সংবাদ

গ্রন্থপাঠ

শব্দ-সংস্পর্শে প্রবহমান জলমাকড়


হাসনাত মোবারক
হাসনাত মোবারক
প্রকাশ: ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৩৪ পিএম

শব্দ-সংস্পর্শে প্রবহমান জলমাকড়

পড়া হলো, বলতে হয় একটু সময় নিয়ে পড়লাম কাব্যগ্রন্থ ‘জলমাকড়ের নৌকাবাইচ’। এটি নিজাম বিশ্বাসের প্রকাশিত একমাত্র কবিতার বই। গ্রন্থটির নামকরণই মধ্যেই উঠে আসে কবির যাপিতজীবনের জলমগ্নতার কথা। আক্ষরিক অর্থেই কবিতাগুলোর বিষয়-বিস্তারে মাটি ও জলের প্রভাব রয়েছে। এই বইয়ের অন্তর্গত প্রত্যেকটি কবিতার শরীরজুড়ে বাজে মহাজাগতিক সুর। সেই সুর ভেসে আসে কখনো পাথরের শরীর থেকে আবার কখনো তা লোকালয়ে এসে কবিতার নির্মাণকৌশল বদলে হয়ে ওঠে এক নান্দনিক দৃশ্যকাব্য।

বইটির মলাট ওল্টালেই চোখে পড়ে ‘পৃথিবীর শেষ সন্ধ্যায়’ নামের কবিতা। কবিতাটি শুরু হয়েছে মহাবিশ্বের মহাজাগতিক ভোর দিয়ে। নাতিদীর্ঘ এই কবিতাটি তরঙ্গের মতো বহমান। নিখুঁত বর্ণনা আর ইমাজিনেশন তৈরিতে ব্যাপক মুন্সিয়ানার ছাপ পাওয়া যায়। শুধু এই একটা কবিতার শরীর খুঁড়লে বের হয় নানান উপাদান। তারচেয়ে বরং কথা বলা যাক, এই গ্রন্থের কবিতাগুলোর গঠন-আঙ্গিক প্রসঙ্গে। এখানে নানান মাধ্যমে কবিতার ফর্ম দাঁড় করানোর চেষ্টা রয়েছে। যা শব্দ হয়ে গড়িয়ে যায়, জল-ঢেউ, নদী তথা জলাভূমির ওপর দিয়ে গড়িয়ে যায়। নদীর ঢেউয়ের মতো ছন্দতোলা কবিতার শরীর। যা নির্দিষ্ট কোনো ছাঁচে ফেলানো যায় না। বইয়ের প্রত্যেকটি কবিতা সে কথাই বলে। কবিতাগুলো পড়ার পর হৃদপ্রকরণে জলের ক্ষরণ ঘটায়। জাগরিত হয় চৈতন্য। বোধের ঘর বিকশিত হয়। প্রথম কবিতাটির এক জায়গায় কবি লিখেছেন,

‘নিশাচর বৃক্ষের বনে এসে দেখি

মহুয়া ফুলের ভাগ-বাঁটোয়ারা নিয়ে

বাদুড়ের সাথে তুমি বাঁধিয়েছ বিবাদ!’

এখানে প্রতীক হিসেবে বাদুড়কে নিয়ে আসা হয়েছে। উপর্যুক্ত লাইনগুলোর পরের প্যারায় কবি বললেন—

‘সূর্যমুখী মানুষ দীর্ঘ দীর্ঘ ছায়া হয়ে

পথের ওপর ছড়িয়েছে অন্ধকার,...।’


আচ্ছা লাইনটি আমাদের কি মনে করিয়ে দেয় না একজন আলো বিক্রি করা মানুষের কথা? যিনি কিনা সংকটকালীন মুহূর্তে উধাও হয়ে যান লোকালয় থেকে। ওই লাইনটিতে আমরা সেই আলো বেচা মানুষের গল্পে ঢুকি পড়ি। অন্য পাঠক হয়তো আরও ভিন্ন কিছু ভাবেন, ওই একই লাইন পড়ে। স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে বলি, গ্রাম থেকে নগর, আলোর পাশ ফিরলে ভেঙচি কাটে ছায়া। উপর্যুক্ত পঙ্ক্তিতে ‘অন্ধকার’ শব্দটি থাকায় পাঠকের রূপকটা ধরে উঠতে কোনো হিমশিম খেতে হয় না। প্রতীক, চিত্রকল্প স্বভাবগত ভঙ্গিতে উঠে এসেছে নিজামের কবিতায়। কোনো শব্দই খাপছাড়া মনে হয় না।

নিজাম বিশ্বাসের কবিতার শরীর নরম। কোমল। তার কবিতা ছায়ার আবরণের অনেক অব্যক্ত কথার কলি হয়ে ফোটে। ছত্রিশ+ছত্রিশ= বাহাত্তর ব্যঞ্জন দিয়ে ভরাট এই কবিতার বইখানি। অর্থাৎ বাহাত্তরটি কবিতা রয়েছে বইটিতে। যা প্রাণ-প্রকৃতির প্রতিচ্ছায়া হয়ে কথা বলেছে পাঠকের সঙ্গে। হ্যাঁ, সচেতন পাঠকের কথাই বলছি। নিজাম বিশ্বাস তার জীবনের প্রায় মধ্যগগনে এসে দুই বছর আগে প্রকাশ করলেন ‘জলমাকড়ের নৌকাবাইচ’। অথচ কবিতা এবং অন্যান্য বিষয়ের ওপর তার নাানাবিধ লেখা নিয়মিতভাবে পত্রপত্রিকায় প্রকাশ হয়ে আসছে। নিজাম লেখালেখি শুরু করেছেন প্রায় দুই যুগ পেরিয়ে গেছে। লেখালেখি এবং দৈনিকের পাতায় প্রকাশ প্রিয়তায় তিনি নিয়মিত হওয়া সত্ত্বেও কবিতাগুলো গ্রন্থের মলাটবন্দি করতে ধীরগামিতার আশ্রয় নিয়েছেন— যা একটু বিস্ময়ই জাগিয়েছিল তার কবিতার পাঠকদের।

জল ও মাটির আশ্রয়ে বেড়ে উঠেছে নিজাম বিশ্বাসের কবিতা। কবিতা কী? যদি উত্তরে বলি অক্ষরের মালা— যা কখনো পাঠকের হৃদয়ে বেদনার অঙ্কুর হয়ে ছড়িয়ে পড়ে। ‘জলমাকড়ের নৌকাবাইচ’ পড়ার পর যে ধারণা জন্মে, তা হলো নিজাম বিশ্বাস শুধু কবিতায় নয়, জীবন যাপনেও বিশ্বাস করেন মাটি ও জল। জলের উপযোগিতা নিয়ে বেড়ে ওঠা এই কবির কবিতায় রূপক ব্যবহারের ক্ষেত্রে যথেষ্ট পারঙ্গমতার পরিচয় পাওয়া যায়। কবিতায় জলমাটি ঘেঁষা শব্দের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়েছে রূপকল্প। কবিতায় রূপকল্প যেমন আছে, তেমনি লোককথা, পুরাকাহিনি, পৌরাণিকতা কবিতার আবেদনকে অনেকখানি বাড়িয়ে তুলেছে।

‘ম্যামথ’ নামের কবিতায় তিনি লিখলেন—

‘আমার ঘ্রাণের অবয়ব তুমি ভুলে গেছ,

ভাবছ আমাকে প্রকাণ্ড ম্যামথ —’

কবি এখানে নিজেকে নিজেকে পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া একটা প্রাণির সঙ্গে তুলনা করেছেন। ঠিক উপর্যুক্ত লাইনটিরে পরেই লিখলেন,—

‘আমরা অন্ধ হওয়ার আগে পৃথিবীতে ফুল ছিল,

বাঁশি ছিল রাতজাগা বিষণ্ন পাখির ডাক’

এখানে অন্তর্গত ভাবের সঙ্গে নানান আঙ্গিকে কবিতাকে তিনি চিত্রকল্পপ্রবণ করে তুলেছেন। কবিতার আঙ্গিক ও আর্দশগত রূপায়ণে শিল্পজ্ঞানের কাছাকাছি পৌঁছানোর প্রাণান্তর চেষ্টার ছাপ লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু সেই জ্ঞান পাঠককে জোর করে গেলানো হয়নি। কবিতার অনুঘটক হিসেবে কখনো এসেছে ঘটনার বিন্যাস। যা বিবরণের বেলায় পরাবাস্তববাদ করে তোলা হয়েছে। প্রবহমান স্রোতের মতো টেনে নিয়ে যায় কবিতার মধ্যে। যা আমাকে বিস্মিত করেছে।

জলমাকড়ের নৌকাবাইচ। নিজাম বিশ্বাস। প্রচ্ছদ: রাজীব দত্ত। প্রকাশক: বৈতরণী। প্রকাশকাল: ডিসেম্বর ২০২৪। মূল্য : ৩৩০ টাকা।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬


শব্দ-সংস্পর্শে প্রবহমান জলমাকড়

প্রকাশের তারিখ : ১৪ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

পড়া হলো, বলতে হয় একটু সময় নিয়ে পড়লাম কাব্যগ্রন্থ ‘জলমাকড়ের নৌকাবাইচ’। এটি নিজাম বিশ্বাসের প্রকাশিত একমাত্র কবিতার বই। গ্রন্থটির নামকরণই মধ্যেই উঠে আসে কবির যাপিতজীবনের জলমগ্নতার কথা। আক্ষরিক অর্থেই কবিতাগুলোর বিষয়-বিস্তারে মাটি ও জলের প্রভাব রয়েছে। এই বইয়ের অন্তর্গত প্রত্যেকটি কবিতার শরীরজুড়ে বাজে মহাজাগতিক সুর। সেই সুর ভেসে আসে কখনো পাথরের শরীর থেকে আবার কখনো তা লোকালয়ে এসে কবিতার নির্মাণকৌশল বদলে হয়ে ওঠে এক নান্দনিক দৃশ্যকাব্য।

বইটির মলাট ওল্টালেই চোখে পড়ে ‘পৃথিবীর শেষ সন্ধ্যায়’ নামের কবিতা। কবিতাটি শুরু হয়েছে মহাবিশ্বের মহাজাগতিক ভোর দিয়ে। নাতিদীর্ঘ এই কবিতাটি তরঙ্গের মতো বহমান। নিখুঁত বর্ণনা আর ইমাজিনেশন তৈরিতে ব্যাপক মুন্সিয়ানার ছাপ পাওয়া যায়। শুধু এই একটা কবিতার শরীর খুঁড়লে বের হয় নানান উপাদান। তারচেয়ে বরং কথা বলা যাক, এই গ্রন্থের কবিতাগুলোর গঠন-আঙ্গিক প্রসঙ্গে। এখানে নানান মাধ্যমে কবিতার ফর্ম দাঁড় করানোর চেষ্টা রয়েছে। যা শব্দ হয়ে গড়িয়ে যায়, জল-ঢেউ, নদী তথা জলাভূমির ওপর দিয়ে গড়িয়ে যায়। নদীর ঢেউয়ের মতো ছন্দতোলা কবিতার শরীর। যা নির্দিষ্ট কোনো ছাঁচে ফেলানো যায় না। বইয়ের প্রত্যেকটি কবিতা সে কথাই বলে। কবিতাগুলো পড়ার পর হৃদপ্রকরণে জলের ক্ষরণ ঘটায়। জাগরিত হয় চৈতন্য। বোধের ঘর বিকশিত হয়। প্রথম কবিতাটির এক জায়গায় কবি লিখেছেন,

‘নিশাচর বৃক্ষের বনে এসে দেখি

মহুয়া ফুলের ভাগ-বাঁটোয়ারা নিয়ে

বাদুড়ের সাথে তুমি বাঁধিয়েছ বিবাদ!’

এখানে প্রতীক হিসেবে বাদুড়কে নিয়ে আসা হয়েছে। উপর্যুক্ত লাইনগুলোর পরের প্যারায় কবি বললেন—

‘সূর্যমুখী মানুষ দীর্ঘ দীর্ঘ ছায়া হয়ে

পথের ওপর ছড়িয়েছে অন্ধকার,...।’


আচ্ছা লাইনটি আমাদের কি মনে করিয়ে দেয় না একজন আলো বিক্রি করা মানুষের কথা? যিনি কিনা সংকটকালীন মুহূর্তে উধাও হয়ে যান লোকালয় থেকে। ওই লাইনটিতে আমরা সেই আলো বেচা মানুষের গল্পে ঢুকি পড়ি। অন্য পাঠক হয়তো আরও ভিন্ন কিছু ভাবেন, ওই একই লাইন পড়ে। স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে বলি, গ্রাম থেকে নগর, আলোর পাশ ফিরলে ভেঙচি কাটে ছায়া। উপর্যুক্ত পঙ্ক্তিতে ‘অন্ধকার’ শব্দটি থাকায় পাঠকের রূপকটা ধরে উঠতে কোনো হিমশিম খেতে হয় না। প্রতীক, চিত্রকল্প স্বভাবগত ভঙ্গিতে উঠে এসেছে নিজামের কবিতায়। কোনো শব্দই খাপছাড়া মনে হয় না।

নিজাম বিশ্বাসের কবিতার শরীর নরম। কোমল। তার কবিতা ছায়ার আবরণের অনেক অব্যক্ত কথার কলি হয়ে ফোটে। ছত্রিশ+ছত্রিশ= বাহাত্তর ব্যঞ্জন দিয়ে ভরাট এই কবিতার বইখানি। অর্থাৎ বাহাত্তরটি কবিতা রয়েছে বইটিতে। যা প্রাণ-প্রকৃতির প্রতিচ্ছায়া হয়ে কথা বলেছে পাঠকের সঙ্গে। হ্যাঁ, সচেতন পাঠকের কথাই বলছি। নিজাম বিশ্বাস তার জীবনের প্রায় মধ্যগগনে এসে দুই বছর আগে প্রকাশ করলেন ‘জলমাকড়ের নৌকাবাইচ’। অথচ কবিতা এবং অন্যান্য বিষয়ের ওপর তার নাানাবিধ লেখা নিয়মিতভাবে পত্রপত্রিকায় প্রকাশ হয়ে আসছে। নিজাম লেখালেখি শুরু করেছেন প্রায় দুই যুগ পেরিয়ে গেছে। লেখালেখি এবং দৈনিকের পাতায় প্রকাশ প্রিয়তায় তিনি নিয়মিত হওয়া সত্ত্বেও কবিতাগুলো গ্রন্থের মলাটবন্দি করতে ধীরগামিতার আশ্রয় নিয়েছেন— যা একটু বিস্ময়ই জাগিয়েছিল তার কবিতার পাঠকদের।

জল ও মাটির আশ্রয়ে বেড়ে উঠেছে নিজাম বিশ্বাসের কবিতা। কবিতা কী? যদি উত্তরে বলি অক্ষরের মালা— যা কখনো পাঠকের হৃদয়ে বেদনার অঙ্কুর হয়ে ছড়িয়ে পড়ে। ‘জলমাকড়ের নৌকাবাইচ’ পড়ার পর যে ধারণা জন্মে, তা হলো নিজাম বিশ্বাস শুধু কবিতায় নয়, জীবন যাপনেও বিশ্বাস করেন মাটি ও জল। জলের উপযোগিতা নিয়ে বেড়ে ওঠা এই কবির কবিতায় রূপক ব্যবহারের ক্ষেত্রে যথেষ্ট পারঙ্গমতার পরিচয় পাওয়া যায়। কবিতায় জলমাটি ঘেঁষা শব্দের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়েছে রূপকল্প। কবিতায় রূপকল্প যেমন আছে, তেমনি লোককথা, পুরাকাহিনি, পৌরাণিকতা কবিতার আবেদনকে অনেকখানি বাড়িয়ে তুলেছে।

‘ম্যামথ’ নামের কবিতায় তিনি লিখলেন—

‘আমার ঘ্রাণের অবয়ব তুমি ভুলে গেছ,

ভাবছ আমাকে প্রকাণ্ড ম্যামথ —’

কবি এখানে নিজেকে নিজেকে পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া একটা প্রাণির সঙ্গে তুলনা করেছেন। ঠিক উপর্যুক্ত লাইনটিরে পরেই লিখলেন,—

‘আমরা অন্ধ হওয়ার আগে পৃথিবীতে ফুল ছিল,

বাঁশি ছিল রাতজাগা বিষণ্ন পাখির ডাক’

এখানে অন্তর্গত ভাবের সঙ্গে নানান আঙ্গিকে কবিতাকে তিনি চিত্রকল্পপ্রবণ করে তুলেছেন। কবিতার আঙ্গিক ও আর্দশগত রূপায়ণে শিল্পজ্ঞানের কাছাকাছি পৌঁছানোর প্রাণান্তর চেষ্টার ছাপ লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু সেই জ্ঞান পাঠককে জোর করে গেলানো হয়নি। কবিতার অনুঘটক হিসেবে কখনো এসেছে ঘটনার বিন্যাস। যা বিবরণের বেলায় পরাবাস্তববাদ করে তোলা হয়েছে। প্রবহমান স্রোতের মতো টেনে নিয়ে যায় কবিতার মধ্যে। যা আমাকে বিস্মিত করেছে।

জলমাকড়ের নৌকাবাইচ। নিজাম বিশ্বাস। প্রচ্ছদ: রাজীব দত্ত। প্রকাশক: বৈতরণী। প্রকাশকাল: ডিসেম্বর ২০২৪। মূল্য : ৩৩০ টাকা।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত