জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের বার্ষিক অধিবেশনে গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান, বেসামরিক নাগরিক হত্যা এবং অধিকৃত পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণের বিরুদ্ধে একযোগে সোচ্চার হয়েছেন বিশ্বনেতারা।
অধিবেশন জুড়ে বিশ্বনেতাদের বক্তব্যে ফিলিস্তিন ও ইসরায়েল সংকট নিরসনে দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের বিষয়টি প্রাধান্য পায়। এর মধ্যেই ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর ভাষণের সময় অধিবেশন কক্ষ থেকে বের হয়ে যান বহু দেশের কূটনীতিকরা।
এ সময় ক্ষুব্ধ প্রতিনিধিদের দুয়োধ্বনিতে হলে হট্টগোল তৈরি হলে শৃঙ্খলা বজায় রাখার আহ্বান জানান অধিবেশনের সভাপতি। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে নেতারা জানান, একদিকে ওয়াশিংটন শান্তির কথা বললেও ট্রাম্প প্রশাসন ইসরায়েলকে সামরিক সহায়তা অব্যাহত রেখেছে।
অধিবেশনে বিশ্বব্যবস্থা ভেঙে পড়ার আশঙ্কা ব্যক্ত করে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ বলেন, "বিশ্ব আবারও 'জঙ্গলের আইন'-এর দিকে ফিরে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। বিশ্বকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে তারা কি এমন একটি পরিস্থিতি চায়, যেখানে শক্তিশালী দেশগুলো নিজেদের মতো করে নিয়ম তৈরি করবে, নাকি সবাই মিলে একটি সভ্য আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা বজায় রাখবে।"
গাজার অমানবিক পরিস্থিতি তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, "কেউ কেউ শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বললেও গাজায় মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর ক্ষেত্রে বাস্তব অগ্রগতি হয়নি।"
ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলি আগ্রাসনের সরাসরি নিন্দা জানিয়ে স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ বলেন, "নেতানিয়াহু গাজায় যে 'গণহত্যা' চালিয়ে যাচ্ছেন, স্পেন তার দ্ব্যর্থহীন নিন্দা জানায়।" তিনি স্পষ্ট করেন যে, ইউক্রেন, লেবানন কিংবা ইরান, যেখানেই আগ্রাসনমূলক যুদ্ধ শুরু হয়েছে, স্পেন তার বিরোধিতা করেছে। একই সঙ্গে স্পেনের ভূখণ্ড আন্তর্জাতিক আইনবিরোধী কোনো কাজে ব্যবহার করতে না দেওয়ার পাশাপাশি ইসরায়েল ও রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা ও অস্ত্র সরবরাহে বাধার পক্ষে নিজেদের নীতি পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।
অন্যদের চেয়ে আরও কঠোর ভাষায় তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান বলেন, "আমরা এমন একটি গণহত্যার মানসিকতার মুখোমুখি, যা হত্যায় কখনো তৃপ্ত হয় না। মানবতা, দয়া ও বিবেকসম্পন্ন কেউই এর দিকে চোখ বন্ধ করে থাকতে পারে না।"
গাজাকে বর্তমান সময়ের সবচেয়ে অমানবিক ও লজ্জাজনক বন্দিশিবির আখ্যা দিয়ে তিনি জানান, মার্কিন সমর্থন ও সমন্বয়ে যুদ্ধবিরতির চেষ্টা সত্ত্বেও গাজায় ১ হাজার ৩০০-এর বেশি বেসামরিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন।
উল্লেখ্য, এরদোয়ানের ভাষণের সময় ইসরায়েলি প্রতিনিধিরা হল ত্যাগ করলেও ফিলিস্তিনি প্রতিনিধিরা তাকে করতালি দিয়ে স্বাগত জানান। এছাড়া জাতিসংঘের সাবেক কর্মকর্তা সালমান শেইখও গাজা ও পশ্চিম তীরের এই নাজুক পরিস্থিতিকে কোনোভাবেই স্বাভাবিক হিসেবে মেনে না নেওয়ার আহ্বান জানান।
সংকটের টেকসই সমাধানের তাগিদ দিয়ে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেন, "ফিলিস্তিন ও ইসরায়েলের মধ্যে দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের প্রতি আন্তর্জাতিক সমর্থন শুধু কথায় সীমাবদ্ধ থাকলে হবে না, এটি বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।"
তিনি সতর্ক করে জানান, পশ্চিম তীরের E1 করিডরে ইসরায়েলের পরিকল্পিত নির্মাণকাজের কারণে একটি ভৌগোলিকভাবে সংযুক্ত ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার শর্তগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
তিনি ১৯৬৭ সালের সীমারেখার ভিত্তিতে জেরুজালেমকে যৌথ রাজধানী করে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র পাশাপাশি শান্তিতে বসবাসের প্রস্তাব জোরদার করেন।
অন্যদিকে, ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কোস্তাও দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের পক্ষে আন্তর্জাতিক একাত্মতা সত্ত্বেও মাঠপর্যায়ে কাজের অগ্রগতি না থাকায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং দ্রুত আন্তর্জাতিক শান্তি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের তাগিদ দেন।

শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের বার্ষিক অধিবেশনে গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান, বেসামরিক নাগরিক হত্যা এবং অধিকৃত পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণের বিরুদ্ধে একযোগে সোচ্চার হয়েছেন বিশ্বনেতারা।
অধিবেশন জুড়ে বিশ্বনেতাদের বক্তব্যে ফিলিস্তিন ও ইসরায়েল সংকট নিরসনে দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের বিষয়টি প্রাধান্য পায়। এর মধ্যেই ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর ভাষণের সময় অধিবেশন কক্ষ থেকে বের হয়ে যান বহু দেশের কূটনীতিকরা।
এ সময় ক্ষুব্ধ প্রতিনিধিদের দুয়োধ্বনিতে হলে হট্টগোল তৈরি হলে শৃঙ্খলা বজায় রাখার আহ্বান জানান অধিবেশনের সভাপতি। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে নেতারা জানান, একদিকে ওয়াশিংটন শান্তির কথা বললেও ট্রাম্প প্রশাসন ইসরায়েলকে সামরিক সহায়তা অব্যাহত রেখেছে।
অধিবেশনে বিশ্বব্যবস্থা ভেঙে পড়ার আশঙ্কা ব্যক্ত করে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ বলেন, "বিশ্ব আবারও 'জঙ্গলের আইন'-এর দিকে ফিরে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। বিশ্বকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে তারা কি এমন একটি পরিস্থিতি চায়, যেখানে শক্তিশালী দেশগুলো নিজেদের মতো করে নিয়ম তৈরি করবে, নাকি সবাই মিলে একটি সভ্য আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা বজায় রাখবে।"
গাজার অমানবিক পরিস্থিতি তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, "কেউ কেউ শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বললেও গাজায় মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর ক্ষেত্রে বাস্তব অগ্রগতি হয়নি।"
ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলি আগ্রাসনের সরাসরি নিন্দা জানিয়ে স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ বলেন, "নেতানিয়াহু গাজায় যে 'গণহত্যা' চালিয়ে যাচ্ছেন, স্পেন তার দ্ব্যর্থহীন নিন্দা জানায়।" তিনি স্পষ্ট করেন যে, ইউক্রেন, লেবানন কিংবা ইরান, যেখানেই আগ্রাসনমূলক যুদ্ধ শুরু হয়েছে, স্পেন তার বিরোধিতা করেছে। একই সঙ্গে স্পেনের ভূখণ্ড আন্তর্জাতিক আইনবিরোধী কোনো কাজে ব্যবহার করতে না দেওয়ার পাশাপাশি ইসরায়েল ও রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা ও অস্ত্র সরবরাহে বাধার পক্ষে নিজেদের নীতি পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।
অন্যদের চেয়ে আরও কঠোর ভাষায় তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান বলেন, "আমরা এমন একটি গণহত্যার মানসিকতার মুখোমুখি, যা হত্যায় কখনো তৃপ্ত হয় না। মানবতা, দয়া ও বিবেকসম্পন্ন কেউই এর দিকে চোখ বন্ধ করে থাকতে পারে না।"
গাজাকে বর্তমান সময়ের সবচেয়ে অমানবিক ও লজ্জাজনক বন্দিশিবির আখ্যা দিয়ে তিনি জানান, মার্কিন সমর্থন ও সমন্বয়ে যুদ্ধবিরতির চেষ্টা সত্ত্বেও গাজায় ১ হাজার ৩০০-এর বেশি বেসামরিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন।
উল্লেখ্য, এরদোয়ানের ভাষণের সময় ইসরায়েলি প্রতিনিধিরা হল ত্যাগ করলেও ফিলিস্তিনি প্রতিনিধিরা তাকে করতালি দিয়ে স্বাগত জানান। এছাড়া জাতিসংঘের সাবেক কর্মকর্তা সালমান শেইখও গাজা ও পশ্চিম তীরের এই নাজুক পরিস্থিতিকে কোনোভাবেই স্বাভাবিক হিসেবে মেনে না নেওয়ার আহ্বান জানান।
সংকটের টেকসই সমাধানের তাগিদ দিয়ে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেন, "ফিলিস্তিন ও ইসরায়েলের মধ্যে দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের প্রতি আন্তর্জাতিক সমর্থন শুধু কথায় সীমাবদ্ধ থাকলে হবে না, এটি বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।"
তিনি সতর্ক করে জানান, পশ্চিম তীরের E1 করিডরে ইসরায়েলের পরিকল্পিত নির্মাণকাজের কারণে একটি ভৌগোলিকভাবে সংযুক্ত ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার শর্তগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
তিনি ১৯৬৭ সালের সীমারেখার ভিত্তিতে জেরুজালেমকে যৌথ রাজধানী করে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র পাশাপাশি শান্তিতে বসবাসের প্রস্তাব জোরদার করেন।
অন্যদিকে, ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কোস্তাও দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের পক্ষে আন্তর্জাতিক একাত্মতা সত্ত্বেও মাঠপর্যায়ে কাজের অগ্রগতি না থাকায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং দ্রুত আন্তর্জাতিক শান্তি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের তাগিদ দেন।

আপনার মতামত লিখুন