দেশে প্রতিনিয়ত গ্যাসের চাহিদা বাড়ছে। তবে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন কমছে; মজুতও দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। স্থলে ও সাগরে নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিস্কার এবং সেখান থেকে সরবরাহ বাড়ানোর মতো পরিস্থিতি আপাতত নেই। তাই সামনের বছরগুলোতে বিদ্যুৎ ও শিল্পখাতে গ্যাসের চাহিদা সামাল দিতে সরকার বেশ কয়েকটি ভাসমান ও স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনা করেছে।
পাশপাশি ১৫০টি নতুন কূপ খনন, সাগরের ২৬ ব্লকে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে বিডিং রাউন্ড আহ্বান এবং ভোলার গ্যাসের ‘সর্বোত্তম’ ব্যবহারের বিষয়েও পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এদিকে দীর্ঘদিন পরিত্যাক্ত অবস্থায় থাকা সুনামগঞ্জের ছাতকে অবস্থিত টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্রে নতুন করে জরিপ ও কূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন এন্ড মাইনস) প্রকৌশলী মো. শোয়েব সম্প্রতি এ বিষয়ে সংবাদকে বলেন, “টেংরাটিলায় দুটি কূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।”
পেট্রোবাংলার আওতাধীন বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন এন্ড প্রোডাকশন কোম্পানি (বাপেক্স) এই গ্যাসক্ষেত্রে পুনরায় গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য ইতিমধ্যে একটি উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) তৈরি করেছে বলে জানান তিনি।
প্রকৌশলী মো. শোয়েব বলেন, “ডিপিপির আওতায় এখানে প্রাথমিকভাবে ২টি অনুসন্ধান ও মূল্যায়ন কূপ খনন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।”
পেট্রোবাংলার সংশ্লিষ্ট আরেক কর্মকর্তা বৃহস্পতিবার সংবাদকে বলেন, “টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্রটি ছাতক পূর্ব ও ছাতক পশ্চিম নামে দুটি অংশে বিভক্ত। নাইকোর সময় বিস্ফোরণে ছাতক পশ্চিম অংশের একটি স্তরের গ্যাস পুড়ে গেছে। অন্যান্য স্তর এবং ছাতক পূর্ব অংশের গ্যাসের মজুত অক্ষত আছে বলে আমরা মনে করছে। পেট্রোবাংলার বিবেচনায়, এই গ্যাসক্ষেত্রে সম্ভাব্য মজুত ২ থেকে ৫ ট্রিলিয়ন ঘনফুট।
চাহিদার বিপরীতে ঘাটতি
দেশে গ্যাস সংকট দীর্ঘদিনের। দেশীয় উৎপাদন ও আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) দিয়ে চাহিদার দুই-তৃতীয়াংশ মেটানো সম্ভব হচ্ছে। এক-তৃতীয়াংশ ঘাটতির কারণে সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশপাশি শিল্পোৎপাদনেও ভাটা পড়েছে।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ি, দেশে দৈনিক মোট গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। দৈনিক গড়ে সরবরাহ করা হয় ২৬০ কোটি ঘনফুটের মত। এরমধ্যে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে আসে দৈনিক ১৫৫ থেকে ১৬৫ কোটি ঘনফুটের মতো।
কক্সবাজারের মহেশখালিতে স্থাপিত মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট ও বেসরকারি কোম্পানি সামিটের পৃথক দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) থেকে আসে দৈনিক মোট ৯৫ থেকে ১০৫ কোটি ঘনফুট। দৈনিক ঘাটতি থাকে প্রায় ১২০ কোটি ঘনফুটের মতো।
সম্প্রতি একটি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ড এবং যথাসময়ে এলএনজি কার্গো না আসার কারণে বেশ কিছুদিন ঘাটতি আরো বেড়ে যায়। এতে সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশপাশি শিল্পোৎপাদনে ধ্বস নামে। গ্যাসের অভাবে অনেক সিএনজি ফিলিং স্টেশন এবং অনেক এলাকায় আবাসিকে রান্নার চুলা বন্ধ হয়ে যায়।
নতুন এলএনজি টার্মিনাল
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ি, দেশে গ্যাসের সরবরাহ বাড়াতে ২০৩৫ সালের মধ্যে পাঁচটি নতুন তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনা করেছে সরকার। এর মধ্যে তিনটি হবে ভাসমান স্টোরেজ ও রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট (এফএসআরইউ) এবং দুটি হবে স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল।
পরিকল্পিত তিনটি ভাসমান তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সংরক্ষণ ও পুনঃগ্যাসীকরণ টার্মিনালের (এফএসআরইউ) মধ্যে একটি কক্সবাজারের মহেশখালীর গভীর সমুদ্রের কুতুবজোম এলাকায় স্থাপনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। চীনা প্রতিষ্ঠান চায়না ন্যাশনাল এনার্জি ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেডের (সিএনইই) প্রস্তাব জিটুজি পদ্ধতিতে প্রক্রিয়াকরণের বিষয়ে গত ২৮ জুলাই নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি।
জ্বালানি ও খনিজ বিভাগ বলছে, চীনের নির্মীয়মাণ এই এফএসআরইউটি ২০২৮ সালের মাঝামাঝি গ্যাস সরবরাহ শুরু করতে পারে। এতে দেশের রিগ্যাসিফিকেশন সক্ষমতা দৈনিক প্রায় ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি) বা ৬০ কোটি ঘনফুট বাড়বে। বড় আকারের এই এফএসআরইউতে বড় জাহাজ থেকেও এলএনজি গ্রহণ করা যাবে। এতে এলএনজি আমদানির খরচ কমতে পারে। একই আকারের আরেকটি এফএসআরইউ স্থাপনের জন্য আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে চুক্তি করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এ ছাড়া জরুরি ভিত্তিতে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল অথবা পায়রা কিংবা মোংলা বন্দরের কাছে আরো একটি এফএসআরইউ স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাই করা হচ্ছে।
জানা গেছে, দুটি স্থলভিত্তিক টার্মিনালের মধ্যে একটি কক্সবাজারের নির্মীয়মাণ মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের কাছে স্থাপনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর সক্ষমতা হবে বছরে ৭.৫ মিলিয়ন টন (এমটিপিএ)। পেট্রোবাংলা দেশের প্রথম স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের জন্য ঠিকাদার নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু করতে কাজ করা হচ্ছে। পরবর্তী ধাপে মাতারবাড়ীতেই একই সক্ষমতার আরো একটি স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ করা হবে।
সংসদে প্রধানমন্ত্রী
শিল্পে গ্যাস-সংকট ঠেকাতে সরকার নতুন এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনসহ ১৫০টি কূপ খননের পরিকল্পনা নিয়েছে বলে জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গত ৯ সেপ্টেম্বর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে সংসদ নেতা বলেছেন, আকস্মিক বা সাময়িক গ্যাস-সংকটের কারণে শিল্প খাত যাতে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে না পড়ে, সে জন্য দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন ও গ্যাস অনুসন্ধানে জোর দিচ্ছে সরকার।
সংসদে প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ি, দেশে বর্তমানে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের মাধ্যমে কমবেশি দৈনিক গড়ে ৯৩৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে। ভবিষ্যতে আকস্মিক গ্যাস-সংকটে শিল্প খাত যাতে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে না পড়ে, তা নিশ্চিত করতে মহেশখালীর কুতুবজোমে নতুন একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল এবং মাতারবাড়ীতে একটি স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের কার্যক্রম বাস্তবায়নাধীন রয়েছে।
সরকারপ্রধান সংসদে আশা প্রকাশ করেছেন, পরিকল্পনা অনুযায়ী, কুতুবজোমের ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল থেকে ২০২৮ সালে এবং মাতারবাড়ীর স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল থেকে ২০৩০ সালের ডিসেম্বর নাগাদ রি-গ্যাসিফাইড এলএনজি সরবরাহ করা সম্ভব হবে।
প্রধানমন্ত্রী সংসদে আরো জানান, এ ছাড়া পায়রা বা মোংলা বন্দর এলাকা অথবা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সমুদ্র উপকূলের সুবিধাজনক কোনো স্থানে জরুরি ভিত্তিতে আরও একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাই চলছে। এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে আকস্মিক গ্যাস-সংকট মোকাবিলায় অতিরিক্ত সরবরাহসক্ষমতা তৈরি হবে বলে মনে করছে সরকার।
সাগরে অনুসন্ধান, ভোলার গ্যাস
সাগরে গ্যাস অনুসন্ধানের পাশপাশি ভোলার গ্যাস কীভাবে ব্যবহার করা হবে সেসব কথাও সেদিন প্রধানমন্ত্রী সংসদে বলেছেন। তারেক রহমান বলেন, সমুদ্রাঞ্চলের ২৬টি ব্লকে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের জন্য আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান নিয়োগে গত ২৪ মে আন্তর্জাতিক বিডিং রাউন্ড আহ্বান করা হয়েছে। আগামী নভেম্বর পর্যন্ত বিড দাখিলের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। স্থলভাগে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যে ‘বাংলাদেশ অনশোর মডেল পিএসসি-২০২৬’ প্রণয়নের কার্যক্রমও গ্রহণ করা হয়েছে।
ভোলার গ্যাসের ব্যবহার প্রসঙ্গে সরকারের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে সরকারপ্রধান বলেন, ভোলার গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে দেশের মূল গ্যাস নেটওয়ার্কে নিয়ে আসতে চাইলে সে পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অন্তত সাত বছর সময় লাগবে। তাই ভোলার গ্যাস স্থানীয়ভাবে ব্যবহার করে শিল্পকারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি। ইতিমধ্যে সেখানে গ্যাসনির্ভর কিছু শিল্প স্থাপনের চেষ্টা চলছে। এর ফলে ভোলা অঞ্চলে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে এবং স্থানীয় অর্থনীতির আকারও বাড়বে বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, দেশের মানুষের স্বার্থে ভোলার গ্যাস যথাযথভাবে ব্যবহারের জন্য সেখানে একটি সার কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি ৫০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনাও করছে সরকার।
ভোলার গ্যাস এলএনজি আকারে মূল ভূখণ্ডে এনে আগ্রহী শিল্পপ্রতিষ্ঠানে সরবরাহের বিষয়েও সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গ্যাসপ্রাপ্তি সাপেক্ষে শিল্পপ্রতিষ্ঠানে সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এ ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক অঞ্চল, ইপিজেড ও বিসিকের মতো পরিকল্পিত শিল্পাঞ্চলে অবস্থিত শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
সরকারের এসব উদ্যোগের লক্ষ্য হিসেবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশীয় উৎস থেকে গ্যাসের সরবরাহ বাড়ানো, আমদানিনির্ভরতা মোকাবিলা এবং শিল্প ও রপ্তানি খাতে নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন নিশ্চিত করা। পাশাপাশি দীর্ঘ মেয়াদে জ্বালানি-নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অনুসন্ধান, উৎপাদন ও অবকাঠামো উন্নয়নে সমন্বিত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
উৎপাদন হ্রাস
হাইড্রোকার্বন ইউনিটের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রতিবেদনে দেখা যায়, ওই বছরে দেশে গ্যাস উৎপাদন হয়েছে ৬৯৬ দশমিক ১০ বিলিয়ন ঘনফুট। দৈনিক গড় উৎপাদন ছিল ১ হাজার ৯০৭ দশমিক ১২ মিলিয়ন বা প্রায় ১৯০ কোটি ঘনফুট। আগের অর্থবছরে উৎপাদন ছিল ৭৪৭ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন ঘনফুট এবং দৈনিক গড় ২ হাজার ৪৮ দশমিক ৬৩ মিলিয়ন বা প্রায় ২০০ কোটি ঘনফুট। অর্থাৎ এক বছরে দৈনিক গড় উৎপাদন কমেছে ১৪১ দশমিক ৫১ মিলিয়ন ঘনফুট।
নতুন ১৫০ কূপ
সরকারের তথ্য অনুযায়ি, ২০৩০ সালের মধ্যে ১৫০টি কূপ খনন ও ওয়ার্কওভার কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে। এর মধ্যে ২৯টির কাজ শেষ হয়েছে। এসব কূপ থেকে দৈনিক প্রায় ২৭ কোটি ঘনফুট গ্যাসের সংস্থান নিশ্চিত হয়েছে বলে সাম্প্রতি সংসদে জানানো হয়েছে। বলা হয়েছে এতে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়েছে বাড়তি প্রায় ১৪ কোটি ঘনফুট গ্যাস।
সরকারে প্রত্যাশা, কর্মসূচির বাকি অংশ বাস্তবায়িত হলে দেশীয় উৎপাদন বাড়বে। তবে যে হারে উৎপাদন কমছে, নতুন কূপ থেকে বাড়তি উৎপাদন সে ঘাটতি পোষাতে পারবে কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন করেছে।
ভবিষ্যৎ ঘাটতি মোকাবিলায় এলএনজি আমদানি বাড়ানোর পথেই হাঁটছে সরকার। তবে এ পথেও ঝুঁকি রয়েছে।
২০২৫ সালে ১০৯টি এলএনজি কার্গো আমদানিতে প্রায় ৩ দশমিক ৮৮ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে, যা আগের বছরের ৮৬টি কার্গোর জন্য ব্যয় করা ৩ দশমিক ০২ বিলিয়ন ডলারের চেয়ে ৮৫৫ দশমিক ৪২ মিলিয়ন ডলার বেশি।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান (মধ্যপ্রাচ্য) যুদ্ধ শুরুর পর কাতার থেকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির কার্গো না আসায় মার্চ থেকে বাংলাদেশকে স্পট মার্কেট থেকে ৩৫ কার্গো এলএনজি কিনতে হয়েছে। মার্চে কেনা দুটি কার্গোর দাম ছিল প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিটে ২৮ দশমিক ২৮ ডলার ও ২৩ দশমিক ০৮ ডলার। জানুয়ারিতে একই বাজারে এলএনজির দাম ছিল প্রায় ১০ ডলার।
মজুত গ্যাসে চলবে কতদিন?
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু গত ১৯ এপ্রিল জাতীয় সংসদে জানান, বর্তমানে দেশে উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের মজুত ২৯ দশমিক ৭৪ ট্রিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ২২ দশমিক ১১ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করা হয়েছে। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি পর্যন্ত অবশিষ্ট মজুত গ্যাসের পরিমাণ ৭ দশমিক ৬৩ ট্রিলিয়ন ঘনফুট। নতুন কোনো গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত না হলে এবং বর্তমানে কম-বেশি দৈনিক ১ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট হারে গ্যাস সরবরাহ করা হলে ওই অবশিষ্ট ৭ দশমিক ৬৩ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস আনুমানিক ১২ বছর সরবরাহ করা সম্ভব হবে।
প্রকৃতপক্ষে ৭ দশমিক ৬৩ ট্রিলিয়ন ঘনফুট বা ৭৬৩০০০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের মজুদ দেশের দৈনিক মোট চাহিদার কতদিন পূরণে সক্ষম তার হিসাব একেক রকম।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ি, দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট ধরে যদি পুরোটাই দেশীয় ক্ষেত্রগুলো থেকে সরবরাহ করা সম্ভব হয় এবং নতুন কোন কূপ বা গ্যাসক্ষেত্র যদি যুক্ত না হয়, তাহলে মজুত গ্যাসে চলবে আর সাড়ে পাঁচ বছর।
যদি এলএনজিসহ বর্তমান সরবরাহ সক্ষমতা দৈনিক ২৬০ কোটি ঘনফুট ধরে হিসেব করা হয়, তাহলে মজুত গ্যাসে চলবে আর আট বছর।
আর যদি শুধু দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোর বতর্মান সরবরাহ সক্ষমতা দৈনিক ১৬০ কোটি ঘনফুট ধরে হিসেব করা হয়, তাহলে মজুত গ্যাসে চলবে আরো ১৩ বছর।
তবে শিল্প ও বিদ্যুতে গ্যাসের চাহিদা যেহেতু প্রতিদিনই বাড়ছে, তাই বছর ভিত্তিক চাহিদা নিরূপণ করা হলে, মজুত গ্যাস আরো দ্রুত শেষ হয়ে যাবে। আবার উত্তোলনযোগ্য মজুত শেষের দিকে এসে পুরোপুরি উত্তোলন করা যাবে এমন নিশ্চয়তা নেই।

শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১০ অক্টোবর ২০২৬
দেশে প্রতিনিয়ত গ্যাসের চাহিদা বাড়ছে। তবে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন কমছে; মজুতও দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। স্থলে ও সাগরে নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিস্কার এবং সেখান থেকে সরবরাহ বাড়ানোর মতো পরিস্থিতি আপাতত নেই। তাই সামনের বছরগুলোতে বিদ্যুৎ ও শিল্পখাতে গ্যাসের চাহিদা সামাল দিতে সরকার বেশ কয়েকটি ভাসমান ও স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনা করেছে।
পাশপাশি ১৫০টি নতুন কূপ খনন, সাগরের ২৬ ব্লকে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে বিডিং রাউন্ড আহ্বান এবং ভোলার গ্যাসের ‘সর্বোত্তম’ ব্যবহারের বিষয়েও পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এদিকে দীর্ঘদিন পরিত্যাক্ত অবস্থায় থাকা সুনামগঞ্জের ছাতকে অবস্থিত টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্রে নতুন করে জরিপ ও কূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন এন্ড মাইনস) প্রকৌশলী মো. শোয়েব সম্প্রতি এ বিষয়ে সংবাদকে বলেন, “টেংরাটিলায় দুটি কূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।”
পেট্রোবাংলার আওতাধীন বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন এন্ড প্রোডাকশন কোম্পানি (বাপেক্স) এই গ্যাসক্ষেত্রে পুনরায় গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য ইতিমধ্যে একটি উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) তৈরি করেছে বলে জানান তিনি।
প্রকৌশলী মো. শোয়েব বলেন, “ডিপিপির আওতায় এখানে প্রাথমিকভাবে ২টি অনুসন্ধান ও মূল্যায়ন কূপ খনন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।”
পেট্রোবাংলার সংশ্লিষ্ট আরেক কর্মকর্তা বৃহস্পতিবার সংবাদকে বলেন, “টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্রটি ছাতক পূর্ব ও ছাতক পশ্চিম নামে দুটি অংশে বিভক্ত। নাইকোর সময় বিস্ফোরণে ছাতক পশ্চিম অংশের একটি স্তরের গ্যাস পুড়ে গেছে। অন্যান্য স্তর এবং ছাতক পূর্ব অংশের গ্যাসের মজুত অক্ষত আছে বলে আমরা মনে করছে। পেট্রোবাংলার বিবেচনায়, এই গ্যাসক্ষেত্রে সম্ভাব্য মজুত ২ থেকে ৫ ট্রিলিয়ন ঘনফুট।
চাহিদার বিপরীতে ঘাটতি
দেশে গ্যাস সংকট দীর্ঘদিনের। দেশীয় উৎপাদন ও আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) দিয়ে চাহিদার দুই-তৃতীয়াংশ মেটানো সম্ভব হচ্ছে। এক-তৃতীয়াংশ ঘাটতির কারণে সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশপাশি শিল্পোৎপাদনেও ভাটা পড়েছে।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ি, দেশে দৈনিক মোট গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। দৈনিক গড়ে সরবরাহ করা হয় ২৬০ কোটি ঘনফুটের মত। এরমধ্যে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে আসে দৈনিক ১৫৫ থেকে ১৬৫ কোটি ঘনফুটের মতো।
কক্সবাজারের মহেশখালিতে স্থাপিত মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট ও বেসরকারি কোম্পানি সামিটের পৃথক দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) থেকে আসে দৈনিক মোট ৯৫ থেকে ১০৫ কোটি ঘনফুট। দৈনিক ঘাটতি থাকে প্রায় ১২০ কোটি ঘনফুটের মতো।
সম্প্রতি একটি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ড এবং যথাসময়ে এলএনজি কার্গো না আসার কারণে বেশ কিছুদিন ঘাটতি আরো বেড়ে যায়। এতে সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশপাশি শিল্পোৎপাদনে ধ্বস নামে। গ্যাসের অভাবে অনেক সিএনজি ফিলিং স্টেশন এবং অনেক এলাকায় আবাসিকে রান্নার চুলা বন্ধ হয়ে যায়।
নতুন এলএনজি টার্মিনাল
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ি, দেশে গ্যাসের সরবরাহ বাড়াতে ২০৩৫ সালের মধ্যে পাঁচটি নতুন তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনা করেছে সরকার। এর মধ্যে তিনটি হবে ভাসমান স্টোরেজ ও রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট (এফএসআরইউ) এবং দুটি হবে স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল।
পরিকল্পিত তিনটি ভাসমান তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সংরক্ষণ ও পুনঃগ্যাসীকরণ টার্মিনালের (এফএসআরইউ) মধ্যে একটি কক্সবাজারের মহেশখালীর গভীর সমুদ্রের কুতুবজোম এলাকায় স্থাপনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। চীনা প্রতিষ্ঠান চায়না ন্যাশনাল এনার্জি ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেডের (সিএনইই) প্রস্তাব জিটুজি পদ্ধতিতে প্রক্রিয়াকরণের বিষয়ে গত ২৮ জুলাই নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি।
জ্বালানি ও খনিজ বিভাগ বলছে, চীনের নির্মীয়মাণ এই এফএসআরইউটি ২০২৮ সালের মাঝামাঝি গ্যাস সরবরাহ শুরু করতে পারে। এতে দেশের রিগ্যাসিফিকেশন সক্ষমতা দৈনিক প্রায় ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি) বা ৬০ কোটি ঘনফুট বাড়বে। বড় আকারের এই এফএসআরইউতে বড় জাহাজ থেকেও এলএনজি গ্রহণ করা যাবে। এতে এলএনজি আমদানির খরচ কমতে পারে। একই আকারের আরেকটি এফএসআরইউ স্থাপনের জন্য আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে চুক্তি করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এ ছাড়া জরুরি ভিত্তিতে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল অথবা পায়রা কিংবা মোংলা বন্দরের কাছে আরো একটি এফএসআরইউ স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাই করা হচ্ছে।
জানা গেছে, দুটি স্থলভিত্তিক টার্মিনালের মধ্যে একটি কক্সবাজারের নির্মীয়মাণ মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের কাছে স্থাপনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর সক্ষমতা হবে বছরে ৭.৫ মিলিয়ন টন (এমটিপিএ)। পেট্রোবাংলা দেশের প্রথম স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের জন্য ঠিকাদার নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু করতে কাজ করা হচ্ছে। পরবর্তী ধাপে মাতারবাড়ীতেই একই সক্ষমতার আরো একটি স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ করা হবে।
সংসদে প্রধানমন্ত্রী
শিল্পে গ্যাস-সংকট ঠেকাতে সরকার নতুন এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনসহ ১৫০টি কূপ খননের পরিকল্পনা নিয়েছে বলে জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গত ৯ সেপ্টেম্বর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে সংসদ নেতা বলেছেন, আকস্মিক বা সাময়িক গ্যাস-সংকটের কারণে শিল্প খাত যাতে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে না পড়ে, সে জন্য দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন ও গ্যাস অনুসন্ধানে জোর দিচ্ছে সরকার।
সংসদে প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ি, দেশে বর্তমানে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের মাধ্যমে কমবেশি দৈনিক গড়ে ৯৩৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে। ভবিষ্যতে আকস্মিক গ্যাস-সংকটে শিল্প খাত যাতে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে না পড়ে, তা নিশ্চিত করতে মহেশখালীর কুতুবজোমে নতুন একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল এবং মাতারবাড়ীতে একটি স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের কার্যক্রম বাস্তবায়নাধীন রয়েছে।
সরকারপ্রধান সংসদে আশা প্রকাশ করেছেন, পরিকল্পনা অনুযায়ী, কুতুবজোমের ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল থেকে ২০২৮ সালে এবং মাতারবাড়ীর স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল থেকে ২০৩০ সালের ডিসেম্বর নাগাদ রি-গ্যাসিফাইড এলএনজি সরবরাহ করা সম্ভব হবে।
প্রধানমন্ত্রী সংসদে আরো জানান, এ ছাড়া পায়রা বা মোংলা বন্দর এলাকা অথবা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সমুদ্র উপকূলের সুবিধাজনক কোনো স্থানে জরুরি ভিত্তিতে আরও একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাই চলছে। এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে আকস্মিক গ্যাস-সংকট মোকাবিলায় অতিরিক্ত সরবরাহসক্ষমতা তৈরি হবে বলে মনে করছে সরকার।
সাগরে অনুসন্ধান, ভোলার গ্যাস
সাগরে গ্যাস অনুসন্ধানের পাশপাশি ভোলার গ্যাস কীভাবে ব্যবহার করা হবে সেসব কথাও সেদিন প্রধানমন্ত্রী সংসদে বলেছেন। তারেক রহমান বলেন, সমুদ্রাঞ্চলের ২৬টি ব্লকে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের জন্য আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান নিয়োগে গত ২৪ মে আন্তর্জাতিক বিডিং রাউন্ড আহ্বান করা হয়েছে। আগামী নভেম্বর পর্যন্ত বিড দাখিলের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। স্থলভাগে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যে ‘বাংলাদেশ অনশোর মডেল পিএসসি-২০২৬’ প্রণয়নের কার্যক্রমও গ্রহণ করা হয়েছে।
ভোলার গ্যাসের ব্যবহার প্রসঙ্গে সরকারের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে সরকারপ্রধান বলেন, ভোলার গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে দেশের মূল গ্যাস নেটওয়ার্কে নিয়ে আসতে চাইলে সে পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অন্তত সাত বছর সময় লাগবে। তাই ভোলার গ্যাস স্থানীয়ভাবে ব্যবহার করে শিল্পকারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি। ইতিমধ্যে সেখানে গ্যাসনির্ভর কিছু শিল্প স্থাপনের চেষ্টা চলছে। এর ফলে ভোলা অঞ্চলে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে এবং স্থানীয় অর্থনীতির আকারও বাড়বে বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, দেশের মানুষের স্বার্থে ভোলার গ্যাস যথাযথভাবে ব্যবহারের জন্য সেখানে একটি সার কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি ৫০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনাও করছে সরকার।
ভোলার গ্যাস এলএনজি আকারে মূল ভূখণ্ডে এনে আগ্রহী শিল্পপ্রতিষ্ঠানে সরবরাহের বিষয়েও সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গ্যাসপ্রাপ্তি সাপেক্ষে শিল্পপ্রতিষ্ঠানে সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এ ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক অঞ্চল, ইপিজেড ও বিসিকের মতো পরিকল্পিত শিল্পাঞ্চলে অবস্থিত শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
সরকারের এসব উদ্যোগের লক্ষ্য হিসেবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশীয় উৎস থেকে গ্যাসের সরবরাহ বাড়ানো, আমদানিনির্ভরতা মোকাবিলা এবং শিল্প ও রপ্তানি খাতে নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন নিশ্চিত করা। পাশাপাশি দীর্ঘ মেয়াদে জ্বালানি-নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অনুসন্ধান, উৎপাদন ও অবকাঠামো উন্নয়নে সমন্বিত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
উৎপাদন হ্রাস
হাইড্রোকার্বন ইউনিটের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রতিবেদনে দেখা যায়, ওই বছরে দেশে গ্যাস উৎপাদন হয়েছে ৬৯৬ দশমিক ১০ বিলিয়ন ঘনফুট। দৈনিক গড় উৎপাদন ছিল ১ হাজার ৯০৭ দশমিক ১২ মিলিয়ন বা প্রায় ১৯০ কোটি ঘনফুট। আগের অর্থবছরে উৎপাদন ছিল ৭৪৭ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন ঘনফুট এবং দৈনিক গড় ২ হাজার ৪৮ দশমিক ৬৩ মিলিয়ন বা প্রায় ২০০ কোটি ঘনফুট। অর্থাৎ এক বছরে দৈনিক গড় উৎপাদন কমেছে ১৪১ দশমিক ৫১ মিলিয়ন ঘনফুট।
নতুন ১৫০ কূপ
সরকারের তথ্য অনুযায়ি, ২০৩০ সালের মধ্যে ১৫০টি কূপ খনন ও ওয়ার্কওভার কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে। এর মধ্যে ২৯টির কাজ শেষ হয়েছে। এসব কূপ থেকে দৈনিক প্রায় ২৭ কোটি ঘনফুট গ্যাসের সংস্থান নিশ্চিত হয়েছে বলে সাম্প্রতি সংসদে জানানো হয়েছে। বলা হয়েছে এতে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়েছে বাড়তি প্রায় ১৪ কোটি ঘনফুট গ্যাস।
সরকারে প্রত্যাশা, কর্মসূচির বাকি অংশ বাস্তবায়িত হলে দেশীয় উৎপাদন বাড়বে। তবে যে হারে উৎপাদন কমছে, নতুন কূপ থেকে বাড়তি উৎপাদন সে ঘাটতি পোষাতে পারবে কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন করেছে।
ভবিষ্যৎ ঘাটতি মোকাবিলায় এলএনজি আমদানি বাড়ানোর পথেই হাঁটছে সরকার। তবে এ পথেও ঝুঁকি রয়েছে।
২০২৫ সালে ১০৯টি এলএনজি কার্গো আমদানিতে প্রায় ৩ দশমিক ৮৮ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে, যা আগের বছরের ৮৬টি কার্গোর জন্য ব্যয় করা ৩ দশমিক ০২ বিলিয়ন ডলারের চেয়ে ৮৫৫ দশমিক ৪২ মিলিয়ন ডলার বেশি।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান (মধ্যপ্রাচ্য) যুদ্ধ শুরুর পর কাতার থেকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির কার্গো না আসায় মার্চ থেকে বাংলাদেশকে স্পট মার্কেট থেকে ৩৫ কার্গো এলএনজি কিনতে হয়েছে। মার্চে কেনা দুটি কার্গোর দাম ছিল প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিটে ২৮ দশমিক ২৮ ডলার ও ২৩ দশমিক ০৮ ডলার। জানুয়ারিতে একই বাজারে এলএনজির দাম ছিল প্রায় ১০ ডলার।
মজুত গ্যাসে চলবে কতদিন?
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু গত ১৯ এপ্রিল জাতীয় সংসদে জানান, বর্তমানে দেশে উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের মজুত ২৯ দশমিক ৭৪ ট্রিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ২২ দশমিক ১১ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করা হয়েছে। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি পর্যন্ত অবশিষ্ট মজুত গ্যাসের পরিমাণ ৭ দশমিক ৬৩ ট্রিলিয়ন ঘনফুট। নতুন কোনো গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত না হলে এবং বর্তমানে কম-বেশি দৈনিক ১ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট হারে গ্যাস সরবরাহ করা হলে ওই অবশিষ্ট ৭ দশমিক ৬৩ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস আনুমানিক ১২ বছর সরবরাহ করা সম্ভব হবে।
প্রকৃতপক্ষে ৭ দশমিক ৬৩ ট্রিলিয়ন ঘনফুট বা ৭৬৩০০০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের মজুদ দেশের দৈনিক মোট চাহিদার কতদিন পূরণে সক্ষম তার হিসাব একেক রকম।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ি, দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট ধরে যদি পুরোটাই দেশীয় ক্ষেত্রগুলো থেকে সরবরাহ করা সম্ভব হয় এবং নতুন কোন কূপ বা গ্যাসক্ষেত্র যদি যুক্ত না হয়, তাহলে মজুত গ্যাসে চলবে আর সাড়ে পাঁচ বছর।
যদি এলএনজিসহ বর্তমান সরবরাহ সক্ষমতা দৈনিক ২৬০ কোটি ঘনফুট ধরে হিসেব করা হয়, তাহলে মজুত গ্যাসে চলবে আর আট বছর।
আর যদি শুধু দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোর বতর্মান সরবরাহ সক্ষমতা দৈনিক ১৬০ কোটি ঘনফুট ধরে হিসেব করা হয়, তাহলে মজুত গ্যাসে চলবে আরো ১৩ বছর।
তবে শিল্প ও বিদ্যুতে গ্যাসের চাহিদা যেহেতু প্রতিদিনই বাড়ছে, তাই বছর ভিত্তিক চাহিদা নিরূপণ করা হলে, মজুত গ্যাস আরো দ্রুত শেষ হয়ে যাবে। আবার উত্তোলনযোগ্য মজুত শেষের দিকে এসে পুরোপুরি উত্তোলন করা যাবে এমন নিশ্চয়তা নেই।

আপনার মতামত লিখুন