সংবাদ

পেপারলেসের পথে চট্টগ্রাম বন্দর, ডিসেম্বরে স্মার্ট পোর্ট


মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম, চট্টগ্রাম
মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:৫৩ পিএম

পেপারলেসের পথে চট্টগ্রাম বন্দর, ডিসেম্বরে স্মার্ট পোর্ট
ডিসেম্বরের মধ্যে পেপারলেস স্মার্ট পোর্ট হচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দর

চট্টগ্রাম বন্দরকে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে ম্যানুয়াল প্রক্রিয়া ও কাগজপত্রের ব্যবহার কমিয়ে পুরো বন্দরকে পেপারলেস ও স্মার্ট পোর্টে রূপান্তরের লক্ষ্য নিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। বিল পরিশোধ থেকে কনটেইনার ডেলিভারি, ট্রাকের প্রবেশ থেকে জাহাজের ছাড়পত্রসহ চট্টগ্রাম বন্দরের প্রায় প্রতিটি ধাপই যাচ্ছে অনলাইনের আওতায়।

বন্দর ব্যবহারকারীদের সেবা সহজীকরণ, পণ্য খালাসে গতি, স্বচ্ছতা বৃদ্ধি, রাজস্ব আদায় ত্বরান্বিত ও যানজট কমাতে নেওয়া হয়েছে এসব উদ্যোগ। চবকের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম গণমাধ্যমকে এসব তথ্য জানান।

সূত্রে প্রকাশ, চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার। ২০২৫ সালে বন্দরটি রেকর্ড ৩৪ লাখ ৯ হাজার ৬৯ টিইইউএস কনটেইনার, ১৩ কোটি ৮১ লাখ ৫১ হাজার ৮১২ টন কার্গো এবং ৪ হাজার ২৭৩টি জাহাজ হ্যান্ডলিং করেছে। কনটেইনার হ্যান্ডলিং আগের বছরের তুলনায় ৪ দশমিক ৭ শতাংশ এবং কার্গো হ্যান্ডলিং ১১ দশমিক ৪৩ শতাংশ বেড়েছে। দেশের সমুদ্রপথে আসা-যাওয়া সাধারণ কার্গোর প্রায় ৯২ শতাংশ এবং কনটেইনারভিত্তিক আমদানি-রপ্তানির প্রায় ৯৮ শতাংশ এই বন্দরের মাধ্যমে পরিচালিত হয়ে আসছে।

সূত্র জানায়, বন্দরের এই বিপুল কর্মযজ্ঞের সঙ্গে শিপিং এজেন্ট, আমদানিকারক, রপ্তানিকারক, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট, কনটেইনার পরিবহনকারী, ব্যাংক, কাস্টমস, টার্মিনাল অপারেটরসহ অসংখ্য প্রতিষ্ঠান জড়িত রয়েছে। ফলে বন্দরের একটি সেবা ম্যানুয়াল থেকে ডিজিটালে রূপান্তরিত হলেও তার সুফল পেতে হলে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সেবাকেও একই প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করতে হবে। 

এ কারণেই এখন বিচ্ছিন্নভাবে অনলাইন সেবা চালুর পরিবর্তে পুরো প্রক্রিয়াকে একটি সমন্বিত ডিজিটাল ব্যবস্থার আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বর্তমানে ভেসেল বিলের ১০০ শতাংশ অনলাইনে সম্পাদিত হচ্ছে। এবার কনটেইনার ও কনসাইনি বিলও শতভাগ টার্মিনাল অপারেটিং সিস্টেম বা টিওএস-এর মাধ্যমে তৈরি ও আদায়ের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এর ফলে বিল তৈরি থেকে শুরু করে অর্থ পরিশোধ ও সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমের মধ্যে সরাসরি ডিজিটাল সংযোগ স্থাপিত হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের কনফারেন্স রুমে চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় ডিজিটালাইজেশন ও অটোমেশন কার্যক্রমের অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হয়। সভায় বন্দর সেবাকে আরও ডিজিটাল করা, যানজট কমানো, রাজস্ব আদায় ত্বরান্বিত করা এবং ব্যবহারকারীদের হয়রানি কমাতে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

চবক সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম সভায় নেওয়া বিভিন্ন সিদ্ধান্ত উল্লেখ করে বলেন, বর্তমানে বন্দরের শতভাগ ভেসেল বিল অনলাইনে সম্পন্ন হচ্ছে। কনটেইনার ও কনসাইনি বিলও শতভাগ টার্মিনাল অপারেটিং সিস্টেমের (টিওএস) মাধ্যমে তৈরি ও আদায়ের সিদ্ধান্ত হয়েছে। এরই মধ্যে ই-গেট পাস ইস্যু, গেট ইন ও গেট আউট অনলাইনের আওতায় আনা হয়েছে। পাশাপাশি টিওএসের মাধ্যমে টাইম স্লট ম্যানেজমেন্ট, অনলাইন কার্ট টিকিট, ই-গেট চালান এবং শতভাগ ভেসেল ই-এনওসি নিশ্চিত করার কার্যক্রম চলছে।

বন্দরের নবনির্মিত ওয়ান স্টপ সার্ভিস সেন্টারে সোনালী ব্যাংক পিএলসির বুথ স্থাপন এবং এপিআই ইন্টিগ্রেশনের মাধ্যমে যেকোনো সময় অনলাইনে পেমেন্টের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। ফলে ছুটির দিন ও অফিস সময়ের বাইরেও বন্দরের মাশুল পরিশোধের সুযোগ থাকবে। ৭২ ঘণ্টার মধ্যে মাশুল পরিশোধ না হলে অটো পুল পেমেন্ট সিস্টেম চালুর সিদ্ধান্তও হয়েছে।

শুধু পেমেন্ট নয়, পণ্য খালাসের পরবর্তী ধাপও স্বয়ংক্রিয় করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। টিওএসে অনলাইনে স্পেশাল ডেলিভারি অ্যাসাইনমেন্ট অনুমোদন, এনবিআর ও কাস্টমসের এপিআইয়ের মাধ্যমে অকশন ডেলিভারি এবং ব্রেকবাল্ক অপারেশন অনলাইনের আওতায় আনার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

বন্দর এলাকায় যানজট কমাতেও ডিজিটাল ব্যবস্থার ব্যবহার বাড়ানো হচ্ছে। টিওএসের নতুন সংস্করণে ড্রপ টিকিট, পিকআপ টিকিট ও ইআইআর ই-গেট পাসের সঙ্গে সমন্বয় করা হবে। একই সঙ্গে বে টার্মিনালে স্লটভিত্তিক ম্যাপিং করে পেমেন্টভিত্তিক ট্রাক পার্কিং টিকিটিং ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ওয়ান স্টপ সার্ভিস সেন্টারে রিয়েল-টাইমে নথি যাচাই, বিল তৈরি ও নিশ্চিতকরণ এবং আইসিডি ইন্টিগ্রেশনের কার্যক্রমও নেওয়া হয়েছে।

সৈয়দ রেফায়েত হামিম বলেন, বন্দরের বিভিন্ন সেবায় অটোমেশন ও ডিজিটাল ব্যবস্থার ব্যবহার বাড়ানোর ফলে কার্যক্রমে দক্ষতা ও গতি বাড়ছে। এনসিটির কার্যক্রম হস্তান্তরের পর দক্ষতা ১২ থেকে ১৪ শতাংশ বেড়েছে। ‘সিপিএ স্কাই’ ও প্রি-অ্যারাইভাল প্রসেসের মতো ডিজিটাল ব্যবস্থাও বন্দরের কার্যক্রমে গতি আনতে ভূমিকা রাখছে।

এর আগে জুলাইয়ে বন্দরের ডেলিভারি ডকুমেন্টেশনের প্রতিটি ধাপ টিওএসের মাধ্যমে ডিজিটাল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এতে ডেলিভারি অর্ডারের আবেদন থেকে চূড়ান্ত গেট আউট পর্যন্ত ম্যানুয়াল প্রক্রিয়া কমানোর কথা জানানো হয়েছিল। একই সঙ্গে টিওএসকে কাস্টমসের অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেমের সঙ্গে রিয়েল-টাইমে যুক্ত করা হয়েছে। ফলে কাস্টমস কোনো কনটেইনার আটকে দিলে সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়াও স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্থগিত করার ব্যবস্থা থাকবে।

বকেয়া মাশুল আদায়েও অটোমেশনের ব্যবহার বাড়ানো হচ্ছে বলে উল্লেখ করে বন্দর সচিব বলেন, বন্দর কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত মাশুল ৭২ ঘণ্টার মধ্যে পরিশোধ না হলে অটো পুল পেমেন্ট সিস্টেম চালুর সিদ্ধান্ত হয়েছে। এর ফলে বকেয়া অর্থ আদায়ের ক্ষেত্রে ম্যানুয়াল তদারকি কমবে এবং সংশ্লিষ্ট হিসাবও দ্রুত পাওয়া যাবে। একই সঙ্গে টিওএস-এর মাধ্যমে স্পেশাল ডেলিভারি অ্যাসাইনমেন্ট অনুমোদনের ব্যবস্থাও অনলাইনে নেওয়া হচ্ছে।

ব্রেক বাল্ক অপারেশনকেও দ্রুত অনলাইনের আওতায় আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করে বন্দর কর্তৃপক্ষ জানায়, বর্তমানে বন্দর ব্যবস্থাপনার বড় একটি অংশ কনটেইনারভিত্তিক হলেও বিপুল পরিমাণ পণ্য এখনো ব্রেক বাল্ক হিসেবে হ্যান্ডলিং হয়ে থাকে। এই কার্যক্রম ডিজিটাল ব্যবস্থায় এলে বন্দর পরিচালনার সামগ্রিক কার্যক্রম আরও সমন্বিত হবে।

বে টার্মিনালকে সামনে রেখেও ডিজিটাল অবকাঠামো তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে উল্লেখ করে বন্দর সচিব জানান, সেখানে স্লট বাই স্লট ম্যাপিং করে পেমেন্টভিত্তিক ট্রাক পার্কিং টিকিটিং ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। ভবিষ্যতে বে টার্মিনালে ট্রাকের প্রবেশ, পার্কিং ও নির্দিষ্ট স্লট ব্যবহারের বিষয়টিও ডিজিটাল ব্যবস্থাপনার আওতায় আসবে। বড় পরিসরে টার্মিনাল পরিচালনার ক্ষেত্রে এ ধরনের স্লটভিত্তিক ব্যবস্থাপনা যানবাহনের অযাচিত জট কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

বন্দর কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন ব্যবস্থায় একই কাজের জন্য ব্যবহারকারীদের একাধিক দপ্তর বা ডেস্কে যেতে হবে না। অনলাইনে কোন নথি কোন পর্যায়ে রয়েছে, সেটিও জানা যাবে। এতে সময় ও খরচ কমার পাশাপাশি সেবা প্রদানের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বাড়বে। ইতোমধ্যে ‘পোর্ট সিঙ্গেল উইন্ডো’ চালুর মাধ্যমে চট্টগ্রাম বন্দর পেপারলেস ও স্মার্ট পোর্ট ব্যবস্থার দিকে এগিয়েছে। ওই প্ল্যাটফর্মে এক লগইনের মাধ্যমে বিভিন্ন সেবা গ্রহণ এবং জাহাজের গতিবিধি রিয়েল-টাইমে পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। 

একটি কনটেইনার বন্দরে আসা থেকে শুরু করে বিল তৈরি, অর্থ পরিশোধ, কাস্টমসের অনুমোদন, ডেলিভারি, ট্রাকের প্রবেশ এবং শেষ পর্যন্ত গেট দিয়ে বের হয়ে যাওয়া পর্যন্ত প্রতিটি ধাপ ডিজিটালভাবে অনুসরণ করতে পারবে। এতে বন্দর ব্যবহারকারীদের সময় ও পরিবহন ব্যয় কমানোর পাশাপাশি বন্দরের রাজস্ব আদায় দ্রুততর হবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে। 

একই সঙ্গে কোন সেবার জন্য কত সময় লাগছে, কোথায় বিলম্ব হচ্ছে, কোন পর্যায়ে অর্থ বকেয়া রয়েছে কিংবা কোন কনটেইনার কোন অবস্থায় রয়েছে—এসব তথ্য রিয়েল-টাইমে পাওয়া গেলে বন্দর ব্যবস্থাপনায়ও নতুন গতিশীলতা তৈরি হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে।

বন্দর কর্তৃপক্ষের মতে, অটোমেশন ও ডিজিটালাইজেশনের ফলে সময় ও খরচ সাশ্রয়ের পাশাপাশি বকেয়া মাশুল দ্রুত আদায়সহ বিভিন্ন আর্থিক সুবিধা নিশ্চিত হবে। ডিসেম্বরের মধ্যে এসব কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণ করে পুরো বন্দরকে পেপারলেস ও স্মার্ট পোর্টে রূপান্তরের লক্ষ্য রয়েছে।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬


পেপারলেসের পথে চট্টগ্রাম বন্দর, ডিসেম্বরে স্মার্ট পোর্ট

প্রকাশের তারিখ : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

চট্টগ্রাম বন্দরকে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে ম্যানুয়াল প্রক্রিয়া ও কাগজপত্রের ব্যবহার কমিয়ে পুরো বন্দরকে পেপারলেস ও স্মার্ট পোর্টে রূপান্তরের লক্ষ্য নিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। বিল পরিশোধ থেকে কনটেইনার ডেলিভারি, ট্রাকের প্রবেশ থেকে জাহাজের ছাড়পত্রসহ চট্টগ্রাম বন্দরের প্রায় প্রতিটি ধাপই যাচ্ছে অনলাইনের আওতায়।

বন্দর ব্যবহারকারীদের সেবা সহজীকরণ, পণ্য খালাসে গতি, স্বচ্ছতা বৃদ্ধি, রাজস্ব আদায় ত্বরান্বিত ও যানজট কমাতে নেওয়া হয়েছে এসব উদ্যোগ। চবকের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম গণমাধ্যমকে এসব তথ্য জানান।

সূত্রে প্রকাশ, চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার। ২০২৫ সালে বন্দরটি রেকর্ড ৩৪ লাখ ৯ হাজার ৬৯ টিইইউএস কনটেইনার, ১৩ কোটি ৮১ লাখ ৫১ হাজার ৮১২ টন কার্গো এবং ৪ হাজার ২৭৩টি জাহাজ হ্যান্ডলিং করেছে। কনটেইনার হ্যান্ডলিং আগের বছরের তুলনায় ৪ দশমিক ৭ শতাংশ এবং কার্গো হ্যান্ডলিং ১১ দশমিক ৪৩ শতাংশ বেড়েছে। দেশের সমুদ্রপথে আসা-যাওয়া সাধারণ কার্গোর প্রায় ৯২ শতাংশ এবং কনটেইনারভিত্তিক আমদানি-রপ্তানির প্রায় ৯৮ শতাংশ এই বন্দরের মাধ্যমে পরিচালিত হয়ে আসছে।

সূত্র জানায়, বন্দরের এই বিপুল কর্মযজ্ঞের সঙ্গে শিপিং এজেন্ট, আমদানিকারক, রপ্তানিকারক, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট, কনটেইনার পরিবহনকারী, ব্যাংক, কাস্টমস, টার্মিনাল অপারেটরসহ অসংখ্য প্রতিষ্ঠান জড়িত রয়েছে। ফলে বন্দরের একটি সেবা ম্যানুয়াল থেকে ডিজিটালে রূপান্তরিত হলেও তার সুফল পেতে হলে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সেবাকেও একই প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করতে হবে। 

এ কারণেই এখন বিচ্ছিন্নভাবে অনলাইন সেবা চালুর পরিবর্তে পুরো প্রক্রিয়াকে একটি সমন্বিত ডিজিটাল ব্যবস্থার আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বর্তমানে ভেসেল বিলের ১০০ শতাংশ অনলাইনে সম্পাদিত হচ্ছে। এবার কনটেইনার ও কনসাইনি বিলও শতভাগ টার্মিনাল অপারেটিং সিস্টেম বা টিওএস-এর মাধ্যমে তৈরি ও আদায়ের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এর ফলে বিল তৈরি থেকে শুরু করে অর্থ পরিশোধ ও সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমের মধ্যে সরাসরি ডিজিটাল সংযোগ স্থাপিত হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের কনফারেন্স রুমে চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় ডিজিটালাইজেশন ও অটোমেশন কার্যক্রমের অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হয়। সভায় বন্দর সেবাকে আরও ডিজিটাল করা, যানজট কমানো, রাজস্ব আদায় ত্বরান্বিত করা এবং ব্যবহারকারীদের হয়রানি কমাতে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

চবক সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম সভায় নেওয়া বিভিন্ন সিদ্ধান্ত উল্লেখ করে বলেন, বর্তমানে বন্দরের শতভাগ ভেসেল বিল অনলাইনে সম্পন্ন হচ্ছে। কনটেইনার ও কনসাইনি বিলও শতভাগ টার্মিনাল অপারেটিং সিস্টেমের (টিওএস) মাধ্যমে তৈরি ও আদায়ের সিদ্ধান্ত হয়েছে। এরই মধ্যে ই-গেট পাস ইস্যু, গেট ইন ও গেট আউট অনলাইনের আওতায় আনা হয়েছে। পাশাপাশি টিওএসের মাধ্যমে টাইম স্লট ম্যানেজমেন্ট, অনলাইন কার্ট টিকিট, ই-গেট চালান এবং শতভাগ ভেসেল ই-এনওসি নিশ্চিত করার কার্যক্রম চলছে।

বন্দরের নবনির্মিত ওয়ান স্টপ সার্ভিস সেন্টারে সোনালী ব্যাংক পিএলসির বুথ স্থাপন এবং এপিআই ইন্টিগ্রেশনের মাধ্যমে যেকোনো সময় অনলাইনে পেমেন্টের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। ফলে ছুটির দিন ও অফিস সময়ের বাইরেও বন্দরের মাশুল পরিশোধের সুযোগ থাকবে। ৭২ ঘণ্টার মধ্যে মাশুল পরিশোধ না হলে অটো পুল পেমেন্ট সিস্টেম চালুর সিদ্ধান্তও হয়েছে।

শুধু পেমেন্ট নয়, পণ্য খালাসের পরবর্তী ধাপও স্বয়ংক্রিয় করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। টিওএসে অনলাইনে স্পেশাল ডেলিভারি অ্যাসাইনমেন্ট অনুমোদন, এনবিআর ও কাস্টমসের এপিআইয়ের মাধ্যমে অকশন ডেলিভারি এবং ব্রেকবাল্ক অপারেশন অনলাইনের আওতায় আনার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

বন্দর এলাকায় যানজট কমাতেও ডিজিটাল ব্যবস্থার ব্যবহার বাড়ানো হচ্ছে। টিওএসের নতুন সংস্করণে ড্রপ টিকিট, পিকআপ টিকিট ও ইআইআর ই-গেট পাসের সঙ্গে সমন্বয় করা হবে। একই সঙ্গে বে টার্মিনালে স্লটভিত্তিক ম্যাপিং করে পেমেন্টভিত্তিক ট্রাক পার্কিং টিকিটিং ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ওয়ান স্টপ সার্ভিস সেন্টারে রিয়েল-টাইমে নথি যাচাই, বিল তৈরি ও নিশ্চিতকরণ এবং আইসিডি ইন্টিগ্রেশনের কার্যক্রমও নেওয়া হয়েছে।

সৈয়দ রেফায়েত হামিম বলেন, বন্দরের বিভিন্ন সেবায় অটোমেশন ও ডিজিটাল ব্যবস্থার ব্যবহার বাড়ানোর ফলে কার্যক্রমে দক্ষতা ও গতি বাড়ছে। এনসিটির কার্যক্রম হস্তান্তরের পর দক্ষতা ১২ থেকে ১৪ শতাংশ বেড়েছে। ‘সিপিএ স্কাই’ ও প্রি-অ্যারাইভাল প্রসেসের মতো ডিজিটাল ব্যবস্থাও বন্দরের কার্যক্রমে গতি আনতে ভূমিকা রাখছে।

এর আগে জুলাইয়ে বন্দরের ডেলিভারি ডকুমেন্টেশনের প্রতিটি ধাপ টিওএসের মাধ্যমে ডিজিটাল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এতে ডেলিভারি অর্ডারের আবেদন থেকে চূড়ান্ত গেট আউট পর্যন্ত ম্যানুয়াল প্রক্রিয়া কমানোর কথা জানানো হয়েছিল। একই সঙ্গে টিওএসকে কাস্টমসের অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেমের সঙ্গে রিয়েল-টাইমে যুক্ত করা হয়েছে। ফলে কাস্টমস কোনো কনটেইনার আটকে দিলে সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়াও স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্থগিত করার ব্যবস্থা থাকবে।

বকেয়া মাশুল আদায়েও অটোমেশনের ব্যবহার বাড়ানো হচ্ছে বলে উল্লেখ করে বন্দর সচিব বলেন, বন্দর কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত মাশুল ৭২ ঘণ্টার মধ্যে পরিশোধ না হলে অটো পুল পেমেন্ট সিস্টেম চালুর সিদ্ধান্ত হয়েছে। এর ফলে বকেয়া অর্থ আদায়ের ক্ষেত্রে ম্যানুয়াল তদারকি কমবে এবং সংশ্লিষ্ট হিসাবও দ্রুত পাওয়া যাবে। একই সঙ্গে টিওএস-এর মাধ্যমে স্পেশাল ডেলিভারি অ্যাসাইনমেন্ট অনুমোদনের ব্যবস্থাও অনলাইনে নেওয়া হচ্ছে।

ব্রেক বাল্ক অপারেশনকেও দ্রুত অনলাইনের আওতায় আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করে বন্দর কর্তৃপক্ষ জানায়, বর্তমানে বন্দর ব্যবস্থাপনার বড় একটি অংশ কনটেইনারভিত্তিক হলেও বিপুল পরিমাণ পণ্য এখনো ব্রেক বাল্ক হিসেবে হ্যান্ডলিং হয়ে থাকে। এই কার্যক্রম ডিজিটাল ব্যবস্থায় এলে বন্দর পরিচালনার সামগ্রিক কার্যক্রম আরও সমন্বিত হবে।

বে টার্মিনালকে সামনে রেখেও ডিজিটাল অবকাঠামো তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে উল্লেখ করে বন্দর সচিব জানান, সেখানে স্লট বাই স্লট ম্যাপিং করে পেমেন্টভিত্তিক ট্রাক পার্কিং টিকিটিং ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। ভবিষ্যতে বে টার্মিনালে ট্রাকের প্রবেশ, পার্কিং ও নির্দিষ্ট স্লট ব্যবহারের বিষয়টিও ডিজিটাল ব্যবস্থাপনার আওতায় আসবে। বড় পরিসরে টার্মিনাল পরিচালনার ক্ষেত্রে এ ধরনের স্লটভিত্তিক ব্যবস্থাপনা যানবাহনের অযাচিত জট কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

বন্দর কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন ব্যবস্থায় একই কাজের জন্য ব্যবহারকারীদের একাধিক দপ্তর বা ডেস্কে যেতে হবে না। অনলাইনে কোন নথি কোন পর্যায়ে রয়েছে, সেটিও জানা যাবে। এতে সময় ও খরচ কমার পাশাপাশি সেবা প্রদানের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বাড়বে। ইতোমধ্যে ‘পোর্ট সিঙ্গেল উইন্ডো’ চালুর মাধ্যমে চট্টগ্রাম বন্দর পেপারলেস ও স্মার্ট পোর্ট ব্যবস্থার দিকে এগিয়েছে। ওই প্ল্যাটফর্মে এক লগইনের মাধ্যমে বিভিন্ন সেবা গ্রহণ এবং জাহাজের গতিবিধি রিয়েল-টাইমে পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। 

একটি কনটেইনার বন্দরে আসা থেকে শুরু করে বিল তৈরি, অর্থ পরিশোধ, কাস্টমসের অনুমোদন, ডেলিভারি, ট্রাকের প্রবেশ এবং শেষ পর্যন্ত গেট দিয়ে বের হয়ে যাওয়া পর্যন্ত প্রতিটি ধাপ ডিজিটালভাবে অনুসরণ করতে পারবে। এতে বন্দর ব্যবহারকারীদের সময় ও পরিবহন ব্যয় কমানোর পাশাপাশি বন্দরের রাজস্ব আদায় দ্রুততর হবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে। 

একই সঙ্গে কোন সেবার জন্য কত সময় লাগছে, কোথায় বিলম্ব হচ্ছে, কোন পর্যায়ে অর্থ বকেয়া রয়েছে কিংবা কোন কনটেইনার কোন অবস্থায় রয়েছে—এসব তথ্য রিয়েল-টাইমে পাওয়া গেলে বন্দর ব্যবস্থাপনায়ও নতুন গতিশীলতা তৈরি হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে।

বন্দর কর্তৃপক্ষের মতে, অটোমেশন ও ডিজিটালাইজেশনের ফলে সময় ও খরচ সাশ্রয়ের পাশাপাশি বকেয়া মাশুল দ্রুত আদায়সহ বিভিন্ন আর্থিক সুবিধা নিশ্চিত হবে। ডিসেম্বরের মধ্যে এসব কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণ করে পুরো বন্দরকে পেপারলেস ও স্মার্ট পোর্টে রূপান্তরের লক্ষ্য রয়েছে।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত