সংবাদ

সিডিএর চতুর্থ মহাপরিকল্পনা : সাংহাইয়ের আদলে রূপ নেবে চট্টগ্রাম


প্রতিনিধি, চট্টগ্রাম
প্রতিনিধি, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: ৬ অক্টোবর ২০২৬, ০২:২৯ পিএম

সিডিএর চতুর্থ মহাপরিকল্পনা : সাংহাইয়ের আদলে রূপ নেবে চট্টগ্রাম
ছবি : সংগৃহীত

নদী, পাহাড় ও সাগরঘেরা প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যের বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামকে চীনের সাংহাই শহরের আদলে গড়ে তোলার সুদূরপ্রসারী রূপরেখা তৈরি করেছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। কর্ণফুলী নদীর দুই পারকে সমন্বিত নগরায়ণের আওতায় এনে মূল শহরের ওপর জনসংখ্যার বাড়তি চাপ কমানো, শিল্প ও বাণিজ্যিক কেন্দ্রের বিকেন্দ্রীকরণ এবং পাহাড়-জলাধার সংরক্ষণের লক্ষ্য সামনে রেখে সংস্থাটি প্রবর্তন করেছে চতুর্থ মহাপরিকল্পনা। ২০২৫ থেকে ২০৫০ সাল–এই ২৫ বছর মেয়াদি পরিকল্পনার মূল দর্শন ‘ওয়ান সিটি, টু টাউন’ বা ‘এক নগরী, দুই শহর’।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে ৩৫ কোটি ৮৭ লাখ টাকা ব্যয়ে ১ হাজার ২৫৫ বর্গকিলোমিটার এলাকা নিয়ে প্রস্তুত করা হয়েছে এই খসড়া পরিকল্পনা। সিডিএর এই উদ্যোগে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের পুরো এলাকা ছাড়াও আশপাশের একাধিক পৌরসভা ও সম্ভাব্য নগরায়ণ এলাকা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। মূলত কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ পাড়ে আনোয়ারা, পটিয়া এবং নগরসংলগ্ন হাঠহাজারীকে ঘিরে তিনটি আধুনিক স্যাটেলাইট টাউন ও বিশেষায়িত বাণিজ্যিক কেন্দ্র গড়ে তোলা হবে, যা মূল শহরের যানজট ও জনঘনত্ব কমাবে। এর আগেও ২০২৩ সালের প্রাথমিক ধারণায় নদীকেন্দ্রিক সাংহাই কিংবা তুরস্কের ইস্তাম্বুলের মডেলে ১১টি স্যাটেলাইট টাউন ও ৬টি শিল্পাঞ্চল রূপায়ণের বিষয়টি আলোচনায় আসে।

নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, শুধু ভবন ও সড়ক নির্মাণই নগরায়ণ নয়; পরিবেশ রক্ষা করা না গেলে চট্টগ্রাম বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে। সে বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে এবার সিডিএ মহানগর ও আশপাশের প্রায় ৪০ হাজার পুকুর ও জলাধার চিহ্নিত করে সংরক্ষণের প্রস্তাব করেছে, যার মধ্যে শুধু মূল শহরেই রয়েছে প্রায় ৪ হাজার ৬০০টি পুকুর। চট্টগ্রাম নগরীতে এই প্রথম জলাধারের ডিজিটাল ডেটাবেস তৈরি হচ্ছে। এর মাধ্যমে গত কয়েক দশকের অপরিকল্পিত পাহাড় কাটা ও দিঘি-পুকুর ভরাট বন্ধসহ জলাবদ্ধতা নিরসনে ড্রেনেজ ব্যবস্থার আমূল সংস্কার এবং খালের প্রাকৃতিক জলপ্রবাহ পুনরুদ্ধারে বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ভূমিকম্প ও মাটির তরলীকরণ (লিকুইফ্যাকশন) ঝুঁকির মানচিত্র তৈরি করে ভূমি ব্যবহারের নিয়ম বেঁধে দেওয়া হবে।

সিডিএ সূত্রে আরও জানা গেছে, পরিকল্পনায় চট্টগ্রামের সুষম উন্নয়নের সুবিধার্থে পুরো মহানগরীকে ছয়টি প্রশাসনিক অঞ্চলে ভাগ করার পাশাপাশি আনোয়ারা, বাকলিয়া ও আগ্রাবাদের জন্য করা হচ্ছে পৃথক ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ)। নাগরিক বিনোদনের কথা ভেবে গড়ে তোলা হবে জাতীয় উদ্যানের আদলে বৃহৎ পার্ক, সংরক্ষিত কবরস্থান ও কেন্দ্রীয় ঈদগাহ। ভূমি ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনতে টিডিআর (ট্রান্সফার অব ডেভেলপমেন্ট রাইটস), ল্যান্ড পুলিং ও ল্যান্ড রিয়্যালাজমেন্টের মতো আন্তর্জাতিক আধুনিক কৌশল যুক্ত করা হচ্ছে। ড্রোন ও ফিল্ড সার্ভের মাধ্যমে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি হচ্ছে নগরের থ্রিডি মানচিত্র।

প্রকল্প বাস্তবায়নে অন্যান্য সরকারি সংস্থার মধ্যে ঐতিহ্যগত সমন্বয়হীনতা দূর করতে নগর ও নগর-বহির্ভূত এলাকার জন্য গঠন করা হচ্ছে পৃথক সমন্বয় কমিটি। এটি বাস্তবায়ন হবে তিন ধাপে–প্রথম ধাপ (২০২৬-২০৩৫), দ্বিতীয় ধাপ (২০৩৬-২০৪০) এবং চূড়ান্ত ধাপ (২০৪১-২০৫০)।

খসড়া এই মহাপরিকল্পনার ওপর জনমত সংগ্রহের জন্য ইতিমধ্যেই ২০২৬ সালের ২ আগস্ট থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৬০ দিনের সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিল সিডিএ। সিডিএ চেয়ারম্যান বেলায়েত হোসেন এ বিষয়ে গণমাধ্যমকে বলেন, পরিকল্পনাটি কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তবায়নযোগ্য করতে জনমতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

তবে নগর বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বাস্তবায়নই এখানে আসল চ্যালেঞ্জ। ১৯৯৫ সালের দ্বিতীয় মহাপরিকল্পনা ও ২০০৮ সালের ড্যাপের বহু প্রস্তাব কাগজে আটকে থাকার অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার সিডিএকে ‘মাস্টারপ্ল্যান’ থেকে ‘মাস্টারঅ্যাকশনে’ যেতে হবে। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সদিচ্ছা, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং আন্তসংস্থা সমন্বয় নিশ্চিত করা গেলেই কর্ণফুলীর দুই তীরে ‘সাংহাইয়ের স্বপ্ন’ বাস্তবে ডানা মেলবে।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর ২০২৬


সিডিএর চতুর্থ মহাপরিকল্পনা : সাংহাইয়ের আদলে রূপ নেবে চট্টগ্রাম

প্রকাশের তারিখ : ০৬ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

নদী, পাহাড় ও সাগরঘেরা প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যের বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামকে চীনের সাংহাই শহরের আদলে গড়ে তোলার সুদূরপ্রসারী রূপরেখা তৈরি করেছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। কর্ণফুলী নদীর দুই পারকে সমন্বিত নগরায়ণের আওতায় এনে মূল শহরের ওপর জনসংখ্যার বাড়তি চাপ কমানো, শিল্প ও বাণিজ্যিক কেন্দ্রের বিকেন্দ্রীকরণ এবং পাহাড়-জলাধার সংরক্ষণের লক্ষ্য সামনে রেখে সংস্থাটি প্রবর্তন করেছে চতুর্থ মহাপরিকল্পনা। ২০২৫ থেকে ২০৫০ সাল–এই ২৫ বছর মেয়াদি পরিকল্পনার মূল দর্শন ‘ওয়ান সিটি, টু টাউন’ বা ‘এক নগরী, দুই শহর’।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে ৩৫ কোটি ৮৭ লাখ টাকা ব্যয়ে ১ হাজার ২৫৫ বর্গকিলোমিটার এলাকা নিয়ে প্রস্তুত করা হয়েছে এই খসড়া পরিকল্পনা। সিডিএর এই উদ্যোগে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের পুরো এলাকা ছাড়াও আশপাশের একাধিক পৌরসভা ও সম্ভাব্য নগরায়ণ এলাকা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। মূলত কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ পাড়ে আনোয়ারা, পটিয়া এবং নগরসংলগ্ন হাঠহাজারীকে ঘিরে তিনটি আধুনিক স্যাটেলাইট টাউন ও বিশেষায়িত বাণিজ্যিক কেন্দ্র গড়ে তোলা হবে, যা মূল শহরের যানজট ও জনঘনত্ব কমাবে। এর আগেও ২০২৩ সালের প্রাথমিক ধারণায় নদীকেন্দ্রিক সাংহাই কিংবা তুরস্কের ইস্তাম্বুলের মডেলে ১১টি স্যাটেলাইট টাউন ও ৬টি শিল্পাঞ্চল রূপায়ণের বিষয়টি আলোচনায় আসে।

নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, শুধু ভবন ও সড়ক নির্মাণই নগরায়ণ নয়; পরিবেশ রক্ষা করা না গেলে চট্টগ্রাম বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে। সে বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে এবার সিডিএ মহানগর ও আশপাশের প্রায় ৪০ হাজার পুকুর ও জলাধার চিহ্নিত করে সংরক্ষণের প্রস্তাব করেছে, যার মধ্যে শুধু মূল শহরেই রয়েছে প্রায় ৪ হাজার ৬০০টি পুকুর। চট্টগ্রাম নগরীতে এই প্রথম জলাধারের ডিজিটাল ডেটাবেস তৈরি হচ্ছে। এর মাধ্যমে গত কয়েক দশকের অপরিকল্পিত পাহাড় কাটা ও দিঘি-পুকুর ভরাট বন্ধসহ জলাবদ্ধতা নিরসনে ড্রেনেজ ব্যবস্থার আমূল সংস্কার এবং খালের প্রাকৃতিক জলপ্রবাহ পুনরুদ্ধারে বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ভূমিকম্প ও মাটির তরলীকরণ (লিকুইফ্যাকশন) ঝুঁকির মানচিত্র তৈরি করে ভূমি ব্যবহারের নিয়ম বেঁধে দেওয়া হবে।

সিডিএ সূত্রে আরও জানা গেছে, পরিকল্পনায় চট্টগ্রামের সুষম উন্নয়নের সুবিধার্থে পুরো মহানগরীকে ছয়টি প্রশাসনিক অঞ্চলে ভাগ করার পাশাপাশি আনোয়ারা, বাকলিয়া ও আগ্রাবাদের জন্য করা হচ্ছে পৃথক ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ)। নাগরিক বিনোদনের কথা ভেবে গড়ে তোলা হবে জাতীয় উদ্যানের আদলে বৃহৎ পার্ক, সংরক্ষিত কবরস্থান ও কেন্দ্রীয় ঈদগাহ। ভূমি ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনতে টিডিআর (ট্রান্সফার অব ডেভেলপমেন্ট রাইটস), ল্যান্ড পুলিং ও ল্যান্ড রিয়্যালাজমেন্টের মতো আন্তর্জাতিক আধুনিক কৌশল যুক্ত করা হচ্ছে। ড্রোন ও ফিল্ড সার্ভের মাধ্যমে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি হচ্ছে নগরের থ্রিডি মানচিত্র।

প্রকল্প বাস্তবায়নে অন্যান্য সরকারি সংস্থার মধ্যে ঐতিহ্যগত সমন্বয়হীনতা দূর করতে নগর ও নগর-বহির্ভূত এলাকার জন্য গঠন করা হচ্ছে পৃথক সমন্বয় কমিটি। এটি বাস্তবায়ন হবে তিন ধাপে–প্রথম ধাপ (২০২৬-২০৩৫), দ্বিতীয় ধাপ (২০৩৬-২০৪০) এবং চূড়ান্ত ধাপ (২০৪১-২০৫০)।

খসড়া এই মহাপরিকল্পনার ওপর জনমত সংগ্রহের জন্য ইতিমধ্যেই ২০২৬ সালের ২ আগস্ট থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৬০ দিনের সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিল সিডিএ। সিডিএ চেয়ারম্যান বেলায়েত হোসেন এ বিষয়ে গণমাধ্যমকে বলেন, পরিকল্পনাটি কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তবায়নযোগ্য করতে জনমতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

তবে নগর বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বাস্তবায়নই এখানে আসল চ্যালেঞ্জ। ১৯৯৫ সালের দ্বিতীয় মহাপরিকল্পনা ও ২০০৮ সালের ড্যাপের বহু প্রস্তাব কাগজে আটকে থাকার অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার সিডিএকে ‘মাস্টারপ্ল্যান’ থেকে ‘মাস্টারঅ্যাকশনে’ যেতে হবে। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সদিচ্ছা, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং আন্তসংস্থা সমন্বয় নিশ্চিত করা গেলেই কর্ণফুলীর দুই তীরে ‘সাংহাইয়ের স্বপ্ন’ বাস্তবে ডানা মেলবে।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত