সংবাদ

এক টাকার মাস্টার : প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ ছাড়াই যেভাবে মিলল রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি


প্রতিনিধি, গাইবান্ধা
প্রতিনিধি, গাইবান্ধা
প্রকাশ: ৬ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০৪ পিএম

এক টাকার মাস্টার : প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ ছাড়াই যেভাবে মিলল রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি
ছবি : সংবাদ

১৯৭৪ সালের ভয়াবহ বন্যা ও নদীভাঙনে ভিটেমাটিসহ ৮০ বিঘা ফসলি জমি, পুকুরভরা মাছ আর গোয়ালভরা গরু–সব হারিয়ে এক লহমায় নিঃস্বার্থ হয়ে পড়েছিল পরিবারটি। এরপর গাইবান্ধা শহর থেকে সাত কিলোমিটার দূরে বাগুড়িয়া গ্রামের ওয়াপদা বাঁধে টিনের ছাপরায় শুরু হয় বেঁচে থাকার নতুন লড়াই। অর্থাভাবে নিজের কলেজে পড়ার স্বপ্ন ভেঙে গেলেও থেমে যাননি লুৎফর রহমান (৭৬)। নিজের ভেতরের না-পাওয়ার আক্ষেপকে শক্তিতে রূপান্তর করে গত ৫২ বছর ধরে নামমাত্র ১ টাকার বিনিময়ে নদীভাঙনকবলিত ও সুবিধাবঞ্চিত পরিবারের হাজারো শিশুর মাঝে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে যাচ্ছেন তিনি। এলাকায় তিনি আজ পরম শ্রদ্ধায় পরিচিত ‘এক টাকার মাস্টার’ নামে।

পায়ে হেঁটে কখনো বাঁধে, কারও বাড়ির আঙিনায় কিংবা গাছের তলায় শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিয়েছেন অনন্য এই শিক্ষাব্রতী। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সনদ বা সরকারি সুযোগ-সুবিধা না থাকা সত্ত্বেও অর্ধশতাব্দীর বেশি সময় ধরে নিরলস পাঠদান করে আসা এই গুণী মানুষটি অবশেষে পেলেন তার প্রাপ্য রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। শিক্ষক দিবসে তাকে বিশেষ সম্মাননা জানানোর পাশাপাশি তার আজীবন নিঃস্বার্থ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে বিশেষ অবদানের জন্য অবসরভাতা প্রদানের অনুশাসন জারি করেছেন প্রধানমন্ত্রী।

১৯৫০ সালের ৭ আগস্ট ফুলছড়ি উপজেলার উড়িয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন লুৎফর রহমান। পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে তিনি সবার ছোট। ১৯৭২ সালে ফুলছড়ি উপজেলার গুণভরি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে ম্যাট্রিক পাস করেন। কিন্তু চরম দারিদ্র্যের কারণে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পাননি। সেই কষ্ট থেকেই পণ করেছিলেন–দারিদ্র্য কিংবা নদীভাঙনের কারণে কোনো শিশুর পড়ালেখা যেন থমকে না যায়। ১৯৭২ সাল থেকেই সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের বিনা পারিশ্রমিকে পাঠদান শুরু করেন। পরবর্তীতে স্থানীয় অভিভাবকদের অনুরোধে প্রতীকী দক্ষিণা হিসেবে দিনপ্রতি ১ টাকা করে নেওয়া শুরু করেন।

গাছতলা, বাড়ির আঙিনা কিংবা বাঁধের ধারে বসেই তিনি গড়ে তুলেছেন কয়েক প্রজন্মের ভবিষ্যৎ। ফজরের নামাজ পড়েই পায়ে হেঁটে কিংবা পুরোনো সাইকেলে চেপে বাগুড়িয়া, মদনেরপাড়া, পুলবন্দি, চন্দিয়া, ঢুলিপাড়া, কঞ্চিপাড়া, মধ্যপাড়া ও পূর্বপাড়াসহ আশপাশের কয়েকটি গ্রামে ছুটে যান তিনি। বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে ৬০ থেকে ৭০ জন শিক্ষার্থীকে প্রতি ব্যাচে ১০ জন করে পাঠদান করান। তার হাত ধরে প্রাথমিক পাঠ শেষ করে বহু শিক্ষার্থী আজ সমাজে সুপ্রতিষ্ঠিত; কেউ চিকিৎসক, কেউ ম্যাজিস্ট্রেট, কেউ বা কলেজ অধ্যক্ষ।

সংসারজীবনে স্ত্রী লতিফুন বেগম, দুই মেয়ে ও দুই ছেলেকে নিয়ে তার পরিবার। মেয়েদের বিয়ে হয়েছে। বড় ছেলে লাভলু মিয়া অর্থাভাবে এসএসসি পাসের পর আর পড়তে না পেরে বর্তমানে অটোরিকশা চালান এবং ছোট ছেলে মশিউর রহমান দাওরায়ে হাদিস পাস করে চাকরির অপেক্ষায় রয়েছেন। চরম অর্থকষ্টের মধ্যেও বাবার এই নিঃস্বার্থ ব্রত নিয়ে গর্বিত সন্তানরা।

লুৎফর রহমান মাস্টারের এই আজীবন আত্মত্যাগ ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি প্রসঙ্গে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘গণ উন্নয়ন কেন্দ্র’ (জিইউকে)-এর প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী প্রধান এম. আবদুস্ সালাম বলেন, 'লুৎফর রহমান মাস্টারের অসাধারণ শিক্ষাব্রতকে সম্মান জানাতে আমরা ২০২০ সালে তাকে 'জিইউকে গুণিজন সম্মাননা' প্রদান করেছিলাম। তবে তিনি দরিদ্র শিশুদের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়াতে যে আজীবন অবদান রেখেছেন, তার কাছে সামাজিক সম্মাননা যথেষ্ট নয়। তার এই নিঃস্বার্থ অবদান মানুষ শত শত বছর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ রাখবে।'

তিনি আরও বলেন, 'যমুনাপাড়ের সুবিধাবঞ্চিত ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর মধ্যে শিক্ষার ভিত গড়ে তুলতে তিনি যে ঐতিহাসিক ভূমিকা রেখেছেন, তা বিরল। প্রাতিষ্ঠানিক সনদ বা সুযোগ-সুবিধার তোয়াক্কা না করে একজন মানুষ কীভাবে সমাজকে বদলে দিতে পারেন, লুৎফর রহমান মাস্টার তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে এই শিক্ষাব্রতীর যথাযথ রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও নিয়মিত ভাতার ব্যবস্থা হওয়া অত্যন্ত আনন্দের ও প্রশংসনীয় উদ্যোগ।'

এদিকে শিক্ষক দিবস উপলক্ষে এবং ঈদুল আজহায় এই প্রবীণ শিক্ষকের পাশে দাঁড়িয়েছে প্রশাসন। জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে সরকারি সহায়তা ও শুভেচ্ছা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে তার জরাজীর্ণ টিনের ঘরে।

নিজের জীবন নিয়ে কোনো খেদ নেই লুৎফর রহমানের। স্বীকৃতি পাওয়ার অনুভূতি ও শিক্ষার্থীদের সাফল্য নিয়ে তিনি তৃপ্তির হাসিতে বলেন, 'আমার ছাত্ররা আজ দেশের বড় বড় পদে গিয়ে সেবা করছে, ওদের হাসিমুখ দেখলেই আমার জীবনের সব কষ্ট আর না-পাওয়ার আক্ষেপ দূর হয়ে যায়।'

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর ২০২৬


এক টাকার মাস্টার : প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ ছাড়াই যেভাবে মিলল রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি

প্রকাশের তারিখ : ০৬ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

১৯৭৪ সালের ভয়াবহ বন্যা ও নদীভাঙনে ভিটেমাটিসহ ৮০ বিঘা ফসলি জমি, পুকুরভরা মাছ আর গোয়ালভরা গরু–সব হারিয়ে এক লহমায় নিঃস্বার্থ হয়ে পড়েছিল পরিবারটি। এরপর গাইবান্ধা শহর থেকে সাত কিলোমিটার দূরে বাগুড়িয়া গ্রামের ওয়াপদা বাঁধে টিনের ছাপরায় শুরু হয় বেঁচে থাকার নতুন লড়াই। অর্থাভাবে নিজের কলেজে পড়ার স্বপ্ন ভেঙে গেলেও থেমে যাননি লুৎফর রহমান (৭৬)। নিজের ভেতরের না-পাওয়ার আক্ষেপকে শক্তিতে রূপান্তর করে গত ৫২ বছর ধরে নামমাত্র ১ টাকার বিনিময়ে নদীভাঙনকবলিত ও সুবিধাবঞ্চিত পরিবারের হাজারো শিশুর মাঝে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে যাচ্ছেন তিনি। এলাকায় তিনি আজ পরম শ্রদ্ধায় পরিচিত ‘এক টাকার মাস্টার’ নামে।

পায়ে হেঁটে কখনো বাঁধে, কারও বাড়ির আঙিনায় কিংবা গাছের তলায় শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিয়েছেন অনন্য এই শিক্ষাব্রতী। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সনদ বা সরকারি সুযোগ-সুবিধা না থাকা সত্ত্বেও অর্ধশতাব্দীর বেশি সময় ধরে নিরলস পাঠদান করে আসা এই গুণী মানুষটি অবশেষে পেলেন তার প্রাপ্য রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। শিক্ষক দিবসে তাকে বিশেষ সম্মাননা জানানোর পাশাপাশি তার আজীবন নিঃস্বার্থ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে বিশেষ অবদানের জন্য অবসরভাতা প্রদানের অনুশাসন জারি করেছেন প্রধানমন্ত্রী।

১৯৫০ সালের ৭ আগস্ট ফুলছড়ি উপজেলার উড়িয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন লুৎফর রহমান। পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে তিনি সবার ছোট। ১৯৭২ সালে ফুলছড়ি উপজেলার গুণভরি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে ম্যাট্রিক পাস করেন। কিন্তু চরম দারিদ্র্যের কারণে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পাননি। সেই কষ্ট থেকেই পণ করেছিলেন–দারিদ্র্য কিংবা নদীভাঙনের কারণে কোনো শিশুর পড়ালেখা যেন থমকে না যায়। ১৯৭২ সাল থেকেই সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের বিনা পারিশ্রমিকে পাঠদান শুরু করেন। পরবর্তীতে স্থানীয় অভিভাবকদের অনুরোধে প্রতীকী দক্ষিণা হিসেবে দিনপ্রতি ১ টাকা করে নেওয়া শুরু করেন।

গাছতলা, বাড়ির আঙিনা কিংবা বাঁধের ধারে বসেই তিনি গড়ে তুলেছেন কয়েক প্রজন্মের ভবিষ্যৎ। ফজরের নামাজ পড়েই পায়ে হেঁটে কিংবা পুরোনো সাইকেলে চেপে বাগুড়িয়া, মদনেরপাড়া, পুলবন্দি, চন্দিয়া, ঢুলিপাড়া, কঞ্চিপাড়া, মধ্যপাড়া ও পূর্বপাড়াসহ আশপাশের কয়েকটি গ্রামে ছুটে যান তিনি। বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে ৬০ থেকে ৭০ জন শিক্ষার্থীকে প্রতি ব্যাচে ১০ জন করে পাঠদান করান। তার হাত ধরে প্রাথমিক পাঠ শেষ করে বহু শিক্ষার্থী আজ সমাজে সুপ্রতিষ্ঠিত; কেউ চিকিৎসক, কেউ ম্যাজিস্ট্রেট, কেউ বা কলেজ অধ্যক্ষ।

সংসারজীবনে স্ত্রী লতিফুন বেগম, দুই মেয়ে ও দুই ছেলেকে নিয়ে তার পরিবার। মেয়েদের বিয়ে হয়েছে। বড় ছেলে লাভলু মিয়া অর্থাভাবে এসএসসি পাসের পর আর পড়তে না পেরে বর্তমানে অটোরিকশা চালান এবং ছোট ছেলে মশিউর রহমান দাওরায়ে হাদিস পাস করে চাকরির অপেক্ষায় রয়েছেন। চরম অর্থকষ্টের মধ্যেও বাবার এই নিঃস্বার্থ ব্রত নিয়ে গর্বিত সন্তানরা।

লুৎফর রহমান মাস্টারের এই আজীবন আত্মত্যাগ ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি প্রসঙ্গে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘গণ উন্নয়ন কেন্দ্র’ (জিইউকে)-এর প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী প্রধান এম. আবদুস্ সালাম বলেন, 'লুৎফর রহমান মাস্টারের অসাধারণ শিক্ষাব্রতকে সম্মান জানাতে আমরা ২০২০ সালে তাকে 'জিইউকে গুণিজন সম্মাননা' প্রদান করেছিলাম। তবে তিনি দরিদ্র শিশুদের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়াতে যে আজীবন অবদান রেখেছেন, তার কাছে সামাজিক সম্মাননা যথেষ্ট নয়। তার এই নিঃস্বার্থ অবদান মানুষ শত শত বছর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ রাখবে।'

তিনি আরও বলেন, 'যমুনাপাড়ের সুবিধাবঞ্চিত ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর মধ্যে শিক্ষার ভিত গড়ে তুলতে তিনি যে ঐতিহাসিক ভূমিকা রেখেছেন, তা বিরল। প্রাতিষ্ঠানিক সনদ বা সুযোগ-সুবিধার তোয়াক্কা না করে একজন মানুষ কীভাবে সমাজকে বদলে দিতে পারেন, লুৎফর রহমান মাস্টার তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে এই শিক্ষাব্রতীর যথাযথ রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও নিয়মিত ভাতার ব্যবস্থা হওয়া অত্যন্ত আনন্দের ও প্রশংসনীয় উদ্যোগ।'

এদিকে শিক্ষক দিবস উপলক্ষে এবং ঈদুল আজহায় এই প্রবীণ শিক্ষকের পাশে দাঁড়িয়েছে প্রশাসন। জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে সরকারি সহায়তা ও শুভেচ্ছা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে তার জরাজীর্ণ টিনের ঘরে।

নিজের জীবন নিয়ে কোনো খেদ নেই লুৎফর রহমানের। স্বীকৃতি পাওয়ার অনুভূতি ও শিক্ষার্থীদের সাফল্য নিয়ে তিনি তৃপ্তির হাসিতে বলেন, 'আমার ছাত্ররা আজ দেশের বড় বড় পদে গিয়ে সেবা করছে, ওদের হাসিমুখ দেখলেই আমার জীবনের সব কষ্ট আর না-পাওয়ার আক্ষেপ দূর হয়ে যায়।'


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত