শ্রীমঙ্গল শুধু চায়ের রাজধানী নয়, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্যও দেশে-বিদেশে পরিচিত। পাহাড়, চা-বাগান, বন ও জলাভূমির সমন্বয় এই অঞ্চলকে দিয়েছে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। সেই সৌন্দর্যের অন্যতম বড় অংশ হাইল হাওর। বর্ষায় সাগরের মতো বিস্তৃত জলরাশি, আকাশের প্রতিবিম্ব আর অসংখ্য জলজ প্রাণীর বিচরণে হাওরটি হয়ে ওঠে এক নৈসর্গিক জনপদ। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পর্যটকেরা এখানে আসেন প্রকৃতির এই রূপ দেখতে।
তবে এই সৌন্দর্যের আড়ালে দ্রুত বদলে যাচ্ছে হাইল হাওরের চিত্র। দখল, অপরিকল্পিত পুকুর খনন, বাণিজ্যিক মাছের খামার, ছড়া ও পানিপ্রবাহের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং জমির শ্রেণি পরিবর্তনের কারণে সংকুচিত হচ্ছে হাওর। হারিয়ে যাচ্ছে বিল ও ছড়া, কমছে দেশীয় মাছের প্রজাতি, হুমকিতে পড়ছে জলপাখি ও অন্যান্য জীববৈচিত্র্য। ঝুঁকিতে পড়ছে স্থানীয় মানুষের জীবিকাও।
নদীমাতৃক বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য হাওরের মধ্যে শ্রীমঙ্গলের হাইল হাওর অন্যতম। প্রচুর লতা ও গুল্মজাতীয় উদ্ভিদের উপস্থিতির কারণে স্থানীয় মানুষের কাছে এটি ‘লতাপাতার হাওর’ নামেও পরিচিত। বর্ষায় বিস্তৃত জলরাশি আর শীতে পরিযায়ী পাখির বিচরণ হাওরটিকে করে তোলে অনন্য। এখানে প্রায় ১৬০ প্রজাতির পাখির বিচরণ লক্ষ করা যায়।
হাইল হাওর বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য। সিলেট অববাহিকার আবাসিক ও পরিযায়ী জলপাখির জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমি। গ্রীষ্মে আশপাশের অন্য জলাধার শুকিয়ে গেলে স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্যও এটি গুরুত্বপূর্ণ পানির উৎস।
অভয়ারণ্যটি মৌলভীবাজার জেলার সদর উপজেলা ও শ্রীমঙ্গল উপজেলায় অবস্থিত। দক্ষিণ, পশ্চিম ও পূর্ব দিকে পাহাড় এবং উত্তরে মনু ও কুশিয়ারা নদীর সমভূমি ঘিরে রেখেছে এই অঞ্চলকে। পাহাড়গুলো ঢাকা পড়ে আছে চা-বাগান ও প্রাকৃতিক বনভূমিতে।
বর্ষাকালে হাইল হাওরের জলাভূমি প্রায় ১৪ হাজার হেক্টরজুড়ে বিস্তৃত হয়, যা গ্রীষ্মে সংকুচিত হয়ে নেমে আসে প্রায় ৩ হাজার হেক্টরে। জলাভূমিটি যুক্ত ১৩১টি বিল ও সরু খালের সঙ্গে। আশপাশের ৬২টি গ্রামে বাস করেন প্রায় দুই লাখের বেশি মানুষ। বর্ষার পর পানি নামলে স্থানীয় কৃষকেরা জলমগ্ন জমিতে ধান চাষ করেন।
১৯৯৮ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকার ও ইউনাইটেড স্টেটস এজেন্সি ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট (ইউএসএআইডি) যৌথভাবে ‘কমিউনিটি হাজবেন্ডারির মাধ্যমে জলজ বাস্তুতন্ত্র ব্যবস্থাপনা’ শীর্ষক একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করে। শ্রীমঙ্গল শহর থেকে হাওরের দূরত্ব প্রায় ৩ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে এবং মৌলভীবাজার থেকে ১৪ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে।
হাইল হাওরের বড় সম্পদ এর জীববৈচিত্র্য। শীতে এখানে ৪০ থেকে ৫০ হাজার জলপাখির সমাগম ঘটে। কম হুইসলিং হাঁস, ফুলভাস হুইসলিং হাঁস, কটন পিগমি গুজ, গার্গানি, নর্দার্ন পিনটেল, নর্দার্ন শোভেলার, কমন টিল, কমন পোচার্ড, টাফটেড ডাক, গ্যাডওয়াল, স্পট-বিল হাঁস, বার-হেডেড গুজ, ম্যালার্ড, রেড-ক্রেস্টেড পোচার্ড, বেয়ার্স পোচার্ড, গ্রেব, লিটল করমোরান্ট, ইন্ডিয়ান পন্ড হেরন, ক্যাটল এগ্রেট, লিটল এগ্রেট, ইন্টারমিডিয়েট এগ্রেট, গ্রেট এগ্রেট, ওয়াটার কক, মুরহেন, পার্পল সোয়াম্পহেন, কমন জ্যাকানা ও ব্রোঞ্জ-উইংড জ্যাকানাসহ নানা প্রজাতির পাখি এখানে দেখা যায়। এ ছাড়া হেরন, কিংফিশার, এগ্রেট ও টার্নও রয়েছে।
শিকারি পাখির মধ্যে রয়েছে অসপ্রে, ইউরেশীয় মার্শ হ্যারিয়ার ও পাইড হ্যারিয়ার। বিপন্ন পাখির তালিকায় আছে বেয়ার্স পোচার্ড, গ্রেটার স্পটেড ঈগল ও প্যালাস’স ফিশ ঈগল। বার্ডলাইফ ইন্টারন্যাশনাল হাইল হাওরকে গুরুত্বপূর্ণ পাখি এলাকা (আইবিএ) হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
শুধু পাখি নয়, উভচর, সরীসৃপ, কচ্ছপ ও বিপুলসংখ্যক মাছেরও আবাসস্থল এই জলাভূমি। কাতলা, রুই, কালীবাউশ, মৃগেল, বোয়াল, টেংরা, পাবদাসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ও স্বাদুপানির চিংড়ি এখানে পাওয়া যায়।
সরকারি হিসাবে হাইল হাওরের আয়তন ১৪ হাজার হেক্টর, যার মধ্যে শ্রীমঙ্গল উপজেলায় পড়েছে ১০ হাজার হেক্টর। এই অংশে বিল আছে ৫৯টি, যার মধ্যে ৩৯টি ২০ একরের কম এবং ২০টি ২০ একরের বেশি আয়তনের। অবশিষ্ট ৪ হাজার হেক্টর মৌলভীবাজার সদর উপজেলায়, যেখানে বিল আছে ৫৫টি; এর মধ্যে ১০ থেকে ১২টি বিলের এখন আর অস্তিত্ব নেই বলে জানা গেছে।
তবে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)-এর কর্মীদের দাবি, হাইল হাওরের প্রকৃত আয়তন এখন ৭ হাজার হেক্টরেরও কম - অর্থাৎ সরকারি হিসাবের অর্ধেকের বেশি জায়গা নিয়েই এখন প্রশ্ন উঠছে।
একসময় হাইল হাওরে প্রায় শতাধিক প্রজাতির দেশীয় মাছ পাওয়া যেত। স্থানীয় সূত্রমতে, বর্তমানে প্রায় ৩০ প্রজাতির মাছ বিলুপ্ত হয়ে গেছে।
হাওরে মিশেছে অর্ধশতাধিক ছড়া, যেগুলো গিয়ে পড়েছে গোফলা নদীতে। এর অনেকগুলো দখলের শিকার হওয়ায় বদলে যাচ্ছে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ, যার প্রভাব পড়ছে জীববৈচিত্র্য ও বোরো চাষে।
স্থানীয়দের ভাষ্যে, একসময় হাইল হাওরে ৩৫২টি ছড়া ছিল। ভূমি দখল ও মাছের খামারের জন্য ভরাটের কারণে এর প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই এখন হারিয়ে গেছে। ১৩১টি বিলের মধ্যে অর্ধেকের বেশি প্রায় বিলীন এবং ৩০টি বিলের কোনো হদিস নেই বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
হাইল হাওরের সংকটের অন্যতম বড় কারণ বাণিজ্যিক মাছ চাষ। তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালে হাওরে বাণিজ্যিক মাছ চাষের পুকুরের আয়তন ছিল ৮৬৩ হেক্টর, যা বর্তমানে বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ হাজার ৩০০ হেক্টরে। স্থানীয়দের দাবি, প্রকৃত আয়তন প্রায় ৩ হাজার হেক্টর হবে।
১৯৮০ সালের পর হাইল হাওরে বাণিজ্যিক মাছের খামার গড়ে উঠতে শুরু করে, ২০০০ সালের পর যার ব্যাপকতা আরও বাড়ে। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি নিয়মনীতি উপেক্ষা করে একটি প্রভাবশালী মহল খাসজমি কিংবা ভূমিহীনদের নামে বন্দোবস্ত দেওয়া জমি কৌশলে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে একের পর এক মৎস্য প্রকল্প গড়ে তুলছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, হাওরের অনেক সরকারি বিল এখন ব্যক্তিগত মৎস্য খামারে পরিণত হয়েছে। ভূমি দখলের কারণে ইতিমধ্যে কয়েকটি বিল পুরোপুরি বিলীন হয়ে গেছে। কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি ভূমিহীনদের নামে লিজ নেওয়া জমি অল্প দামে কিনে নিয়ে পরে ক্ষমতার প্রভাবে অবশিষ্ট খাসজমিও দখলে নিচ্ছেন বলে অভিযোগ। অতীতে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে জমির শ্রেণি পরিবর্তনেরও অভিযোগ রয়েছে।
হাওরের যে অংশ থেকে কৃষকেরা আগে গবাদিপশুর খাদ্য সংগ্রহ করতেন, তা এখন আর আগের মতো মেলে না। ভূমিহীনদের নামে দেওয়া খাসজমিতেও তাঁদের প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ নেই বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের পৃষ্ঠপোষকতায় দিনের পর দিন হাইল হাওরের জমি দখল হচ্ছে, যা হুমকিতে ফেলছে হাওর, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যকে। কৃত্রিম বাঁধ ও রাস্তা তৈরি করে জলাশয়কে ছোট ছোট মাছ ধরার ব্লকে রূপান্তরের ফলে কমছে মাছ ও জলপাখির সংখ্যা। চাষাবাদ, গবাদিপশুর চারণ, জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ ও সড়ক-নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে উদ্ভিদ বৈচিত্র্য ও প্রাণীর আবাসস্থল।
হাওরপারের বিশাল জনগোষ্ঠীর অধিকাংশ জীবিকার জন্য মাছ ধরা ও চাষাবাদের ওপর নির্ভরশীল বলে এই সংকট শুধু প্রকৃতির নয়, মানুষের জীবিকারও সংকট।
স্থানীয়দের ভাষ্যে, একসময় হাইল হাওর ছিল অনেক গভীর, আর এই পথ দিয়ে চলাচল করত জাহাজ। শ্রীমঙ্গল শহরতলির উত্তর ভাড়াউড়ায় হাওরমুখী একটি জেটি ছিল, যে স্থানটি এখনো ‘জেটি রোড’ নামে পরিচিত। সেই নৌপথের স্মৃতি আর হাওরের বর্তমান চিত্রের মধ্যে তৈরি হয়েছে বড় ব্যবধান।
অভিজ্ঞ মহলের মতে, জনস্বার্থে হাওর ও উন্মুক্ত জলাশয় রক্ষা করা জরুরি। জলাভূমি দখল করে ফিশারি গড়ে তোলা প্রভাবশালীদের কঠোরভাবে দমন এবং জমির শ্রেণি পরিবর্তন সম্পূর্ণ বন্ধ করার দাবি উঠেছে। বিলগুলো খনন করে এবং প্রতিটি পাহাড়ি ছড়ার নিচের অংশ পরিষ্কার করে গোফলা নদী পর্যন্ত পানি চলাচলের পথ খুলে দেওয়া গেলে হাওরের স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরে আসতে পারে বলে মত বিশেষজ্ঞদের।
এর আগে বিভিন্ন গণমাধ্যমে হাইল হাওর দখলের খবর প্রকাশিত হয়েছে এবং প্রশাসনের কর্মকর্তারা অভিযান চালিয়ে দখলমুক্ত করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন। তবে বাস্তবতা হলো, হাওরটি এখনো পুরোপুরি দখলমুক্ত হয়নি।
চায়ের রাজধানী ও পর্যটন নগরী হিসেবে পরিচিত শ্রীমঙ্গলের অন্যতম আকর্ষণ হাইল হাওর। প্রতিদিন দেশ-বিদেশের শত শত পর্যটক এখানে আসেন। হাওরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সংরক্ষণ, বিল-ছড়া পুনঃখনন, পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক রাখা ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার সঙ্গে পর্যটন অবকাঠামোর সমন্বিত উন্নয়ন হলে এ অঞ্চলে খুলতে পারে নতুন সম্ভাবনার দ্বার। তবে সেই সম্ভাবনা বাস্তবায়নের আগে প্রয়োজন হাওরকে রক্ষা করা।
১৪ হাজার হেক্টরের সরকারি হিসাব আর ৭ হাজার হেক্টরের নিচে নেমে আসার আশঙ্কা - এই ব্যবধানই বলে দিচ্ছে সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। বিল হারাচ্ছে, ছড়া হারাচ্ছে, দেশীয় মাছ হারাচ্ছে, বদলে যাচ্ছে পানির প্রবাহ; একই সঙ্গে সংকুচিত হচ্ছে মানুষের জীবিকার ভিত্তিও।
হাইল হাওরকে বাঁচাতে হলে এখনই দখলমুক্তকরণ, অবৈধ পুকুর খনন বন্ধ, জমির শ্রেণি পরিবর্তন রোধ, বিল-ছড়া পুনঃখনন এবং পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ফেরানোর কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। প্রকৃতি, জীববৈচিত্র্য ও মানুষের জীবিকা - তিনটিকেই সমান গুরুত্ব দিয়ে হাইল হাওর সংরক্ষণ করা এখন সময়ের দাবি।

মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৫ আগস্ট ২০২৬
শ্রীমঙ্গল শুধু চায়ের রাজধানী নয়, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্যও দেশে-বিদেশে পরিচিত। পাহাড়, চা-বাগান, বন ও জলাভূমির সমন্বয় এই অঞ্চলকে দিয়েছে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। সেই সৌন্দর্যের অন্যতম বড় অংশ হাইল হাওর। বর্ষায় সাগরের মতো বিস্তৃত জলরাশি, আকাশের প্রতিবিম্ব আর অসংখ্য জলজ প্রাণীর বিচরণে হাওরটি হয়ে ওঠে এক নৈসর্গিক জনপদ। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পর্যটকেরা এখানে আসেন প্রকৃতির এই রূপ দেখতে।
তবে এই সৌন্দর্যের আড়ালে দ্রুত বদলে যাচ্ছে হাইল হাওরের চিত্র। দখল, অপরিকল্পিত পুকুর খনন, বাণিজ্যিক মাছের খামার, ছড়া ও পানিপ্রবাহের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং জমির শ্রেণি পরিবর্তনের কারণে সংকুচিত হচ্ছে হাওর। হারিয়ে যাচ্ছে বিল ও ছড়া, কমছে দেশীয় মাছের প্রজাতি, হুমকিতে পড়ছে জলপাখি ও অন্যান্য জীববৈচিত্র্য। ঝুঁকিতে পড়ছে স্থানীয় মানুষের জীবিকাও।
নদীমাতৃক বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য হাওরের মধ্যে শ্রীমঙ্গলের হাইল হাওর অন্যতম। প্রচুর লতা ও গুল্মজাতীয় উদ্ভিদের উপস্থিতির কারণে স্থানীয় মানুষের কাছে এটি ‘লতাপাতার হাওর’ নামেও পরিচিত। বর্ষায় বিস্তৃত জলরাশি আর শীতে পরিযায়ী পাখির বিচরণ হাওরটিকে করে তোলে অনন্য। এখানে প্রায় ১৬০ প্রজাতির পাখির বিচরণ লক্ষ করা যায়।
হাইল হাওর বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য। সিলেট অববাহিকার আবাসিক ও পরিযায়ী জলপাখির জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমি। গ্রীষ্মে আশপাশের অন্য জলাধার শুকিয়ে গেলে স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্যও এটি গুরুত্বপূর্ণ পানির উৎস।
অভয়ারণ্যটি মৌলভীবাজার জেলার সদর উপজেলা ও শ্রীমঙ্গল উপজেলায় অবস্থিত। দক্ষিণ, পশ্চিম ও পূর্ব দিকে পাহাড় এবং উত্তরে মনু ও কুশিয়ারা নদীর সমভূমি ঘিরে রেখেছে এই অঞ্চলকে। পাহাড়গুলো ঢাকা পড়ে আছে চা-বাগান ও প্রাকৃতিক বনভূমিতে।
বর্ষাকালে হাইল হাওরের জলাভূমি প্রায় ১৪ হাজার হেক্টরজুড়ে বিস্তৃত হয়, যা গ্রীষ্মে সংকুচিত হয়ে নেমে আসে প্রায় ৩ হাজার হেক্টরে। জলাভূমিটি যুক্ত ১৩১টি বিল ও সরু খালের সঙ্গে। আশপাশের ৬২টি গ্রামে বাস করেন প্রায় দুই লাখের বেশি মানুষ। বর্ষার পর পানি নামলে স্থানীয় কৃষকেরা জলমগ্ন জমিতে ধান চাষ করেন।
১৯৯৮ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকার ও ইউনাইটেড স্টেটস এজেন্সি ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট (ইউএসএআইডি) যৌথভাবে ‘কমিউনিটি হাজবেন্ডারির মাধ্যমে জলজ বাস্তুতন্ত্র ব্যবস্থাপনা’ শীর্ষক একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করে। শ্রীমঙ্গল শহর থেকে হাওরের দূরত্ব প্রায় ৩ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে এবং মৌলভীবাজার থেকে ১৪ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে।
হাইল হাওরের বড় সম্পদ এর জীববৈচিত্র্য। শীতে এখানে ৪০ থেকে ৫০ হাজার জলপাখির সমাগম ঘটে। কম হুইসলিং হাঁস, ফুলভাস হুইসলিং হাঁস, কটন পিগমি গুজ, গার্গানি, নর্দার্ন পিনটেল, নর্দার্ন শোভেলার, কমন টিল, কমন পোচার্ড, টাফটেড ডাক, গ্যাডওয়াল, স্পট-বিল হাঁস, বার-হেডেড গুজ, ম্যালার্ড, রেড-ক্রেস্টেড পোচার্ড, বেয়ার্স পোচার্ড, গ্রেব, লিটল করমোরান্ট, ইন্ডিয়ান পন্ড হেরন, ক্যাটল এগ্রেট, লিটল এগ্রেট, ইন্টারমিডিয়েট এগ্রেট, গ্রেট এগ্রেট, ওয়াটার কক, মুরহেন, পার্পল সোয়াম্পহেন, কমন জ্যাকানা ও ব্রোঞ্জ-উইংড জ্যাকানাসহ নানা প্রজাতির পাখি এখানে দেখা যায়। এ ছাড়া হেরন, কিংফিশার, এগ্রেট ও টার্নও রয়েছে।
শিকারি পাখির মধ্যে রয়েছে অসপ্রে, ইউরেশীয় মার্শ হ্যারিয়ার ও পাইড হ্যারিয়ার। বিপন্ন পাখির তালিকায় আছে বেয়ার্স পোচার্ড, গ্রেটার স্পটেড ঈগল ও প্যালাস’স ফিশ ঈগল। বার্ডলাইফ ইন্টারন্যাশনাল হাইল হাওরকে গুরুত্বপূর্ণ পাখি এলাকা (আইবিএ) হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
শুধু পাখি নয়, উভচর, সরীসৃপ, কচ্ছপ ও বিপুলসংখ্যক মাছেরও আবাসস্থল এই জলাভূমি। কাতলা, রুই, কালীবাউশ, মৃগেল, বোয়াল, টেংরা, পাবদাসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ও স্বাদুপানির চিংড়ি এখানে পাওয়া যায়।
সরকারি হিসাবে হাইল হাওরের আয়তন ১৪ হাজার হেক্টর, যার মধ্যে শ্রীমঙ্গল উপজেলায় পড়েছে ১০ হাজার হেক্টর। এই অংশে বিল আছে ৫৯টি, যার মধ্যে ৩৯টি ২০ একরের কম এবং ২০টি ২০ একরের বেশি আয়তনের। অবশিষ্ট ৪ হাজার হেক্টর মৌলভীবাজার সদর উপজেলায়, যেখানে বিল আছে ৫৫টি; এর মধ্যে ১০ থেকে ১২টি বিলের এখন আর অস্তিত্ব নেই বলে জানা গেছে।
তবে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)-এর কর্মীদের দাবি, হাইল হাওরের প্রকৃত আয়তন এখন ৭ হাজার হেক্টরেরও কম - অর্থাৎ সরকারি হিসাবের অর্ধেকের বেশি জায়গা নিয়েই এখন প্রশ্ন উঠছে।
একসময় হাইল হাওরে প্রায় শতাধিক প্রজাতির দেশীয় মাছ পাওয়া যেত। স্থানীয় সূত্রমতে, বর্তমানে প্রায় ৩০ প্রজাতির মাছ বিলুপ্ত হয়ে গেছে।
হাওরে মিশেছে অর্ধশতাধিক ছড়া, যেগুলো গিয়ে পড়েছে গোফলা নদীতে। এর অনেকগুলো দখলের শিকার হওয়ায় বদলে যাচ্ছে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ, যার প্রভাব পড়ছে জীববৈচিত্র্য ও বোরো চাষে।
স্থানীয়দের ভাষ্যে, একসময় হাইল হাওরে ৩৫২টি ছড়া ছিল। ভূমি দখল ও মাছের খামারের জন্য ভরাটের কারণে এর প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই এখন হারিয়ে গেছে। ১৩১টি বিলের মধ্যে অর্ধেকের বেশি প্রায় বিলীন এবং ৩০টি বিলের কোনো হদিস নেই বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
হাইল হাওরের সংকটের অন্যতম বড় কারণ বাণিজ্যিক মাছ চাষ। তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালে হাওরে বাণিজ্যিক মাছ চাষের পুকুরের আয়তন ছিল ৮৬৩ হেক্টর, যা বর্তমানে বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ হাজার ৩০০ হেক্টরে। স্থানীয়দের দাবি, প্রকৃত আয়তন প্রায় ৩ হাজার হেক্টর হবে।
১৯৮০ সালের পর হাইল হাওরে বাণিজ্যিক মাছের খামার গড়ে উঠতে শুরু করে, ২০০০ সালের পর যার ব্যাপকতা আরও বাড়ে। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি নিয়মনীতি উপেক্ষা করে একটি প্রভাবশালী মহল খাসজমি কিংবা ভূমিহীনদের নামে বন্দোবস্ত দেওয়া জমি কৌশলে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে একের পর এক মৎস্য প্রকল্প গড়ে তুলছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, হাওরের অনেক সরকারি বিল এখন ব্যক্তিগত মৎস্য খামারে পরিণত হয়েছে। ভূমি দখলের কারণে ইতিমধ্যে কয়েকটি বিল পুরোপুরি বিলীন হয়ে গেছে। কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি ভূমিহীনদের নামে লিজ নেওয়া জমি অল্প দামে কিনে নিয়ে পরে ক্ষমতার প্রভাবে অবশিষ্ট খাসজমিও দখলে নিচ্ছেন বলে অভিযোগ। অতীতে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে জমির শ্রেণি পরিবর্তনেরও অভিযোগ রয়েছে।
হাওরের যে অংশ থেকে কৃষকেরা আগে গবাদিপশুর খাদ্য সংগ্রহ করতেন, তা এখন আর আগের মতো মেলে না। ভূমিহীনদের নামে দেওয়া খাসজমিতেও তাঁদের প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ নেই বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের পৃষ্ঠপোষকতায় দিনের পর দিন হাইল হাওরের জমি দখল হচ্ছে, যা হুমকিতে ফেলছে হাওর, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যকে। কৃত্রিম বাঁধ ও রাস্তা তৈরি করে জলাশয়কে ছোট ছোট মাছ ধরার ব্লকে রূপান্তরের ফলে কমছে মাছ ও জলপাখির সংখ্যা। চাষাবাদ, গবাদিপশুর চারণ, জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ ও সড়ক-নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে উদ্ভিদ বৈচিত্র্য ও প্রাণীর আবাসস্থল।
হাওরপারের বিশাল জনগোষ্ঠীর অধিকাংশ জীবিকার জন্য মাছ ধরা ও চাষাবাদের ওপর নির্ভরশীল বলে এই সংকট শুধু প্রকৃতির নয়, মানুষের জীবিকারও সংকট।
স্থানীয়দের ভাষ্যে, একসময় হাইল হাওর ছিল অনেক গভীর, আর এই পথ দিয়ে চলাচল করত জাহাজ। শ্রীমঙ্গল শহরতলির উত্তর ভাড়াউড়ায় হাওরমুখী একটি জেটি ছিল, যে স্থানটি এখনো ‘জেটি রোড’ নামে পরিচিত। সেই নৌপথের স্মৃতি আর হাওরের বর্তমান চিত্রের মধ্যে তৈরি হয়েছে বড় ব্যবধান।
অভিজ্ঞ মহলের মতে, জনস্বার্থে হাওর ও উন্মুক্ত জলাশয় রক্ষা করা জরুরি। জলাভূমি দখল করে ফিশারি গড়ে তোলা প্রভাবশালীদের কঠোরভাবে দমন এবং জমির শ্রেণি পরিবর্তন সম্পূর্ণ বন্ধ করার দাবি উঠেছে। বিলগুলো খনন করে এবং প্রতিটি পাহাড়ি ছড়ার নিচের অংশ পরিষ্কার করে গোফলা নদী পর্যন্ত পানি চলাচলের পথ খুলে দেওয়া গেলে হাওরের স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরে আসতে পারে বলে মত বিশেষজ্ঞদের।
এর আগে বিভিন্ন গণমাধ্যমে হাইল হাওর দখলের খবর প্রকাশিত হয়েছে এবং প্রশাসনের কর্মকর্তারা অভিযান চালিয়ে দখলমুক্ত করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন। তবে বাস্তবতা হলো, হাওরটি এখনো পুরোপুরি দখলমুক্ত হয়নি।
চায়ের রাজধানী ও পর্যটন নগরী হিসেবে পরিচিত শ্রীমঙ্গলের অন্যতম আকর্ষণ হাইল হাওর। প্রতিদিন দেশ-বিদেশের শত শত পর্যটক এখানে আসেন। হাওরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সংরক্ষণ, বিল-ছড়া পুনঃখনন, পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক রাখা ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার সঙ্গে পর্যটন অবকাঠামোর সমন্বিত উন্নয়ন হলে এ অঞ্চলে খুলতে পারে নতুন সম্ভাবনার দ্বার। তবে সেই সম্ভাবনা বাস্তবায়নের আগে প্রয়োজন হাওরকে রক্ষা করা।
১৪ হাজার হেক্টরের সরকারি হিসাব আর ৭ হাজার হেক্টরের নিচে নেমে আসার আশঙ্কা - এই ব্যবধানই বলে দিচ্ছে সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। বিল হারাচ্ছে, ছড়া হারাচ্ছে, দেশীয় মাছ হারাচ্ছে, বদলে যাচ্ছে পানির প্রবাহ; একই সঙ্গে সংকুচিত হচ্ছে মানুষের জীবিকার ভিত্তিও।
হাইল হাওরকে বাঁচাতে হলে এখনই দখলমুক্তকরণ, অবৈধ পুকুর খনন বন্ধ, জমির শ্রেণি পরিবর্তন রোধ, বিল-ছড়া পুনঃখনন এবং পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ফেরানোর কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। প্রকৃতি, জীববৈচিত্র্য ও মানুষের জীবিকা - তিনটিকেই সমান গুরুত্ব দিয়ে হাইল হাওর সংরক্ষণ করা এখন সময়ের দাবি।

আপনার মতামত লিখুন