গুমের শিকার ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা এবং গুমের সংস্কৃতির চিরতরে অবসানের কথা ব্যক্ত করেছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস ২০২৬ উপলক্ষে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে এক বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। রোববার (৩০ আগস্ট) এই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে স্বাগত ও দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য রাখতে গিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, আজ এমন এক দিন, যা আমাদের বুকফাটা হাহাকার আর তীব্র বেদনার অতল গহ্বরে নিয়ে যায়। বক্তব্যের শুরুতে আমি তীব্র কষ্ট-বেদনা নিয়ে এবং গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে জোরপূর্বক গুমের শিকার সকল মানুষকে। স্মরণ করছি, সেইসব মা-বাবা, ভাই-বোনদের যাঁরা দিনের পর দিন, বছরের পর বছর অপেক্ষা করছেন, এই বুঝি তাঁদের সন্তান, স্বজন ফিরে এলো।
তিনি আরও বলেন, স্মরণ করছি সেই স্ত্রীকে, যিনি প্রিয় স্বামীকে হারিয়ে একা জীবনের কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করে চলেছেন। স্মরণ করছি, সেই সন্তানকে, যার শৈশব পেরিয়ে গেছে বাবার ফিরে আসার অপেক্ষায়, কিন্তু বাবা তাকে কোলে তুলে নিতে আর ফিরে আসেননি। গুমের নির্মম শিকার সকল ব্যক্তি, পরিবার, স্বজন ও সহযোদ্ধার প্রতি জানাই আমার গভীর সমবেদনা ও আন্তরিক সহমর্মিতা। গুম-খুনের শিকার সকল মানুষের পবিত্র স্মৃতির প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা। আমি তাদের রূহের চিরশান্তি ও মাগফিরাত কামনা করি।"
গুমকে মানবতাবিরোধী অপরাধ উল্লেখ করে তিনি সাংবিধানিক অধিকার ভুলুণ্ঠিত হওয়ার বিষয়ে তুলে ধরেন। রাষ্ট্রপতি বলেন, "উপস্থিত সুধীবৃন্দ, গুম কোনো সাধারণ অপরাধ নয়। এটি মানবতাবিরোধী অপরাধ। গুম শুধু একটা মানুষকে কেড়ে নেয় না। কেড়ে নেয় প্রিয়জনদের হাসি, শান্তি, স্বপ্ন, অর্থনৈতিক-সামাজিক স্বস্তি। এ এক জঘন্য মানবাধিকার লঙ্ঘন। আমাদের সংবিধান প্রত্যেক নাগরিকের জীবন, ব্যক্তিস্বাধীনতা, আইনের সুরক্ষা ও মানবিক মর্যাদার নিশ্চয়তা দিয়েছে। গুম-খুনের মাধ্যমে কার্যত সেই অধিকারগুলোর সবকটিকেই একসঙ্গে ভুলুণ্ঠিত করা হয়।"
অতীতের শাসনের ভয়াবহ চিত্র এবং গুমের শিকার ব্যক্তিদের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, বিগত দেড় দশকে ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে এই গুম, গোপন বন্দিশালা ‘আয়নাঘর’ এর দুঃসহ থাবা বাংলাদেশের বুকে চেপে বসেছিল। যারাই অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছেন, ভিন্নমত প্রকাশ করেছেন, গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের জন্য যখনই আন্দোলন করেছেন, তখনই তাদের স্তব্ধ করে দেওয়ার জন্য তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, গুম করা হয়েছে, গোপনে খুন করা হয়েছে। অথচ ফ্যাসিস্টের আজ্ঞাবহ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো এই গুরুতর অপরাধকে সর্বদা অস্বীকার করে গেছে।
তিনি আরও বলেন, আমরা ভুলে যাইনি বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ নেতা ইলিয়াস আলী, ওয়ার্ড কমিশনার চৌধুরী আলম, একটি ওয়ার্ডের সাধারণ সম্পাদক সাজেদুল ইসলাম সুমনসহ অগণিত মানুষকে। যাদের পরিবারের প্রতিটি রাত কাটছে বুকভরা বেদনা, অনিশ্চয়তা ও প্রতীক্ষা নিয়ে। আইনজীবী ব্যারিস্টার আরমান, অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল আজমীসহ অসংখ্য ভিন্ন মতাবলম্বী, কর্মকর্তা, লেখক, সাংবাদিক, সমাজকর্মী, এমনকি গৃহবধূ ও সাধারণ নাগরিককে বছরের পর বছর অন্ধকার, স্যাঁতসেঁতে, আলো-বাতাসহীন আয়নাঘরে আটকে রাখা হয়েছিল। সেখানে প্রতিটি মুহূর্ত ছিল মৃত্যুর চেয়েও ভয়াবহ।
তিনি বলেন, মঞ্চে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকেও গুম করে ভিনদেশে ফেলে আসা হয়েছিল। তাদের মধ্যে কেউ কেউ সৌভাগ্যক্রমে আমাদের মাঝে ফিরে এসেছেন। এ দেশে আজও এমন বহু মানুষ আছেন, যারা আজ পর্যন্ত আর ফিরে আসেননি। যে গণতন্ত্র, সাম্য, বাকস্বাধীনতা, মানবিক মর্যাদা ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের জন্য ১৯৭১ সালে আমাদের বীর মুক্তিযোদ্ধারা বুকের তাজা রক্ত দিয়ে দেশটাকে স্বাধীন করেছিলেন, সেই স্বাধীন দেশে গুম-খুনের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে চূড়ান্ত অন্যায় আর ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা হয়েছিল।
এর মাধ্যমে একটা ভয়ানক ও ভীতিকর পরিবেশ তৈরি করা হয়েছিল। আমাদের জাতীয় ইতিহাসের এ এক অত্যন্ত বেদনাদায়ক, অপমানজনক অধ্যায় বলেও মন্তব্য করেন রাষ্ট্রপতি।
স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন ও গণতান্ত্রিক সংগ্রামের প্রসঙ্গ টেনে তিনি উল্লেখ করেন, নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে সেই ফ্যাসিবাদ বংশ দেশ থেকে পালাতে বাধ্য হয়েছে। এখন প্রতিশোধ নয়, প্রতিকারের ব্যবস্থা নিতে হবে, প্রকৃত অপরাধীদের আইনানুগ শাস্তির আওতায় আনতে হবে।
গুম সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের তথ্যাবলি প্রকাশ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, "আজকে এখানে গুম সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের সদস্যরা উপস্থিত আছেন। কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে যে সত্য বেরিয়ে এসেছে, তা শুধু বেদনাদায়কই নয়, অত্যন্ত লজ্জাজনক ও ভয়াবহ। কমিশন ১,৫৬৯টি ঘটনাকে সুনির্দিষ্টভাবে গুম হিসেবে চিহ্নিত করেছে, যার মধ্যে ২৮৭ জন নিখোঁজ ও মৃত। এই প্রতিবেদনে নির্বাচনের আগে গুমের ঘটনা বেড়ে যাওয়া, বেছে বেছে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের নেতাকর্মীদের জোরপূর্বক গুম ও গোপনে খুন করার যে চিত্র ফুটে উঠেছে তা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে রাষ্ট্রক্ষমতাকে কুক্ষিগত করে রাখতেই দলীয় ও ব্যক্তি স্বার্থে এই বর্বর, পৈশাচিক ও ঘৃণ্য কাজগুলো বেশি করা হয়েছে।"
আইনগত পদক্ষেপ ও আন্তর্জাতিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার বিষয় তুলে ধরে তিনি যোগ করেন, "কমিশনের প্রতিবেদন আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করেছে, কিন্তু পথ এখনো অনেক দীর্ঘ। এবারের আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবসের প্রতিপাদ্য: 'Victims first, Action now'। গুমের শিকার ব্যক্তি ও পরিবারকে রক্ষা এবং গুমকে চিরতরে নিষিদ্ধ করতে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬' জাতীয় সংসদে উত্থাপিত হয়েছে। বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ সনদে স্বাক্ষর করেছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে গুম ও গণহত্যার বিচারের কাজ স্বচ্ছ ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রেখে এগিয়ে চলছে।"
ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর প্রতি রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা পুনর্ব্যক্ত করে তিনি বলেন, "প্রিয় স্বজনহারা ও প্রিয়জনের অপেক্ষায় থাকা পরিবার, আমি বিশ্বাস করি, শুধু অপরাধীদের শাস্তি দিলেই রাষ্ট্রের দায়িত্ব শেষ হবে না। যেসব পরিবার বছরের পর বছর প্রিয়জনের অপেক্ষায় সীমাহীন অনিশ্চয়তা, আর্থিক সংকট ও মানসিক যন্ত্রণা বহন করেছে, তাদের মর্যাদা, সামাজিক নিরাপত্তা, চিকিৎসা, শিক্ষা, জীবিকা ও পুনর্বাসনের দায়িত্বও রাষ্ট্রকে গ্রহণ করতে হবে।"
