পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারে ভোটার তালিকা সংশোধনের জন্য চলা বিশেষ নিবিড় পুনর্বিবেচনা বা এসআইআরকে ঘিরে এবার নির্বাচন কমিশনের অন্দরেই মতবিরোধের অভিযোগ সামনে এসেছে। কমিশনের দুই সদস্যের আপত্তি, বিপুল সংখ্যক ভোটারের নাম বাদ পড়া, ২০২৫ সালের ভোটার তালিকা পুনর্বহালের দাবি এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিকে ঘিরে বিতর্ক ক্রমেই তীব্র হচ্ছে।
একইসঙ্গে প্রশ্ন উঠছে—এসআইআর প্রক্রিয়ায় প্রকৃত ভোটারদের অধিকার কতটা সুরক্ষিত হয়েছে এবং অভিযোগগুলি নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত ও জবাবদিহি কীভাবে নিশ্চিত হবে?
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, ভোটার তালিকা সংশোধন কোনও নতুন বা অস্বাভাবিক প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নয়। মৃত ভোটারের নাম বাদ দেওয়া, স্থানান্তরিত ভোটারের ঠিকানা সংশোধন, একাধিক জায়গায় নাম থাকা শনাক্ত করা এবং নতুন প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকদের নাম অন্তর্ভুক্ত করার জন্য নিয়মিত ভোটার তালিকা সংশোধন করা হয়। সাধারণত এই বার্ষিক সংশোধন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তালিকা হালনাগাদ করা হয়।
কিন্তু এসআইআর-এর মতো বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়ায় ভোটারদের যোগ্যতা নতুন করে যাচাই এবং পুরনো নথির সঙ্গে তথ্য মেলানোর বিষয়টি আরও ব্যাপক আকার নেয়। ফলে এই প্রক্রিয়ায় ভুল হলে তার প্রভাবও অনেক বেশি হতে পারে।
তবে এই প্রশ্নমালার জবাব না দেওয়াকে সরাসরি অনিয়মের প্রমাণ বলা যায় না। কিন্তু নির্বাচন কমিশনের মতো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এমন গুরুতর অভিযোগের পর বিস্তারিত ব্যাখ্যা না পাওয়া স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে। বিশেষ করে যখন অভিযোগগুলি ভোটার তালিকার তথ্য, নতুন ভোটার অন্তর্ভুক্তি এবং নাম বাদ দেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের সঙ্গে যুক্ত, তখন কমিশনের উচিত প্রতিটি অভিযোগের নির্দিষ্ট উত্তর দেওয়া। কোন সিদ্ধান্ত কীভাবে নেওয়া হয়েছিল, কার অনুমোদন ছিল এবং আপত্তিগুলি কীভাবে নিষ্পত্তি করা হয়েছে—সেই তথ্য প্রকাশ্যে এলে বিতর্কের প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হতে পারে।
এই বিতর্কের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারের ভোটার তালিকা সংশোধনকে ঘিরে। বিহারে এসআইআর-এর খসড়া তালিকা থেকে প্রায় ৬৫ লক্ষ নাম বাদ পড়ার পর চূড়ান্ত তালিকায় আগের তালিকার তুলনায় ভোটারের সংখ্যা কমে যায়।
পশ্চিমবঙ্গেও এসআইআর-পরবর্তী তালিকায় বিপুল সংখ্যক নাম বাদ পড়েছে। নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য, মৃত, স্থানান্তরিত, একাধিক জায়গায় নাম থাকা এবং অযোগ্য ভোটারদের চিহ্নিত করতেই এই প্রক্রিয়া। কিন্তু এই ব্যাখ্যার পাশাপাশি আরও একটি প্রশ্ন জরুরি—যারা প্রকৃত ভোটার, তাঁদের নাম ভুল করে বাদ পড়লে দ্রুত পুনর্বহালের ব্যবস্থা কতটা কার্যকর হয়েছে?
দীপকের বক্তব্যের মূল সুর, যে নির্বাচন ব্যবস্থাকে বিরোধীরা কারচুপিযুক্ত বলে দাবি করছে, সেই ব্যবস্থার মধ্যেই বারবার নির্বাচনে অংশ নিয়ে তারা কার্যত তাকে বৈধতা দিচ্ছে। তাঁর মতে, ভোটার তালিকা নিয়ে অনিয়ম, জনপ্রতিনিধিদের দলবদল এবং রাজনৈতিক দল ভাঙনের অভিযোগ যদি সত্যিই বিরোধীদের দুর্বল করে, তাহলে সেই ব্যবস্থার মধ্যে থেকে ক্ষমতা ধরে রাখার লড়াই কতটা কার্যকর? তবে এই বক্তব্যের সঙ্গে বিরোধী দলগুলির একমত না হওয়ারও রাজনৈতিক যুক্তি রয়েছে।
নির্বাচনে অংশ না নিলে নির্বাচন কমিশন একতরফাভাবে ভোট পরিচালনার সুযোগ পেতে পারে। নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করা রাজনৈতিক দলগুলির বিরুদ্ধে দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগ তুলে তাদের নাম ও প্রতীক বাতিলের মতো পদক্ষেপের আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ফলে ভোট বয়কট করলেই নির্বাচন ব্যবস্থার পরিবর্তন নিশ্চিত হবে, এমন কোনও নিশ্চয়তা নেই।
সবশেষে, এসআইআর প্রক্রিয়া ঘিরে মৃত্যুর অভিযোগগুলিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। পশ্চিমবঙ্গসহ বিভিন্ন জায়গায় ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে উদ্বেগ ও চাপের আবহে মৃত্যুর খবর প্রকাশ্যে এসেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে কতজনের মৃত্যু হয়েছে, প্রতিটি মৃত্যুর কারণ কী এবং তার সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না—এসব বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ ও স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য ছাড়া কোনও নির্দিষ্ট সংখ্যাকে নিশ্চিত সত্য হিসেবে বলা যায় না। তবু এমন অভিযোগ সামনে এলে তা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। প্রতিটি ঘটনার পৃথক তদন্ত, পরিবারের বক্তব্য শোনা এবং প্রয়োজন হলে বিচারবিভাগীয় নজরদারিতে অনুসন্ধানের দাবি উঠতেই পারে।
অভিজিৎ দীপকের আন্দোলনের ঘোষণা তাই বৃহত্তর বিতর্কের একটি অংশ মাত্র। বিরোধীরা নির্বাচনে অংশ নেবে কি না, সেটি তাদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। কিন্তু ভোটারদের অধিকার, নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা এবং এসআইআর প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা—এই প্রশ্নগুলির উত্তর কোনও রাজনৈতিক কৌশলের আড়ালে হারিয়ে যেতে পারে না। নির্বাচন কমিশনকে আগেভাগে দায়মুক্তি দেওয়া যেমন ঠিক নয়, তেমনই প্রমাণ ছাড়া অপরাধী ঘোষণা করাও নয়। প্রয়োজন সত্য উদ্ঘাটন, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং আইনের ভিত্তিতে দায় নির্ধারণ।

শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারে ভোটার তালিকা সংশোধনের জন্য চলা বিশেষ নিবিড় পুনর্বিবেচনা বা এসআইআরকে ঘিরে এবার নির্বাচন কমিশনের অন্দরেই মতবিরোধের অভিযোগ সামনে এসেছে। কমিশনের দুই সদস্যের আপত্তি, বিপুল সংখ্যক ভোটারের নাম বাদ পড়া, ২০২৫ সালের ভোটার তালিকা পুনর্বহালের দাবি এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিকে ঘিরে বিতর্ক ক্রমেই তীব্র হচ্ছে।
একইসঙ্গে প্রশ্ন উঠছে—এসআইআর প্রক্রিয়ায় প্রকৃত ভোটারদের অধিকার কতটা সুরক্ষিত হয়েছে এবং অভিযোগগুলি নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত ও জবাবদিহি কীভাবে নিশ্চিত হবে?
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, ভোটার তালিকা সংশোধন কোনও নতুন বা অস্বাভাবিক প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নয়। মৃত ভোটারের নাম বাদ দেওয়া, স্থানান্তরিত ভোটারের ঠিকানা সংশোধন, একাধিক জায়গায় নাম থাকা শনাক্ত করা এবং নতুন প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকদের নাম অন্তর্ভুক্ত করার জন্য নিয়মিত ভোটার তালিকা সংশোধন করা হয়। সাধারণত এই বার্ষিক সংশোধন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তালিকা হালনাগাদ করা হয়।
কিন্তু এসআইআর-এর মতো বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়ায় ভোটারদের যোগ্যতা নতুন করে যাচাই এবং পুরনো নথির সঙ্গে তথ্য মেলানোর বিষয়টি আরও ব্যাপক আকার নেয়। ফলে এই প্রক্রিয়ায় ভুল হলে তার প্রভাবও অনেক বেশি হতে পারে।
তবে এই প্রশ্নমালার জবাব না দেওয়াকে সরাসরি অনিয়মের প্রমাণ বলা যায় না। কিন্তু নির্বাচন কমিশনের মতো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এমন গুরুতর অভিযোগের পর বিস্তারিত ব্যাখ্যা না পাওয়া স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে। বিশেষ করে যখন অভিযোগগুলি ভোটার তালিকার তথ্য, নতুন ভোটার অন্তর্ভুক্তি এবং নাম বাদ দেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের সঙ্গে যুক্ত, তখন কমিশনের উচিত প্রতিটি অভিযোগের নির্দিষ্ট উত্তর দেওয়া। কোন সিদ্ধান্ত কীভাবে নেওয়া হয়েছিল, কার অনুমোদন ছিল এবং আপত্তিগুলি কীভাবে নিষ্পত্তি করা হয়েছে—সেই তথ্য প্রকাশ্যে এলে বিতর্কের প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হতে পারে।
এই বিতর্কের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারের ভোটার তালিকা সংশোধনকে ঘিরে। বিহারে এসআইআর-এর খসড়া তালিকা থেকে প্রায় ৬৫ লক্ষ নাম বাদ পড়ার পর চূড়ান্ত তালিকায় আগের তালিকার তুলনায় ভোটারের সংখ্যা কমে যায়।
পশ্চিমবঙ্গেও এসআইআর-পরবর্তী তালিকায় বিপুল সংখ্যক নাম বাদ পড়েছে। নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য, মৃত, স্থানান্তরিত, একাধিক জায়গায় নাম থাকা এবং অযোগ্য ভোটারদের চিহ্নিত করতেই এই প্রক্রিয়া। কিন্তু এই ব্যাখ্যার পাশাপাশি আরও একটি প্রশ্ন জরুরি—যারা প্রকৃত ভোটার, তাঁদের নাম ভুল করে বাদ পড়লে দ্রুত পুনর্বহালের ব্যবস্থা কতটা কার্যকর হয়েছে?
দীপকের বক্তব্যের মূল সুর, যে নির্বাচন ব্যবস্থাকে বিরোধীরা কারচুপিযুক্ত বলে দাবি করছে, সেই ব্যবস্থার মধ্যেই বারবার নির্বাচনে অংশ নিয়ে তারা কার্যত তাকে বৈধতা দিচ্ছে। তাঁর মতে, ভোটার তালিকা নিয়ে অনিয়ম, জনপ্রতিনিধিদের দলবদল এবং রাজনৈতিক দল ভাঙনের অভিযোগ যদি সত্যিই বিরোধীদের দুর্বল করে, তাহলে সেই ব্যবস্থার মধ্যে থেকে ক্ষমতা ধরে রাখার লড়াই কতটা কার্যকর? তবে এই বক্তব্যের সঙ্গে বিরোধী দলগুলির একমত না হওয়ারও রাজনৈতিক যুক্তি রয়েছে।
নির্বাচনে অংশ না নিলে নির্বাচন কমিশন একতরফাভাবে ভোট পরিচালনার সুযোগ পেতে পারে। নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করা রাজনৈতিক দলগুলির বিরুদ্ধে দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগ তুলে তাদের নাম ও প্রতীক বাতিলের মতো পদক্ষেপের আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ফলে ভোট বয়কট করলেই নির্বাচন ব্যবস্থার পরিবর্তন নিশ্চিত হবে, এমন কোনও নিশ্চয়তা নেই।
সবশেষে, এসআইআর প্রক্রিয়া ঘিরে মৃত্যুর অভিযোগগুলিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। পশ্চিমবঙ্গসহ বিভিন্ন জায়গায় ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে উদ্বেগ ও চাপের আবহে মৃত্যুর খবর প্রকাশ্যে এসেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে কতজনের মৃত্যু হয়েছে, প্রতিটি মৃত্যুর কারণ কী এবং তার সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না—এসব বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ ও স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য ছাড়া কোনও নির্দিষ্ট সংখ্যাকে নিশ্চিত সত্য হিসেবে বলা যায় না। তবু এমন অভিযোগ সামনে এলে তা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। প্রতিটি ঘটনার পৃথক তদন্ত, পরিবারের বক্তব্য শোনা এবং প্রয়োজন হলে বিচারবিভাগীয় নজরদারিতে অনুসন্ধানের দাবি উঠতেই পারে।
অভিজিৎ দীপকের আন্দোলনের ঘোষণা তাই বৃহত্তর বিতর্কের একটি অংশ মাত্র। বিরোধীরা নির্বাচনে অংশ নেবে কি না, সেটি তাদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। কিন্তু ভোটারদের অধিকার, নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা এবং এসআইআর প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা—এই প্রশ্নগুলির উত্তর কোনও রাজনৈতিক কৌশলের আড়ালে হারিয়ে যেতে পারে না। নির্বাচন কমিশনকে আগেভাগে দায়মুক্তি দেওয়া যেমন ঠিক নয়, তেমনই প্রমাণ ছাড়া অপরাধী ঘোষণা করাও নয়। প্রয়োজন সত্য উদ্ঘাটন, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং আইনের ভিত্তিতে দায় নির্ধারণ।

আপনার মতামত লিখুন