সংবাদ

সন্ধ্যা থেকে শিল্প কারখানায় আগের মত গ্যাস, প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাস


সংবাদ ডিজিটাল রিপোর্ট
সংবাদ ডিজিটাল রিপোর্ট
প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:২৫ পিএম

সন্ধ্যা থেকে শিল্প কারখানায় আগের মত গ্যাস, প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাস

  • ‘জ্বালানি পরিকল্পনা’ বাস্তবায়নে ব্যবসায়ী ও গণমাধ্যমের সহযোগিতা চাইলেন সরকারপ্রধান
  • দেশে দৈনিক গড়ে গ্যাসের চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট
  • এলএনজিসহ সরবরাহ করা হয় ২৬০ কোটি ঘনফুট
  • টার্মিনালে আগুনের পর সরবরাহ নামে ২২০ কোটি ঘনফুটে
  • সোমবার সরবরাহ ছিল ২৩৬ কোটি ঘনফুট
  • পাঁচটি এলএনজি কার্গো অপেক্ষমান: পেট্রোবাংলা

চলমান গ্যাস সংকটের মধ্যে শিল্প মালিক ও ব্যবসায়ী নেতাদের সুখবর দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

তিনি বলেছেন, তার সরকার আশা করছে, মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যা থেকে শিল্পে গ্যাসের সরবরাহ ‘এক থেকে দেড় মাস’ আগের অবস্থায় ফিরবে।

সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ব্যবসায়ী নেতা ও গণমাধ্যমের ব্যক্তিদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে সরকারপ্রধান এ কথা বলেন।

দেশে গ্যাস সংকট দীর্ঘদিনের। দেশীয় উৎপাদন ও আমদানি করা এলএনজি দিয়ে চাহিদার দুই-তৃতীয়াংশ মেটানো সম্ভব হচ্ছে। এক-তৃতীয়াংশ ঘাটতির কারণে সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশপাশি শিল্পোৎপাদনেও ভাটা পড়েছে। 

এরমধ্যে গত ২১ জুলাই কক্সবাজারের মহেশখালীতে মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের (এফএসআরইউ) বয়লারে আগুন লাগার পর এলএনজি সরবরাহ অর্ধেকে নেমে গেলে গ্যাস সংকট প্রকট হয়। গ্যাসের অভাবে অনেক শিল্পোৎপাদনে ধ্বস নামে, অনেক কারখানায় উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়।

প্রধানমন্ত্রী সোমবার মতমিনিময় সভায় বলেন, দেশের দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের একটিতে দুর্ঘটনার কারণে সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে শিল্পকারখানাসহ বিভিন্ন খাতে। তবে দুর্ঘটনাজনিত সমস্যাটি এরই মধ্যে সমাধান করা হয়েছে।

তিনি বলেন, “আমরা আশা করছি, আগামীকাল সন্ধ্যা থেকে গ্যাসের সরবরাহ এক থেকে দেড় মাস আগের অবস্থায় ফিরবে।” প্রধানমন্ত্রীর উপ প্রেস সচিব হাসান শিপলু এসব কথা জানান।

চাহিদা ও ঘাটতি

পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ি, দেশে দৈনিক মোট গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। দৈনিক গড়ে সরবরাহ করা হয় ২৬০ কোটি ঘনফুটের মত। এরমধ্যে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে আসে প্রায় ১০০ কোটি ঘনফুট। দৈনিক ঘাটতি থাকে প্রায় ১২০ কোটি ঘনফুটের মত।

দেড় মাসের কিছু বেশী আগে এক্সিলারেটের বয়লারে আগুন লাগার পর দেশে দৈনিক সরবরাহ নেমে আসে ২২০ কোটি ঘনফুটে। পেট্রোবাংলার ২০-২১ জুলাইয়ের তথ্য অনুযায়ি, ওইদিন দেশে মোট গ্যাস সরবরাহ করা হয় ২৬৪ কোটি ঘনফুটের মতো। এরমধ্যে এলএনজি থেকে আসে ৯৯ কোটি ৩০ লাখ ঘনফুট।

২১ জুলাই এলএনজি টার্মিনালে আগুন লাগার পর সরবরাহ নেমে আসে ২২৬ কোটি ঘনফুটে। ওইদিন এলএনজি থেকে আসে ৬২ কোটি ঘনফুট। এরপর মধ্যপ্রাচ্য সংকটে এলএনজি জাহাজ সময়মত না আসার কারণে সরবরাহ আরো কমে যায়।

এর আগে দৈনিক গ্যাসের ঘাটতি ১২০ কোটি ঘনফুটের মতো থাকলেও দুর্ঘটনার পর ঘাটতি আরো প্রায় ৪০ থেকে ৫০ কোটি ঘনফুট বেড়ে যায়। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ধ্বস নামে। শিল্পোৎপাদন থমকে যায়। সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতেও দীর্ঘ লাইন তৈরী হয়। আবাসিকে অনেক এলাকায় চুলা বন্ধ হয়ে যায়।

নতুন টার্মিনাল

এলএনজি টার্মিনালটির দুর্ঘটনাজনিত সমস্যাটি এরই মধ্যে সমাধান করা হয়েছে উল্লেখ করে  প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ব্যবসায়ী নেতাদের উদ্দেশ্যে বলেন, মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকে গ্যাসের সরবরাহ এক থেকে দেড় মাস আগের অবস্থায় ফিরবে।

ঘাটতি মোকাবিলায় তৃতীয় একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের উদ্যোগের কথাও জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, জিটুজি ভিত্তিতে গত এক মাসে আরেকটি টার্মিনাল স্থাপনের প্রস্তুতি মোটামুটি সম্পন্ন হয়েছে। দ্রুতই কাজ শুরু হবে।

সরকার আগামী ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে তৃতীয় টার্মিনাল সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হতে পারবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তারেক রহমান।

বিদ্যুৎখাতের সমস্যাও দীর্ঘদিনের বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সমস্যাগুলো পর্যালোচনা করেছে, সংশ্লিষ্টদের নিয়ে বসেছে এবং সেগুলো সমাধানে পরিকল্পনা তৈরি করেছে। এখন তা বাস্তবায়নের কাজ চলছে।

বর্তমান সরবরাহ পরিস্থিতি

এদিকে সোমবার সন্ধ্যায় পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ি, এদিন দেশে এলএনজিসহ মোট গ্যাস সরবরাহ হয়েছে ২৩৬ কোটি ২০ লাখ ঘনফুট। এরমধ্যে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে পাওয়া গেছে ১৬০ কোটি ঘনফুট এবং এলএনজি থেকে এসেছে ৭৬ কোটি ২০ লাখ ঘনফুট।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, এলএনজি থেকে এখনো প্রায় ২০ কোটি ঘনফুট সরবরাহ ঘাটতি রয়ে গেছে।

মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকে এলএনজি সরবরাহ বাড়াবে কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে পেট্রোবাংলার সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, তাদের আরো পাঁচটি এলএনজি কার্গো পাইপলাইনে আছে। তার মতে, যথাসময়ে পাঁচটি এলএনজি জাহাজ আসা নিশ্চিৎ হওয়ার মধ্য দিয়ে সরবরাহ পরিস্থিতি আগের চেয়ে উন্নত হবে।

চ্যালেঞ্জ ও পথরেখা

তিন ঘণ্টার এই আলোচনায় ব্যবসায়ী নেতা ও গণমাধ্যমের ব্যক্তিরা বিভিন্ন বিষয়ে নিজেদের মতামত তুলে ধরেন বলেও জানান প্রধানমন্ত্রীর উপ প্রেস সচিব হাসান শিপলু। তিনি আরও জানান, সভায় ‘বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ পথরেখা’ শীর্ষক একটি উপস্থাপনা করেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।

উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া

প্রধানমন্ত্রী দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বর্তমান সংকটকে ‘উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সমস্যা’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, এই সংকট ছয় মাস বা এক বছরের মধ্যে পুরোপুরি সমাধান করা সম্ভব নয়। তবে সরকার সমস্যা চিহ্নিত করে পরিকল্পনা তৈরি করেছে এবং এখন সেগুলো বাস্তবায়নের পর্যায়ে রয়েছে।

তারেক রহমান বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করতে সরকার একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা ধরে কাজ করছে। পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে ব্যবসা-বাণিজ্যের পাশাপাশি সামগ্রিক অর্থনীতিও উপকৃত হবে।

সরকারপ্রধান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ ও গণমাধ্যমের সহযোগিতা চান। তিনি সংশ্লিষ্ট সবাইকে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি থেকে বিরত থেকে সরকারের মেয়াদে এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সুযোগ করে দেওয়ার আহ্বান জানান।

সরকার কোন কাজ কখন শেষ করতে চায়, তার একটি সম্ভাব্য সময়সীমাও সভায় ব্যবসায়ী নেতাদের সামনে তুলে ধরা হয়। বিষয়টি উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সময় কিছুটা এদিক-সেদিক হতে পারে। তবে সরকারের সামনে একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও সময়সীমা রয়েছে।

ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের সহযোগিতা চেয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ব্যবসা ও শিল্পখাত ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার সামগ্রিক প্রভাব দেশের অর্থনীতির ওপর পড়ে। ফলে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান শুধু ব্যবসায়ীদের স্বার্থের বিষয় নয়; এটি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অগ্রগতির সঙ্গে সম্পর্কিত।

এক ট্রিলিয়ন ডলার

তিনি আরও বলেন, ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পৌঁছানোর যে লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে, তা অর্জন করতে হলে নিরবচ্ছিন্ন ও পর্যাপ্ত জ্বালানি এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। সেই লক্ষ্য সামনে রেখেই সরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়েছে।

হতাশ হওয়ার কারণ নেই উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সমস্যার ব্যাপ্তি ও জটিলতা সম্পর্কে ব্যবসায়ী সম্প্রদায় আগে থেকেই অবগত। সরকার সমস্যাগুলো আড়াল না করে খোলামেলাভাবে তুলে ধরেছে। একই সঙ্গে কীভাবে সেগুলোর সমাধান করতে চায়, সেটিও জানিয়েছে।

তিনি বলেন, “আপনাদের জানাতে চাই যে আমরা এটা নিয়ে কাজ করছি। সে জন্য হতাশ হওয়ার কোনো কারণ নেই।”

সরকারের পরিকল্পনা যৌক্তিক মনে হলে তা বাস্তবায়নে সহযোগিতা করার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “এগুলো বাস্তবায়ন হলে শুধু ব্যবসায়ী সম্প্রদায় নয়, পুরো দেশ ও জাতি উপকৃত হবে।”

অস্থিতিশীলতা

দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হলে ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলেও আশঙ্কার প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, “জনগণই সময়মতো ঠিক করবে কাকে সরকার পরিচালনার দায়িত্ব দেবে। তবে যে সময় যে সরকার দায়িত্বে থাকে, তাকে তার পরিকল্পিত কাজগুলো সম্পন্ন করার সুযোগ দেওয়া উচিত।”

আলোচনায় গণমাধ্যমকর্মী ও মিডিয়া ব্যক্তিত্বদের আমন্ত্রণ জানানোর কারণ ব্যাখ্যা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকারের উদ্দেশ্য ও পরিকল্পনা গণমাধ্যমের কাছে পরিষ্কারভাবে তুলে ধরা প্রয়োজন। তা না হলে বিচ্ছিন্ন তথ্য থেকে বিভিন্ন ধরনের বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।

গণমাধ্যম সরকারের পরিকল্পনা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পেলে তা দেশবাসীর কাছে সঠিকভাবে তুলে ধরতে পারবে বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, “বড় কোনো কাজ সফলভাবে করতে একটি কার্যকর দল প্রয়োজন। সরকারের সংশ্লিষ্ট সবাই একসঙ্গে কাজ করছেন, যাতে পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনা যায়।”

ব্যবসায়ী ও গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আমাদের সহযোগিতা করবেন, যাতে আমরা আপনাদের জন্য আরও ভালো কিছু করতে পারি।”

সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, শিক্ষা, প্রবাসী কল্যাণ এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান উপদেষ্টা মাহদী আমিন, ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান, বিদ্যুৎ সচিব মিরানা মাহরুখ এবং জ্বালানি সচিব মো. জিয়াউল হক।

ব্যবসায়ী নেতাদের মধ্যে ছিলেন এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক ফজলুল হক, বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান, ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি মাহবুবুর রহমান, বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম, বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ, বাংলাদেশ জুট মিলস অ্যাসোসিয়েশনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আবুল কামাল, চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আমিরুল হক, বাংলাদেশ এগ্রো প্রসেসরস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মাহবুব আনাম প্রমুখ।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬


সন্ধ্যা থেকে শিল্প কারখানায় আগের মত গ্যাস, প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাস

প্রকাশের তারিখ : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

  • ‘জ্বালানি পরিকল্পনা’ বাস্তবায়নে ব্যবসায়ী ও গণমাধ্যমের সহযোগিতা চাইলেন সরকারপ্রধান
  • দেশে দৈনিক গড়ে গ্যাসের চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট
  • এলএনজিসহ সরবরাহ করা হয় ২৬০ কোটি ঘনফুট
  • টার্মিনালে আগুনের পর সরবরাহ নামে ২২০ কোটি ঘনফুটে
  • সোমবার সরবরাহ ছিল ২৩৬ কোটি ঘনফুট
  • পাঁচটি এলএনজি কার্গো অপেক্ষমান: পেট্রোবাংলা

চলমান গ্যাস সংকটের মধ্যে শিল্প মালিক ও ব্যবসায়ী নেতাদের সুখবর দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

তিনি বলেছেন, তার সরকার আশা করছে, মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যা থেকে শিল্পে গ্যাসের সরবরাহ ‘এক থেকে দেড় মাস’ আগের অবস্থায় ফিরবে।

সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ব্যবসায়ী নেতা ও গণমাধ্যমের ব্যক্তিদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে সরকারপ্রধান এ কথা বলেন।

দেশে গ্যাস সংকট দীর্ঘদিনের। দেশীয় উৎপাদন ও আমদানি করা এলএনজি দিয়ে চাহিদার দুই-তৃতীয়াংশ মেটানো সম্ভব হচ্ছে। এক-তৃতীয়াংশ ঘাটতির কারণে সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশপাশি শিল্পোৎপাদনেও ভাটা পড়েছে। 

এরমধ্যে গত ২১ জুলাই কক্সবাজারের মহেশখালীতে মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের (এফএসআরইউ) বয়লারে আগুন লাগার পর এলএনজি সরবরাহ অর্ধেকে নেমে গেলে গ্যাস সংকট প্রকট হয়। গ্যাসের অভাবে অনেক শিল্পোৎপাদনে ধ্বস নামে, অনেক কারখানায় উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়।

প্রধানমন্ত্রী সোমবার মতমিনিময় সভায় বলেন, দেশের দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের একটিতে দুর্ঘটনার কারণে সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে শিল্পকারখানাসহ বিভিন্ন খাতে। তবে দুর্ঘটনাজনিত সমস্যাটি এরই মধ্যে সমাধান করা হয়েছে।

তিনি বলেন, “আমরা আশা করছি, আগামীকাল সন্ধ্যা থেকে গ্যাসের সরবরাহ এক থেকে দেড় মাস আগের অবস্থায় ফিরবে।” প্রধানমন্ত্রীর উপ প্রেস সচিব হাসান শিপলু এসব কথা জানান।

চাহিদা ও ঘাটতি

পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ি, দেশে দৈনিক মোট গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। দৈনিক গড়ে সরবরাহ করা হয় ২৬০ কোটি ঘনফুটের মত। এরমধ্যে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে আসে প্রায় ১০০ কোটি ঘনফুট। দৈনিক ঘাটতি থাকে প্রায় ১২০ কোটি ঘনফুটের মত।

দেড় মাসের কিছু বেশী আগে এক্সিলারেটের বয়লারে আগুন লাগার পর দেশে দৈনিক সরবরাহ নেমে আসে ২২০ কোটি ঘনফুটে। পেট্রোবাংলার ২০-২১ জুলাইয়ের তথ্য অনুযায়ি, ওইদিন দেশে মোট গ্যাস সরবরাহ করা হয় ২৬৪ কোটি ঘনফুটের মতো। এরমধ্যে এলএনজি থেকে আসে ৯৯ কোটি ৩০ লাখ ঘনফুট।

২১ জুলাই এলএনজি টার্মিনালে আগুন লাগার পর সরবরাহ নেমে আসে ২২৬ কোটি ঘনফুটে। ওইদিন এলএনজি থেকে আসে ৬২ কোটি ঘনফুট। এরপর মধ্যপ্রাচ্য সংকটে এলএনজি জাহাজ সময়মত না আসার কারণে সরবরাহ আরো কমে যায়।

এর আগে দৈনিক গ্যাসের ঘাটতি ১২০ কোটি ঘনফুটের মতো থাকলেও দুর্ঘটনার পর ঘাটতি আরো প্রায় ৪০ থেকে ৫০ কোটি ঘনফুট বেড়ে যায়। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ধ্বস নামে। শিল্পোৎপাদন থমকে যায়। সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতেও দীর্ঘ লাইন তৈরী হয়। আবাসিকে অনেক এলাকায় চুলা বন্ধ হয়ে যায়।

নতুন টার্মিনাল

এলএনজি টার্মিনালটির দুর্ঘটনাজনিত সমস্যাটি এরই মধ্যে সমাধান করা হয়েছে উল্লেখ করে  প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ব্যবসায়ী নেতাদের উদ্দেশ্যে বলেন, মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকে গ্যাসের সরবরাহ এক থেকে দেড় মাস আগের অবস্থায় ফিরবে।

ঘাটতি মোকাবিলায় তৃতীয় একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের উদ্যোগের কথাও জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, জিটুজি ভিত্তিতে গত এক মাসে আরেকটি টার্মিনাল স্থাপনের প্রস্তুতি মোটামুটি সম্পন্ন হয়েছে। দ্রুতই কাজ শুরু হবে।

সরকার আগামী ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে তৃতীয় টার্মিনাল সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হতে পারবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তারেক রহমান।

বিদ্যুৎখাতের সমস্যাও দীর্ঘদিনের বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সমস্যাগুলো পর্যালোচনা করেছে, সংশ্লিষ্টদের নিয়ে বসেছে এবং সেগুলো সমাধানে পরিকল্পনা তৈরি করেছে। এখন তা বাস্তবায়নের কাজ চলছে।

বর্তমান সরবরাহ পরিস্থিতি

এদিকে সোমবার সন্ধ্যায় পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ি, এদিন দেশে এলএনজিসহ মোট গ্যাস সরবরাহ হয়েছে ২৩৬ কোটি ২০ লাখ ঘনফুট। এরমধ্যে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে পাওয়া গেছে ১৬০ কোটি ঘনফুট এবং এলএনজি থেকে এসেছে ৭৬ কোটি ২০ লাখ ঘনফুট।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, এলএনজি থেকে এখনো প্রায় ২০ কোটি ঘনফুট সরবরাহ ঘাটতি রয়ে গেছে।

মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকে এলএনজি সরবরাহ বাড়াবে কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে পেট্রোবাংলার সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, তাদের আরো পাঁচটি এলএনজি কার্গো পাইপলাইনে আছে। তার মতে, যথাসময়ে পাঁচটি এলএনজি জাহাজ আসা নিশ্চিৎ হওয়ার মধ্য দিয়ে সরবরাহ পরিস্থিতি আগের চেয়ে উন্নত হবে।

চ্যালেঞ্জ ও পথরেখা

তিন ঘণ্টার এই আলোচনায় ব্যবসায়ী নেতা ও গণমাধ্যমের ব্যক্তিরা বিভিন্ন বিষয়ে নিজেদের মতামত তুলে ধরেন বলেও জানান প্রধানমন্ত্রীর উপ প্রেস সচিব হাসান শিপলু। তিনি আরও জানান, সভায় ‘বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ পথরেখা’ শীর্ষক একটি উপস্থাপনা করেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।

উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া

প্রধানমন্ত্রী দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বর্তমান সংকটকে ‘উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সমস্যা’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, এই সংকট ছয় মাস বা এক বছরের মধ্যে পুরোপুরি সমাধান করা সম্ভব নয়। তবে সরকার সমস্যা চিহ্নিত করে পরিকল্পনা তৈরি করেছে এবং এখন সেগুলো বাস্তবায়নের পর্যায়ে রয়েছে।

তারেক রহমান বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করতে সরকার একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা ধরে কাজ করছে। পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে ব্যবসা-বাণিজ্যের পাশাপাশি সামগ্রিক অর্থনীতিও উপকৃত হবে।

সরকারপ্রধান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ ও গণমাধ্যমের সহযোগিতা চান। তিনি সংশ্লিষ্ট সবাইকে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি থেকে বিরত থেকে সরকারের মেয়াদে এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সুযোগ করে দেওয়ার আহ্বান জানান।

সরকার কোন কাজ কখন শেষ করতে চায়, তার একটি সম্ভাব্য সময়সীমাও সভায় ব্যবসায়ী নেতাদের সামনে তুলে ধরা হয়। বিষয়টি উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সময় কিছুটা এদিক-সেদিক হতে পারে। তবে সরকারের সামনে একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও সময়সীমা রয়েছে।

ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের সহযোগিতা চেয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ব্যবসা ও শিল্পখাত ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার সামগ্রিক প্রভাব দেশের অর্থনীতির ওপর পড়ে। ফলে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান শুধু ব্যবসায়ীদের স্বার্থের বিষয় নয়; এটি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অগ্রগতির সঙ্গে সম্পর্কিত।

এক ট্রিলিয়ন ডলার

তিনি আরও বলেন, ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পৌঁছানোর যে লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে, তা অর্জন করতে হলে নিরবচ্ছিন্ন ও পর্যাপ্ত জ্বালানি এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। সেই লক্ষ্য সামনে রেখেই সরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়েছে।

হতাশ হওয়ার কারণ নেই উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সমস্যার ব্যাপ্তি ও জটিলতা সম্পর্কে ব্যবসায়ী সম্প্রদায় আগে থেকেই অবগত। সরকার সমস্যাগুলো আড়াল না করে খোলামেলাভাবে তুলে ধরেছে। একই সঙ্গে কীভাবে সেগুলোর সমাধান করতে চায়, সেটিও জানিয়েছে।

তিনি বলেন, “আপনাদের জানাতে চাই যে আমরা এটা নিয়ে কাজ করছি। সে জন্য হতাশ হওয়ার কোনো কারণ নেই।”

সরকারের পরিকল্পনা যৌক্তিক মনে হলে তা বাস্তবায়নে সহযোগিতা করার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “এগুলো বাস্তবায়ন হলে শুধু ব্যবসায়ী সম্প্রদায় নয়, পুরো দেশ ও জাতি উপকৃত হবে।”

অস্থিতিশীলতা

দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হলে ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলেও আশঙ্কার প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, “জনগণই সময়মতো ঠিক করবে কাকে সরকার পরিচালনার দায়িত্ব দেবে। তবে যে সময় যে সরকার দায়িত্বে থাকে, তাকে তার পরিকল্পিত কাজগুলো সম্পন্ন করার সুযোগ দেওয়া উচিত।”

আলোচনায় গণমাধ্যমকর্মী ও মিডিয়া ব্যক্তিত্বদের আমন্ত্রণ জানানোর কারণ ব্যাখ্যা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকারের উদ্দেশ্য ও পরিকল্পনা গণমাধ্যমের কাছে পরিষ্কারভাবে তুলে ধরা প্রয়োজন। তা না হলে বিচ্ছিন্ন তথ্য থেকে বিভিন্ন ধরনের বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।

গণমাধ্যম সরকারের পরিকল্পনা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পেলে তা দেশবাসীর কাছে সঠিকভাবে তুলে ধরতে পারবে বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, “বড় কোনো কাজ সফলভাবে করতে একটি কার্যকর দল প্রয়োজন। সরকারের সংশ্লিষ্ট সবাই একসঙ্গে কাজ করছেন, যাতে পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনা যায়।”

ব্যবসায়ী ও গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আমাদের সহযোগিতা করবেন, যাতে আমরা আপনাদের জন্য আরও ভালো কিছু করতে পারি।”

সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, শিক্ষা, প্রবাসী কল্যাণ এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান উপদেষ্টা মাহদী আমিন, ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান, বিদ্যুৎ সচিব মিরানা মাহরুখ এবং জ্বালানি সচিব মো. জিয়াউল হক।

ব্যবসায়ী নেতাদের মধ্যে ছিলেন এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক ফজলুল হক, বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান, ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি মাহবুবুর রহমান, বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম, বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ, বাংলাদেশ জুট মিলস অ্যাসোসিয়েশনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আবুল কামাল, চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আমিরুল হক, বাংলাদেশ এগ্রো প্রসেসরস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মাহবুব আনাম প্রমুখ।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত