সংবাদ

নিরাপদ সড়ক প্রতিষ্ঠায় চাই সমন্বিত উদ্যোগ


গনি মিয়া বাবুল
গনি মিয়া বাবুল
প্রকাশ: ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৩৩ পিএম

নিরাপদ সড়ক প্রতিষ্ঠায় চাই সমন্বিত উদ্যোগ
ছবি: সংগৃহীত

দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। দেশের অর্থনীতি, শিল্প, কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং বাণিজ্যের প্রতিটি ক্ষেত্রই সড়ক পরিবহনের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। গত এক দশকে মহাসড়ক সম্প্রসারণ, সেতু নির্মাণ, এক্সপ্রেসওয়ে, উড়ালপথ এবং আঞ্চলিক সড়ক উন্নয়নের মাধ্যমে যোগাযোগ খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। কিন্তু অবকাঠামোগত এই উন্নয়নের পাশাপাশি একটি উদ্বেগজনক বাস্তবতা বারবার সামনে আসে, আর তা হলো সড়ক দুর্ঘটনা। প্রায় প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও প্রাণহানি, পঙ্গুত্ব কিংবা গুরুতর আহত হওয়ার খবর প্রকাশিত হচ্ছে। এসব দুর্ঘটনা কেবল কয়েকটি পরিসংখ্যান নয়; প্রতিটি ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি পরিবারের স্বপ্নভঙ্গ, অর্থনৈতিক বিপর্যয় এবং সমাজের অপূরণীয় ক্ষতি।

সড়ক দুর্ঘটনার অর্থনৈতিক ক্ষতিও অত্যন্ত ব্যাপক। দুর্ঘটনায় একজন কর্মক্ষম ব্যক্তি মারা গেলে বা স্থায়ীভাবে পঙ্গু হলে শুধু একটি পরিবার নয়, জাতীয় অর্থনীতিও ক্ষতির মুখে পড়ে। চিকিৎসা ব্যয়, উৎপাদনশীলতা হ্রাস, সম্পদের ক্ষতি, আইনি ব্যয় এবং দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক প্রভাব মিলিয়ে প্রতিবছর বিপুল অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, সড়ক দুর্ঘটনা একটি দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের উল্লেখযোগ্য অংশের সমপরিমাণ আর্থিক ক্ষতির কারণ হতে পারে।

সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় হলো, সড়ক দুর্ঘটনায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন সমাজের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী, শিক্ষার্থী, পথচারী এবং নিম্ন আয়ের মানুষ। অনেক শিশু তাদের বাবা-মাকে হারিয়ে এতিম হয়ে যায়, আবার অনেক পরিবার একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে। ফলে সড়ক দুর্ঘটনা শুধু একটি পরিবহন সমস্যা নয়; এটি একটি গভীর সামাজিক ও মানবিক সংকট।

সড়ক নিরাপত্তার প্রশ্নে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিতেও পরিবর্তন আনতে হবে। দুর্ঘটনাকে ভাগ্য বা নিয়তির বিষয় হিসেবে দেখার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে এসে এটিকে প্রতিরোধযোগ্য ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। কারণ বিশ্বের অনেক দেশ সঠিক পরিকল্পনা, কঠোর আইন প্রয়োগ, উন্নত প্রকৌশল, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং সচেতনতার মাধ্যমে সড়ক দুর্ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে। বাংলাদেশও চাইলে সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে পারে।

নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে প্রয়োজন সড়কের অবকাঠামো উন্নয়ন। দেশের অনেক মহাসড়ক ও আঞ্চলিক সড়কে এখনো ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক, ভাঙাচোরা অংশ, অপর্যাপ্ত আলোকসজ্জা, মানসম্মত সড়কচিহ্ন এবং লেন বিভাজনের অভাব রয়েছে। এসব ত্রুটি দ্রুত শনাক্ত করে আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী সংস্কার করতে হবে। নতুন সড়ক নির্মাণের সময় সড়ক নিরাপত্তা নিরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা উচিত। পাশাপাশি পথচারীদের জন্য ফুটপাত, ফুটওভার ব্রিজ, আন্ডারপাস, সাইকেল লেন এবং প্রতিবন্ধীবান্ধব অবকাঠামো নিশ্চিত করতে হবে।

চালকদের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং লাইসেন্সিং ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। একজন চালকের হাতে শুধু একটি গাড়ি নয়, বহু মানুষের জীবনও অর্পিত থাকে। তাই দক্ষতা যাচাই ছাড়া কোনোভাবেই গাড়ি চালানোর লাইসেন্স দেওয়া উচিত নয়। পেশাদার চালকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, স্বাস্থ্য পরীক্ষা, দৃষ্টিশক্তি পরীক্ষা এবং পুনঃপ্রশিক্ষণ কোর্স চালু করতে হবে। একই সঙ্গে দীর্ঘ সময় টানা গাড়ি চালানোর প্রবণতা বন্ধে কার্যকর নীতিমালা বাস্তবায়ন প্রয়োজন।

পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনাও সময়ের দাবি। যাত্রী পরিবহনে অতিরিক্ত গতি, প্রতিযোগিতামূলকভাবে যাত্রী ওঠানামা, অতিরিক্ত যাত্রী বহন এবং অনিয়মিত স্টপেজ ব্যবস্থাপনা দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। রুট পারমিট, ফিটনেস সনদ, চালকের লাইসেন্স এবং যানবাহনের কারিগরি সক্ষমতা নিয়মিত তদারকি করতে হবে। গণপরিবহন পরিচালনায় জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে পারলে দুর্ঘটনার হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।

আইনের কঠোর প্রয়োগ ছাড়া কোনো নিরাপত্তাব্যবস্থা কার্যকর হতে পারে না। সড়ক পরিবহন আইন বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধি করতে হবে। ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রভাব বিবেচনা না করে সমানভাবে ব্যবস্থা গ্রহণের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। অতিরিক্ত গতি, মাদক বা নেশাগ্রস্ত অবস্থায় গাড়ি চালানো, মুঠোফোন ব্যবহার, হেলমেট বা সিটবেল্ট ব্যবহার না করা এবং উল্টো পথে চলাচলের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করতে হবে।

প্রযুক্তির ব্যবহার সড়ক নিরাপত্তাব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করতে পারে। আধুনিক বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্মার্ট ট্রাফিক সিগন্যাল, সিসিটিভি ক্যামেরা, স্বয়ংক্রিয় নম্বরপ্লেট শনাক্তকরণ, গতিসীমা শনাক্তকারী ক্যামেরা এবং ইলেকট্রনিক জরিমানা ব্যবস্থা সফলভাবে দুর্ঘটনা ও আইন লঙ্ঘন কমিয়েছে। বাংলাদেশেও এসব প্রযুক্তির ব্যবহার আরও বিস্তৃত করতে হবে। একই সঙ্গে দুর্ঘটনার তথ্য সংরক্ষণ, বিশ্লেষণ এবং গবেষণার জন্য একটি সমন্বিত জাতীয় তথ্যভান্ডার গড়ে তোলা প্রয়োজন, যাতে তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সম্ভব হয়।

সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শিক্ষারও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। শিশুদের ছোটবেলা থেকেই ট্রাফিক আইন, পথচারীর আচরণ, সাইকেল চালানোর নিয়ম এবং নিরাপদ সড়ক ব্যবহারের শিক্ষা দিতে হবে। প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত পাঠ্যক্রমে সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে বাস্তবভিত্তিক পাঠ অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। বিদ্যালয়ভিত্তিক সচেতনতামূলক কার্যক্রম, ট্রাফিক ক্লাব এবং নিরাপদ সড়ক বিষয়ক কর্মসূচি শিক্ষার্থীদের দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে সহায়ক হবে।

সড়কের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নাগরিক সমাজ, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং সামাজিক আন্দোলনের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন সংগঠন নিরাপদ সড়কের দাবিতে জনসচেতনতা সৃষ্টি, গবেষণা, প্রশিক্ষণ এবং নীতিগত সুপারিশ প্রদান করে আসছে। এই ধরনের উদ্যোগকে রাষ্ট্রীয় সহযোগিতা ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া হলে জনসম্পৃক্ততা আরও বৃদ্ধি পাবে। কারণ সড়ক নিরাপত্তা কেবল সরকারের দায়িত্ব নয়; এটি একটি জাতীয় সামাজিক আন্দোলনের বিষয়।

দুর্ঘটনার পর দ্রুত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করাও মৃত্যুহার কমানোর অন্যতম কার্যকর উপায়। দেশের মহাসড়কগুলোতে পর্যাপ্ত অ্যাম্বুলেন্স, ট্রমা কেয়ার সেন্টার, জরুরি উদ্ধার ইউনিট এবং প্রশিক্ষিত উদ্ধারকর্মী নিয়োজিত করতে হবে। দুর্ঘটনার পর প্রথম এক ঘণ্টাকে স্বর্ণঘণ্টা বলা হয়। এই সময়ের মধ্যে যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে অসংখ্য প্রাণ রক্ষা করা সম্ভব।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সড়ক দুর্ঘটনাকে ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দেওয়া যাবে না। বিশ্বের বহু দেশ পরিকল্পিত উদ্যোগ, কঠোর আইন প্রয়োগ, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং জনসচেতনতার মাধ্যমে সড়ক দুর্ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে এনেছে। বাংলাদেশও চাইলে সেই পথ অনুসরণ করতে পারে। এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা।

[লেখক: যুগ্মমহাসচিব, নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা), কেন্দ্রীয় কমিটি]

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

সোমবার, ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬


নিরাপদ সড়ক প্রতিষ্ঠায় চাই সমন্বিত উদ্যোগ

প্রকাশের তারিখ : ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। দেশের অর্থনীতি, শিল্প, কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং বাণিজ্যের প্রতিটি ক্ষেত্রই সড়ক পরিবহনের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। গত এক দশকে মহাসড়ক সম্প্রসারণ, সেতু নির্মাণ, এক্সপ্রেসওয়ে, উড়ালপথ এবং আঞ্চলিক সড়ক উন্নয়নের মাধ্যমে যোগাযোগ খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। কিন্তু অবকাঠামোগত এই উন্নয়নের পাশাপাশি একটি উদ্বেগজনক বাস্তবতা বারবার সামনে আসে, আর তা হলো সড়ক দুর্ঘটনা। প্রায় প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও প্রাণহানি, পঙ্গুত্ব কিংবা গুরুতর আহত হওয়ার খবর প্রকাশিত হচ্ছে। এসব দুর্ঘটনা কেবল কয়েকটি পরিসংখ্যান নয়; প্রতিটি ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি পরিবারের স্বপ্নভঙ্গ, অর্থনৈতিক বিপর্যয় এবং সমাজের অপূরণীয় ক্ষতি।

সড়ক দুর্ঘটনার অর্থনৈতিক ক্ষতিও অত্যন্ত ব্যাপক। দুর্ঘটনায় একজন কর্মক্ষম ব্যক্তি মারা গেলে বা স্থায়ীভাবে পঙ্গু হলে শুধু একটি পরিবার নয়, জাতীয় অর্থনীতিও ক্ষতির মুখে পড়ে। চিকিৎসা ব্যয়, উৎপাদনশীলতা হ্রাস, সম্পদের ক্ষতি, আইনি ব্যয় এবং দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক প্রভাব মিলিয়ে প্রতিবছর বিপুল অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, সড়ক দুর্ঘটনা একটি দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের উল্লেখযোগ্য অংশের সমপরিমাণ আর্থিক ক্ষতির কারণ হতে পারে।

সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় হলো, সড়ক দুর্ঘটনায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন সমাজের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী, শিক্ষার্থী, পথচারী এবং নিম্ন আয়ের মানুষ। অনেক শিশু তাদের বাবা-মাকে হারিয়ে এতিম হয়ে যায়, আবার অনেক পরিবার একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে। ফলে সড়ক দুর্ঘটনা শুধু একটি পরিবহন সমস্যা নয়; এটি একটি গভীর সামাজিক ও মানবিক সংকট।

সড়ক নিরাপত্তার প্রশ্নে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিতেও পরিবর্তন আনতে হবে। দুর্ঘটনাকে ভাগ্য বা নিয়তির বিষয় হিসেবে দেখার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে এসে এটিকে প্রতিরোধযোগ্য ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। কারণ বিশ্বের অনেক দেশ সঠিক পরিকল্পনা, কঠোর আইন প্রয়োগ, উন্নত প্রকৌশল, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং সচেতনতার মাধ্যমে সড়ক দুর্ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে। বাংলাদেশও চাইলে সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে পারে।



নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে প্রয়োজন সড়কের অবকাঠামো উন্নয়ন। দেশের অনেক মহাসড়ক ও আঞ্চলিক সড়কে এখনো ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক, ভাঙাচোরা অংশ, অপর্যাপ্ত আলোকসজ্জা, মানসম্মত সড়কচিহ্ন এবং লেন বিভাজনের অভাব রয়েছে। এসব ত্রুটি দ্রুত শনাক্ত করে আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী সংস্কার করতে হবে। নতুন সড়ক নির্মাণের সময় সড়ক নিরাপত্তা নিরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা উচিত। পাশাপাশি পথচারীদের জন্য ফুটপাত, ফুটওভার ব্রিজ, আন্ডারপাস, সাইকেল লেন এবং প্রতিবন্ধীবান্ধব অবকাঠামো নিশ্চিত করতে হবে।

চালকদের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং লাইসেন্সিং ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। একজন চালকের হাতে শুধু একটি গাড়ি নয়, বহু মানুষের জীবনও অর্পিত থাকে। তাই দক্ষতা যাচাই ছাড়া কোনোভাবেই গাড়ি চালানোর লাইসেন্স দেওয়া উচিত নয়। পেশাদার চালকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, স্বাস্থ্য পরীক্ষা, দৃষ্টিশক্তি পরীক্ষা এবং পুনঃপ্রশিক্ষণ কোর্স চালু করতে হবে। একই সঙ্গে দীর্ঘ সময় টানা গাড়ি চালানোর প্রবণতা বন্ধে কার্যকর নীতিমালা বাস্তবায়ন প্রয়োজন।

পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনাও সময়ের দাবি। যাত্রী পরিবহনে অতিরিক্ত গতি, প্রতিযোগিতামূলকভাবে যাত্রী ওঠানামা, অতিরিক্ত যাত্রী বহন এবং অনিয়মিত স্টপেজ ব্যবস্থাপনা দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। রুট পারমিট, ফিটনেস সনদ, চালকের লাইসেন্স এবং যানবাহনের কারিগরি সক্ষমতা নিয়মিত তদারকি করতে হবে। গণপরিবহন পরিচালনায় জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে পারলে দুর্ঘটনার হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।

আইনের কঠোর প্রয়োগ ছাড়া কোনো নিরাপত্তাব্যবস্থা কার্যকর হতে পারে না। সড়ক পরিবহন আইন বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধি করতে হবে। ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রভাব বিবেচনা না করে সমানভাবে ব্যবস্থা গ্রহণের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। অতিরিক্ত গতি, মাদক বা নেশাগ্রস্ত অবস্থায় গাড়ি চালানো, মুঠোফোন ব্যবহার, হেলমেট বা সিটবেল্ট ব্যবহার না করা এবং উল্টো পথে চলাচলের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করতে হবে।

প্রযুক্তির ব্যবহার সড়ক নিরাপত্তাব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করতে পারে। আধুনিক বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্মার্ট ট্রাফিক সিগন্যাল, সিসিটিভি ক্যামেরা, স্বয়ংক্রিয় নম্বরপ্লেট শনাক্তকরণ, গতিসীমা শনাক্তকারী ক্যামেরা এবং ইলেকট্রনিক জরিমানা ব্যবস্থা সফলভাবে দুর্ঘটনা ও আইন লঙ্ঘন কমিয়েছে। বাংলাদেশেও এসব প্রযুক্তির ব্যবহার আরও বিস্তৃত করতে হবে। একই সঙ্গে দুর্ঘটনার তথ্য সংরক্ষণ, বিশ্লেষণ এবং গবেষণার জন্য একটি সমন্বিত জাতীয় তথ্যভান্ডার গড়ে তোলা প্রয়োজন, যাতে তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সম্ভব হয়।

সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শিক্ষারও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। শিশুদের ছোটবেলা থেকেই ট্রাফিক আইন, পথচারীর আচরণ, সাইকেল চালানোর নিয়ম এবং নিরাপদ সড়ক ব্যবহারের শিক্ষা দিতে হবে। প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত পাঠ্যক্রমে সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে বাস্তবভিত্তিক পাঠ অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। বিদ্যালয়ভিত্তিক সচেতনতামূলক কার্যক্রম, ট্রাফিক ক্লাব এবং নিরাপদ সড়ক বিষয়ক কর্মসূচি শিক্ষার্থীদের দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে সহায়ক হবে।

সড়কের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নাগরিক সমাজ, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং সামাজিক আন্দোলনের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন সংগঠন নিরাপদ সড়কের দাবিতে জনসচেতনতা সৃষ্টি, গবেষণা, প্রশিক্ষণ এবং নীতিগত সুপারিশ প্রদান করে আসছে। এই ধরনের উদ্যোগকে রাষ্ট্রীয় সহযোগিতা ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া হলে জনসম্পৃক্ততা আরও বৃদ্ধি পাবে। কারণ সড়ক নিরাপত্তা কেবল সরকারের দায়িত্ব নয়; এটি একটি জাতীয় সামাজিক আন্দোলনের বিষয়।

দুর্ঘটনার পর দ্রুত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করাও মৃত্যুহার কমানোর অন্যতম কার্যকর উপায়। দেশের মহাসড়কগুলোতে পর্যাপ্ত অ্যাম্বুলেন্স, ট্রমা কেয়ার সেন্টার, জরুরি উদ্ধার ইউনিট এবং প্রশিক্ষিত উদ্ধারকর্মী নিয়োজিত করতে হবে। দুর্ঘটনার পর প্রথম এক ঘণ্টাকে স্বর্ণঘণ্টা বলা হয়। এই সময়ের মধ্যে যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে অসংখ্য প্রাণ রক্ষা করা সম্ভব।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সড়ক দুর্ঘটনাকে ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দেওয়া যাবে না। বিশ্বের বহু দেশ পরিকল্পিত উদ্যোগ, কঠোর আইন প্রয়োগ, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং জনসচেতনতার মাধ্যমে সড়ক দুর্ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে এনেছে। বাংলাদেশও চাইলে সেই পথ অনুসরণ করতে পারে। এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা।

[লেখক: যুগ্মমহাসচিব, নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা), কেন্দ্রীয় কমিটি]


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত