সংবাদ

পিংক বাস ও নিরাপদ গণপরিবহনের চ্যালেঞ্জ


সানজিদা নওরীন ঝিনুক
সানজিদা নওরীন ঝিনুক
প্রকাশ: ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:০৫ এএম

পিংক বাস ও নিরাপদ গণপরিবহনের চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশে একজন নারীর নিরাপদে চলাচলের অধিকার এখনো অনেকাংশে তার সামাজিক পরিচয়, পোশাক, বৈবাহিক অবস্থা কিংবা পারিবারিক অবস্থানের সঙ্গে অদৃশ্যভাবে জড়িয়ে আছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বদলে বহু ক্ষেত্রে সমাজ নারীকেই নিরাপদ থাকার দায় চাপিয়ে দেয়। গণপরিবহনেও এর ব্যতিক্রম নেই। ফলে নারীদের জন্য আলাদা বাস চালুর উদ্যোগ নিঃসন্দেহে স্বস্তিদায়ক একটি পদক্ষেপ হলেও এর বাস্তবায়ন ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলা জরুরি।

১৯ আগস্ট ঢাকায় নারীদের জন্য আলাদা ‘পিংক বাস’ সেবা চালু হয়েছে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) উদ্যোগে মোট ১৪টি বাস এই সেবায় যুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ১০টি ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরে এবং চারটি চট্টগ্রাম ও বগুড়ায় পরিচালিত হচ্ছে। বাসগুলোর চালক ও কন্ডাক্টর নারী। উদ্যোগটির উদ্দেশ্য ইতিবাচক এবং এটিকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করার কোনো কারণ নেই। বরং নারীর নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করার বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে এটিকে স্বাগত জানানো উচিত। তবে প্রশ্ন হলো, এই উদ্যোগের পরিসর কি সমস্যার ব্যাপ্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ?

২০২৬ সালের উইমেন, পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি সূচকে বাংলাদেশের স্কোর ০.৫২৬-এ নেমে এসেছে যা সূচকটিতে বাংলাদেশের সর্বনিম্ন অবস্থান। গত তিন বছর ধরে দেশের অবস্থান অবনতির দিকে। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে গণপরিবহনে নারীর নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিনের উদ্বেগ। ২০১৭ সালে থমসন রয়টার্স ফাউন্ডেশনের এক জরিপে ঢাকা নারীদের জন্য বিশ্বের সপ্তম বিপজ্জনক মহানগর হিসেবে উঠে এসেছিল।

এদিকে দেশের কর্মশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণও উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে, দেশের শ্রমশক্তির প্রায় ৩৮.৪ শতাংশ নারী। অর্থাৎ শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের কারণে নারীর গণপরিবহনের ওপর নির্ভরতা ভবিষ্যতে আরও বাড়বে। কিন্তু নিরাপত্তার পরিস্থিতি সেই বাস্তবতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে উন্নত হয়নি। ২০২৫ সালের একটি গবেষণায় ঢাকার প্রায় ৭৯ শতাংশ নারী যাত্রী কোনো না কোনো সময় গণপরিবহনে যৌন হয়রানির শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছেন। বাংলাদেশ রোড সেফটি নেটওয়ার্কের হিসাবেও এই হার ৮৩ শতাংশ। এই বাস্তবতায় পিংক বাসের মতো উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সাম্প্রতিক কিছু অভিজ্ঞতা নতুন একটি উদ্বেগ সামনে আনছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন পোস্ট ও ভিডিওতে অভিযোগ এসেছে, কিছু সাধারণ বাসের কন্ডাক্টর ও হেলপার নারী যাত্রীদের উদ্দেশে বলছেন ‘আপনাদের জন্য তো আলাদা বাস আছে, ওটাতে উঠুন।’ অথচ সংশ্লিষ্ট রুটে কোনো পিংক বাসের সেবা নেই। কোথাও নারী যাত্রী নির্ধারিত স্টপেজে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও বাস পাননি; কোথাও অফিসে পৌঁছাতে দেরি হয়েছে; আবার কোনো শিক্ষার্থী ক্লাসে সময়মতো পৌঁছাতে পারেননি। অভিযোগগুলোর প্রবণতা যদি বাস্তবতার প্রতিফলন হয়, তাহলে বিষয়টি উদ্বেগজনক। কারণ নারীর নিরাপত্তার জন্য চালু করা একটি বিশেষায়িত সেবা যেন সাধারণ গণপরিবহনে নারীর অধিকার সীমিত করার অজুহাত না হয়ে ওঠে।

এখানেই তৈরি হয় পিংক বাসের প্যারাডক্স। মাত্র ১৪টি বাস দিয়ে দেশের বিপুলসংখ্যক নারী যাত্রীর পরিবহন চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়, এটি সহজেই অনুমেয়। এমনকি একটি শহরের সব রুটেও এই সেবা পৌঁছানো সম্ভব নয়। ফলে পিংক বাসকে যদি সাধারণ গণপরিবহনের বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই একটি বড় অংশের নারী যাত্রী এর বাইরে থেকে যাবেন। অথচ তাঁদের যদি সাধারণ বাসেও নিরুৎসাহিত করা হয়, তাহলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বদলে তাঁদের চলাচলের সুযোগই সংকুচিত হবে।

এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সামাজিক মানসিকতা। বাংলাদেশের সমাজে নারীর ঘরের বাইরে কাজ করা, একা চলাফেরা করা কিংবা রাত পর্যন্ত বাইরে থাকা নিয়ে এখনো নানা ধরনের সামাজিক আপত্তি রয়েছে। উইমেন, পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি সূচকের ২০২১-২২ সালের তথ্য অনুযায়ী, ১৫ বছরের বেশি বয়সী পুরুষদের ৫৭ শতাংশেরও বেশি মনে করেন, পরিবারের নারীদের বাইরে গিয়ে বেতনের কাজ করা গ্রহণযোগ্য নয়। এই মানসিকতার সঙ্গে যদি এমন একটি পরিবহনব্যবস্থা যুক্ত হয়, যেখানে ‘নারীদের জন্য আলাদা বাস’কে তাঁদের সাধারণ পরিবহনে চলাচলের বিকল্প হিসেবে দেখা হয়, তাহলে অনিচ্ছাকৃতভাবেই একটি বিপজ্জনক বার্তা তৈরি হতে পারে। নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায় নারীর জন্য আলাদা ব্যবস্থা তৈরির মধ্যেই সীমাবদ্ধ, সাধারণ পরিবহনব্যবস্থাকে নিরাপদ করার দায় যেন আর নেই।

প্রতিবেশী দেশগুলোর অভিজ্ঞতাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশে করাচি-হায়দরাবাদ এবং পেশোয়ারেও নারী-চালিত পিংক বাসের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু সীমিত রুট ও সংখ্যার কারণে এসব সেবা মূলত নির্দিষ্ট শ্রেণির নারীদের কাছেই বেশি পৌঁছেছে বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও তুলনামূলক সচ্ছল নারীদের। নিম্ন-আয়ের নারী, দিনমজুর কিংবা অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত নারীদের জন্য সীমিত রুটের বিশেষায়িত বাস অনেক সময় বাস্তবসম্মত বিকল্প হয়ে উঠতে পারেনি।

ভারতের কিছু উদ্যোগ অবশ্য ভিন্ন ধরনের শিক্ষা দেয়। বেঙ্গালুরুতে পুরো বাস নারীদের জন্য আলাদা না রেখে প্রতিটি বাসে নির্দিষ্ট কিছু আসন নারীদের জন্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং সেই আসনে পুরুষ বসলে জরিমানার বিধান রয়েছে। এই অভিজ্ঞতাগুলোর মূল শিক্ষা হলো নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য তাঁদের আলাদা করে দেওয়া একমাত্র সমাধান নয়। বরং গোটা গণপরিবহনব্যবস্থাকে নিরাপদ, জবাবদিহিমূলক এবং জেন্ডার-সংবেদনশীল করে তোলাই দীর্ঘমেয়াদে বেশি কার্যকর হতে পারে।

বাংলাদেশেও তাই পিংক বাসের সংখ্যা বাড়ানো অবশ্যই জরুরি। এর পাশাপাশি ডিজিটাল টিকিটিং, সিসিটিভি, জিপিএস ট্র্যাকিং, কার্যকর অভিযোগ ব্যবস্থা এবং দ্রুত প্রতিকারের ব্যবস্থা প্রয়োজন। তবে প্রযুক্তি ও অবকাঠামো একা সমস্যার সমাধান করবে না। বাসের চালক, কন্ডাক্টর, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং পরিবহন কর্তৃপক্ষ প্রত্যেক স্তরে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে নারীর প্রতি সহিংসতা ও হয়রানির বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগকে দৃশ্যমান ও কার্যকর করতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তন। একজন নারী কেন বাইরে যাবেন, কী পোশাক পরবেন, কখন বাড়ি ফিরবেন কিংবা কোন পরিবহনে উঠবেন এসব প্রশ্নের কেন্দ্রবিন্দুতে যদি তাঁর স্বাধীনতার বদলে সামাজিক নিয়ন্ত্রণ থাকে, তাহলে কোনো বিশেষ বাসই সমস্যার স্থায়ী সমাধান দিতে পারবে না।

নারীরা বহু বাধা অতিক্রম করে শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছেন। তাদের চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা তাই কোনো বিশেষ সুবিধা নয়; এটি তাদের নাগরিক অধিকার এবং অর্থনৈতিক অংশগ্রহণের পূর্বশর্ত। পিংক বাস সেই অধিকার বাস্তবায়নের একটি অতিরিক্ত সুযোগ হতে পারে। কিন্তু সেটি যেন কখনোই সাধারণ বাসে নারীর সমান অধিকার খর্ব করার যুক্তি না হয়ে ওঠে। নারীর জন্য আলাদা বাস থাকতে পারে, কিন্তু নিরাপদ সাধারণ গণপরিবহনে ওঠার অধিকারও তার সমানভাবে থাকতে হবে।

[লেখক: শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়]

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বুধবার, ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬


পিংক বাস ও নিরাপদ গণপরিবহনের চ্যালেঞ্জ

প্রকাশের তারিখ : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

বাংলাদেশে একজন নারীর নিরাপদে চলাচলের অধিকার এখনো অনেকাংশে তার সামাজিক পরিচয়, পোশাক, বৈবাহিক অবস্থা কিংবা পারিবারিক অবস্থানের সঙ্গে অদৃশ্যভাবে জড়িয়ে আছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বদলে বহু ক্ষেত্রে সমাজ নারীকেই নিরাপদ থাকার দায় চাপিয়ে দেয়। গণপরিবহনেও এর ব্যতিক্রম নেই। ফলে নারীদের জন্য আলাদা বাস চালুর উদ্যোগ নিঃসন্দেহে স্বস্তিদায়ক একটি পদক্ষেপ হলেও এর বাস্তবায়ন ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলা জরুরি।


১৯ আগস্ট ঢাকায় নারীদের জন্য আলাদা ‘পিংক বাস’ সেবা চালু হয়েছে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) উদ্যোগে মোট ১৪টি বাস এই সেবায় যুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ১০টি ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরে এবং চারটি চট্টগ্রাম ও বগুড়ায় পরিচালিত হচ্ছে। বাসগুলোর চালক ও কন্ডাক্টর নারী। উদ্যোগটির উদ্দেশ্য ইতিবাচক এবং এটিকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করার কোনো কারণ নেই। বরং নারীর নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করার বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে এটিকে স্বাগত জানানো উচিত। তবে প্রশ্ন হলো, এই উদ্যোগের পরিসর কি সমস্যার ব্যাপ্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ?


২০২৬ সালের উইমেন, পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি সূচকে বাংলাদেশের স্কোর ০.৫২৬-এ নেমে এসেছে যা সূচকটিতে বাংলাদেশের সর্বনিম্ন অবস্থান। গত তিন বছর ধরে দেশের অবস্থান অবনতির দিকে। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে গণপরিবহনে নারীর নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিনের উদ্বেগ। ২০১৭ সালে থমসন রয়টার্স ফাউন্ডেশনের এক জরিপে ঢাকা নারীদের জন্য বিশ্বের সপ্তম বিপজ্জনক মহানগর হিসেবে উঠে এসেছিল।


এদিকে দেশের কর্মশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণও উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে, দেশের শ্রমশক্তির প্রায় ৩৮.৪ শতাংশ নারী। অর্থাৎ শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের কারণে নারীর গণপরিবহনের ওপর নির্ভরতা ভবিষ্যতে আরও বাড়বে। কিন্তু নিরাপত্তার পরিস্থিতি সেই বাস্তবতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে উন্নত হয়নি। ২০২৫ সালের একটি গবেষণায় ঢাকার প্রায় ৭৯ শতাংশ নারী যাত্রী কোনো না কোনো সময় গণপরিবহনে যৌন হয়রানির শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছেন। বাংলাদেশ রোড সেফটি নেটওয়ার্কের হিসাবেও এই হার ৮৩ শতাংশ। এই বাস্তবতায় পিংক বাসের মতো উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সাম্প্রতিক কিছু অভিজ্ঞতা নতুন একটি উদ্বেগ সামনে আনছে।


সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন পোস্ট ও ভিডিওতে অভিযোগ এসেছে, কিছু সাধারণ বাসের কন্ডাক্টর ও হেলপার নারী যাত্রীদের উদ্দেশে বলছেন ‘আপনাদের জন্য তো আলাদা বাস আছে, ওটাতে উঠুন।’ অথচ সংশ্লিষ্ট রুটে কোনো পিংক বাসের সেবা নেই। কোথাও নারী যাত্রী নির্ধারিত স্টপেজে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও বাস পাননি; কোথাও অফিসে পৌঁছাতে দেরি হয়েছে; আবার কোনো শিক্ষার্থী ক্লাসে সময়মতো পৌঁছাতে পারেননি। অভিযোগগুলোর প্রবণতা যদি বাস্তবতার প্রতিফলন হয়, তাহলে বিষয়টি উদ্বেগজনক। কারণ নারীর নিরাপত্তার জন্য চালু করা একটি বিশেষায়িত সেবা যেন সাধারণ গণপরিবহনে নারীর অধিকার সীমিত করার অজুহাত না হয়ে ওঠে।


এখানেই তৈরি হয় পিংক বাসের প্যারাডক্স। মাত্র ১৪টি বাস দিয়ে দেশের বিপুলসংখ্যক নারী যাত্রীর পরিবহন চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়, এটি সহজেই অনুমেয়। এমনকি একটি শহরের সব রুটেও এই সেবা পৌঁছানো সম্ভব নয়। ফলে পিংক বাসকে যদি সাধারণ গণপরিবহনের বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই একটি বড় অংশের নারী যাত্রী এর বাইরে থেকে যাবেন। অথচ তাঁদের যদি সাধারণ বাসেও নিরুৎসাহিত করা হয়, তাহলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বদলে তাঁদের চলাচলের সুযোগই সংকুচিত হবে।


এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সামাজিক মানসিকতা। বাংলাদেশের সমাজে নারীর ঘরের বাইরে কাজ করা, একা চলাফেরা করা কিংবা রাত পর্যন্ত বাইরে থাকা নিয়ে এখনো নানা ধরনের সামাজিক আপত্তি রয়েছে। উইমেন, পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি সূচকের ২০২১-২২ সালের তথ্য অনুযায়ী, ১৫ বছরের বেশি বয়সী পুরুষদের ৫৭ শতাংশেরও বেশি মনে করেন, পরিবারের নারীদের বাইরে গিয়ে বেতনের কাজ করা গ্রহণযোগ্য নয়। এই মানসিকতার সঙ্গে যদি এমন একটি পরিবহনব্যবস্থা যুক্ত হয়, যেখানে ‘নারীদের জন্য আলাদা বাস’কে তাঁদের সাধারণ পরিবহনে চলাচলের বিকল্প হিসেবে দেখা হয়, তাহলে অনিচ্ছাকৃতভাবেই একটি বিপজ্জনক বার্তা তৈরি হতে পারে। নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায় নারীর জন্য আলাদা ব্যবস্থা তৈরির মধ্যেই সীমাবদ্ধ, সাধারণ পরিবহনব্যবস্থাকে নিরাপদ করার দায় যেন আর নেই।


প্রতিবেশী দেশগুলোর অভিজ্ঞতাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশে করাচি-হায়দরাবাদ এবং পেশোয়ারেও নারী-চালিত পিংক বাসের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু সীমিত রুট ও সংখ্যার কারণে এসব সেবা মূলত নির্দিষ্ট শ্রেণির নারীদের কাছেই বেশি পৌঁছেছে বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও তুলনামূলক সচ্ছল নারীদের। নিম্ন-আয়ের নারী, দিনমজুর কিংবা অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত নারীদের জন্য সীমিত রুটের বিশেষায়িত বাস অনেক সময় বাস্তবসম্মত বিকল্প হয়ে উঠতে পারেনি।


ভারতের কিছু উদ্যোগ অবশ্য ভিন্ন ধরনের শিক্ষা দেয়। বেঙ্গালুরুতে পুরো বাস নারীদের জন্য আলাদা না রেখে প্রতিটি বাসে নির্দিষ্ট কিছু আসন নারীদের জন্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং সেই আসনে পুরুষ বসলে জরিমানার বিধান রয়েছে। এই অভিজ্ঞতাগুলোর মূল শিক্ষা হলো নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য তাঁদের আলাদা করে দেওয়া একমাত্র সমাধান নয়। বরং গোটা গণপরিবহনব্যবস্থাকে নিরাপদ, জবাবদিহিমূলক এবং জেন্ডার-সংবেদনশীল করে তোলাই দীর্ঘমেয়াদে বেশি কার্যকর হতে পারে।


বাংলাদেশেও তাই পিংক বাসের সংখ্যা বাড়ানো অবশ্যই জরুরি। এর পাশাপাশি ডিজিটাল টিকিটিং, সিসিটিভি, জিপিএস ট্র্যাকিং, কার্যকর অভিযোগ ব্যবস্থা এবং দ্রুত প্রতিকারের ব্যবস্থা প্রয়োজন। তবে প্রযুক্তি ও অবকাঠামো একা সমস্যার সমাধান করবে না। বাসের চালক, কন্ডাক্টর, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং পরিবহন কর্তৃপক্ষ প্রত্যেক স্তরে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে নারীর প্রতি সহিংসতা ও হয়রানির বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগকে দৃশ্যমান ও কার্যকর করতে হবে।


সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তন। একজন নারী কেন বাইরে যাবেন, কী পোশাক পরবেন, কখন বাড়ি ফিরবেন কিংবা কোন পরিবহনে উঠবেন এসব প্রশ্নের কেন্দ্রবিন্দুতে যদি তাঁর স্বাধীনতার বদলে সামাজিক নিয়ন্ত্রণ থাকে, তাহলে কোনো বিশেষ বাসই সমস্যার স্থায়ী সমাধান দিতে পারবে না।


নারীরা বহু বাধা অতিক্রম করে শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছেন। তাদের চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা তাই কোনো বিশেষ সুবিধা নয়; এটি তাদের নাগরিক অধিকার এবং অর্থনৈতিক অংশগ্রহণের পূর্বশর্ত। পিংক বাস সেই অধিকার বাস্তবায়নের একটি অতিরিক্ত সুযোগ হতে পারে। কিন্তু সেটি যেন কখনোই সাধারণ বাসে নারীর সমান অধিকার খর্ব করার যুক্তি না হয়ে ওঠে। নারীর জন্য আলাদা বাস থাকতে পারে, কিন্তু নিরাপদ সাধারণ গণপরিবহনে ওঠার অধিকারও তার সমানভাবে থাকতে হবে।

[লেখক: শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়]


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত