মৃত্যুর এক সপ্তাহ পরেও কুষ্টিয়া থেকে প্রকাশিত সবগুলো দৈনিকের প্রধান শিরোনাম এখনো সাংবাদিক দেবাশীষ দত্তকে নিয়ে। দেবাশীষ ছিলেন কুষ্টিয়ার সব শ্রেণির মানুষের কাছে একজন প্রিয় ব্যক্তি।
এদিকে বাবা দেবাশীষ দত্ত, মা আর ছোট ভাই চিকিৎসা শেষে ভারত থেকে ফিরবেন–সঙ্গে আনবেন বায়না করা জামা, চকলেট আর জুতা; এই অপেক্ষাতেই ছিল সাত বছরের মহিমা দত্ত। কুষ্টিয়ার আড়ুয়াপাড়ার ভাড়া বাসায় আত্মীয়স্বজনের ভিড়, চারপাশে কান্না। কিন্তু সেই শোকের গভীরতা বুঝে ওঠার বয়স হয়নি ছোট্ট মহিমার। ভারতের কলকাতায় আবাসিক হোটেলে আগুনে প্রাণ হারিয়েছেন মহিমার বাবা সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত, মা আফসানা শারমিন, ছোট ভাই স্বর্ণশীষ দত্ত এবং নানা আকরাম আলী। চিকিৎসার জন্য ভারতে গিয়েছিল পরিবারটি। ফেরার আগের রাতে কলকাতার মির্জা গালিব স্ট্রিটের হোটেলে ঘটে যায় এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড।
অনাথ শিশু মহিমা দত্ত জানায়, 'আমার বাবা-মা আমাকে স্কুলে নিয়ে যেত। আমার জন্য জামাকাপড়, চকলেট, কাজুবাদাম আর কসমেটিকস আনতো।' মহিমা এখন শুধু বাবা-মা নয়, হারিয়েছে স্নেহের ছোট ভাই এবং নানাকেও। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, বৃদ্ধ দাদা-দাদিই এখন তার প্রধান আশ্রয়। আত্মীয়স্বজনের স্নেহে ঘেরা থাকলেও শিশুটির সামনে দাঁড়িয়ে গেছে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ।
সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত ছিলেন ‘আজকের পত্রিকা’ ও ‘চ্যানেল নাইন’-এর কুষ্টিয়া প্রতিনিধি। একই সঙ্গে তিনি কুষ্টিয়া থেকে প্রকাশিত ‘আজকের আলো’ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন; সাংবাদিকতা করতেন ‘আজকাল’ পত্রিকার অফিসে বসে। ছোট্ট অফিসটিতেই কেটেছে দেবাশীষের কর্মজীবনের বড় একটি সময়। টেবিলে পড়ে আছে সংবাদপত্রের পুরোনো কপি, সাংবাদিকতার বই, নোটবুক ও ব্যবহৃত নানা উপকরণ। এই ঘরে বসে অসংখ্য খবরের শিরোনাম লিখেছেন তিনি। মানুষের গল্প, অন্যায়, আশা আর বেদনার খবর তুলে ধরেছেন পাঠকের সামনে। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে এবার তিনি নিজেই হয়ে গেলেন একটি মর্মান্তিক সংবাদের শিরোনাম।
নিহত দেবাশীষের কাকা নিশিথ কুমার দত্ত জানান, 'দেবাশীষের একটি সাত বছরের সন্তান আছে। সে এতিম হয়ে গেল। মর্মান্তিক ব্যাপার এটাই–সেই শিশুটি এখনো বুঝতে পারছে না যে তার বাবা-মা আর নেই। তাকে বাবা-মায়ের কথা জিজ্ঞাসা করা হলে সে উত্তর দিচ্ছে, ‘আমার বাবা-মা আমার জামাকাপড় আর চকলেট নিয়ে আসছে।' দেবাশীষের পুরো পরিবার এখন দিশেহারা।
দেবাশীষের প্রতিবেশী জানান, পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিল দেবাশীষ। তাই দেবাশীষের সঙ্গে সঙ্গে ওই বাড়িটির প্রাণও বিদায় হয়ে গেল। স্বজনদের ভাষ্য মতে, আড়ুয়াপাড়ার ভাড়া বাসায় বাবা-মাকে নিয়ে থাকতেন দেবাশীষ। তাদের নিজস্ব বাড়ি বা জমি নেই। পরিবারের সঞ্চয়ের বড় অংশ স্ত্রীর চিকিৎসায় ব্যয় হয়েছে বলেও জানিয়েছেন তারা। এখন মহিমার লালন-পালন, শিক্ষা এবং নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করাই প্রধান চ্যালেঞ্জ।
সহকর্মী ও স্বজনরা বলছেন, একজন মফস্বল সাংবাদিকের পরিবারের ওপর নেমে আসা এই বিপর্যয়ে সমাজ ও সংশ্লিষ্টদের পাশে দাঁড়ানো প্রয়োজন। নবীন সাংবাদিক কে এম রাইয়ান রহমান বলেন, 'প্রতিনিয়ত সাংবাদিকতা শিখতে দেবাশীষ কাকার অফিসে যেতাম। যে সংবাদকর্মী একদিন সংবাদের পেছনে ছুটতেন, আজ তিনিই শিরোনাম হয়ে গেছেন। আমরা চাই না কোনো মানুষের এমন মর্মান্তিক মৃত্যু হোক; আমরা স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি চাই।' রাইয়ান আরও বলেন, আগুনে নিভে গেছে একটি পরিবারের চারটি প্রাণ। রয়ে গেছে কেবল ছোট্ট মহিমা–যার কাছে বাবা-মায়ের না ফেরার খবরের চেয়েও বড় হয়ে আছে তাদের ফিরে আসার অপেক্ষা। চকলেট, জামা আর জুতা নিয়ে বাবা আর ফিরবেন না, কিন্তু মহিমার জীবন যেন অনিশ্চয়তার অন্ধকারে হারিয়ে না যায়–সেই দায় এখন পরিবার, সমাজ এবং কুষ্টিয়ার সচেতন মানুষের।

মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৫ আগস্ট ২০২৬
মৃত্যুর এক সপ্তাহ পরেও কুষ্টিয়া থেকে প্রকাশিত সবগুলো দৈনিকের প্রধান শিরোনাম এখনো সাংবাদিক দেবাশীষ দত্তকে নিয়ে। দেবাশীষ ছিলেন কুষ্টিয়ার সব শ্রেণির মানুষের কাছে একজন প্রিয় ব্যক্তি।
এদিকে বাবা দেবাশীষ দত্ত, মা আর ছোট ভাই চিকিৎসা শেষে ভারত থেকে ফিরবেন–সঙ্গে আনবেন বায়না করা জামা, চকলেট আর জুতা; এই অপেক্ষাতেই ছিল সাত বছরের মহিমা দত্ত। কুষ্টিয়ার আড়ুয়াপাড়ার ভাড়া বাসায় আত্মীয়স্বজনের ভিড়, চারপাশে কান্না। কিন্তু সেই শোকের গভীরতা বুঝে ওঠার বয়স হয়নি ছোট্ট মহিমার। ভারতের কলকাতায় আবাসিক হোটেলে আগুনে প্রাণ হারিয়েছেন মহিমার বাবা সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত, মা আফসানা শারমিন, ছোট ভাই স্বর্ণশীষ দত্ত এবং নানা আকরাম আলী। চিকিৎসার জন্য ভারতে গিয়েছিল পরিবারটি। ফেরার আগের রাতে কলকাতার মির্জা গালিব স্ট্রিটের হোটেলে ঘটে যায় এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড।
অনাথ শিশু মহিমা দত্ত জানায়, 'আমার বাবা-মা আমাকে স্কুলে নিয়ে যেত। আমার জন্য জামাকাপড়, চকলেট, কাজুবাদাম আর কসমেটিকস আনতো।' মহিমা এখন শুধু বাবা-মা নয়, হারিয়েছে স্নেহের ছোট ভাই এবং নানাকেও। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, বৃদ্ধ দাদা-দাদিই এখন তার প্রধান আশ্রয়। আত্মীয়স্বজনের স্নেহে ঘেরা থাকলেও শিশুটির সামনে দাঁড়িয়ে গেছে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ।
সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত ছিলেন ‘আজকের পত্রিকা’ ও ‘চ্যানেল নাইন’-এর কুষ্টিয়া প্রতিনিধি। একই সঙ্গে তিনি কুষ্টিয়া থেকে প্রকাশিত ‘আজকের আলো’ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন; সাংবাদিকতা করতেন ‘আজকাল’ পত্রিকার অফিসে বসে। ছোট্ট অফিসটিতেই কেটেছে দেবাশীষের কর্মজীবনের বড় একটি সময়। টেবিলে পড়ে আছে সংবাদপত্রের পুরোনো কপি, সাংবাদিকতার বই, নোটবুক ও ব্যবহৃত নানা উপকরণ। এই ঘরে বসে অসংখ্য খবরের শিরোনাম লিখেছেন তিনি। মানুষের গল্প, অন্যায়, আশা আর বেদনার খবর তুলে ধরেছেন পাঠকের সামনে। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে এবার তিনি নিজেই হয়ে গেলেন একটি মর্মান্তিক সংবাদের শিরোনাম।
নিহত দেবাশীষের কাকা নিশিথ কুমার দত্ত জানান, 'দেবাশীষের একটি সাত বছরের সন্তান আছে। সে এতিম হয়ে গেল। মর্মান্তিক ব্যাপার এটাই–সেই শিশুটি এখনো বুঝতে পারছে না যে তার বাবা-মা আর নেই। তাকে বাবা-মায়ের কথা জিজ্ঞাসা করা হলে সে উত্তর দিচ্ছে, ‘আমার বাবা-মা আমার জামাকাপড় আর চকলেট নিয়ে আসছে।' দেবাশীষের পুরো পরিবার এখন দিশেহারা।
দেবাশীষের প্রতিবেশী জানান, পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিল দেবাশীষ। তাই দেবাশীষের সঙ্গে সঙ্গে ওই বাড়িটির প্রাণও বিদায় হয়ে গেল। স্বজনদের ভাষ্য মতে, আড়ুয়াপাড়ার ভাড়া বাসায় বাবা-মাকে নিয়ে থাকতেন দেবাশীষ। তাদের নিজস্ব বাড়ি বা জমি নেই। পরিবারের সঞ্চয়ের বড় অংশ স্ত্রীর চিকিৎসায় ব্যয় হয়েছে বলেও জানিয়েছেন তারা। এখন মহিমার লালন-পালন, শিক্ষা এবং নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করাই প্রধান চ্যালেঞ্জ।
সহকর্মী ও স্বজনরা বলছেন, একজন মফস্বল সাংবাদিকের পরিবারের ওপর নেমে আসা এই বিপর্যয়ে সমাজ ও সংশ্লিষ্টদের পাশে দাঁড়ানো প্রয়োজন। নবীন সাংবাদিক কে এম রাইয়ান রহমান বলেন, 'প্রতিনিয়ত সাংবাদিকতা শিখতে দেবাশীষ কাকার অফিসে যেতাম। যে সংবাদকর্মী একদিন সংবাদের পেছনে ছুটতেন, আজ তিনিই শিরোনাম হয়ে গেছেন। আমরা চাই না কোনো মানুষের এমন মর্মান্তিক মৃত্যু হোক; আমরা স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি চাই।' রাইয়ান আরও বলেন, আগুনে নিভে গেছে একটি পরিবারের চারটি প্রাণ। রয়ে গেছে কেবল ছোট্ট মহিমা–যার কাছে বাবা-মায়ের না ফেরার খবরের চেয়েও বড় হয়ে আছে তাদের ফিরে আসার অপেক্ষা। চকলেট, জামা আর জুতা নিয়ে বাবা আর ফিরবেন না, কিন্তু মহিমার জীবন যেন অনিশ্চয়তার অন্ধকারে হারিয়ে না যায়–সেই দায় এখন পরিবার, সমাজ এবং কুষ্টিয়ার সচেতন মানুষের।

আপনার মতামত লিখুন