সংবাদ

প্রবন্ধ

‘ডাইনী’ ও ‘পানকৌড়ির রক্ত’: একটি মনস্তাত্ত্বিক পর্যালোচনা


মোহিত কামাল
মোহিত কামাল
প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:১৩ পিএম

‘ডাইনী’ ও ‘পানকৌড়ির রক্ত’: একটি মনস্তাত্ত্বিক পর্যালোচনা

কোনো গল্পকে একক তাত্ত্বিক কাঠামোর মধ্যে আবদ্ধ করলে তার সম্ভাব্য অর্থের অনেকটাই অনাবিষ্কৃত থেকে যেতে পারে। বাস্তববাদী পাঠে যে গল্পকে সামাজিক বাস্তবতার দলিল বলে মনে হয়, আধুনিকতাবাদী পাঠে সেখানে দেখা দিতে পারে ব্যক্তিমানসের সংকট; আবার উত্তর-আধুনিক পাঠে সেই একই গল্পের চরিত্র, পরিচয়, সত্য ও বাস্তবতা সম্পর্কে প্রতিষ্ঠিত ধারণাগুলোই প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। তাই একই গল্পের ভিন্ন তাত্ত্বিক পাঠ শুধু ভিন্ন ব্যাখ্যা দেয় না, গল্পের অর্থ নির্মাণের কৌশল বা প্রক্রিয়াটিও দৃশ্যমান করে।

এই অংশে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘ডাইনী’ এবং আল মাহমুদের ‘পানকৌড়ির রক্ত’ দুটি ভিন্ন সময় ও স্বরের গল্পকে আধুনিকতাবাদী ও উত্তর-আধুনিক তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে পাঠ করতে চাই। 

এর উদ্দেশ্য কোনো গল্পকে জোর করে ‘আধুনিকতাবাদী’ বা ‘উত্তর-আধুনিক’ বলে শ্রেণিবদ্ধ করা নয়; বরং দেখানো, সাহিত্যতত্ত্বের ধারণাগুলো ব্যবহার করলে প্রতিষ্ঠিত কোনো গল্পের নতুন অর্থ কীভাবে উন্মোচিত হতে পারে।

উনিশ শতকের শেষ ভাগ থেকে বিশ শতকের মধ্যভাগে পশ্চিমা বিশ্বে গড়ে ওঠা সাংস্কৃতিক, শৈল্পিক ও বৌদ্ধিক আন্দোলনের নাম আধুনিকতাবাদ; পুরোনো ঐতিহ্য, সনাতন বিশ্বাস ও রীতিনীতিকে পেছনে ফেলে নতুন রূপ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং শিল্প-সাহিত্যে আধুনিক জীবনের বাস্তবতাকে প্রকাশ করার এক জোরালো প্রয়াস। সাহিত্যে একরৈখিক কাহিনির পরিবর্তে মনের ভেতরের জটিল প্রবাহ বা ‘স্ট্রিম অব কনশাসনেস’ এবং আত্মোপলব্ধির প্রকাশকে গুরুত্ব দিয়ে পরিবর্তন আসে এই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। শিল্পকলায় বাস্তবধর্মী অঙ্কনরীতি ভেঙে বিমূর্ততা ও নতুন রূপের পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু হয়, আর দর্শনেও চলমান ধারার বিরোধিতা করে নতুন ও স্বাধীন মতবাদের জন্ম দেয়।

বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে আধুনিকতাবাদের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া হিসেবে নতুন চিন্তা এবং শিল্প-সাহিত্য আন্দোলনের জোরালো বক্তব্য নিয়ে শুরু হয় উত্তরা-আধুনিকতাবাদ। নির্দিষ্ট কোনো ধ্রুব সত্য, সর্বজনীন নিয়ম বা বড় কোনো তত্ত্বে বিশ্বাস করেন না এ আন্দোলনের উদ্যোক্তারা; পরিবর্তে বহুমুখিতা, ভিন্ন মত এবং জীবনের জটিলতাকে গুরুত্ব দেন। তাঁদের মতে সাহিত্য-শিল্পে এক ও অদ্বিতীয় কোনো সত্য নেই, বরং মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন হতে পারে। 

সহজ কথায়, আধুনিকতাবাদ শৃঙ্খলা, সরলতা এবং সুন্দর ভবিষ্যতের আদর্শে বিশ্বাস করে, আর উত্তর-আধুনিকতাবাদ বিশৃঙ্খলা, জটিলতা এবং প্রচলিত ধারণার অসারতা প্রমাণে জোর দেয়।


‘ডাইনী’

তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘ডাইনী’ রাঢ় বাংলার গ্রামীণ সমাজ, নিম্নবর্গের জীবন, লোকবিশ্বাস ও সামাজিক কুসংস্কারের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত। গল্পটির কেন্দ্রে রয়েছে এক নারী। সমাজ তাকে ‘ডাইনী’ হিসেবে চিহ্নিত করে। এই পরিচয় কেবলই বাইরের নিষ্ঠুর অপবাদ হয়ে থাকেনি; ক্রমে তা তার নিজের আত্মপরিচয়ের অংশ হয়ে ওঠে। বিভিন্ন আলোচনায়ও গল্পটির এই দিক বিশেষভাবে চিহ্নিত হয়েছে। কোনো সামাজিক অপবাদ কীভাবে একজন মানুষের নিজের বিশ্বাসে পরিণত হয় এবং তার জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করতে থাকে, গল্পটিতে সে কথা বলা হয়েছে।

ডাইনীর আধুনিকতাবাদী পাঠ: এই সাহিত্যতত্ত্ব পাঠে বাইরের ঘটনাকে কেবল সামাজিক বাস্তবতা হিসেবে দেখা হয় না; ব্যক্তির অন্তর্লোক, বিচ্ছিন্নতা, ভয়, অস্তিত্বসংকট এবং বাস্তবতার সঙ্গে ব্যক্তিমানসের সংঘাত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এ গল্পে সমাজ একজন নারীকে যে পরিচয় দেয়, তার সঙ্গে নারীর নিজের অস্তিত্বের সম্পর্ক ক্রমে জটিল হয়ে ওঠে। 

শুরুতে ‘ডাইনী’ ছিল সামাজিকভাবে আরোপিত অপবাদ। কিন্তু দীর্ঘদিনের সামাজিক প্রত্যাখ্যান, ভয় ও নিঃসঙ্গতা তাকে বিরূপ পরিস্থিতির মধ্যে নিয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত আরোপিত পরিচয়টা তার আত্মপরিচয়ের অংশ হয়ে ওঠে। ফলে গল্পটির ট্র্যাজেডি কেবল কুসংস্কারের নয়; মানুষের আত্মসত্তা কীভাবে সামাজিক অভিজ্ঞতার দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তারও গল্প।

‘বুড়া শিবতলার সম্মুখেই দুর্গাসায়রের বাঁধাঘাটের ভাঙা রানার উপর সে দাঁড়াইয়া ছিল— জলের তলে তাহার ছবি উল্টা দিকে মাথা করিয়া দাঁড়াইয়া জলের ঢেউয়ে আঁকিয়া বাঁকিয়া লম্বা হইয়া যাইতেছিল— জল স্থির হইলে লম্বা ছবিটি অবিকল তাহার মতো দশ-এগার বৎসরের মেয়েটি হইয়া তাহারই দিকে চাহিয়া হাসিতেছিল। হঠাৎ বামুন-বাড়ির হারু সরকার আসিয়া তাহার চুলের মুঠি ধরিয়া টানিয়া সান-বাঁধানো সিঁড়ির উপর তাহাকে আছাড় দিয়া ফেলিয়া দিয়াছিল। তাহার সে রূঢ় কণ্ঠস্বর সে এখনও শুনিতে পায়— হারামজাদী ডাইনী, তুমি আমার ছেলেকে নজর দিয়েছ? তোমার এত বড় বাড়? খুন করে ফেলব হারামজাদীকে।

হারু সরকারের সে ভয়ঙ্কর মূর্তি যেন স্পষ্ট চোখের উপর ভাসিতেছে।’

এখানে আধুনিকতাবাদী পাঠে মূল প্রশ্ন হতে পারে, মানুষ নিজের সম্পর্কে যে ধারণা অর্জন করে, তা কতটা নিজের এবং কতটা তার চারপাশের সমাজের তৈরি?

গল্পের ভয়, নিঃসঙ্গতা ও মানসিক সংকটকে এই দৃষ্টিতে পাঠ করলে ‘ডাইনী’ আর কেবল কুসংস্কারাচ্ছন্ন গ্রামীণ সমাজের গল্প থাকে না; প্রবলভাবে উচ্চারিত ‘ডাইনী’ শব্দটা দশ-এগারো বছরের মেয়েটির মর্মমূলে শক্তিশালী নেতিবাচক ছাপ বসিয়ে দেয়; তার সমগ্র জীবনকে বদলে দেয়। শৈশব থেকে এভাবে এক নারীর ক্রমশ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া এবং নিজের মানবিক পরিচয় হারিয়ে ফেলার ক্লাসিকেল গল্পে উত্তীর্ণ হয়ে যায় এই আখ্যানটি। অন্যদিকে, গল্পে প্রকৃতি ও পরিবেশও কেবল পটভূমি হিসেবে চিহ্নিত হয়নি। অন্ধকার, নির্জনতা, ভয়, জনশূন্যতা— এসব বাইরের উপাদান চরিত্রের মানসিক অবস্থার সঙ্গে মিশে যায়। ফলে বহির্জগৎ ও অন্তর্জগতের মধ্যে সমান্তরাল সম্পর্ক তৈরি হয়ে যায়। আধুনিকতাবাদী পাঠে এই সম্পর্ক গল্পের মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা বাড়ায়।

উত্তর-আধুনিক পাঠ: উত্তর-আধুনিক পাঠে প্রশ্নটা আরও ভিন্নভাবে করা যায়। ‘ডাইনী’ আসলে কে? সে কি জন্মগতভাবে ডাইনী? নাকি সমাজ তাকে ডাইনী বানিয়েছে?

এখানে ‘ডাইনী’ কোনো স্বাভাবিক বা চূড়ান্ত পরিচয় নয়; সামাজিকভাবে নির্মিত নির্মম এক পরিচয়। সমাজ কোনো মানুষকে ‘স্বাভাবিক’ এবং অন্য একজনকে ‘অস্বাভাবিক’, ‘ভয়ঙ্কর’ কিংবা ‘অশুভ’ হিসেবে চিহ্নিত করে। অর্থাৎ ‘ডাইনী’ পরিচয় ব্যক্তির শরীর বা অস্তিত্বের কোনো নির্দিষ্ট সত্য নয়; সামাজিক ভাষ্য ও ক্ষমতার সম্পর্কের মধ্য দিয়ে তৈরি হয়।

এখানে প্রাসঙ্গিকভাবে ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকোর পাওয়ার/ডিসকোর্স ধারণার প্রয়োগ করা যায়— ক্ষমতা শুধু নিষেধ করে না; বরং মানুষকে শ্রেণিবদ্ধ করে, নাম দেয়, পরিচয় নির্ধারণ করে এবং কোনটা সত্য বলে গ্রহণযোগ্য হবে তা নির্ধারণ করে। ‘ডাইনী’ নামটাও তেমন ক্ষমতাশীল সামাজিক উচ্চারণ।

সমাজ নিজেকে ‘স্বাভাবিক’ বা ‘শুদ্ধ’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে যে মানুষকে ভিন্ন, অশুভ বা বিপজ্জনক হিসেবে চিহ্নিত করে, সেই মানুষটি হয়ে ওঠে ‘অন্য’। ফলে ‘ডাইনী’ কেবল একক চরিত্র নয়; সে সামাজিক ‘অন্য’-এর প্রতীকও।

আরও এক গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দ্বৈত বিরোধ— স্বাভাবিক/অস্বাভাবিক, মানুষ/অমানুষ, পবিত্র/অপবিত্র, আমাদের/অন্য। উত্তর-আধুনিক পাঠ এই দ্বৈততাগুলোর স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলে।  যে নারীকে সমাজ ‘অমানবিক’ বা ‘অশুভ’ বলে চিহ্নিত করে, গল্পের মানবিক পরিণতি শেষ পর্যন্ত সেই সামাজিক শ্রেণিবিভাগকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। ফলে গল্পটির উত্তর-আধুনিক প্রশ্ন হতে পারে, ‘ডাইনী’ কি তার প্রকৃত পরিচয়, নাকি সমাজের দেওয়া একটি নাম? এই প্রশ্নের কোনো একক উত্তর নেই। বরং এ গল্প দেখায়, নাম কখনো কখনো মানুষের ওপর এমনভাবে আরোপিত হতে পারে যে শেষ পর্যন্ত মানুষ সেই নামের মধ্য দিয়েই নিজেকে দেখতে শুরু করে। এখানেই পরিচয়কে এক ধরনের নির্মাণপ্রক্রিয়া হিসেবে পাঠ করার সুযোগ তৈরি হয়।


‘পানকৌড়ির রক্ত’ 

‘পানকৌড়ির রক্ত’ আল মাহমুদের প্রথম গল্পগ্রন্থের নামগল্প এবং ১৯৭৫ সালে ‘বর্ণমিছিল প্রকাশনী’ থেকে গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়। গল্পটির কেন্দ্রে রয়েছে প্রকৃতি, শিকার, পাখি, রক্ত, নারী-শরীর, আকাঙ্ক্ষা এবং মানুষের অন্তর্লোকের পারস্পরিক সম্পর্ক। সমালোচনামূলক আলোচনায় গল্পটির শুরুতে পানকৌড়ির সৌন্দর্যের সঙ্গে কথকের স্ত্রীর সৌন্দর্যের তুলনা এবং প্রকৃতি ও নারীর শরীরকে পরস্পরের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার দিকটি বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো, আল মাহমুদ নিজেই এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, পানকৌড়ির হত্যার মাধ্যমে তিনি রঙের বিবর্তন এবং মানুষের ওপর তার প্রভাব দেখাতে চেয়েছিলেন। তিনি গল্পটিকে একজন চিত্রকরের কাজের সঙ্গেও তুলনা করেছেন।

আধুনিকতাবাদী পাঠ: ‘পানকৌড়ির রক্ত’-র আধুনিকতাবাদী পাঠে প্রথমেই চোখে পড়ে দৃশ্যমান বাইরের ঘটনা ও অন্তর্গত অভিজ্ঞতার পার্থক্য। ঘটনাটি খুব সরল।

একজন শিকারি পানকৌড়িকে লক্ষ করে গুলি চালায়। কিন্তু গল্পের অর্থ কেবল পাখি শিকার করার ঘটনায় সীমাবদ্ধ থাকে না। পানকৌড়ির শরীর, তার কালো রং, জলের সঙ্গে তার সম্পর্ক, রক্তের দৃশ্য এবং স্ত্রীর শরীরের স্মৃতিসহ সবকিছু মিলিয়ে কথকের অন্তর্জগতে জটিল অনুভূতির জন্ম হয়। অর্থাৎ ঘটনা এখানে মনস্তাত্ত্বিক অভিজ্ঞতায় রূপান্তরিত হয়।

‘আমি আবার আমার একনলা বন্দুক হাতে ত্রিকোণাকৃতি চরভূমির নরম গুল্মলতায় পা মাড়িয়ে চলতে লাগলাম। নদীটা যেখানে বাঁক নিয়েছে আমি সেখানে এসে পেশাদার শিকারির মতো হাঁটু গেড়ে বন্দুক বাগিয়ে বসলাম। আমার বসার সাথে সাথে কালো বেলুনের মতো একটা পানকৌড়ি পানির ওপর ভেসে উঠল। আমি মুহূর্তমাত্র বিলম্ব না করে গুলি ছুড়লাম। গুলির শব্দ আর বন্দুকের পাল্টা ধকলে আমার চোখের সামনে সমগ্র নিসর্গচিত্রটি ফেটে চৌচির হয়ে গেল। আমি দেখলাম, একটি শ্যামবর্ণ নারীশরীর নদীর নীলিমায় আপন রক্তের মধ্যে তোলপাড় করছে। মনে হলো, আলোকিত এই মুখ, বাহু, বুক ও যুগল-ঊরু আমার চেনা। আমি আদিনার নাম ধরে নদীর দিকে ডাক দিতে গেলে দেখলাম সেই অঙ্গশোভা ঢেউয়ের ছলছলানি তুলে ডুবে যাচ্ছে। আমি বন্দুকের গরম নলে গাল চেপে অসহায়ের মতো বসে রইলাম। বারুদের গন্ধে আমার চারপাশটা ভরে যেতে লাগল।’

আধুনিকতাবাদী পাঠে তাই প্রশ্ন হতে পারে, এখানে কি কেবল একটা পাখিকে হত্যা করা হয়েছে, নাকি কথকের নিজের আকাঙ্ক্ষা, স্মৃতি ও অপরাধবোধের সঙ্গে তার অন্তর্গত সম্পর্ক তৈরি হয়ে গেছে? এখানে বিচ্ছিন্নতা কিংবা অন্তর্দ্বন্দ্বও গুরুত্বপূর্ণ। প্রকৃতিকে উপভোগ করা মানুষই আবার প্রকৃতির নিরীহ প্রাণিকে হত্যা করে। সৌন্দর্যের প্রতি আকর্ষণ এবং ধ্বংসের প্রবৃত্তি একই মানুষের মধ্যে সহাবস্থান করে। ফলে মানুষ ও প্রকৃতির সম্পর্ক সরল বা একমাত্রিক থাকে না। গল্পের রক্তও কেবল হত্যার ফল নয়; সৌন্দর্য, কামনা, জীবন, মৃত্যু ও অপরাধবোধের মধ্যে সংযোগ তৈরি করে। আল মাহমুদের নিজের বক্তব্যে রং এবং রক্তের যে সম্পর্কের কথা এসেছে, তা গল্পের এই শিল্পরূপ বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

উত্তর-আধুনিক পাঠ: এই পাঠে ‘পানকৌড়ির রক্ত’ আরও বহুমাত্রিক হয়ে ওঠে। এখানে মানুষ/প্রকৃতি, শিকারি/শিকার, সৌন্দর্য/হিংসা, কামনা/অপরাধ, জীবন/মৃত্যু— এসব দ্বৈত সম্পর্ককে স্থির ও চূড়ান্ত বলে গ্রহণ করা যায় না। শিকারি মানুষ; পানকৌড়ি শিকার।  কিন্তু গল্পের অর্থ কেবল এই ক্ষমতার সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। পানকৌড়ির শরীর কথকের কাছে নারীর শরীরের স্মৃতি জাগায়; পাখির রক্ত মানুষের কামনা, সৌন্দর্য ও মৃত্যুচেতনার সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। ফলে এই প্রাণি হত্যার ঘটনা একাধিক অর্থের কেন্দ্র হয়ে ওঠে। ‘রক্ত’ একদিকে মৃত্যু ও হিংসার চিহ্ন, অন্যদিকে জীবন, যৌনতা, আকাঙ্ক্ষা এবং সৌন্দর্যেরও চিহ্ন। একই চিহ্ন একাধিক অর্থ তৈরি করে। এখানে গল্পের বহুমাত্রিক অর্থ গুরুত্বপূর্ণ। 

‘পানকৌড়ি’ কেবল পাখি নয়; হয়ে উঠতে পারে প্রকৃতি, সৌন্দর্য, নারী-শরীর, আকাঙ্ক্ষা কিংবা ধ্বংসের প্রতীক। আবার ‘রক্ত’ও কেবল শারীরিক রক্ত নয়; জীবন ও মৃত্যুর সীমারেখাকে অস্পষ্ট করে। এই বহুমাত্রিকতা গল্পটিকে উত্তর-আধুনিক পাঠের জন্য উন্মুক্ত করে।

তবে সতর্ক থাকা জরুরি: ‘পানকৌড়ির রক্ত’কে সরাসরি উত্তর-আধুনিক গল্প বলা ঠিক হবে না। গল্পটির রচনাকাল ও সাহিত্যিক অবস্থান ভিন্ন। বরং উত্তর-আধুনিক তত্ত্বের আলোকে পাঠ করলে গল্পের মধ্যে এমন কিছু অর্থের সম্ভাবনা দেখা যায়, যা তার প্রথম প্রকাশকালীন পাঠের বাইরে গিয়ে নতুন ব্যাখ্যার সুযোগ তৈরি করে।

একই গল্পে দুই তত্ত্ব: পার্থক্য কোথায়?: ‘ডাইনী’ গল্পে ব্যক্তির নিঃসঙ্গতা, মানসিক সংকট, আত্মপরিচয়ের বিপর্যয় প্রাধান্য পেয়েছে। ‘ডাইনী’ পরিচয় সামাজিক নির্মাণে ঙঃযবৎরহম ক্ষমতা ও ফরংপড়ঁৎংব মতাদর্শ ফুটে উঠেছে।

‘পানকৌড়ির রক্ত’ গল্পে অন্তর্দ্বন্দ্ব, আকাঙ্ক্ষা, স্মৃতি, অপরাধবোধ, মানুষ-প্রকৃতির দ্বন্দ্ব, চিহ্নের বহুমাত্রিকতা, দ্বৈত বিরোধের ভাঙন, প্রকৃতি-মানুষ ও সৌন্দর্য-হিংসার অনির্দিষ্ট সম্পর্ক দুটির ‘অর্থ’ এক জায়গায় স্থির থাকে না। ‘ডাইনী’-তে প্রশ্ন ওঠে, পরিচয় কে তৈরি করে? ‘পানকৌড়ির রক্ত’-এ প্রশ্ন ওঠে, ঘটনা বা চিহ্নের অর্থ কে নির্ধারণ করে? প্রথম গল্পে ‘পরিচয়’ এবং দ্বিতীয় গল্পে ‘অর্থ’ হয়ে ওঠে নির্মাণের বিষয়। এভাবেই দুটি গল্প পাশাপাশি রেখে বলা যায়, সাহিত্য পাঠের ক্ষেত্রে কোনো একক তত্ত্বই শেষ কথা নয়। একই গল্পের মধ্যে একাধিক অর্থের সম্ভাবনা থাকে এবং পাঠের দৃষ্টিকোণ পরিবর্তিত হলে সেই সম্ভাবনাও পরিবর্তিত হয়।

এই দুই গল্পের পাঠ থেকে আমাদের মূল সিদ্ধান্ত আবারও স্পষ্ট হয়: গল্পের অর্থ শুধু গল্পের ঘটনায় নিহিত নয়; পাঠের পদ্ধতিও অর্থ নির্মাণে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। তারাশঙ্করের ‘ডাইনী’কে আধুনিকতাবাদী পাঠে একজন নিঃসঙ্গ ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত মানুষের ট্র্যাজেডি হিসেবে দেখা যায়; উত্তর-আধুনিক পাঠে একই গল্প সামাজিক পরিচয়, ক্ষমতা ও ‘অন্য’ নির্মাণের গল্পে পরিণত হয়। আবার ‘পানকৌড়ির রক্ত’ আধুনিকতাবাদী পাঠে মানুষের অন্তর্লোক, আকাঙ্ক্ষা ও অপরাধবোধের জটিলতা প্রকাশ করে; উত্তর-আধুনিক পাঠে তা চিহ্ন, প্রকৃতি, শরীর, রক্ত, সৌন্দর্য ও হিংসার বহুমাত্রিক সম্পর্কের একটি উন্মুক্ত পাঠক্ষেত্র হয়ে ওঠে।

অতএব, গল্পের অর্থ এক দরজা দিয়ে প্রবেশ করা কোনো ঘর নয়; বরং ভিন্ন ভিন্ন পাঠের জন্য তার একাধিক দরজা খোলা থাকে।


গ্রন্থঋণ :

১. তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, শ্রেষ্ঠ গল্প; ঢাকা, প্রকাশক, প্রতীক প্রকাশনা সংস্থা।

২. আল মাহমুদ, পানকৌড়ির রক্ত; ঢাকা, প্রকাশক, আদর্শ।

সূত্র

3. Barry, Peter. Beginning Theory: An Introduction to Literary and Cultural Theory. Manchester: Manchester University Press.

4. Eagleton, Terry. Literary Theory: An Introduction. Minneapolis: University of Minnesota Press.

5. Abrams, M. H., and Geoffrey Galt Harpham. A Glossary of Literary Terms. Boston: Wadsworth/Cengage.

6. Lodge, David, ed. Modern Criticism and Theory: A Reader. London: Longman.

7. Foucault, Michel. Power/Knowledge: Selected Interviews and Other Writings, 1972–1977. Edited by Colin Gordon. New York: Pantheon.

8. Lyotard, Jean-François. The Postmodern Condition: A Report on Knowledge. Minneapolis: University of Minnesota Press.

9. Hutcheon, Linda. A Poetics of Postmodernism: History, Theory, Fiction. New York: Routledge.

*** 

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর ২০২৬


‘ডাইনী’ ও ‘পানকৌড়ির রক্ত’: একটি মনস্তাত্ত্বিক পর্যালোচনা

প্রকাশের তারিখ : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

কোনো গল্পকে একক তাত্ত্বিক কাঠামোর মধ্যে আবদ্ধ করলে তার সম্ভাব্য অর্থের অনেকটাই অনাবিষ্কৃত থেকে যেতে পারে। বাস্তববাদী পাঠে যে গল্পকে সামাজিক বাস্তবতার দলিল বলে মনে হয়, আধুনিকতাবাদী পাঠে সেখানে দেখা দিতে পারে ব্যক্তিমানসের সংকট; আবার উত্তর-আধুনিক পাঠে সেই একই গল্পের চরিত্র, পরিচয়, সত্য ও বাস্তবতা সম্পর্কে প্রতিষ্ঠিত ধারণাগুলোই প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। তাই একই গল্পের ভিন্ন তাত্ত্বিক পাঠ শুধু ভিন্ন ব্যাখ্যা দেয় না, গল্পের অর্থ নির্মাণের কৌশল বা প্রক্রিয়াটিও দৃশ্যমান করে।

এই অংশে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘ডাইনী’ এবং আল মাহমুদের ‘পানকৌড়ির রক্ত’ দুটি ভিন্ন সময় ও স্বরের গল্পকে আধুনিকতাবাদী ও উত্তর-আধুনিক তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে পাঠ করতে চাই। 

এর উদ্দেশ্য কোনো গল্পকে জোর করে ‘আধুনিকতাবাদী’ বা ‘উত্তর-আধুনিক’ বলে শ্রেণিবদ্ধ করা নয়; বরং দেখানো, সাহিত্যতত্ত্বের ধারণাগুলো ব্যবহার করলে প্রতিষ্ঠিত কোনো গল্পের নতুন অর্থ কীভাবে উন্মোচিত হতে পারে।

উনিশ শতকের শেষ ভাগ থেকে বিশ শতকের মধ্যভাগে পশ্চিমা বিশ্বে গড়ে ওঠা সাংস্কৃতিক, শৈল্পিক ও বৌদ্ধিক আন্দোলনের নাম আধুনিকতাবাদ; পুরোনো ঐতিহ্য, সনাতন বিশ্বাস ও রীতিনীতিকে পেছনে ফেলে নতুন রূপ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং শিল্প-সাহিত্যে আধুনিক জীবনের বাস্তবতাকে প্রকাশ করার এক জোরালো প্রয়াস। সাহিত্যে একরৈখিক কাহিনির পরিবর্তে মনের ভেতরের জটিল প্রবাহ বা ‘স্ট্রিম অব কনশাসনেস’ এবং আত্মোপলব্ধির প্রকাশকে গুরুত্ব দিয়ে পরিবর্তন আসে এই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। শিল্পকলায় বাস্তবধর্মী অঙ্কনরীতি ভেঙে বিমূর্ততা ও নতুন রূপের পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু হয়, আর দর্শনেও চলমান ধারার বিরোধিতা করে নতুন ও স্বাধীন মতবাদের জন্ম দেয়।

বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে আধুনিকতাবাদের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া হিসেবে নতুন চিন্তা এবং শিল্প-সাহিত্য আন্দোলনের জোরালো বক্তব্য নিয়ে শুরু হয় উত্তরা-আধুনিকতাবাদ। নির্দিষ্ট কোনো ধ্রুব সত্য, সর্বজনীন নিয়ম বা বড় কোনো তত্ত্বে বিশ্বাস করেন না এ আন্দোলনের উদ্যোক্তারা; পরিবর্তে বহুমুখিতা, ভিন্ন মত এবং জীবনের জটিলতাকে গুরুত্ব দেন। তাঁদের মতে সাহিত্য-শিল্পে এক ও অদ্বিতীয় কোনো সত্য নেই, বরং মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন হতে পারে। 

সহজ কথায়, আধুনিকতাবাদ শৃঙ্খলা, সরলতা এবং সুন্দর ভবিষ্যতের আদর্শে বিশ্বাস করে, আর উত্তর-আধুনিকতাবাদ বিশৃঙ্খলা, জটিলতা এবং প্রচলিত ধারণার অসারতা প্রমাণে জোর দেয়।


‘ডাইনী’

তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘ডাইনী’ রাঢ় বাংলার গ্রামীণ সমাজ, নিম্নবর্গের জীবন, লোকবিশ্বাস ও সামাজিক কুসংস্কারের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত। গল্পটির কেন্দ্রে রয়েছে এক নারী। সমাজ তাকে ‘ডাইনী’ হিসেবে চিহ্নিত করে। এই পরিচয় কেবলই বাইরের নিষ্ঠুর অপবাদ হয়ে থাকেনি; ক্রমে তা তার নিজের আত্মপরিচয়ের অংশ হয়ে ওঠে। বিভিন্ন আলোচনায়ও গল্পটির এই দিক বিশেষভাবে চিহ্নিত হয়েছে। কোনো সামাজিক অপবাদ কীভাবে একজন মানুষের নিজের বিশ্বাসে পরিণত হয় এবং তার জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করতে থাকে, গল্পটিতে সে কথা বলা হয়েছে।

ডাইনীর আধুনিকতাবাদী পাঠ: এই সাহিত্যতত্ত্ব পাঠে বাইরের ঘটনাকে কেবল সামাজিক বাস্তবতা হিসেবে দেখা হয় না; ব্যক্তির অন্তর্লোক, বিচ্ছিন্নতা, ভয়, অস্তিত্বসংকট এবং বাস্তবতার সঙ্গে ব্যক্তিমানসের সংঘাত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এ গল্পে সমাজ একজন নারীকে যে পরিচয় দেয়, তার সঙ্গে নারীর নিজের অস্তিত্বের সম্পর্ক ক্রমে জটিল হয়ে ওঠে। 

শুরুতে ‘ডাইনী’ ছিল সামাজিকভাবে আরোপিত অপবাদ। কিন্তু দীর্ঘদিনের সামাজিক প্রত্যাখ্যান, ভয় ও নিঃসঙ্গতা তাকে বিরূপ পরিস্থিতির মধ্যে নিয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত আরোপিত পরিচয়টা তার আত্মপরিচয়ের অংশ হয়ে ওঠে। ফলে গল্পটির ট্র্যাজেডি কেবল কুসংস্কারের নয়; মানুষের আত্মসত্তা কীভাবে সামাজিক অভিজ্ঞতার দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তারও গল্প।

‘বুড়া শিবতলার সম্মুখেই দুর্গাসায়রের বাঁধাঘাটের ভাঙা রানার উপর সে দাঁড়াইয়া ছিল— জলের তলে তাহার ছবি উল্টা দিকে মাথা করিয়া দাঁড়াইয়া জলের ঢেউয়ে আঁকিয়া বাঁকিয়া লম্বা হইয়া যাইতেছিল— জল স্থির হইলে লম্বা ছবিটি অবিকল তাহার মতো দশ-এগার বৎসরের মেয়েটি হইয়া তাহারই দিকে চাহিয়া হাসিতেছিল। হঠাৎ বামুন-বাড়ির হারু সরকার আসিয়া তাহার চুলের মুঠি ধরিয়া টানিয়া সান-বাঁধানো সিঁড়ির উপর তাহাকে আছাড় দিয়া ফেলিয়া দিয়াছিল। তাহার সে রূঢ় কণ্ঠস্বর সে এখনও শুনিতে পায়— হারামজাদী ডাইনী, তুমি আমার ছেলেকে নজর দিয়েছ? তোমার এত বড় বাড়? খুন করে ফেলব হারামজাদীকে।

হারু সরকারের সে ভয়ঙ্কর মূর্তি যেন স্পষ্ট চোখের উপর ভাসিতেছে।’

এখানে আধুনিকতাবাদী পাঠে মূল প্রশ্ন হতে পারে, মানুষ নিজের সম্পর্কে যে ধারণা অর্জন করে, তা কতটা নিজের এবং কতটা তার চারপাশের সমাজের তৈরি?

গল্পের ভয়, নিঃসঙ্গতা ও মানসিক সংকটকে এই দৃষ্টিতে পাঠ করলে ‘ডাইনী’ আর কেবল কুসংস্কারাচ্ছন্ন গ্রামীণ সমাজের গল্প থাকে না; প্রবলভাবে উচ্চারিত ‘ডাইনী’ শব্দটা দশ-এগারো বছরের মেয়েটির মর্মমূলে শক্তিশালী নেতিবাচক ছাপ বসিয়ে দেয়; তার সমগ্র জীবনকে বদলে দেয়। শৈশব থেকে এভাবে এক নারীর ক্রমশ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া এবং নিজের মানবিক পরিচয় হারিয়ে ফেলার ক্লাসিকেল গল্পে উত্তীর্ণ হয়ে যায় এই আখ্যানটি। অন্যদিকে, গল্পে প্রকৃতি ও পরিবেশও কেবল পটভূমি হিসেবে চিহ্নিত হয়নি। অন্ধকার, নির্জনতা, ভয়, জনশূন্যতা— এসব বাইরের উপাদান চরিত্রের মানসিক অবস্থার সঙ্গে মিশে যায়। ফলে বহির্জগৎ ও অন্তর্জগতের মধ্যে সমান্তরাল সম্পর্ক তৈরি হয়ে যায়। আধুনিকতাবাদী পাঠে এই সম্পর্ক গল্পের মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা বাড়ায়।

উত্তর-আধুনিক পাঠ: উত্তর-আধুনিক পাঠে প্রশ্নটা আরও ভিন্নভাবে করা যায়। ‘ডাইনী’ আসলে কে? সে কি জন্মগতভাবে ডাইনী? নাকি সমাজ তাকে ডাইনী বানিয়েছে?

এখানে ‘ডাইনী’ কোনো স্বাভাবিক বা চূড়ান্ত পরিচয় নয়; সামাজিকভাবে নির্মিত নির্মম এক পরিচয়। সমাজ কোনো মানুষকে ‘স্বাভাবিক’ এবং অন্য একজনকে ‘অস্বাভাবিক’, ‘ভয়ঙ্কর’ কিংবা ‘অশুভ’ হিসেবে চিহ্নিত করে। অর্থাৎ ‘ডাইনী’ পরিচয় ব্যক্তির শরীর বা অস্তিত্বের কোনো নির্দিষ্ট সত্য নয়; সামাজিক ভাষ্য ও ক্ষমতার সম্পর্কের মধ্য দিয়ে তৈরি হয়।

এখানে প্রাসঙ্গিকভাবে ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকোর পাওয়ার/ডিসকোর্স ধারণার প্রয়োগ করা যায়— ক্ষমতা শুধু নিষেধ করে না; বরং মানুষকে শ্রেণিবদ্ধ করে, নাম দেয়, পরিচয় নির্ধারণ করে এবং কোনটা সত্য বলে গ্রহণযোগ্য হবে তা নির্ধারণ করে। ‘ডাইনী’ নামটাও তেমন ক্ষমতাশীল সামাজিক উচ্চারণ।

সমাজ নিজেকে ‘স্বাভাবিক’ বা ‘শুদ্ধ’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে যে মানুষকে ভিন্ন, অশুভ বা বিপজ্জনক হিসেবে চিহ্নিত করে, সেই মানুষটি হয়ে ওঠে ‘অন্য’। ফলে ‘ডাইনী’ কেবল একক চরিত্র নয়; সে সামাজিক ‘অন্য’-এর প্রতীকও।

আরও এক গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দ্বৈত বিরোধ— স্বাভাবিক/অস্বাভাবিক, মানুষ/অমানুষ, পবিত্র/অপবিত্র, আমাদের/অন্য। উত্তর-আধুনিক পাঠ এই দ্বৈততাগুলোর স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলে।  যে নারীকে সমাজ ‘অমানবিক’ বা ‘অশুভ’ বলে চিহ্নিত করে, গল্পের মানবিক পরিণতি শেষ পর্যন্ত সেই সামাজিক শ্রেণিবিভাগকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। ফলে গল্পটির উত্তর-আধুনিক প্রশ্ন হতে পারে, ‘ডাইনী’ কি তার প্রকৃত পরিচয়, নাকি সমাজের দেওয়া একটি নাম? এই প্রশ্নের কোনো একক উত্তর নেই। বরং এ গল্প দেখায়, নাম কখনো কখনো মানুষের ওপর এমনভাবে আরোপিত হতে পারে যে শেষ পর্যন্ত মানুষ সেই নামের মধ্য দিয়েই নিজেকে দেখতে শুরু করে। এখানেই পরিচয়কে এক ধরনের নির্মাণপ্রক্রিয়া হিসেবে পাঠ করার সুযোগ তৈরি হয়।


‘পানকৌড়ির রক্ত’ 

‘পানকৌড়ির রক্ত’ আল মাহমুদের প্রথম গল্পগ্রন্থের নামগল্প এবং ১৯৭৫ সালে ‘বর্ণমিছিল প্রকাশনী’ থেকে গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়। গল্পটির কেন্দ্রে রয়েছে প্রকৃতি, শিকার, পাখি, রক্ত, নারী-শরীর, আকাঙ্ক্ষা এবং মানুষের অন্তর্লোকের পারস্পরিক সম্পর্ক। সমালোচনামূলক আলোচনায় গল্পটির শুরুতে পানকৌড়ির সৌন্দর্যের সঙ্গে কথকের স্ত্রীর সৌন্দর্যের তুলনা এবং প্রকৃতি ও নারীর শরীরকে পরস্পরের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার দিকটি বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো, আল মাহমুদ নিজেই এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, পানকৌড়ির হত্যার মাধ্যমে তিনি রঙের বিবর্তন এবং মানুষের ওপর তার প্রভাব দেখাতে চেয়েছিলেন। তিনি গল্পটিকে একজন চিত্রকরের কাজের সঙ্গেও তুলনা করেছেন।

আধুনিকতাবাদী পাঠ: ‘পানকৌড়ির রক্ত’-র আধুনিকতাবাদী পাঠে প্রথমেই চোখে পড়ে দৃশ্যমান বাইরের ঘটনা ও অন্তর্গত অভিজ্ঞতার পার্থক্য। ঘটনাটি খুব সরল।

একজন শিকারি পানকৌড়িকে লক্ষ করে গুলি চালায়। কিন্তু গল্পের অর্থ কেবল পাখি শিকার করার ঘটনায় সীমাবদ্ধ থাকে না। পানকৌড়ির শরীর, তার কালো রং, জলের সঙ্গে তার সম্পর্ক, রক্তের দৃশ্য এবং স্ত্রীর শরীরের স্মৃতিসহ সবকিছু মিলিয়ে কথকের অন্তর্জগতে জটিল অনুভূতির জন্ম হয়। অর্থাৎ ঘটনা এখানে মনস্তাত্ত্বিক অভিজ্ঞতায় রূপান্তরিত হয়।

‘আমি আবার আমার একনলা বন্দুক হাতে ত্রিকোণাকৃতি চরভূমির নরম গুল্মলতায় পা মাড়িয়ে চলতে লাগলাম। নদীটা যেখানে বাঁক নিয়েছে আমি সেখানে এসে পেশাদার শিকারির মতো হাঁটু গেড়ে বন্দুক বাগিয়ে বসলাম। আমার বসার সাথে সাথে কালো বেলুনের মতো একটা পানকৌড়ি পানির ওপর ভেসে উঠল। আমি মুহূর্তমাত্র বিলম্ব না করে গুলি ছুড়লাম। গুলির শব্দ আর বন্দুকের পাল্টা ধকলে আমার চোখের সামনে সমগ্র নিসর্গচিত্রটি ফেটে চৌচির হয়ে গেল। আমি দেখলাম, একটি শ্যামবর্ণ নারীশরীর নদীর নীলিমায় আপন রক্তের মধ্যে তোলপাড় করছে। মনে হলো, আলোকিত এই মুখ, বাহু, বুক ও যুগল-ঊরু আমার চেনা। আমি আদিনার নাম ধরে নদীর দিকে ডাক দিতে গেলে দেখলাম সেই অঙ্গশোভা ঢেউয়ের ছলছলানি তুলে ডুবে যাচ্ছে। আমি বন্দুকের গরম নলে গাল চেপে অসহায়ের মতো বসে রইলাম। বারুদের গন্ধে আমার চারপাশটা ভরে যেতে লাগল।’

আধুনিকতাবাদী পাঠে তাই প্রশ্ন হতে পারে, এখানে কি কেবল একটা পাখিকে হত্যা করা হয়েছে, নাকি কথকের নিজের আকাঙ্ক্ষা, স্মৃতি ও অপরাধবোধের সঙ্গে তার অন্তর্গত সম্পর্ক তৈরি হয়ে গেছে? এখানে বিচ্ছিন্নতা কিংবা অন্তর্দ্বন্দ্বও গুরুত্বপূর্ণ। প্রকৃতিকে উপভোগ করা মানুষই আবার প্রকৃতির নিরীহ প্রাণিকে হত্যা করে। সৌন্দর্যের প্রতি আকর্ষণ এবং ধ্বংসের প্রবৃত্তি একই মানুষের মধ্যে সহাবস্থান করে। ফলে মানুষ ও প্রকৃতির সম্পর্ক সরল বা একমাত্রিক থাকে না। গল্পের রক্তও কেবল হত্যার ফল নয়; সৌন্দর্য, কামনা, জীবন, মৃত্যু ও অপরাধবোধের মধ্যে সংযোগ তৈরি করে। আল মাহমুদের নিজের বক্তব্যে রং এবং রক্তের যে সম্পর্কের কথা এসেছে, তা গল্পের এই শিল্পরূপ বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

উত্তর-আধুনিক পাঠ: এই পাঠে ‘পানকৌড়ির রক্ত’ আরও বহুমাত্রিক হয়ে ওঠে। এখানে মানুষ/প্রকৃতি, শিকারি/শিকার, সৌন্দর্য/হিংসা, কামনা/অপরাধ, জীবন/মৃত্যু— এসব দ্বৈত সম্পর্ককে স্থির ও চূড়ান্ত বলে গ্রহণ করা যায় না। শিকারি মানুষ; পানকৌড়ি শিকার।  কিন্তু গল্পের অর্থ কেবল এই ক্ষমতার সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। পানকৌড়ির শরীর কথকের কাছে নারীর শরীরের স্মৃতি জাগায়; পাখির রক্ত মানুষের কামনা, সৌন্দর্য ও মৃত্যুচেতনার সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। ফলে এই প্রাণি হত্যার ঘটনা একাধিক অর্থের কেন্দ্র হয়ে ওঠে। ‘রক্ত’ একদিকে মৃত্যু ও হিংসার চিহ্ন, অন্যদিকে জীবন, যৌনতা, আকাঙ্ক্ষা এবং সৌন্দর্যেরও চিহ্ন। একই চিহ্ন একাধিক অর্থ তৈরি করে। এখানে গল্পের বহুমাত্রিক অর্থ গুরুত্বপূর্ণ। 

‘পানকৌড়ি’ কেবল পাখি নয়; হয়ে উঠতে পারে প্রকৃতি, সৌন্দর্য, নারী-শরীর, আকাঙ্ক্ষা কিংবা ধ্বংসের প্রতীক। আবার ‘রক্ত’ও কেবল শারীরিক রক্ত নয়; জীবন ও মৃত্যুর সীমারেখাকে অস্পষ্ট করে। এই বহুমাত্রিকতা গল্পটিকে উত্তর-আধুনিক পাঠের জন্য উন্মুক্ত করে।

তবে সতর্ক থাকা জরুরি: ‘পানকৌড়ির রক্ত’কে সরাসরি উত্তর-আধুনিক গল্প বলা ঠিক হবে না। গল্পটির রচনাকাল ও সাহিত্যিক অবস্থান ভিন্ন। বরং উত্তর-আধুনিক তত্ত্বের আলোকে পাঠ করলে গল্পের মধ্যে এমন কিছু অর্থের সম্ভাবনা দেখা যায়, যা তার প্রথম প্রকাশকালীন পাঠের বাইরে গিয়ে নতুন ব্যাখ্যার সুযোগ তৈরি করে।

একই গল্পে দুই তত্ত্ব: পার্থক্য কোথায়?: ‘ডাইনী’ গল্পে ব্যক্তির নিঃসঙ্গতা, মানসিক সংকট, আত্মপরিচয়ের বিপর্যয় প্রাধান্য পেয়েছে। ‘ডাইনী’ পরিচয় সামাজিক নির্মাণে ঙঃযবৎরহম ক্ষমতা ও ফরংপড়ঁৎংব মতাদর্শ ফুটে উঠেছে।

‘পানকৌড়ির রক্ত’ গল্পে অন্তর্দ্বন্দ্ব, আকাঙ্ক্ষা, স্মৃতি, অপরাধবোধ, মানুষ-প্রকৃতির দ্বন্দ্ব, চিহ্নের বহুমাত্রিকতা, দ্বৈত বিরোধের ভাঙন, প্রকৃতি-মানুষ ও সৌন্দর্য-হিংসার অনির্দিষ্ট সম্পর্ক দুটির ‘অর্থ’ এক জায়গায় স্থির থাকে না। ‘ডাইনী’-তে প্রশ্ন ওঠে, পরিচয় কে তৈরি করে? ‘পানকৌড়ির রক্ত’-এ প্রশ্ন ওঠে, ঘটনা বা চিহ্নের অর্থ কে নির্ধারণ করে? প্রথম গল্পে ‘পরিচয়’ এবং দ্বিতীয় গল্পে ‘অর্থ’ হয়ে ওঠে নির্মাণের বিষয়। এভাবেই দুটি গল্প পাশাপাশি রেখে বলা যায়, সাহিত্য পাঠের ক্ষেত্রে কোনো একক তত্ত্বই শেষ কথা নয়। একই গল্পের মধ্যে একাধিক অর্থের সম্ভাবনা থাকে এবং পাঠের দৃষ্টিকোণ পরিবর্তিত হলে সেই সম্ভাবনাও পরিবর্তিত হয়।

এই দুই গল্পের পাঠ থেকে আমাদের মূল সিদ্ধান্ত আবারও স্পষ্ট হয়: গল্পের অর্থ শুধু গল্পের ঘটনায় নিহিত নয়; পাঠের পদ্ধতিও অর্থ নির্মাণে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। তারাশঙ্করের ‘ডাইনী’কে আধুনিকতাবাদী পাঠে একজন নিঃসঙ্গ ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত মানুষের ট্র্যাজেডি হিসেবে দেখা যায়; উত্তর-আধুনিক পাঠে একই গল্প সামাজিক পরিচয়, ক্ষমতা ও ‘অন্য’ নির্মাণের গল্পে পরিণত হয়। আবার ‘পানকৌড়ির রক্ত’ আধুনিকতাবাদী পাঠে মানুষের অন্তর্লোক, আকাঙ্ক্ষা ও অপরাধবোধের জটিলতা প্রকাশ করে; উত্তর-আধুনিক পাঠে তা চিহ্ন, প্রকৃতি, শরীর, রক্ত, সৌন্দর্য ও হিংসার বহুমাত্রিক সম্পর্কের একটি উন্মুক্ত পাঠক্ষেত্র হয়ে ওঠে।

অতএব, গল্পের অর্থ এক দরজা দিয়ে প্রবেশ করা কোনো ঘর নয়; বরং ভিন্ন ভিন্ন পাঠের জন্য তার একাধিক দরজা খোলা থাকে।


গ্রন্থঋণ :

১. তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, শ্রেষ্ঠ গল্প; ঢাকা, প্রকাশক, প্রতীক প্রকাশনা সংস্থা।

২. আল মাহমুদ, পানকৌড়ির রক্ত; ঢাকা, প্রকাশক, আদর্শ।

সূত্র

3. Barry, Peter. Beginning Theory: An Introduction to Literary and Cultural Theory. Manchester: Manchester University Press.

4. Eagleton, Terry. Literary Theory: An Introduction. Minneapolis: University of Minnesota Press.

5. Abrams, M. H., and Geoffrey Galt Harpham. A Glossary of Literary Terms. Boston: Wadsworth/Cengage.

6. Lodge, David, ed. Modern Criticism and Theory: A Reader. London: Longman.

7. Foucault, Michel. Power/Knowledge: Selected Interviews and Other Writings, 1972–1977. Edited by Colin Gordon. New York: Pantheon.

8. Lyotard, Jean-François. The Postmodern Condition: A Report on Knowledge. Minneapolis: University of Minnesota Press.

9. Hutcheon, Linda. A Poetics of Postmodernism: History, Theory, Fiction. New York: Routledge.

*** 


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত