জীবনের চলমানতার মধ্যে অল্পসংখ্যক মানুষ পৃথিবীতে আসেন, যারা স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসেন। এই স্বপ্নের মধ্য দিয়ে মানুষকে আলোর পথে নিয়ে আসেন। বাঁচার প্রেরণা জোগান। তেমনই এক ব্যক্তিত্ব ছিলেন ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিম। বারডেম হাসপাতালের বড় স্যার। কতখানি আন্তরিকতা থাকলে একটি বৃহৎ প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছে বড় স্যার হয়ে উঠতে পারেন, এটাও একটা বিস্ময়।
তিনি জন্মেছিলেন আমাদের দেশের অসহায় রোগাক্রান্ত মানুষের ত্রাণকর্তা হিসেবে। উপলব্ধি করেছিলেন, রোগ-শোক শুধুমাত্র ব্যক্তি ও পরিবারকে আক্রান্ত করে না, এটি সুন্দর সমাজের প্রতিবন্ধক হিসেবেও কাজ করে। তিনি বলতেন, আর্ত-রুগ্ন মানুষের সেবা করা রাব্বুল আলামীনের খুব পছন্দনীয় কাজ। তাই রোগীর সেবাকে তিনি ইবাদত মনে করতেন। সকাল থেকে রাত অবধি রোগীদের চিন্তায় তিনি মগ্ন থাকতেন। কীভাবে রোগীদের উন্নত সেবা দেওয়া যায়, ডাক্তার, নার্স, হাসপাতাল সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাজের উন্নতি ঘটানো যায়, টেকনিশিয়ানদের কীভাবে আরও দক্ষ করে তোলা যায়, এটাই ছিল তার সার্বক্ষণিক চিন্তা। মূলত রোগীর সেবা করাই ছিল তার ধ্যান-ধারণা ও সাধনা।
তিনি কখনও টাকার সাধনা করেন নাই। রোগী দেখে টাকা উপার্জনের কথা তিনি ভাবতেই পারতেন না। এই কারণে কখনোই প্রাইভেট প্র্যাকটিস করেন নাই। অর্থাৎ চিকিৎসাকে অর্থকরি লাভজনক পেশা হিসেবে দেখেননি।
১৯৫৬ সালে ঢাকার সেগুনবাগিচায় ডায়াবেটিক রোগীদের জন্য তিনি একটি চারা রোপণ করেছিলেন। সেটি আজ বটবৃক্ষে পরিণত হয়ে ডালপালা ছড়িয়েছে। অর্থাৎ দেশের প্রতিটি জেলা-উপজেলায় এর বিস্তৃতি ঘটেছে। যার ফলে সারা দেশের রোগীরা এর সুফল পাচ্ছে। এই ব্যাপারে তার পরিবারের সদস্যদের অবদান রয়েছে প্রচুর।
ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিম কম বয়সী ডায়াবেটিক রোগী—যারা ইনসুলিন নির্ভরশীল অর্থাৎ টাইপ ১ ডায়াবেটিক রোগী তাদের জন্য বেশি চিন্তা করতেন। যে বয়সে বাচ্চারা খেলাধুলা, ছুটাছুটি, পড়াশোনা করে, সে বয়সে রোগটি বাধা হয়ে দাঁড়াবে সেটা তিনি মানতে পারতেন না। এইজন্য অভিভাবকদের আশ্বস্ত করতেন যে, যদি ঠিকমতো ডায়াবেটিসের নিয়ম-নীতি মেনে চলা যায়, তাহলে তারাও অন্য বাচ্চাদের মতো স্বাচ্ছন্দ্যে পড়াশোনা শেষ করে চাকরি করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবে।
তিনি ভাবতেন, একজন রোগীর রোগ নিরাময়ের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র ডাক্তার নয়, এক্ষেত্রে রোগী নিজে, পরিবার ও সমাজের দায়িত্ব রয়েছে। তাই সকলকেই এগিয়ে আসতে হবে। রোগীর প্রতি তার ব্যবহার ছিল পিতৃসুলভ। প্রতিটি রোগীই হয়ে উঠত তার আত্মার আত্মীয়। তিনি তাদের প্রতি এত বেশি সহানুভূতিশীল ও আন্তরিক ছিলেন যে, যে কেউ দেখলে ভাবতেন—উক্ত রোগী বুঝি তার নিকট আত্মীয়।
কোনো রোগী তার কাছে আসলে তিনি প্রথমে রোগীর কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতেন। তারপর যথাযথ ব্যবস্থা করে রোগীর সমস্যা সমাধান করে অন্য কাজে মনোনিবেশ করতেন। অথচ আজ এ ধরনের কর্মতৎপরতা একেবারেই অনুপস্থিত। তার সফল কাজের মূলেই ছিল ডায়াবেটিক রোগীর রোগ নিয়ন্ত্রণ করা ও সকলকে সচেতন করা।
তিনি প্রতিষ্ঠানের সকলকে বলতেন চিকিৎসাসেবাকে চাকরি হিসেবে না নিয়ে সেবা হিসেবে নিতে হবে। চিকিৎসকেরা রোগীকে ব্যবস্থাপত্র লিখে দেবার পর তিনি জানতে চাইতেন সেই রোগীর নির্দেশিত ওষুধ কেনার সামর্থ্য আছে কিনা। রোগের বাইরেও রোগীর পারিবারিক ইতিহাস জানার আগ্রহ তার বরাবর ছিল। তিনি মনে করতেন রোগীর পারিবারিক অবস্থান জানা থাকলে চিকিৎসা করা সহজ হয়। রোগী যদি ডাক্তারকে বিশ্বাস করে তাহলে রোগীর মনোবল বৃদ্ধি পায় বলে তার ধারণা।
রোগাক্রান্ত, অসহায়, আর্ত পীড়িত মানুষ যাতে সুস্থ-কর্মঠ এবং সম্মানের সাথে বাঁচতে পারে সেই লক্ষ্যেই সারাজীবন কাজ করে গেছেন। তিনি নিজে রোগী ও তার পরিবারের সদস্যদের সুন্দরভাবে রোগের জটিলতাগুলো বুঝিয়ে বলতেন। যাতে রোগী ও পরিবারের সদস্যগণ রোগ নিয়ন্ত্রণে সচেষ্ট হয়। জটিলতাগুলো হলো—অন্ধত্ব, কিডনির রোগ, যক্ষ্মা, হৃদরোগ, পক্ষাঘাত, মাড়ির রোগ, গর্ভপাত ইত্যাদি।
তিনি বলতেন রোগীর প্রতি সহানুভূতি থাকাটা বড় কথা নয়, থাকতে হবে সমানুভূতি। রোগীর যন্ত্রণাকে নিজের যন্ত্রণা মনে করলেই সেই সেবক হবে সার্থক ও সফল। তার অভিমত হলো, একজন ব্যবসায়ীর টাকা উপার্জনের নেশা আর একজন ডাক্তারের টাকা উপার্জনের নেশা কখনোই এক হতে পারে না। আবার রোগ ভালো না করে টাকা নেওয়াটাকে তিনি লজ্জাজনক মনে করতেন। একারণেই আজীবনের রোগ ডায়াবেটিসের চিকিৎসা বিনা পয়সায় করতেন। যাতে রোগীর ব্যয়ভার কিছুটা লাঘব হয়।
ডাক্তারদের শিক্ষাদানের সময় বলতেন, প্রতিটি রোগীই তোমার পাঠ্যবই। রোগের সমাধান কল্পে যা তুমি শিখবে সেটাতেই তোমার চিকিৎসাবিদ্যার অনেক জ্ঞান অর্জিত হবে। তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি প্রদীপ থেকে শত শত প্রদীপ জ্বালালে যেমন আলো এতটুকু কমে না। তেমনি তোমার শিক্ষার আলো যত বেশি দান করা যাবে ততই মঙ্গল। এতে চারদিক হবে আলোকিত।
বারডেম হাসপাতালের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীকে যদি বেলা ২টা বাজার সঙ্গে সঙ্গে বের হয়ে যেতে দেখতেন, তখন তিনি বলতেন, এই যে গন্ডারের মতো ছুটছিস কেন? আগে আমার রোগী, তারপর তোর ঘর সংসার। রোগী চিকিৎসা না পেয়ে ফিরে যাবে, এটা তিনি কিছুতেই সহ্য করতেন না। কতদিন এমন হয়েছে—ছুটি হয়েছে, বাড়ির পথ ধরেছি, সেখান থেকে তার ডাকে ফিরে এসেছি। তার সান্নিধ্যে এসে আমাদের মানসিকতা এমনভাবে গড়ে উঠেছিল যে, আমরা এতে কেউ বিরক্ত হতাম না। কর্তব্য মনে করেই ফিরে আসতাম। কখনও মনে হলে তিনি ছুটির দিনেও আমাদের ডেকে পাঠাতেন।
তিনি বলতেন, রোগীরা আমার মেহমান। তবে সে বেড়াতে আসেনি, তার কপাল খারাপ, তাই সে আমাদের কাছে এসেছে। আমাদের উচিত তাকে সাহায্য করা। তার ক্ষেত্রে বলা যায়, মহৎ মানুষের হৃদয় আকাশের চাইতে বড় আর সাগরের চাইতে গভীর হয়।
তার সময়ে ডায়াবেটিস আছে এবং চাকরি প্রয়োজন, সে সমস্ত ব্যক্তিকে ডায়াবেটিক হাসপাতালে চাকরি দিয়েছেন। এই কারণে অনেক রোগী চিকিৎসা নিতে এসে আমাদের প্রশ্ন করতেন—‘আপনার কি ডায়াবেটিস আছে? শুনেছি ডায়াবেটিস থাকলে সহজেই এখানে চাকরি হয়ে যায়।’ রোগীদের এ ধরনের কথায় লজ্জা পেতাম ঠিকই, কিন্তু এই ভেবে ভালো লাগত যে, তিনি বেকার ডায়াবেটিক রোগীদের কথা ভাবতেন বলেই আজ তারা এখানে চাকরি করে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন, জীবনকে নতুন করে ভাবতে শিখেছেন।
তিনিই প্রথম বলেছেন, নিয়ম-নীতি মেনে মনে চললে ডায়াবেটিস কোনো রোগই নয়। রোগীদের সমস্যা নিরূপণে সূক্ষ্মভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতেন। যাতে কোনো ভুল-ত্রুটি না হয়। তিনি বলতেন, আমরা গরিব হলেও সেবার মান নিম্ন হবে তা হতে পারে না। তিনি রোগীর ব্যবস্থাপত্রে অল্প ওষুধ দেওয়া পছন্দ করতেন।
বাংলাদেশের ডাক্তারদের মধ্যে ডা. মো. ইব্রাহিমই প্রথম জাতীয় অধ্যাপকের মর্যাদা পেয়েছেন। চিকিৎসাক্ষেত্রে তিনি একটি বিপ্লবের সূচনা করে গেছেন। যে রোগটি মানুষের অজানা ছিল, চিকিৎসাও ছিল না অথচ রোগটি মানুষের দেহে বাসা বেঁধে মানুষকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিত। সেই রোগ চিহ্নিত করে তার উপশমের ব্যবস্থা করে দিয়ে মানুষকে সুস্থভাবে বেঁচে থাকার পথ বাতলে দিয়েছেন। যদিও এটি সারাজীবনের রোগ তবুও একে নিয়ন্ত্রণে রেখে কর্মময় জীবনযাপন সম্ভব করে তুলেছিলেন।
তার জীবনযাপন প্রণালী বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, যারা মূর্খ, কোনো কালেই কিছু করবে না, তারাই শুধু বলে অসম্ভব। আসলে অসম্ভব বলে কিছু নেই—থাকতেও পারে না। যদি চেষ্টা থাকে, ইচ্ছা থাকে, মানুষ সে লক্ষ্যে পৌঁছুবেই। যত বাধা-বিপত্তিই আসুক না কেন, শাহবাগের বুকে দাঁড়িয়ে থাকা ১৬ তলা বিশিষ্ট বারডেম হাসপাতালের ইমারতটি তারই জ্বলন্ত প্রমাণ।
[লেখক: সাবেক চিফ নিউট্রিশন অফিসার ও বিভাগীয় প্রধান, বারডেম জেনারেল হাসপাতাল এবং সভাপতি, ডায়াবেটিস নিউট্রিশনিস্ট সোসাইটি অব বাংলাদেশ]

সোমবার, ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
জীবনের চলমানতার মধ্যে অল্পসংখ্যক মানুষ পৃথিবীতে আসেন, যারা স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসেন। এই স্বপ্নের মধ্য দিয়ে মানুষকে আলোর পথে নিয়ে আসেন। বাঁচার প্রেরণা জোগান। তেমনই এক ব্যক্তিত্ব ছিলেন ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিম। বারডেম হাসপাতালের বড় স্যার। কতখানি আন্তরিকতা থাকলে একটি বৃহৎ প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছে বড় স্যার হয়ে উঠতে পারেন, এটাও একটা বিস্ময়।
তিনি জন্মেছিলেন আমাদের দেশের অসহায় রোগাক্রান্ত মানুষের ত্রাণকর্তা হিসেবে। উপলব্ধি করেছিলেন, রোগ-শোক শুধুমাত্র ব্যক্তি ও পরিবারকে আক্রান্ত করে না, এটি সুন্দর সমাজের প্রতিবন্ধক হিসেবেও কাজ করে। তিনি বলতেন, আর্ত-রুগ্ন মানুষের সেবা করা রাব্বুল আলামীনের খুব পছন্দনীয় কাজ। তাই রোগীর সেবাকে তিনি ইবাদত মনে করতেন। সকাল থেকে রাত অবধি রোগীদের চিন্তায় তিনি মগ্ন থাকতেন। কীভাবে রোগীদের উন্নত সেবা দেওয়া যায়, ডাক্তার, নার্স, হাসপাতাল সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাজের উন্নতি ঘটানো যায়, টেকনিশিয়ানদের কীভাবে আরও দক্ষ করে তোলা যায়, এটাই ছিল তার সার্বক্ষণিক চিন্তা। মূলত রোগীর সেবা করাই ছিল তার ধ্যান-ধারণা ও সাধনা।
তিনি কখনও টাকার সাধনা করেন নাই। রোগী দেখে টাকা উপার্জনের কথা তিনি ভাবতেই পারতেন না। এই কারণে কখনোই প্রাইভেট প্র্যাকটিস করেন নাই। অর্থাৎ চিকিৎসাকে অর্থকরি লাভজনক পেশা হিসেবে দেখেননি।
১৯৫৬ সালে ঢাকার সেগুনবাগিচায় ডায়াবেটিক রোগীদের জন্য তিনি একটি চারা রোপণ করেছিলেন। সেটি আজ বটবৃক্ষে পরিণত হয়ে ডালপালা ছড়িয়েছে। অর্থাৎ দেশের প্রতিটি জেলা-উপজেলায় এর বিস্তৃতি ঘটেছে। যার ফলে সারা দেশের রোগীরা এর সুফল পাচ্ছে। এই ব্যাপারে তার পরিবারের সদস্যদের অবদান রয়েছে প্রচুর।
ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিম কম বয়সী ডায়াবেটিক রোগী—যারা ইনসুলিন নির্ভরশীল অর্থাৎ টাইপ ১ ডায়াবেটিক রোগী তাদের জন্য বেশি চিন্তা করতেন। যে বয়সে বাচ্চারা খেলাধুলা, ছুটাছুটি, পড়াশোনা করে, সে বয়সে রোগটি বাধা হয়ে দাঁড়াবে সেটা তিনি মানতে পারতেন না। এইজন্য অভিভাবকদের আশ্বস্ত করতেন যে, যদি ঠিকমতো ডায়াবেটিসের নিয়ম-নীতি মেনে চলা যায়, তাহলে তারাও অন্য বাচ্চাদের মতো স্বাচ্ছন্দ্যে পড়াশোনা শেষ করে চাকরি করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবে।
তিনি ভাবতেন, একজন রোগীর রোগ নিরাময়ের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র ডাক্তার নয়, এক্ষেত্রে রোগী নিজে, পরিবার ও সমাজের দায়িত্ব রয়েছে। তাই সকলকেই এগিয়ে আসতে হবে। রোগীর প্রতি তার ব্যবহার ছিল পিতৃসুলভ। প্রতিটি রোগীই হয়ে উঠত তার আত্মার আত্মীয়। তিনি তাদের প্রতি এত বেশি সহানুভূতিশীল ও আন্তরিক ছিলেন যে, যে কেউ দেখলে ভাবতেন—উক্ত রোগী বুঝি তার নিকট আত্মীয়।
কোনো রোগী তার কাছে আসলে তিনি প্রথমে রোগীর কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতেন। তারপর যথাযথ ব্যবস্থা করে রোগীর সমস্যা সমাধান করে অন্য কাজে মনোনিবেশ করতেন। অথচ আজ এ ধরনের কর্মতৎপরতা একেবারেই অনুপস্থিত। তার সফল কাজের মূলেই ছিল ডায়াবেটিক রোগীর রোগ নিয়ন্ত্রণ করা ও সকলকে সচেতন করা।
তিনি প্রতিষ্ঠানের সকলকে বলতেন চিকিৎসাসেবাকে চাকরি হিসেবে না নিয়ে সেবা হিসেবে নিতে হবে। চিকিৎসকেরা রোগীকে ব্যবস্থাপত্র লিখে দেবার পর তিনি জানতে চাইতেন সেই রোগীর নির্দেশিত ওষুধ কেনার সামর্থ্য আছে কিনা। রোগের বাইরেও রোগীর পারিবারিক ইতিহাস জানার আগ্রহ তার বরাবর ছিল। তিনি মনে করতেন রোগীর পারিবারিক অবস্থান জানা থাকলে চিকিৎসা করা সহজ হয়। রোগী যদি ডাক্তারকে বিশ্বাস করে তাহলে রোগীর মনোবল বৃদ্ধি পায় বলে তার ধারণা।
রোগাক্রান্ত, অসহায়, আর্ত পীড়িত মানুষ যাতে সুস্থ-কর্মঠ এবং সম্মানের সাথে বাঁচতে পারে সেই লক্ষ্যেই সারাজীবন কাজ করে গেছেন। তিনি নিজে রোগী ও তার পরিবারের সদস্যদের সুন্দরভাবে রোগের জটিলতাগুলো বুঝিয়ে বলতেন। যাতে রোগী ও পরিবারের সদস্যগণ রোগ নিয়ন্ত্রণে সচেষ্ট হয়। জটিলতাগুলো হলো—অন্ধত্ব, কিডনির রোগ, যক্ষ্মা, হৃদরোগ, পক্ষাঘাত, মাড়ির রোগ, গর্ভপাত ইত্যাদি।
তিনি বলতেন রোগীর প্রতি সহানুভূতি থাকাটা বড় কথা নয়, থাকতে হবে সমানুভূতি। রোগীর যন্ত্রণাকে নিজের যন্ত্রণা মনে করলেই সেই সেবক হবে সার্থক ও সফল। তার অভিমত হলো, একজন ব্যবসায়ীর টাকা উপার্জনের নেশা আর একজন ডাক্তারের টাকা উপার্জনের নেশা কখনোই এক হতে পারে না। আবার রোগ ভালো না করে টাকা নেওয়াটাকে তিনি লজ্জাজনক মনে করতেন। একারণেই আজীবনের রোগ ডায়াবেটিসের চিকিৎসা বিনা পয়সায় করতেন। যাতে রোগীর ব্যয়ভার কিছুটা লাঘব হয়।
ডাক্তারদের শিক্ষাদানের সময় বলতেন, প্রতিটি রোগীই তোমার পাঠ্যবই। রোগের সমাধান কল্পে যা তুমি শিখবে সেটাতেই তোমার চিকিৎসাবিদ্যার অনেক জ্ঞান অর্জিত হবে। তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি প্রদীপ থেকে শত শত প্রদীপ জ্বালালে যেমন আলো এতটুকু কমে না। তেমনি তোমার শিক্ষার আলো যত বেশি দান করা যাবে ততই মঙ্গল। এতে চারদিক হবে আলোকিত।
বারডেম হাসপাতালের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীকে যদি বেলা ২টা বাজার সঙ্গে সঙ্গে বের হয়ে যেতে দেখতেন, তখন তিনি বলতেন, এই যে গন্ডারের মতো ছুটছিস কেন? আগে আমার রোগী, তারপর তোর ঘর সংসার। রোগী চিকিৎসা না পেয়ে ফিরে যাবে, এটা তিনি কিছুতেই সহ্য করতেন না। কতদিন এমন হয়েছে—ছুটি হয়েছে, বাড়ির পথ ধরেছি, সেখান থেকে তার ডাকে ফিরে এসেছি। তার সান্নিধ্যে এসে আমাদের মানসিকতা এমনভাবে গড়ে উঠেছিল যে, আমরা এতে কেউ বিরক্ত হতাম না। কর্তব্য মনে করেই ফিরে আসতাম। কখনও মনে হলে তিনি ছুটির দিনেও আমাদের ডেকে পাঠাতেন।
তিনি বলতেন, রোগীরা আমার মেহমান। তবে সে বেড়াতে আসেনি, তার কপাল খারাপ, তাই সে আমাদের কাছে এসেছে। আমাদের উচিত তাকে সাহায্য করা। তার ক্ষেত্রে বলা যায়, মহৎ মানুষের হৃদয় আকাশের চাইতে বড় আর সাগরের চাইতে গভীর হয়।
তার সময়ে ডায়াবেটিস আছে এবং চাকরি প্রয়োজন, সে সমস্ত ব্যক্তিকে ডায়াবেটিক হাসপাতালে চাকরি দিয়েছেন। এই কারণে অনেক রোগী চিকিৎসা নিতে এসে আমাদের প্রশ্ন করতেন—‘আপনার কি ডায়াবেটিস আছে? শুনেছি ডায়াবেটিস থাকলে সহজেই এখানে চাকরি হয়ে যায়।’ রোগীদের এ ধরনের কথায় লজ্জা পেতাম ঠিকই, কিন্তু এই ভেবে ভালো লাগত যে, তিনি বেকার ডায়াবেটিক রোগীদের কথা ভাবতেন বলেই আজ তারা এখানে চাকরি করে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন, জীবনকে নতুন করে ভাবতে শিখেছেন।
তিনিই প্রথম বলেছেন, নিয়ম-নীতি মেনে মনে চললে ডায়াবেটিস কোনো রোগই নয়। রোগীদের সমস্যা নিরূপণে সূক্ষ্মভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতেন। যাতে কোনো ভুল-ত্রুটি না হয়। তিনি বলতেন, আমরা গরিব হলেও সেবার মান নিম্ন হবে তা হতে পারে না। তিনি রোগীর ব্যবস্থাপত্রে অল্প ওষুধ দেওয়া পছন্দ করতেন।
বাংলাদেশের ডাক্তারদের মধ্যে ডা. মো. ইব্রাহিমই প্রথম জাতীয় অধ্যাপকের মর্যাদা পেয়েছেন। চিকিৎসাক্ষেত্রে তিনি একটি বিপ্লবের সূচনা করে গেছেন। যে রোগটি মানুষের অজানা ছিল, চিকিৎসাও ছিল না অথচ রোগটি মানুষের দেহে বাসা বেঁধে মানুষকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিত। সেই রোগ চিহ্নিত করে তার উপশমের ব্যবস্থা করে দিয়ে মানুষকে সুস্থভাবে বেঁচে থাকার পথ বাতলে দিয়েছেন। যদিও এটি সারাজীবনের রোগ তবুও একে নিয়ন্ত্রণে রেখে কর্মময় জীবনযাপন সম্ভব করে তুলেছিলেন।
তার জীবনযাপন প্রণালী বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, যারা মূর্খ, কোনো কালেই কিছু করবে না, তারাই শুধু বলে অসম্ভব। আসলে অসম্ভব বলে কিছু নেই—থাকতেও পারে না। যদি চেষ্টা থাকে, ইচ্ছা থাকে, মানুষ সে লক্ষ্যে পৌঁছুবেই। যত বাধা-বিপত্তিই আসুক না কেন, শাহবাগের বুকে দাঁড়িয়ে থাকা ১৬ তলা বিশিষ্ট বারডেম হাসপাতালের ইমারতটি তারই জ্বলন্ত প্রমাণ।
[লেখক: সাবেক চিফ নিউট্রিশন অফিসার ও বিভাগীয় প্রধান, বারডেম জেনারেল হাসপাতাল এবং সভাপতি, ডায়াবেটিস নিউট্রিশনিস্ট সোসাইটি অব বাংলাদেশ]

আপনার মতামত লিখুন