ভবিষ্যতের গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের রূপরেখা তুলে ধরে তিনি মন্তব্য করেন, "আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবে, কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থাকবে না। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে, কিন্তু ভয়ের সংস্কৃতি থাকবে না। আইনশৃঙ্খলা থাকবে, কিন্তু আইনের নামে মানবাধিকার ও সুবিচার লঙ্ঘনের সুযোগ থাকবে না। রাষ্ট্রের ক্ষমতা থাকবে, কিন্তু সেই ক্ষমতার ওপর থাকবে সংবিধান ও আইনের নিয়ন্ত্রণ। আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি দেশের উন্নয়ন ও সাফল্য শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। বরং একটি রাষ্ট্র কতটা গণতান্ত্রিক ও কল্যাণমুখী, কতটা ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক এবং তার নাগরিক কতটা নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন করে—সেটি একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত উন্নয়ন ও সাফল্যের চিত্র তুলে ধরে। আর এমন একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ে তুলতেই আমরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।"
পরিশেষে বিচার সুনিশ্চিত করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে রাষ্ট্রপতি তাঁর ভাষণ শেষ করেন, "স্পষ্ট ভাষায় বলতে চাই, এই স্বাধীন বাংলাদেশে আর কোনো 'আয়নাঘর' থাকবে না। আর কোনো মাকে সন্তানের জন্য, কোনো স্ত্রীকে স্বামীর জন্য চোখের পানি ফেলতে হবে না। প্রতিটি গুমের ঘটনার সাথে জড়িত অপরাধীদের, তা সে যতো বড় ক্ষমতাবানই হোক না কেন, বিচারের মুখোমুখি করা হবে। আইনের সর্বোচ্চ শাস্তি তাদের পেতেই হবে। এই দেশে ফ্যাসিবাদ ফিরে আসার সকল পথ চিরতরে বন্ধ করা হবে। রাষ্ট্রের আরেকটা পবিত্র দায়িত্ব, গুমের শিকার পরিবারগুলোর পাশে আন্তরিকভাবে দাঁড়ানো। আমি বিশ্বাস করি, সরকার এ বিষয়ে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।"

রোববার, ৩০ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ৩০ আগস্ট ২০২৬
গুমের শিকার ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা এবং গুমের সংস্কৃতির চিরতরে অবসানের কথা ব্যক্ত করেছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস ২০২৬ উপলক্ষে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে এক বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। রোববার (৩০ আগস্ট) এই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে স্বাগত ও দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য রাখতে গিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, আজ এমন এক দিন, যা আমাদের বুকফাটা হাহাকার আর তীব্র বেদনার অতল গহ্বরে নিয়ে যায়। বক্তব্যের শুরুতে আমি তীব্র কষ্ট-বেদনা নিয়ে এবং গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে জোরপূর্বক গুমের শিকার সকল মানুষকে। স্মরণ করছি, সেইসব মা-বাবা, ভাই-বোনদের যাঁরা দিনের পর দিন, বছরের পর বছর অপেক্ষা করছেন, এই বুঝি তাঁদের সন্তান, স্বজন ফিরে এলো।
তিনি আরও বলেন, স্মরণ করছি সেই স্ত্রীকে, যিনি প্রিয় স্বামীকে হারিয়ে একা জীবনের কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করে চলেছেন। স্মরণ করছি, সেই সন্তানকে, যার শৈশব পেরিয়ে গেছে বাবার ফিরে আসার অপেক্ষায়, কিন্তু বাবা তাকে কোলে তুলে নিতে আর ফিরে আসেননি। গুমের নির্মম শিকার সকল ব্যক্তি, পরিবার, স্বজন ও সহযোদ্ধার প্রতি জানাই আমার গভীর সমবেদনা ও আন্তরিক সহমর্মিতা। গুম-খুনের শিকার সকল মানুষের পবিত্র স্মৃতির প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা। আমি তাদের রূহের চিরশান্তি ও মাগফিরাত কামনা করি।"
গুমকে মানবতাবিরোধী অপরাধ উল্লেখ করে তিনি সাংবিধানিক অধিকার ভুলুণ্ঠিত হওয়ার বিষয়ে তুলে ধরেন। রাষ্ট্রপতি বলেন, "উপস্থিত সুধীবৃন্দ, গুম কোনো সাধারণ অপরাধ নয়। এটি মানবতাবিরোধী অপরাধ। গুম শুধু একটা মানুষকে কেড়ে নেয় না। কেড়ে নেয় প্রিয়জনদের হাসি, শান্তি, স্বপ্ন, অর্থনৈতিক-সামাজিক স্বস্তি। এ এক জঘন্য মানবাধিকার লঙ্ঘন। আমাদের সংবিধান প্রত্যেক নাগরিকের জীবন, ব্যক্তিস্বাধীনতা, আইনের সুরক্ষা ও মানবিক মর্যাদার নিশ্চয়তা দিয়েছে। গুম-খুনের মাধ্যমে কার্যত সেই অধিকারগুলোর সবকটিকেই একসঙ্গে ভুলুণ্ঠিত করা হয়।"
অতীতের শাসনের ভয়াবহ চিত্র এবং গুমের শিকার ব্যক্তিদের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, বিগত দেড় দশকে ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে এই গুম, গোপন বন্দিশালা ‘আয়নাঘর’ এর দুঃসহ থাবা বাংলাদেশের বুকে চেপে বসেছিল। যারাই অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছেন, ভিন্নমত প্রকাশ করেছেন, গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের জন্য যখনই আন্দোলন করেছেন, তখনই তাদের স্তব্ধ করে দেওয়ার জন্য তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, গুম করা হয়েছে, গোপনে খুন করা হয়েছে। অথচ ফ্যাসিস্টের আজ্ঞাবহ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো এই গুরুতর অপরাধকে সর্বদা অস্বীকার করে গেছে।
তিনি আরও বলেন, আমরা ভুলে যাইনি বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ নেতা ইলিয়াস আলী, ওয়ার্ড কমিশনার চৌধুরী আলম, একটি ওয়ার্ডের সাধারণ সম্পাদক সাজেদুল ইসলাম সুমনসহ অগণিত মানুষকে। যাদের পরিবারের প্রতিটি রাত কাটছে বুকভরা বেদনা, অনিশ্চয়তা ও প্রতীক্ষা নিয়ে। আইনজীবী ব্যারিস্টার আরমান, অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল আজমীসহ অসংখ্য ভিন্ন মতাবলম্বী, কর্মকর্তা, লেখক, সাংবাদিক, সমাজকর্মী, এমনকি গৃহবধূ ও সাধারণ নাগরিককে বছরের পর বছর অন্ধকার, স্যাঁতসেঁতে, আলো-বাতাসহীন আয়নাঘরে আটকে রাখা হয়েছিল। সেখানে প্রতিটি মুহূর্ত ছিল মৃত্যুর চেয়েও ভয়াবহ।
তিনি বলেন, মঞ্চে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকেও গুম করে ভিনদেশে ফেলে আসা হয়েছিল। তাদের মধ্যে কেউ কেউ সৌভাগ্যক্রমে আমাদের মাঝে ফিরে এসেছেন। এ দেশে আজও এমন বহু মানুষ আছেন, যারা আজ পর্যন্ত আর ফিরে আসেননি। যে গণতন্ত্র, সাম্য, বাকস্বাধীনতা, মানবিক মর্যাদা ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের জন্য ১৯৭১ সালে আমাদের বীর মুক্তিযোদ্ধারা বুকের তাজা রক্ত দিয়ে দেশটাকে স্বাধীন করেছিলেন, সেই স্বাধীন দেশে গুম-খুনের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে চূড়ান্ত অন্যায় আর ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা হয়েছিল।
এর মাধ্যমে একটা ভয়ানক ও ভীতিকর পরিবেশ তৈরি করা হয়েছিল। আমাদের জাতীয় ইতিহাসের এ এক অত্যন্ত বেদনাদায়ক, অপমানজনক অধ্যায় বলেও মন্তব্য করেন রাষ্ট্রপতি।
স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন ও গণতান্ত্রিক সংগ্রামের প্রসঙ্গ টেনে তিনি উল্লেখ করেন, নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে সেই ফ্যাসিবাদ বংশ দেশ থেকে পালাতে বাধ্য হয়েছে। এখন প্রতিশোধ নয়, প্রতিকারের ব্যবস্থা নিতে হবে, প্রকৃত অপরাধীদের আইনানুগ শাস্তির আওতায় আনতে হবে।
গুম সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের তথ্যাবলি প্রকাশ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, "আজকে এখানে গুম সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের সদস্যরা উপস্থিত আছেন। কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে যে সত্য বেরিয়ে এসেছে, তা শুধু বেদনাদায়কই নয়, অত্যন্ত লজ্জাজনক ও ভয়াবহ। কমিশন ১,৫৬৯টি ঘটনাকে সুনির্দিষ্টভাবে গুম হিসেবে চিহ্নিত করেছে, যার মধ্যে ২৮৭ জন নিখোঁজ ও মৃত। এই প্রতিবেদনে নির্বাচনের আগে গুমের ঘটনা বেড়ে যাওয়া, বেছে বেছে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের নেতাকর্মীদের জোরপূর্বক গুম ও গোপনে খুন করার যে চিত্র ফুটে উঠেছে তা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে রাষ্ট্রক্ষমতাকে কুক্ষিগত করে রাখতেই দলীয় ও ব্যক্তি স্বার্থে এই বর্বর, পৈশাচিক ও ঘৃণ্য কাজগুলো বেশি করা হয়েছে।"
আইনগত পদক্ষেপ ও আন্তর্জাতিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার বিষয় তুলে ধরে তিনি যোগ করেন, "কমিশনের প্রতিবেদন আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করেছে, কিন্তু পথ এখনো অনেক দীর্ঘ। এবারের আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবসের প্রতিপাদ্য: 'Victims first, Action now'। গুমের শিকার ব্যক্তি ও পরিবারকে রক্ষা এবং গুমকে চিরতরে নিষিদ্ধ করতে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬' জাতীয় সংসদে উত্থাপিত হয়েছে। বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ সনদে স্বাক্ষর করেছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে গুম ও গণহত্যার বিচারের কাজ স্বচ্ছ ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রেখে এগিয়ে চলছে।"
ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর প্রতি রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা পুনর্ব্যক্ত করে তিনি বলেন, "প্রিয় স্বজনহারা ও প্রিয়জনের অপেক্ষায় থাকা পরিবার, আমি বিশ্বাস করি, শুধু অপরাধীদের শাস্তি দিলেই রাষ্ট্রের দায়িত্ব শেষ হবে না। যেসব পরিবার বছরের পর বছর প্রিয়জনের অপেক্ষায় সীমাহীন অনিশ্চয়তা, আর্থিক সংকট ও মানসিক যন্ত্রণা বহন করেছে, তাদের মর্যাদা, সামাজিক নিরাপত্তা, চিকিৎসা, শিক্ষা, জীবিকা ও পুনর্বাসনের দায়িত্বও রাষ্ট্রকে গ্রহণ করতে হবে।"
ভবিষ্যতের গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের রূপরেখা তুলে ধরে তিনি মন্তব্য করেন, "আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবে, কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থাকবে না। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে, কিন্তু ভয়ের সংস্কৃতি থাকবে না। আইনশৃঙ্খলা থাকবে, কিন্তু আইনের নামে মানবাধিকার ও সুবিচার লঙ্ঘনের সুযোগ থাকবে না। রাষ্ট্রের ক্ষমতা থাকবে, কিন্তু সেই ক্ষমতার ওপর থাকবে সংবিধান ও আইনের নিয়ন্ত্রণ। আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি দেশের উন্নয়ন ও সাফল্য শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। বরং একটি রাষ্ট্র কতটা গণতান্ত্রিক ও কল্যাণমুখী, কতটা ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক এবং তার নাগরিক কতটা নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন করে—সেটি একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত উন্নয়ন ও সাফল্যের চিত্র তুলে ধরে। আর এমন একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ে তুলতেই আমরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।"
পরিশেষে বিচার সুনিশ্চিত করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে রাষ্ট্রপতি তাঁর ভাষণ শেষ করেন, "স্পষ্ট ভাষায় বলতে চাই, এই স্বাধীন বাংলাদেশে আর কোনো 'আয়নাঘর' থাকবে না। আর কোনো মাকে সন্তানের জন্য, কোনো স্ত্রীকে স্বামীর জন্য চোখের পানি ফেলতে হবে না। প্রতিটি গুমের ঘটনার সাথে জড়িত অপরাধীদের, তা সে যতো বড় ক্ষমতাবানই হোক না কেন, বিচারের মুখোমুখি করা হবে। আইনের সর্বোচ্চ শাস্তি তাদের পেতেই হবে। এই দেশে ফ্যাসিবাদ ফিরে আসার সকল পথ চিরতরে বন্ধ করা হবে। রাষ্ট্রের আরেকটা পবিত্র দায়িত্ব, গুমের শিকার পরিবারগুলোর পাশে আন্তরিকভাবে দাঁড়ানো। আমি বিশ্বাস করি, সরকার এ বিষয়ে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।"

আপনার মতামত লিখুন