সংবাদ

নভেম্বর বিপ্লবের ১০৯ বছর: শ্রেণিসংগ্রামের উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা


সৈয়দ আমিরুজ্জামান
সৈয়দ আমিরুজ্জামান
প্রকাশ: ৭ নভেম্বর ২০২৬, ০১:০৬ পিএম

নভেম্বর বিপ্লবের ১০৯ বছর: শ্রেণিসংগ্রামের উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা

৭ নভেম্বর মহান সমাজতান্ত্রিক নভেম্বর বিপ্লবের ১০৯তম বার্ষিকী। শ্রমিক শ্রেণির গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং কমিউনিস্ট আদর্শের বিকাশে এই বিপ্লব বিশ্ব ইতিহাসে আজও প্রাসঙ্গিক ও গুরুত্বপূর্ণ। মহান এই বার্ষিকীতে সব বিপ্লবীর প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা ও অভিবাদন।

মানবজাতির ইতিহাসে উৎপাদনশক্তির বিকাশের ধারায় আদিম সাম্যবাদী সমাজের ভাঙনের পর সৃষ্টি হয় শ্রেণিবিভক্ত সমাজব্যবস্থা ও রাষ্ট্র। এই সমাজব্যবস্থার উদ্ভবের সঙ্গে সঙ্গে দেখা দেয় শ্রেণিশোষণ ও শ্রেণিসংগ্রাম। শোষিত ও নিপীড়িত শ্রেণি নিজেদের ওপর চেপে বসা শোষণ থেকে মুক্তির জন্য শোষক শ্রেণির বিরুদ্ধে বারবার বিদ্রোহ করেছে। সৃষ্টি করেছে ইতিহাসের নানা অধ্যায়। কিন্তু দীর্ঘদিন পর্যন্ত শোষিত মানুষ শ্রেণিশোষণ থেকে মুক্তি অর্জন করতে পারেনি।

ইতিহাসের ধারায় বুর্জোয়া ব্যবস্থার বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে বুর্জোয়া শ্রেণির বিপরীতে শ্রমিক শ্রেণির উদ্ভব ঘটে। বিভিন্ন দেশে সামন্তশ্রেণিকে হটিয়ে বুর্জোয়া শ্রেণি রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে। প্রতিষ্ঠিত হয় বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা। এই ব্যবস্থার যত বিকাশ ঘটেছে, শ্রমিক শ্রেণিরও তত বিকাশ ঘটেছে। শ্রমিক শ্রেণি ছাড়া বুর্জোয়া উৎপাদনব্যবস্থার অস্তিত্ব টিকে থাকতে পারে না।

বুর্জোয়া ব্যবস্থায় উৎপাদনপ্রক্রিয়া সামাজিক হলেও উৎপাদনের উপকরণের মালিকানা ব্যক্তিগত। জমি, বাড়ি, কলকারখানাসহ উৎপাদনের প্রধান উপকরণগুলোর মালিক বুর্জোয়া শ্রেণি। অথচ উৎপাদন করে শ্রমিক শ্রেণি। শ্রমিকের শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের মালিকানা চলে যায় বুর্জোয়া শ্রেণির হাতে। এভাবেই ইতিহাসের মঞ্চে বুর্জোয়া শ্রেণির বিপরীত শ্রেণি হিসেবে শ্রমিক শ্রেণির আবির্ভাব ঘটে। শ্রমিক শ্রেণিকে বুর্জোয়া সমাজের কবর খননকারী বলা হয়। পুঁজিবাদী সমাজে এই দুই পরস্পরবিরোধী শ্রেণির স্বার্থের সংঘাত থেকেই তীব্র শ্রেণিসংগ্রামের জন্ম হয়।

কমিউনিস্টবিরোধীরা প্রায়ই প্রশ্ন তোলেন, সোভিয়েত ইউনিয়ন আজ আর নেই, তাহলে ইতিহাসে পরিণত হওয়া নভেম্বর বিপ্লবের বার্ষিকী কেন উদ্‌যাপন করা হয়? আমাদের বিবেচনায়, সোভিয়েত ইউনিয়ন না থাকলেও নভেম্বর বিপ্লবের অভিজ্ঞতা আজও প্রাসঙ্গিক। মানবসভ্যতার ইতিহাসে এটি একটি উজ্জ্বল ঘটনা। এই বিপ্লব প্রমাণ করেছে, মানুষই তার ভবিষ্যতের চূড়ান্ত নির্ধারক। শোষিত শ্রেণির সম্মিলিত হস্তক্ষেপ ইতিহাসের গতিপথ বদলে দিতে পারে।

সমাজতান্ত্রিক নভেম্বর বিপ্লবের বিজয় মার্কসীয় তত্ত্বের বাস্তব প্রয়োগের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এটি মার্কসবাদকে একটি সৃজনশীল বিজ্ঞান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। এই বিপ্লব বিশ্বে নতুন যুগের সূচনা করে। এটি শুধু জারতন্ত্রবিরোধী বিপ্লব ছিল না; চরিত্রের দিক থেকে ছিল সাম্রাজ্যবাদবিরোধী, পুঁজিবাদবিরোধী ও সমাজতান্ত্রিক। শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে মানবসভ্যতার অগ্রগতির যে সম্ভাবনার কথা মার্কসবাদ তুলে ধরেছিল, নভেম্বর বিপ্লব তা বাস্তবে প্রতিষ্ঠার পথ দেখায়।

আমেরিকান মার্কসবাদী দার্শনিক ও অর্থনীতিবিদ লিও হুবারম্যান বলেছিলেন, ‘ঊনবিংশ শতাব্দীর সমাপ্তির ১৭ বছর আগে কার্ল মার্কস প্রয়াত হয়েছেন। বিংশ শতাব্দীর শুরুর ১৭ বছর পর কার্ল মার্কস পুনর্জীবন লাভ করেছেন।’ নভেম্বর বিপ্লবের প্রাসঙ্গিকতা আলোচনায় যাঁর কথা অনিবার্যভাবে সামনে আসে, তিনি মহান চিন্তানায়ক কার্ল মার্কস। তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ফ্রেডরিক এঙ্গেলসও এই বিপ্লবের তাত্ত্বিক ভিত্তি নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। মার্কসের চিন্তার ওপর দাঁড়িয়েই নভেম্বর বিপ্লবের বিশাল কর্মযজ্ঞ পরিচালিত হয়।

পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ দার্শনিক কার্ল মার্কসের চিন্তার উৎস কী? কমরেড লেনিন সংক্ষেপে বলেছিলেন, মার্কসের চিন্তার প্রধান তিনটি উৎস হলো জার্মান দর্শন, ইংল্যান্ডের অর্থনীতি এবং ফরাসি কাল্পনিক সমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারা। মার্কসবাদেরও তিনটি প্রধান উপাদান রয়েছে—মার্কসীয় দর্শন, মার্কসীয় রাজনৈতিক অর্থনীতি এবং বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র ও বিপ্লবের তত্ত্ব। লেনিন তার ‘মার্কসবাদের তিনটি উৎস ও তিনটি উপাদান’ প্রবন্ধে বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছেন।

মার্কসের মৌলিক চিন্তা বুঝতে তার তিনটি আবিষ্কার বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, দ্বান্দ্বিক ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদ। এর মাধ্যমে তিনি দেখিয়েছেন, বস্তুজগতের পাশাপাশি মানবসমাজের ইতিহাসেরও দ্বান্দ্বিক বিকাশ ঘটে। প্রাচীন সমাজব্যবস্থার বিবর্তনের ধারায় পুঁজিবাদী সমাজের উদ্ভব ঘটেছে এবং মার্কসীয় বিশ্লেষণ অনুযায়ী এর পরবর্তী ঐতিহাসিক পর্যায় সমাজতন্ত্র। দ্বিতীয়ত, শ্রেণিসংগ্রাম ইতিহাসের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। তৃতীয়ত, উদ্বৃত্ত মূল্যের তত্ত্ব। শ্রমিকের উৎপাদিত মূল্যের যে অংশ তার মজুরি হিসেবে ফিরে আসে না, তা থেকেই উদ্বৃত্ত মূল্য সৃষ্টি হয়। এই উদ্বৃত্ত মূল্য পুঁজি ও মুনাফা সৃষ্টির ভিত্তি। সামাজিক শ্রম ও ব্যক্তিগত মালিকানার মধ্যকার সংঘাত শ্রমিক ও মালিকের দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হয়। ১৭৮ বছর আগে লেখা ‘কমিউনিস্ট ইশতেহার’-এ এই শ্রেণিবিরোধের বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

মার্কস ও এঙ্গেলসের কর্মকাণ্ডের প্রভাব ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে। উনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে রাশিয়াতেও এই প্রভাব পৌঁছায়। সে সময় রাশিয়ার সামাজিক ও অর্থনৈতিক চরিত্রে ইউরোপ ও এশিয়ার বৈশিষ্ট্যের মিশ্রণ ছিল। মূলত ১৮৮০-এর দশক থেকে খনি ও রেলপথশিল্পে পুঁজিবাদের বিকাশের মধ্য দিয়ে সেখানে শ্রমিক শ্রেণির আবির্ভাব ঘটে। জারতান্ত্রিক শাসনে কৃষকেরা শুধু শোষিতই ছিল না, অনেক ক্ষেত্রে তাদের জীবন ছিল কার্যত দাসত্বের মতো।

সে সময় শ্রমিকদের মধ্যে রাজনৈতিক আলোচনা ও বিতর্কে নারোদনিক মতাবলম্বীদের প্রভাব ছিল। তারা সন্ত্রাসবাদী পদ্ধতিতে বিশ্বাস করতেন। এই মতবাদের অনুসারী হওয়ায় লেনিনের দাদার ফাঁসি হয়েছিল। লেনিন বুঝতে পেরেছিলেন, সন্ত্রাসবাদী পথে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। বিকল্প পথের সন্ধানে তিনি বিভিন্ন রাজনৈতিক আলোচনা ও মতবিনিময় কেন্দ্রে যেতেন। এমনই একটি কেন্দ্র ছিল জর্জি প্লেখানভের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, যিনি রাশিয়ায় মার্কসবাদের চর্চার সূচনা করেছিলেন।

প্লেখানভের চিন্তা লেনিনকে উৎসাহিত করে। তিনি ভাবতে শুরু করেন, রাশিয়ায় কেন এবং কীভাবে বিপ্লব সম্ভব। তত্ত্ব ও প্রয়োগের সমন্বিত চর্চায় নিজেকে নিয়োজিত করেন। রাশিয়ায় কমিউনিস্ট পার্টি গঠনের মতাদর্শগত ভিত্তি নির্মাণের জন্য তিনি লেখেন ‘কী করিতে হইবে’। আর সাংগঠনিক কর্মকৌশল ও সংগঠনকে শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন ‘এক পা এগিয়ে, দুই পা পিছিয়ে’ গ্রন্থে।

সে সময় রাশিয়ায় শ্রমিক আন্দোলন, ধর্মঘট এবং দুমা নিয়ে বিতর্ক ক্রমেই জোরালো হচ্ছিল। দেশের অভ্যন্তরীণ ঘটনাপ্রবাহ দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছিল। এই পরিস্থিতির চূড়ান্ত প্রকাশ ঘটে ১৯১৭ সালের দুটি বিপ্লবের মধ্য দিয়ে।

প্রথমটি ছিল ফেব্রুয়ারি মাসের গণতান্ত্রিক বিপ্লব। এর মধ্য দিয়ে জার সাম্রাজ্যের অবসান ঘটে। এই বিপ্লবে শ্রমিক শ্রেণির উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ হলেও নেতৃত্ব চলে যায় বুর্জোয়া ও সংশোধনবাদী দলগুলোর হাতে। মেনশেভিকদের সমর্থনে কেরেনস্কি সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু লেনিনের নেতৃত্বে বলশেভিক পার্টি ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের সীমাবদ্ধতা ও অসম্পূর্ণতা যথাযথভাবে চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়। এর পেছনে ছিল লেনিনের আগের দুটি ব্যর্থ বিপ্লবের অভিজ্ঞতা।

প্যারি কমিউনের নেতাদের চিন্তায় একটি বড় সীমাবদ্ধতা ছিল। ক্ষমতা দখলের পর তারা রাষ্ট্রক্ষমতার পুরোনো কাঠামো অটুট রেখেছিলেন। অন্যদিকে, ১৯০৫ সালে রাশিয়ার শহরগুলোতে শ্রমিকেরা অভ্যুত্থান করলেও কৃষকেরা তাদের পাশে দাঁড়ায়নি। শ্রমিক ও কৃষকের ঐক্য যে বিপ্লবের জন্য জরুরি, লেনিন তা উপলব্ধি করেন। এ বিষয়ে তিনি ‘গ্রামের গরিবদের প্রতি’ গ্রন্থে নিজের মূল্যায়ন তুলে ধরেন।

১৯১৭ সালের এপ্রিলে বিদেশ থেকে ফিরে লেনিন স্লোগান দেন, ‘সমস্ত ক্ষমতা সোভিয়েতের হাতে চাই।’ ‘এপ্রিল থিসিস’-এর মাধ্যমে তিনি গণতান্ত্রিক বিপ্লব থেকে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের দিকে এগিয়ে যাওয়ার কর্মপন্থা তুলে ধরেন। শ্রমিক, সৈনিক ও কৃষকদের সম্মিলিত সংগঠন হিসেবে সোভিয়েতকে ক্ষমতার কেন্দ্রে প্রতিষ্ঠার কথা বলেন। ‘রুটি, জমি ও শান্তি’—এই দাবি সাধারণ মানুষের মধ্যে গভীরভাবে ছড়িয়ে পড়ে। তা বিপ্লবী শক্তিকে সংগঠিত করে। শেষ পর্যন্ত শোষিত মানুষের সম্মিলিত শক্তির বিজয় ঘটে। ইউরোপের পশ্চাৎপদ দেশগুলোর একটি রাশিয়ায় বিশ্বের প্রথম সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়।

নবগঠিত সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রকে ধ্বংস করার জন্য শুরু হয় নানা ষড়যন্ত্র। প্রতিবিপ্লবীরা সংগঠিত হয়ে শ্বেতবাহিনীর নামে সরকার উৎখাতের চেষ্টা চালায়। বারোটি সাম্রাজ্যবাদী দেশ প্রত্যক্ষভাবে এসব প্রতিবিপ্লবী শক্তিকে সহায়তা করে। বলশেভিকরা শ্রমিক, কৃষক, সেনাবাহিনীর বড় অংশ এবং সাধারণ মানুষের সমর্থন নিয়ে এই শক্তিকে পরাস্ত করে। এরপর সমাজতন্ত্র গড়ে তোলার কঠিন সংগ্রাম শুরু হয়।

এ সময় নয়া অর্থনৈতিক নীতি চালু করা হয়। লেনিনের মৃত্যুর পর স্তালিনের নেতৃত্বে শুরু হয় ‘স্তাখানোভীয় আন্দোলন’। এর মূল লক্ষ্য ছিল উৎপাদনব্যবস্থার উন্নয়ন, শ্রমিকের সৃজনশীলতা বৃদ্ধি এবং উৎপাদনে গতি আনা। ১৯৪১ সালের মধ্যে রাশিয়া একটি পশ্চাৎপদ দেশ থেকে বিশ্বের অন্যতম শিল্পোন্নত ও সামরিক শক্তিধর রাষ্ট্রে পরিণত হয়। সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠা সমাজ ও অর্থনীতির ক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আনে। সেখানে পূর্ণ কর্মসংস্থান, সর্বজনীন ও বিনা মূল্যে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন এবং নারীর সমানাধিকারের মতো গুরুত্বপূর্ণ অর্জন সম্ভব হয়েছিল।

১৯৩২ সালে ‘নিউইয়র্ক টাইমস’-এর সাংবাদিক ওয়াল্টার ডুরান্টি মন্তব্য করেছিলেন, সোভিয়েত ইউনিয়নে সমাজতন্ত্রের কাঠামো নির্মাণের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। ১৯৩৬ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি ‘ম্যানচেস্টার গার্ডিয়ান’ পত্রিকার সম্পাদকীয়তেও স্বীকার করা হয়, সংশয়ী বিশ্বকে মানতে হবে যে রাশিয়ায় যৌথ মালিকানার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

১৮৪৫ সালে ‘দ্য জার্মান আইডিওলজি’ গ্রন্থে ফয়েরবাখ প্রসঙ্গে মার্কস একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা লিখেছিলেন, ‘দার্শনিকরা নানাভাবে এই জগৎকে ব্যাখ্যা করেছেন, কিন্তু আসল কথা হলো একে পরিবর্তন করা।’ নভেম্বর বিপ্লবের মধ্য দিয়ে সম্পূর্ণ নতুন একটি অর্থনৈতিক ও শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়, যার চালিকাশক্তি ছিল নিপীড়িত জনগণ।

১৯৩০ সালে রাশিয়া ভ্রমণের অভিজ্ঞতা নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘রাশিয়ার চিঠি’তে লিখেছিলেন, ‘আমি নিজের চোখে না দেখলে কোনো মতেই বিশ্বাস করতে পারতুম না যে অশিক্ষা ও অবমাননার নিম্নতম তল থেকে আজ কেবলমাত্র ১০ বছরের মধ্যে লক্ষ লক্ষ মানুষকে এরা শুধু ক খ গ ঘ শেখায়নি, মনুষ্যত্বে সম্মানিত করেছে।’ রবীন্দ্রনাথ রাশিয়ায় কোথাও ‘ধনগরিমার ইতরতা’ দেখেননি বলেও উল্লেখ করেছিলেন।

নভেম্বর বিপ্লবের পর বিংশ শতাব্দীর ইতিহাসে সমাজতন্ত্র গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব বিস্তার করে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে ওঠে। ফ্যাসিবাদকে পরাস্ত করতে সোভিয়েতের লাল ফৌজ নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করে। এর ফলে পূর্ব ইউরোপে একাধিক সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। একই সঙ্গে ঔপনিবেশিকতাবিরোধী সংগ্রামও নতুন অনুপ্রেরণা পায়। সে সময় ১১টি সাম্রাজ্যবাদী দেশ ১০৭টি দেশকে নিজেদের অধীনে রেখেছিল। নভেম্বর বিপ্লবের পর এসব দেশে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী মুক্তিসংগ্রাম আরও জোরালো হয়।

সমাজতান্ত্রিক সমাজের চরিত্র কী হবে, এর দৃষ্টিভঙ্গি কেমন হবে এবং কীভাবে এই ব্যবস্থা সাম্যবাদে রূপান্তরিত হবে—এসব প্রশ্নে মার্কসীয় শিক্ষার ভিত্তিতে লেনিনের ব্যাখ্যা মার্কসবাদকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। মার্কসীয় তত্ত্বচর্চা আসলে একটি পুনর্গঠন ও বিকাশের প্রক্রিয়া। এর উদ্দেশ্য বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের বাস্তব প্রয়োগে সহায়তা করা। লেনিনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবদান হলো সাম্রাজ্যবাদ সম্পর্কে মার্কসবাদী উপলব্ধিকে আরও বিকশিত করা এবং তাকে বিপ্লবী কৌশলের অংশে পরিণত করা।

লেনিন লক্ষ্য করেছিলেন, পুঁজি ক্রমে সংহত ও কেন্দ্রীভূত হওয়ার ফলে একচেটিয়া পুঁজিবাদের সৃষ্টি হয়। এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সাম্রাজ্যবাদ বিশ্বকে পুঁজিবাদী শোষণের আওতায় নিয়ে আসে। প্রচলিত মার্কসীয় ধারণা ছিল, উন্নত পুঁজিবাদী দেশেই সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সংঘটিত হবে। কিন্তু লেনিন এই ধারণার সীমাবদ্ধতা তুলে ধরেন। তিনি দেখান, সাম্রাজ্যবাদের যুগে পুঁজিবাদের অসম বিকাশের কারণে অপেক্ষাকৃত পশ্চাৎপদ কোনো দেশেও সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সফল হতে পারে। সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থার দুর্বলতম গ্রন্থি ভেঙে বিপ্লবের পথ তৈরি হতে পারে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় জারশাসিত রাশিয়া ছিল সেই দুর্বলতম গ্রন্থি।

নভেম্বর বিপ্লবের প্রভাবে পরবর্তী সময়ে চীন, ভিয়েতনাম, উত্তর কোরিয়া ও কিউবায় বিপ্লব সংঘটিত হয়। তবে উন্নত পুঁজিবাদী দেশগুলোতে বিপ্লব ঘটেনি। সাম্রাজ্যবাদ সম্পর্কে লেনিনের বিশ্লেষণ থেকে নভেম্বর বিপ্লবের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত শিক্ষা পাওয়া যায়। পশ্চাৎপদ অর্থনীতিকে সমাজতন্ত্রের পথে এগিয়ে নেওয়ার জন্য তিনি এক দেশে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনার কথা বলেন। একই সঙ্গে বিপ্লবের বিভিন্ন পর্যায়ের তত্ত্ব তুলে ধরেন। গণতান্ত্রিক বিপ্লবকে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের দিকে এগিয়ে নেওয়ার পথ দেখান। পুঁজিবাদ ও জমিদারতন্ত্রের বিরুদ্ধে শ্রমিক-কৃষক মৈত্রীর কৌশল গ্রহণ করেন। জাতীয় প্রশ্নে মার্কসবাদী দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন, যার মধ্যে জারশাসিত রাশিয়ার নিপীড়িত জাতিগুলোর আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারও অন্তর্ভুক্ত ছিল। নভেম্বর বিপ্লব নতুন ধরনের বিপ্লবী দল, সংগঠন ও সাংগঠনিক অনুশীলনের ধারণাকেও সামনে নিয়ে আসে।

আজকের বিশ্ব পরিস্থিতি

প্রায় ৩৫ বছর আগে নানা অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক কারণে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ঘটে। অনেকে মনে করেন, সোভিয়েতের পতন সমাজতন্ত্র ও মার্কসবাদের মৃত্যুঘণ্টা বাজিয়ে দিয়েছে। তাদের ধারণা, মানবজাতির ভবিষ্যৎ পুঁজিবাদের অন্তহীন বিস্তারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু সোভিয়েতের পতন মানে সবকিছুর অবসান নয়। আবার এই পতনে কিছুই হয়নি, এমন ভাবারও সুযোগ নেই। এর ফলে বিশ্ব সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন অনেকটা পিছিয়ে গেছে।

বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সাম্রাজ্যবাদের অনুকূলে থাকলেও সাম্রাজ্যবাদ ও সমাজতন্ত্রের মধ্যকার মৌলিক দ্বন্দ্বের অবসান ঘটেনি। চীনের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান সংঘাত এই দ্বন্দ্বকে আরও তীব্র করছে। এক নতুন ধরনের শীতল যুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

প্রথম শীতল যুদ্ধের সময় সোভিয়েত ইউনিয়ন কখনোই যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক শক্তির কাছাকাছি পৌঁছাতে পারেনি। ১৯৭৫ সালে সোভিয়েত অর্থনীতির শক্তি সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছিল। তখন সোভিয়েতের মোট দেশজ উৎপাদন ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ৪৪ দশমিক ৪ শতাংশ। আর বর্তমানে চীনের মোট দেশজ উৎপাদন যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৭৫ শতাংশের সমান বলে ধারণা করা হয়। উন্নত প্রযুক্তির কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে চীনের দ্রুত অগ্রগতি যুক্তরাষ্ট্রকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো যাতে অর্ধপরিবাহী প্রযুক্তি ও উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন চিপ সংগ্রহ করতে না পারে, সে জন্য শুল্ক আরোপের পাশাপাশি নতুন নিষেধাজ্ঞা ও নিয়ন্ত্রণবিধি জারি করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হতে পারে, তা নিয়েও নতুন করে বিশ্লেষণ ও পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রশক্তির আধিপত্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিভিন্ন অঞ্চলে আগ্রাসী সামরিক অভিযান পরিচালিত হয়েছে। সার্বিয়ায় বোমাবর্ষণ, আফগানিস্তান ও ইরাকে সামরিক অভিযান, সুদান, লিবিয়া ও সিরিয়ায় হস্তক্ষেপ এবং বর্তমানে ফিলিস্তিনে বর্বরোচিত আক্রমণ এর উদাহরণ। ইউক্রেন সংঘাতের পেছনেও ন্যাটোর পরিকল্পনার ভূমিকা রয়েছে বলে মনে করা হয়। তবে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর মধ্যে পারস্পরিক দ্বন্দ্বও বিদ্যমান।

বর্তমানে আন্তর্জাতিক লগ্নিপুঁজি সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থার ওপর আধিপত্য বিস্তার করছে। লেনিনের সময়কার লগ্নিপুঁজির সঙ্গে এর চরিত্রগত কিছু পার্থক্য রয়েছে। মুনাফা সর্বোচ্চ করার লক্ষ্যে অর্থনীতির একটি বড় অংশ ফাটকাবাজারের দিকে স্থানান্তরিত হচ্ছে। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় অর্থনীতির আর্থিকীকরণ। সম্পদের বাজারমূল্য অনুযায়ী বিশ্বের বৃহৎ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে গুগল, ফেসবুক, অ্যাপল, আমাজন, মাইক্রোসফট, আলিবাবা ও টেনসেন্টের মতো প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান সরাসরি প্রচলিত উৎপাদনব্যবস্থায় অংশ না নিয়েও বিপুল মুনাফা অর্জন করছে। এই ব্যবস্থাকে বলা হচ্ছে মঞ্চনির্ভর অর্থনীতি।

আগে পুঁজির প্রধান রূপ ছিল বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠানে কেন্দ্রীভূত অংশীদারিভিত্তিক পুঁজিবাদ। বর্তমানে শেয়ারধারীদের স্বার্থকেন্দ্রিক পুঁজিবাদের বিস্তার ঘটেছে। সাম্প্রতিক সময়ে লগ্নিপুঁজির ধরন ও করপোরেট সংগঠনে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। আমাদের পার্টি ১৯৯২ সালে চতুর্দশ কংগ্রেসে ‘কিছু মতাদর্শগত বিষয় সম্পর্কে প্রস্তাব’ এবং ২০১২ সালে বিংশতম কংগ্রেসে ‘কয়েকটি মতাদর্শগত বিষয় সম্পর্কে প্রস্তাব’ গ্রহণের মাধ্যমে তাত্ত্বিক উপলব্ধিকে সময়োপযোগী ও সমৃদ্ধ করার চেষ্টা করেছে।

সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর যারা পুঁজিবাদের চূড়ান্ত বিজয় ঘোষণা করেছিলেন, আজকের পুতিনের রাশিয়া এবং পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোর সংকট, বিভক্তি ও সংঘাতের মধ্যে তারা কি গণতন্ত্র ও সভ্যতার অগ্রগতি দেখতে পাচ্ছেন? ১৯৯৭-৯৮ সালের এশীয় অর্থনৈতিক সংকট এবং ২০০৮ সালের অর্থনৈতিক বিপর্যয় থেকে পুঁজিবাদ এখনো পুরোপুরি মুক্ত হতে পারেনি। এসব ঘটনা কি পুঁজিবাদের সীমাবদ্ধতা ও ব্যর্থতাকে সামনে আনে না?

বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পূর্বাভাস অনুযায়ী, পুঁজিবাদ দীর্ঘস্থায়ী মন্দার মুখে পড়তে পারে। আয় ও সম্পদের বৈষম্য ক্রমাগত বাড়ছে। বিশ্বের মোট জনসংখ্যার মাত্র ১০ শতাংশ মানুষের হাতে রয়েছে মোট সম্পদের ৭৬ শতাংশ। জনস্বার্থের পরিবর্তে আন্তর্জাতিক লগ্নিপুঁজির স্বার্থ রক্ষাই রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নীতির প্রধান লক্ষ্য হয়ে উঠছে।

বাংলাদেশের মতো দেশেও নয়া উদারনৈতিক অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর স্বনির্ভরতার প্রশ্নটি গৌণ হয়ে পড়েছে। ঋণনির্ভর ব্যয় বাড়িয়ে কৃত্রিম চাহিদা তৈরির মাধ্যমে সংকট মোকাবিলার চেষ্টা উন্নত দেশগুলোতে ব্যর্থ হচ্ছে। বাড়ছে মন্দা ও বেকারত্ব। উন্নয়নশীল দেশগুলোও বড় ধরনের ঋণসংকটে ভুগছে। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের আগ্রাসী মনোভাব উন্নয়নশীল দেশগুলোর সঙ্গে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির দ্বন্দ্বকে আরও প্রভাবিত করছে।

বর্তমান সংকট থেকে বেরিয়ে আসার নামে শ্রমজীবী মানুষের ওপর অভূতপূর্ব ব্যয়সংকোচনের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। মানুষের আয় ও জীবনধারণের প্রয়োজনকে উপেক্ষা করা হচ্ছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কৃষিতে ভর্তুকি কমানো হচ্ছে। কৃষি উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়ানো, দরিদ্র মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং শিল্পোৎপাদনের অগ্রগতির মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রেও রাষ্ট্রের ভূমিকা ক্রমাগত সংকুচিত হচ্ছে।

চাহিদা বাড়াতে রাষ্ট্রের ভূমিকা কমে যাওয়ায় অতিরিক্ত উৎপাদন ও অর্থনৈতিক ভারসাম্যহীনতা তৈরি হচ্ছে। এর সঙ্গে বাড়ছে বেকারত্ব, শ্রমিক ছাঁটাই ও মজুরি হ্রাস। এসব সংকট ক্রমেই বিভিন্ন দেশকে গ্রাস করছে।

বিশ্ব পুঁজির অবাধ কার্যক্রম নিশ্চিত করতে বিভিন্ন দেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব দুর্বল করা প্রয়োজন হয়ে পড়ছে। আর তা সম্ভব হয় না যদি জনগণের রাজনৈতিক ক্ষমতা কমানো এবং গণতন্ত্রকে দুর্বল করা না যায়। একদিকে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের খামখেয়ালিপনা মেনে চলা, অন্যদিকে দেশের জনগণের ইচ্ছার প্রতি সম্মান দেখানো—এই দুই বিপরীতমুখী লক্ষ্য পূরণ ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। ফলে শ্রম ও পুঁজির মধ্যকার মৌলিক দ্বন্দ্ব আরও তীব্র হচ্ছে।

নয়া উদারনীতির এই সংকটের সুযোগ নিয়ে দক্ষিণপন্থী স্বৈরাচারী শক্তি নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে চাইছে। সামগ্রিকভাবে বিশ্ব রাজনীতির ভারসাম্য দক্ষিণপন্থার দিকে ঝুঁকে পড়লেও লাতিন আমেরিকার ব্রাজিল, চিলি ও কলম্বিয়ার মতো দেশে কিছু ব্যতিক্রমী অবস্থান দেখা যাচ্ছে। সেখানে নতুন রূপে সমাজতন্ত্রের জন্য দীর্ঘস্থায়ী সংগ্রাম গড়ে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশেও গত ১৬ বছরে করপোরেট পুঁজি ও লগ্নিপুঁজির নিয়ন্ত্রণে অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব, ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্র, উন্নয়ন কাঠামো ও সামাজিক ন্যায়বিচার আক্রান্ত হয়েছে। পুঁজি ও শ্রমের মধ্যকার শ্রেণিসংগ্রাম অব্যাহত রয়েছে। সংকট যত বাড়বে, এই সংগ্রামও তত তীব্র হবে।

বর্তমান বিশ্বে চারটি প্রধান সামাজিক দ্বন্দ্ব বিদ্যমান। মার্কসবাদী বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পুঁজিবাদকে অতিক্রম করে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়েই এসব দ্বন্দ্বের সমাধান সম্ভব। প্রশ্ন হলো, পৃথিবী কি মুষ্টিমেয় পুঁজিপতির হাতে ছেড়ে দেওয়া হবে, নাকি তাদের হাত থেকে ক্ষমতা কেড়ে নেওয়ার সংগ্রাম চলবে?

আমাদের সময়ের এই নতুন ক্রান্তিকালে নভেম্বর বিপ্লবের বিপ্লবী উত্তরাধিকার সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে নতুন শক্তি জোগাতে পারে। বাংলাদেশেও বামপন্থিদের সামনে সম্ভাবনার নতুন ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। পুঁজিবাদী সংকট, সাম্প্রদায়িকতা, বৈষম্য, বিভেদ এবং বিরুদ্ধ মত নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে জনগণকে সংগঠিত করতে হবে। সমাজতান্ত্রিক বিকল্পকে বাস্তবসম্মতভাবে তুলে ধরতে হবে। এ ক্ষেত্রে নভেম্বর বিপ্লব ও ‘কমিউনিস্ট ইশতেহার’ হতে পারে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার।

পুঁজির সম্পর্ক এবং সেই সম্পর্ক থেকে মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা নানা সময়ে বাধার মুখে পড়েছে। কিন্তু তা থেমে যায়নি। যত বাধাই আসুক, মানুষই ইতিহাস রচনা করবে।

মার্কসবাদ-লেনিনবাদ ও নভেম্বর বিপ্লব বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শ্রমিক শ্রেণি এবং নিপীড়িত জাতি ও জনগণের মুক্তিসংগ্রামে পথনির্দেশক হিসেবে কাজ করে চলেছে। পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোতে সমাজতন্ত্র তথা সর্বহারা একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠার লড়াই এবং নয়া ঔপনিবেশিক দেশগুলোর সাম্রাজ্যবাদবিরোধী জাতীয় মুক্তির লড়াই একই বৃহত্তর সংগ্রামের অংশ হয়ে উঠেছে।

বর্তমানে পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থায় রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকট ক্রমেই গভীর হচ্ছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শ্রমিক শ্রেণি ও সাধারণ মানুষ এসব সংকটের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে ফেটে পড়ছে। সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থার দুর্বলতম গ্রন্থি ছিন্ন করার মধ্য দিয়ে পুঁজিবাদী দেশগুলোর শ্রমিক শ্রেণি সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব এবং নয়া ঔপনিবেশিক দেশগুলোর শ্রমিক শ্রেণি ও জনগণ সাম্রাজ্যবাদ ও সামন্তবাদবিরোধী জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন করার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

এই সংগ্রামে শ্রমিক শ্রেণি ও জনগণ তখনই সফল হতে পারবে, যখন লেনিনবাদের মৌলিক অবদানগুলো যথাযথভাবে ধারণ ও প্রয়োগ করতে পারবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কমিউনিস্ট আদর্শে বিশ্বাসী শ্রমিক শ্রেণি ও জনগণ আজ সেই মহান বিপ্লবী লক্ষ্য অর্জনের পথেই এগিয়ে চলেছে।

(লেখকের নিজস্ব মত)

[লেখক: কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, জাতীয় কৃষক সমিতি]

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

শনিবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৬


নভেম্বর বিপ্লবের ১০৯ বছর: শ্রেণিসংগ্রামের উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা

প্রকাশের তারিখ : ০৭ নভেম্বর ২০২৬

featured Image

৭ নভেম্বর মহান সমাজতান্ত্রিক নভেম্বর বিপ্লবের ১০৯তম বার্ষিকী। শ্রমিক শ্রেণির গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং কমিউনিস্ট আদর্শের বিকাশে এই বিপ্লব বিশ্ব ইতিহাসে আজও প্রাসঙ্গিক ও গুরুত্বপূর্ণ। মহান এই বার্ষিকীতে সব বিপ্লবীর প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা ও অভিবাদন।

মানবজাতির ইতিহাসে উৎপাদনশক্তির বিকাশের ধারায় আদিম সাম্যবাদী সমাজের ভাঙনের পর সৃষ্টি হয় শ্রেণিবিভক্ত সমাজব্যবস্থা ও রাষ্ট্র। এই সমাজব্যবস্থার উদ্ভবের সঙ্গে সঙ্গে দেখা দেয় শ্রেণিশোষণ ও শ্রেণিসংগ্রাম। শোষিত ও নিপীড়িত শ্রেণি নিজেদের ওপর চেপে বসা শোষণ থেকে মুক্তির জন্য শোষক শ্রেণির বিরুদ্ধে বারবার বিদ্রোহ করেছে। সৃষ্টি করেছে ইতিহাসের নানা অধ্যায়। কিন্তু দীর্ঘদিন পর্যন্ত শোষিত মানুষ শ্রেণিশোষণ থেকে মুক্তি অর্জন করতে পারেনি।

ইতিহাসের ধারায় বুর্জোয়া ব্যবস্থার বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে বুর্জোয়া শ্রেণির বিপরীতে শ্রমিক শ্রেণির উদ্ভব ঘটে। বিভিন্ন দেশে সামন্তশ্রেণিকে হটিয়ে বুর্জোয়া শ্রেণি রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে। প্রতিষ্ঠিত হয় বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা। এই ব্যবস্থার যত বিকাশ ঘটেছে, শ্রমিক শ্রেণিরও তত বিকাশ ঘটেছে। শ্রমিক শ্রেণি ছাড়া বুর্জোয়া উৎপাদনব্যবস্থার অস্তিত্ব টিকে থাকতে পারে না।

বুর্জোয়া ব্যবস্থায় উৎপাদনপ্রক্রিয়া সামাজিক হলেও উৎপাদনের উপকরণের মালিকানা ব্যক্তিগত। জমি, বাড়ি, কলকারখানাসহ উৎপাদনের প্রধান উপকরণগুলোর মালিক বুর্জোয়া শ্রেণি। অথচ উৎপাদন করে শ্রমিক শ্রেণি। শ্রমিকের শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের মালিকানা চলে যায় বুর্জোয়া শ্রেণির হাতে। এভাবেই ইতিহাসের মঞ্চে বুর্জোয়া শ্রেণির বিপরীত শ্রেণি হিসেবে শ্রমিক শ্রেণির আবির্ভাব ঘটে। শ্রমিক শ্রেণিকে বুর্জোয়া সমাজের কবর খননকারী বলা হয়। পুঁজিবাদী সমাজে এই দুই পরস্পরবিরোধী শ্রেণির স্বার্থের সংঘাত থেকেই তীব্র শ্রেণিসংগ্রামের জন্ম হয়।

কমিউনিস্টবিরোধীরা প্রায়ই প্রশ্ন তোলেন, সোভিয়েত ইউনিয়ন আজ আর নেই, তাহলে ইতিহাসে পরিণত হওয়া নভেম্বর বিপ্লবের বার্ষিকী কেন উদ্‌যাপন করা হয়? আমাদের বিবেচনায়, সোভিয়েত ইউনিয়ন না থাকলেও নভেম্বর বিপ্লবের অভিজ্ঞতা আজও প্রাসঙ্গিক। মানবসভ্যতার ইতিহাসে এটি একটি উজ্জ্বল ঘটনা। এই বিপ্লব প্রমাণ করেছে, মানুষই তার ভবিষ্যতের চূড়ান্ত নির্ধারক। শোষিত শ্রেণির সম্মিলিত হস্তক্ষেপ ইতিহাসের গতিপথ বদলে দিতে পারে।

সমাজতান্ত্রিক নভেম্বর বিপ্লবের বিজয় মার্কসীয় তত্ত্বের বাস্তব প্রয়োগের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এটি মার্কসবাদকে একটি সৃজনশীল বিজ্ঞান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। এই বিপ্লব বিশ্বে নতুন যুগের সূচনা করে। এটি শুধু জারতন্ত্রবিরোধী বিপ্লব ছিল না; চরিত্রের দিক থেকে ছিল সাম্রাজ্যবাদবিরোধী, পুঁজিবাদবিরোধী ও সমাজতান্ত্রিক। শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে মানবসভ্যতার অগ্রগতির যে সম্ভাবনার কথা মার্কসবাদ তুলে ধরেছিল, নভেম্বর বিপ্লব তা বাস্তবে প্রতিষ্ঠার পথ দেখায়।

আমেরিকান মার্কসবাদী দার্শনিক ও অর্থনীতিবিদ লিও হুবারম্যান বলেছিলেন, ‘ঊনবিংশ শতাব্দীর সমাপ্তির ১৭ বছর আগে কার্ল মার্কস প্রয়াত হয়েছেন। বিংশ শতাব্দীর শুরুর ১৭ বছর পর কার্ল মার্কস পুনর্জীবন লাভ করেছেন।’ নভেম্বর বিপ্লবের প্রাসঙ্গিকতা আলোচনায় যাঁর কথা অনিবার্যভাবে সামনে আসে, তিনি মহান চিন্তানায়ক কার্ল মার্কস। তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ফ্রেডরিক এঙ্গেলসও এই বিপ্লবের তাত্ত্বিক ভিত্তি নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। মার্কসের চিন্তার ওপর দাঁড়িয়েই নভেম্বর বিপ্লবের বিশাল কর্মযজ্ঞ পরিচালিত হয়।

পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ দার্শনিক কার্ল মার্কসের চিন্তার উৎস কী? কমরেড লেনিন সংক্ষেপে বলেছিলেন, মার্কসের চিন্তার প্রধান তিনটি উৎস হলো জার্মান দর্শন, ইংল্যান্ডের অর্থনীতি এবং ফরাসি কাল্পনিক সমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারা। মার্কসবাদেরও তিনটি প্রধান উপাদান রয়েছে—মার্কসীয় দর্শন, মার্কসীয় রাজনৈতিক অর্থনীতি এবং বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র ও বিপ্লবের তত্ত্ব। লেনিন তার ‘মার্কসবাদের তিনটি উৎস ও তিনটি উপাদান’ প্রবন্ধে বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছেন।

মার্কসের মৌলিক চিন্তা বুঝতে তার তিনটি আবিষ্কার বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, দ্বান্দ্বিক ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদ। এর মাধ্যমে তিনি দেখিয়েছেন, বস্তুজগতের পাশাপাশি মানবসমাজের ইতিহাসেরও দ্বান্দ্বিক বিকাশ ঘটে। প্রাচীন সমাজব্যবস্থার বিবর্তনের ধারায় পুঁজিবাদী সমাজের উদ্ভব ঘটেছে এবং মার্কসীয় বিশ্লেষণ অনুযায়ী এর পরবর্তী ঐতিহাসিক পর্যায় সমাজতন্ত্র। দ্বিতীয়ত, শ্রেণিসংগ্রাম ইতিহাসের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। তৃতীয়ত, উদ্বৃত্ত মূল্যের তত্ত্ব। শ্রমিকের উৎপাদিত মূল্যের যে অংশ তার মজুরি হিসেবে ফিরে আসে না, তা থেকেই উদ্বৃত্ত মূল্য সৃষ্টি হয়। এই উদ্বৃত্ত মূল্য পুঁজি ও মুনাফা সৃষ্টির ভিত্তি। সামাজিক শ্রম ও ব্যক্তিগত মালিকানার মধ্যকার সংঘাত শ্রমিক ও মালিকের দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হয়। ১৭৮ বছর আগে লেখা ‘কমিউনিস্ট ইশতেহার’-এ এই শ্রেণিবিরোধের বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

মার্কস ও এঙ্গেলসের কর্মকাণ্ডের প্রভাব ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে। উনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে রাশিয়াতেও এই প্রভাব পৌঁছায়। সে সময় রাশিয়ার সামাজিক ও অর্থনৈতিক চরিত্রে ইউরোপ ও এশিয়ার বৈশিষ্ট্যের মিশ্রণ ছিল। মূলত ১৮৮০-এর দশক থেকে খনি ও রেলপথশিল্পে পুঁজিবাদের বিকাশের মধ্য দিয়ে সেখানে শ্রমিক শ্রেণির আবির্ভাব ঘটে। জারতান্ত্রিক শাসনে কৃষকেরা শুধু শোষিতই ছিল না, অনেক ক্ষেত্রে তাদের জীবন ছিল কার্যত দাসত্বের মতো।

সে সময় শ্রমিকদের মধ্যে রাজনৈতিক আলোচনা ও বিতর্কে নারোদনিক মতাবলম্বীদের প্রভাব ছিল। তারা সন্ত্রাসবাদী পদ্ধতিতে বিশ্বাস করতেন। এই মতবাদের অনুসারী হওয়ায় লেনিনের দাদার ফাঁসি হয়েছিল। লেনিন বুঝতে পেরেছিলেন, সন্ত্রাসবাদী পথে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। বিকল্প পথের সন্ধানে তিনি বিভিন্ন রাজনৈতিক আলোচনা ও মতবিনিময় কেন্দ্রে যেতেন। এমনই একটি কেন্দ্র ছিল জর্জি প্লেখানভের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, যিনি রাশিয়ায় মার্কসবাদের চর্চার সূচনা করেছিলেন।

প্লেখানভের চিন্তা লেনিনকে উৎসাহিত করে। তিনি ভাবতে শুরু করেন, রাশিয়ায় কেন এবং কীভাবে বিপ্লব সম্ভব। তত্ত্ব ও প্রয়োগের সমন্বিত চর্চায় নিজেকে নিয়োজিত করেন। রাশিয়ায় কমিউনিস্ট পার্টি গঠনের মতাদর্শগত ভিত্তি নির্মাণের জন্য তিনি লেখেন ‘কী করিতে হইবে’। আর সাংগঠনিক কর্মকৌশল ও সংগঠনকে শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন ‘এক পা এগিয়ে, দুই পা পিছিয়ে’ গ্রন্থে।

সে সময় রাশিয়ায় শ্রমিক আন্দোলন, ধর্মঘট এবং দুমা নিয়ে বিতর্ক ক্রমেই জোরালো হচ্ছিল। দেশের অভ্যন্তরীণ ঘটনাপ্রবাহ দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছিল। এই পরিস্থিতির চূড়ান্ত প্রকাশ ঘটে ১৯১৭ সালের দুটি বিপ্লবের মধ্য দিয়ে।

প্রথমটি ছিল ফেব্রুয়ারি মাসের গণতান্ত্রিক বিপ্লব। এর মধ্য দিয়ে জার সাম্রাজ্যের অবসান ঘটে। এই বিপ্লবে শ্রমিক শ্রেণির উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ হলেও নেতৃত্ব চলে যায় বুর্জোয়া ও সংশোধনবাদী দলগুলোর হাতে। মেনশেভিকদের সমর্থনে কেরেনস্কি সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু লেনিনের নেতৃত্বে বলশেভিক পার্টি ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের সীমাবদ্ধতা ও অসম্পূর্ণতা যথাযথভাবে চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়। এর পেছনে ছিল লেনিনের আগের দুটি ব্যর্থ বিপ্লবের অভিজ্ঞতা।

প্যারি কমিউনের নেতাদের চিন্তায় একটি বড় সীমাবদ্ধতা ছিল। ক্ষমতা দখলের পর তারা রাষ্ট্রক্ষমতার পুরোনো কাঠামো অটুট রেখেছিলেন। অন্যদিকে, ১৯০৫ সালে রাশিয়ার শহরগুলোতে শ্রমিকেরা অভ্যুত্থান করলেও কৃষকেরা তাদের পাশে দাঁড়ায়নি। শ্রমিক ও কৃষকের ঐক্য যে বিপ্লবের জন্য জরুরি, লেনিন তা উপলব্ধি করেন। এ বিষয়ে তিনি ‘গ্রামের গরিবদের প্রতি’ গ্রন্থে নিজের মূল্যায়ন তুলে ধরেন।

১৯১৭ সালের এপ্রিলে বিদেশ থেকে ফিরে লেনিন স্লোগান দেন, ‘সমস্ত ক্ষমতা সোভিয়েতের হাতে চাই।’ ‘এপ্রিল থিসিস’-এর মাধ্যমে তিনি গণতান্ত্রিক বিপ্লব থেকে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের দিকে এগিয়ে যাওয়ার কর্মপন্থা তুলে ধরেন। শ্রমিক, সৈনিক ও কৃষকদের সম্মিলিত সংগঠন হিসেবে সোভিয়েতকে ক্ষমতার কেন্দ্রে প্রতিষ্ঠার কথা বলেন। ‘রুটি, জমি ও শান্তি’—এই দাবি সাধারণ মানুষের মধ্যে গভীরভাবে ছড়িয়ে পড়ে। তা বিপ্লবী শক্তিকে সংগঠিত করে। শেষ পর্যন্ত শোষিত মানুষের সম্মিলিত শক্তির বিজয় ঘটে। ইউরোপের পশ্চাৎপদ দেশগুলোর একটি রাশিয়ায় বিশ্বের প্রথম সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়।

নবগঠিত সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রকে ধ্বংস করার জন্য শুরু হয় নানা ষড়যন্ত্র। প্রতিবিপ্লবীরা সংগঠিত হয়ে শ্বেতবাহিনীর নামে সরকার উৎখাতের চেষ্টা চালায়। বারোটি সাম্রাজ্যবাদী দেশ প্রত্যক্ষভাবে এসব প্রতিবিপ্লবী শক্তিকে সহায়তা করে। বলশেভিকরা শ্রমিক, কৃষক, সেনাবাহিনীর বড় অংশ এবং সাধারণ মানুষের সমর্থন নিয়ে এই শক্তিকে পরাস্ত করে। এরপর সমাজতন্ত্র গড়ে তোলার কঠিন সংগ্রাম শুরু হয়।

এ সময় নয়া অর্থনৈতিক নীতি চালু করা হয়। লেনিনের মৃত্যুর পর স্তালিনের নেতৃত্বে শুরু হয় ‘স্তাখানোভীয় আন্দোলন’। এর মূল লক্ষ্য ছিল উৎপাদনব্যবস্থার উন্নয়ন, শ্রমিকের সৃজনশীলতা বৃদ্ধি এবং উৎপাদনে গতি আনা। ১৯৪১ সালের মধ্যে রাশিয়া একটি পশ্চাৎপদ দেশ থেকে বিশ্বের অন্যতম শিল্পোন্নত ও সামরিক শক্তিধর রাষ্ট্রে পরিণত হয়। সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠা সমাজ ও অর্থনীতির ক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আনে। সেখানে পূর্ণ কর্মসংস্থান, সর্বজনীন ও বিনা মূল্যে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন এবং নারীর সমানাধিকারের মতো গুরুত্বপূর্ণ অর্জন সম্ভব হয়েছিল।

১৯৩২ সালে ‘নিউইয়র্ক টাইমস’-এর সাংবাদিক ওয়াল্টার ডুরান্টি মন্তব্য করেছিলেন, সোভিয়েত ইউনিয়নে সমাজতন্ত্রের কাঠামো নির্মাণের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। ১৯৩৬ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি ‘ম্যানচেস্টার গার্ডিয়ান’ পত্রিকার সম্পাদকীয়তেও স্বীকার করা হয়, সংশয়ী বিশ্বকে মানতে হবে যে রাশিয়ায় যৌথ মালিকানার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

১৮৪৫ সালে ‘দ্য জার্মান আইডিওলজি’ গ্রন্থে ফয়েরবাখ প্রসঙ্গে মার্কস একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা লিখেছিলেন, ‘দার্শনিকরা নানাভাবে এই জগৎকে ব্যাখ্যা করেছেন, কিন্তু আসল কথা হলো একে পরিবর্তন করা।’ নভেম্বর বিপ্লবের মধ্য দিয়ে সম্পূর্ণ নতুন একটি অর্থনৈতিক ও শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়, যার চালিকাশক্তি ছিল নিপীড়িত জনগণ।

১৯৩০ সালে রাশিয়া ভ্রমণের অভিজ্ঞতা নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘রাশিয়ার চিঠি’তে লিখেছিলেন, ‘আমি নিজের চোখে না দেখলে কোনো মতেই বিশ্বাস করতে পারতুম না যে অশিক্ষা ও অবমাননার নিম্নতম তল থেকে আজ কেবলমাত্র ১০ বছরের মধ্যে লক্ষ লক্ষ মানুষকে এরা শুধু ক খ গ ঘ শেখায়নি, মনুষ্যত্বে সম্মানিত করেছে।’ রবীন্দ্রনাথ রাশিয়ায় কোথাও ‘ধনগরিমার ইতরতা’ দেখেননি বলেও উল্লেখ করেছিলেন।

নভেম্বর বিপ্লবের পর বিংশ শতাব্দীর ইতিহাসে সমাজতন্ত্র গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব বিস্তার করে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে ওঠে। ফ্যাসিবাদকে পরাস্ত করতে সোভিয়েতের লাল ফৌজ নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করে। এর ফলে পূর্ব ইউরোপে একাধিক সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। একই সঙ্গে ঔপনিবেশিকতাবিরোধী সংগ্রামও নতুন অনুপ্রেরণা পায়। সে সময় ১১টি সাম্রাজ্যবাদী দেশ ১০৭টি দেশকে নিজেদের অধীনে রেখেছিল। নভেম্বর বিপ্লবের পর এসব দেশে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী মুক্তিসংগ্রাম আরও জোরালো হয়।

সমাজতান্ত্রিক সমাজের চরিত্র কী হবে, এর দৃষ্টিভঙ্গি কেমন হবে এবং কীভাবে এই ব্যবস্থা সাম্যবাদে রূপান্তরিত হবে—এসব প্রশ্নে মার্কসীয় শিক্ষার ভিত্তিতে লেনিনের ব্যাখ্যা মার্কসবাদকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। মার্কসীয় তত্ত্বচর্চা আসলে একটি পুনর্গঠন ও বিকাশের প্রক্রিয়া। এর উদ্দেশ্য বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের বাস্তব প্রয়োগে সহায়তা করা। লেনিনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবদান হলো সাম্রাজ্যবাদ সম্পর্কে মার্কসবাদী উপলব্ধিকে আরও বিকশিত করা এবং তাকে বিপ্লবী কৌশলের অংশে পরিণত করা।

লেনিন লক্ষ্য করেছিলেন, পুঁজি ক্রমে সংহত ও কেন্দ্রীভূত হওয়ার ফলে একচেটিয়া পুঁজিবাদের সৃষ্টি হয়। এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সাম্রাজ্যবাদ বিশ্বকে পুঁজিবাদী শোষণের আওতায় নিয়ে আসে। প্রচলিত মার্কসীয় ধারণা ছিল, উন্নত পুঁজিবাদী দেশেই সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সংঘটিত হবে। কিন্তু লেনিন এই ধারণার সীমাবদ্ধতা তুলে ধরেন। তিনি দেখান, সাম্রাজ্যবাদের যুগে পুঁজিবাদের অসম বিকাশের কারণে অপেক্ষাকৃত পশ্চাৎপদ কোনো দেশেও সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সফল হতে পারে। সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থার দুর্বলতম গ্রন্থি ভেঙে বিপ্লবের পথ তৈরি হতে পারে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় জারশাসিত রাশিয়া ছিল সেই দুর্বলতম গ্রন্থি।

নভেম্বর বিপ্লবের প্রভাবে পরবর্তী সময়ে চীন, ভিয়েতনাম, উত্তর কোরিয়া ও কিউবায় বিপ্লব সংঘটিত হয়। তবে উন্নত পুঁজিবাদী দেশগুলোতে বিপ্লব ঘটেনি। সাম্রাজ্যবাদ সম্পর্কে লেনিনের বিশ্লেষণ থেকে নভেম্বর বিপ্লবের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত শিক্ষা পাওয়া যায়। পশ্চাৎপদ অর্থনীতিকে সমাজতন্ত্রের পথে এগিয়ে নেওয়ার জন্য তিনি এক দেশে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনার কথা বলেন। একই সঙ্গে বিপ্লবের বিভিন্ন পর্যায়ের তত্ত্ব তুলে ধরেন। গণতান্ত্রিক বিপ্লবকে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের দিকে এগিয়ে নেওয়ার পথ দেখান। পুঁজিবাদ ও জমিদারতন্ত্রের বিরুদ্ধে শ্রমিক-কৃষক মৈত্রীর কৌশল গ্রহণ করেন। জাতীয় প্রশ্নে মার্কসবাদী দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন, যার মধ্যে জারশাসিত রাশিয়ার নিপীড়িত জাতিগুলোর আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারও অন্তর্ভুক্ত ছিল। নভেম্বর বিপ্লব নতুন ধরনের বিপ্লবী দল, সংগঠন ও সাংগঠনিক অনুশীলনের ধারণাকেও সামনে নিয়ে আসে।

আজকের বিশ্ব পরিস্থিতি

প্রায় ৩৫ বছর আগে নানা অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক কারণে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ঘটে। অনেকে মনে করেন, সোভিয়েতের পতন সমাজতন্ত্র ও মার্কসবাদের মৃত্যুঘণ্টা বাজিয়ে দিয়েছে। তাদের ধারণা, মানবজাতির ভবিষ্যৎ পুঁজিবাদের অন্তহীন বিস্তারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু সোভিয়েতের পতন মানে সবকিছুর অবসান নয়। আবার এই পতনে কিছুই হয়নি, এমন ভাবারও সুযোগ নেই। এর ফলে বিশ্ব সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন অনেকটা পিছিয়ে গেছে।

বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সাম্রাজ্যবাদের অনুকূলে থাকলেও সাম্রাজ্যবাদ ও সমাজতন্ত্রের মধ্যকার মৌলিক দ্বন্দ্বের অবসান ঘটেনি। চীনের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান সংঘাত এই দ্বন্দ্বকে আরও তীব্র করছে। এক নতুন ধরনের শীতল যুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

প্রথম শীতল যুদ্ধের সময় সোভিয়েত ইউনিয়ন কখনোই যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক শক্তির কাছাকাছি পৌঁছাতে পারেনি। ১৯৭৫ সালে সোভিয়েত অর্থনীতির শক্তি সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছিল। তখন সোভিয়েতের মোট দেশজ উৎপাদন ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ৪৪ দশমিক ৪ শতাংশ। আর বর্তমানে চীনের মোট দেশজ উৎপাদন যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৭৫ শতাংশের সমান বলে ধারণা করা হয়। উন্নত প্রযুক্তির কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে চীনের দ্রুত অগ্রগতি যুক্তরাষ্ট্রকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো যাতে অর্ধপরিবাহী প্রযুক্তি ও উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন চিপ সংগ্রহ করতে না পারে, সে জন্য শুল্ক আরোপের পাশাপাশি নতুন নিষেধাজ্ঞা ও নিয়ন্ত্রণবিধি জারি করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হতে পারে, তা নিয়েও নতুন করে বিশ্লেষণ ও পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রশক্তির আধিপত্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিভিন্ন অঞ্চলে আগ্রাসী সামরিক অভিযান পরিচালিত হয়েছে। সার্বিয়ায় বোমাবর্ষণ, আফগানিস্তান ও ইরাকে সামরিক অভিযান, সুদান, লিবিয়া ও সিরিয়ায় হস্তক্ষেপ এবং বর্তমানে ফিলিস্তিনে বর্বরোচিত আক্রমণ এর উদাহরণ। ইউক্রেন সংঘাতের পেছনেও ন্যাটোর পরিকল্পনার ভূমিকা রয়েছে বলে মনে করা হয়। তবে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর মধ্যে পারস্পরিক দ্বন্দ্বও বিদ্যমান।

বর্তমানে আন্তর্জাতিক লগ্নিপুঁজি সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থার ওপর আধিপত্য বিস্তার করছে। লেনিনের সময়কার লগ্নিপুঁজির সঙ্গে এর চরিত্রগত কিছু পার্থক্য রয়েছে। মুনাফা সর্বোচ্চ করার লক্ষ্যে অর্থনীতির একটি বড় অংশ ফাটকাবাজারের দিকে স্থানান্তরিত হচ্ছে। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় অর্থনীতির আর্থিকীকরণ। সম্পদের বাজারমূল্য অনুযায়ী বিশ্বের বৃহৎ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে গুগল, ফেসবুক, অ্যাপল, আমাজন, মাইক্রোসফট, আলিবাবা ও টেনসেন্টের মতো প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান সরাসরি প্রচলিত উৎপাদনব্যবস্থায় অংশ না নিয়েও বিপুল মুনাফা অর্জন করছে। এই ব্যবস্থাকে বলা হচ্ছে মঞ্চনির্ভর অর্থনীতি।

আগে পুঁজির প্রধান রূপ ছিল বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠানে কেন্দ্রীভূত অংশীদারিভিত্তিক পুঁজিবাদ। বর্তমানে শেয়ারধারীদের স্বার্থকেন্দ্রিক পুঁজিবাদের বিস্তার ঘটেছে। সাম্প্রতিক সময়ে লগ্নিপুঁজির ধরন ও করপোরেট সংগঠনে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। আমাদের পার্টি ১৯৯২ সালে চতুর্দশ কংগ্রেসে ‘কিছু মতাদর্শগত বিষয় সম্পর্কে প্রস্তাব’ এবং ২০১২ সালে বিংশতম কংগ্রেসে ‘কয়েকটি মতাদর্শগত বিষয় সম্পর্কে প্রস্তাব’ গ্রহণের মাধ্যমে তাত্ত্বিক উপলব্ধিকে সময়োপযোগী ও সমৃদ্ধ করার চেষ্টা করেছে।

সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর যারা পুঁজিবাদের চূড়ান্ত বিজয় ঘোষণা করেছিলেন, আজকের পুতিনের রাশিয়া এবং পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোর সংকট, বিভক্তি ও সংঘাতের মধ্যে তারা কি গণতন্ত্র ও সভ্যতার অগ্রগতি দেখতে পাচ্ছেন? ১৯৯৭-৯৮ সালের এশীয় অর্থনৈতিক সংকট এবং ২০০৮ সালের অর্থনৈতিক বিপর্যয় থেকে পুঁজিবাদ এখনো পুরোপুরি মুক্ত হতে পারেনি। এসব ঘটনা কি পুঁজিবাদের সীমাবদ্ধতা ও ব্যর্থতাকে সামনে আনে না?

বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পূর্বাভাস অনুযায়ী, পুঁজিবাদ দীর্ঘস্থায়ী মন্দার মুখে পড়তে পারে। আয় ও সম্পদের বৈষম্য ক্রমাগত বাড়ছে। বিশ্বের মোট জনসংখ্যার মাত্র ১০ শতাংশ মানুষের হাতে রয়েছে মোট সম্পদের ৭৬ শতাংশ। জনস্বার্থের পরিবর্তে আন্তর্জাতিক লগ্নিপুঁজির স্বার্থ রক্ষাই রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নীতির প্রধান লক্ষ্য হয়ে উঠছে।

বাংলাদেশের মতো দেশেও নয়া উদারনৈতিক অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর স্বনির্ভরতার প্রশ্নটি গৌণ হয়ে পড়েছে। ঋণনির্ভর ব্যয় বাড়িয়ে কৃত্রিম চাহিদা তৈরির মাধ্যমে সংকট মোকাবিলার চেষ্টা উন্নত দেশগুলোতে ব্যর্থ হচ্ছে। বাড়ছে মন্দা ও বেকারত্ব। উন্নয়নশীল দেশগুলোও বড় ধরনের ঋণসংকটে ভুগছে। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের আগ্রাসী মনোভাব উন্নয়নশীল দেশগুলোর সঙ্গে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির দ্বন্দ্বকে আরও প্রভাবিত করছে।

বর্তমান সংকট থেকে বেরিয়ে আসার নামে শ্রমজীবী মানুষের ওপর অভূতপূর্ব ব্যয়সংকোচনের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। মানুষের আয় ও জীবনধারণের প্রয়োজনকে উপেক্ষা করা হচ্ছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কৃষিতে ভর্তুকি কমানো হচ্ছে। কৃষি উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়ানো, দরিদ্র মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং শিল্পোৎপাদনের অগ্রগতির মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রেও রাষ্ট্রের ভূমিকা ক্রমাগত সংকুচিত হচ্ছে।

চাহিদা বাড়াতে রাষ্ট্রের ভূমিকা কমে যাওয়ায় অতিরিক্ত উৎপাদন ও অর্থনৈতিক ভারসাম্যহীনতা তৈরি হচ্ছে। এর সঙ্গে বাড়ছে বেকারত্ব, শ্রমিক ছাঁটাই ও মজুরি হ্রাস। এসব সংকট ক্রমেই বিভিন্ন দেশকে গ্রাস করছে।

বিশ্ব পুঁজির অবাধ কার্যক্রম নিশ্চিত করতে বিভিন্ন দেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব দুর্বল করা প্রয়োজন হয়ে পড়ছে। আর তা সম্ভব হয় না যদি জনগণের রাজনৈতিক ক্ষমতা কমানো এবং গণতন্ত্রকে দুর্বল করা না যায়। একদিকে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের খামখেয়ালিপনা মেনে চলা, অন্যদিকে দেশের জনগণের ইচ্ছার প্রতি সম্মান দেখানো—এই দুই বিপরীতমুখী লক্ষ্য পূরণ ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। ফলে শ্রম ও পুঁজির মধ্যকার মৌলিক দ্বন্দ্ব আরও তীব্র হচ্ছে।

নয়া উদারনীতির এই সংকটের সুযোগ নিয়ে দক্ষিণপন্থী স্বৈরাচারী শক্তি নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে চাইছে। সামগ্রিকভাবে বিশ্ব রাজনীতির ভারসাম্য দক্ষিণপন্থার দিকে ঝুঁকে পড়লেও লাতিন আমেরিকার ব্রাজিল, চিলি ও কলম্বিয়ার মতো দেশে কিছু ব্যতিক্রমী অবস্থান দেখা যাচ্ছে। সেখানে নতুন রূপে সমাজতন্ত্রের জন্য দীর্ঘস্থায়ী সংগ্রাম গড়ে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশেও গত ১৬ বছরে করপোরেট পুঁজি ও লগ্নিপুঁজির নিয়ন্ত্রণে অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব, ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্র, উন্নয়ন কাঠামো ও সামাজিক ন্যায়বিচার আক্রান্ত হয়েছে। পুঁজি ও শ্রমের মধ্যকার শ্রেণিসংগ্রাম অব্যাহত রয়েছে। সংকট যত বাড়বে, এই সংগ্রামও তত তীব্র হবে।

বর্তমান বিশ্বে চারটি প্রধান সামাজিক দ্বন্দ্ব বিদ্যমান। মার্কসবাদী বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পুঁজিবাদকে অতিক্রম করে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়েই এসব দ্বন্দ্বের সমাধান সম্ভব। প্রশ্ন হলো, পৃথিবী কি মুষ্টিমেয় পুঁজিপতির হাতে ছেড়ে দেওয়া হবে, নাকি তাদের হাত থেকে ক্ষমতা কেড়ে নেওয়ার সংগ্রাম চলবে?

আমাদের সময়ের এই নতুন ক্রান্তিকালে নভেম্বর বিপ্লবের বিপ্লবী উত্তরাধিকার সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে নতুন শক্তি জোগাতে পারে। বাংলাদেশেও বামপন্থিদের সামনে সম্ভাবনার নতুন ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। পুঁজিবাদী সংকট, সাম্প্রদায়িকতা, বৈষম্য, বিভেদ এবং বিরুদ্ধ মত নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে জনগণকে সংগঠিত করতে হবে। সমাজতান্ত্রিক বিকল্পকে বাস্তবসম্মতভাবে তুলে ধরতে হবে। এ ক্ষেত্রে নভেম্বর বিপ্লব ও ‘কমিউনিস্ট ইশতেহার’ হতে পারে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার।

পুঁজির সম্পর্ক এবং সেই সম্পর্ক থেকে মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা নানা সময়ে বাধার মুখে পড়েছে। কিন্তু তা থেমে যায়নি। যত বাধাই আসুক, মানুষই ইতিহাস রচনা করবে।

মার্কসবাদ-লেনিনবাদ ও নভেম্বর বিপ্লব বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শ্রমিক শ্রেণি এবং নিপীড়িত জাতি ও জনগণের মুক্তিসংগ্রামে পথনির্দেশক হিসেবে কাজ করে চলেছে। পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোতে সমাজতন্ত্র তথা সর্বহারা একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠার লড়াই এবং নয়া ঔপনিবেশিক দেশগুলোর সাম্রাজ্যবাদবিরোধী জাতীয় মুক্তির লড়াই একই বৃহত্তর সংগ্রামের অংশ হয়ে উঠেছে।

বর্তমানে পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থায় রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকট ক্রমেই গভীর হচ্ছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শ্রমিক শ্রেণি ও সাধারণ মানুষ এসব সংকটের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে ফেটে পড়ছে। সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থার দুর্বলতম গ্রন্থি ছিন্ন করার মধ্য দিয়ে পুঁজিবাদী দেশগুলোর শ্রমিক শ্রেণি সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব এবং নয়া ঔপনিবেশিক দেশগুলোর শ্রমিক শ্রেণি ও জনগণ সাম্রাজ্যবাদ ও সামন্তবাদবিরোধী জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন করার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

এই সংগ্রামে শ্রমিক শ্রেণি ও জনগণ তখনই সফল হতে পারবে, যখন লেনিনবাদের মৌলিক অবদানগুলো যথাযথভাবে ধারণ ও প্রয়োগ করতে পারবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কমিউনিস্ট আদর্শে বিশ্বাসী শ্রমিক শ্রেণি ও জনগণ আজ সেই মহান বিপ্লবী লক্ষ্য অর্জনের পথেই এগিয়ে চলেছে।

(লেখকের নিজস্ব মত)

[লেখক: কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, জাতীয় কৃষক সমিতি]


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত