সংবাদ

ধারাবাহিক উপন্যাস ১৬

গোমতীকন্যা


মহিবুল আলম
মহিবুল আলম
প্রকাশ: ১ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৪৬ এএম

গোমতীকন্যা
শিল্পী: সঞ্জয় দে রিপন

দ্বিতীয় পর্ব: মমিনার জীবন 

(পূর্ব প্রকাশের পর) 

ছয়.

মীরবহরি বাজারের পূর্বদিকে একেবারে শুরুতে মুখোমুখি কয়েকটি দোকান। এই দোকানগুলো বছর দশেক আগেও ছিল না। ইট-সিমেন্টের দেয়াল আর টিনের চাল দিয়ে সুরুজ আলী চেয়ারম্যান দুই সারিতে দোকানগুলো করেছিলেন। সুরুজ আলী চেয়ারম্যান মারা গেছেন বছর পাঁচেক হলো। এখন তার ছেলে আরমান আলী তাদের ইউনিয়নের চেয়ারম্যান। গত ইউনিয়ন বোর্ডের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী থেকে বড় ব্যবধানে ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছে। বয়সে একেবারে তরুণ, কিন্তু ইউনিয়নের জন্য বেশ ভালোই কাজ করছে। অনুতপুর থেকে মোল্লাকান্দি, মীরবহরি ও আঁধারিয়া গ্রামের দক্ষিণ দিয়ে কদমতলি হয়ে গোমতীর উজানের দিকে যে রাস্তাটা হচ্ছে, সেটার পেছনে তার কঠোর পরিশ্রম আছে। সে স্থানীয় সাংসাদের হাতেপায়ে ধরে কাজটা বের করে এনেছে।

সুরুজ আলী চেয়ারম্যানের দোকানগুলো মূলত ডাক্তারখানা, ফার্মেসি আর টিন-রড-সিমেন্টের দোকান। এর পাশেই একটা রেস্তোঁরা। আবুল মিয়া দোকানের দুই ইউনিট ভাড়া নিয়ে নতুন এই রেস্তোরাঁ খুলেছে। কী সব সৌদিআরবের খাবার নিয়ে খেপসা রেস্তোরাঁ। মুরগির রানথান দিয়ে ভাতের ওপর একজাতীয় রান্না করে সাজিয়ে দেওয়া হয়।

আবুল মিয়া প্রায় বারো বছর সৌদির রিয়াদে ছিল। সেখান থেকেই সে খাবারটা শিখে এসেছে। বছর দুই আগে স্থায়ীভাবে দেশে এসে রেস্তোরাঁটা খোলে। রেস্তোরাঁটা খোলার পর থেকেই এটার খাবারের প্রতি আশেপাশের পাঁচ-সাত গ্রামের মানুষের বেশ আকর্ষণ সৃষ্টি হয়। রেস্তোরাঁয় ভিড় লেগে থাকতে শুরু করে। আনিসও একদিন কৌতূহলবশত আবুল মিয়ার খেপসা রেস্তোরাঁয় ঢোকে। কিন্তু সৌদি খেপসা খাবার তার মোটেও ভালো লাগেনি। অযথা বেশি মসলা দিয়ে মাখা মুরগি রান্না আর পোলাওর মতো করে রান্না করা ভাত। চালের সঙ্গে কিছু বাদাম আর কিচমিচ। ভাতের ওপর রান্না করা মুরগি সাজিয়ে দেওয়া হয়। দেখতে সুন্দরই লাগে। মানুষজন তা খপখপ করে খায়, আর আয়াসি ঢেঁকুর তোলে।

মীরবহরি বাজারে এলে আনিস একবার হলেও যোগেশ পোদ্দারের মিষ্টান্নভাণ্ডারে যায়। সেখানে যে সে খুব বেশি কিছু খায়, তা নয়। কখনও দুটো জিলাপি, কখনও দুটো গজা, কখনও একটা রুটি ও একটা বড় রসগোল্লা, কখনও বা শুধু সবজি আর রুটি। সেটা তার ছোটবেলা থেকেই অভ্যাস। বড় হয়ে মাঝেমধ্যে সে ঠোঙায় করে তার মা’র জন্য জিলাপি নিয়ে যেত। রাহেলা খানম খুব খেতে পারত না। তারপর বাঁকা মুখে জিলাপি চুকচুক করে খেতো, আর একটু একটু হাসত। মা’র সেই হাসিটা আনিসের খুবই পছন্দের ছিল।

আনিস ছোটবেলা থেকে মীরবহরি বাজারটা দেখেছে একটু অন্যভাবে। একটা পুরোনো বটগাছ দিয়ে পুবদিক থেকে বাজারটার শুরু ছিল। তারপর বাজারটা দুইভাগে ভাগ হয়ে পশ্চিমে এগিয়ে গিয়েছিল। পশ্চিমের শেষ মাথায় মীরবহরি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও খেলার মাঠ। প্রাথমিক বিদ্যালয়টার ঠিক একটু আগে গোমতী নদী ঘেঁষে বড় মসজিদ।

মীরবহরি বাজারটা দুইভাগে ভাগ হলেও দোকানের সারি এখন তিনটা। মধ্য সারির দোকানগুলোর প্রত্যেকটারই উত্তর-দক্ষিণ দুই দিক দিয়ে দরজা। মধ্য সারির দোকানগুলোর মধ্যে পরপর দুটো মুদি-বাজে মালের দোকান, একটি সিলভারের হাঁড়িপাতিল ও প্লাস্টিকের বাসন-পেয়ালার দোকান, একটি থানকাপড়ের দোকান ও একটি বেশ বড় শাড়ি-লুঙি-গামছার দোকান। মধ্য সারির দোকানগুলোর মাথায় একেবারে পশ্চিমে রহমান মিয়ার চা-বিস্কুটের দোকান। এরপর সামান্যবিস্তর খোলা জায়গার পর বড় মসজিদ ও মীরবহরি প্রাথমিক বিদ্যালয়।

মীরবহরি বাজারের দক্ষিণ সারিতে মূলত ডাক্তারখানা, বইখাতার দোকান, তৈরি সেলোয়ার-কামিজের দোকান, শার্ট-প্যান্টের দোকান, জুতার দোকান, দুটো দর্জির দোকান, ইলেক্ট্রনিকস ও ইলেকট্রিক দোকান, একটি স্বর্ণের দোকান, ব্যাংক ও সমবায় অফিস।

উত্তর সারিতেই মূলত মীরবহরির মূল বাজার। উত্তর সারিটা একটু বাঁক নেওয়া ও তুলনামূলক দীর্ঘ।  গোমতী নদী ঘেঁষা উত্তর সারির একেবারে শুরুতে যোগেশ পোদ্দারের মিষ্টান্নভাণ্ডার। তারপর কুতুব আলীর খাবারের দোকান। যদিও মুদি-বাজেমালের দোকানগুলোতে অন্য সামগ্রীর সঙ্গে চাল-আটা বিক্রি করা হয়, এরপরও উত্তর সারিতে একটি আলাদা চালের আড়ত আছে। এই চালের আড়তটা বহুবছর আগে মনসুর পাগলার বাবা আসমত আলী বেপারির ছিল। আগে যেমন দোকানটার বেশ নামধাম ছিল, সেটার এখন খুব দৈন্যদশা। এখন এই দোকানটা ছল্লাকান্দির মজনু মিয়া চালায়। অবশ্য এতগুলো বছরে দোকানটার হাত বদল হয়েছে কয়েকবার। চালের আড়তের পাশেই ভটভট শব্দ তোলা ধান-গম ভাঙার মিল আছে দুটো। মিল দুটো দুই মালিকের। এরপর একটি ভুসির দোকান। ভুসির দোকানের পর একটি চুল কাটার সেলুন, তারপরই একটি সার-কীটনাশকের দোকান। এই সার-কীটনাশকের দোকানটা একসময় আনিসের বাবা সুন্দর ভুঁইয়ার ছিল। সুন্দর ভুঁইয়া মারা যাবার পর রায়পুরের সুবোল মিয়া আনিসের কাছ থেকে দোকানটা কিনে নেয়। এই উত্তর সারিতেই খোলাবাজারে কাঁচাবাজার ও মাছ-মাংসের দোকান বসে। যদিও হাটের দিন কাঁচাবাজার বিস্তৃত হয়ে বটগাছটা পর্যন্ত চলে আসে। ছুরিকাঁচি-দা বানানোর বিধু কর্মকারের দোকানটা উত্তর সারির একেবারে শেষ মাথায়, স্কুলের দেয়ালের গা ঘেঁষে।

সুরুজ আলী চেয়ারম্যানের দোকানগুলো হওয়াতে মীরবহরি বাজারটার এখন যেমন পুবদিকে আরও বিস্তার ঘটেছে ও বটগাছটা খানিকটা ভেতরে চলে গেছে, কিন্তু পশ্চিমে বাজারটার তেমন বিস্তার ঘটেনি। এর পেছনে প্রধান কারণ, বড় মসজিদ ও মীরবহরি প্রাথমিক বিদ্যালয়। অবশ্য আনিস বিশ্বাস করে, উপজেলা সড়ক থেকে নেমে এসে অনুতপুর দিয়ে যে নতুন রাস্তাটা উজানের গোমতী বেড়িবাঁধে গিয়ে মিলছে, সেটা শেষ হয়ে গেলে মীরবহরি বাজারের অনেক পসার হবে। তখন পূর্ব-পশ্চিম ও উত্তরদিকে অনেক দোকানপাট বেড়ে যাবে। মীরবহরি বাজার এমনিতেই অনেক পুরোনো বাজার। প্রায় দেড়শো বছর তো হবেই এই বাজারটার।

আনিস মোটর সাইকেল নিয়ে মীরবহরি বাজারে ঢুকে বটগাছটার ছায়ায় একটু থামল। মোটর সাইকেলের ইঞ্জিন বন্ধ করল না। সে বটগাছের গোড়ায় বা এর আশেপাশে এখন হাট জমে ওঠার কোনো লক্ষণ দেখছে না। বিক্রেতারা দোকানের পসরা সাজাচ্ছে। ক্রেতার উপস্থিতি একেবারেই কম। এখন সবে দুপুর হয়ে এসেছে। হাট জমে ওঠে দুপুর পড়ে এলে, ঠিক বিকেলের দিকে।

সুদিনে বুইদ্দার বিলের ভেতর দিয়ে দীর্ঘ হাঁটার পথ, জোয়ারের মওসুমে প্রখর রোদের ভেতর দিয়ে নৌকা চালিয়ে এসে মীরবহরি বাজারের ডাঙায় উঠে আশেপাশের চার-পাঁচ গ্রামের মানুষজন বটগাছটার নিচে দাঁড়িয়ে যেন প্রশান্তির দৃষ্টি মেলে। প্রতিটি মানুষ একটু হলেও বটগাছটার তলে স্বস্তির শ্বাস ফেলে যায়। আনিসও মীরবিহরি বাজারে এলেই একদণ্ডের জন্য হলেও বটগাছটার নিচে দাঁড়ায়। শুধু প্রশান্তি বা স্বস্তির জন্যই নয়, এর নিচে দাঁড়িয়ে সে আস্ত একটা ইতিহাস খুঁজে পায়। কতসব পুরোনো ইতিহাস! বৃটিশ আমলে গোমতী নদী ধরে বজরার মতো নৌকায় করে বেশ কয়েকজন লাল পোশাকের সৈন্য নিয়ে লালমুখো এক ইংরেজ কালেক্টরের এসেছিলেন উজানের গ্রাম নেয়ামতকান্দিতে। নেয়ামতকান্দির এক সময়ের জমিদার ছিলেন নজীব উল্লাহ খান। তাঁর কাছে তিন বছরের খাজনা বাকি ছিল। তিনি ইংরেজদের খাজনা দিবেন না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

সেই লালমুখো ইংরেজ কালেক্টর নেয়ামতকান্দিতে এসে নজীব উল্লাহ খানকে পাননি। নজীব উল্লাহ খান ইংরেজ সৈন্য আসার খবর পেয়েই পালিয়ে যান। এদিকে লালমুখো ইংরেজ সাহেব তাঁকে না পেয়ে জমিদারের নায়েব খুররম আলী ও জমিদারের তিনজন পেয়াদাকে ধরে নিয়ে এসেছিলেন এই মীরবহরি বাজারে। এই বটগাছের ডালে ঝুলিয়ে ওদেরকে গুলি করে মারেন। লাশ তিনদিন বটগাছে ঝুলেছিল, কিন্তু কেউ সাহস পায়নি নামাতে।

উনিশশো সাতচল্লিশের ইতিহাসটাও করুণ। কয়েকদিন পরপর গ্রামের মানুষ দেখত, হিন্দু জোতদার বা আড়তদারের লাশ এই বটগাছটায় ঝুলছে। এদের বেশিরভাগই ছিল হিন্দু অধ্যুষিত প্রসিদ্ধ রায়পুর গ্রামের। আশেপাশের গ্রামের একদল মুসলমান প্রভাবশালী নতুন পাকিস্তান জোশে ওই হিন্দু জোতদার ও আড়তদারদের মেরে বটগাছে টানিয়ে রাখত। কয়েকদিন পরই ওদের জমিজিরাত ও ব্যবসা সেই মুসলমান প্রভাবশালীদের কারও দখলে চলে যেত। এভাবে মীরবহরি, আঁধারিয়া, মোল্লাকান্দি, ছল্লাকান্দি ও কদমতলির বেশ কয়েকজন ফুলেফেঁপে ওঠে। ওরা নতুন উপাধি নেয়। কেউ হয়ে যায় সৈয়দ, কেউ মীর, কেউবা জোয়ারদার। আনিসদের বাড়িটাও ভুঁইয়াবাড়ি নামধারণ করে সেই সময়ে।

উনিশশো একাত্তর সালটা তো ছিল আরও ভয়াবহ। বর্ষা মওসুমের মাঝামাঝি গোমতী নদী ধরে একটা ইঞ্জিন চালিত নৌকায় এক পাকিস্তানি ক্যাপ্টেন কুড়িজন সৈন্য নিয়ে এই মীরবহরি বাজারে আসে। ক্যাম্প ফেলে মীরবহরি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। সাতদিন ছিল। তখন গ্রামের মানুষ প্রতিদিনই দেখত, বিভিন্ন স্থান থেকে ওরা মানুষজন ধরে এনে বটগাছের নিচে বেঁধে রাখছে। বিকেলের দিকে ওদেরকে গুলি করে মেরে গোমতী নদীতে ভাসিয়ে দিচ্ছে। ওদের মধ্যে শুধু হিন্দু সম্প্রদায়ের লোক ছিল, তা নয়। অনেক মুসলমান মুক্তিযোদ্ধাও ছিল...।

আনিস ইতিহাস ভাবনা থামিয়ে গলা বাড়িয়ে উত্তরের গলির শেষমাথা পর্যন্ত দেখল। কোথাও রমজান আলী বা কুদরত মিয়াকে দেখা যাচ্ছে না। সে বুঝতে পারল না, বশিরের কথা শুনে এভাবে হুট করে মীরবহরি বাজারে চলে আসাটা ঠিক হলো কি? পরক্ষণে সে মাথা নাড়ল। ভাবল, তার অনেকদিন ধরে যোগেশ পোদ্দারের মিষ্টান্নভাণ্ডারে যাওয়া হয়নি। আজ যেমন সুযোগ আছে ও সঙ্গে মনসুর পাগলা আছে, সে সেখানে গিয়ে খানিকক্ষণ বসতে পারে। বাড়িতে বশির খাবারের সরঞ্জাম করে রেখেছে। তারপরও তার মনে হলো, আজ দুপুরের খাবারটা যোগেশ পোদ্দারের মিষ্টান্নভাণ্ডারে সেরে গেলে ভালো হবে।

মনসুর পাগলা জিজ্ঞেস করল, ‘আনিস, হোন্ডা থামাইলা যে?’

আনিস পাল্টা জিজ্ঞেস করল, ‘কেন, কই যেতে চাস?’

‘কোনোখানে না। হোন্ডা দিয়া বাজারটা চক্কর দিতে চাইতাছি।’

‘বাজার চক্কর দিবি কেন?’

মনসুর পাগলা একটা লাজুক হাসি দিয়ে বলল, ‘বাজারের মানুষগোরে বুক চিতাইয়া দেখাইতাম যে আমি তোমার হোন্ডায় চলতাছি।’

আনিস হাসল। একটু শব্দ করে হাসি। বলল, ‘তুই না! আচ্ছা, ঠিক আছে, চল।’

মনসুর পাগলা হাসল— খিক খিক, খিক খিক।

আনিস একটু ধীরে ধীরে মোটর সাইকলটা চালাতে শুরু করল। সে দক্ষিণের গলি ধরে যাচ্ছে। দোকান থেকে তার চেনা কেউ হাত তুলছে। কেউ গলা চড়িয়ে জিজ্ঞেস করছে, ‘আনিস ভাই, ক্যামুন আছেন?’

আনিস কারও কথায় জবাব দিচ্ছে, কারও কথায় হাত উঁচিয়ে সৌজন্য দেখাচ্ছে। সে প্রথমে শিক্ষক হিসেবে, তার ওপর কবি, এখন সাংবাদিক, তাই দুই-চার-পাঁচ গ্রামে তার বেশ নাম আছে। এই মীরবহরি বাজারেও মোটামুটি সবাই তাকে চিনে। এছাড়া তার বাবা সুন্দর ভুঁইয়ার সার-কীটনাশকের দোকান ছিল এই বাজারেই। যদিও বাবার জন্য সে এই মীরবহরি বাজারে মুখ দেখাতে পারত না। এমনকি স্কুলেও সে একা একা চলত। শুধু মনসুরই তাকে সঙ্গ দিত। অন্য কোনো ছাত্র কিছু বললে তেড়ে যেত।

মনসুর পাগলা এখন আর মোটর সাইকেলে বসে হাত দুটো হাওয়ায় ভাসিয়ে বাতাসের ঢেউ খেলাচ্ছে না। সে বুক চিতিয়ে দোকানের সারির এদিকওদিক তাকাচ্ছে। এমনিতেই প্যান্ট-শার্ট পরে তার ভাবের শেষ নেই, তার ওপর সে এখন মোটর সাইকেলে আনিসের পেছনে বসে আছে। আনিস যখন হাত তুলে কাউকে সৌজন্য দেখাচ্ছে, সে-ও তখন হাত তুলছে। হাসছে অযথাই।

আনিস দক্ষিণের গলি ধরে একেবারে পশ্চিমে এসে মনসুর পাগলাকে জিজ্ঞেস করল, ‘পাগলা, স্কুলের ভেতরে ঢুকবি?’

মনসুর পাগলা খুশি হয়ে বলল, ‘হ হ, ঢোকো। স্কুলের মাঠটায় একখান চক্কর দেও।’

আনিস সমবায় সমিতির অফিস ও মসজিদের উঁচু মিনারের পাশ দিয়ে মীরবহরি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভেতর ঢুকল। মাঠ ফাঁকা। হয়তো দুপুর বলেই মাঠ এমন ফাঁকা। আজ শুক্রবার। স্কুলও বন্ধ। মাঠটা চক্কর দিতে দিতে আনিসের পুরোনো কিছু স্মৃতি মনে পড়ল। স্মৃতিটা মনসুর পাগলাকে নিয়েই।

ছোটবেলা থেকেই মনসুর পাগলা ছিল বেশ শক্তিশালী। দুই-তিনজনকে সে একাই কোনোকিছু ছাড়া ঘায়েল করে ফেলতে পারত। তার তখনও মাথায় ছিট ধরা পড়েনি। একবার কী কারণে যেন আনিসের সঙ্গে মোল্লাকান্দির কুদ্দুস নামে এক ছেলের ঝগড়া বাঁধে। ঝগড়াটা কুদ্দুসই শুরু করে। আনিসকে ধাক্কা দিয়ে বেঞ্চ থেকে ফেলে দেয়। এতে আনিসে কনুই কেটে যায়।

মনসুর পাগলা দূর থেকে সেটা দেখে। আর দেখেই সে এগিয়ে এসে গাল দিতে দিতে কুদ্দুসকে এমন মার দেয়, শেষপর্যন্ত তাকে উপজেলা সদর হাসপাতালে পর্যন্ত নিতে হয়। এ নিয়ে পরে বেশ কিছুদিন স্কুলে ও স্কুলের বাইরে দেনদরবার হয়। পরে যেভাবেই হোক ব্যাপারটা নিষ্পত্তি হয়।

এই স্কুলে আনিসের খুব মন খারাপ করার একটি স্মৃতি আছে। যদিও এই স্কুলে পড়াকালীন আরও অনেক কারণেই তার মন খারাপ হতো, কিন্তু মনসুর তাকে মন খারাপ করতে দিত না। তার মা রাহেলা খানম একদিন তার সঙ্গে দেখা করতে স্কুলে আসে। তখনও রাহেলা খানমের পক্ষাঘাতগ্রস্ত রোগ হয়নি। যদিও এর কিছুদিন পরই তার মা পক্ষাঘাতগ্রস্ত রোগী হয়ে বিছানা নেয়।

আনিসের স্পষ্ট মনে আছে, সেদিন সকালবেলা থেকেই খুব বৃষ্টি হচ্ছিল। শ্রাবণ মাস ছিল। বুইদ্দার বিলেও জল থইথই করছিল। তার মা নৌকায় করে স্কুলে আসে। তাকে নিয়ে মীরবহরি বাজারের দক্ষিণ দিক দিয়ে যোগেশের মিষ্টান্নভাণ্ডারে নিয়ে যায়। একটা পিরিজে দুটো বড় বড় মিষ্টি নিয়ে খাইয়ে দিতে দিতে বলে, ‘বাপ, আমি তোর নানার বাড়িত কয়দিনের লাইগা যাইতাছি। তুই একলা থাকতে পারবি তো?’

আনিস না বুঝেই সায় দেয়। মুখ কিছু বলে না।

রাহেলা খানম বলে, ‘আমি তোরে কয়দিন পরই লইয়া যাইমু। তুই যাইবি তো আমার লগে?’

আনিস আবারও সায় দেয়।

রাহেলা খানম মিষ্টি দুটো খাইয়ে দিয়ে আঁচলে গোঁজা টাকা খুলে যোগেশ পোদ্দারকে মিষ্টির টাকা দেয়। কিছু টাকা আনিসের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলে, ‘বাপ, তুই টাকাটা রাখ। স্কুলে আইসা পইত্যেক দিন দুইডা কইরা জিলাপি খাইস। উপাস থাকিস না।’

আনিস এবারও কিছু বলে না। টাকাটা পকেটে রাখতে রাখতে মাথা ঝাঁকায়।

রাহেলা খানম যোগেশের মিষ্টান্ন ভাণ্ডার থেকে বের হয়ে মীরবহরি ঘাটে নৌকায় ওঠে। গোমতী নদী ধরে আরও ভাটির দিকে চলে যায়।

আনিসের নানার বাড়ি ছিল গোমতী নদীর একেবারে ভাটিতে মেঘনার কাছাকাছি জমশেদপুর। সে অনেকবারই গিয়েছে। তার নানা ছিলেন খুব দরিদ্র, একটি মাদ্রাসার জুনিয়র শিক্ষক। মাদ্রাসাটা বেসরকারি ছিল। মাদ্রাসার তহবিল থেকে খুব সামান্যই বেতন পেতেন। কিছু জমিজমা ছিল। সেগুলো দিয়ে সাত ছেলেমেয়েকে নিয়ে সংসার চালাতে খুবই হিমশিম খেতেন। রাহেলা খানম ছিল তার বড় মেয়ে। তিনি বড় মেয়েকে মোকামের ব্যবসায়ীর সাথে বিয়ে দিয়ে ভেবেছিলেন বাকি ছেলেমেয়েদেরও কোনো একটা গতি হবে। কিন্তু মেয়ে বিয়ে দেওয়ার পরপরই বুঝতে পারেন, তার ধারণা ভুল। ব্যবসায়ীরা আসলেই হিসেবি হয়। কয়েক দিন পর আরও বুঝতে পারেন, মেয়ের জামাই শুধু হিসেবিই নয়, চরিত্রের দিক দিয়ে খুব খারাপ প্রকৃতির। শুধু নারীগঠিত ব্যাপারেই নয়, জামাই তার মেয়ের গায়ে হাত তোলে, মারধোর করে হাতপা ভেঙে দেয়।

আনিসের মনে আছে, তার মা তাকে নিয়ে যাবে দূরের কথা, সপ্তাহখানেক পর নিজেই চলে আসে। একে তো তার প্রতি টান, তার ওপর বাপের বাড়িতে উপোস থাকার চেয়ে স্বামীর বাড়িতে পিঠে খেয়ে পেটে খাওয়া শ্রেয় মনে করেছিল। কিন্তু বিপত্তি ঘটে এর কিছুদিন পরই। তার বাবার প্রচণ্ড মারে ঘাড়ে আঘাত পেয়ে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে সেই যে বিছানায় পড়ে, আর ওঠেনি। মাঝখানে কুমিল্লা সদর হাসপাতালে পর্যন্ত থাকতে হয়েছিল অনেকদিন...।

মীরবহরি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠে মোটর সাইকেলটা দিয়ে দুটো চক্কর দিয়ে বের হতে হতে আনিস কী ভেবে মনসুর পাগলাকে জিজ্ঞেস করল, ‘পাগলা, তোর মনির স্যারের কথা মনে আছে?’

মনসুর পাগলা একটু ভেবে বলল, ‘হ, মনে আছে। আমাগোরে খালি পিডাইতেন।’

আনিস হাসল। বলল, ‘তোকে পিটাতেন বেশি।’

মনসুর পাগলা ন্যায় ঠেলে বলল, ‘না, না, তোমারে পিডাইতেন বেশি। আসলে স্যার সবারেই পিডাইতেন। কোনো বাছবিচার করতেন না।’

‘হ্যাঁ, সেটাই। আমার মনে আছে, স্যার শুধু বুধবারে পিটাতেন।’

‘হ, ঠিক কইছ। আইচ্ছা, কও তো, স্যার বুইধবারে ক্যান পিটাইতেন?

‘সেটা তো জানি না। তবে একটা ব্যাপার মনে আছে, আমরা যখন ক্লাস ফোর-এ পড়ি, তখন স্যার জণ্ডিসে মারা যান। স্যার মারা যাওয়াতে আমরা কী খুশি হয়েছিলাম, তাই না?’

মনসুর পাগলা মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, ‘হ, হা, আমরা খুশি হইয়া নাচতে ছিলাম। হেইডা দেইখা হেড স্যার আইসা আমাগোরে পিটাইছিলেন। স্যারেরা আমাগোরে ক্যান যে খালি পিটাইতেন? তুমি যখন ইসকুলে পড়াইতা তখন কি ছাত্র পিটাইতা?’

আনিস বলল, ‘না, কখনও না। ছাত্রদের পিটিয়ে কখনও কোনোকিছু শেখানো যায় না।’

মনসুর পাগলা সায় দিয়ে বলল, ‘আমারও হেইডা মনে হয়। তুমি ঠিক কইছ।’

আনিস এবার মোটর সাইকেলটা নিয়ে বাজারের উত্তরদিক দিয়ে এল। আসতে আসতে সে কাঁচাবাজারেও রমজান আলী ও কুদরত মিয়াকে খুঁজল, কিন্তু কোথাও দেখল না। কাঁচাবাজারের ব্যবসায়ীরা কেউ কেউ এখনও পসরা সাজাচ্ছে, কেউ এরই মধ্যে পসরা সাজিয়ে বসেছে। ক্রেতাদের ভিড় অবশ্য মোটেও নেই। দুই-চারজন ক্রেতা এদিকওদিক এলোমেলো ঘুরছে।

আনিস কাঁচাবাজার পেরিয়ে একটা দোকানের সামনে একটু থামল। দোকানের ভেতরটা দেখল। দোকানটা বড় একটা টিনের ঘরের। মাঝখানে একটা ঝাঁপ আছে। দোকানের বেড়ায় সবুজ রঙ করা। দরজার গলে সুবোল মিয়াকে দেখা যাচ্ছে। ক্যাশবাক্সেটা সামনে নিয়ে একটা চৌকির ওপর বসে আছে। তার সামনে আরও দু’জন মানুষ হাত নেড়ে কী যেন বলছে।

মনসুর পাগলা বলল, ‘তোমাগো দোকানডা।’

আনিস মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, ‘হ্যাঁ।’

মনসুর পাগলা জিজ্ঞেস করল, ‘ভিতরে ঢুকবা না?’

আনিস বলল, ‘না।’ু বলেই সে মোটর সাইকেল টান দিল। সে তার বাবার সার ও কীটনাশকের ব্যবসাটা বিক্রি করলেও, দোকানের স্থানটা বিক্রি করেনি। এখন দোকানটা বিক্রি করলে বহুগুণ দাম পাবে।

আনিস মোটর সাইকেল টান দিয়ে সরাসরি যোগেশ পোদ্দারের মিষ্টান্নভাণ্ডারের সামনে এসে থামল।

যোগেশ পোদ্দার কুঁজো হয়ে বসে বড় একটা বড় কড়াইতে হাত ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে জিলাপি ভাজছে। গুড়ের জিলাপি। একটি বড় সিলভারের ট্রে-তে তরে তরে উঁচু করে সাজিয়ে রাখা। হাটবার বলে আজ বেশি করে জিলাপি ভাজা হচ্ছে। ধুতির গিট থেকে ভুড়িটা বের হয়ে আছে বলে যোগেশ পোদ্দারকে দেখতে বেশ লাগছে। যদিও তার গায়ে একটা শার্ট আছে, কিন্তু ভুড়িটা সেই শার্টে ঢাকছে না।

আনিসকে দেখেই যোগেশ পোদ্দার একটা দিঘল হাসি দিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘আরে, ভাইজান যে! ঢাকা থাইকা কবে আইছেন?’

যোগেশ পোদ্দার আনিসের চেয়ে বয়সে অনেক বড় হলেও তাকে ‘আপনি’ সম্বোধনে ডাকে। অবশ্য ছোটবেলায় তুমি সম্বোধনে ডাকত। সে স্কুলের চাকরিটা যখন নেয়, তখন থেকে সেটা ‘আপনি’ সম্বোধনে উঠে আসে।

আনিস মোটর সাইকেলটা একপাশে রেখে ইঞ্জিন বন্ধ করে নামতে নামতে বলল, ‘এই তো বেশিক্ষণ হয়নি। হাটে আসছি, তাই ভাবলাম, আপনার দোকানে জিলাপি খেয়ে যাই।’

যোগেশ পোদ্দার বলল, ‘ভালা করছেন। অখন গরম গরম ভাজতাছি। তয় এইবার মনে হয় অনেকদিন পর গেরামে আইলেন?’

আনিস বলল, ‘না, আট-নয়দিন আগে একবার আসছিলাম তো।’

‘ও, তাই। আমার দোকানে তো আসেন না।’

‘আসলে বাড়িতে এলেও আমার মীরবহরি বাজারে আসা হয় না।’

‘আইচ্ছা, আইচ্ছা, অখন ভিতরে গিয়া বসেন। আমি এক্কেবারে কড়াই থাইকা তোলা জিলাপি সিরায় দিতাছি। একটু সময় লাগবনে। আপনে খাইয়া ভালা পাইবেন।’

‘অসুবিধা নেই। পাগলার জন্যও দিবেন।’

‘হ হ, দুই পেলেট পাঠাইতাছি।’

মনসুর পাগলা বলল, ‘আমার পেলেটে জিলাপির লগে সিরা একটু বেশি দিবেন।’

যোগেশ পোদ্দার হেসে বলল, ‘এই পাগলা, জিলাপির লগে কেউ সিরা খায়? মিষ্টির লগে খায়।’

মনসুর পাগলা বুক টান করে বলল, ‘আমি খাই। আমার ভালা লাগে। তয় আমারে হুধা জিলাপি না, একটা বড় মিষ্টিও দিবেন।’

যোগেশ পোদ্দার বলল, ‘আইচ্ছা, যা। বস গিয়া। তোর লাইগা মিষ্টিও পাঠাইতাছি।’

মনসুর পাগলা অযথাই হেসে বলল, ‘হ, হ, বইতাছি। আমার মিষ্টিটা আগে পাঠাইয়া দেন। আমার বড় বুক লাগছে।’

যোগেশ পোদ্দার মাথা ঝাঁকিয়ে সায় দিল। মুখ কিছু বলল না।

ওরা মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ভেতরে গিয়ে একেবারে দক্ষিণের একটা টেবিল নিয়ে বসল। মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের পেছনটা ঝাঁপ ওঠানো খোলা। নদীটা তো স্পষ্ট দেখাই যায়, এমনকি নদীর কলকল ধ্বনিও কানে এসে বাজে। বেশ কয়েকটা হিজল গাছ, দুটো আমগাছ, আর বিস্তৃত কলা গাছের মোড়া। মীরবহরি ঘাটটা পাশেই, হিজল গাছগুলোর তলায়।

আনিস যোগেশ পোদ্দারের এই মিষ্টান্নভাণ্ডারে বসে অনেকবার অনেক কবিতার ভাবনা নিয়ে গেছে। তার প্রথম বইয়ের ‘রাধা সমাচার’ কবিতাটি এখানে বসেই লিখেছে। নদীর ঘাট, জলের কলকল শব্দ, হিজলতলা, কানাইর বাঁশির সুর!

মনসুর পাগলা মীরবহরি ঘাটের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আনিস, আমাগো মীরবহরি ঘাটে নৌকা মনে হয় কইমা গেছে। আগে কত নৌকা থাকত!’

আনিস বলল, ‘হুম, আসলে নতুন রাস্তাটা হয়েছে না? এজন্যই নৌকা কমে গেছে। এছাড়া নতুন রাস্তায় যখন রিকশা, ভ্যানগাড়ি আর সিএনজি চলা শুরু করবে, তখন নৌকা আরও কমে যাবে।’

মনসুর পাগলা সায় দিয়ে বলল, ‘আমারও তাই মনে হইতাছে। তয় একটা কথা কই, ওইদিন যখন জেল থাইকা ছাড়া পাইয়া উপজিলার নৌকাঘাটে আসি, দেখি কি নৌকা নাই। তখন উপজিলা থাইকা নতুন রাস্তা ধইরা বাড়িত আসতে হইছে। রাইতের বেলা আছিল। বিশ্বাস করো, আমি না বাড়ির পথটা হারাইয়া ফেলছিলাম। পরে তোমাগো বাড়ির নিশানা ধইরা বাড়ি চিনতে পারি।’

আনিস বলল, ‘তাই!’— বলেই সে আরও কিছু বলতে যাবে, ঠিক তখনই তার দৃষ্টিটা গিয়ে একটা দোকানের পেছনের অংশে পড়তেই সে চুপ হয়ে গেল। একটু অন্যমনস্কতাও তার মধ্যে ভিড় করল। মীরবহরি ঘাট বরাবর সেই দোকানটা। সেই দোকানটাই সার ও কীটনাশকের দোকান। একসময় তার বাবার দোকান ছিল। তার বাবা তো নেই। কয়েক বছর আগে মারা গেছে। একটু আগেই সে দোকানে সুবোল মিয়াকে ক্যাশবাক্সের সামনে বসে থাকতে দেখে এসেছে।

এটা শুধু আজ নয়, যখনই আনিস যোগেশ পোদ্দারের মিষ্টান্নভাণ্ডারে বসে তখনই তার দৃষ্টিটা চলে যায় তার বাবার দোকানটার পেছনের অংশটার দিকে। প্রতিবার একটা হাহাকার এসে তার ভেতর বাসা বাঁধে। আজও তার ভেতর সেই হাহাকারটা বাসা বাঁধল। সঙ্গে একটা দীর্ঘশ্বাস।

আনিস চোখে তার বাবার চেহারাটা ভেসে উঠল স্পষ্টভাবে। সঙ্গে তার মা’র চেহারাটাও। আজ দু’জনের কেউ বেঁচে নেই এটা সত্য। কিন্তু তাদের বেঁচে থাকার যে সমীকরণটা ছিল তা আজও তাকে পীড়া দেয়। চিরায়ত অসুখের মতো পীড়া।

আনিস তার বাবা সুন্দর ভুঁইয়াকে কোনোদিনই বুঝতে পারেনি। বাপ-বেটার স্বাভাবিক সম্পর্কটা ওদের মধ্যে কোনো কালেই ছিল না। কখনও গড়েও ওঠেনি। না তার ছোটবেলায়, না সে বড় হওয়ার পর। তাদের মধ্যে সম্পর্কের দূরত্ব ছিল এত বিস্তর যে দু’জন দু’জনকে মনে করত দুই জগতের মানুষ। অবশ্য এর প্রধানতম কারণ ছিল, তার মা। তার মাকে তার বাবা প্রচণ্ড মারত। শারীরিক ও মানসিক অত্যাচার করত। সেটা সে মোটেও মেনে নিতে পারত না। সে সবসময় তার মা’র পক্ষাঘাতগ্রস্ত হওয়ার পেছনে তার বাবাকে প্রচণ্ডভাবে দায়ী করত। আর সেটাই ছিল একদম সত্য।

সুন্দর ভুঁইয়ার আরেকটা দোষ ছিল, সে ছিল নির্লজ্জ চরিত্রহীন। তার শুধু কি মনসুর পাগলার মা কমলা খাতুনের সঙ্গেই সম্পর্ক ছিল?— মোটেও তা নয়। এর বাইরেও সে মাঝেমধ্যে নৌকায় করে মেয়ে এনে দোকানে রাত কাটাত। কেউ কেউ বলত, দোকানে নাকি সে মেয়ে এনে নাচাত। এটা সে বুড়ো বয়স পর্যন্ত করেছিল। গ্রামের মানুষ তার এসব কীর্তি জানত। এমনকি বাজারের সবাই। এটা রাহেল খানম একেবারেই সহ্য করতে পারত না। গরিব হোক, তারপরও সে একজন মাদ্রাসার শিক্ষকের মেয়ে ছিল। প্রতিবাদ করত, শারীরিকভাবে নির্যাতিত হতো। একবার নয়, বারবার। তারপরও প্রতিবাদ করত। এরপর তো পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে সেই যে বিছানা নেয়, এরপর থেকে প্রতিবাদের ভাষাই হারিয়ে ফেলে। এদিকে সুন্দর ভুঁইয়া যেন বউয়ের এই পক্ষাঘাতগ্রস্ত হওয়া নিয়ে মনে মনে খুশিই হয়। যদিও কোনোদিন দ্বিতীয় বিয়ে করেনি বা এধরনের কোনো আকাঙ্ক্ষা সে পোষণ করেনি। দীর্ঘদিন ধরে ঘরে স্ত্রী পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়ে থাকার পরও না। কিন্তু তার প্রচণ্ড নারীর নেশা ছিল।

মীরবহরি প্রাথমিক বিদ্যালয়টা বাজার লাগোয়া ছিল বলে আনিস পড়েছিল সবচেয়ে বড় সমস্যায়। তার বাবার এসব কীর্তি তার স্কুলের শিক্ষকরাই শুধু জানত না, ছাত্ররাও জানত। ছাত্ররা তার বাবাকে নিয়ে নানান ধরনের কটূক্তি ও টিটকারি মেরে কথা বলত। সে বরাবরই ছিল একটু ভাবুক ও নিশ্চুপ ধরনের। কারও সঙ্গে সহজে ঝগড়া লাগতে চাইত না। কিন্তু মনসুর তার হয়ে ঠিকই ছোটবেলা থেকে স্কুলের ছাত্রদের সঙ্গে ঝগড়া করত ও প্রতিবাদ জানাত। মাঝেমধ্যে মারামারিও লাগিয়ে দিত। সে অনুতপুর হাইস্কুলে পড়তে গিয়েও এর থেকে নিস্তার পায়নি। তাকে তো দিনের শেষে গ্রামে আসতে হতো। এখন যেমন মীরবহরি বাজারের সবাই তাকে সম্মান দেয়, সমীহ করে কথা বলে, আগে তেমনটা কখনই ছিল না। সবাই কেমন হেয় করে কথা বলত। কিন্তু তার বাবার এতে কোনো পরোয়া ছিল না। এজন্য সে পারতে তার বাবার দোকানে যেত না। তার বাবাও কখনও তাকে দোকানে সহজে ডেকে নিত না। ক্রমশ...

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর ২০২৬


গোমতীকন্যা

প্রকাশের তারিখ : ০১ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

দ্বিতীয় পর্ব: মমিনার জীবন 

(পূর্ব প্রকাশের পর) 

ছয়.

মীরবহরি বাজারের পূর্বদিকে একেবারে শুরুতে মুখোমুখি কয়েকটি দোকান। এই দোকানগুলো বছর দশেক আগেও ছিল না। ইট-সিমেন্টের দেয়াল আর টিনের চাল দিয়ে সুরুজ আলী চেয়ারম্যান দুই সারিতে দোকানগুলো করেছিলেন। সুরুজ আলী চেয়ারম্যান মারা গেছেন বছর পাঁচেক হলো। এখন তার ছেলে আরমান আলী তাদের ইউনিয়নের চেয়ারম্যান। গত ইউনিয়ন বোর্ডের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী থেকে বড় ব্যবধানে ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছে। বয়সে একেবারে তরুণ, কিন্তু ইউনিয়নের জন্য বেশ ভালোই কাজ করছে। অনুতপুর থেকে মোল্লাকান্দি, মীরবহরি ও আঁধারিয়া গ্রামের দক্ষিণ দিয়ে কদমতলি হয়ে গোমতীর উজানের দিকে যে রাস্তাটা হচ্ছে, সেটার পেছনে তার কঠোর পরিশ্রম আছে। সে স্থানীয় সাংসাদের হাতেপায়ে ধরে কাজটা বের করে এনেছে।

সুরুজ আলী চেয়ারম্যানের দোকানগুলো মূলত ডাক্তারখানা, ফার্মেসি আর টিন-রড-সিমেন্টের দোকান। এর পাশেই একটা রেস্তোঁরা। আবুল মিয়া দোকানের দুই ইউনিট ভাড়া নিয়ে নতুন এই রেস্তোরাঁ খুলেছে। কী সব সৌদিআরবের খাবার নিয়ে খেপসা রেস্তোরাঁ। মুরগির রানথান দিয়ে ভাতের ওপর একজাতীয় রান্না করে সাজিয়ে দেওয়া হয়।

আবুল মিয়া প্রায় বারো বছর সৌদির রিয়াদে ছিল। সেখান থেকেই সে খাবারটা শিখে এসেছে। বছর দুই আগে স্থায়ীভাবে দেশে এসে রেস্তোরাঁটা খোলে। রেস্তোরাঁটা খোলার পর থেকেই এটার খাবারের প্রতি আশেপাশের পাঁচ-সাত গ্রামের মানুষের বেশ আকর্ষণ সৃষ্টি হয়। রেস্তোরাঁয় ভিড় লেগে থাকতে শুরু করে। আনিসও একদিন কৌতূহলবশত আবুল মিয়ার খেপসা রেস্তোরাঁয় ঢোকে। কিন্তু সৌদি খেপসা খাবার তার মোটেও ভালো লাগেনি। অযথা বেশি মসলা দিয়ে মাখা মুরগি রান্না আর পোলাওর মতো করে রান্না করা ভাত। চালের সঙ্গে কিছু বাদাম আর কিচমিচ। ভাতের ওপর রান্না করা মুরগি সাজিয়ে দেওয়া হয়। দেখতে সুন্দরই লাগে। মানুষজন তা খপখপ করে খায়, আর আয়াসি ঢেঁকুর তোলে।

মীরবহরি বাজারে এলে আনিস একবার হলেও যোগেশ পোদ্দারের মিষ্টান্নভাণ্ডারে যায়। সেখানে যে সে খুব বেশি কিছু খায়, তা নয়। কখনও দুটো জিলাপি, কখনও দুটো গজা, কখনও একটা রুটি ও একটা বড় রসগোল্লা, কখনও বা শুধু সবজি আর রুটি। সেটা তার ছোটবেলা থেকেই অভ্যাস। বড় হয়ে মাঝেমধ্যে সে ঠোঙায় করে তার মা’র জন্য জিলাপি নিয়ে যেত। রাহেলা খানম খুব খেতে পারত না। তারপর বাঁকা মুখে জিলাপি চুকচুক করে খেতো, আর একটু একটু হাসত। মা’র সেই হাসিটা আনিসের খুবই পছন্দের ছিল।

আনিস ছোটবেলা থেকে মীরবহরি বাজারটা দেখেছে একটু অন্যভাবে। একটা পুরোনো বটগাছ দিয়ে পুবদিক থেকে বাজারটার শুরু ছিল। তারপর বাজারটা দুইভাগে ভাগ হয়ে পশ্চিমে এগিয়ে গিয়েছিল। পশ্চিমের শেষ মাথায় মীরবহরি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও খেলার মাঠ। প্রাথমিক বিদ্যালয়টার ঠিক একটু আগে গোমতী নদী ঘেঁষে বড় মসজিদ।

মীরবহরি বাজারটা দুইভাগে ভাগ হলেও দোকানের সারি এখন তিনটা। মধ্য সারির দোকানগুলোর প্রত্যেকটারই উত্তর-দক্ষিণ দুই দিক দিয়ে দরজা। মধ্য সারির দোকানগুলোর মধ্যে পরপর দুটো মুদি-বাজে মালের দোকান, একটি সিলভারের হাঁড়িপাতিল ও প্লাস্টিকের বাসন-পেয়ালার দোকান, একটি থানকাপড়ের দোকান ও একটি বেশ বড় শাড়ি-লুঙি-গামছার দোকান। মধ্য সারির দোকানগুলোর মাথায় একেবারে পশ্চিমে রহমান মিয়ার চা-বিস্কুটের দোকান। এরপর সামান্যবিস্তর খোলা জায়গার পর বড় মসজিদ ও মীরবহরি প্রাথমিক বিদ্যালয়।

মীরবহরি বাজারের দক্ষিণ সারিতে মূলত ডাক্তারখানা, বইখাতার দোকান, তৈরি সেলোয়ার-কামিজের দোকান, শার্ট-প্যান্টের দোকান, জুতার দোকান, দুটো দর্জির দোকান, ইলেক্ট্রনিকস ও ইলেকট্রিক দোকান, একটি স্বর্ণের দোকান, ব্যাংক ও সমবায় অফিস।

উত্তর সারিতেই মূলত মীরবহরির মূল বাজার। উত্তর সারিটা একটু বাঁক নেওয়া ও তুলনামূলক দীর্ঘ।  গোমতী নদী ঘেঁষা উত্তর সারির একেবারে শুরুতে যোগেশ পোদ্দারের মিষ্টান্নভাণ্ডার। তারপর কুতুব আলীর খাবারের দোকান। যদিও মুদি-বাজেমালের দোকানগুলোতে অন্য সামগ্রীর সঙ্গে চাল-আটা বিক্রি করা হয়, এরপরও উত্তর সারিতে একটি আলাদা চালের আড়ত আছে। এই চালের আড়তটা বহুবছর আগে মনসুর পাগলার বাবা আসমত আলী বেপারির ছিল। আগে যেমন দোকানটার বেশ নামধাম ছিল, সেটার এখন খুব দৈন্যদশা। এখন এই দোকানটা ছল্লাকান্দির মজনু মিয়া চালায়। অবশ্য এতগুলো বছরে দোকানটার হাত বদল হয়েছে কয়েকবার। চালের আড়তের পাশেই ভটভট শব্দ তোলা ধান-গম ভাঙার মিল আছে দুটো। মিল দুটো দুই মালিকের। এরপর একটি ভুসির দোকান। ভুসির দোকানের পর একটি চুল কাটার সেলুন, তারপরই একটি সার-কীটনাশকের দোকান। এই সার-কীটনাশকের দোকানটা একসময় আনিসের বাবা সুন্দর ভুঁইয়ার ছিল। সুন্দর ভুঁইয়া মারা যাবার পর রায়পুরের সুবোল মিয়া আনিসের কাছ থেকে দোকানটা কিনে নেয়। এই উত্তর সারিতেই খোলাবাজারে কাঁচাবাজার ও মাছ-মাংসের দোকান বসে। যদিও হাটের দিন কাঁচাবাজার বিস্তৃত হয়ে বটগাছটা পর্যন্ত চলে আসে। ছুরিকাঁচি-দা বানানোর বিধু কর্মকারের দোকানটা উত্তর সারির একেবারে শেষ মাথায়, স্কুলের দেয়ালের গা ঘেঁষে।

সুরুজ আলী চেয়ারম্যানের দোকানগুলো হওয়াতে মীরবহরি বাজারটার এখন যেমন পুবদিকে আরও বিস্তার ঘটেছে ও বটগাছটা খানিকটা ভেতরে চলে গেছে, কিন্তু পশ্চিমে বাজারটার তেমন বিস্তার ঘটেনি। এর পেছনে প্রধান কারণ, বড় মসজিদ ও মীরবহরি প্রাথমিক বিদ্যালয়। অবশ্য আনিস বিশ্বাস করে, উপজেলা সড়ক থেকে নেমে এসে অনুতপুর দিয়ে যে নতুন রাস্তাটা উজানের গোমতী বেড়িবাঁধে গিয়ে মিলছে, সেটা শেষ হয়ে গেলে মীরবহরি বাজারের অনেক পসার হবে। তখন পূর্ব-পশ্চিম ও উত্তরদিকে অনেক দোকানপাট বেড়ে যাবে। মীরবহরি বাজার এমনিতেই অনেক পুরোনো বাজার। প্রায় দেড়শো বছর তো হবেই এই বাজারটার।

আনিস মোটর সাইকেল নিয়ে মীরবহরি বাজারে ঢুকে বটগাছটার ছায়ায় একটু থামল। মোটর সাইকেলের ইঞ্জিন বন্ধ করল না। সে বটগাছের গোড়ায় বা এর আশেপাশে এখন হাট জমে ওঠার কোনো লক্ষণ দেখছে না। বিক্রেতারা দোকানের পসরা সাজাচ্ছে। ক্রেতার উপস্থিতি একেবারেই কম। এখন সবে দুপুর হয়ে এসেছে। হাট জমে ওঠে দুপুর পড়ে এলে, ঠিক বিকেলের দিকে।

সুদিনে বুইদ্দার বিলের ভেতর দিয়ে দীর্ঘ হাঁটার পথ, জোয়ারের মওসুমে প্রখর রোদের ভেতর দিয়ে নৌকা চালিয়ে এসে মীরবহরি বাজারের ডাঙায় উঠে আশেপাশের চার-পাঁচ গ্রামের মানুষজন বটগাছটার নিচে দাঁড়িয়ে যেন প্রশান্তির দৃষ্টি মেলে। প্রতিটি মানুষ একটু হলেও বটগাছটার তলে স্বস্তির শ্বাস ফেলে যায়। আনিসও মীরবিহরি বাজারে এলেই একদণ্ডের জন্য হলেও বটগাছটার নিচে দাঁড়ায়। শুধু প্রশান্তি বা স্বস্তির জন্যই নয়, এর নিচে দাঁড়িয়ে সে আস্ত একটা ইতিহাস খুঁজে পায়। কতসব পুরোনো ইতিহাস! বৃটিশ আমলে গোমতী নদী ধরে বজরার মতো নৌকায় করে বেশ কয়েকজন লাল পোশাকের সৈন্য নিয়ে লালমুখো এক ইংরেজ কালেক্টরের এসেছিলেন উজানের গ্রাম নেয়ামতকান্দিতে। নেয়ামতকান্দির এক সময়ের জমিদার ছিলেন নজীব উল্লাহ খান। তাঁর কাছে তিন বছরের খাজনা বাকি ছিল। তিনি ইংরেজদের খাজনা দিবেন না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

সেই লালমুখো ইংরেজ কালেক্টর নেয়ামতকান্দিতে এসে নজীব উল্লাহ খানকে পাননি। নজীব উল্লাহ খান ইংরেজ সৈন্য আসার খবর পেয়েই পালিয়ে যান। এদিকে লালমুখো ইংরেজ সাহেব তাঁকে না পেয়ে জমিদারের নায়েব খুররম আলী ও জমিদারের তিনজন পেয়াদাকে ধরে নিয়ে এসেছিলেন এই মীরবহরি বাজারে। এই বটগাছের ডালে ঝুলিয়ে ওদেরকে গুলি করে মারেন। লাশ তিনদিন বটগাছে ঝুলেছিল, কিন্তু কেউ সাহস পায়নি নামাতে।

উনিশশো সাতচল্লিশের ইতিহাসটাও করুণ। কয়েকদিন পরপর গ্রামের মানুষ দেখত, হিন্দু জোতদার বা আড়তদারের লাশ এই বটগাছটায় ঝুলছে। এদের বেশিরভাগই ছিল হিন্দু অধ্যুষিত প্রসিদ্ধ রায়পুর গ্রামের। আশেপাশের গ্রামের একদল মুসলমান প্রভাবশালী নতুন পাকিস্তান জোশে ওই হিন্দু জোতদার ও আড়তদারদের মেরে বটগাছে টানিয়ে রাখত। কয়েকদিন পরই ওদের জমিজিরাত ও ব্যবসা সেই মুসলমান প্রভাবশালীদের কারও দখলে চলে যেত। এভাবে মীরবহরি, আঁধারিয়া, মোল্লাকান্দি, ছল্লাকান্দি ও কদমতলির বেশ কয়েকজন ফুলেফেঁপে ওঠে। ওরা নতুন উপাধি নেয়। কেউ হয়ে যায় সৈয়দ, কেউ মীর, কেউবা জোয়ারদার। আনিসদের বাড়িটাও ভুঁইয়াবাড়ি নামধারণ করে সেই সময়ে।

উনিশশো একাত্তর সালটা তো ছিল আরও ভয়াবহ। বর্ষা মওসুমের মাঝামাঝি গোমতী নদী ধরে একটা ইঞ্জিন চালিত নৌকায় এক পাকিস্তানি ক্যাপ্টেন কুড়িজন সৈন্য নিয়ে এই মীরবহরি বাজারে আসে। ক্যাম্প ফেলে মীরবহরি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। সাতদিন ছিল। তখন গ্রামের মানুষ প্রতিদিনই দেখত, বিভিন্ন স্থান থেকে ওরা মানুষজন ধরে এনে বটগাছের নিচে বেঁধে রাখছে। বিকেলের দিকে ওদেরকে গুলি করে মেরে গোমতী নদীতে ভাসিয়ে দিচ্ছে। ওদের মধ্যে শুধু হিন্দু সম্প্রদায়ের লোক ছিল, তা নয়। অনেক মুসলমান মুক্তিযোদ্ধাও ছিল...।

আনিস ইতিহাস ভাবনা থামিয়ে গলা বাড়িয়ে উত্তরের গলির শেষমাথা পর্যন্ত দেখল। কোথাও রমজান আলী বা কুদরত মিয়াকে দেখা যাচ্ছে না। সে বুঝতে পারল না, বশিরের কথা শুনে এভাবে হুট করে মীরবহরি বাজারে চলে আসাটা ঠিক হলো কি? পরক্ষণে সে মাথা নাড়ল। ভাবল, তার অনেকদিন ধরে যোগেশ পোদ্দারের মিষ্টান্নভাণ্ডারে যাওয়া হয়নি। আজ যেমন সুযোগ আছে ও সঙ্গে মনসুর পাগলা আছে, সে সেখানে গিয়ে খানিকক্ষণ বসতে পারে। বাড়িতে বশির খাবারের সরঞ্জাম করে রেখেছে। তারপরও তার মনে হলো, আজ দুপুরের খাবারটা যোগেশ পোদ্দারের মিষ্টান্নভাণ্ডারে সেরে গেলে ভালো হবে।

মনসুর পাগলা জিজ্ঞেস করল, ‘আনিস, হোন্ডা থামাইলা যে?’

আনিস পাল্টা জিজ্ঞেস করল, ‘কেন, কই যেতে চাস?’

‘কোনোখানে না। হোন্ডা দিয়া বাজারটা চক্কর দিতে চাইতাছি।’

‘বাজার চক্কর দিবি কেন?’

মনসুর পাগলা একটা লাজুক হাসি দিয়ে বলল, ‘বাজারের মানুষগোরে বুক চিতাইয়া দেখাইতাম যে আমি তোমার হোন্ডায় চলতাছি।’

আনিস হাসল। একটু শব্দ করে হাসি। বলল, ‘তুই না! আচ্ছা, ঠিক আছে, চল।’

মনসুর পাগলা হাসল— খিক খিক, খিক খিক।

আনিস একটু ধীরে ধীরে মোটর সাইকলটা চালাতে শুরু করল। সে দক্ষিণের গলি ধরে যাচ্ছে। দোকান থেকে তার চেনা কেউ হাত তুলছে। কেউ গলা চড়িয়ে জিজ্ঞেস করছে, ‘আনিস ভাই, ক্যামুন আছেন?’

আনিস কারও কথায় জবাব দিচ্ছে, কারও কথায় হাত উঁচিয়ে সৌজন্য দেখাচ্ছে। সে প্রথমে শিক্ষক হিসেবে, তার ওপর কবি, এখন সাংবাদিক, তাই দুই-চার-পাঁচ গ্রামে তার বেশ নাম আছে। এই মীরবহরি বাজারেও মোটামুটি সবাই তাকে চিনে। এছাড়া তার বাবা সুন্দর ভুঁইয়ার সার-কীটনাশকের দোকান ছিল এই বাজারেই। যদিও বাবার জন্য সে এই মীরবহরি বাজারে মুখ দেখাতে পারত না। এমনকি স্কুলেও সে একা একা চলত। শুধু মনসুরই তাকে সঙ্গ দিত। অন্য কোনো ছাত্র কিছু বললে তেড়ে যেত।

মনসুর পাগলা এখন আর মোটর সাইকেলে বসে হাত দুটো হাওয়ায় ভাসিয়ে বাতাসের ঢেউ খেলাচ্ছে না। সে বুক চিতিয়ে দোকানের সারির এদিকওদিক তাকাচ্ছে। এমনিতেই প্যান্ট-শার্ট পরে তার ভাবের শেষ নেই, তার ওপর সে এখন মোটর সাইকেলে আনিসের পেছনে বসে আছে। আনিস যখন হাত তুলে কাউকে সৌজন্য দেখাচ্ছে, সে-ও তখন হাত তুলছে। হাসছে অযথাই।

আনিস দক্ষিণের গলি ধরে একেবারে পশ্চিমে এসে মনসুর পাগলাকে জিজ্ঞেস করল, ‘পাগলা, স্কুলের ভেতরে ঢুকবি?’

মনসুর পাগলা খুশি হয়ে বলল, ‘হ হ, ঢোকো। স্কুলের মাঠটায় একখান চক্কর দেও।’

আনিস সমবায় সমিতির অফিস ও মসজিদের উঁচু মিনারের পাশ দিয়ে মীরবহরি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভেতর ঢুকল। মাঠ ফাঁকা। হয়তো দুপুর বলেই মাঠ এমন ফাঁকা। আজ শুক্রবার। স্কুলও বন্ধ। মাঠটা চক্কর দিতে দিতে আনিসের পুরোনো কিছু স্মৃতি মনে পড়ল। স্মৃতিটা মনসুর পাগলাকে নিয়েই।

ছোটবেলা থেকেই মনসুর পাগলা ছিল বেশ শক্তিশালী। দুই-তিনজনকে সে একাই কোনোকিছু ছাড়া ঘায়েল করে ফেলতে পারত। তার তখনও মাথায় ছিট ধরা পড়েনি। একবার কী কারণে যেন আনিসের সঙ্গে মোল্লাকান্দির কুদ্দুস নামে এক ছেলের ঝগড়া বাঁধে। ঝগড়াটা কুদ্দুসই শুরু করে। আনিসকে ধাক্কা দিয়ে বেঞ্চ থেকে ফেলে দেয়। এতে আনিসে কনুই কেটে যায়।

মনসুর পাগলা দূর থেকে সেটা দেখে। আর দেখেই সে এগিয়ে এসে গাল দিতে দিতে কুদ্দুসকে এমন মার দেয়, শেষপর্যন্ত তাকে উপজেলা সদর হাসপাতালে পর্যন্ত নিতে হয়। এ নিয়ে পরে বেশ কিছুদিন স্কুলে ও স্কুলের বাইরে দেনদরবার হয়। পরে যেভাবেই হোক ব্যাপারটা নিষ্পত্তি হয়।

এই স্কুলে আনিসের খুব মন খারাপ করার একটি স্মৃতি আছে। যদিও এই স্কুলে পড়াকালীন আরও অনেক কারণেই তার মন খারাপ হতো, কিন্তু মনসুর তাকে মন খারাপ করতে দিত না। তার মা রাহেলা খানম একদিন তার সঙ্গে দেখা করতে স্কুলে আসে। তখনও রাহেলা খানমের পক্ষাঘাতগ্রস্ত রোগ হয়নি। যদিও এর কিছুদিন পরই তার মা পক্ষাঘাতগ্রস্ত রোগী হয়ে বিছানা নেয়।

আনিসের স্পষ্ট মনে আছে, সেদিন সকালবেলা থেকেই খুব বৃষ্টি হচ্ছিল। শ্রাবণ মাস ছিল। বুইদ্দার বিলেও জল থইথই করছিল। তার মা নৌকায় করে স্কুলে আসে। তাকে নিয়ে মীরবহরি বাজারের দক্ষিণ দিক দিয়ে যোগেশের মিষ্টান্নভাণ্ডারে নিয়ে যায়। একটা পিরিজে দুটো বড় বড় মিষ্টি নিয়ে খাইয়ে দিতে দিতে বলে, ‘বাপ, আমি তোর নানার বাড়িত কয়দিনের লাইগা যাইতাছি। তুই একলা থাকতে পারবি তো?’

আনিস না বুঝেই সায় দেয়। মুখ কিছু বলে না।

রাহেলা খানম বলে, ‘আমি তোরে কয়দিন পরই লইয়া যাইমু। তুই যাইবি তো আমার লগে?’

আনিস আবারও সায় দেয়।

রাহেলা খানম মিষ্টি দুটো খাইয়ে দিয়ে আঁচলে গোঁজা টাকা খুলে যোগেশ পোদ্দারকে মিষ্টির টাকা দেয়। কিছু টাকা আনিসের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলে, ‘বাপ, তুই টাকাটা রাখ। স্কুলে আইসা পইত্যেক দিন দুইডা কইরা জিলাপি খাইস। উপাস থাকিস না।’

আনিস এবারও কিছু বলে না। টাকাটা পকেটে রাখতে রাখতে মাথা ঝাঁকায়।

রাহেলা খানম যোগেশের মিষ্টান্ন ভাণ্ডার থেকে বের হয়ে মীরবহরি ঘাটে নৌকায় ওঠে। গোমতী নদী ধরে আরও ভাটির দিকে চলে যায়।

আনিসের নানার বাড়ি ছিল গোমতী নদীর একেবারে ভাটিতে মেঘনার কাছাকাছি জমশেদপুর। সে অনেকবারই গিয়েছে। তার নানা ছিলেন খুব দরিদ্র, একটি মাদ্রাসার জুনিয়র শিক্ষক। মাদ্রাসাটা বেসরকারি ছিল। মাদ্রাসার তহবিল থেকে খুব সামান্যই বেতন পেতেন। কিছু জমিজমা ছিল। সেগুলো দিয়ে সাত ছেলেমেয়েকে নিয়ে সংসার চালাতে খুবই হিমশিম খেতেন। রাহেলা খানম ছিল তার বড় মেয়ে। তিনি বড় মেয়েকে মোকামের ব্যবসায়ীর সাথে বিয়ে দিয়ে ভেবেছিলেন বাকি ছেলেমেয়েদেরও কোনো একটা গতি হবে। কিন্তু মেয়ে বিয়ে দেওয়ার পরপরই বুঝতে পারেন, তার ধারণা ভুল। ব্যবসায়ীরা আসলেই হিসেবি হয়। কয়েক দিন পর আরও বুঝতে পারেন, মেয়ের জামাই শুধু হিসেবিই নয়, চরিত্রের দিক দিয়ে খুব খারাপ প্রকৃতির। শুধু নারীগঠিত ব্যাপারেই নয়, জামাই তার মেয়ের গায়ে হাত তোলে, মারধোর করে হাতপা ভেঙে দেয়।

আনিসের মনে আছে, তার মা তাকে নিয়ে যাবে দূরের কথা, সপ্তাহখানেক পর নিজেই চলে আসে। একে তো তার প্রতি টান, তার ওপর বাপের বাড়িতে উপোস থাকার চেয়ে স্বামীর বাড়িতে পিঠে খেয়ে পেটে খাওয়া শ্রেয় মনে করেছিল। কিন্তু বিপত্তি ঘটে এর কিছুদিন পরই। তার বাবার প্রচণ্ড মারে ঘাড়ে আঘাত পেয়ে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে সেই যে বিছানায় পড়ে, আর ওঠেনি। মাঝখানে কুমিল্লা সদর হাসপাতালে পর্যন্ত থাকতে হয়েছিল অনেকদিন...।

মীরবহরি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠে মোটর সাইকেলটা দিয়ে দুটো চক্কর দিয়ে বের হতে হতে আনিস কী ভেবে মনসুর পাগলাকে জিজ্ঞেস করল, ‘পাগলা, তোর মনির স্যারের কথা মনে আছে?’

মনসুর পাগলা একটু ভেবে বলল, ‘হ, মনে আছে। আমাগোরে খালি পিডাইতেন।’

আনিস হাসল। বলল, ‘তোকে পিটাতেন বেশি।’

মনসুর পাগলা ন্যায় ঠেলে বলল, ‘না, না, তোমারে পিডাইতেন বেশি। আসলে স্যার সবারেই পিডাইতেন। কোনো বাছবিচার করতেন না।’

‘হ্যাঁ, সেটাই। আমার মনে আছে, স্যার শুধু বুধবারে পিটাতেন।’

‘হ, ঠিক কইছ। আইচ্ছা, কও তো, স্যার বুইধবারে ক্যান পিটাইতেন?

‘সেটা তো জানি না। তবে একটা ব্যাপার মনে আছে, আমরা যখন ক্লাস ফোর-এ পড়ি, তখন স্যার জণ্ডিসে মারা যান। স্যার মারা যাওয়াতে আমরা কী খুশি হয়েছিলাম, তাই না?’

মনসুর পাগলা মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, ‘হ, হা, আমরা খুশি হইয়া নাচতে ছিলাম। হেইডা দেইখা হেড স্যার আইসা আমাগোরে পিটাইছিলেন। স্যারেরা আমাগোরে ক্যান যে খালি পিটাইতেন? তুমি যখন ইসকুলে পড়াইতা তখন কি ছাত্র পিটাইতা?’

আনিস বলল, ‘না, কখনও না। ছাত্রদের পিটিয়ে কখনও কোনোকিছু শেখানো যায় না।’

মনসুর পাগলা সায় দিয়ে বলল, ‘আমারও হেইডা মনে হয়। তুমি ঠিক কইছ।’

আনিস এবার মোটর সাইকেলটা নিয়ে বাজারের উত্তরদিক দিয়ে এল। আসতে আসতে সে কাঁচাবাজারেও রমজান আলী ও কুদরত মিয়াকে খুঁজল, কিন্তু কোথাও দেখল না। কাঁচাবাজারের ব্যবসায়ীরা কেউ কেউ এখনও পসরা সাজাচ্ছে, কেউ এরই মধ্যে পসরা সাজিয়ে বসেছে। ক্রেতাদের ভিড় অবশ্য মোটেও নেই। দুই-চারজন ক্রেতা এদিকওদিক এলোমেলো ঘুরছে।

আনিস কাঁচাবাজার পেরিয়ে একটা দোকানের সামনে একটু থামল। দোকানের ভেতরটা দেখল। দোকানটা বড় একটা টিনের ঘরের। মাঝখানে একটা ঝাঁপ আছে। দোকানের বেড়ায় সবুজ রঙ করা। দরজার গলে সুবোল মিয়াকে দেখা যাচ্ছে। ক্যাশবাক্সেটা সামনে নিয়ে একটা চৌকির ওপর বসে আছে। তার সামনে আরও দু’জন মানুষ হাত নেড়ে কী যেন বলছে।

মনসুর পাগলা বলল, ‘তোমাগো দোকানডা।’

আনিস মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, ‘হ্যাঁ।’

মনসুর পাগলা জিজ্ঞেস করল, ‘ভিতরে ঢুকবা না?’

আনিস বলল, ‘না।’ু বলেই সে মোটর সাইকেল টান দিল। সে তার বাবার সার ও কীটনাশকের ব্যবসাটা বিক্রি করলেও, দোকানের স্থানটা বিক্রি করেনি। এখন দোকানটা বিক্রি করলে বহুগুণ দাম পাবে।

আনিস মোটর সাইকেল টান দিয়ে সরাসরি যোগেশ পোদ্দারের মিষ্টান্নভাণ্ডারের সামনে এসে থামল।

যোগেশ পোদ্দার কুঁজো হয়ে বসে বড় একটা বড় কড়াইতে হাত ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে জিলাপি ভাজছে। গুড়ের জিলাপি। একটি বড় সিলভারের ট্রে-তে তরে তরে উঁচু করে সাজিয়ে রাখা। হাটবার বলে আজ বেশি করে জিলাপি ভাজা হচ্ছে। ধুতির গিট থেকে ভুড়িটা বের হয়ে আছে বলে যোগেশ পোদ্দারকে দেখতে বেশ লাগছে। যদিও তার গায়ে একটা শার্ট আছে, কিন্তু ভুড়িটা সেই শার্টে ঢাকছে না।

আনিসকে দেখেই যোগেশ পোদ্দার একটা দিঘল হাসি দিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘আরে, ভাইজান যে! ঢাকা থাইকা কবে আইছেন?’

যোগেশ পোদ্দার আনিসের চেয়ে বয়সে অনেক বড় হলেও তাকে ‘আপনি’ সম্বোধনে ডাকে। অবশ্য ছোটবেলায় তুমি সম্বোধনে ডাকত। সে স্কুলের চাকরিটা যখন নেয়, তখন থেকে সেটা ‘আপনি’ সম্বোধনে উঠে আসে।

আনিস মোটর সাইকেলটা একপাশে রেখে ইঞ্জিন বন্ধ করে নামতে নামতে বলল, ‘এই তো বেশিক্ষণ হয়নি। হাটে আসছি, তাই ভাবলাম, আপনার দোকানে জিলাপি খেয়ে যাই।’

যোগেশ পোদ্দার বলল, ‘ভালা করছেন। অখন গরম গরম ভাজতাছি। তয় এইবার মনে হয় অনেকদিন পর গেরামে আইলেন?’

আনিস বলল, ‘না, আট-নয়দিন আগে একবার আসছিলাম তো।’

‘ও, তাই। আমার দোকানে তো আসেন না।’

‘আসলে বাড়িতে এলেও আমার মীরবহরি বাজারে আসা হয় না।’

‘আইচ্ছা, আইচ্ছা, অখন ভিতরে গিয়া বসেন। আমি এক্কেবারে কড়াই থাইকা তোলা জিলাপি সিরায় দিতাছি। একটু সময় লাগবনে। আপনে খাইয়া ভালা পাইবেন।’

‘অসুবিধা নেই। পাগলার জন্যও দিবেন।’

‘হ হ, দুই পেলেট পাঠাইতাছি।’

মনসুর পাগলা বলল, ‘আমার পেলেটে জিলাপির লগে সিরা একটু বেশি দিবেন।’

যোগেশ পোদ্দার হেসে বলল, ‘এই পাগলা, জিলাপির লগে কেউ সিরা খায়? মিষ্টির লগে খায়।’

মনসুর পাগলা বুক টান করে বলল, ‘আমি খাই। আমার ভালা লাগে। তয় আমারে হুধা জিলাপি না, একটা বড় মিষ্টিও দিবেন।’

যোগেশ পোদ্দার বলল, ‘আইচ্ছা, যা। বস গিয়া। তোর লাইগা মিষ্টিও পাঠাইতাছি।’

মনসুর পাগলা অযথাই হেসে বলল, ‘হ, হ, বইতাছি। আমার মিষ্টিটা আগে পাঠাইয়া দেন। আমার বড় বুক লাগছে।’

যোগেশ পোদ্দার মাথা ঝাঁকিয়ে সায় দিল। মুখ কিছু বলল না।

ওরা মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ভেতরে গিয়ে একেবারে দক্ষিণের একটা টেবিল নিয়ে বসল। মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের পেছনটা ঝাঁপ ওঠানো খোলা। নদীটা তো স্পষ্ট দেখাই যায়, এমনকি নদীর কলকল ধ্বনিও কানে এসে বাজে। বেশ কয়েকটা হিজল গাছ, দুটো আমগাছ, আর বিস্তৃত কলা গাছের মোড়া। মীরবহরি ঘাটটা পাশেই, হিজল গাছগুলোর তলায়।

আনিস যোগেশ পোদ্দারের এই মিষ্টান্নভাণ্ডারে বসে অনেকবার অনেক কবিতার ভাবনা নিয়ে গেছে। তার প্রথম বইয়ের ‘রাধা সমাচার’ কবিতাটি এখানে বসেই লিখেছে। নদীর ঘাট, জলের কলকল শব্দ, হিজলতলা, কানাইর বাঁশির সুর!

মনসুর পাগলা মীরবহরি ঘাটের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আনিস, আমাগো মীরবহরি ঘাটে নৌকা মনে হয় কইমা গেছে। আগে কত নৌকা থাকত!’

আনিস বলল, ‘হুম, আসলে নতুন রাস্তাটা হয়েছে না? এজন্যই নৌকা কমে গেছে। এছাড়া নতুন রাস্তায় যখন রিকশা, ভ্যানগাড়ি আর সিএনজি চলা শুরু করবে, তখন নৌকা আরও কমে যাবে।’

মনসুর পাগলা সায় দিয়ে বলল, ‘আমারও তাই মনে হইতাছে। তয় একটা কথা কই, ওইদিন যখন জেল থাইকা ছাড়া পাইয়া উপজিলার নৌকাঘাটে আসি, দেখি কি নৌকা নাই। তখন উপজিলা থাইকা নতুন রাস্তা ধইরা বাড়িত আসতে হইছে। রাইতের বেলা আছিল। বিশ্বাস করো, আমি না বাড়ির পথটা হারাইয়া ফেলছিলাম। পরে তোমাগো বাড়ির নিশানা ধইরা বাড়ি চিনতে পারি।’

আনিস বলল, ‘তাই!’— বলেই সে আরও কিছু বলতে যাবে, ঠিক তখনই তার দৃষ্টিটা গিয়ে একটা দোকানের পেছনের অংশে পড়তেই সে চুপ হয়ে গেল। একটু অন্যমনস্কতাও তার মধ্যে ভিড় করল। মীরবহরি ঘাট বরাবর সেই দোকানটা। সেই দোকানটাই সার ও কীটনাশকের দোকান। একসময় তার বাবার দোকান ছিল। তার বাবা তো নেই। কয়েক বছর আগে মারা গেছে। একটু আগেই সে দোকানে সুবোল মিয়াকে ক্যাশবাক্সের সামনে বসে থাকতে দেখে এসেছে।

এটা শুধু আজ নয়, যখনই আনিস যোগেশ পোদ্দারের মিষ্টান্নভাণ্ডারে বসে তখনই তার দৃষ্টিটা চলে যায় তার বাবার দোকানটার পেছনের অংশটার দিকে। প্রতিবার একটা হাহাকার এসে তার ভেতর বাসা বাঁধে। আজও তার ভেতর সেই হাহাকারটা বাসা বাঁধল। সঙ্গে একটা দীর্ঘশ্বাস।

আনিস চোখে তার বাবার চেহারাটা ভেসে উঠল স্পষ্টভাবে। সঙ্গে তার মা’র চেহারাটাও। আজ দু’জনের কেউ বেঁচে নেই এটা সত্য। কিন্তু তাদের বেঁচে থাকার যে সমীকরণটা ছিল তা আজও তাকে পীড়া দেয়। চিরায়ত অসুখের মতো পীড়া।

আনিস তার বাবা সুন্দর ভুঁইয়াকে কোনোদিনই বুঝতে পারেনি। বাপ-বেটার স্বাভাবিক সম্পর্কটা ওদের মধ্যে কোনো কালেই ছিল না। কখনও গড়েও ওঠেনি। না তার ছোটবেলায়, না সে বড় হওয়ার পর। তাদের মধ্যে সম্পর্কের দূরত্ব ছিল এত বিস্তর যে দু’জন দু’জনকে মনে করত দুই জগতের মানুষ। অবশ্য এর প্রধানতম কারণ ছিল, তার মা। তার মাকে তার বাবা প্রচণ্ড মারত। শারীরিক ও মানসিক অত্যাচার করত। সেটা সে মোটেও মেনে নিতে পারত না। সে সবসময় তার মা’র পক্ষাঘাতগ্রস্ত হওয়ার পেছনে তার বাবাকে প্রচণ্ডভাবে দায়ী করত। আর সেটাই ছিল একদম সত্য।

সুন্দর ভুঁইয়ার আরেকটা দোষ ছিল, সে ছিল নির্লজ্জ চরিত্রহীন। তার শুধু কি মনসুর পাগলার মা কমলা খাতুনের সঙ্গেই সম্পর্ক ছিল?— মোটেও তা নয়। এর বাইরেও সে মাঝেমধ্যে নৌকায় করে মেয়ে এনে দোকানে রাত কাটাত। কেউ কেউ বলত, দোকানে নাকি সে মেয়ে এনে নাচাত। এটা সে বুড়ো বয়স পর্যন্ত করেছিল। গ্রামের মানুষ তার এসব কীর্তি জানত। এমনকি বাজারের সবাই। এটা রাহেল খানম একেবারেই সহ্য করতে পারত না। গরিব হোক, তারপরও সে একজন মাদ্রাসার শিক্ষকের মেয়ে ছিল। প্রতিবাদ করত, শারীরিকভাবে নির্যাতিত হতো। একবার নয়, বারবার। তারপরও প্রতিবাদ করত। এরপর তো পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে সেই যে বিছানা নেয়, এরপর থেকে প্রতিবাদের ভাষাই হারিয়ে ফেলে। এদিকে সুন্দর ভুঁইয়া যেন বউয়ের এই পক্ষাঘাতগ্রস্ত হওয়া নিয়ে মনে মনে খুশিই হয়। যদিও কোনোদিন দ্বিতীয় বিয়ে করেনি বা এধরনের কোনো আকাঙ্ক্ষা সে পোষণ করেনি। দীর্ঘদিন ধরে ঘরে স্ত্রী পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়ে থাকার পরও না। কিন্তু তার প্রচণ্ড নারীর নেশা ছিল।

মীরবহরি প্রাথমিক বিদ্যালয়টা বাজার লাগোয়া ছিল বলে আনিস পড়েছিল সবচেয়ে বড় সমস্যায়। তার বাবার এসব কীর্তি তার স্কুলের শিক্ষকরাই শুধু জানত না, ছাত্ররাও জানত। ছাত্ররা তার বাবাকে নিয়ে নানান ধরনের কটূক্তি ও টিটকারি মেরে কথা বলত। সে বরাবরই ছিল একটু ভাবুক ও নিশ্চুপ ধরনের। কারও সঙ্গে সহজে ঝগড়া লাগতে চাইত না। কিন্তু মনসুর তার হয়ে ঠিকই ছোটবেলা থেকে স্কুলের ছাত্রদের সঙ্গে ঝগড়া করত ও প্রতিবাদ জানাত। মাঝেমধ্যে মারামারিও লাগিয়ে দিত। সে অনুতপুর হাইস্কুলে পড়তে গিয়েও এর থেকে নিস্তার পায়নি। তাকে তো দিনের শেষে গ্রামে আসতে হতো। এখন যেমন মীরবহরি বাজারের সবাই তাকে সম্মান দেয়, সমীহ করে কথা বলে, আগে তেমনটা কখনই ছিল না। সবাই কেমন হেয় করে কথা বলত। কিন্তু তার বাবার এতে কোনো পরোয়া ছিল না। এজন্য সে পারতে তার বাবার দোকানে যেত না। তার বাবাও কখনও তাকে দোকানে সহজে ডেকে নিত না। ক্রমশ...


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত