গ্রীষ্ম এলেই বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থার সামনে একই পুরোনো সংকট ফিরে আসে- চাহিদা বাড়ে, জ্বালানি সরবরাহে চাপ পড়ে, উৎপাদন ব্যাহত হয়, আর কোনো কোনো এলাকায় শুরু হয় লোডশেডিং। এই পরিস্থিতিতে জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর বদলে সৌরবিদ্যুৎকে সামনে আনার উদ্যোগ নতুন সম্ভাবনার পাশাপাশি বড় কিছু প্রশ্নও তৈরি করেছে।
শনিবার (২৯ আগস্ট) বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেছেন, সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে উদ্যোক্তাদের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছে সরকার। এর ফলে আগামী গ্রীষ্মের আগেই দেশে অন্তত ৩ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা তৈরি হবে।
উত্তরটি কিছুটা ইতিবাচক। সেই জায়গা কোনো ধানী জমি নয়, বরং শিল্পকারখানার ছাদ, সরকারি জমি, রেলওয়ের অব্যবহৃত জায়গা, চর, উপকূলীয় অনুর্বর জমি এবং বিদ্যমান বিদ্যুৎ অবকাঠামোর আশপাশ। আসল সম্ভাবনা এগুলোতেই।
সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে দেশে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো জমি। বড় আকারের সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনে প্রতি মেগাওয়াটে আনুমানিক তিন একর জমি প্রয়োজন হতে পারে। বিশ্বব্যাংকের এক গবেষণাতেও তিন একর/মেগাওয়াট হিসেবে হিসাব করা হয়েছে। এই হিসাব ধরলে ১ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুতের জন্যই প্রায় ৩ হাজার একর জমি প্রয়োজন। কৃষিজমিতে এমন প্রকল্প করলে খাদ্যনিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সংঘাত তৈরি হতে পারে।
টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষও (স্রেডা) বলছে, রুফটপ সোলার বাংলাদেশের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। প্রতি মেগাওয়াট ইউটিলিটি-স্কেল সৌর প্রকল্পে তিন একরের বেশি অকৃষি জমি লাগতে পারে; তাই বাড়ি, শিল্পকারখানা ও অন্যান্য স্থাপনার অব্যবহৃত ছাদ কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এখানেই বাংলাদেশের ‘সোলার বিপ্লবের’ সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা।গাজীপুর, সাভার, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামের শিল্পাঞ্চলে দিনের বেলায় যখন কারখানাগুলো সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ ব্যবহার করে, ঠিক তখনই সৌর প্যানেল সর্বোচ্চ উৎপাদন করতে পারে। অর্থাৎ কারখানার ছাদে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন হলে কারখানায় তা জোগান হবে। তাতে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমবে। এটি বড় সৌর পার্কের চেয়ে বাংলাদেশের বাস্তবতার সঙ্গে অনেক বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ মডেল।
স্রেডা ইতোমধ্যে ‘জাতীয় রুফটপ সোলার কর্মসূচি’র গাইডলাইন করেছে। ২০২৬ সালের মার্চে মাঝারি ও বড় রুফটপ প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য আলাদা কর্মশালাও করেছে। তবে রুফটপ সোলারের সবচেয়ে বড় বাধা হচ্ছে, সূর্য না থাকলে কী হবে? এর একটি গুরুত্বপূর্ণ সমাধান হচ্ছে, নতুন নেট-মিটারিং ব্যবস্থা। দিনে ছাদে উৎপাদিত বিদ্যুতের একটি অংশ কারখানা বা ভবন নিজে ব্যবহার করবে। অতিরিক্ত বিদ্যুৎ গ্রিডে যাবে। সেই বিদ্যুৎ হিসাব করে গ্রাহকের বিলের সঙ্গে সমন্বয় করা হবে।
২০২৫ সালের নেট মিটারিং নির্দেশিকা এই ব্যবস্থাকে আরও সম্প্রসারিত করেছে। স্রেডার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শুরুতে নেট-মিটার্ড রুফটপ সোলারের সংখ্যা ৪,৪৯০ ছাড়িয়েছে। মোট সক্ষমতা প্রায় ২১৪ মেগাওয়াট। অর্থাৎ সম্ভাবনা হাজার হাজার মেগাওয়াট হলেও বাস্তব অর্জন এখনো কয়েক শ মেগাওয়াটের ঘরে। এটাই সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
পাশাপাশি উপকূল ও দ্বীপে অন্য এক সম্ভাবনা হয়ে আছে। খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, পটুয়াখালী, বরগুনা কিংবা ভোলার মতো এলাকায় লবণাক্ত বা অনুর্বর জমি সৌরবিদ্যুতের জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে। আর দ্বীপাঞ্চলে এর গুরুত্ব আরও বেশি। সন্দ্বীপ, হাতিয়া, কুতুবদিয়া কিংবা মনপুরার মতো এলাকায় কেন্দ্রীয় গ্রিড সম্প্রসারণ ব্যয়বহুল হলে সোলারের সঙ্গে ব্যাটারি তার সঙ্গে মাইক্রোগ্রিড মডেলটি কার্যকর হতে পারে।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, ৩ হাজার মেগাওয়াট কি গ্রীষ্মে বিদ্যুতের সংকট পুরোপুরি মেটাতে সক্ষম হবে? বলা ভালো যে, ৩ হাজার মেগাওয়াট হলো ইনস্টল্ড ক্যাপাসিটি। সব সময় ৩ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে না। তাছাড়া সূর্যের আলো দিনের নির্দিষ্ট সময় থাকে। মেঘলা দিনে উৎপাদন কমে। সন্ধ্যার পর উৎপাদন শূন্য। তাই ৩ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ মানেই জাতীয় গ্রিডে সব সময় ৩ হাজার মেগাওয়াট অতিরিক্ত বিদ্যুৎ নয়।
তবে গ্রীষ্মের দুপুরের বিষয়টি আলাদা। তাপমাত্রা বাড়লে ফ্যান, এসি, পাম্পসহ বিভিন্ন যন্ত্রের ব্যবহার বাড়ে। সেই সময় সৌরবিদ্যুৎ দিনের পিক চাহিদার একটি অংশ সরাসরি সামাল দিতে পারে। এ কারণেই সৌরবিদ্যুৎ লোডশেডিংয়ের পূর্ণ সমাধান না হলেও দিনের বেলার সংকট কমানোর অত্যন্ত কার্যকর হাতিয়ার হতে পারে।
বাংলাদেশের সৌরবিদ্যুতের সবচেয়ে বড় সমস্যা সৌর প্যানেলে নয়, সেটা মূলত গ্রিড। চর বা উপকূল থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করলেই হবে না। সেটি নিতে হবে জাতীয় গ্রিডে। প্রয়োজন হবে সাবস্টেশন, ট্রান্সমিশন লাইন এবং বিতরণ নেটওয়ার্কের সক্ষমতা। অন্যদিকে হাজার হাজার ছোট রুফটপ সোলার গ্রিডে যুক্ত হলে বিদ্যুৎ প্রবাহের চরিত্রও বদলে যাবে।স্রেডাও বলছে, নেট মিটারিং ব্যবস্থায় ব্যাটারি ছাড়াই সিস্টেম পরিচালনা করা সম্ভব। কিন্তু যদি লক্ষ্য হয় সন্ধ্যার পরও সৌরবিদ্যুতের সুবিধা পাওয়া, তখন স্টোরেজ দরকার। আর ব্যাটারি এখনও ব্যয়বহুল। ফলে বাংলাদেশের জন্য বাস্তবসম্মত কৌশল হতে পারে প্রথমত, রুফটপ সোলার সেখান থেকে শক্তিশালী গ্রিড। তারপর সীমিত ব্যাটারি স্টোরেজ। সেখান থেকে স্মার্ট গ্রিড। সব সৌরবিদ্যুৎকে ব্যাটারিতে আটকে রাখার প্রয়োজন নেই।
তাহলে সরকারের বিনিয়োগ অগ্রাধিকারের জরুরি তালিকা কেমন হতে পারে? বাংলাদেশের জন্য একটি সম্ভাব্য অগ্রাধিকার তালিকা হতে পারে- প্রথমে শিল্পকারখানার ছাদ থেকে সৌরবিদ্যুৎ, যা দ্রুততম ফল দেবে। এরপর আসে সরকারি ও রেলওয়ের অব্যবহৃত জমি। এসব জমি অধিগ্রহণের জটিলতা খুবই কম। তারপর অর্থনৈতিক অঞ্চল ও ইপিজেড। যেগুলো উৎপাদন ও ব্যবহার একই এলাকায় হয়।
পরের তালিকায় আসতে পারে উপকূলীয় অনুর্বর জমি। যেখানে বড় প্রকল্পের বড় সুযোগ আছে। এরপর নির্বাচিত চরাঞ্চল, যেখানে ভূমি-স্থিতিশীলতা যাচাই করে নেওয়া সম্ভব। পরের ধাপে বিবেচনায় নেওয়া যায় দ্বীপাঞ্চল, যেখানে সোলার মাইক্রোগ্রিড স্থাপন করা যেতে পারে। সবচেয়ে সৌরবিদ্যুতের মাধ্যমে সেচ প্রকল্প চালু রাখা, যাতে কৃষির ডিজেল নির্ভরতা কমানো যাবে।
তবে মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশ রাতারাতি জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে যেতে পারবে না। শিল্প, পরিবহন, বিদ্যুৎ- সব ক্ষেত্রেই এখনো গ্যাস, তেল ও অন্যান্য জ্বালানির ওপর নির্ভরতা রয়েছে। কিন্তু সৌরবিদ্যুতের বিশেষ সুবিধা হলো- জ্বালানি কিনতে হয় না। সূর্য প্রতিদিন ওঠে। তার জন্য ডলার লাগে না। আমদানি করতে হয় না। জাহাজ ভাড়া করতে হয় না। গ্যাসের সরবরাহ নিয়ে চিন্তা করতে হয় না। প্রয়োজন শুধু সঠিক জায়গা, ভালো প্রযুক্তি, অর্থায়ন ও গ্রিড।
বাংলাদেশের নতুন নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিতে ২০৩০ সালে ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে লক্ষ্য ঘোষণা করা সহজ। বাস্তবায়নই কঠিন। ৩ হাজার মেগাওয়াটের প্রশ্ন তাই আসলে ৩ হাজার মেগাওয়াটের নয়।
আর যদি না পারে, তাহলে ৩ হাজার মেগাওয়াটের লক্ষ্যও শেষ পর্যন্ত কাগজে থাকা আরেকটি বড় সংখ্যা হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি আছে। বাংলাদেশের সামনে তখন দুটো প্রশ্ন আসবে, সূর্যের আলো আমরা শুধু গায়ে মাখব, নাকি সেটিকে দেশের সবচেয়ে বড় দেশীয় জ্বালানি সম্পদে পরিণত করব?

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৯ আগস্ট ২০২৬
গ্রীষ্ম এলেই বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থার সামনে একই পুরোনো সংকট ফিরে আসে- চাহিদা বাড়ে, জ্বালানি সরবরাহে চাপ পড়ে, উৎপাদন ব্যাহত হয়, আর কোনো কোনো এলাকায় শুরু হয় লোডশেডিং। এই পরিস্থিতিতে জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর বদলে সৌরবিদ্যুৎকে সামনে আনার উদ্যোগ নতুন সম্ভাবনার পাশাপাশি বড় কিছু প্রশ্নও তৈরি করেছে।
শনিবার (২৯ আগস্ট) বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেছেন, সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে উদ্যোক্তাদের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছে সরকার। এর ফলে আগামী গ্রীষ্মের আগেই দেশে অন্তত ৩ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা তৈরি হবে।
উত্তরটি কিছুটা ইতিবাচক। সেই জায়গা কোনো ধানী জমি নয়, বরং শিল্পকারখানার ছাদ, সরকারি জমি, রেলওয়ের অব্যবহৃত জায়গা, চর, উপকূলীয় অনুর্বর জমি এবং বিদ্যমান বিদ্যুৎ অবকাঠামোর আশপাশ। আসল সম্ভাবনা এগুলোতেই।
সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে দেশে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো জমি। বড় আকারের সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনে প্রতি মেগাওয়াটে আনুমানিক তিন একর জমি প্রয়োজন হতে পারে। বিশ্বব্যাংকের এক গবেষণাতেও তিন একর/মেগাওয়াট হিসেবে হিসাব করা হয়েছে। এই হিসাব ধরলে ১ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুতের জন্যই প্রায় ৩ হাজার একর জমি প্রয়োজন। কৃষিজমিতে এমন প্রকল্প করলে খাদ্যনিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সংঘাত তৈরি হতে পারে।
টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষও (স্রেডা) বলছে, রুফটপ সোলার বাংলাদেশের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। প্রতি মেগাওয়াট ইউটিলিটি-স্কেল সৌর প্রকল্পে তিন একরের বেশি অকৃষি জমি লাগতে পারে; তাই বাড়ি, শিল্পকারখানা ও অন্যান্য স্থাপনার অব্যবহৃত ছাদ কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এখানেই বাংলাদেশের ‘সোলার বিপ্লবের’ সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা।গাজীপুর, সাভার, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামের শিল্পাঞ্চলে দিনের বেলায় যখন কারখানাগুলো সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ ব্যবহার করে, ঠিক তখনই সৌর প্যানেল সর্বোচ্চ উৎপাদন করতে পারে। অর্থাৎ কারখানার ছাদে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন হলে কারখানায় তা জোগান হবে। তাতে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমবে। এটি বড় সৌর পার্কের চেয়ে বাংলাদেশের বাস্তবতার সঙ্গে অনেক বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ মডেল।
স্রেডা ইতোমধ্যে ‘জাতীয় রুফটপ সোলার কর্মসূচি’র গাইডলাইন করেছে। ২০২৬ সালের মার্চে মাঝারি ও বড় রুফটপ প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য আলাদা কর্মশালাও করেছে। তবে রুফটপ সোলারের সবচেয়ে বড় বাধা হচ্ছে, সূর্য না থাকলে কী হবে? এর একটি গুরুত্বপূর্ণ সমাধান হচ্ছে, নতুন নেট-মিটারিং ব্যবস্থা। দিনে ছাদে উৎপাদিত বিদ্যুতের একটি অংশ কারখানা বা ভবন নিজে ব্যবহার করবে। অতিরিক্ত বিদ্যুৎ গ্রিডে যাবে। সেই বিদ্যুৎ হিসাব করে গ্রাহকের বিলের সঙ্গে সমন্বয় করা হবে।
২০২৫ সালের নেট মিটারিং নির্দেশিকা এই ব্যবস্থাকে আরও সম্প্রসারিত করেছে। স্রেডার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শুরুতে নেট-মিটার্ড রুফটপ সোলারের সংখ্যা ৪,৪৯০ ছাড়িয়েছে। মোট সক্ষমতা প্রায় ২১৪ মেগাওয়াট। অর্থাৎ সম্ভাবনা হাজার হাজার মেগাওয়াট হলেও বাস্তব অর্জন এখনো কয়েক শ মেগাওয়াটের ঘরে। এটাই সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
পাশাপাশি উপকূল ও দ্বীপে অন্য এক সম্ভাবনা হয়ে আছে। খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, পটুয়াখালী, বরগুনা কিংবা ভোলার মতো এলাকায় লবণাক্ত বা অনুর্বর জমি সৌরবিদ্যুতের জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে। আর দ্বীপাঞ্চলে এর গুরুত্ব আরও বেশি। সন্দ্বীপ, হাতিয়া, কুতুবদিয়া কিংবা মনপুরার মতো এলাকায় কেন্দ্রীয় গ্রিড সম্প্রসারণ ব্যয়বহুল হলে সোলারের সঙ্গে ব্যাটারি তার সঙ্গে মাইক্রোগ্রিড মডেলটি কার্যকর হতে পারে।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, ৩ হাজার মেগাওয়াট কি গ্রীষ্মে বিদ্যুতের সংকট পুরোপুরি মেটাতে সক্ষম হবে? বলা ভালো যে, ৩ হাজার মেগাওয়াট হলো ইনস্টল্ড ক্যাপাসিটি। সব সময় ৩ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে না। তাছাড়া সূর্যের আলো দিনের নির্দিষ্ট সময় থাকে। মেঘলা দিনে উৎপাদন কমে। সন্ধ্যার পর উৎপাদন শূন্য। তাই ৩ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ মানেই জাতীয় গ্রিডে সব সময় ৩ হাজার মেগাওয়াট অতিরিক্ত বিদ্যুৎ নয়।
তবে গ্রীষ্মের দুপুরের বিষয়টি আলাদা। তাপমাত্রা বাড়লে ফ্যান, এসি, পাম্পসহ বিভিন্ন যন্ত্রের ব্যবহার বাড়ে। সেই সময় সৌরবিদ্যুৎ দিনের পিক চাহিদার একটি অংশ সরাসরি সামাল দিতে পারে। এ কারণেই সৌরবিদ্যুৎ লোডশেডিংয়ের পূর্ণ সমাধান না হলেও দিনের বেলার সংকট কমানোর অত্যন্ত কার্যকর হাতিয়ার হতে পারে।
বাংলাদেশের সৌরবিদ্যুতের সবচেয়ে বড় সমস্যা সৌর প্যানেলে নয়, সেটা মূলত গ্রিড। চর বা উপকূল থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করলেই হবে না। সেটি নিতে হবে জাতীয় গ্রিডে। প্রয়োজন হবে সাবস্টেশন, ট্রান্সমিশন লাইন এবং বিতরণ নেটওয়ার্কের সক্ষমতা। অন্যদিকে হাজার হাজার ছোট রুফটপ সোলার গ্রিডে যুক্ত হলে বিদ্যুৎ প্রবাহের চরিত্রও বদলে যাবে।স্রেডাও বলছে, নেট মিটারিং ব্যবস্থায় ব্যাটারি ছাড়াই সিস্টেম পরিচালনা করা সম্ভব। কিন্তু যদি লক্ষ্য হয় সন্ধ্যার পরও সৌরবিদ্যুতের সুবিধা পাওয়া, তখন স্টোরেজ দরকার। আর ব্যাটারি এখনও ব্যয়বহুল। ফলে বাংলাদেশের জন্য বাস্তবসম্মত কৌশল হতে পারে প্রথমত, রুফটপ সোলার সেখান থেকে শক্তিশালী গ্রিড। তারপর সীমিত ব্যাটারি স্টোরেজ। সেখান থেকে স্মার্ট গ্রিড। সব সৌরবিদ্যুৎকে ব্যাটারিতে আটকে রাখার প্রয়োজন নেই।
তাহলে সরকারের বিনিয়োগ অগ্রাধিকারের জরুরি তালিকা কেমন হতে পারে? বাংলাদেশের জন্য একটি সম্ভাব্য অগ্রাধিকার তালিকা হতে পারে- প্রথমে শিল্পকারখানার ছাদ থেকে সৌরবিদ্যুৎ, যা দ্রুততম ফল দেবে। এরপর আসে সরকারি ও রেলওয়ের অব্যবহৃত জমি। এসব জমি অধিগ্রহণের জটিলতা খুবই কম। তারপর অর্থনৈতিক অঞ্চল ও ইপিজেড। যেগুলো উৎপাদন ও ব্যবহার একই এলাকায় হয়।
পরের তালিকায় আসতে পারে উপকূলীয় অনুর্বর জমি। যেখানে বড় প্রকল্পের বড় সুযোগ আছে। এরপর নির্বাচিত চরাঞ্চল, যেখানে ভূমি-স্থিতিশীলতা যাচাই করে নেওয়া সম্ভব। পরের ধাপে বিবেচনায় নেওয়া যায় দ্বীপাঞ্চল, যেখানে সোলার মাইক্রোগ্রিড স্থাপন করা যেতে পারে। সবচেয়ে সৌরবিদ্যুতের মাধ্যমে সেচ প্রকল্প চালু রাখা, যাতে কৃষির ডিজেল নির্ভরতা কমানো যাবে।
তবে মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশ রাতারাতি জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে যেতে পারবে না। শিল্প, পরিবহন, বিদ্যুৎ- সব ক্ষেত্রেই এখনো গ্যাস, তেল ও অন্যান্য জ্বালানির ওপর নির্ভরতা রয়েছে। কিন্তু সৌরবিদ্যুতের বিশেষ সুবিধা হলো- জ্বালানি কিনতে হয় না। সূর্য প্রতিদিন ওঠে। তার জন্য ডলার লাগে না। আমদানি করতে হয় না। জাহাজ ভাড়া করতে হয় না। গ্যাসের সরবরাহ নিয়ে চিন্তা করতে হয় না। প্রয়োজন শুধু সঠিক জায়গা, ভালো প্রযুক্তি, অর্থায়ন ও গ্রিড।
বাংলাদেশের নতুন নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিতে ২০৩০ সালে ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে লক্ষ্য ঘোষণা করা সহজ। বাস্তবায়নই কঠিন। ৩ হাজার মেগাওয়াটের প্রশ্ন তাই আসলে ৩ হাজার মেগাওয়াটের নয়।
আর যদি না পারে, তাহলে ৩ হাজার মেগাওয়াটের লক্ষ্যও শেষ পর্যন্ত কাগজে থাকা আরেকটি বড় সংখ্যা হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি আছে। বাংলাদেশের সামনে তখন দুটো প্রশ্ন আসবে, সূর্যের আলো আমরা শুধু গায়ে মাখব, নাকি সেটিকে দেশের সবচেয়ে বড় দেশীয় জ্বালানি সম্পদে পরিণত করব?

আপনার মতামত লিখুন