বিদ্যুৎ সংকটের ফলে তীব্র গরমে ও লোডশেডিংয়ের যন্ত্রণায় জনজীবন সম্পূর্ণ বেহাল। অন্যদিকে বাজারের অনিয়ন্ত্রিত মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের পিঠ দেয়ালে ঠেকিয়ে দিয়েছে। আইনশৃঙ্খলাজনিত পরিস্থিতিও খুবই উদ্বেগজনক। বেপরোয়াভাবে চলছে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, খুন। অন্যদিকে চলছে বেপরোয়া দলবাজি ও চাঁদাবাজি। এই দলবাজরা দলকেও ভয় পায় না। ‘দখলদারিত্বই প্রথম’ — এই নীতি বাস্তবায়নে তারা মরিয়া।
তবে আমাদের বিমানভাগ্য চমৎকার! তীব্র জ্বালানি সংকটের এই সময়ে আপাতত ১৪টি বোয়িং আসছে মার্কিন মুলুক থেকে। এরপরে আরো আসবে, আসতেই থাকবে। দেশবাসীর উপর ‘দয়াপরবশ’ হয়ে এক বাণিজ্য চুক্তি করে মুহাম্মদ ইউনূস বিমানে চড়ার এ ধরনের সুব্যবস্থা করে গেছেন। দেশবাসীর এই উপকার করতে নির্বাচনের তিনদিন আগে দেশের স্বার্থবিরোধী বাণিজ্য চুক্তি করার বিষয়ে তিনি নাকি বিএনপি, জামায়াত এবং তার নিজের তরুণ তুর্কি দলের সম্মতিও নিয়ে নিয়েছিলেন। সারা দুনিয়াকে অস্থিতিশীল করায় পারঙ্গম ট্রাম্পও গদগদ হয়ে আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে এজন্য অভিনন্দন জানিয়ে বলেছেন শীঘ্রই দুজনের সাক্ষাৎ হবে। আর দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত এবং ভারতে দেশটির রাষ্ট্রদূত সার্জিও গর তার পোস্টে লিখেছেন, ‘এ সপ্তাহেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী আরেকটি অভূতপূর্ব চুক্তি করেছেন, যেখানে বাংলাদেশ বোয়িংয়ের উড়োজাহাজ কেনার জন্য বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যা তাদের আগের অর্ডারের চেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বেশি।’ অর্থাৎ আরো আসবে। অন্যদিকে গ্যাস সংকটে মানুষের বাসায় চুলা জ্বলে না, বিদ্যুতের অভাবে আলো জ্বলে না। অনেকে রাত দুইটা-তিনটার সময় পরবর্তী দিনের রান্না করেন। হাসপাতালের চিকিৎসা চলছে মুঠোফোনের আলোয়। আর আমরা সবাই বোয়িং স্বপ্নে বিভোর!
এ দুর্বিষহ পরিস্থিতিতে জনপরিসরে অস্বস্তি, অস্থিরতা এবং ক্ষোভ বাড়লেও এসব সমস্যার একটা সুরাহা করতে সরকারকে আরো কিছুটা সময় হয়তোবা মানুষ দেবে। তবে অনন্তকাল তো মানুষ অপেক্ষা করবে না। অন্যদিকে দেশে শান্তি, স্থিতিশীলতা, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে কোনো অগ্রগতি না দেখে বিশেষত এ সব বিষয়ে সদিচ্ছার প্রতিফলন না দেখে মানুষ আরো বেশি হতাশ ও উদ্বিগ্ন। মনে রাখা প্রয়োজন জুলাইয়ের কোটা আন্দোলন সরকার উৎখাতের আন্দোলনে পরিণত হওয়ার অন্যতম কারণ ছিল দীর্ঘ সময় যাবৎ দেশের বুকে আইনের শাসনের অনুপস্থিতি এবং বিচারহীনতা — যা বিক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষকেও রাজপথে টেনে আনে।
প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন অবশ্য বলেছেন, “গত ছয় মাসে বাকস্বাধীনতা, আইনের শাসন এবং মানবাধিকারের ক্ষেত্রে আমরা সর্বোচ্চ মানবিকতা দেখেছি। একটি বারের জন্য কখনো কোনো রাজনৈতিক নিপীড়ন ঘটেনি।” সরকারি প্রেস ব্রিফিং-এ এমনটা বলাই স্বাভাবিক, এটাই রেওয়াজ। কিন্তু বাস্তবে এ ছয় মাসে বাকস্বাধীনতা, আইনের শাসন এবং মানবাধিকারের ক্ষেত্রে ইউনূস আমল অপেক্ষা কি কোনো অগ্রগতি আছে? বরং সবকিছু দেখে শুনে মনে হয়, এ সব ক্ষেত্রে ইউনূস আমলের ধারাবাহিকতাই চলছে। একমাত্র ব্যতিক্রম নাগরিক আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে দেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত করা। তবে তাতে তো আর জনজীবনের সংকট ও আইনের শাসনের যে অভাব তার সুরাহা হবে না।
কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলের সাথে সম্পর্ক আছে বা ছিল এ ফালতু অভিযোগে গ্রেফতার, আটক তো পূর্বের মতোই অব্যাহত আছে এবং আগের মতোই এখনো জুড়ে দেওয়া হচ্ছে বহুল আলোচিত তথাকথিত খুনের মামলা। আর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে যে হাস্যকর খুনের মামলায় বছরের পর বছর রাজনীতিক, সাংবাদিক, অভিনেতা, আমলা, বিচারপতিরা আটক আছেন — এক মামলায় জামিন পেলেও ভিন্ন আরেকটি সাজানো মামলায় শ্যোন অ্যারেস্ট দেখানো হয় — ইউনূস আমলের সেই নিবর্তনমূলক ব্যবস্থা অব্যাহত আছে। মানুষ আশা করেছিল নির্বাচিত সরকার আসার পরে এ ধরনের সাজানো খুনের মামলাগুলো প্রত্যাহার ও আইনানুগভাবে নিষ্পত্তি করা হবে। তা না করায় পরিস্থিতি অস্থিতিশীলই থাকছে।
প্রবীণ রাজনীতিবিদ রাশেদ খান মেননের নামে ঢাকা শহরের বিভিন্ন থানায় একাধিক হত্যা মামলা দায়ের করে এখন আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে বিচারকার্য চালানো হচ্ছে। হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধেও ঢাকা ও কুষ্টিয়ার একাধিক থানায় বেশ কয়েকটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং আইসিটিতে ইতোমধ্যে সাজাও দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সবাই জানে ২০২৪ সালের মন্ত্রিসভায় তারা ছিলেন না, সরকারের নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রেও তাদের ভূমিকা ছিল না। আওয়ামী লীগ সরকারের পক্ষে ‘লিপ সার্ভিস’ দেওয়া ছাড়া ভিন্ন কোনো ক্ষমতা জোটের কোনো শরিকদের দীর্ঘদিন যাবৎ ছিল না। শুধুমাত্র নিরবচ্ছিন্নভাবে জামায়াত ও জঙ্গিবাদের কঠোর সমালোচনা করায় এবং জুলাই আন্দোলনের বিরোধিতা করায় ইউনূস আমলে তাদেরকে আটক করে খুনের মামলা জুড়ে দেওয়া হয়। বিএনপির সাথে জামায়াতের ক্ষমতাকেন্দ্রিক ঘনিষ্ঠতা থাকায় তারা দু’জনেই কঠোর ভাষায় বিএনপিরও সমালোচনা করতেন। তাই আজ বিএনপি আমলেও তাদের উপর ইউনূসীয় প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধ অব্যাহত আছে। আওয়ামী লীগ নেত্রী ডাঃ দীপু মনির বিরুদ্ধে প্রায় ৭০টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলার সংখ্যার বহর দেখেই বোঝা যায় তিনি আইনের আওতায় নয়, প্রতিশোধের আওতায় আছেন। আইনের সঠিক প্রয়োগ থাকলে এতদিনে অন্তত আসাদুজ্জামান নূর জামিন পেতেন। ঢাকা সহ সারা দেশে হাজারে হাজারে রাজনৈতিক নেতাকর্মী আটক আছেন এবং তাদেরকে জামিনের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে।
এ কথা ঠিক গ্রেপ্তারকৃত অনেকেই জুলাই আন্দোলনে সরকারের কঠোর বলপ্রয়োগ এবং হত্যাযজ্ঞের নিন্দা না করে বরং নিপীড়নকে বৈধতা দেওয়ার প্রচেষ্টা নেওয়ায়, এ রক্তাক্ত ঘটনার নৈতিক দায় এড়াতে পারবেন না। বিরোধী দলবিহীন একতরফা নির্বাচনে অংশ নিয়ে বা সমর্থন করে বা আয়োজনে সহযোগিতা করে তারা নৈতিক বা প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন। সেসব ধিকৃত ঘটনার সমালোচনা এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে আইনানুগ শাস্তিও জরুরি। তবে মনে রাখা প্রয়োজন ফৌজদারি অপরাধ এবং নৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার সুস্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। আওয়ামী শাসনামলকে সমর্থন করা বা আওয়ামী লীগ দলের নেতাকর্মী হওয়া তো ফৌজদারি অপরাধ নয়। ফৌজদারি দায়বদ্ধতা অবশ্যই অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের উপযুক্ত প্রমাণের ওপর ভিত্তি করেই হতে হয় — ঢালাও হত্যা মামলা বা দুদকের নোটিশ ধরিয়ে দিলেই তা প্রমাণিত হয় না।
রাজনৈতিক কারণে মামলা, নিবর্তনমূলক আটক এবং আইনের অসম প্রয়োগ বা অপপ্রয়োগ বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থাকে বহুদিন ধরেই ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। ২০২৪-এ যে তারুণ্যের জাগরণ আমরা দেখেছি তা আমাদের প্রাথমিকভাবে আশ্বস্ত করেছিল যে, বিভাজনের বাংলাদেশকে পেছনে রেখে বৈষম্যমুক্ত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ এবং সুশাসনের পথে দেশ অগ্রসর হবে। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারে ক্ষমতার অংশীদার হওয়ার সুযোগে তরুণ নেতৃত্বের একাংশ ধর্মীয় উগ্রবাদীদের সাথে গাঁটছড়া বেঁধে প্রতিহিংসায় উন্মত্ত হয়ে ওঠায় সাধারণ শিক্ষার্থী আর তরুণদের দেয়ালে আঁকা স্বপ্নগুলো হারিয়ে যেতে থাকল এবং শুরুতেই ভবিষ্যৎ গণতান্ত্রিক যাত্রা সংকটের সম্মুখীন হয়। মানুষের মনের প্রত্যাশা দুরাশায় পরিণত হয়।
তবে নির্বাচনের সময় থেকে বিএনপির শীর্ষ নেতারা বলে আসছিলেন যে, এক উদার গণতান্ত্রিক সমাজ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়ার জন্য তাদের হাতে ‘প্ল্যান’ রয়েছে। কিন্তু ক্ষমতার সমীকরণে সে সব ‘প্ল্যান’ আর অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবস্থা এবং সাম্য, সুবিচার ও সুশাসন অধরাই রয়ে যাচ্ছে। অপরাধ করলে তার শাস্তি হওয়া উচিত। এটা সভ্য সমাজের রীতি। কিন্তু সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়া এক একটি হত্যা বা হত্যা প্রচেষ্টা মামলায় শতাধিক সন্দেহভাজন ব্যক্তির নাম উল্লেখ করে বছরের পর বছর তাদের জেলে পুরে রাখা অবিচারের নামান্তর। অন্যদিকে কারো কারো ক্ষেত্রে সরকারি উদ্যোগে প্রথমে মিডিয়া ট্রায়াল, অতঃপর ট্রাইব্যুনালে বিচারকার্য চলছে। এসব দেখে ইতোমধ্যে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, আইসিটি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। আর বিচারের ক্ষেত্রে ন্যায্যতার কোনো লক্ষণ না দেখে টিআইবি যথাযথভাবেই প্রশ্ন উত্থাপন করেছে যে ‘কর্তৃত্ববাদী শাসনামলের নির্মম ও বহুমাত্রিক মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিজ্ঞতা থেকে সরকার আদৌ কিছু শিখেছে কি না?’
(লেখকের নিজস্ব মত)
[লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা]

সোমবার, ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বিদ্যুৎ সংকটের ফলে তীব্র গরমে ও লোডশেডিংয়ের যন্ত্রণায় জনজীবন সম্পূর্ণ বেহাল। অন্যদিকে বাজারের অনিয়ন্ত্রিত মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের পিঠ দেয়ালে ঠেকিয়ে দিয়েছে। আইনশৃঙ্খলাজনিত পরিস্থিতিও খুবই উদ্বেগজনক। বেপরোয়াভাবে চলছে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, খুন। অন্যদিকে চলছে বেপরোয়া দলবাজি ও চাঁদাবাজি। এই দলবাজরা দলকেও ভয় পায় না। ‘দখলদারিত্বই প্রথম’ — এই নীতি বাস্তবায়নে তারা মরিয়া।
তবে আমাদের বিমানভাগ্য চমৎকার! তীব্র জ্বালানি সংকটের এই সময়ে আপাতত ১৪টি বোয়িং আসছে মার্কিন মুলুক থেকে। এরপরে আরো আসবে, আসতেই থাকবে। দেশবাসীর উপর ‘দয়াপরবশ’ হয়ে এক বাণিজ্য চুক্তি করে মুহাম্মদ ইউনূস বিমানে চড়ার এ ধরনের সুব্যবস্থা করে গেছেন। দেশবাসীর এই উপকার করতে নির্বাচনের তিনদিন আগে দেশের স্বার্থবিরোধী বাণিজ্য চুক্তি করার বিষয়ে তিনি নাকি বিএনপি, জামায়াত এবং তার নিজের তরুণ তুর্কি দলের সম্মতিও নিয়ে নিয়েছিলেন। সারা দুনিয়াকে অস্থিতিশীল করায় পারঙ্গম ট্রাম্পও গদগদ হয়ে আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে এজন্য অভিনন্দন জানিয়ে বলেছেন শীঘ্রই দুজনের সাক্ষাৎ হবে। আর দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত এবং ভারতে দেশটির রাষ্ট্রদূত সার্জিও গর তার পোস্টে লিখেছেন, ‘এ সপ্তাহেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী আরেকটি অভূতপূর্ব চুক্তি করেছেন, যেখানে বাংলাদেশ বোয়িংয়ের উড়োজাহাজ কেনার জন্য বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যা তাদের আগের অর্ডারের চেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বেশি।’ অর্থাৎ আরো আসবে। অন্যদিকে গ্যাস সংকটে মানুষের বাসায় চুলা জ্বলে না, বিদ্যুতের অভাবে আলো জ্বলে না। অনেকে রাত দুইটা-তিনটার সময় পরবর্তী দিনের রান্না করেন। হাসপাতালের চিকিৎসা চলছে মুঠোফোনের আলোয়। আর আমরা সবাই বোয়িং স্বপ্নে বিভোর!
এ দুর্বিষহ পরিস্থিতিতে জনপরিসরে অস্বস্তি, অস্থিরতা এবং ক্ষোভ বাড়লেও এসব সমস্যার একটা সুরাহা করতে সরকারকে আরো কিছুটা সময় হয়তোবা মানুষ দেবে। তবে অনন্তকাল তো মানুষ অপেক্ষা করবে না। অন্যদিকে দেশে শান্তি, স্থিতিশীলতা, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে কোনো অগ্রগতি না দেখে বিশেষত এ সব বিষয়ে সদিচ্ছার প্রতিফলন না দেখে মানুষ আরো বেশি হতাশ ও উদ্বিগ্ন। মনে রাখা প্রয়োজন জুলাইয়ের কোটা আন্দোলন সরকার উৎখাতের আন্দোলনে পরিণত হওয়ার অন্যতম কারণ ছিল দীর্ঘ সময় যাবৎ দেশের বুকে আইনের শাসনের অনুপস্থিতি এবং বিচারহীনতা — যা বিক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষকেও রাজপথে টেনে আনে।
প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন অবশ্য বলেছেন, “গত ছয় মাসে বাকস্বাধীনতা, আইনের শাসন এবং মানবাধিকারের ক্ষেত্রে আমরা সর্বোচ্চ মানবিকতা দেখেছি। একটি বারের জন্য কখনো কোনো রাজনৈতিক নিপীড়ন ঘটেনি।” সরকারি প্রেস ব্রিফিং-এ এমনটা বলাই স্বাভাবিক, এটাই রেওয়াজ। কিন্তু বাস্তবে এ ছয় মাসে বাকস্বাধীনতা, আইনের শাসন এবং মানবাধিকারের ক্ষেত্রে ইউনূস আমল অপেক্ষা কি কোনো অগ্রগতি আছে? বরং সবকিছু দেখে শুনে মনে হয়, এ সব ক্ষেত্রে ইউনূস আমলের ধারাবাহিকতাই চলছে। একমাত্র ব্যতিক্রম নাগরিক আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে দেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত করা। তবে তাতে তো আর জনজীবনের সংকট ও আইনের শাসনের যে অভাব তার সুরাহা হবে না।
কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলের সাথে সম্পর্ক আছে বা ছিল এ ফালতু অভিযোগে গ্রেফতার, আটক তো পূর্বের মতোই অব্যাহত আছে এবং আগের মতোই এখনো জুড়ে দেওয়া হচ্ছে বহুল আলোচিত তথাকথিত খুনের মামলা। আর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে যে হাস্যকর খুনের মামলায় বছরের পর বছর রাজনীতিক, সাংবাদিক, অভিনেতা, আমলা, বিচারপতিরা আটক আছেন — এক মামলায় জামিন পেলেও ভিন্ন আরেকটি সাজানো মামলায় শ্যোন অ্যারেস্ট দেখানো হয় — ইউনূস আমলের সেই নিবর্তনমূলক ব্যবস্থা অব্যাহত আছে। মানুষ আশা করেছিল নির্বাচিত সরকার আসার পরে এ ধরনের সাজানো খুনের মামলাগুলো প্রত্যাহার ও আইনানুগভাবে নিষ্পত্তি করা হবে। তা না করায় পরিস্থিতি অস্থিতিশীলই থাকছে।
প্রবীণ রাজনীতিবিদ রাশেদ খান মেননের নামে ঢাকা শহরের বিভিন্ন থানায় একাধিক হত্যা মামলা দায়ের করে এখন আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে বিচারকার্য চালানো হচ্ছে। হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধেও ঢাকা ও কুষ্টিয়ার একাধিক থানায় বেশ কয়েকটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং আইসিটিতে ইতোমধ্যে সাজাও দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সবাই জানে ২০২৪ সালের মন্ত্রিসভায় তারা ছিলেন না, সরকারের নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রেও তাদের ভূমিকা ছিল না। আওয়ামী লীগ সরকারের পক্ষে ‘লিপ সার্ভিস’ দেওয়া ছাড়া ভিন্ন কোনো ক্ষমতা জোটের কোনো শরিকদের দীর্ঘদিন যাবৎ ছিল না। শুধুমাত্র নিরবচ্ছিন্নভাবে জামায়াত ও জঙ্গিবাদের কঠোর সমালোচনা করায় এবং জুলাই আন্দোলনের বিরোধিতা করায় ইউনূস আমলে তাদেরকে আটক করে খুনের মামলা জুড়ে দেওয়া হয়। বিএনপির সাথে জামায়াতের ক্ষমতাকেন্দ্রিক ঘনিষ্ঠতা থাকায় তারা দু’জনেই কঠোর ভাষায় বিএনপিরও সমালোচনা করতেন। তাই আজ বিএনপি আমলেও তাদের উপর ইউনূসীয় প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধ অব্যাহত আছে। আওয়ামী লীগ নেত্রী ডাঃ দীপু মনির বিরুদ্ধে প্রায় ৭০টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলার সংখ্যার বহর দেখেই বোঝা যায় তিনি আইনের আওতায় নয়, প্রতিশোধের আওতায় আছেন। আইনের সঠিক প্রয়োগ থাকলে এতদিনে অন্তত আসাদুজ্জামান নূর জামিন পেতেন। ঢাকা সহ সারা দেশে হাজারে হাজারে রাজনৈতিক নেতাকর্মী আটক আছেন এবং তাদেরকে জামিনের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে।
এ কথা ঠিক গ্রেপ্তারকৃত অনেকেই জুলাই আন্দোলনে সরকারের কঠোর বলপ্রয়োগ এবং হত্যাযজ্ঞের নিন্দা না করে বরং নিপীড়নকে বৈধতা দেওয়ার প্রচেষ্টা নেওয়ায়, এ রক্তাক্ত ঘটনার নৈতিক দায় এড়াতে পারবেন না। বিরোধী দলবিহীন একতরফা নির্বাচনে অংশ নিয়ে বা সমর্থন করে বা আয়োজনে সহযোগিতা করে তারা নৈতিক বা প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন। সেসব ধিকৃত ঘটনার সমালোচনা এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে আইনানুগ শাস্তিও জরুরি। তবে মনে রাখা প্রয়োজন ফৌজদারি অপরাধ এবং নৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার সুস্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। আওয়ামী শাসনামলকে সমর্থন করা বা আওয়ামী লীগ দলের নেতাকর্মী হওয়া তো ফৌজদারি অপরাধ নয়। ফৌজদারি দায়বদ্ধতা অবশ্যই অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের উপযুক্ত প্রমাণের ওপর ভিত্তি করেই হতে হয় — ঢালাও হত্যা মামলা বা দুদকের নোটিশ ধরিয়ে দিলেই তা প্রমাণিত হয় না।
রাজনৈতিক কারণে মামলা, নিবর্তনমূলক আটক এবং আইনের অসম প্রয়োগ বা অপপ্রয়োগ বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থাকে বহুদিন ধরেই ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। ২০২৪-এ যে তারুণ্যের জাগরণ আমরা দেখেছি তা আমাদের প্রাথমিকভাবে আশ্বস্ত করেছিল যে, বিভাজনের বাংলাদেশকে পেছনে রেখে বৈষম্যমুক্ত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ এবং সুশাসনের পথে দেশ অগ্রসর হবে। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারে ক্ষমতার অংশীদার হওয়ার সুযোগে তরুণ নেতৃত্বের একাংশ ধর্মীয় উগ্রবাদীদের সাথে গাঁটছড়া বেঁধে প্রতিহিংসায় উন্মত্ত হয়ে ওঠায় সাধারণ শিক্ষার্থী আর তরুণদের দেয়ালে আঁকা স্বপ্নগুলো হারিয়ে যেতে থাকল এবং শুরুতেই ভবিষ্যৎ গণতান্ত্রিক যাত্রা সংকটের সম্মুখীন হয়। মানুষের মনের প্রত্যাশা দুরাশায় পরিণত হয়।
তবে নির্বাচনের সময় থেকে বিএনপির শীর্ষ নেতারা বলে আসছিলেন যে, এক উদার গণতান্ত্রিক সমাজ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়ার জন্য তাদের হাতে ‘প্ল্যান’ রয়েছে। কিন্তু ক্ষমতার সমীকরণে সে সব ‘প্ল্যান’ আর অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবস্থা এবং সাম্য, সুবিচার ও সুশাসন অধরাই রয়ে যাচ্ছে। অপরাধ করলে তার শাস্তি হওয়া উচিত। এটা সভ্য সমাজের রীতি। কিন্তু সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়া এক একটি হত্যা বা হত্যা প্রচেষ্টা মামলায় শতাধিক সন্দেহভাজন ব্যক্তির নাম উল্লেখ করে বছরের পর বছর তাদের জেলে পুরে রাখা অবিচারের নামান্তর। অন্যদিকে কারো কারো ক্ষেত্রে সরকারি উদ্যোগে প্রথমে মিডিয়া ট্রায়াল, অতঃপর ট্রাইব্যুনালে বিচারকার্য চলছে। এসব দেখে ইতোমধ্যে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, আইসিটি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। আর বিচারের ক্ষেত্রে ন্যায্যতার কোনো লক্ষণ না দেখে টিআইবি যথাযথভাবেই প্রশ্ন উত্থাপন করেছে যে ‘কর্তৃত্ববাদী শাসনামলের নির্মম ও বহুমাত্রিক মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিজ্ঞতা থেকে সরকার আদৌ কিছু শিখেছে কি না?’
(লেখকের নিজস্ব মত)
[লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা]

আপনার মতামত লিখুন