কোনো ধরনের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ও লিখিত পরীক্ষা ছাড়াই জালিয়াতির মাধ্যমে দেশের শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি ব্যাংক ইসলামী ব্যাংকে ৮ হাজার ৫৪২ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে নিয়োগ দিয়েছিল বিতর্কিত এস আলম গ্রুপ। ২০১৭ সালে ব্যাংকটির দখল নেওয়ার পর থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত এসব নিয়োগ দেওয়া হয়। সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো–এই অনিয়মপ্রসূত নিয়োগপ্রাপ্তদের বড় একটি অংশই তৎকালীন চেয়ারম্যান সাইফুল আলমের (এস আলম) নিজ এলাকা চট্টগ্রামের পটিয়ার বাসিন্দা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক এক উচ্চপর্যায়ের পরিদর্শন প্রতিবেদনে জালিয়াতির এসব তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনটি ইতিমধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের কাছে দাখিল করা হয়েছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত ইসলামী ব্যাংকে মোট ১০ হাজার ৮৩২ জন কর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়। এর মধ্যে ন্যূনতম চাকরির বিজ্ঞপ্তি ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা ছাড়া সরাসরি নিয়োগ পান ৮ হাজার ৫৪২ জন। কেবল নিজেদের স্বজন ও এলাকার লোকজনকে নিয়োগ সুবিধা দিতে ওই সময়ে ব্যাংকের দীর্ঘদিনের মানবসম্পদ নীতিমালায় পরিবর্তন আনা হয়েছিল। নীতিমালার জরুরি প্রয়োজনের ধারা শিথিলতার দোহাই দিয়ে বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই গণহারে প্রবেশনারি পদ ও অন্যান্য ক্যাডারে কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়, যা ব্যাংকিং খাতের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ঘটনা।
নিয়োগের ক্ষেত্রে ভৌগোলিক ভারসাম্যের বিষয়টি চরমভাবে উপেক্ষিত হয়েছিল। মোট নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে ৮ হাজার ৯৯ জনই চট্টগ্রাম বিভাগের, যার মধ্যে কেবল পটিয়া উপজেলারই রয়েছেন ৫,১৪৮ জন। এর ফলে ব্যাংকে আঞ্চলিকীকরণের এক বিশাল ঝুঁকি তৈরি হয় এবং দেশের অন্য অঞ্চলের যোগ্য ও মেধাবী প্রার্থীরা বঞ্চিত হন।
প্রতিবেদনে আরও জানা যায়, প্রার্থীদের জীবনবৃত্তান্ত (সিভি) সংগ্রহের পদ্ধতিও ছিল অদ্ভুত। এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যানের পটিয়ার বাসভবন এবং চট্টগ্রামের আসাদগঞ্জ অফিসে বিভিন্ন লেবেলযুক্ত ‘বক্স’ রাখা হতো। ‘পটিয়া জেনারেল’, ‘পটিয়া ক্যাশ’, ‘পুরুষ ক্যাশ-সাতকানিয়া-লোহাগাড়া’ ইত্যাদি বক্সে জমা হওয়া সিভি থেকেই সরাসরি নিয়োগপত্র ইস্যু করত ব্যাংকটির তৎকালীন প্রধান কার্যালয়। এমনকি ঢাকার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শকেরা তৎকালীন কর্মরতদের লিখিত বক্তব্য নিতে গিয়ে জানতে পারেন, অনেকেই কোনো লিখিত বা ভাইভা পরীক্ষা না দিয়েই শুধু সুগন্ধা আবাসিক এলাকার বাড়িতে ভাইভা বা সরাসরি যোগদানপত্র পেয়েছিলেন।
অবশ্য কেবল এন্ট্রি লেভেলেই নয়, উচ্চপদেও ছিল চরম জালিয়াতি। এস আলমের ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) আকিজ উদ্দীন মাত্র আট বছরের অভিজ্ঞতা নিয়ে ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) পদ হাসিল করেন, যেখানে ন্যূনতম অভিজ্ঞতা থাকার কথা ২০ বছরের।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, নিয়োগ ব্যাংকের নিজস্ব বিষয় হলেও অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক অভিভাবক হিসেবে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা ও কঠোর ব্যবস্থা নেবে।
এদিকে, অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পর ২০২৫ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএর মাধ্যমে সব বিতর্কিত কর্মকর্তার একটি বিশেষ দক্ষতা যাচাই পরীক্ষার আয়োজন করে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। তবে ৫ হাজার ৩৭৩ জনের মধ্যে মাত্র ৪০২ জন পরীক্ষায় অংশ নেন এবং উত্তীর্ণ হন। পরীক্ষায় অংশ না নিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি, কর্মবিরতি ও ব্যাংকবিরোধী বিভ্রান্তি ছড়ানোর দায়ে ব্যাংকের মানবসম্পদ নীতি অনুযায়ী পরবর্তীতে ৪ হাজার৬৮৫ জন কর্মীকে তিন মাসের বেতন দিয়ে চাকরিচ্যুত করা হয়।
ইসলামী ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আলতাফ হোসাইন জানান, অনিয়মের মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া কর্মীদের দক্ষতা প্রমাণের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তারা বোর্ডের সিদ্ধান্ত অমান্য করে পরীক্ষা বর্জন করেন ও বিশৃঙ্খলা ঘটান। ফলে শৃঙ্খলার স্বার্থে প্রতিষ্ঠানের নীতিমালা অনুযায়ী তাদের অব্যাহতির সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়েছে।

বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কোনো ধরনের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ও লিখিত পরীক্ষা ছাড়াই জালিয়াতির মাধ্যমে দেশের শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি ব্যাংক ইসলামী ব্যাংকে ৮ হাজার ৫৪২ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে নিয়োগ দিয়েছিল বিতর্কিত এস আলম গ্রুপ। ২০১৭ সালে ব্যাংকটির দখল নেওয়ার পর থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত এসব নিয়োগ দেওয়া হয়। সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো–এই অনিয়মপ্রসূত নিয়োগপ্রাপ্তদের বড় একটি অংশই তৎকালীন চেয়ারম্যান সাইফুল আলমের (এস আলম) নিজ এলাকা চট্টগ্রামের পটিয়ার বাসিন্দা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক এক উচ্চপর্যায়ের পরিদর্শন প্রতিবেদনে জালিয়াতির এসব তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনটি ইতিমধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের কাছে দাখিল করা হয়েছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত ইসলামী ব্যাংকে মোট ১০ হাজার ৮৩২ জন কর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়। এর মধ্যে ন্যূনতম চাকরির বিজ্ঞপ্তি ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা ছাড়া সরাসরি নিয়োগ পান ৮ হাজার ৫৪২ জন। কেবল নিজেদের স্বজন ও এলাকার লোকজনকে নিয়োগ সুবিধা দিতে ওই সময়ে ব্যাংকের দীর্ঘদিনের মানবসম্পদ নীতিমালায় পরিবর্তন আনা হয়েছিল। নীতিমালার জরুরি প্রয়োজনের ধারা শিথিলতার দোহাই দিয়ে বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই গণহারে প্রবেশনারি পদ ও অন্যান্য ক্যাডারে কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়, যা ব্যাংকিং খাতের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ঘটনা।
নিয়োগের ক্ষেত্রে ভৌগোলিক ভারসাম্যের বিষয়টি চরমভাবে উপেক্ষিত হয়েছিল। মোট নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে ৮ হাজার ৯৯ জনই চট্টগ্রাম বিভাগের, যার মধ্যে কেবল পটিয়া উপজেলারই রয়েছেন ৫,১৪৮ জন। এর ফলে ব্যাংকে আঞ্চলিকীকরণের এক বিশাল ঝুঁকি তৈরি হয় এবং দেশের অন্য অঞ্চলের যোগ্য ও মেধাবী প্রার্থীরা বঞ্চিত হন।
প্রতিবেদনে আরও জানা যায়, প্রার্থীদের জীবনবৃত্তান্ত (সিভি) সংগ্রহের পদ্ধতিও ছিল অদ্ভুত। এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যানের পটিয়ার বাসভবন এবং চট্টগ্রামের আসাদগঞ্জ অফিসে বিভিন্ন লেবেলযুক্ত ‘বক্স’ রাখা হতো। ‘পটিয়া জেনারেল’, ‘পটিয়া ক্যাশ’, ‘পুরুষ ক্যাশ-সাতকানিয়া-লোহাগাড়া’ ইত্যাদি বক্সে জমা হওয়া সিভি থেকেই সরাসরি নিয়োগপত্র ইস্যু করত ব্যাংকটির তৎকালীন প্রধান কার্যালয়। এমনকি ঢাকার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শকেরা তৎকালীন কর্মরতদের লিখিত বক্তব্য নিতে গিয়ে জানতে পারেন, অনেকেই কোনো লিখিত বা ভাইভা পরীক্ষা না দিয়েই শুধু সুগন্ধা আবাসিক এলাকার বাড়িতে ভাইভা বা সরাসরি যোগদানপত্র পেয়েছিলেন।
অবশ্য কেবল এন্ট্রি লেভেলেই নয়, উচ্চপদেও ছিল চরম জালিয়াতি। এস আলমের ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) আকিজ উদ্দীন মাত্র আট বছরের অভিজ্ঞতা নিয়ে ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) পদ হাসিল করেন, যেখানে ন্যূনতম অভিজ্ঞতা থাকার কথা ২০ বছরের।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, নিয়োগ ব্যাংকের নিজস্ব বিষয় হলেও অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক অভিভাবক হিসেবে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা ও কঠোর ব্যবস্থা নেবে।
এদিকে, অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পর ২০২৫ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএর মাধ্যমে সব বিতর্কিত কর্মকর্তার একটি বিশেষ দক্ষতা যাচাই পরীক্ষার আয়োজন করে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। তবে ৫ হাজার ৩৭৩ জনের মধ্যে মাত্র ৪০২ জন পরীক্ষায় অংশ নেন এবং উত্তীর্ণ হন। পরীক্ষায় অংশ না নিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি, কর্মবিরতি ও ব্যাংকবিরোধী বিভ্রান্তি ছড়ানোর দায়ে ব্যাংকের মানবসম্পদ নীতি অনুযায়ী পরবর্তীতে ৪ হাজার৬৮৫ জন কর্মীকে তিন মাসের বেতন দিয়ে চাকরিচ্যুত করা হয়।
ইসলামী ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আলতাফ হোসাইন জানান, অনিয়মের মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া কর্মীদের দক্ষতা প্রমাণের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তারা বোর্ডের সিদ্ধান্ত অমান্য করে পরীক্ষা বর্জন করেন ও বিশৃঙ্খলা ঘটান। ফলে শৃঙ্খলার স্বার্থে প্রতিষ্ঠানের নীতিমালা অনুযায়ী তাদের অব্যাহতির সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়েছে।

আপনার মতামত লিখুন