সংবাদ

স্মরণ

আখতার হুসেন: বেঁচে থাকবেন সৃষ্টির ছায়ায়


মুহাম্মদ মোয়াজ্জেম হোসেন
মুহাম্মদ মোয়াজ্জেম হোসেন
প্রকাশ: ১ অক্টোবর ২০২৬, ০১:০০ এএম

আখতার হুসেন: বেঁচে থাকবেন সৃষ্টির ছায়ায়
সদ্যপ্রয়াত আখতার হুসেন


বিশিষ্ট ছড়াকার, কবি, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আখতার হুসেনের প্রয়াণে আমাদের সাহিত্যাঙ্গনে যে শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে, তা সহজে পূরণ হবার নয়। একজন আখতার হুসেন হঠাৎ করে কিংবা একদিনে তৈরি হন না। সময়ান্তরে সমাজে এমন মানুষের আবির্ভাব ঘটে, এবং অবক্ষয়িত সমাজ ও নেমে আসা অন্ধকারে তারা নিরন্তর নক্ষত্র প্রজ্বলন করেন। তিনি ছিলেন আমাদের মানস ও সাংস্কৃতিক চেতনা জাগরণের কারিগর— যা তিনি শুরু করেছিলেন শিশুতোষ সাহিত্য রচনার মাধ্যমে। পরবর্তীতে তিনি সাহিত্য-সংস্কৃতির নানা শাখায় তার সৃজনশীলতা বিস্তৃত করেন। 

সেই ছোটবেলায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ‘চয়নিকা’ বইয়ে পড়েছিলাম— ‘পারিস কি তুই শীতের ভোরে/দিঘীর জলে নাবতে? ডুবটি দিয়ে চুপটি করে/আপন মনে ভাবতে?/কি বললি, পারবি নে তুই করতে এসব কিচ্ছু/কান্না জুড়িস হঠাৎ করে কামড়ে দিলে বিচ্ছু।’ এরপর বহু বছর চলে গেছে কিন্তু এই ছড়াটি এখনো মনে আছে। আরও মনে আছে চয়নিকা বইয়েই পড়া— ‘হ্যাঁরে, খবরটা কি উড়ো?/শুনতে পেলাম নিখিলপুরের চার-চারটে বুড়ো/কাঁদেন কেবল লাগিয়ে চোখে শুকনো মরিচ গুঁড়ো,/আরে, কী বললি দূরো!/খাওয়ার সময় খায় কী জানিস? পাঁচটা রুইয়ের মুড়ো।/বয়স ওদের জানিস কতো? আটশো নাকি পুরো।/ হ্যাঁরে, খবরটা কি উড়ো?’ আরও পরে পড়েছি, ‘মা-ও বলেন— বাবা-ও বলেন/ অভিযোগের সুরে/ আমি নাকি আলসে এবং কুঁড়ে/ কাজ করি না মোটে/ মিনু যেমন করে/ সারাটা দিন ধরে...’ এমন মজার ছড়া লিখে শিশুদের মন আনন্দে ভরিয়ে দেওয়ার মানুষটির নামই আখতার হুসেন। তাঁর ছড়ার প্রধান শক্তি ছিল সহজাত ছন্দ ও স্বাভাবিকতা। শিশুরা যাতে পড়তে গিয়ে পড়াবিমুখ না হয়ে, বরং শব্দের খেলায় মেতে উঠতে পারে তাঁর ছড়াতে ছিল সেই মুন্সিয়ানা। শৈশবের সেই পাঠ-স্মৃতির আড়ালে ছিলেন এমন এক স্রষ্টা, যাঁর দীর্ঘ সাহিত্যজীবন বাংলা শিশুতোষ সাহিত্যকে নানা মাত্রায় সমৃদ্ধ করেছে।

আখতার হুসেনের জন্ম ১৯৪৫ সালের ১ নভেম্বর। তাঁর পৈতৃক নিবাস নাটোর জেলার লালপুর উপজেলার নুরুল্লাপুর গ্রামে। তাঁর পিতা টি. আই. এম. সিকান্দার রেলওয়েতে কর্মরত ছিলেন। পিতার চাকরিসূত্রে আখতার হুসেনের শৈশব ও কৈশোরের একটি উল্লেখযোগ্য সময় অতিবাহিত হয় দেশের বিভিন্ন জনপদে— খুলনা, গফরগাঁও, কুলাউড়াসহ নানা অঞ্চলে। শৈশবের বহুজনপদে বিচরণের এই বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতা তাঁকে বিচিত্র পরিবেশ, মানুষ ও জীবনযাত্রার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ করে দেয়। পরবর্তী সময়ে তাঁর সাহিত্যিক দৃষ্টিভঙ্গি, কল্পনাশক্তি ও জীবনবোধ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। প্রথম আলোর স্মৃতিচারণমূলক লেখা থেকে জানা যায়, গফরগাঁওয়ে তাঁর সাহিত্যজীবনের সূচনা এবং কুলাউড়ায় তাঁর প্রথম মুদ্রিত রচনা প্রকাশিত হয়। তাঁর প্রথম বই ‘সমুদ্র অনেক বড়’ প্রকাশিত হয় ১৯৭০ সালে। তাঁর সাহিত্যিক যাত্রার শুরু ছিল এমন এক সময়, যখন বাংলাদেশের সমাজ-সংস্কৃতি গভীর রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। ফলে তাঁর শিশু-কিশোর সাহিত্য নিছক ছোটদেরকে হাসানোর বা বিনোদন দেওয়ার সাহিত্য হয়ে থাকেনি; এর ভেতর দিয়ে তিনি জ্ঞান, কল্পনা, স্বাধীনতার চেতনা, মানবিকতা ও সামাজিক বোধের নানা বীজ ছড়িয়ে দিয়েছেন।

একটি জাতির মানসিক বিকাশ, মূল্যবোধের নির্মাণ ও দায়িত্বশীল ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গঠনে শিশুতোষ সাহিত্যের ভূমিকা অপরিসীম। সৃষ্টিশীলতার মধ্য দিয়ে এ দায়িত্ব পালনে যে ক’জন শিশুসাহিত্যিক দীর্ঘদিন নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করেছেন, আখতার হুসেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম। শিশুদের মনোজগতের প্রতি গভীর সংবেদনশীলতা তাঁর সাহিত্যকর্মের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। তাঁর শিশুতোষ সাহিত্যের প্রধান সুর গড়ে উঠেছে শিশুমনের আনন্দ, সরলতা, মানবিকতা ও নৈতিক বোধকে কেন্দ্র করে। হাসি, কৌতুক, কল্পনা ও ছন্দের প্রাণবন্ত ব্যবহারে তিনি শিশুর পরিচিত জগতকে আনন্দময় করে তুলেছেন; পাশাপাশি সত্যবাদিতা, সদাচরণ, সহমর্মিতা, দায়িত্ববোধ ও পরোপকারের মতো মূল্যবোধও তাঁর রচনায় স্বাভাবিকভাবে প্রকাশ পেয়েছে। শব্দের সুনিপুণ প্রয়োগ ও সহজ-সাবলীল ভাষা তাঁর লেখাকে যেমন শিশুর কাছে আকর্ষণীয় করেছে, তেমনি তাদের কল্পনাশক্তি ও মানবিক চেতনার বিকাশেও ভূমিকা রেখেছে।

অনেকের লেখাতেই উপদেশ খুঁজে পাওয়া যায়, কিন্তু উপদেশ প্রদানের উদ্দেশ্য নিয়ে কবিতা লেখার চেষ্টা যাঁরা করেছেন, তাঁদের মধ্যে আখতার হুসেনের নামই বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বাংলা সাহিত্যে উপদেশমূলক কবিতার ধারায় ষাটের দশকের অন্যতম কবি ও শিশুসাহিত্যিক আখতার হুসেনের অবদান অনন্য। এই ধারার চর্চাকে বেগবান করতে তিনি সম্পাদনা করেছেন ‘বাংলাসাহিত্যের সেরা উপদেশমূলক কবিতা’ ও ‘বাংলাসাহিত্যের সেরা গল্পভিত্তিক উপদেশমূলক কবিতা’— শিরোনামের দুটো গ্রন্থ। শিশুমনস্তত্ত্বের গভীর অনুধাবন থেকে আগামীর প্রজন্মকে নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধের পথে পরিচালিত করার প্রয়াসেই আখতার হুসেন রচনা করেছেন উপদেশমূলক কবিতার অনন্য সংকলন ‘সারাদিন আমি যেন ভালো হয়ে চলি’। গ্রন্থটির মূল লক্ষ্য শিশু-কিশোরদের মানসিক ও নৈতিক বিকাশে সহায়তা করা হলেও এর অন্তর্নিহিত জীবনবোধ ও নীতিচেতনা বয়সের সীমা অতিক্রম করেছে। ফলে গ্রন্থটি শুধু শিশু-কিশোরদের জন্য শিক্ষণীয় নয়, বরং প্রাপ্তবয়স্ক পাঠকের মননকেও ভাবনার খোরাক জোগায়।

আখতার হুসেনের সাহিত্যচেতনায় দেশপ্রেম একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে আছে। বাংলাদেশ, মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা ও দেশের মানুষের প্রতি ভালোবাসা তাঁর বিভিন্ন রচনায় প্রকাশিত হয়েছে। একই সঙ্গে প্রকৃতি, পশুপাখি ও পরিবেশের প্রতি মমত্ববোধ তাঁর শিশুতোষ সাহিত্যকে করেছে আরও জীবনঘনিষ্ঠ। অন্যায়, অসুন্দর ও অনৈতিকতার বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান শিশু-কিশোর মনে ন্যায়বোধ এবং সুন্দর সমাজের আকাঙ্ক্ষা জাগিয়ে তোলে। আনন্দ ও শিক্ষার এই সমন্বয় তাঁর সাহিত্যকে নিছক বিনোদনের গণ্ডি অতিক্রম করে শিশুর মানসিক ও নৈতিক বিকাশের সহায়ক করে তুলেছে। সহজ ভাষা, ছন্দোময় প্রকাশভঙ্গি এবং জীবনঘনিষ্ঠ বিষয়বস্তুর কারণে আখতার হুসেনের সাহিত্য বাংলা শিশুতোষ সাহিত্যের ভাণ্ডারে একটি স্বতন্ত্র ও মূল্যবান সংযোজন। তাঁর সাহিত্য শিশু-কিশোরদের মনের আনন্দ ও বিকাশের সঙ্গে মানবিক মূল্যবোধের যোগসূত্র নির্মাণকারী এক স্বতন্ত্র সাহিত্যিক প্রয়াস।

তাঁর রচনা কেবল কল্পনার আনন্দে সীমাবদ্ধ নয়; এর মর্মমূলে রয়েছে গভীর সমাজচেতনা, মানবিক মূল্যবোধ ও দায়িত্ববোধ। শিশুমনের স্বাভাবিক প্রবণতা ও মনস্তত্ত্বকে উপলব্ধি করে সহজ-সরল ভাষা, ছন্দোময় প্রকাশভঙ্গি ও সুনিপুণ শব্দচয়নের মাধ্যমে তিনি শিশুদের নৈতিকতা, মানবিকতা ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করেছেন। ষাট ও সত্তরের দশক থেকে স্বাধীন বাংলাদেশের পরবর্তী সময় পর্যন্ত প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক পরিসরে ছড়াকার হিসেবে তাঁর সক্রিয় ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি নবীন লেখকদের উৎসাহিত করা, তাঁদের পথনির্দেশ দেওয়া এবং সম্পাদনার ক্ষেত্রেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। শিশুমনে মুক্তচিন্তা, মানবিকতা ও দেশপ্রেমের বীজ বপনের মধ্য দিয়ে আলোকিত প্রজন্ম গঠনে তাঁর দীর্ঘ সাহিত্যযাত্রা বাংলা শিশুতোষ সাহিত্যের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

শুধু লেখক হিসেবেই নয়, সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সঙ্গেও আখতার হুসেনের ছিল গভীর ও সক্রিয় সম্পৃক্ততা। তিনি বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্যদের অন্যতম এবং সংগঠনটির প্রাথমিক পর্বের বেশ কয়েকটি নাটক রচনা ও নির্দেশনা দিয়েছেন। প্রগতিশীল উদার অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বলীয়ান শিশুদের জন্য কাজ করেছেন ‘কেন্দ্রীয় খেলাঘর আসরে’র মাধ্যমে। তাঁর সৃজনশীল প্রতিভার স্বাক্ষর রয়েছে সংগঠনগুলোর সংগীতেও। খেলাঘরের সংগঠনসংগীত ‘আমরা তো সৈনিক, শান্তির সৈনিক’ এবং ছাত্র ইউনিয়নের সাংগঠনিক সংগীত ‘আমরা তো ঐক্যের দৃঢ় বলে বলীয়ান, শোষণের কারাগার ভাঙবই’ তাঁরই রচনা। এসব গান ও নাটকে তাঁর সাহিত্যচেতনা ও সমাজমনস্কতার পরিচয় মেলে। সারা দেশের শিশু-কিশোরদের গড়ে তুলতে চেয়েছেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনায়। শিশু-কিশোরদের সাহিত্য-সংস্কৃতিচর্চায় উদ্বুদ্ধ করেছেন। তিনি শিশু সাহিত্যচর্চাকেও উৎসাহিত করেছেন। তিনি শিশুকে শুধু ‘ভালো ছেলে’ হওয়ার উপদেশ দেননি; বরং সাহিত্য, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সমাজের সঙ্গে তার সম্পর্ক তৈরি করার চেষ্টা করেছেন। এই জায়গায় তাঁর শিশুসাহিত্য এক ধরনের সাংস্কৃতিক শিক্ষার ভূমিকা পালন করেছে।

প্রগতিশীল অসাম্প্রদায়িক চেতনার অধিকারী আখতার হুসেনের জীবন ও সাহিত্যকর্মের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় মুক্তিযুদ্ধ। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোতে তাঁর কলম হয়ে উঠেছিল অনন্য এক অস্ত্র। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত তাঁর লেখা এবং অজিত রায়ের সুরে তিমির নন্দীর কণ্ঠে সেই উদ্দীপনামূলক গান— ‘স্বাধীন স্বাধীন দিকে দিকে জাগছে বাঙালিরা/আজ রুখবে তাদের কারা’ এই গানটি অবরুদ্ধ জাতিকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল এবং আজীবন বাঙালির গৌরবের ইতিহাসের সঙ্গে মিশে থাকবে। দেশের প্রতিটি গণ-আন্দোলনে ছড়াকে হাতিয়ার করে তিনি সক্রিয় ছিলেন।

পেশাগত জীবনে আখতার হুসেন ছিলেন সাংবাদিক। দৈনিক সংবাদ, দৈনিক জনকণ্ঠ, প্রথম আলোসহ দেশের বিভিন্ন শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যমে সুনামের সাথে কাজ করেছেন। বাংলা সাহিত্যে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি ‘বাংলা একাডেমি পুরস্কার’, ‘অগ্রণী ব্যাংক-শিশু একাডেমি শিশুসাহিত্য পুরস্কার’, ‘আলাওল সাহিত্য পুরস্কার’, ‘ভাষাশহীদ আবদুল জব্বার স্মৃতি পদক’, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজনেস স্টাডিজ অনুষদ প্রদত্ত ‘মুক্তিযোদ্ধা কলম সৈনিক সম্মাননা স্মারক’, ‘মনিরউদ্দীন ইউসুফ সাহিত্য পুরস্কার’, ‘এম নুরুল কাদের শিশুসাহিত্য পুরস্কার’, ‘বজলুর রহমান স্মৃতিপদক’সহ আরও অনেক পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন। তিনি ছিলেন বাংলা একাডেমির ফেলো। ২০০৯ থেকে তিনি প্রথমা প্রকাশনের পাণ্ডুলিপি সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করে ২০২৫ সালে অবসরে যান। মফস্বলের সহজ-সরল পরিবেশে বেড়ে ওঠা এই মানুষটি সারাজীবন খুব আন্তরিক, সুহৃদ, সদা হাস্যোজ্জ্বল নির্লোভ এবং অত্যন্ত সাদামাটা ও নিরহংকার জীবনযাপন করতেন। অনেকটাই তাঁর ছড়ার মতো সহজ-সরল। তিনি যেমন শিশুতোষ সাহিত্য রচনা করতেন, তেমনি স্বভাবও ছিল তাঁর শিশুসুলভ। খ্যাতিমান হয়েও তিনি খ্যাতির মোহে পড়েননি। বরাবর বিনয়ের সঙ্গে মাথা নিচু করে চলেছেন। খুব সহজে অপরের সঙ্গে মিশে যেতে পারতেন। শিশু, তরুণ প্রজন্ম ও সহকর্মীদের প্রতিনিয়ত উৎসাহিত করতেন। অজাতশত্রু কথাটি সম্ভবত এমন মানুষদের জন্যই।

আখতার হুসেনের সাহিত্যিক জীবনের ব্যাপ্তি প্রায় ছয় দশকেরও বেশি। ছড়া, কবিতা, গল্প, নাটক, জীবনী, অনুবাদ এবং সম্পাদনা মিলিয়ে তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা শতাধিক। বাংলাদেশ শিশু একাডেমি থেকে প্রকাশিত পাঁচ খণ্ডের বিখ্যাত ‘শিশু-বিশ্বকোষ’-এ সর্বাধিকসংখ্যক লেখা বা ভুক্তি রচনার অনন্য কৃতিত্ব রয়েছে। তাঁর উল্লেখযোগ্য বইগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘সমুদ্র অনেক বড়’, ‘রামধনুকের সাঁকো’, ‘উল্টোপাল্টা’, ‘হালচাল’, ‘আমার দুটো ডানা’, ‘ও হাওয়া ও হাওয়া’, ‘পাজি বেড়ালের শাস্তি’, ‘ফ্রিডম ফাইটার’, ‘কর্ণকুসুম ও কালোপাখার প্রজাপতি’, ‘খেলাঘরের পুতুলগুলো’ ‘ছোটদের চারণ কবি মুকুন্দদাস’ ইত্যাদি।

আখতার হুসেনের সৃষ্টিশীলতার আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকে উপযোগী করে তোলার মানসিকতা। তিনি শুধু একটি নির্দিষ্ট সময়ের শিশুদের জন্য লেখেননি, নতুন প্রজন্মের বদলে যাওয়া জগতকেও সাহিত্যে ধারণ করেছেন। ‘গুগল’ নিয়ে রচিত তাঁর ছড়াটি এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আধুনিক প্রযুক্তি, ইন্টারনেট ও তথ্য অনুসন্ধানের নতুন বাস্তবতাকে তিনি শিশুসাহিত্যের বিষয় করে তুলেছেন। ফলে তাঁর রচনায় শুধু অতীতের শিশুজগতের প্রতিফলন ঘটেনি; সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে শিশুর চিন্তা, অভিজ্ঞতা ও পারিপার্শ্বিক জগতের যে রূপান্তর ঘটেছে, তাও সৃজনশীলভাবে স্থান পেয়েছে। ‘গুগলে গুগলে গুগলে!’ ছড়ায় তিনি লিখেছেন— ‘মোটেও যা নেই বইয়ে কিংবা ভূগোলে/তা-ই আছে জেনো গুগলে গুগলে গুগলে।/‘কোথায় কী কাজ করছে সরল গাধারা/ভিরমি কেনই খাচ্ছে তাদের দাদারা/সবই পাওয়া যায় ঠিকমতো সার্চ করলে।/বললে কি তুমি-মিছে কথা! বাজি ধরলে?/তুমি না একটা মূর্খ খাসির বাচ্চা/মোটাই হয়েছ, জানো না ব্যাপার সাচ্চা।’

২০২৬ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর ৮১ বছর বয়সে এই মহান ছড়াকার অনন্তলোকে গমন করেন। আখতার হুসেনের প্রয়াণ কেবল একজন প্রবীণ সাহিত্যিকের বিদায় নয়; এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের শিশুসাহিত্যের একটি দীর্ঘ ও সমৃদ্ধ অধ্যায়েরও পরিসমাপ্তি ঘটল। ছয় দশকেরও বেশি সময়ের তাঁর সাহিত্যসাধনা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, শিশুসাহিত্য কোনো খাটো বা গৌণ সাহিত্যধারা নয়; বরং একটি জাতির ভবিষ্যৎ পাঠক, নাগরিক ও সৃজনশীল মনন গঠনে এর ভূমিকা গভীর ও মৌলিক।

পরিশেষে একবাক্যে স্বীকার করে নেওয়া যায়, আখতার হুসেনের প্রস্থান দেশের শিশুসাহিত্যে এক গভীর শূন্যতার সৃষ্টি করেছে। কিন্তু তাঁর অনবদ্য সৃষ্টির মাধ্যমে তিনি চিরকাল বেঁচে থাকবেন বাঙালির ঘরে ঘরে। শিশুদের নির্মল আনন্দ দেওয়া, দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করা এবং ভাষার প্রতি মমত্ববোধ জাগিয়ে তোলার জন্য তাঁর রচনা আমাদের মাঝে আলোকবর্তিকা হয়ে থাকবে। বহু প্রজন্মের শৈশবের প্রিয় ‘ছড়া-দাদু’ তাঁর লেখার মাঝেই অমর হয়ে থাকবেন।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর ২০২৬


আখতার হুসেন: বেঁচে থাকবেন সৃষ্টির ছায়ায়

প্রকাশের তারিখ : ০১ অক্টোবর ২০২৬

featured Image


বিশিষ্ট ছড়াকার, কবি, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আখতার হুসেনের প্রয়াণে আমাদের সাহিত্যাঙ্গনে যে শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে, তা সহজে পূরণ হবার নয়। একজন আখতার হুসেন হঠাৎ করে কিংবা একদিনে তৈরি হন না। সময়ান্তরে সমাজে এমন মানুষের আবির্ভাব ঘটে, এবং অবক্ষয়িত সমাজ ও নেমে আসা অন্ধকারে তারা নিরন্তর নক্ষত্র প্রজ্বলন করেন। তিনি ছিলেন আমাদের মানস ও সাংস্কৃতিক চেতনা জাগরণের কারিগর— যা তিনি শুরু করেছিলেন শিশুতোষ সাহিত্য রচনার মাধ্যমে। পরবর্তীতে তিনি সাহিত্য-সংস্কৃতির নানা শাখায় তার সৃজনশীলতা বিস্তৃত করেন। 

সেই ছোটবেলায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ‘চয়নিকা’ বইয়ে পড়েছিলাম— ‘পারিস কি তুই শীতের ভোরে/দিঘীর জলে নাবতে? ডুবটি দিয়ে চুপটি করে/আপন মনে ভাবতে?/কি বললি, পারবি নে তুই করতে এসব কিচ্ছু/কান্না জুড়িস হঠাৎ করে কামড়ে দিলে বিচ্ছু।’ এরপর বহু বছর চলে গেছে কিন্তু এই ছড়াটি এখনো মনে আছে। আরও মনে আছে চয়নিকা বইয়েই পড়া— ‘হ্যাঁরে, খবরটা কি উড়ো?/শুনতে পেলাম নিখিলপুরের চার-চারটে বুড়ো/কাঁদেন কেবল লাগিয়ে চোখে শুকনো মরিচ গুঁড়ো,/আরে, কী বললি দূরো!/খাওয়ার সময় খায় কী জানিস? পাঁচটা রুইয়ের মুড়ো।/বয়স ওদের জানিস কতো? আটশো নাকি পুরো।/ হ্যাঁরে, খবরটা কি উড়ো?’ আরও পরে পড়েছি, ‘মা-ও বলেন— বাবা-ও বলেন/ অভিযোগের সুরে/ আমি নাকি আলসে এবং কুঁড়ে/ কাজ করি না মোটে/ মিনু যেমন করে/ সারাটা দিন ধরে...’ এমন মজার ছড়া লিখে শিশুদের মন আনন্দে ভরিয়ে দেওয়ার মানুষটির নামই আখতার হুসেন। তাঁর ছড়ার প্রধান শক্তি ছিল সহজাত ছন্দ ও স্বাভাবিকতা। শিশুরা যাতে পড়তে গিয়ে পড়াবিমুখ না হয়ে, বরং শব্দের খেলায় মেতে উঠতে পারে তাঁর ছড়াতে ছিল সেই মুন্সিয়ানা। শৈশবের সেই পাঠ-স্মৃতির আড়ালে ছিলেন এমন এক স্রষ্টা, যাঁর দীর্ঘ সাহিত্যজীবন বাংলা শিশুতোষ সাহিত্যকে নানা মাত্রায় সমৃদ্ধ করেছে।

আখতার হুসেনের জন্ম ১৯৪৫ সালের ১ নভেম্বর। তাঁর পৈতৃক নিবাস নাটোর জেলার লালপুর উপজেলার নুরুল্লাপুর গ্রামে। তাঁর পিতা টি. আই. এম. সিকান্দার রেলওয়েতে কর্মরত ছিলেন। পিতার চাকরিসূত্রে আখতার হুসেনের শৈশব ও কৈশোরের একটি উল্লেখযোগ্য সময় অতিবাহিত হয় দেশের বিভিন্ন জনপদে— খুলনা, গফরগাঁও, কুলাউড়াসহ নানা অঞ্চলে। শৈশবের বহুজনপদে বিচরণের এই বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতা তাঁকে বিচিত্র পরিবেশ, মানুষ ও জীবনযাত্রার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ করে দেয়। পরবর্তী সময়ে তাঁর সাহিত্যিক দৃষ্টিভঙ্গি, কল্পনাশক্তি ও জীবনবোধ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। প্রথম আলোর স্মৃতিচারণমূলক লেখা থেকে জানা যায়, গফরগাঁওয়ে তাঁর সাহিত্যজীবনের সূচনা এবং কুলাউড়ায় তাঁর প্রথম মুদ্রিত রচনা প্রকাশিত হয়। তাঁর প্রথম বই ‘সমুদ্র অনেক বড়’ প্রকাশিত হয় ১৯৭০ সালে। তাঁর সাহিত্যিক যাত্রার শুরু ছিল এমন এক সময়, যখন বাংলাদেশের সমাজ-সংস্কৃতি গভীর রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। ফলে তাঁর শিশু-কিশোর সাহিত্য নিছক ছোটদেরকে হাসানোর বা বিনোদন দেওয়ার সাহিত্য হয়ে থাকেনি; এর ভেতর দিয়ে তিনি জ্ঞান, কল্পনা, স্বাধীনতার চেতনা, মানবিকতা ও সামাজিক বোধের নানা বীজ ছড়িয়ে দিয়েছেন।

একটি জাতির মানসিক বিকাশ, মূল্যবোধের নির্মাণ ও দায়িত্বশীল ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গঠনে শিশুতোষ সাহিত্যের ভূমিকা অপরিসীম। সৃষ্টিশীলতার মধ্য দিয়ে এ দায়িত্ব পালনে যে ক’জন শিশুসাহিত্যিক দীর্ঘদিন নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করেছেন, আখতার হুসেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম। শিশুদের মনোজগতের প্রতি গভীর সংবেদনশীলতা তাঁর সাহিত্যকর্মের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। তাঁর শিশুতোষ সাহিত্যের প্রধান সুর গড়ে উঠেছে শিশুমনের আনন্দ, সরলতা, মানবিকতা ও নৈতিক বোধকে কেন্দ্র করে। হাসি, কৌতুক, কল্পনা ও ছন্দের প্রাণবন্ত ব্যবহারে তিনি শিশুর পরিচিত জগতকে আনন্দময় করে তুলেছেন; পাশাপাশি সত্যবাদিতা, সদাচরণ, সহমর্মিতা, দায়িত্ববোধ ও পরোপকারের মতো মূল্যবোধও তাঁর রচনায় স্বাভাবিকভাবে প্রকাশ পেয়েছে। শব্দের সুনিপুণ প্রয়োগ ও সহজ-সাবলীল ভাষা তাঁর লেখাকে যেমন শিশুর কাছে আকর্ষণীয় করেছে, তেমনি তাদের কল্পনাশক্তি ও মানবিক চেতনার বিকাশেও ভূমিকা রেখেছে।

অনেকের লেখাতেই উপদেশ খুঁজে পাওয়া যায়, কিন্তু উপদেশ প্রদানের উদ্দেশ্য নিয়ে কবিতা লেখার চেষ্টা যাঁরা করেছেন, তাঁদের মধ্যে আখতার হুসেনের নামই বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বাংলা সাহিত্যে উপদেশমূলক কবিতার ধারায় ষাটের দশকের অন্যতম কবি ও শিশুসাহিত্যিক আখতার হুসেনের অবদান অনন্য। এই ধারার চর্চাকে বেগবান করতে তিনি সম্পাদনা করেছেন ‘বাংলাসাহিত্যের সেরা উপদেশমূলক কবিতা’ ও ‘বাংলাসাহিত্যের সেরা গল্পভিত্তিক উপদেশমূলক কবিতা’— শিরোনামের দুটো গ্রন্থ। শিশুমনস্তত্ত্বের গভীর অনুধাবন থেকে আগামীর প্রজন্মকে নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধের পথে পরিচালিত করার প্রয়াসেই আখতার হুসেন রচনা করেছেন উপদেশমূলক কবিতার অনন্য সংকলন ‘সারাদিন আমি যেন ভালো হয়ে চলি’। গ্রন্থটির মূল লক্ষ্য শিশু-কিশোরদের মানসিক ও নৈতিক বিকাশে সহায়তা করা হলেও এর অন্তর্নিহিত জীবনবোধ ও নীতিচেতনা বয়সের সীমা অতিক্রম করেছে। ফলে গ্রন্থটি শুধু শিশু-কিশোরদের জন্য শিক্ষণীয় নয়, বরং প্রাপ্তবয়স্ক পাঠকের মননকেও ভাবনার খোরাক জোগায়।

আখতার হুসেনের সাহিত্যচেতনায় দেশপ্রেম একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে আছে। বাংলাদেশ, মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা ও দেশের মানুষের প্রতি ভালোবাসা তাঁর বিভিন্ন রচনায় প্রকাশিত হয়েছে। একই সঙ্গে প্রকৃতি, পশুপাখি ও পরিবেশের প্রতি মমত্ববোধ তাঁর শিশুতোষ সাহিত্যকে করেছে আরও জীবনঘনিষ্ঠ। অন্যায়, অসুন্দর ও অনৈতিকতার বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান শিশু-কিশোর মনে ন্যায়বোধ এবং সুন্দর সমাজের আকাঙ্ক্ষা জাগিয়ে তোলে। আনন্দ ও শিক্ষার এই সমন্বয় তাঁর সাহিত্যকে নিছক বিনোদনের গণ্ডি অতিক্রম করে শিশুর মানসিক ও নৈতিক বিকাশের সহায়ক করে তুলেছে। সহজ ভাষা, ছন্দোময় প্রকাশভঙ্গি এবং জীবনঘনিষ্ঠ বিষয়বস্তুর কারণে আখতার হুসেনের সাহিত্য বাংলা শিশুতোষ সাহিত্যের ভাণ্ডারে একটি স্বতন্ত্র ও মূল্যবান সংযোজন। তাঁর সাহিত্য শিশু-কিশোরদের মনের আনন্দ ও বিকাশের সঙ্গে মানবিক মূল্যবোধের যোগসূত্র নির্মাণকারী এক স্বতন্ত্র সাহিত্যিক প্রয়াস।

তাঁর রচনা কেবল কল্পনার আনন্দে সীমাবদ্ধ নয়; এর মর্মমূলে রয়েছে গভীর সমাজচেতনা, মানবিক মূল্যবোধ ও দায়িত্ববোধ। শিশুমনের স্বাভাবিক প্রবণতা ও মনস্তত্ত্বকে উপলব্ধি করে সহজ-সরল ভাষা, ছন্দোময় প্রকাশভঙ্গি ও সুনিপুণ শব্দচয়নের মাধ্যমে তিনি শিশুদের নৈতিকতা, মানবিকতা ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করেছেন। ষাট ও সত্তরের দশক থেকে স্বাধীন বাংলাদেশের পরবর্তী সময় পর্যন্ত প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক পরিসরে ছড়াকার হিসেবে তাঁর সক্রিয় ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি নবীন লেখকদের উৎসাহিত করা, তাঁদের পথনির্দেশ দেওয়া এবং সম্পাদনার ক্ষেত্রেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। শিশুমনে মুক্তচিন্তা, মানবিকতা ও দেশপ্রেমের বীজ বপনের মধ্য দিয়ে আলোকিত প্রজন্ম গঠনে তাঁর দীর্ঘ সাহিত্যযাত্রা বাংলা শিশুতোষ সাহিত্যের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

শুধু লেখক হিসেবেই নয়, সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সঙ্গেও আখতার হুসেনের ছিল গভীর ও সক্রিয় সম্পৃক্ততা। তিনি বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্যদের অন্যতম এবং সংগঠনটির প্রাথমিক পর্বের বেশ কয়েকটি নাটক রচনা ও নির্দেশনা দিয়েছেন। প্রগতিশীল উদার অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বলীয়ান শিশুদের জন্য কাজ করেছেন ‘কেন্দ্রীয় খেলাঘর আসরে’র মাধ্যমে। তাঁর সৃজনশীল প্রতিভার স্বাক্ষর রয়েছে সংগঠনগুলোর সংগীতেও। খেলাঘরের সংগঠনসংগীত ‘আমরা তো সৈনিক, শান্তির সৈনিক’ এবং ছাত্র ইউনিয়নের সাংগঠনিক সংগীত ‘আমরা তো ঐক্যের দৃঢ় বলে বলীয়ান, শোষণের কারাগার ভাঙবই’ তাঁরই রচনা। এসব গান ও নাটকে তাঁর সাহিত্যচেতনা ও সমাজমনস্কতার পরিচয় মেলে। সারা দেশের শিশু-কিশোরদের গড়ে তুলতে চেয়েছেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনায়। শিশু-কিশোরদের সাহিত্য-সংস্কৃতিচর্চায় উদ্বুদ্ধ করেছেন। তিনি শিশু সাহিত্যচর্চাকেও উৎসাহিত করেছেন। তিনি শিশুকে শুধু ‘ভালো ছেলে’ হওয়ার উপদেশ দেননি; বরং সাহিত্য, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সমাজের সঙ্গে তার সম্পর্ক তৈরি করার চেষ্টা করেছেন। এই জায়গায় তাঁর শিশুসাহিত্য এক ধরনের সাংস্কৃতিক শিক্ষার ভূমিকা পালন করেছে।

প্রগতিশীল অসাম্প্রদায়িক চেতনার অধিকারী আখতার হুসেনের জীবন ও সাহিত্যকর্মের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় মুক্তিযুদ্ধ। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোতে তাঁর কলম হয়ে উঠেছিল অনন্য এক অস্ত্র। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত তাঁর লেখা এবং অজিত রায়ের সুরে তিমির নন্দীর কণ্ঠে সেই উদ্দীপনামূলক গান— ‘স্বাধীন স্বাধীন দিকে দিকে জাগছে বাঙালিরা/আজ রুখবে তাদের কারা’ এই গানটি অবরুদ্ধ জাতিকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল এবং আজীবন বাঙালির গৌরবের ইতিহাসের সঙ্গে মিশে থাকবে। দেশের প্রতিটি গণ-আন্দোলনে ছড়াকে হাতিয়ার করে তিনি সক্রিয় ছিলেন।

পেশাগত জীবনে আখতার হুসেন ছিলেন সাংবাদিক। দৈনিক সংবাদ, দৈনিক জনকণ্ঠ, প্রথম আলোসহ দেশের বিভিন্ন শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যমে সুনামের সাথে কাজ করেছেন। বাংলা সাহিত্যে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি ‘বাংলা একাডেমি পুরস্কার’, ‘অগ্রণী ব্যাংক-শিশু একাডেমি শিশুসাহিত্য পুরস্কার’, ‘আলাওল সাহিত্য পুরস্কার’, ‘ভাষাশহীদ আবদুল জব্বার স্মৃতি পদক’, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজনেস স্টাডিজ অনুষদ প্রদত্ত ‘মুক্তিযোদ্ধা কলম সৈনিক সম্মাননা স্মারক’, ‘মনিরউদ্দীন ইউসুফ সাহিত্য পুরস্কার’, ‘এম নুরুল কাদের শিশুসাহিত্য পুরস্কার’, ‘বজলুর রহমান স্মৃতিপদক’সহ আরও অনেক পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন। তিনি ছিলেন বাংলা একাডেমির ফেলো। ২০০৯ থেকে তিনি প্রথমা প্রকাশনের পাণ্ডুলিপি সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করে ২০২৫ সালে অবসরে যান। মফস্বলের সহজ-সরল পরিবেশে বেড়ে ওঠা এই মানুষটি সারাজীবন খুব আন্তরিক, সুহৃদ, সদা হাস্যোজ্জ্বল নির্লোভ এবং অত্যন্ত সাদামাটা ও নিরহংকার জীবনযাপন করতেন। অনেকটাই তাঁর ছড়ার মতো সহজ-সরল। তিনি যেমন শিশুতোষ সাহিত্য রচনা করতেন, তেমনি স্বভাবও ছিল তাঁর শিশুসুলভ। খ্যাতিমান হয়েও তিনি খ্যাতির মোহে পড়েননি। বরাবর বিনয়ের সঙ্গে মাথা নিচু করে চলেছেন। খুব সহজে অপরের সঙ্গে মিশে যেতে পারতেন। শিশু, তরুণ প্রজন্ম ও সহকর্মীদের প্রতিনিয়ত উৎসাহিত করতেন। অজাতশত্রু কথাটি সম্ভবত এমন মানুষদের জন্যই।

আখতার হুসেনের সাহিত্যিক জীবনের ব্যাপ্তি প্রায় ছয় দশকেরও বেশি। ছড়া, কবিতা, গল্প, নাটক, জীবনী, অনুবাদ এবং সম্পাদনা মিলিয়ে তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা শতাধিক। বাংলাদেশ শিশু একাডেমি থেকে প্রকাশিত পাঁচ খণ্ডের বিখ্যাত ‘শিশু-বিশ্বকোষ’-এ সর্বাধিকসংখ্যক লেখা বা ভুক্তি রচনার অনন্য কৃতিত্ব রয়েছে। তাঁর উল্লেখযোগ্য বইগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘সমুদ্র অনেক বড়’, ‘রামধনুকের সাঁকো’, ‘উল্টোপাল্টা’, ‘হালচাল’, ‘আমার দুটো ডানা’, ‘ও হাওয়া ও হাওয়া’, ‘পাজি বেড়ালের শাস্তি’, ‘ফ্রিডম ফাইটার’, ‘কর্ণকুসুম ও কালোপাখার প্রজাপতি’, ‘খেলাঘরের পুতুলগুলো’ ‘ছোটদের চারণ কবি মুকুন্দদাস’ ইত্যাদি।

আখতার হুসেনের সৃষ্টিশীলতার আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকে উপযোগী করে তোলার মানসিকতা। তিনি শুধু একটি নির্দিষ্ট সময়ের শিশুদের জন্য লেখেননি, নতুন প্রজন্মের বদলে যাওয়া জগতকেও সাহিত্যে ধারণ করেছেন। ‘গুগল’ নিয়ে রচিত তাঁর ছড়াটি এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আধুনিক প্রযুক্তি, ইন্টারনেট ও তথ্য অনুসন্ধানের নতুন বাস্তবতাকে তিনি শিশুসাহিত্যের বিষয় করে তুলেছেন। ফলে তাঁর রচনায় শুধু অতীতের শিশুজগতের প্রতিফলন ঘটেনি; সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে শিশুর চিন্তা, অভিজ্ঞতা ও পারিপার্শ্বিক জগতের যে রূপান্তর ঘটেছে, তাও সৃজনশীলভাবে স্থান পেয়েছে। ‘গুগলে গুগলে গুগলে!’ ছড়ায় তিনি লিখেছেন— ‘মোটেও যা নেই বইয়ে কিংবা ভূগোলে/তা-ই আছে জেনো গুগলে গুগলে গুগলে।/‘কোথায় কী কাজ করছে সরল গাধারা/ভিরমি কেনই খাচ্ছে তাদের দাদারা/সবই পাওয়া যায় ঠিকমতো সার্চ করলে।/বললে কি তুমি-মিছে কথা! বাজি ধরলে?/তুমি না একটা মূর্খ খাসির বাচ্চা/মোটাই হয়েছ, জানো না ব্যাপার সাচ্চা।’

২০২৬ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর ৮১ বছর বয়সে এই মহান ছড়াকার অনন্তলোকে গমন করেন। আখতার হুসেনের প্রয়াণ কেবল একজন প্রবীণ সাহিত্যিকের বিদায় নয়; এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের শিশুসাহিত্যের একটি দীর্ঘ ও সমৃদ্ধ অধ্যায়েরও পরিসমাপ্তি ঘটল। ছয় দশকেরও বেশি সময়ের তাঁর সাহিত্যসাধনা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, শিশুসাহিত্য কোনো খাটো বা গৌণ সাহিত্যধারা নয়; বরং একটি জাতির ভবিষ্যৎ পাঠক, নাগরিক ও সৃজনশীল মনন গঠনে এর ভূমিকা গভীর ও মৌলিক।

পরিশেষে একবাক্যে স্বীকার করে নেওয়া যায়, আখতার হুসেনের প্রস্থান দেশের শিশুসাহিত্যে এক গভীর শূন্যতার সৃষ্টি করেছে। কিন্তু তাঁর অনবদ্য সৃষ্টির মাধ্যমে তিনি চিরকাল বেঁচে থাকবেন বাঙালির ঘরে ঘরে। শিশুদের নির্মল আনন্দ দেওয়া, দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করা এবং ভাষার প্রতি মমত্ববোধ জাগিয়ে তোলার জন্য তাঁর রচনা আমাদের মাঝে আলোকবর্তিকা হয়ে থাকবে। বহু প্রজন্মের শৈশবের প্রিয় ‘ছড়া-দাদু’ তাঁর লেখার মাঝেই অমর হয়ে থাকবেন।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত