সংবাদ

মমেকে অগ্নিকাণ্ডে ৬ মৃত্যু, প্রশাসন-কর্তৃপক্ষের অস্বীকার


জেলা বার্তা পরিবেশক, ময়মনসিংহ
জেলা বার্তা পরিবেশক, ময়মনসিংহ
প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:৪৯ পিএম

মমেকে অগ্নিকাণ্ডে ৬ মৃত্যু, প্রশাসন-কর্তৃপক্ষের অস্বীকার
নিহতদের স্বজনদের আহাজারি।

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (মমেক) অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় আতঙ্কে হুড়োহুড়ি করে নামতে গিয়ে পদদলিত হয়ে ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনা প্রথমে মৌখিকভাবে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হলেও পরবর্তীতে পুলিশ, প্রশাসন ও  হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কেউ এ মৃত্যুর ঘটনা স্বীকার করেনি। 

তবে প্রতক্ষদর্শীদের অনেকেই বলেছেন, আগুন নিভানোর সময় হুড়োহুড়ি করে নামতে গিয়ে অনেকেই আহত হয়ে পরবর্তীতে মারা গেছেন। তবে মৃতদের স্বজনেরা বলছেন, হুড়োহুড়ির মধ্যে পড়ে গিয়ে তাদের মৃত্যু হয়েছে।

ছয় জনের মৃত্যুর ঘটনার বিষয়টি নগরীরতে এবং বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রচার হলে রাত দশটার দিকে ময়মনসিংহ সদর আসনের সংসদ সদস্য আবু ওয়াহাব আকন্দকে সাথে নিয়ে বিভাগীয় কমিশনার, সিটি প্রশাসক,  জেলা প্রশাসক,  পুলিশ সুপারসহ সরকারি উর্ধতন কর্মকর্তারা হাসপাতালে ছুটে যান। তারা ঘটনাস্থল সরেজমিনে পরিদর্শন করেন এবং রোগী, রোগীর স্বজন, চিকিৎসক এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলেন। এ সময় জেলায় কর্মরত প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার কর্মীরাও তাদের সাথে ছিলেন।

পরিদর্শন শেষে হাসপাতালের উপপরিচালকের কক্ষে এক সমন্বয় সভা শেষে বিভাগীয় কমিশনার এস এম হুমায়ুন কবির সরকার সাংবকিদের জানান, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় পদদলিত হয়ে কেউ মারা যায়নি। তবে এ ব্যাপরে মেডিসিন বিভাগের পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ কমিটি ৩ কর্ম দিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিবেন।

ঘটনার দিন সোমবারে হাসপাতালের জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসক ও  রেজিস্টারের তথ্য অনুযায়ী মৃতের তালিকায় পাওয়া মারা যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে চার জনের তথ্য পাওয়া গেছে। তারা হলেন, ফুলবাড়িয়া উপজেলার বিষ্ণুরামপুর গ্রামের পল্লিচিকিৎসক শাহাজাহান মনির (৪৫), একই উপজেলার বিদ্যানন্দ গ্রামের সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক রমজান আলী (৩৮) এবং তারাকান্দা উপজেলার বালিখা গ্রামের কুলসুম আক্তার (৩৫) রয়েছেন। আরও একজন নেত্রকোনা জেলার পূর্বধলার হাজেরা বেগম (৫০) নামের আরেক নারীর মৃত্যুর তথ্যও হাসপাতালের নথিতে নাম থাকলেও তার স্বজনেরা এককে জন একেক রকম তথ্য জানিয়েছেন।

কুলসুমের স্বামী আয়ুব আলী জানান, হার্টর সমস্যা নিয়ে গতকাল (সোমবার) সকালে আমার স্ত্রীকে নিয়ে হাসপাতালে যাই। হাসপাতালে ভর্তির পরে সে স্ট্রোক করে মারা যায়। পরে দুপুর তিনটার দিকে তাকে নিয়ে বাড়ি ফিরে আসি। আগুন লাগার ঘটনা ঘটে সন্ধ্যায়। কুলসুম আক্তারের ছেলে জানিয়েছেন মাকে হাসপাতালে ভর্তির পর আগুন লাগার খবর পেয়ে মা স্ট্রোক করে মারা যায়।

ফুলবাড়িয়া উপজেলার বিষ্ণুরামপুর গ্রামের পল্লিচিকিৎসক শাহাজাহান মনির প্রায় ১০ থেকে ১২ দিন ধরে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নতুন ভবনে মেরুদণ্ডের হাড়ে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। সন্ধ্যা ৬টা ৩৫ মিনিটে তার মৃত্যু হয়। পরে রাতেই তার মরদেহ বাড়িতে নেওয়া হয়। দুপুর ১১টার দিকে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

শাহাজাহান মনিরের ভাই কামরুজ্জামন বলেন, হাসপাতালের নতুন ভবনে আমার ভাই শাহজাহান ভর্তি ছিলেন। আগুন লাগার কথা শুনে তার সাথে থাকা দুইজন তাকে নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামতে শুরু করেন। দুই-তিন ধাপ নামার পরই পিছন থেকে ধাক্কা লেগে তারা পড়ে যান। আর তিনি অচেতন হয়ে পড়েন। পরে জানতে পারেন, ভিড়ের মধ্যে পড়ে গিয়ে তার ভাই মারা গেছেন।

তারাকান্দা উপজেলার বালিখা গ্রামের কুলসুম আক্তার ১২ দিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। ১২ বছর বয়সী ছেলে স্বাধীনকে নিয়ে তিনি ৩১ নম্বর শিশু ওয়ার্ডে ছিলেন। স্বাধীন জন্ডিসে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন ছিল। সঙ্গে ছিলেন তার ১৮ বছর বয়সী মেয়ে মিম আক্তার। সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে জরুরি বিভাগের চিকিৎসক কুলসুমকে মৃত ঘোষণা করেন। সকাল ১০টার দিকে জানাজা শেষে তার মরদেহ পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।

তার মেয়ে মিম আক্তার বলেন, আগুনের কথা শুনে তিনি, তার মা ও ভাই একসঙ্গে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামছিলেন। ভিড়ের মধ্যে তারা পিছন থেকে ধাক্কা খেয়ে পড়ে যান। তিনি উঠে ভাইকে টেনে তুললেও মাকে তুলতে গেলে আবরও তাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেওয়া হয়। মিম বলেন, ‘আম্মু তখন মানুষের ভিড়ের মধ্যে নিচে পড়েছিল। তখন আম্মু আমাকে ডাক দিয়ে বলছে, “ও মিম, আমারে ধরলি না?” আমি তখন মানুষের চাপায় পড়ে যাই।’পরে মাকে জরুরি বিভাগে নেওয়া হয় বলে জানান মিম। তার অভিযোগ, জরুরি বিভাগে দ্রুত ও যথাসময় চিকিৎসা দেওয়া হলে তার মা বেঁচে যেতে পারতেন।

ফুলবাড়িয়া উপজেলার বিদ্যানন্দ গ্রামের সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক রমজান আলী বুকের ব্যথা নিয়ে সোমবার সকালে ফুলবাড়িয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গেলে সেখান থেকে তাকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। দুপুরে তাকে হৃদরোগ বিভাগে ভর্তি করা হয়। হাসপাতালের নথিতে তার মৃত্যুর সময় দেখানো হয়েছে সন্ধ্যা ৭টা ২৫ মিনিটে।

তার স্বজনেরা জানান, আগুন লাগার সময় সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে হুড়োহুড়ির মধ্যে পড়ে তিনি মারা যান। মঙ্গলবার দুপুরে জানাজা শেষে তার গ্রামের বাড়িতে মরদেহ দাফন করা হয়।

রমজান আলীর স্ত্রী খাদিজা আক্তার জানান, আগুন লাগার খবর পেয়ে সবাই আতঙ্কিত হয়ে তাড়াতাহুড়া করে সিঁড়ি দিয়ে নামতে শুরু করি। তখন তিনিও সিঁড়ির মধ্যে পড়ে যান। পরে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার কথা শুনে স্বামীকে নিয়ে আর নিচে বা ওপর-কোনো দিকেই যেতে পারছিলাম না। পরে ‘মাঝখানে আটকা পড়ে মারা যায় আমার স্বামী। আগুন না লাগলে এই সর্বনাশ হতো না।’

রমজানের ছোট ভাই সাইফুল ইসলাম বলেন, তার ভাই হার্টের রোগী ছিলেন। আগুনের খবর পেয়ে সিঁড়িতে ধাক্কাধাক্কির মধ্যে পড়ে তিনি মারা যান। পরে তাকে জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়। হাসপাতাল থেকে রাতেই ডেথ সার্টিফিকেট ও গেট পাস দিয়ে বিদায় করে দেওয়া হয় বলে তিনি জানান।

সাইফুল বলেন, ‘আমাদের হাতে ৭টা ২৫ মিনিটে দেওয়া ডেথ সার্টিফিকেট ও গেট পাস আছে। তাহলে তারা কীভাবে বলে যে তিনি হাসপাতালে মারা যাননি?’

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানান, বিকেল ৫টা ৫৫ মিনিটের দিকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ১১ নম্বর লিফটে আগুন লাগে। এতে লিফটের বাইরের আবরণ পুড়ে যায়। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। আগুন লাগার পর হাসপাতালের বিভিন্ন তলা থেকে রোগী ও স্বজনেরা আতঙ্কে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে থাকেন। এ সময় কয়েকজন আহত হন।

নিহতদের স্বজনদের আহাজারি

হাসপাতালের জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসক ও রেজিস্টারের তথ্য অনুযায়ী, আগুন লাগার পর চারজনকে মৃত অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়েছিল। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ওই রেজিস্টারের পাতার ছবির সত্যতা হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) মোহাম্মদ মাইনউদ্দিন খান নিশ্চিত করেছেন।

সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) মোহাম্মদ মাইনউদ্দিন খান বলেন, একজন নার্স তাৎক্ষণিকভাবে ওই রেজিস্টার করেছিলেন। তবে ওই চারজন পদদলিত হয়ে মারা গেছেন-এমন কোনো তথ্য তাদের কাছে নেই। তাদের শরীরেও পদদলিত হওয়ার কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি।

এ ব্যাপরে মেডিসিন বিভাগের পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ কমিটি ৩ কর্ম দিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিবেন। 

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬


মমেকে অগ্নিকাণ্ডে ৬ মৃত্যু, প্রশাসন-কর্তৃপক্ষের অস্বীকার

প্রকাশের তারিখ : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (মমেক) অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় আতঙ্কে হুড়োহুড়ি করে নামতে গিয়ে পদদলিত হয়ে ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনা প্রথমে মৌখিকভাবে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হলেও পরবর্তীতে পুলিশ, প্রশাসন ও  হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কেউ এ মৃত্যুর ঘটনা স্বীকার করেনি। 

তবে প্রতক্ষদর্শীদের অনেকেই বলেছেন, আগুন নিভানোর সময় হুড়োহুড়ি করে নামতে গিয়ে অনেকেই আহত হয়ে পরবর্তীতে মারা গেছেন। তবে মৃতদের স্বজনেরা বলছেন, হুড়োহুড়ির মধ্যে পড়ে গিয়ে তাদের মৃত্যু হয়েছে।

ছয় জনের মৃত্যুর ঘটনার বিষয়টি নগরীরতে এবং বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রচার হলে রাত দশটার দিকে ময়মনসিংহ সদর আসনের সংসদ সদস্য আবু ওয়াহাব আকন্দকে সাথে নিয়ে বিভাগীয় কমিশনার, সিটি প্রশাসক,  জেলা প্রশাসক,  পুলিশ সুপারসহ সরকারি উর্ধতন কর্মকর্তারা হাসপাতালে ছুটে যান। তারা ঘটনাস্থল সরেজমিনে পরিদর্শন করেন এবং রোগী, রোগীর স্বজন, চিকিৎসক এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলেন। এ সময় জেলায় কর্মরত প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার কর্মীরাও তাদের সাথে ছিলেন।

পরিদর্শন শেষে হাসপাতালের উপপরিচালকের কক্ষে এক সমন্বয় সভা শেষে বিভাগীয় কমিশনার এস এম হুমায়ুন কবির সরকার সাংবকিদের জানান, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় পদদলিত হয়ে কেউ মারা যায়নি। তবে এ ব্যাপরে মেডিসিন বিভাগের পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ কমিটি ৩ কর্ম দিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিবেন।

ঘটনার দিন সোমবারে হাসপাতালের জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসক ও  রেজিস্টারের তথ্য অনুযায়ী মৃতের তালিকায় পাওয়া মারা যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে চার জনের তথ্য পাওয়া গেছে। তারা হলেন, ফুলবাড়িয়া উপজেলার বিষ্ণুরামপুর গ্রামের পল্লিচিকিৎসক শাহাজাহান মনির (৪৫), একই উপজেলার বিদ্যানন্দ গ্রামের সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক রমজান আলী (৩৮) এবং তারাকান্দা উপজেলার বালিখা গ্রামের কুলসুম আক্তার (৩৫) রয়েছেন। আরও একজন নেত্রকোনা জেলার পূর্বধলার হাজেরা বেগম (৫০) নামের আরেক নারীর মৃত্যুর তথ্যও হাসপাতালের নথিতে নাম থাকলেও তার স্বজনেরা এককে জন একেক রকম তথ্য জানিয়েছেন।

কুলসুমের স্বামী আয়ুব আলী জানান, হার্টর সমস্যা নিয়ে গতকাল (সোমবার) সকালে আমার স্ত্রীকে নিয়ে হাসপাতালে যাই। হাসপাতালে ভর্তির পরে সে স্ট্রোক করে মারা যায়। পরে দুপুর তিনটার দিকে তাকে নিয়ে বাড়ি ফিরে আসি। আগুন লাগার ঘটনা ঘটে সন্ধ্যায়। কুলসুম আক্তারের ছেলে জানিয়েছেন মাকে হাসপাতালে ভর্তির পর আগুন লাগার খবর পেয়ে মা স্ট্রোক করে মারা যায়।

ফুলবাড়িয়া উপজেলার বিষ্ণুরামপুর গ্রামের পল্লিচিকিৎসক শাহাজাহান মনির প্রায় ১০ থেকে ১২ দিন ধরে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নতুন ভবনে মেরুদণ্ডের হাড়ে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। সন্ধ্যা ৬টা ৩৫ মিনিটে তার মৃত্যু হয়। পরে রাতেই তার মরদেহ বাড়িতে নেওয়া হয়। দুপুর ১১টার দিকে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

শাহাজাহান মনিরের ভাই কামরুজ্জামন বলেন, হাসপাতালের নতুন ভবনে আমার ভাই শাহজাহান ভর্তি ছিলেন। আগুন লাগার কথা শুনে তার সাথে থাকা দুইজন তাকে নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামতে শুরু করেন। দুই-তিন ধাপ নামার পরই পিছন থেকে ধাক্কা লেগে তারা পড়ে যান। আর তিনি অচেতন হয়ে পড়েন। পরে জানতে পারেন, ভিড়ের মধ্যে পড়ে গিয়ে তার ভাই মারা গেছেন।

তারাকান্দা উপজেলার বালিখা গ্রামের কুলসুম আক্তার ১২ দিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। ১২ বছর বয়সী ছেলে স্বাধীনকে নিয়ে তিনি ৩১ নম্বর শিশু ওয়ার্ডে ছিলেন। স্বাধীন জন্ডিসে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন ছিল। সঙ্গে ছিলেন তার ১৮ বছর বয়সী মেয়ে মিম আক্তার। সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে জরুরি বিভাগের চিকিৎসক কুলসুমকে মৃত ঘোষণা করেন। সকাল ১০টার দিকে জানাজা শেষে তার মরদেহ পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।

তার মেয়ে মিম আক্তার বলেন, আগুনের কথা শুনে তিনি, তার মা ও ভাই একসঙ্গে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামছিলেন। ভিড়ের মধ্যে তারা পিছন থেকে ধাক্কা খেয়ে পড়ে যান। তিনি উঠে ভাইকে টেনে তুললেও মাকে তুলতে গেলে আবরও তাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেওয়া হয়। মিম বলেন, ‘আম্মু তখন মানুষের ভিড়ের মধ্যে নিচে পড়েছিল। তখন আম্মু আমাকে ডাক দিয়ে বলছে, “ও মিম, আমারে ধরলি না?” আমি তখন মানুষের চাপায় পড়ে যাই।’পরে মাকে জরুরি বিভাগে নেওয়া হয় বলে জানান মিম। তার অভিযোগ, জরুরি বিভাগে দ্রুত ও যথাসময় চিকিৎসা দেওয়া হলে তার মা বেঁচে যেতে পারতেন।

ফুলবাড়িয়া উপজেলার বিদ্যানন্দ গ্রামের সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক রমজান আলী বুকের ব্যথা নিয়ে সোমবার সকালে ফুলবাড়িয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গেলে সেখান থেকে তাকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। দুপুরে তাকে হৃদরোগ বিভাগে ভর্তি করা হয়। হাসপাতালের নথিতে তার মৃত্যুর সময় দেখানো হয়েছে সন্ধ্যা ৭টা ২৫ মিনিটে।

তার স্বজনেরা জানান, আগুন লাগার সময় সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে হুড়োহুড়ির মধ্যে পড়ে তিনি মারা যান। মঙ্গলবার দুপুরে জানাজা শেষে তার গ্রামের বাড়িতে মরদেহ দাফন করা হয়।

রমজান আলীর স্ত্রী খাদিজা আক্তার জানান, আগুন লাগার খবর পেয়ে সবাই আতঙ্কিত হয়ে তাড়াতাহুড়া করে সিঁড়ি দিয়ে নামতে শুরু করি। তখন তিনিও সিঁড়ির মধ্যে পড়ে যান। পরে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার কথা শুনে স্বামীকে নিয়ে আর নিচে বা ওপর-কোনো দিকেই যেতে পারছিলাম না। পরে ‘মাঝখানে আটকা পড়ে মারা যায় আমার স্বামী। আগুন না লাগলে এই সর্বনাশ হতো না।’

রমজানের ছোট ভাই সাইফুল ইসলাম বলেন, তার ভাই হার্টের রোগী ছিলেন। আগুনের খবর পেয়ে সিঁড়িতে ধাক্কাধাক্কির মধ্যে পড়ে তিনি মারা যান। পরে তাকে জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়। হাসপাতাল থেকে রাতেই ডেথ সার্টিফিকেট ও গেট পাস দিয়ে বিদায় করে দেওয়া হয় বলে তিনি জানান।

সাইফুল বলেন, ‘আমাদের হাতে ৭টা ২৫ মিনিটে দেওয়া ডেথ সার্টিফিকেট ও গেট পাস আছে। তাহলে তারা কীভাবে বলে যে তিনি হাসপাতালে মারা যাননি?’

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানান, বিকেল ৫টা ৫৫ মিনিটের দিকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ১১ নম্বর লিফটে আগুন লাগে। এতে লিফটের বাইরের আবরণ পুড়ে যায়। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। আগুন লাগার পর হাসপাতালের বিভিন্ন তলা থেকে রোগী ও স্বজনেরা আতঙ্কে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে থাকেন। এ সময় কয়েকজন আহত হন।

নিহতদের স্বজনদের আহাজারি

হাসপাতালের জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসক ও রেজিস্টারের তথ্য অনুযায়ী, আগুন লাগার পর চারজনকে মৃত অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়েছিল। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ওই রেজিস্টারের পাতার ছবির সত্যতা হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) মোহাম্মদ মাইনউদ্দিন খান নিশ্চিত করেছেন।

সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) মোহাম্মদ মাইনউদ্দিন খান বলেন, একজন নার্স তাৎক্ষণিকভাবে ওই রেজিস্টার করেছিলেন। তবে ওই চারজন পদদলিত হয়ে মারা গেছেন-এমন কোনো তথ্য তাদের কাছে নেই। তাদের শরীরেও পদদলিত হওয়ার কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি।

এ ব্যাপরে মেডিসিন বিভাগের পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ কমিটি ৩ কর্ম দিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিবেন। 


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত