাড়গুলোর ডিএনএ পরীক্ষা ও হস্তান্তরের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এসব ঘটনায় কেউ এসে হাড়গুলো তার স্বজনের দাবি করলে আমরা তাদের নমুনা নিয়ে হাড়ের ডিএনএ পরীক্ষা করি। কিন্তু এ ঘটনায় কেউ হাড়গুলো তাদের স্বজনের দাবি না করায় এগুলোর ডিএনএ পরীক্ষা হয়নি।”
প্রশাসন বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিখোঁজ দাবি করা স্বজনদের কাছ থেকে ডিএনএ নমুনা আহ্বান করেছিল কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, “না, আমরা কারো কাছে ডিএনএ নমুনা আহ্বান করিনি।”
এদিকে অগ্নিসংযোগের পর থেকে বন্ধ রয়েছে গাজী টায়ারসের কার্যক্রম। তদন্ত কমিটি মালিকপক্ষকে ভবন অপসারণের সুপারিশ করলেও তা করা হয়নি।
গাজী গ্রুপের মালিক গোলাম দস্তগীর গাজী কারাবন্দি থাকায় গ্রুপটির বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও এ বিষয়ে কারও সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি।

আপনার মতামত লিখুন