ঢাকার উত্তরের আকাশে ভোরের আলো তখনও পুরোপুরি স্পষ্ট হয়নি, বাতাসে কেবল শীতের হালকা পরশ। উত্তর আর বাড্ডার ভেজা সকালে কাঠের ডালপালা আর খড়ের টুকরো দিয়ে ছাওয়া আড়তগুলোতে একের পর এক ঝুড়ি নামতে শুরু করে - নদীর হিমেল স্পর্শ গায়ে মেখে দূর জেলা থেকে আসা সবজির ঝুড়ি।
সকাল ছয়টা বাজতেই আজমপুর সমবায় মার্কেটের সরু গলিগুলো চেনা কোলাহলে মেতে ওঠে। সবজি বিক্রেতা আরিফ মিস্ত্রী কাঠের চৌকির ওপর জামরঙা বেগুন আর তাজা শিম সাজাতে সাজাতে কপালে জমা ঘাম মুছে নেন। পাশে রাখা ছোট ছোট ফুলকপিগুলোর সবুজ পাতা সরাতেই ভেতরের সাদা কুঁড়িগুলো বাল্বের হলদে আলোয় চকচক করে ওঠে।
সকালের এই কুয়াশাচ্ছন্ন বাজারে শীতের আগাম ফসলগুলো ক্রেতাদের চোখে একটা সাময়িক স্বস্তির পরশ বুলে দেয়। মুলার ধবধবে সাদা মূল, বাঁধাকপি আর লাউয়ের তাজা সবুজ রং স্টলগুলোতে যেন সাজানো ক্যানভাস। মাটির চেনা গন্ধ বাতাসে ভাসছে, মনে হয় যেন শহরের অন্তহীন মূল্যস্ফীতি আজকের সকালের জন্য কিছুটা দমে গেছে।
কিন্তু ঠিক তিনটে দোকান পরেই সেই চিত্র বদলে যায়।
আমদানি করা টমেটো আর গাজর মোছার তোয়ালেটা হাতে নিয়ে এক ক্রেতা কিছুটা গম্ভীর মুখে বলেন, ‘কপি দেখে অমনি খুশি হইয়েন না। শীতের সবজি সব নামলেও দেশি টমেটো আর কাঁচামরিচের রাগ কিন্তু কমে নাই। টমেটো এখনো ১২০, গাজর ১৪০। প্রকৃতি কিছুটা দিলে কী হবে, পরিবহনের পথ তো ছাড় দেয় না।’
পাস দিয়ে যাওয়া এক নিয়মিত ক্রেতাকে দেখে আরিফের দ্বারা মৃদু হেসে বলা হয় যে, দাম একটু নামছে; যে শিম সেদিনও হাত দেওয়া যাচ্ছিল না, তা আজ ষাট-আশিতে নামছে এবং উত্তরের মাঠগুলো এবার একটু ছাড় দেওয়া শুরু করছে।
সবজির সারির গণ্ডি পেরিয়ে যেখান থেকে বাজারটা ভিজে পিচ্ছিল হয়ে গেছে, সেখানে পরিবেশ সম্পূর্ণ ভিন্ন। ছাদ থেকে ঝুলানো লাল বাল্বগুলোর নিচে মাছ আর মাংসের বাজারে দরদামের হাঁকডাকের বদলে এক ধরনের ভারী নিস্তব্ধতা।
মাছের পট্টিতে গলিত বরফের পানির মধ্যে শুয়ে আছে রুপালি রুই আর পাঙাশের সারি। এখানে শীতের কোনো অলৌকিক প্রভাব নেই। মাঝারি রুই আগের মতোই ২৮০ থেকে ৩৮০ টাকায় আটকে আছে। আর একটু দূরে বরফের ট্রের ওপর রাখা পেটি চওড়া একজোড়া ইলিশ যেন এক দূরপ্রাপ্য স্বপ্ন - কেজিপ্রতি আড়াই হাজার টাকার দাম শুনে ক্রেতারা একটু থেমে নীরবে এগিয়ে যাচ্ছেন।
আরও পেছনে মাংসের দোকানে ভারী বটির ছন্দময় ঠক-ঠক শব্দ। ব্রয়লারের কেজি ১৮০ ছুঁইছুঁই, আর গরুর মাংস সেই ৮০০ থেকে ৮৫০ টাকাতেই অবিচল।
বাজারের মাঝখানে দাঁড়িয়ে এক মধ্যবয়সী নারী তার থলেটা গুছিয়ে নেন। ব্যাগের একপাশে কম দামে কেনা বাঁধাকপি আর মুলার সবুজ ডগা বেরিয়ে আছে, অন্যদিকে মাংসের দোকানের ঝুলানো মাংসের দিকে একবার চোখ বুলিয়ে তিনি না কেনার সিদ্ধান্ত নিয়ে ভিড়ের মধ্যে মিলিয়ে যান।
শীতের আগাম আগমন থালায় কিছুটা সবজির সবুজ এনে দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু মাছ-মাংসের বাজারের এই কঠিন বাস্তবতায় পুরো পরিবারের বাজেট মেলাতে গিয়ে শহরের সাধারণ মানুষের লড়াইটা আজও আগের মতোই রয়ে গেছে।

শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৬ নভেম্বর ২০২৬
ঢাকার উত্তরের আকাশে ভোরের আলো তখনও পুরোপুরি স্পষ্ট হয়নি, বাতাসে কেবল শীতের হালকা পরশ। উত্তর আর বাড্ডার ভেজা সকালে কাঠের ডালপালা আর খড়ের টুকরো দিয়ে ছাওয়া আড়তগুলোতে একের পর এক ঝুড়ি নামতে শুরু করে - নদীর হিমেল স্পর্শ গায়ে মেখে দূর জেলা থেকে আসা সবজির ঝুড়ি।
সকাল ছয়টা বাজতেই আজমপুর সমবায় মার্কেটের সরু গলিগুলো চেনা কোলাহলে মেতে ওঠে। সবজি বিক্রেতা আরিফ মিস্ত্রী কাঠের চৌকির ওপর জামরঙা বেগুন আর তাজা শিম সাজাতে সাজাতে কপালে জমা ঘাম মুছে নেন। পাশে রাখা ছোট ছোট ফুলকপিগুলোর সবুজ পাতা সরাতেই ভেতরের সাদা কুঁড়িগুলো বাল্বের হলদে আলোয় চকচক করে ওঠে।
সকালের এই কুয়াশাচ্ছন্ন বাজারে শীতের আগাম ফসলগুলো ক্রেতাদের চোখে একটা সাময়িক স্বস্তির পরশ বুলে দেয়। মুলার ধবধবে সাদা মূল, বাঁধাকপি আর লাউয়ের তাজা সবুজ রং স্টলগুলোতে যেন সাজানো ক্যানভাস। মাটির চেনা গন্ধ বাতাসে ভাসছে, মনে হয় যেন শহরের অন্তহীন মূল্যস্ফীতি আজকের সকালের জন্য কিছুটা দমে গেছে।
কিন্তু ঠিক তিনটে দোকান পরেই সেই চিত্র বদলে যায়।
আমদানি করা টমেটো আর গাজর মোছার তোয়ালেটা হাতে নিয়ে এক ক্রেতা কিছুটা গম্ভীর মুখে বলেন, ‘কপি দেখে অমনি খুশি হইয়েন না। শীতের সবজি সব নামলেও দেশি টমেটো আর কাঁচামরিচের রাগ কিন্তু কমে নাই। টমেটো এখনো ১২০, গাজর ১৪০। প্রকৃতি কিছুটা দিলে কী হবে, পরিবহনের পথ তো ছাড় দেয় না।’
পাস দিয়ে যাওয়া এক নিয়মিত ক্রেতাকে দেখে আরিফের দ্বারা মৃদু হেসে বলা হয় যে, দাম একটু নামছে; যে শিম সেদিনও হাত দেওয়া যাচ্ছিল না, তা আজ ষাট-আশিতে নামছে এবং উত্তরের মাঠগুলো এবার একটু ছাড় দেওয়া শুরু করছে।
সবজির সারির গণ্ডি পেরিয়ে যেখান থেকে বাজারটা ভিজে পিচ্ছিল হয়ে গেছে, সেখানে পরিবেশ সম্পূর্ণ ভিন্ন। ছাদ থেকে ঝুলানো লাল বাল্বগুলোর নিচে মাছ আর মাংসের বাজারে দরদামের হাঁকডাকের বদলে এক ধরনের ভারী নিস্তব্ধতা।
মাছের পট্টিতে গলিত বরফের পানির মধ্যে শুয়ে আছে রুপালি রুই আর পাঙাশের সারি। এখানে শীতের কোনো অলৌকিক প্রভাব নেই। মাঝারি রুই আগের মতোই ২৮০ থেকে ৩৮০ টাকায় আটকে আছে। আর একটু দূরে বরফের ট্রের ওপর রাখা পেটি চওড়া একজোড়া ইলিশ যেন এক দূরপ্রাপ্য স্বপ্ন - কেজিপ্রতি আড়াই হাজার টাকার দাম শুনে ক্রেতারা একটু থেমে নীরবে এগিয়ে যাচ্ছেন।
আরও পেছনে মাংসের দোকানে ভারী বটির ছন্দময় ঠক-ঠক শব্দ। ব্রয়লারের কেজি ১৮০ ছুঁইছুঁই, আর গরুর মাংস সেই ৮০০ থেকে ৮৫০ টাকাতেই অবিচল।
বাজারের মাঝখানে দাঁড়িয়ে এক মধ্যবয়সী নারী তার থলেটা গুছিয়ে নেন। ব্যাগের একপাশে কম দামে কেনা বাঁধাকপি আর মুলার সবুজ ডগা বেরিয়ে আছে, অন্যদিকে মাংসের দোকানের ঝুলানো মাংসের দিকে একবার চোখ বুলিয়ে তিনি না কেনার সিদ্ধান্ত নিয়ে ভিড়ের মধ্যে মিলিয়ে যান।
শীতের আগাম আগমন থালায় কিছুটা সবজির সবুজ এনে দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু মাছ-মাংসের বাজারের এই কঠিন বাস্তবতায় পুরো পরিবারের বাজেট মেলাতে গিয়ে শহরের সাধারণ মানুষের লড়াইটা আজও আগের মতোই রয়ে গেছে।

আপনার মতামত লিখুন