সংবাদ

বিপন্ন টাঙ্গাইলের তাঁতশিল্প, ৭৫ হাজার কারখানা বন্ধ


জাহাঙ্গীর আলম, টাঙ্গাইল
জাহাঙ্গীর আলম, টাঙ্গাইল
প্রকাশ: ৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৩৯ পিএম

বিপন্ন টাঙ্গাইলের তাঁতশিল্প, ৭৫ হাজার কারখানা বন্ধ
তাঁতে শাড়ির কাজ করছেন এক কারিগর। ছবি: সংবাদ।

ঐতিহ্যবাহী শিল্পে পড়েছে ভাটা: বাজারে শাড়ির দাম নেই; চরম হতাশায় প্রান্তিক কারিগররা 

সুতার অগ্নিমূল্য, কাঁচামালের ঊর্ধ্বগতি, যান্ত্রিক পাওয়ার লুমের আগ্রাসন এবং সুদূরপ্রসারী বাজার ব্যবস্থাপনার অভাবে তীব্র অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে টাঙ্গাইলের বিশ্বখ্যাত ও ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্প। হাড়ভাঙা পরিশ্রমের পরও উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য ও উপযুক্ত পারিশ্রমিক না পেয়ে চরম হতাশায় নিমজ্জিত হচ্ছেন এই শিল্পের মূল কারিগররা। জীবন-জীবিকার রূঢ় বাস্তবতায় বাধ্য হয়ে বহু দক্ষ তাঁতি তাদের পূর্বপুরুষের এই সুপ্রাচীন পেশা ত্যাগ করছেন।

সরকার প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নতুন কারিগর তৈরি করে এই শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করার স্বপ্ন দেখালেও, মাঠপর্যায়ের কঠোর বাস্তবতার কারণে প্রান্তিক তাঁতিদের মনে কোনো আশার আলো জাগছে না।

প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, এক সময় টাঙ্গাইল জেলা জুড়ে লক্ষাধিক তাঁত সচল থাকলেও বর্তমানে প্রায় ৭৫ হাজার তাঁত কারখানা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। ঐতিহ্যবাহী টাঙ্গাইল শাড়ি উৎপাদনের সচল তাঁতের সংখ্যা বর্তমানে ২০ হাজারেরও নিচে নেমে এসেছে। বাজারজাত করণের সঠিক নীতিমালার অভাব এবং ধারাবাহিক লোকসানের আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরাও এই শিল্পে নতুন করে পুঁজি বিনিয়োগে সাহস পাচ্ছেন না।

টাঙ্গাইলের কারিগররা মূলত দু’ধরনের ঐতিহ্যবাহী তাঁত ব্যবহার করে শাড়ির জমিনে নান্দনিকতা ফুটিয়ে তোলেন- চিত্তরঞ্জন (মিহি) তাঁত এবং পিটলুম (খটখটি) তাঁত। এই দু’ধরনের তাঁতেই সূক্ষ্ম সুতার বুননে তৈরি হয় বৈচিত্র্যময় ডিজাইন ও নজরকাড়া সব নামের শাড়ি। যার মধ্যে রয়েছে- জামদানী বা সফ্ট সিল্ক, হাফ সিল্ক, টাঙ্গাইল বি.টি, বালুচরি, জরিপাড়, হাজারবুটি, সূতিপাড়, কটকি, স্বর্ণচুড়, ইককাত, আনারকলি, দেবদাস, কুমকুম, সানন্দা, নীলাম্বরী ও ময়ূরকণ্ঠীসহ বিভিন্ন সাধারণ মানের শাড়ি।

শাড়ির গুণগত মান, জমিনের রঙবিন্যাস এবং হাতের কাজের সূক্ষ্মতার ওপর ভিত্তি করে এর মূল্যে রয়েছে ব্যাপক তারতম্য। বাজারে প্রকারভেদে একেকটি শাড়ি সর্বনিম্ন ৪০০ টাকা থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ৩৫ হাজার টাকা পর্যন্ত মূল্যে কেনাবেচা হয়ে থাকে।

বর্তমানে টাঙ্গাইলের সীমিত কিছু এলাকায় এই প্রাচীন শিল্পটি কোনোমতে টিকে রয়েছে। এর মধ্যে শাড়ি উৎপাদনের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত- বাজিতপুর, পাথরাইল, নলসন্দা, চন্ডি, বিষ্ণুপুর ও বিন্নাফৈর গ্রাম। এছাড়া কালিহাতী উপজেলার বল্লা, রামপুর, মমিননগর ও ছাতিহাটিসহ কয়েকটি গ্রাম এখনো টাঙ্গাইল শাড়ির প্রধান তাঁতপল্লী হিসেবে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে যুদ্ধ করে যাচ্ছে।

স্থানীয় তাঁতশিল্পীদের অভিযোগ, সুতা ও রঙের মূল্য অনিয়ন্ত্রিতভাবে বাড়লেও শাড়ির পাইকারি মূল্য সেই অনুপাতে বৃদ্ধি পায়নি। ফলে তাঁত মালিকদের পক্ষে শ্রমিকদের উপযুক্ত মজুরি দেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বর্তমান দ্রব্যমূল্যের বাজারে এই যৎসামান্য পারিশ্রমিক দিয়ে সংসার চালানো দুষ্কর হওয়ায় দক্ষ কারিগররা পেশা পরিবর্তন করতে বাধ্য হচ্ছেন।

সংশ্লিষ্টদের মতে, কেবল সরকারি প্রশিক্ষণ দিয়ে এই শিল্পের সুদিন ফেরানো সম্ভব নয় বরং সুতা সহ কাঁচামালের দাম প্রান্তিক তাঁতিদের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আনা, পাওয়ার লুমের আগ্রাসন রোধ করা এবং উৎপাদকদের সরাসরি বাজার সুবিধা নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায়, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে বাঙালির হাজার বছরের এই সাংস্কৃতিক স্মারকটি অচিরেই বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তাঁতে কাজ করছেন এক কারিগর।

তাঁত মালিকরা অভিযোগ করেছেন, উৎপাদন খরচ দিন দিন বাড়ছে, কিন্তু বাজারে শাড়ির কাঙ্ক্ষিত দাম পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে চলার মতো অবস্থা নেই। অনেক তাঁত শ্রমিকই মজুরি ঠিকমতো পাচ্ছেন না- যা পরিবারের জীবনযাত্রাকে প্রভাবিত করছে।

তাঁত শ্রমিক শুকুর মাহমুদ, চান মিয়া, সাইফুলসহ অনেকেই জানান, দুই থেকে আড়াই দিন পরিশ্রম করে একটি শাড়ি তৈরি করলে ৭০০-১০০০ টাকা মজুরি পাওয়া যায়। এতো স্বল্প মজুরিতে সংসার চালানো দূরূহ। ফলে তাঁতশ্রমিকরা ভিন্ন পেশায় চলে যাচ্ছে। অথচ একজন তাঁতশ্রমিককে কাপড় বুনানো শিখতে ৩-৪ মাস সময় লাগে। যেভাবে শ্রমিকরা অন্য পেশায় চলে যাচ্ছে, তাতে আগামি ২-৩ বছরের মধ্যে তাঁতশিল্পে চরম শ্রমিক সংকট দেখা দিবে। শুধুমাত্র মজুরি কম থাকার কারণে অনেকেই এ পেশা ছেড়ে দিচ্ছেন।

টাঙ্গাইল সদর উপজেলার ছিলিমপুর গ্রামের তাঁত ফ্যাক্টরির মালিক আমজাদ হোসেন জানান, তার ফ্যাক্টরিতে ২০টি তাঁত ছিল। কাঁচামালের ঊর্ধ্বগতি, তৈরি কাপড় বিক্রি করতে না পারা ও শ্রমিক সংকটসহ নানা কারণে সম্প্রতি ফ্যাক্টরিটি বন্ধ হয়ে গেছে। ইতোমধ্যে লোকসানের বোঝা টানতে টানতে তিনি ২০ লাখ টাকা ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। বর্তমানে তিনি টাঙ্গাইল শহরের ‘জয় মা লক্ষ্মী ভান্ডার’ নামক তাঁতের শাড়ির দোকানে শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন। 

শিল্পটির করুণ অবস্থার বাস্তব চিত্র উঠে আসে টাঙ্গাইল শাড়ি ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি রঘুনাথ বসাকের কথায়। তিনি বলেন, ২০১৫ সালে পাথরাইল এলাকায় প্রায় পাঁচ হাজার তাঁতিপরিবার থাকলেও বর্তমানে তা কমে ৪০০-৪৫০টিতে দাঁড়িয়েছে। জেলার প্রায় ৬০ শতাংশ তাঁতি এরই মধ্যে এই শিল্প থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। রপ্তানি বাণিজ্যেও বড় ধাক্কা লেগেছে। আগে স্থলপথে একদিনে প্রতিবেশী দেশে শাড়ি পৌঁছলেও এখন সময় লাগছে এক থেকে দেড় মাস। ফলে দীর্ঘ অপেক্ষায় বিদেশি ক্রেতারা হারাচ্ছেন আগ্রহ।

যদিও এসব সংকটের মধ্যেই শিল্পের আধুনিকায়নে প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ঐতিহ্যবাহী এ খাতের কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়ন, প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি প্রদান এবং কারিগরদের সক্ষমতা বাড়িয়ে দেশে-বিদেশে কর্মসংস্থান সম্প্রসারণ করা হবে।

সরকারের উদ্যোগেও আশাবাদী হতে পারছেন না বাজিতপুরের প্রদীপ তরফদার। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, একটি শাড়ি তৈরি করতে প্রায় তিন দিন লাগে, অথচ মজুরি পাওয়া যায় মাত্র ৭৫০ টাকা। ন্যায্যমূল্য ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত না করে শুধু দক্ষ কারিগরদের প্রশিক্ষণ দিয়ে কী লাভ?দীর্ঘ ৫০ বছর এ পেশায় থাকা নির্মলকান্তি জীবনে কোনোদিন প্রশিক্ষণের নাম শোনেননি।

তার মতে, পুরনোরা নিরুপায় হয়ে কাজ করছেন, আর নতুন প্রজন্মের কেউ এই পেশায় আসছে না। তাই নতুন প্রজন্মকে আকৃষ্ট করতে সরকারকে আগে বাস্তবসম্মত আশার আলো দেখাতে হবে।

তাঁতশিল্পে দুর্দিন চলছে।

টাঙ্গাইল তাঁত বোর্ডের(বাজিতপুর) লিয়াজোঁ অফিসের তথ্যমতে, ২০১৮ সালে সদর, দেলদুয়ার ও বাসাইলের ৩২টি সমিতিতে তাঁতি ছিল ১৮ হাজারের বেশি, যা বর্তমানে ১৫ হাজারের নিচে নেমেছে।

অন্যদিকে, কালিহাতী বেসিক সেন্টারের লিয়াজোঁ অফিসের তথ্যমতে, তাদের ১৭টি সমিতির অধীনে ২০১৮ সালে ১৮ হাজার ৮৪ জন তাঁতি থাকলেও, বর্তমানে তা নেমে এসেছে অর্ধেকে।

এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে সম্প্রতি জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (এনএসডিএ) ‘টাঙ্গাইল শাড়ি উইভিং (লেভেল-২)’ অকুপেশনের কম্পিটেন্সি স্ট্যান্ডার্ড ও কোর্স অ্যাক্রিডিটেশন ডকুমেন্টের উন্নয়নে কাজ করছে।

এনএসডিএর নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. নাজনীন কাউসার চৌধুরী জানান, দেশের ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্পকে জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন ব্যবস্থার আওতায় আনতে সরকার কাজ করছে। দ্রুতই এর সুফল পাওয়া যাবে।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর ২০২৬


বিপন্ন টাঙ্গাইলের তাঁতশিল্প, ৭৫ হাজার কারখানা বন্ধ

প্রকাশের তারিখ : ০৬ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

ঐতিহ্যবাহী শিল্পে পড়েছে ভাটা: বাজারে শাড়ির দাম নেই; চরম হতাশায় প্রান্তিক কারিগররা 

সুতার অগ্নিমূল্য, কাঁচামালের ঊর্ধ্বগতি, যান্ত্রিক পাওয়ার লুমের আগ্রাসন এবং সুদূরপ্রসারী বাজার ব্যবস্থাপনার অভাবে তীব্র অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে টাঙ্গাইলের বিশ্বখ্যাত ও ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্প। হাড়ভাঙা পরিশ্রমের পরও উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য ও উপযুক্ত পারিশ্রমিক না পেয়ে চরম হতাশায় নিমজ্জিত হচ্ছেন এই শিল্পের মূল কারিগররা। জীবন-জীবিকার রূঢ় বাস্তবতায় বাধ্য হয়ে বহু দক্ষ তাঁতি তাদের পূর্বপুরুষের এই সুপ্রাচীন পেশা ত্যাগ করছেন।

সরকার প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নতুন কারিগর তৈরি করে এই শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করার স্বপ্ন দেখালেও, মাঠপর্যায়ের কঠোর বাস্তবতার কারণে প্রান্তিক তাঁতিদের মনে কোনো আশার আলো জাগছে না।

প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, এক সময় টাঙ্গাইল জেলা জুড়ে লক্ষাধিক তাঁত সচল থাকলেও বর্তমানে প্রায় ৭৫ হাজার তাঁত কারখানা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। ঐতিহ্যবাহী টাঙ্গাইল শাড়ি উৎপাদনের সচল তাঁতের সংখ্যা বর্তমানে ২০ হাজারেরও নিচে নেমে এসেছে। বাজারজাত করণের সঠিক নীতিমালার অভাব এবং ধারাবাহিক লোকসানের আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরাও এই শিল্পে নতুন করে পুঁজি বিনিয়োগে সাহস পাচ্ছেন না।

টাঙ্গাইলের কারিগররা মূলত দু’ধরনের ঐতিহ্যবাহী তাঁত ব্যবহার করে শাড়ির জমিনে নান্দনিকতা ফুটিয়ে তোলেন- চিত্তরঞ্জন (মিহি) তাঁত এবং পিটলুম (খটখটি) তাঁত। এই দু’ধরনের তাঁতেই সূক্ষ্ম সুতার বুননে তৈরি হয় বৈচিত্র্যময় ডিজাইন ও নজরকাড়া সব নামের শাড়ি। যার মধ্যে রয়েছে- জামদানী বা সফ্ট সিল্ক, হাফ সিল্ক, টাঙ্গাইল বি.টি, বালুচরি, জরিপাড়, হাজারবুটি, সূতিপাড়, কটকি, স্বর্ণচুড়, ইককাত, আনারকলি, দেবদাস, কুমকুম, সানন্দা, নীলাম্বরী ও ময়ূরকণ্ঠীসহ বিভিন্ন সাধারণ মানের শাড়ি।

শাড়ির গুণগত মান, জমিনের রঙবিন্যাস এবং হাতের কাজের সূক্ষ্মতার ওপর ভিত্তি করে এর মূল্যে রয়েছে ব্যাপক তারতম্য। বাজারে প্রকারভেদে একেকটি শাড়ি সর্বনিম্ন ৪০০ টাকা থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ৩৫ হাজার টাকা পর্যন্ত মূল্যে কেনাবেচা হয়ে থাকে।

বর্তমানে টাঙ্গাইলের সীমিত কিছু এলাকায় এই প্রাচীন শিল্পটি কোনোমতে টিকে রয়েছে। এর মধ্যে শাড়ি উৎপাদনের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত- বাজিতপুর, পাথরাইল, নলসন্দা, চন্ডি, বিষ্ণুপুর ও বিন্নাফৈর গ্রাম। এছাড়া কালিহাতী উপজেলার বল্লা, রামপুর, মমিননগর ও ছাতিহাটিসহ কয়েকটি গ্রাম এখনো টাঙ্গাইল শাড়ির প্রধান তাঁতপল্লী হিসেবে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে যুদ্ধ করে যাচ্ছে।

স্থানীয় তাঁতশিল্পীদের অভিযোগ, সুতা ও রঙের মূল্য অনিয়ন্ত্রিতভাবে বাড়লেও শাড়ির পাইকারি মূল্য সেই অনুপাতে বৃদ্ধি পায়নি। ফলে তাঁত মালিকদের পক্ষে শ্রমিকদের উপযুক্ত মজুরি দেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বর্তমান দ্রব্যমূল্যের বাজারে এই যৎসামান্য পারিশ্রমিক দিয়ে সংসার চালানো দুষ্কর হওয়ায় দক্ষ কারিগররা পেশা পরিবর্তন করতে বাধ্য হচ্ছেন।

সংশ্লিষ্টদের মতে, কেবল সরকারি প্রশিক্ষণ দিয়ে এই শিল্পের সুদিন ফেরানো সম্ভব নয় বরং সুতা সহ কাঁচামালের দাম প্রান্তিক তাঁতিদের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আনা, পাওয়ার লুমের আগ্রাসন রোধ করা এবং উৎপাদকদের সরাসরি বাজার সুবিধা নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায়, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে বাঙালির হাজার বছরের এই সাংস্কৃতিক স্মারকটি অচিরেই বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তাঁতে কাজ করছেন এক কারিগর।

তাঁত মালিকরা অভিযোগ করেছেন, উৎপাদন খরচ দিন দিন বাড়ছে, কিন্তু বাজারে শাড়ির কাঙ্ক্ষিত দাম পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে চলার মতো অবস্থা নেই। অনেক তাঁত শ্রমিকই মজুরি ঠিকমতো পাচ্ছেন না- যা পরিবারের জীবনযাত্রাকে প্রভাবিত করছে।

তাঁত শ্রমিক শুকুর মাহমুদ, চান মিয়া, সাইফুলসহ অনেকেই জানান, দুই থেকে আড়াই দিন পরিশ্রম করে একটি শাড়ি তৈরি করলে ৭০০-১০০০ টাকা মজুরি পাওয়া যায়। এতো স্বল্প মজুরিতে সংসার চালানো দূরূহ। ফলে তাঁতশ্রমিকরা ভিন্ন পেশায় চলে যাচ্ছে। অথচ একজন তাঁতশ্রমিককে কাপড় বুনানো শিখতে ৩-৪ মাস সময় লাগে। যেভাবে শ্রমিকরা অন্য পেশায় চলে যাচ্ছে, তাতে আগামি ২-৩ বছরের মধ্যে তাঁতশিল্পে চরম শ্রমিক সংকট দেখা দিবে। শুধুমাত্র মজুরি কম থাকার কারণে অনেকেই এ পেশা ছেড়ে দিচ্ছেন।

টাঙ্গাইল সদর উপজেলার ছিলিমপুর গ্রামের তাঁত ফ্যাক্টরির মালিক আমজাদ হোসেন জানান, তার ফ্যাক্টরিতে ২০টি তাঁত ছিল। কাঁচামালের ঊর্ধ্বগতি, তৈরি কাপড় বিক্রি করতে না পারা ও শ্রমিক সংকটসহ নানা কারণে সম্প্রতি ফ্যাক্টরিটি বন্ধ হয়ে গেছে। ইতোমধ্যে লোকসানের বোঝা টানতে টানতে তিনি ২০ লাখ টাকা ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। বর্তমানে তিনি টাঙ্গাইল শহরের ‘জয় মা লক্ষ্মী ভান্ডার’ নামক তাঁতের শাড়ির দোকানে শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন। 

শিল্পটির করুণ অবস্থার বাস্তব চিত্র উঠে আসে টাঙ্গাইল শাড়ি ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি রঘুনাথ বসাকের কথায়। তিনি বলেন, ২০১৫ সালে পাথরাইল এলাকায় প্রায় পাঁচ হাজার তাঁতিপরিবার থাকলেও বর্তমানে তা কমে ৪০০-৪৫০টিতে দাঁড়িয়েছে। জেলার প্রায় ৬০ শতাংশ তাঁতি এরই মধ্যে এই শিল্প থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। রপ্তানি বাণিজ্যেও বড় ধাক্কা লেগেছে। আগে স্থলপথে একদিনে প্রতিবেশী দেশে শাড়ি পৌঁছলেও এখন সময় লাগছে এক থেকে দেড় মাস। ফলে দীর্ঘ অপেক্ষায় বিদেশি ক্রেতারা হারাচ্ছেন আগ্রহ।

যদিও এসব সংকটের মধ্যেই শিল্পের আধুনিকায়নে প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ঐতিহ্যবাহী এ খাতের কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়ন, প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি প্রদান এবং কারিগরদের সক্ষমতা বাড়িয়ে দেশে-বিদেশে কর্মসংস্থান সম্প্রসারণ করা হবে।

সরকারের উদ্যোগেও আশাবাদী হতে পারছেন না বাজিতপুরের প্রদীপ তরফদার। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, একটি শাড়ি তৈরি করতে প্রায় তিন দিন লাগে, অথচ মজুরি পাওয়া যায় মাত্র ৭৫০ টাকা। ন্যায্যমূল্য ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত না করে শুধু দক্ষ কারিগরদের প্রশিক্ষণ দিয়ে কী লাভ?দীর্ঘ ৫০ বছর এ পেশায় থাকা নির্মলকান্তি জীবনে কোনোদিন প্রশিক্ষণের নাম শোনেননি।

তার মতে, পুরনোরা নিরুপায় হয়ে কাজ করছেন, আর নতুন প্রজন্মের কেউ এই পেশায় আসছে না। তাই নতুন প্রজন্মকে আকৃষ্ট করতে সরকারকে আগে বাস্তবসম্মত আশার আলো দেখাতে হবে।

তাঁতশিল্পে দুর্দিন চলছে।

টাঙ্গাইল তাঁত বোর্ডের(বাজিতপুর) লিয়াজোঁ অফিসের তথ্যমতে, ২০১৮ সালে সদর, দেলদুয়ার ও বাসাইলের ৩২টি সমিতিতে তাঁতি ছিল ১৮ হাজারের বেশি, যা বর্তমানে ১৫ হাজারের নিচে নেমেছে।

অন্যদিকে, কালিহাতী বেসিক সেন্টারের লিয়াজোঁ অফিসের তথ্যমতে, তাদের ১৭টি সমিতির অধীনে ২০১৮ সালে ১৮ হাজার ৮৪ জন তাঁতি থাকলেও, বর্তমানে তা নেমে এসেছে অর্ধেকে।

এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে সম্প্রতি জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (এনএসডিএ) ‘টাঙ্গাইল শাড়ি উইভিং (লেভেল-২)’ অকুপেশনের কম্পিটেন্সি স্ট্যান্ডার্ড ও কোর্স অ্যাক্রিডিটেশন ডকুমেন্টের উন্নয়নে কাজ করছে।

এনএসডিএর নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. নাজনীন কাউসার চৌধুরী জানান, দেশের ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্পকে জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন ব্যবস্থার আওতায় আনতে সরকার কাজ করছে। দ্রুতই এর সুফল পাওয়া যাবে।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত