সরকারি সেবায় পুরোনো ও দুর্বল ব্যবস্থা টিকিয়ে রেখে শুধু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) যুক্ত করলে মানুষের আস্থা তৈরি হবে না। এআই ব্যবহারের আগে সিস্টেম সংস্কার, স্থানীয় ও মানসম্মত তথ্য নিশ্চিত করা এবং তথ্য ব্যবহারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ব্যবস্থা করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র বা চীনে তৈরি এআই মডেল যে তথ্যের ওপর প্রশিক্ষিত, অন্য দেশে ব্যবহারের ক্ষেত্রে সেই তথ্য বর্তমান স্থানীয় পরিস্থিতিকে প্রতিফলিত করছে কি না, সেটিও দেখতে হবে। এছাড়া, এআই কীভাবে ও কোন উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হবে, সে বিষয়ে নাগরিকদের অংশগ্রহণও গুরুত্বপূর্ণ।
সোমবার (৫ অক্টোবর) ঢাকায় প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন (বিওবিসি) ২০২৬’-এর এক অধিবেশনে বিভিন্ন দেশের বিশেষজ্ঞরা এ কথা বলেন। অধিবেশনের শিরোনাম ছিল ‘ক্যান অ্যালগরিদমস বিল্ড ট্রাস্ট? রিথিংকিং স্টেট ক্যাপাসিটি ইন দ্য এজ অব এআই’। তিন দিনব্যাপী এই আন্তর্জাতিক সম্মেলন সোমবার শেষ হয়।
অধিবেশনে অর্থনীতিবিদ ও এআই গবেষক শিমেলসে মেকোনেন এআই ব্যবহারে স্থানীয় বাস্তবতা ও তথ্যের গুরুত্বের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বা চীনে তৈরি এআই মডেল অন্য দেশে ব্যবহার করা গেলেও স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। মডেল যে তথ্যের ওপর প্রশিক্ষিত, সেই তথ্য বর্তমান স্থানীয় পরিস্থিতিকে প্রতিফলিত করছে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। এআইয়ের ভুলের ঝুঁকি বিবেচনা করে শুরুতে তুলনামূলক কম ঝুঁকির সরকারি সেবায় এ প্রযুক্তি ব্যবহারের পরামর্শও দেন তিনি।
অ্যাকাউন্টেবিলিটি ল্যাব পাকিস্তানের নির্বাহী পরিচালক ফাইয়াজ ইয়াসিন বলেন, সরকার ও জনগণের মধ্যে আগে থেকেই আস্থার বড় ঘাটতি রয়েছে। এই অবস্থায় এআই সমস্যা সমাধানের প্রক্রিয়াকে দ্রুত করবে, নাকি আরও ১০-১৫ বছর সমস্যা সমাধান না করার অজুহাত হয়ে উঠবে, সেই প্রশ্ন এখন গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, এআই ব্যবহারের আগে সরকারকে বুঝতে হবে, তারা এই প্রযুক্তির কাছ থেকে কী চায়। একই সঙ্গে সরকারি কর্মকর্তা, আমলাতন্ত্র ও সাধারণ মানুষকেও এআই ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত করতে হবে।
নিজ দেশ পাকিস্তানের উদাহরণ টেনে ফাইয়াজ ইয়াসিন বলেন, “সেখানে এখনো অধিকাংশ সরকারি সিদ্ধান্ত তথ্যভিত্তিক নয়। অথচ এআই কার্যকর করতে হলে আগে পর্যাপ্ত ও মানসম্মত তথ্য দরকার।”
সোনালী লাইফ ইনস্যুরেন্স বাংলাদেশের পরিচালক শেখ মোহাম্মদ দানিয়াল বলেন, বিশ্বের সবচেয়ে ভালো ডিজিটাল ব্যবস্থা তৈরি করেও লাভ হবে না, যদি সেই ব্যবস্থার পেছনের সিস্টেম পরিবর্তন করা না হয়। সরকারি সেবার উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, “সরকারি সেবায় প্রচলিত ব্যবস্থায় ফাইল এগিয়ে নিতে ঘুষ দেওয়ার সুযোগ থাকলে ডিজিটাল ব্যবস্থা করেও মানুষের আস্থা তৈরি করা যাবে না।”
সোলশেয়ারের প্রধান নির্বাহী ও সহপ্রতিষ্ঠাতা সেবাস্তিয়ান গ্রোহের মতে, মানুষকে সম্পৃক্ত না করে অ্যালগরিদমের ওপর আস্থা তৈরি কঠিন। তিনি বলেন, যাদের জন্য অ্যালগরিদম কাজ করবে, সেটি তৈরির সময় তাদের তথ্য ও মতামত নিতে হবে। প্রযুক্তি কীভাবে মানুষের কাজে লাগছে, সেটি তাদের বুঝতে দিতে হবে। অ্যালগরিদমের সিদ্ধান্তে সমস্যা হলে অভিযোগ বা প্রতিকারের সুযোগও রাখতে হবে।
মানুষের কাছে প্রযুক্তির উপকার দৃশ্যমান না হলে শুধু প্রযুক্তির ওপর আস্থা তৈরি হবে না বলে মনে করেন তিনি।
অ্যাকাউন্টেবিলিটি ল্যাব নেপালের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক পরিচালক নারায়ণ অধিকারী বলেন, প্রযুক্তি ব্যবহারে শুধু নতুন ব্যবস্থা তৈরি করাই যথেষ্ট নয়। তার মতে, প্রযুক্তি মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাচ্ছে কি না, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। আস্থা তৈরির জন্য শুধু ‘মেশিন মাইন্ডসেট’ দিয়ে কাজ না করে মানুষ, প্রতিষ্ঠান ও পারস্পরিক সহযোগিতাকে গুরুত্ব দিয়ে ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। অ্যালগরিদম কীভাবে মানুষের মতামত ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণকে প্রভাবিত করতে পারে, সে বিষয়টিও অধিবেশনের আলোচনায় উঠে আসে।
সিটি ইউনিভার্সিটি অব হংকংয়ের সহযোগী অধ্যাপক মার্কো স্কোরিক বলেন, অ্যালগরিদমের অতিরিক্ত বাছাইয়ের কারণে মানুষ একই ধরনের বিষয় বারবার দেখতে থাকে। ফলে ভিন্নমতের মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ কমে যায়। এভাবে মানুষ ক্রমে ভিন্নমতের মানুষের সঙ্গে কথা বলতেও অনাগ্রহী হয়ে উঠতে পারে। এতে সামাজিক ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণের পাশাপাশি মানুষের মধ্যে আস্থার সংকটও বাড়তে পারে।
ভারতের স্টারকার গ্লোবাল সলিউশন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জে পি সিং এআই ও ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে সংগৃহীত তথ্যের অপব্যবহারের ঝুঁকির কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ভালো উদ্দেশ্যে তৈরি করা কোনো প্রযুক্তি পরে নজরদারি বা অন্য কাজে ব্যবহার হতে পারে। ভারতে শহরের নিরাপত্তার জন্য স্থাপন করা সিসিটিভি ক্যামেরার উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, একটি শহরে বিক্ষোভের সময় ওই ব্যবস্থার মাধ্যমে বিক্ষোভকারীদের শনাক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছিল। অথচ শুরুতে ব্যবস্থাটি তৈরির উদ্দেশ্য ছিল চুরি বা দুর্যোগের মতো ঘটনা মোকাবিলা করা।
শপ আপ বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট মামুন রশীদের সঞ্চালনায় অধিবেশনে আরও বক্তব্য রাখেন ভারতীয় নীতি পরামর্শক সুবিমল ভট্টাচার্য।

সোমবার, ০৫ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৫ অক্টোবর ২০২৬
সরকারি সেবায় পুরোনো ও দুর্বল ব্যবস্থা টিকিয়ে রেখে শুধু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) যুক্ত করলে মানুষের আস্থা তৈরি হবে না। এআই ব্যবহারের আগে সিস্টেম সংস্কার, স্থানীয় ও মানসম্মত তথ্য নিশ্চিত করা এবং তথ্য ব্যবহারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ব্যবস্থা করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র বা চীনে তৈরি এআই মডেল যে তথ্যের ওপর প্রশিক্ষিত, অন্য দেশে ব্যবহারের ক্ষেত্রে সেই তথ্য বর্তমান স্থানীয় পরিস্থিতিকে প্রতিফলিত করছে কি না, সেটিও দেখতে হবে। এছাড়া, এআই কীভাবে ও কোন উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হবে, সে বিষয়ে নাগরিকদের অংশগ্রহণও গুরুত্বপূর্ণ।
সোমবার (৫ অক্টোবর) ঢাকায় প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন (বিওবিসি) ২০২৬’-এর এক অধিবেশনে বিভিন্ন দেশের বিশেষজ্ঞরা এ কথা বলেন। অধিবেশনের শিরোনাম ছিল ‘ক্যান অ্যালগরিদমস বিল্ড ট্রাস্ট? রিথিংকিং স্টেট ক্যাপাসিটি ইন দ্য এজ অব এআই’। তিন দিনব্যাপী এই আন্তর্জাতিক সম্মেলন সোমবার শেষ হয়।
অধিবেশনে অর্থনীতিবিদ ও এআই গবেষক শিমেলসে মেকোনেন এআই ব্যবহারে স্থানীয় বাস্তবতা ও তথ্যের গুরুত্বের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বা চীনে তৈরি এআই মডেল অন্য দেশে ব্যবহার করা গেলেও স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। মডেল যে তথ্যের ওপর প্রশিক্ষিত, সেই তথ্য বর্তমান স্থানীয় পরিস্থিতিকে প্রতিফলিত করছে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। এআইয়ের ভুলের ঝুঁকি বিবেচনা করে শুরুতে তুলনামূলক কম ঝুঁকির সরকারি সেবায় এ প্রযুক্তি ব্যবহারের পরামর্শও দেন তিনি।
অ্যাকাউন্টেবিলিটি ল্যাব পাকিস্তানের নির্বাহী পরিচালক ফাইয়াজ ইয়াসিন বলেন, সরকার ও জনগণের মধ্যে আগে থেকেই আস্থার বড় ঘাটতি রয়েছে। এই অবস্থায় এআই সমস্যা সমাধানের প্রক্রিয়াকে দ্রুত করবে, নাকি আরও ১০-১৫ বছর সমস্যা সমাধান না করার অজুহাত হয়ে উঠবে, সেই প্রশ্ন এখন গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, এআই ব্যবহারের আগে সরকারকে বুঝতে হবে, তারা এই প্রযুক্তির কাছ থেকে কী চায়। একই সঙ্গে সরকারি কর্মকর্তা, আমলাতন্ত্র ও সাধারণ মানুষকেও এআই ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত করতে হবে।
নিজ দেশ পাকিস্তানের উদাহরণ টেনে ফাইয়াজ ইয়াসিন বলেন, “সেখানে এখনো অধিকাংশ সরকারি সিদ্ধান্ত তথ্যভিত্তিক নয়। অথচ এআই কার্যকর করতে হলে আগে পর্যাপ্ত ও মানসম্মত তথ্য দরকার।”
সোনালী লাইফ ইনস্যুরেন্স বাংলাদেশের পরিচালক শেখ মোহাম্মদ দানিয়াল বলেন, বিশ্বের সবচেয়ে ভালো ডিজিটাল ব্যবস্থা তৈরি করেও লাভ হবে না, যদি সেই ব্যবস্থার পেছনের সিস্টেম পরিবর্তন করা না হয়। সরকারি সেবার উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, “সরকারি সেবায় প্রচলিত ব্যবস্থায় ফাইল এগিয়ে নিতে ঘুষ দেওয়ার সুযোগ থাকলে ডিজিটাল ব্যবস্থা করেও মানুষের আস্থা তৈরি করা যাবে না।”
সোলশেয়ারের প্রধান নির্বাহী ও সহপ্রতিষ্ঠাতা সেবাস্তিয়ান গ্রোহের মতে, মানুষকে সম্পৃক্ত না করে অ্যালগরিদমের ওপর আস্থা তৈরি কঠিন। তিনি বলেন, যাদের জন্য অ্যালগরিদম কাজ করবে, সেটি তৈরির সময় তাদের তথ্য ও মতামত নিতে হবে। প্রযুক্তি কীভাবে মানুষের কাজে লাগছে, সেটি তাদের বুঝতে দিতে হবে। অ্যালগরিদমের সিদ্ধান্তে সমস্যা হলে অভিযোগ বা প্রতিকারের সুযোগও রাখতে হবে।
মানুষের কাছে প্রযুক্তির উপকার দৃশ্যমান না হলে শুধু প্রযুক্তির ওপর আস্থা তৈরি হবে না বলে মনে করেন তিনি।
অ্যাকাউন্টেবিলিটি ল্যাব নেপালের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক পরিচালক নারায়ণ অধিকারী বলেন, প্রযুক্তি ব্যবহারে শুধু নতুন ব্যবস্থা তৈরি করাই যথেষ্ট নয়। তার মতে, প্রযুক্তি মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাচ্ছে কি না, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। আস্থা তৈরির জন্য শুধু ‘মেশিন মাইন্ডসেট’ দিয়ে কাজ না করে মানুষ, প্রতিষ্ঠান ও পারস্পরিক সহযোগিতাকে গুরুত্ব দিয়ে ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। অ্যালগরিদম কীভাবে মানুষের মতামত ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণকে প্রভাবিত করতে পারে, সে বিষয়টিও অধিবেশনের আলোচনায় উঠে আসে।
সিটি ইউনিভার্সিটি অব হংকংয়ের সহযোগী অধ্যাপক মার্কো স্কোরিক বলেন, অ্যালগরিদমের অতিরিক্ত বাছাইয়ের কারণে মানুষ একই ধরনের বিষয় বারবার দেখতে থাকে। ফলে ভিন্নমতের মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ কমে যায়। এভাবে মানুষ ক্রমে ভিন্নমতের মানুষের সঙ্গে কথা বলতেও অনাগ্রহী হয়ে উঠতে পারে। এতে সামাজিক ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণের পাশাপাশি মানুষের মধ্যে আস্থার সংকটও বাড়তে পারে।
ভারতের স্টারকার গ্লোবাল সলিউশন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জে পি সিং এআই ও ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে সংগৃহীত তথ্যের অপব্যবহারের ঝুঁকির কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ভালো উদ্দেশ্যে তৈরি করা কোনো প্রযুক্তি পরে নজরদারি বা অন্য কাজে ব্যবহার হতে পারে। ভারতে শহরের নিরাপত্তার জন্য স্থাপন করা সিসিটিভি ক্যামেরার উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, একটি শহরে বিক্ষোভের সময় ওই ব্যবস্থার মাধ্যমে বিক্ষোভকারীদের শনাক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছিল। অথচ শুরুতে ব্যবস্থাটি তৈরির উদ্দেশ্য ছিল চুরি বা দুর্যোগের মতো ঘটনা মোকাবিলা করা।
শপ আপ বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট মামুন রশীদের সঞ্চালনায় অধিবেশনে আরও বক্তব্য রাখেন ভারতীয় নীতি পরামর্শক সুবিমল ভট্টাচার্য।

আপনার মতামত লিখুন