সংবাদ

খাদ্যে ভেজাল: অজ্ঞতা, অভ্যাস নাকি লোভ?


শহীদুল ইসলাম
শহীদুল ইসলাম
প্রকাশ: ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:২৪ এএম

খাদ্যে ভেজাল: অজ্ঞতা, অভ্যাস নাকি লোভ?
বাংলাদেশে খাদ্যে ভেজাল নতুন কোনো সমস্যা নয়। কখনো মসলায় অননুমোদিত রং, কখনো নিম্নমানের কাঁচামালকে উন্নতমানের বলে বিক্রি, কখনো খাবারের রং, গঠন বা বাহ্যিক সৌন্দর্য পরিবর্তনের জন্য অননুমোদিত রাসায়নিকের ব্যবহার—বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম আমাদের সামনে এসেছে। সাম্প্রতিক সময়ে জিলাপি, মুড়ি, গুড়সহ কিছু খাদ্যে ‘হাইড্রোজ’ নামে পরিচিত রাসায়নিক ব্যবহারের খবর বিষয়টিকে আবারও আলোচনায় এনেছে

বাংলাদেশে খাদ্যে ভেজাল নতুন কোনো সমস্যা নয়। কখনো মসলায় অননুমোদিত রং, কখনো নিম্নমানের কাঁচামালকে উন্নতমানের বলে বিক্রি, কখনো খাবারের রং, গঠন বা বাহ্যিক সৌন্দর্য পরিবর্তনের জন্য অননুমোদিত রাসায়নিকের ব্যবহার—বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম আমাদের সামনে এসেছে। সাম্প্রতিক সময়ে জিলাপি, মুড়ি, গুড়সহ কিছু খাদ্যে ‘হাইড্রোজ’ নামে পরিচিত রাসায়নিক ব্যবহারের খবর বিষয়টিকে আবারও আলোচনায় এনেছে। অভিযান হচ্ছে, জরিমানা হচ্ছে, সংবাদ প্রকাশিত হচ্ছে। কিন্তু এসব ঘটনার মধ্যেও একটি মৌলিক প্রশ্ন থেকে যায়—একজন মানুষ কেন অন্য মানুষের খাবারে এমন কিছু মেশাবেন, যা সেখানে থাকার কথা নয়? তিনি কি জানেন না, নাকি জেনেও করেন? আর জেনেও করলে কীভাবে একটি অন্যায় কাজ ধীরে ধীরে তার কাছে স্বাভাবিক হয়ে ওঠে?

প্রথমেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন। খাদ্যে ভেজাল দেওয়াকে বাংলাদেশের মানুষের কোনো ‘মানসিক সমস্যা’ বা বিশেষ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। খাদ্য প্রতারণা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশেই ঘটে। এখানে আচরণগত বা মনস্তাত্ত্বিক বিষয় বলতে কোনো মানসিক রোগ বোঝানো হচ্ছে না। বরং মানুষ কীভাবে সিদ্ধান্ত নেয়, অন্যের আচরণ দ্বারা প্রভাবিত হয়, লাভ ও ঝুঁকির মধ্যে তুলনা করে, নিজের ভুলের পক্ষে যুক্তি তৈরি করে এবং একই ভুল বারবার করতে করতে একসময় সেটিকে স্বাভাবিক বলে মেনে নেয়—সেই প্রক্রিয়াকে বোঝানো হচ্ছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তাই প্রশ্ন হওয়া উচিত, আমাদের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার কোন পরিস্থিতি কিছু মানুষের মধ্যে এমন আচরণ তৈরি করতে এবং টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করছে?

সাম্প্রতিক আলোচিত ‘হাইড্রোজ’ বলতে সাধারণত Sodium dithionite বা Sodium hydrosulfite নামে পরিচিত একটি রাসায়নিক পদার্থকে বোঝানো হয়। এটি একটি শক্তিশালী বিজারক ও বিরঞ্জক পদার্থ এবং বিভিন্ন শিল্পে এর ব্যবহার রয়েছে। অথচ খাবারকে অস্বাভাবিক সাদা, উজ্জ্বল বা বাহ্যিকভাবে আকর্ষণীয় করার উদ্দেশ্যে এর অপব্যবহারের অভিযোগ বাংলাদেশে রয়েছে। এখানেই প্রশ্ন আসে—একজন মুড়ি প্রস্তুতকারক কেন তার মুড়িকে অস্বাভাবিক সাদা করতে চাইবেন? একজন গুড় উৎপাদক কেন গুড়ের স্বাভাবিক রং পরিবর্তন করবেন? একজন মিষ্টি প্রস্তুতকারক কেন এমন একটি রাসায়নিক ব্যবহার করবেন, যার খাদ্যে থাকার কথা নয়?

এর প্রথম উত্তর হতে পারে—অজ্ঞতা। বাংলাদেশের ক্ষুদ্র ও অনানুষ্ঠানিক খাদ্যখাতের বড় একটি অংশে আনুষ্ঠানিক খাদ্য নিরাপত্তা প্রশিক্ষণের ঘাটতি রয়েছে। বিভিন্ন গবেষণায় রাস্তার খাবার বিক্রেতাদের বড় অংশের খাদ্য নিরাপত্তা বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ না থাকার চিত্র উঠে এসেছে। ফলে খাদ্যমানের রাসায়নিক আর শিল্পে ব্যবহৃত রাসায়নিকের পার্থক্য, কোন খাদ্য-সংযোজনী অনুমোদিত, কোনটি নয়, কতটুকু ব্যবহার করা যায় কিংবা ভুল রাসায়নিক ব্যবহারে কী ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে—এসব বিষয়ে অনেকের পর্যাপ্ত ধারণা নাও থাকতে পারে।

একজন নতুন কারিগরের কথা ভাবা যাক। তিনি একটি মুড়ির কারখানায় কাজ শিখতে গেলেন। সেখানে দেখলেন অভিজ্ঞ কারিগর একটি বিশেষ রাসায়নিক ব্যবহার করছেন। পাশের কারখানাতেও একই পদ্ধতি চলছে। জানতে চাইলে তাকে বলা হলো, “এটা দিলে মুড়ি সুন্দর হয়, আমরা তো বহু বছর ধরে এভাবেই করছি।” নতুন কর্মী হয়তো আর প্রশ্ন করলেন না—পদার্থটি আসলে কী, এটি খাদ্যে ব্যবহারের অনুমতি আছে কি না কিংবা এর নিরাপদ বিকল্প কী। তার কাছে সেটিই হয়ে গেল শেখা পদ্ধতি। কয়েক বছর পর তিনিই হয়তো আরেকজনকে একই পদ্ধতি শেখাবেন।

এভাবেই একটি ভুল পদ্ধতি একজন থেকে আরেকজনের কাছে যেতে যেতে একসময় ‘প্রচলিত পদ্ধতি’ হয়ে উঠতে পারে। অথচ কোনো কাজ বহু বছর ধরে করা হচ্ছে বলেই সেটি বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক বা নিরাপদ হয়ে যায় না।

কিন্তু অজ্ঞতা দিয়ে পুরো সমস্যাটি ব্যাখ্যা করা যায় না। খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে বাংলাদেশে পরিচালিত গবেষণাগুলো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এনেছে—মানুষ যা জানে, বাস্তবে সবসময় তা অনুসরণ করে না। অর্থাৎ জানা এবং মানার মধ্যে ব্যবধান রয়েছে। খাদ্য নিরাপত্তার নিয়ম সম্পর্কে ধারণা থাকা সত্ত্বেও বাস্তবে সেই নিয়ম অনুসরণ না করার ঘটনা দেখা যায়। তাই শুধু তথ্য দিলেই মানুষের আচরণ পরিবর্তিত হবে—এমন ধারণাও ঠিক নয়।

মানুষ সামাজিক জীব। আশপাশের মানুষ যা করছে, সেটিকে স্বাভাবিক বলে ধরে নেওয়ার প্রবণতা আমাদের মধ্যে রয়েছে। একটি বাজারে যদি দশজন উৎপাদকের মধ্যে আটজন একই অননুমোদিত পদ্ধতি অনুসরণ করেন, বাকি দুজনের ওপরও সেই পদ্ধতি অনুসরণের চাপ তৈরি হতে পারে। তখন একটি অত্যন্ত পরিচিত যুক্তি সামনে আসে—“সবাই তো করছে।”

সবাই যখন করছে, নিশ্চয় খুব খারাপ নয়। এত বছর ধরে চলছে, সমস্যা হলে এত দিনে হতো। আমি একা নিয়ম মেনে কী লাভ? এই ধরনের চিন্তা ব্যক্তির নিজের দায়িত্ববোধকে দুর্বল করতে পারে। ধীরে ধীরে ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের দায় গোষ্ঠীর মধ্যে ছড়িয়ে যায়।

এর সঙ্গে যখন ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতা যুক্ত হয়, তখন চাপ আরও বাড়ে। একজন ব্যবসায়ী দেখলেন পাশের দোকানের মুড়ি বেশি সাদা বলে বেশি বিক্রি হচ্ছে। অন্যের গুড় বেশি উজ্জ্বল বলে ক্রেতা সেটিকেই উন্নতমানের মনে করছেন। তার স্বাভাবিক পণ্য দেখতে তুলনামূলক কম আকর্ষণীয়। তখন তার সামনে একটি কঠিন প্রশ্ন তৈরি হতে পারে—নিয়ম মেনে বাজার হারাবেন, নাকি অন্যদের মতো করে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকবেন?

এখানেই খাদ্যে ভেজালের সঙ্গে অর্থনৈতিক প্রণোদনা যুক্ত হয়। নিম্নমানের কাঁচামালকে উন্নত দেখানো, উৎপাদন খরচ কমানো, পণ্যের বাহ্যিক সৌন্দর্য বাড়ানো, বিক্রি বাড়ানো কিংবা বেশি মূল্য পাওয়ার সুযোগ থাকলে একজন দুর্বল নৈতিকতার ব্যবসায়ীর কাছে অনিয়ম আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে। সিদ্ধান্তটি তখন শুধু “এটি ঠিক না ভুল”—এই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকে না; এর সঙ্গে যুক্ত হয়—“এতে আমার কত লাভ হবে?”

এরপর আসে মানুষের নিজের ঝুঁকিকে ছোট করে দেখার প্রবণতা। কেউ হয়তো জানেন কাজটি পুরোপুরি ঠিক নয়, কিন্তু নিজেকে বোঝাতে শুরু করেন—“আমি তো খুব সামান্য দিচ্ছি”, “একটু দিলে কী আর হবে”, “অন্যরা আমার চেয়েও বেশি দেয়”, “এত বছর মানুষ খাচ্ছে, কিছু তো হয়নি।”

এসব বক্তব্য বৈজ্ঞানিক ঝুঁকি নিরূপণ নয়। এগুলো নিজের আচরণকে নিজের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলার মানসিক উপায়। বিশেষ করে কোনো অনিরাপদ কাজের ক্ষতি সঙ্গে সঙ্গে চোখে না পড়লে এই ধারণা আরও শক্তিশালী হতে পারে। আজ একটি অননুমোদিত রাসায়নিক ব্যবহার করা হলো, কাল কোনো অভিযোগ এল না। পরদিন আবার ব্যবহার করা হলো। কয়েক মাস বা কয়েক বছর পর সেই ব্যক্তির কাছে কাজটি আর অস্বাভাবিক বলে মনে নাও হতে পারে।

এভাবেই শুরু হয় সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিবর্তন—অন্যায়ের স্বাভাবিকীকরণ। প্রথমবার একটি ভুল কাজ করার সময় মানুষের মনে দ্বিধা থাকতে পারে। দ্বিতীয়বার সেই দ্বিধা কিছুটা কমে। একই কাজ বারবার করতে করতে সেটি পরিচিত অভ্যাসে পরিণত হয়। একসময় সেই ব্যক্তিই নতুন কর্মীকে বলেন, “আমরা তো সবসময় এভাবেই করি।” তখন অতীতের অভ্যাসই যেন কাজটির সঠিকতার প্রমাণ হয়ে দাঁড়ায়।

এর সঙ্গে যুক্ত হয় নিজের ভুলের পক্ষে নৈতিক যুক্তি তৈরি করা। মানুষ সাধারণত নিজেকে অসৎ মানুষ হিসেবে দেখতে চায় না। তাই ভুল কাজ করলেও নিজের কাছে সেটিকে গ্রহণযোগ্য করার জন্য নানা ব্যাখ্যা তৈরি করতে পারে—“ক্রেতাই তো এমন পণ্য চায়”, “সাদা না হলে মুড়ি বিক্রি হয় না”, “উজ্জ্বল না হলে গুড় কেউ কিনবে না”, “আমি বন্ধ করলেও অন্যরা তো বন্ধ করবে না”, “এভাবে না করলে ব্যবসায় লাভ থাকবে না।”

এভাবে নিজের সিদ্ধান্তের দায় কখনো ক্রেতা, কখনো প্রতিযোগী, কখনো বাজারের ওপর সরিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু একজন খাদ্য উৎপাদক তার পণ্যে কী ব্যবহার করছেন, সেই দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত তারই।

তবে ভোক্তার ভূমিকাও উপেক্ষা করা যায় না। আমাদের নিজেদেরও প্রশ্ন করা দরকার—আমরা কেন ধবধবে সাদা মুড়িকে ভালো মুড়ি মনে করি? কেন অস্বাভাবিক উজ্জ্বল গুড়কে বেশি বিশুদ্ধ ভাবি? কেন অতিরিক্ত উজ্জ্বল রঙের মিষ্টি আমাদের বেশি আকর্ষণ করে?

প্রাকৃতিক খাদ্যের নিজস্ব রং, গন্ধ, স্বাদ ও গঠন রয়েছে এবং তাতে স্বাভাবিক তারতম্য থাকতেই পারে। সব গুড় একই রঙের হবে না। সব মুড়ি বরফের মতো সাদা হওয়ার প্রয়োজন নেই। একটি পণ্য অস্বাভাবিক সুন্দর দেখালেই সেটি বেশি নিরাপদ বা উন্নতমানের—এমন কোনো বৈজ্ঞানিক নিয়ম নেই।

কিন্তু ভোক্তা যদি বাহ্যিক সৌন্দর্যকে গুণমানের প্রধান মাপকাঠি হিসেবে দেখেন, বাজার সেই চাহিদার উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করবে। ক্রেতা অস্বাভাবিক সাদা পণ্য পছন্দ করেন, উৎপাদক আরও সাদা করার উপায় খোঁজেন, সেই পণ্য বেশি বিক্রি হয়, অন্য উৎপাদকও তা অনুসরণ করেন। একসময় অস্বাভাবিক চেহারাই আমাদের কাছে ‘স্বাভাবিক ভালো মান’ হয়ে উঠতে পারে।

অবশ্য ভোক্তার পছন্দ কোনোভাবেই খাদ্যে ভেজাল দেওয়ার বৈধতা তৈরি করে না। একজন ক্রেতা সুন্দর পণ্য চাইতে পারেন; তার অর্থ এই নয় যে উৎপাদক অননুমোদিত রাসায়নিক ব্যবহার করতে পারবেন। কিন্তু ভেজালের বাজার কেন তৈরি হয় এবং কেন টিকে থাকে, সেটি বুঝতে হলে ভোক্তার প্রত্যাশাকেও আলোচনায় আনতে হবে।

এরপর আসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—ধরা পড়ার সম্ভাবনা। আইন কত কঠোর, সেটি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আইন ভাঙলে বাস্তবে ধরা পড়ার সম্ভাবনা কতটুকু, সেটিও মানুষের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। একজন ব্যবসায়ী যদি মনে করেন অননুমোদিত রাসায়নিক ব্যবহার করে তিনি নিয়মিত বাড়তি লাভ করতে পারবেন, অথচ তার পণ্যের নমুনা পরীক্ষা হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম, তাহলে তার কাছে অনিয়মটি ‘লাভজনক ঝুঁকি’ বলে মনে হতে পারে।

তাই শুধু বড় অঙ্কের জরিমানা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন এমন নিয়মিত ও ঝুঁকিভিত্তিক নজরদারি, যাতে অনিয়ম করলে ধরা পড়ার সম্ভাবনাটিও বাস্তব বলে মনে হয়। কোন খাবারে কোন ভেজাল বেশি হচ্ছে, কোন এলাকায় সমস্যা বেশি, কোন মৌসুমে নির্দিষ্ট অনিয়ম বাড়ছে এবং কোন রাসায়নিক খাদ্য উৎপাদকের কাছে যাচ্ছে—এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে নজরদারি পরিচালনা করা প্রয়োজন।

হাইড্রোজের মতো শিল্পে ব্যবহৃত রাসায়নিকের ক্ষেত্রে শুধু শেষের মুড়ি প্রস্তুতকারক, গুড় উৎপাদক বা মিষ্টির দোকানকে জরিমানা করলেই সমস্যার মূল উৎস বন্ধ হবে না। দেখতে হবে রাসায়নিকটি কোথা থেকে আসছে, কে বিক্রি করছে, কে কিনছে এবং খাদ্য উৎপাদকের কাছে কীভাবে পৌঁছাচ্ছে। অর্থাৎ শেষের দোকান থেকে শুরু করে রাসায়নিকের উৎস পর্যন্ত পুরো সরবরাহব্যবস্থার অনুসরণযোগ্যতা প্রয়োজন।

এই জায়গাতেই খাদ্যবিজ্ঞানী ও খাদ্যপ্রযুক্তিবিদদের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। খাদ্যে ভেজালের সব সমস্যার সমাধান শুধু আইন প্রয়োগ করে সম্ভব নয়। অনেক সময় একজন ক্ষুদ্র উৎপাদক একটি অননুমোদিত রাসায়নিক ব্যবহার করেন একটি নির্দিষ্ট প্রযুক্তিগত উদ্দেশ্যে—মুড়ি আরও সাদা করা, গুড়ের রং হালকা করা, মিষ্টির গঠন ভালো রাখা, পণ্যের স্বাদ উন্নত করা কিংবা বেশি সময় ভালো রাখার জন্য। তাকে শুধু বলা হলো, “এটি ব্যবহার করা যাবে না”—তাতে সমস্যার অর্ধেক সমাধান হয়। একই সঙ্গে তাকে বলতে হবে—তাহলে নিরাপদভাবে কাজটি কীভাবে করা যাবে?

এখানেই খাদ্যবিজ্ঞানী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। যদি মুড়ির রং বা গঠন সমস্যা হয়, তাহলে কাঁচামালের মান, ধানের জাত, ভিজিয়ে রাখার সময়, তাপমাত্রা, শুকানো ও ভাজার প্রক্রিয়া পরীক্ষা করে নিরাপদ উপায়ে কাঙ্ক্ষিত গুণমান অর্জনের পথ বের করা যেতে পারে। গুড়ের ক্ষেত্রে রস সংগ্রহের স্বাস্থ্যসম্মত পদ্ধতি, দ্রুত প্রক্রিয়াজাতকরণ, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, ছাঁকন ও জ্বাল দেওয়ার পদ্ধতি উন্নত করে রাসায়নিকের ওপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগ থাকতে পারে। মিষ্টি, বেকারি ও অন্যান্য প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের ক্ষেত্রেও সঠিক কাঁচামাল, অনুমোদিত খাদ্য-সংযোজনী এবং উপযুক্ত প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে নিরাপদ বিকল্প তৈরি করা সম্ভব।

এখানে নীতিটি হওয়া উচিত—“নিষেধের সঙ্গে বিকল্পও দিতে হবে।”

একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীকে বলা হলো হাইড্রোজ ব্যবহার করবেন না, কিন্তু হাইড্রোজ ছাড়া কীভাবে তার পণ্যের গ্রহণযোগ্য রং, স্বাদ বা গঠন বজায় রাখা যাবে তা শেখানো হলো না—তাহলে তার পুরোনো অভ্যাসে ফিরে যাওয়ার ঝুঁকি থাকবে। খাদ্যবিজ্ঞানীর কাজ সেই প্রযুক্তিগত ব্যবধানটি পূরণ করা।

খাদ্যবিজ্ঞানীর আরেকটি বড় দায়িত্ব হলো জটিল খাদ্যবিজ্ঞান ও আইনকে সাধারণ উৎপাদকের ভাষায় পৌঁছে দেওয়া। একজন ক্ষুদ্র মুড়ি প্রস্তুতকারকের Sodium dithionite-এর জটিল রাসায়নিক বিক্রিয়া জানার প্রয়োজন নেই। তার জানা প্রয়োজন—কোনটি ব্যবহার করা যাবে না, কেন যাবে না এবং তার পরিবর্তে তিনি কী করবেন। একইভাবে খাদ্য-সংযোজনীর অনুমোদিত ব্যবহার, খাদ্যমানের ও শিল্পমানের রাসায়নিকের পার্থক্য, পরিচ্ছন্নতা, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, সংরক্ষণ, জীবাণু নিয়ন্ত্রণ ও মোড়কজাতকরণের মৌলিক বিষয়গুলো হাতে-কলমে শেখানো প্রয়োজন।

বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণাগার, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, বিএসটিআই, খাদ্যশিল্প এবং স্থানীয় ক্ষুদ্র উৎপাদকদের মধ্যে আরও কার্যকর সহযোগিতা তৈরি করা গেলে গবেষণাগারের জ্ঞান সরাসরি বাজারের সমস্যার সমাধানে ব্যবহার করা সম্ভব। খাদ্যবিজ্ঞানীর কাজ তখন শুধু নমুনায় ভেজাল শনাক্ত করা থাকবে না; বরং ভেজাল দেওয়ার প্রয়োজনটাই কমিয়ে আনা হবে। কোনো উৎপাদক যদি নিরাপদ প্রযুক্তি ব্যবহার করে গ্রহণযোগ্য খরচে ভালো রং, স্বাদ, গঠন ও সংরক্ষণকাল অর্জন করতে পারেন, তাহলে অননুমোদিত রাসায়নিক ব্যবহারের প্রণোদনাও কমবে।

বাংলাদেশে তাই খাদ্যে ভেজাল প্রতিরোধের একটি কার্যকর দর্শন হতে পারে—আইন বলবে কী করা যাবে না, আর খাদ্যবিজ্ঞান দেখাবে নিরাপদভাবে কীভাবে করা যাবে।

সবকিছু মিলিয়ে খাদ্যে ভেজালের পেছনের ধারাবাহিকতাটি অনেকটা এমন—অজ্ঞতা থেকে ভুল পদ্ধতি শেখা, অন্যকে দেখে সেটি গ্রহণ করা, “সবাই করছে” বলে নিজেকে বোঝানো, ছোট অনিয়ম দিয়ে শুরু করা, তাৎক্ষণিক ক্ষতি দেখতে না পাওয়া, একই কাজ বারবার করা, সেখান থেকে আর্থিক সুবিধা পাওয়া, নিজের কাজের পক্ষে যুক্তি তৈরি করা এবং ধরা পড়ার আশঙ্কা কম মনে করতে করতে একসময় অনিয়মকেই স্বাভাবিক বলে ধরে নেওয়া।

এই চক্র ভাঙতে হলে যিনি জানেন না তাকে শিক্ষা দিতে হবে, যিনি ভুল পদ্ধতি শিখেছেন তাকে সঠিক পদ্ধতির প্রশিক্ষণ দিতে হবে, ভোক্তাকে প্রাকৃতিক খাদ্যের স্বাভাবিক রং ও গঠন সম্পর্কে সচেতন করতে হবে এবং সৎ ব্যবসায়ী যেন নিয়ম মেনে চলার কারণে বাজারে পিছিয়ে না পড়েন, সেটিও দেখতে হবে। আর যিনি সবকিছু জানার পরও ইচ্ছাকৃতভাবে আর্থিক লাভের জন্য মানুষের খাবারে অননুমোদিত পদার্থ ব্যবহার করেন, তার ক্ষেত্রে কার্যকর আইন প্রয়োগের বিকল্প নেই।

সবশেষে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন প্রয়োজন আমাদের খাদ্য নিরাপত্তার সংস্কৃতিতে। একজন খাদ্য ব্যবসায়ীর মনে যদি প্রধান প্রশ্ন হয়—“এটা করলে আমি ধরা পড়ব কি না?”, তাহলে তার আচরণ নিয়ন্ত্রণের জন্য সবসময় একজন পরিদর্শকের প্রয়োজন হবে। কিন্তু প্রশ্নটি যদি হয়—“এই খাবারটি যদি আমার নিজের সন্তান বা পরিবারের কাউকে খাওয়াতে হয়, আমি কি একইভাবে তৈরি করব?”—তাহলে খাদ্য নিরাপত্তার সঙ্গে ব্যক্তিগত বিবেক ও সামাজিক দায়িত্বও যুক্ত হয়।

বাংলাদেশে খাদ্যে ভেজাল তাই শুধু অজ্ঞতার সমস্যা নয়, আবার শুধু লোভের সমস্যাও নয়। এটি অজ্ঞতা, ভুল শিক্ষা, সামাজিক অনুকরণ, অর্থনৈতিক প্রণোদনা, ভোক্তার প্রত্যাশা, নিজের ঝুঁকিকে ছোট করে দেখা, নিজের ভুলের পক্ষে যুক্তি তৈরি এবং দুর্বল নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার সম্মিলিত ফল। তাই এর সমাধানও হতে হবে সমন্বিত—শিক্ষা, খাদ্যবিজ্ঞান, নিরাপদ প্রযুক্তি, দায়িত্বশীল ব্যবসা, সচেতন ভোক্তা, নিয়মিত নজরদারি এবং কার্যকর আইন প্রয়োগকে একই সঙ্গে কাজ করতে হবে।

কারণ অন্যায় যখন বারবার ঘটে, আশপাশের সবাই সেটি করতে থাকে, বাজারে তার পুরস্কার পাওয়া যায় এবং ধরা পড়ার আশঙ্কা কম থাকে—তখন একসময় সেই অন্যায়ই স্বাভাবিক বলে মনে হতে শুরু করে। খাদ্য নিরাপত্তায় আমাদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব সম্ভবত সেখানেই—অন্যায়কে কখনোই স্বাভাবিক হয়ে উঠতে না দেওয়া।

[লেখক: খাদ্য বিজ্ঞানী; ইনোভেশন ম্যানেজার, সালুটিভিয়া, বার্মিংহাম, যুক্তরাজ্য]



আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

মঙ্গলবার, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬


খাদ্যে ভেজাল: অজ্ঞতা, অভ্যাস নাকি লোভ?

প্রকাশের তারিখ : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

বাংলাদেশে খাদ্যে ভেজাল নতুন কোনো সমস্যা নয়। কখনো মসলায় অননুমোদিত রং, কখনো নিম্নমানের কাঁচামালকে উন্নতমানের বলে বিক্রি, কখনো খাবারের রং, গঠন বা বাহ্যিক সৌন্দর্য পরিবর্তনের জন্য অননুমোদিত রাসায়নিকের ব্যবহার—বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম আমাদের সামনে এসেছে। সাম্প্রতিক সময়ে জিলাপি, মুড়ি, গুড়সহ কিছু খাদ্যে ‘হাইড্রোজ’ নামে পরিচিত রাসায়নিক ব্যবহারের খবর বিষয়টিকে আবারও আলোচনায় এনেছে। অভিযান হচ্ছে, জরিমানা হচ্ছে, সংবাদ প্রকাশিত হচ্ছে। কিন্তু এসব ঘটনার মধ্যেও একটি মৌলিক প্রশ্ন থেকে যায়—একজন মানুষ কেন অন্য মানুষের খাবারে এমন কিছু মেশাবেন, যা সেখানে থাকার কথা নয়? তিনি কি জানেন না, নাকি জেনেও করেন? আর জেনেও করলে কীভাবে একটি অন্যায় কাজ ধীরে ধীরে তার কাছে স্বাভাবিক হয়ে ওঠে?

প্রথমেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন। খাদ্যে ভেজাল দেওয়াকে বাংলাদেশের মানুষের কোনো ‘মানসিক সমস্যা’ বা বিশেষ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। খাদ্য প্রতারণা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশেই ঘটে। এখানে আচরণগত বা মনস্তাত্ত্বিক বিষয় বলতে কোনো মানসিক রোগ বোঝানো হচ্ছে না। বরং মানুষ কীভাবে সিদ্ধান্ত নেয়, অন্যের আচরণ দ্বারা প্রভাবিত হয়, লাভ ও ঝুঁকির মধ্যে তুলনা করে, নিজের ভুলের পক্ষে যুক্তি তৈরি করে এবং একই ভুল বারবার করতে করতে একসময় সেটিকে স্বাভাবিক বলে মেনে নেয়—সেই প্রক্রিয়াকে বোঝানো হচ্ছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তাই প্রশ্ন হওয়া উচিত, আমাদের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার কোন পরিস্থিতি কিছু মানুষের মধ্যে এমন আচরণ তৈরি করতে এবং টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করছে?

সাম্প্রতিক আলোচিত ‘হাইড্রোজ’ বলতে সাধারণত Sodium dithionite বা Sodium hydrosulfite নামে পরিচিত একটি রাসায়নিক পদার্থকে বোঝানো হয়। এটি একটি শক্তিশালী বিজারক ও বিরঞ্জক পদার্থ এবং বিভিন্ন শিল্পে এর ব্যবহার রয়েছে। অথচ খাবারকে অস্বাভাবিক সাদা, উজ্জ্বল বা বাহ্যিকভাবে আকর্ষণীয় করার উদ্দেশ্যে এর অপব্যবহারের অভিযোগ বাংলাদেশে রয়েছে। এখানেই প্রশ্ন আসে—একজন মুড়ি প্রস্তুতকারক কেন তার মুড়িকে অস্বাভাবিক সাদা করতে চাইবেন? একজন গুড় উৎপাদক কেন গুড়ের স্বাভাবিক রং পরিবর্তন করবেন? একজন মিষ্টি প্রস্তুতকারক কেন এমন একটি রাসায়নিক ব্যবহার করবেন, যার খাদ্যে থাকার কথা নয়?

এর প্রথম উত্তর হতে পারে—অজ্ঞতা। বাংলাদেশের ক্ষুদ্র ও অনানুষ্ঠানিক খাদ্যখাতের বড় একটি অংশে আনুষ্ঠানিক খাদ্য নিরাপত্তা প্রশিক্ষণের ঘাটতি রয়েছে। বিভিন্ন গবেষণায় রাস্তার খাবার বিক্রেতাদের বড় অংশের খাদ্য নিরাপত্তা বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ না থাকার চিত্র উঠে এসেছে। ফলে খাদ্যমানের রাসায়নিক আর শিল্পে ব্যবহৃত রাসায়নিকের পার্থক্য, কোন খাদ্য-সংযোজনী অনুমোদিত, কোনটি নয়, কতটুকু ব্যবহার করা যায় কিংবা ভুল রাসায়নিক ব্যবহারে কী ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে—এসব বিষয়ে অনেকের পর্যাপ্ত ধারণা নাও থাকতে পারে।

একজন নতুন কারিগরের কথা ভাবা যাক। তিনি একটি মুড়ির কারখানায় কাজ শিখতে গেলেন। সেখানে দেখলেন অভিজ্ঞ কারিগর একটি বিশেষ রাসায়নিক ব্যবহার করছেন। পাশের কারখানাতেও একই পদ্ধতি চলছে। জানতে চাইলে তাকে বলা হলো, “এটা দিলে মুড়ি সুন্দর হয়, আমরা তো বহু বছর ধরে এভাবেই করছি।” নতুন কর্মী হয়তো আর প্রশ্ন করলেন না—পদার্থটি আসলে কী, এটি খাদ্যে ব্যবহারের অনুমতি আছে কি না কিংবা এর নিরাপদ বিকল্প কী। তার কাছে সেটিই হয়ে গেল শেখা পদ্ধতি। কয়েক বছর পর তিনিই হয়তো আরেকজনকে একই পদ্ধতি শেখাবেন।

এভাবেই একটি ভুল পদ্ধতি একজন থেকে আরেকজনের কাছে যেতে যেতে একসময় ‘প্রচলিত পদ্ধতি’ হয়ে উঠতে পারে। অথচ কোনো কাজ বহু বছর ধরে করা হচ্ছে বলেই সেটি বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক বা নিরাপদ হয়ে যায় না।

কিন্তু অজ্ঞতা দিয়ে পুরো সমস্যাটি ব্যাখ্যা করা যায় না। খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে বাংলাদেশে পরিচালিত গবেষণাগুলো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এনেছে—মানুষ যা জানে, বাস্তবে সবসময় তা অনুসরণ করে না। অর্থাৎ জানা এবং মানার মধ্যে ব্যবধান রয়েছে। খাদ্য নিরাপত্তার নিয়ম সম্পর্কে ধারণা থাকা সত্ত্বেও বাস্তবে সেই নিয়ম অনুসরণ না করার ঘটনা দেখা যায়। তাই শুধু তথ্য দিলেই মানুষের আচরণ পরিবর্তিত হবে—এমন ধারণাও ঠিক নয়।

মানুষ সামাজিক জীব। আশপাশের মানুষ যা করছে, সেটিকে স্বাভাবিক বলে ধরে নেওয়ার প্রবণতা আমাদের মধ্যে রয়েছে। একটি বাজারে যদি দশজন উৎপাদকের মধ্যে আটজন একই অননুমোদিত পদ্ধতি অনুসরণ করেন, বাকি দুজনের ওপরও সেই পদ্ধতি অনুসরণের চাপ তৈরি হতে পারে। তখন একটি অত্যন্ত পরিচিত যুক্তি সামনে আসে—“সবাই তো করছে।”

সবাই যখন করছে, নিশ্চয় খুব খারাপ নয়। এত বছর ধরে চলছে, সমস্যা হলে এত দিনে হতো। আমি একা নিয়ম মেনে কী লাভ? এই ধরনের চিন্তা ব্যক্তির নিজের দায়িত্ববোধকে দুর্বল করতে পারে। ধীরে ধীরে ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের দায় গোষ্ঠীর মধ্যে ছড়িয়ে যায়।

এর সঙ্গে যখন ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতা যুক্ত হয়, তখন চাপ আরও বাড়ে। একজন ব্যবসায়ী দেখলেন পাশের দোকানের মুড়ি বেশি সাদা বলে বেশি বিক্রি হচ্ছে। অন্যের গুড় বেশি উজ্জ্বল বলে ক্রেতা সেটিকেই উন্নতমানের মনে করছেন। তার স্বাভাবিক পণ্য দেখতে তুলনামূলক কম আকর্ষণীয়। তখন তার সামনে একটি কঠিন প্রশ্ন তৈরি হতে পারে—নিয়ম মেনে বাজার হারাবেন, নাকি অন্যদের মতো করে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকবেন?

এখানেই খাদ্যে ভেজালের সঙ্গে অর্থনৈতিক প্রণোদনা যুক্ত হয়। নিম্নমানের কাঁচামালকে উন্নত দেখানো, উৎপাদন খরচ কমানো, পণ্যের বাহ্যিক সৌন্দর্য বাড়ানো, বিক্রি বাড়ানো কিংবা বেশি মূল্য পাওয়ার সুযোগ থাকলে একজন দুর্বল নৈতিকতার ব্যবসায়ীর কাছে অনিয়ম আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে। সিদ্ধান্তটি তখন শুধু “এটি ঠিক না ভুল”—এই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকে না; এর সঙ্গে যুক্ত হয়—“এতে আমার কত লাভ হবে?”

এরপর আসে মানুষের নিজের ঝুঁকিকে ছোট করে দেখার প্রবণতা। কেউ হয়তো জানেন কাজটি পুরোপুরি ঠিক নয়, কিন্তু নিজেকে বোঝাতে শুরু করেন—“আমি তো খুব সামান্য দিচ্ছি”, “একটু দিলে কী আর হবে”, “অন্যরা আমার চেয়েও বেশি দেয়”, “এত বছর মানুষ খাচ্ছে, কিছু তো হয়নি।”

এসব বক্তব্য বৈজ্ঞানিক ঝুঁকি নিরূপণ নয়। এগুলো নিজের আচরণকে নিজের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলার মানসিক উপায়। বিশেষ করে কোনো অনিরাপদ কাজের ক্ষতি সঙ্গে সঙ্গে চোখে না পড়লে এই ধারণা আরও শক্তিশালী হতে পারে। আজ একটি অননুমোদিত রাসায়নিক ব্যবহার করা হলো, কাল কোনো অভিযোগ এল না। পরদিন আবার ব্যবহার করা হলো। কয়েক মাস বা কয়েক বছর পর সেই ব্যক্তির কাছে কাজটি আর অস্বাভাবিক বলে মনে নাও হতে পারে।

এভাবেই শুরু হয় সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিবর্তন—অন্যায়ের স্বাভাবিকীকরণ। প্রথমবার একটি ভুল কাজ করার সময় মানুষের মনে দ্বিধা থাকতে পারে। দ্বিতীয়বার সেই দ্বিধা কিছুটা কমে। একই কাজ বারবার করতে করতে সেটি পরিচিত অভ্যাসে পরিণত হয়। একসময় সেই ব্যক্তিই নতুন কর্মীকে বলেন, “আমরা তো সবসময় এভাবেই করি।” তখন অতীতের অভ্যাসই যেন কাজটির সঠিকতার প্রমাণ হয়ে দাঁড়ায়।

এর সঙ্গে যুক্ত হয় নিজের ভুলের পক্ষে নৈতিক যুক্তি তৈরি করা। মানুষ সাধারণত নিজেকে অসৎ মানুষ হিসেবে দেখতে চায় না। তাই ভুল কাজ করলেও নিজের কাছে সেটিকে গ্রহণযোগ্য করার জন্য নানা ব্যাখ্যা তৈরি করতে পারে—“ক্রেতাই তো এমন পণ্য চায়”, “সাদা না হলে মুড়ি বিক্রি হয় না”, “উজ্জ্বল না হলে গুড় কেউ কিনবে না”, “আমি বন্ধ করলেও অন্যরা তো বন্ধ করবে না”, “এভাবে না করলে ব্যবসায় লাভ থাকবে না।”

এভাবে নিজের সিদ্ধান্তের দায় কখনো ক্রেতা, কখনো প্রতিযোগী, কখনো বাজারের ওপর সরিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু একজন খাদ্য উৎপাদক তার পণ্যে কী ব্যবহার করছেন, সেই দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত তারই।

তবে ভোক্তার ভূমিকাও উপেক্ষা করা যায় না। আমাদের নিজেদেরও প্রশ্ন করা দরকার—আমরা কেন ধবধবে সাদা মুড়িকে ভালো মুড়ি মনে করি? কেন অস্বাভাবিক উজ্জ্বল গুড়কে বেশি বিশুদ্ধ ভাবি? কেন অতিরিক্ত উজ্জ্বল রঙের মিষ্টি আমাদের বেশি আকর্ষণ করে?

প্রাকৃতিক খাদ্যের নিজস্ব রং, গন্ধ, স্বাদ ও গঠন রয়েছে এবং তাতে স্বাভাবিক তারতম্য থাকতেই পারে। সব গুড় একই রঙের হবে না। সব মুড়ি বরফের মতো সাদা হওয়ার প্রয়োজন নেই। একটি পণ্য অস্বাভাবিক সুন্দর দেখালেই সেটি বেশি নিরাপদ বা উন্নতমানের—এমন কোনো বৈজ্ঞানিক নিয়ম নেই।

কিন্তু ভোক্তা যদি বাহ্যিক সৌন্দর্যকে গুণমানের প্রধান মাপকাঠি হিসেবে দেখেন, বাজার সেই চাহিদার উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করবে। ক্রেতা অস্বাভাবিক সাদা পণ্য পছন্দ করেন, উৎপাদক আরও সাদা করার উপায় খোঁজেন, সেই পণ্য বেশি বিক্রি হয়, অন্য উৎপাদকও তা অনুসরণ করেন। একসময় অস্বাভাবিক চেহারাই আমাদের কাছে ‘স্বাভাবিক ভালো মান’ হয়ে উঠতে পারে।

অবশ্য ভোক্তার পছন্দ কোনোভাবেই খাদ্যে ভেজাল দেওয়ার বৈধতা তৈরি করে না। একজন ক্রেতা সুন্দর পণ্য চাইতে পারেন; তার অর্থ এই নয় যে উৎপাদক অননুমোদিত রাসায়নিক ব্যবহার করতে পারবেন। কিন্তু ভেজালের বাজার কেন তৈরি হয় এবং কেন টিকে থাকে, সেটি বুঝতে হলে ভোক্তার প্রত্যাশাকেও আলোচনায় আনতে হবে।

এরপর আসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—ধরা পড়ার সম্ভাবনা। আইন কত কঠোর, সেটি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আইন ভাঙলে বাস্তবে ধরা পড়ার সম্ভাবনা কতটুকু, সেটিও মানুষের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। একজন ব্যবসায়ী যদি মনে করেন অননুমোদিত রাসায়নিক ব্যবহার করে তিনি নিয়মিত বাড়তি লাভ করতে পারবেন, অথচ তার পণ্যের নমুনা পরীক্ষা হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম, তাহলে তার কাছে অনিয়মটি ‘লাভজনক ঝুঁকি’ বলে মনে হতে পারে।

তাই শুধু বড় অঙ্কের জরিমানা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন এমন নিয়মিত ও ঝুঁকিভিত্তিক নজরদারি, যাতে অনিয়ম করলে ধরা পড়ার সম্ভাবনাটিও বাস্তব বলে মনে হয়। কোন খাবারে কোন ভেজাল বেশি হচ্ছে, কোন এলাকায় সমস্যা বেশি, কোন মৌসুমে নির্দিষ্ট অনিয়ম বাড়ছে এবং কোন রাসায়নিক খাদ্য উৎপাদকের কাছে যাচ্ছে—এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে নজরদারি পরিচালনা করা প্রয়োজন।

হাইড্রোজের মতো শিল্পে ব্যবহৃত রাসায়নিকের ক্ষেত্রে শুধু শেষের মুড়ি প্রস্তুতকারক, গুড় উৎপাদক বা মিষ্টির দোকানকে জরিমানা করলেই সমস্যার মূল উৎস বন্ধ হবে না। দেখতে হবে রাসায়নিকটি কোথা থেকে আসছে, কে বিক্রি করছে, কে কিনছে এবং খাদ্য উৎপাদকের কাছে কীভাবে পৌঁছাচ্ছে। অর্থাৎ শেষের দোকান থেকে শুরু করে রাসায়নিকের উৎস পর্যন্ত পুরো সরবরাহব্যবস্থার অনুসরণযোগ্যতা প্রয়োজন।

এই জায়গাতেই খাদ্যবিজ্ঞানী ও খাদ্যপ্রযুক্তিবিদদের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। খাদ্যে ভেজালের সব সমস্যার সমাধান শুধু আইন প্রয়োগ করে সম্ভব নয়। অনেক সময় একজন ক্ষুদ্র উৎপাদক একটি অননুমোদিত রাসায়নিক ব্যবহার করেন একটি নির্দিষ্ট প্রযুক্তিগত উদ্দেশ্যে—মুড়ি আরও সাদা করা, গুড়ের রং হালকা করা, মিষ্টির গঠন ভালো রাখা, পণ্যের স্বাদ উন্নত করা কিংবা বেশি সময় ভালো রাখার জন্য। তাকে শুধু বলা হলো, “এটি ব্যবহার করা যাবে না”—তাতে সমস্যার অর্ধেক সমাধান হয়। একই সঙ্গে তাকে বলতে হবে—তাহলে নিরাপদভাবে কাজটি কীভাবে করা যাবে?

এখানেই খাদ্যবিজ্ঞানী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। যদি মুড়ির রং বা গঠন সমস্যা হয়, তাহলে কাঁচামালের মান, ধানের জাত, ভিজিয়ে রাখার সময়, তাপমাত্রা, শুকানো ও ভাজার প্রক্রিয়া পরীক্ষা করে নিরাপদ উপায়ে কাঙ্ক্ষিত গুণমান অর্জনের পথ বের করা যেতে পারে। গুড়ের ক্ষেত্রে রস সংগ্রহের স্বাস্থ্যসম্মত পদ্ধতি, দ্রুত প্রক্রিয়াজাতকরণ, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, ছাঁকন ও জ্বাল দেওয়ার পদ্ধতি উন্নত করে রাসায়নিকের ওপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগ থাকতে পারে। মিষ্টি, বেকারি ও অন্যান্য প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের ক্ষেত্রেও সঠিক কাঁচামাল, অনুমোদিত খাদ্য-সংযোজনী এবং উপযুক্ত প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে নিরাপদ বিকল্প তৈরি করা সম্ভব।

এখানে নীতিটি হওয়া উচিত—“নিষেধের সঙ্গে বিকল্পও দিতে হবে।”

একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীকে বলা হলো হাইড্রোজ ব্যবহার করবেন না, কিন্তু হাইড্রোজ ছাড়া কীভাবে তার পণ্যের গ্রহণযোগ্য রং, স্বাদ বা গঠন বজায় রাখা যাবে তা শেখানো হলো না—তাহলে তার পুরোনো অভ্যাসে ফিরে যাওয়ার ঝুঁকি থাকবে। খাদ্যবিজ্ঞানীর কাজ সেই প্রযুক্তিগত ব্যবধানটি পূরণ করা।

খাদ্যবিজ্ঞানীর আরেকটি বড় দায়িত্ব হলো জটিল খাদ্যবিজ্ঞান ও আইনকে সাধারণ উৎপাদকের ভাষায় পৌঁছে দেওয়া। একজন ক্ষুদ্র মুড়ি প্রস্তুতকারকের Sodium dithionite-এর জটিল রাসায়নিক বিক্রিয়া জানার প্রয়োজন নেই। তার জানা প্রয়োজন—কোনটি ব্যবহার করা যাবে না, কেন যাবে না এবং তার পরিবর্তে তিনি কী করবেন। একইভাবে খাদ্য-সংযোজনীর অনুমোদিত ব্যবহার, খাদ্যমানের ও শিল্পমানের রাসায়নিকের পার্থক্য, পরিচ্ছন্নতা, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, সংরক্ষণ, জীবাণু নিয়ন্ত্রণ ও মোড়কজাতকরণের মৌলিক বিষয়গুলো হাতে-কলমে শেখানো প্রয়োজন।

বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণাগার, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, বিএসটিআই, খাদ্যশিল্প এবং স্থানীয় ক্ষুদ্র উৎপাদকদের মধ্যে আরও কার্যকর সহযোগিতা তৈরি করা গেলে গবেষণাগারের জ্ঞান সরাসরি বাজারের সমস্যার সমাধানে ব্যবহার করা সম্ভব। খাদ্যবিজ্ঞানীর কাজ তখন শুধু নমুনায় ভেজাল শনাক্ত করা থাকবে না; বরং ভেজাল দেওয়ার প্রয়োজনটাই কমিয়ে আনা হবে। কোনো উৎপাদক যদি নিরাপদ প্রযুক্তি ব্যবহার করে গ্রহণযোগ্য খরচে ভালো রং, স্বাদ, গঠন ও সংরক্ষণকাল অর্জন করতে পারেন, তাহলে অননুমোদিত রাসায়নিক ব্যবহারের প্রণোদনাও কমবে।

বাংলাদেশে তাই খাদ্যে ভেজাল প্রতিরোধের একটি কার্যকর দর্শন হতে পারে—আইন বলবে কী করা যাবে না, আর খাদ্যবিজ্ঞান দেখাবে নিরাপদভাবে কীভাবে করা যাবে।

সবকিছু মিলিয়ে খাদ্যে ভেজালের পেছনের ধারাবাহিকতাটি অনেকটা এমন—অজ্ঞতা থেকে ভুল পদ্ধতি শেখা, অন্যকে দেখে সেটি গ্রহণ করা, “সবাই করছে” বলে নিজেকে বোঝানো, ছোট অনিয়ম দিয়ে শুরু করা, তাৎক্ষণিক ক্ষতি দেখতে না পাওয়া, একই কাজ বারবার করা, সেখান থেকে আর্থিক সুবিধা পাওয়া, নিজের কাজের পক্ষে যুক্তি তৈরি করা এবং ধরা পড়ার আশঙ্কা কম মনে করতে করতে একসময় অনিয়মকেই স্বাভাবিক বলে ধরে নেওয়া।

এই চক্র ভাঙতে হলে যিনি জানেন না তাকে শিক্ষা দিতে হবে, যিনি ভুল পদ্ধতি শিখেছেন তাকে সঠিক পদ্ধতির প্রশিক্ষণ দিতে হবে, ভোক্তাকে প্রাকৃতিক খাদ্যের স্বাভাবিক রং ও গঠন সম্পর্কে সচেতন করতে হবে এবং সৎ ব্যবসায়ী যেন নিয়ম মেনে চলার কারণে বাজারে পিছিয়ে না পড়েন, সেটিও দেখতে হবে। আর যিনি সবকিছু জানার পরও ইচ্ছাকৃতভাবে আর্থিক লাভের জন্য মানুষের খাবারে অননুমোদিত পদার্থ ব্যবহার করেন, তার ক্ষেত্রে কার্যকর আইন প্রয়োগের বিকল্প নেই।

সবশেষে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন প্রয়োজন আমাদের খাদ্য নিরাপত্তার সংস্কৃতিতে। একজন খাদ্য ব্যবসায়ীর মনে যদি প্রধান প্রশ্ন হয়—“এটা করলে আমি ধরা পড়ব কি না?”, তাহলে তার আচরণ নিয়ন্ত্রণের জন্য সবসময় একজন পরিদর্শকের প্রয়োজন হবে। কিন্তু প্রশ্নটি যদি হয়—“এই খাবারটি যদি আমার নিজের সন্তান বা পরিবারের কাউকে খাওয়াতে হয়, আমি কি একইভাবে তৈরি করব?”—তাহলে খাদ্য নিরাপত্তার সঙ্গে ব্যক্তিগত বিবেক ও সামাজিক দায়িত্বও যুক্ত হয়।

বাংলাদেশে খাদ্যে ভেজাল তাই শুধু অজ্ঞতার সমস্যা নয়, আবার শুধু লোভের সমস্যাও নয়। এটি অজ্ঞতা, ভুল শিক্ষা, সামাজিক অনুকরণ, অর্থনৈতিক প্রণোদনা, ভোক্তার প্রত্যাশা, নিজের ঝুঁকিকে ছোট করে দেখা, নিজের ভুলের পক্ষে যুক্তি তৈরি এবং দুর্বল নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার সম্মিলিত ফল। তাই এর সমাধানও হতে হবে সমন্বিত—শিক্ষা, খাদ্যবিজ্ঞান, নিরাপদ প্রযুক্তি, দায়িত্বশীল ব্যবসা, সচেতন ভোক্তা, নিয়মিত নজরদারি এবং কার্যকর আইন প্রয়োগকে একই সঙ্গে কাজ করতে হবে।

কারণ অন্যায় যখন বারবার ঘটে, আশপাশের সবাই সেটি করতে থাকে, বাজারে তার পুরস্কার পাওয়া যায় এবং ধরা পড়ার আশঙ্কা কম থাকে—তখন একসময় সেই অন্যায়ই স্বাভাবিক বলে মনে হতে শুরু করে। খাদ্য নিরাপত্তায় আমাদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব সম্ভবত সেখানেই—অন্যায়কে কখনোই স্বাভাবিক হয়ে উঠতে না দেওয়া।

[লেখক: খাদ্য বিজ্ঞানী; ইনোভেশন ম্যানেজার, সালুটিভিয়া, বার্মিংহাম, যুক্তরাজ্য]




সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত