নেপালের ত্রিশূলী করিডোরের পাহাড়ি নদীগুলোর গভীরে, মাটির নিচে, সুড়ঙ্গ আর ভূগর্ভস্থ বিদ্যুৎকেন্দ্রে আটকে আছে শত শত শ্রমিক। ভোঁটেকোশীর ভয়াবহ বন্যার তিন দিন পরও তাঁদের অনেকের কাছে পৌঁছাতে পারেনি উদ্ধারকারীরা। সড়ক ও সেতু ভেসে গেছে, সুড়ঙ্গের মুখ চাপা পড়েছে ধ্বসে।
একটি ভিডিও ছড়িয়েছে সামাজিক মাধ্যমে- নেপালি সেনাবাহিনীর সৈন্যরা কর্দমাক্ত সুড়ঙ্গের ভেতর থেকে একজন শ্রমিককে টেনে বের করছেন। এটি আপার ত্রিশূলী-১ বিদ্যুৎকেন্দ্রের উদ্ধার অভিযানের দৃশ্য। সেনাবাহিনী বুধবার থেকেই এই অভিযান চালাচ্ছে।
কিন্তু এই নাটকীয় উদ্ধার শুধু এক অংশ- আরও বড় সংকট অপেক্ষা করছে। নেপালের স্বাধীন বিদ্যুৎ উৎপাদক সংস্থা (আইপিপ্যান) জানিয়েছে, ১১টি বিদ্যুৎ প্রকল্পের ৯৩৪ জন কর্মী এখনো নিখোঁজ। সঠিক সংখ্যা জানা যাচ্ছে না, কারণ বন্যায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া প্রকল্পগুলোতে পৌঁছানোই দুঃসাধ্য।
চিলিমে বিদ্যুৎ প্রকল্পের ৮ কর্মী এখনো যোগাযোগহীন। তাদের মধ্যে ৬ জন সুড়ঙ্গের ভেতর আটকে আছেন। প্রকল্পের নির্বাহী পরিচালক বাবুরাজ মহার্জন বলেন, ‘সুড়ঙ্গ কাদায় ভর্তি, প্রবেশ করা অসম্ভব।’
রাসুওয়াগড়ি বিদ্যুৎ প্রকল্পের ৪৯ কর্মী নিখোঁজ। তথ্য কর্মকর্তা নারায়ণ নাথ নেওপানে বলেন, ‘আমরা অনুমান করছি, ছয় থেকে সাত তলা ভূগর্ভস্থ বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভেতর তিন থেকে ছয় জন আটকে থাকতে পারেন। যতক্ষণ অক্সিজেন পাইপ বন্ধ না হয়, ততক্ষণ তারা নিরাপদ আছেন বলে আশা করছি।’
সেনাবাহিনী এখন পর্যন্ত আপার ত্রিশূলী-১ থেকে ২৫৪ জন এবং লাংটাং খোলা থেকে ১৮ জনকে উদ্ধার করেছে। কিন্তু রাসুওয়াগড়ি ও চিলিমের কর্মীরা এখনো অপেক্ষা করছেন।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, পৌঁছানোর অভাবে উদ্ধার কাজ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। লাংটাং হাইড্রোপাওয়ারের উদ্যোক্তা বিজয় মোহন ভট্টরাই বলেন, ‘সড়কের সেতুগুলো ভেসে গেছে। হেলিকপ্টার ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। ৪২ জন এখনো নিখোঁজ। সরকারকে উদ্ধারকে প্রাধান্য দিতে হবে।’
জ্বালানি, পানি সম্পদ ও সেচ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, শুক্রবার পর্যন্ত বিভিন্ন প্রকল্প থেকে ৩৫০ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের তথ্য অনুযায়ী, ১০০ জনের বেশি এখনো সুড়ঙ্গের ভেতর আটকে আছেন।
এক বিবৃতিতে মন্ত্রণালয় জানায়, ‘প্রাথমিক তথ্য বলছে, এলাকার বিদ্যুৎ প্রকল্পে কর্মরত ১ হাজার কর্মীর বেশি এখনো যোগাযোগহীন।’
নেপাল বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের কর্মী অভিষেক চৌহান সামাজিক মাধ্যমে আবেদন জানিয়েছেন, আপার ত্রিশূলী-৩এ প্রকল্পে আটক ৩৫ জনের উদ্ধারকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। তিনি লিখেছেন, ‘আমি বারবার আবেদন করে ক্লান্ত। তিন দিন পার হয়ে গেছে, ওরা এখনো নিখোঁজ। প্রতি মুহূর্ত তাঁদের জন্য অসহনীয় যন্ত্রণার।’
জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আপার ত্রিশূলী-৩এ-এর ভূগর্ভস্থ বিদ্যুৎকেন্দ্রে আটক কর্মীদের উদ্ধারে বিশেষ অভিযান চলছে। সুড়ঙ্গের মুখ চাপা পড়েছে, খনন যন্ত্র দিয়ে সেটি পরিষ্কার করার কাজ চলছে।
নেপাল বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক দীর্ঘায়ু কুমার শ্রেষ্ঠ বলেন, ‘আমরা চিলিমে ১৫-২০ জন, রাসুওয়াগড়িতে ১০০-এর বেশি, আপার ত্রিশূলী-৩এ-তে ৪০-৪৫ জন এবং আপার ত্রিশূলী-৩বি-তে ২০-২৫ জন কর্মীর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছি না।’
বন্যায় ত্রিশূলী করিডোরের ১৪-১৫টি প্রকল্পের ৪৩০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতা নষ্ট হয়েছে। বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ বলছে, দেশের চাহিদা মেটানোয় এখনই সমস্যা হচ্ছে না। তবে ক্ষতির পরিমাণ নিঃসন্দেহে বিশাল- কোটি কোটি রুপি।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মনোজ থাপা জানিয়েছেন, ১৯টি হাইড্রোপাওয়ার সুড়ঙ্গে উদ্ধার অভিযানকে অগ্রাধিকার দিয়েছে সেনাবাহিনী।
ভোঁটেকোশীর এই বন্যায় পাহাড়চূড়া থেকে নামা কর্দম স্রোত যেন গিলে নিয়েছে সব স্বপ্ন। সুড়ঙ্গের অন্ধকারে বন্দী কর্মীরা অপেক্ষা করছে আলোর জন্য। উদ্ধারকারী দল দিন-রাত খুঁড়ছে পাহাড়, কিন্তু সময় যেন থমকে দাঁড়িয়েছে। প্রতিটি সেকেন্ড যেন এক যুগ হয়ে যাচ্ছে। সূত্র: কাঠমুণ্ডু পোস্ট

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৯ আগস্ট ২০২৬
নেপালের ত্রিশূলী করিডোরের পাহাড়ি নদীগুলোর গভীরে, মাটির নিচে, সুড়ঙ্গ আর ভূগর্ভস্থ বিদ্যুৎকেন্দ্রে আটকে আছে শত শত শ্রমিক। ভোঁটেকোশীর ভয়াবহ বন্যার তিন দিন পরও তাঁদের অনেকের কাছে পৌঁছাতে পারেনি উদ্ধারকারীরা। সড়ক ও সেতু ভেসে গেছে, সুড়ঙ্গের মুখ চাপা পড়েছে ধ্বসে।
একটি ভিডিও ছড়িয়েছে সামাজিক মাধ্যমে- নেপালি সেনাবাহিনীর সৈন্যরা কর্দমাক্ত সুড়ঙ্গের ভেতর থেকে একজন শ্রমিককে টেনে বের করছেন। এটি আপার ত্রিশূলী-১ বিদ্যুৎকেন্দ্রের উদ্ধার অভিযানের দৃশ্য। সেনাবাহিনী বুধবার থেকেই এই অভিযান চালাচ্ছে।
কিন্তু এই নাটকীয় উদ্ধার শুধু এক অংশ- আরও বড় সংকট অপেক্ষা করছে। নেপালের স্বাধীন বিদ্যুৎ উৎপাদক সংস্থা (আইপিপ্যান) জানিয়েছে, ১১টি বিদ্যুৎ প্রকল্পের ৯৩৪ জন কর্মী এখনো নিখোঁজ। সঠিক সংখ্যা জানা যাচ্ছে না, কারণ বন্যায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া প্রকল্পগুলোতে পৌঁছানোই দুঃসাধ্য।
চিলিমে বিদ্যুৎ প্রকল্পের ৮ কর্মী এখনো যোগাযোগহীন। তাদের মধ্যে ৬ জন সুড়ঙ্গের ভেতর আটকে আছেন। প্রকল্পের নির্বাহী পরিচালক বাবুরাজ মহার্জন বলেন, ‘সুড়ঙ্গ কাদায় ভর্তি, প্রবেশ করা অসম্ভব।’
রাসুওয়াগড়ি বিদ্যুৎ প্রকল্পের ৪৯ কর্মী নিখোঁজ। তথ্য কর্মকর্তা নারায়ণ নাথ নেওপানে বলেন, ‘আমরা অনুমান করছি, ছয় থেকে সাত তলা ভূগর্ভস্থ বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভেতর তিন থেকে ছয় জন আটকে থাকতে পারেন। যতক্ষণ অক্সিজেন পাইপ বন্ধ না হয়, ততক্ষণ তারা নিরাপদ আছেন বলে আশা করছি।’
সেনাবাহিনী এখন পর্যন্ত আপার ত্রিশূলী-১ থেকে ২৫৪ জন এবং লাংটাং খোলা থেকে ১৮ জনকে উদ্ধার করেছে। কিন্তু রাসুওয়াগড়ি ও চিলিমের কর্মীরা এখনো অপেক্ষা করছেন।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, পৌঁছানোর অভাবে উদ্ধার কাজ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। লাংটাং হাইড্রোপাওয়ারের উদ্যোক্তা বিজয় মোহন ভট্টরাই বলেন, ‘সড়কের সেতুগুলো ভেসে গেছে। হেলিকপ্টার ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। ৪২ জন এখনো নিখোঁজ। সরকারকে উদ্ধারকে প্রাধান্য দিতে হবে।’
জ্বালানি, পানি সম্পদ ও সেচ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, শুক্রবার পর্যন্ত বিভিন্ন প্রকল্প থেকে ৩৫০ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের তথ্য অনুযায়ী, ১০০ জনের বেশি এখনো সুড়ঙ্গের ভেতর আটকে আছেন।
এক বিবৃতিতে মন্ত্রণালয় জানায়, ‘প্রাথমিক তথ্য বলছে, এলাকার বিদ্যুৎ প্রকল্পে কর্মরত ১ হাজার কর্মীর বেশি এখনো যোগাযোগহীন।’
নেপাল বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের কর্মী অভিষেক চৌহান সামাজিক মাধ্যমে আবেদন জানিয়েছেন, আপার ত্রিশূলী-৩এ প্রকল্পে আটক ৩৫ জনের উদ্ধারকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। তিনি লিখেছেন, ‘আমি বারবার আবেদন করে ক্লান্ত। তিন দিন পার হয়ে গেছে, ওরা এখনো নিখোঁজ। প্রতি মুহূর্ত তাঁদের জন্য অসহনীয় যন্ত্রণার।’
জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আপার ত্রিশূলী-৩এ-এর ভূগর্ভস্থ বিদ্যুৎকেন্দ্রে আটক কর্মীদের উদ্ধারে বিশেষ অভিযান চলছে। সুড়ঙ্গের মুখ চাপা পড়েছে, খনন যন্ত্র দিয়ে সেটি পরিষ্কার করার কাজ চলছে।
নেপাল বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক দীর্ঘায়ু কুমার শ্রেষ্ঠ বলেন, ‘আমরা চিলিমে ১৫-২০ জন, রাসুওয়াগড়িতে ১০০-এর বেশি, আপার ত্রিশূলী-৩এ-তে ৪০-৪৫ জন এবং আপার ত্রিশূলী-৩বি-তে ২০-২৫ জন কর্মীর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছি না।’
বন্যায় ত্রিশূলী করিডোরের ১৪-১৫টি প্রকল্পের ৪৩০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতা নষ্ট হয়েছে। বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ বলছে, দেশের চাহিদা মেটানোয় এখনই সমস্যা হচ্ছে না। তবে ক্ষতির পরিমাণ নিঃসন্দেহে বিশাল- কোটি কোটি রুপি।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মনোজ থাপা জানিয়েছেন, ১৯টি হাইড্রোপাওয়ার সুড়ঙ্গে উদ্ধার অভিযানকে অগ্রাধিকার দিয়েছে সেনাবাহিনী।
ভোঁটেকোশীর এই বন্যায় পাহাড়চূড়া থেকে নামা কর্দম স্রোত যেন গিলে নিয়েছে সব স্বপ্ন। সুড়ঙ্গের অন্ধকারে বন্দী কর্মীরা অপেক্ষা করছে আলোর জন্য। উদ্ধারকারী দল দিন-রাত খুঁড়ছে পাহাড়, কিন্তু সময় যেন থমকে দাঁড়িয়েছে। প্রতিটি সেকেন্ড যেন এক যুগ হয়ে যাচ্ছে। সূত্র: কাঠমুণ্ডু পোস্ট

আপনার মতামত লিখুন