দ্বিতীয় পর্ব: মমিনার জীবন
(পূর্ব প্রকাশের পর)
আট.
তিন দিনের টানা বৃষ্টির কারণে গোমতী নদীতে এখন ভরাট বান। গোমতীর জল ফুলে-ফেঁপে বুইদ্দার খালে উঠে এসেছে খালের শেষ অব্ধি। কিন্তু এখনও উত্তর থেকে আসা জোয়ারের জল এসে বুইদ্দার বিলে ওঠেনি। তবে হাল দেওয়ার পর জমিতে বৃষ্টির কারণে জল জমে ধানের চারা লাগাতে সুবিধা হচ্ছে। আনিসের জমির বর্গাদারেরা ধানের চারা লাগাচ্ছে। কিছু জমি আনিস এবার নিজেও চাষ করছে। বশির কাদাজল মাড়িয়ে সেগুলো ঘুরে ঘুরে দেখছে।
মনসুর পাগলাও এবার নিজেদের বেশ কিছু জমি নিজেই দেখাশোনা করছে। হালচাষ থেকে শুরু করে বৃষ্টিটির জল জমানোর জন্য ক্ষেতের আইল ঠিক করা, ছুটা কামলাদের নিয়ে সারি করে ধানের চারা লাগানো, চারা লাগানোর পরপর সার ছিটানো, সবই সে করছে। বাড়তি হিসেবে মাঝেমধ্যে বশিরে সঙ্গে গিয়ে আনিসের জমিগুলোরও তদারকি করে। আনিসই তাকে সেই দায়িত্ব দিয়ে গেছে।
আনিস এখন মাসে একবার হলেও বাড়িতে আসে। গ্রামের পাশ দিয়ে নতুন রাস্তাটা হওয়াতে তার বাড়িতে আসতে অনেক সুবিধা হয়েছে। মোটর সাইকেলে টেনে চলে আসতে পারে।
আনিস বাড়িতে এলে সবচেয়ে আনন্দে থাকে মনসুর পাগলা। সে তার মোটর সাইকেলে করে মীরবহরি বাজারে ঘোরে। একবার প্যান্ট-শার্ট পরে সে মোটর সাইকেল চড়ে আনিসের সঙ্গে উপজেলা সদরে পর্যন্ত গিয়েছিল। সদরে গিয়ে আনিস যখন থানার ওসি মহিউদ্দিন আহমেদের সঙ্গে হেসে হেসে সাহিত্য নিয়ে আলাপ করছিল, তখন পাশের চেয়ারে বসে তার ছাতি অনেক চওড়া হয়ে গিয়েছিল।
এদিকে নতুন রাস্তাটার কারণে আঁধারিয়া গ্রামেও বেশ পরিবর্তন এসেছে। আগে কেউ মধ্যপ্রাচ্য বা মালয়েশিয়া গেলে উপজেলা সদরের দিকে বাড়ি করার চিন্তা করত। এখন ওরা রাস্তাটার কারণে নিজ বাড়িতেই দালান তোলা শুরু করেছে। গ্রামের উত্তর পাড়ায় করিম শেখের পোলা আব্দু কুয়েত থেকে এসে বাড়িতে দালান তুলছে। উত্তর পাড়ার ছালেক মেম্বরের পোলা ইব্রাহীম দুবাই থেকে এসে পশ্চিম পাড়ায় দালান তুলবে বলে মাটি দিয়ে একটা জমি ভরাট করছে। সে নাকি দোতলা দালান তুলবে। ইব্রাহীম ছালেক মেম্বরের পোলা, দোতলা দালান তুলতেই পারে।
মনসুর পাগলার মধ্যেও বেশ পরিবর্তন এসেছে। তার মাথার পাগলামিটা অনেকটাই চলে গেছে। শুধু পুকুরের জলে নামলে সাঁতরে খুব বেশি এপার-ওপার করে। সে আর আগের মতো পুনোয়ারার মস্তানের দরগায় গিয়ে পড়ে থাকে না। পুরোনো অভ্যাসমতো মাঝেমধ্যে সেখানে যায়, খানিকক্ষণ থেকে আবার চলে আসে। দরগার আজমত খাদেম ডাকলে একটু বসে। অন্য খাদেম ডাকলে তাড়া দেখায়।
আজকাল মনসুর পাগলার অবশ্য আরেকটা নতুন নেশা পেয়ে বসেছে, যেটা সে এখনও কাউকে বলেনি। এমনকি আনিসকেও না। সে লুকিয়ে লুকিয়ে মমিনাকে দেখে। মমিনা যখন পুকুরের ঘাটে গোছল করতে নামে তখন সে পুকুরের অন্যদিকের ঘাটে বা গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে তা দেখে। সে অপেক্ষায় থাকে মমিনা কখন তার মা’র সঙ্গে দেখা করতে আসবে। সে কিছুই বলে না, শুধু মমিনার কথা শোনে। তার কাছাকাছি বসে থাকতে ভালো লাগে। তাকে যখন মমিনা টুকটাক এটাসেটা এগিয়ে দেয়, সেটাও তার ভালো লাগে।
বেশ অনেক দিন হয়ে গেল মনসুর পাগলা নারী সঙ্গিহীন। তিন-সাড়ে তিন বছর তো হবেই। আরও বেশি সময় হতে পারে। সে সেটা গুনে দেখেনি। কিন্তু তার কাছে সেটা আজকাল তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়। এর পেছনে প্রধান কারণ, তার মনে প্রেম জেগেছে। মনসুর পাগলা ভাবল, সে তার আগের দুই বউয়ের সঙ্গে খুব কি প্রেম-ভালোবাসা করেছিল? সে নিজে নিজেই মাথা নাড়ল, না, মোটেও নয়। জুলেখাকে সে বিয়ে করেছিল অতি অল্প বয়সে। প্রেম-ভালোবাসা বা এসব অনুভূতির কিছুই সে বোঝেনি। শরীরের চাহিদা ছিল শুধু। কিন্তু মন টানত না। এজন্য সে সারাদিন মস্তানের দরগায় গিয়ে পড়ে থাকত। সেতারা বেগমকে বিয়ের পরও তার একই হাল হয়েছিল। শরীর টানত, মন টানত না। যদিও তখন তার বুঝ হয়েছিল। তবে সেতারা বেগমকে যে তার একেবারে মনে ধরেনি, তা নয়। নাদুসনুদুস শরীর, মায়াবী চোখ, গোলাগাল ভরাট চেহারা তাকে কখনও কখনও নেশা ধরিরে দিত। কিন্তু শরীরের চাহিদা পূর্ণ হওয়ার পর কেন জানি তার সেই নেশাটা আর থাকত না। এজন্য সে মস্তানের দরগায় পড়ে থেকে হেরে গলায় গান বাঁধত। মনের সব হাহাকার উগলে দিত। তখন সে খানিকটা শান্তি পেত।
কিন্তু আজকাল তার কী হয়েছে? মনসুর পাগলা ঠিক জানে না। তবে তার যে কিছু একটা হয়েছে সে তা স্পষ্টই বুঝতে পারছে। মমিনা যখন মন খারাপ করে তার মা’র কাছে এসে হাউমাউ করে কাঁদে, তখন তার অনেক দুঃখ হয়। আবার কখনও মমিনা মন খারাপ করে উদাস হয়ে দূরে তাকিয়ে থাকে, তার মনটা তখন খারাপ হয়ে যায়। তখন মমিনার পিঠ আলতো স্পর্শ করে তার সান্ত্বনা দিতে ইচ্ছে করে।
মমিনার স্বামীটা ফিরছে না। সেই যে শ্বশুরের দুটো গরু চুরি করে তার স্বামী মাস ছয়েক আগে পালিয়েছে, এরপর আর কোনো খবর নেই। আজ অব্দি একটা ফোন পর্যন্ত করেনি। তার স্বামীর যে মোবাইল নম্বরটা ছিল, সেটা বন্ধ। মমিনার কষ্ট দেখে মনসুর পাগলার মাঝেমধ্যে ইচ্ছে হয়, তার স্বামীকে খুঁজে বের করে আনতে। কিন্তু সে ইচ্ছেটুকু সঙ্গে সঙ্গে দমন করে নেয়। ভাবে, জুলেখা ও সেতারা বেগম তাকে ঘরে টেনে রাখতে পারেনি। মমিনার ক্ষেত্রেও মনে হয় এমনটা হয়েছে। স্বামীকে মমিনা ঘরে টেনে রাখতে পারেনি।
তবে মনসুর পাগলা একটা বিষয় ঠিকই বুঝতে পারে, মমিনা আজকাল তাকে কেমন করে যেন ঘরে টেনে রাখে। সারাদিন ক্ষেতে-খামারে থাকলেও বিকেলে ঘরে ফিরে পেছনের দিঘল পুকুরটায় গোছল সেরে প্যান্টশার্ট পরে সে ফুলবাবু সাজে শুধুমাত্র মমিনার জন্যই। আজকাল মীরবহরি বাজারে গেলেই যোগেশ পোদ্দারের মিষ্টান্নভাণ্ডার থেকে মা’র জন্য গুড়ের জিলাপি কিনে নিয়ে আসে। জিলাপি মা’র জন্য নিলেও মূলত তার ইচ্ছে থাকে, মমিনা যাতে দু-একটা জিলাপি খায়। মাঝেমধ্যে সে জোর দিয়ে বলে, ‘খা তো, মমিনা, জিলাপি খা। এত্তগুলান জিলাপি মা কি একলা খাইতে পারবে? একটা নিতাছস ক্যান, বেশি কইরা খা।’
মমিনা হেসে বলে, ‘ভাইজান, বাজারে গেলেই তো তুমি জিলাপি আনো। এত কি খাওয়ন যায়?’
মনসুর পাগলা জিজ্ঞেস করে, ‘তাইলে তোর লাইগা কী আনমু ক দেখিনি?
মমিনা একটু নিষ্প্রভ হয়ে বলে, ‘আমার লাইগা কিচ্ছু আনতে হইব না।’
আনিস মনসুর পাগলাকে একটা মোবাইল ফোন কিনে দিয়েছে। স্মার্টফোন, তবে খুব বেশি দামের নয়। তারপরও সে খুব খুশি। চ্যাপ্টা মোবাইলটা মুঠো করে ধরে সে মীরবহরি বাজারে হাঁটে। অযথাই মোবাইল কানে ধরে ‘হ্যালো-হ্যালো’ বলে। কখনও হেডফোন কানে দিয়ে গান শুনতে শুনতে বাজারের দুই গলি ধরেই পুব থেকে পশ্চিমে যায়। বাড়িতে মমিনা কাছে থাকলে চ্যাপ্টা মোবাইলটায় স্ক্রিনে চোখ রেখে সে এটাসেটা ঘাঁটাঘাঁটি করে। মমিনাকে সে কিছু একটা দেখাতে চায়। কিন্তু সে পারে না। কী একটা জড়তা এসে বারবার তাকে জড়িয়ে ধরে।
মনসুর পাগলার এই জড়তার পেছনে কারণও আছে। মমিনা বিবাহিত। যদিও স্বামী নিখোঁজ, তারপরও তো ছাড়াছাড়ি হয়নি। এছাড়া মমিনা তার চেয়ে কমপক্ষে চৌদ্দ-পনেরো বছরের ছোট। এদিকে সে আবার তার আপন চাচাত বোন। ছোটবেলা থেকে পিচ্চি-থিনথিনে মেয়েটা কখন-কীভাবে বড় হয়ে গেছে, সে তা খেয়ালই করেনি। অথচ মমিনা তার চোখের সামনেই বড় হয়েছে। এমনকি সে যখন জেলে যায়, তখনও এমনভাবে চোখে পড়েনি। কিন্তু জেল থেকে বের হয়ে বাড়িতে এসে প্রথম যখন মমিনাকে দেখে তার চোখ আটকে যায়। কেমন ভরাট শরীর, গোলগাল চেহারা, চোখ দুটোও কেমন টানাটানা হয়েছে। ভরাট শরীরের সঙ্গে গায়ে ফর্সা রঙ। সে মজে যায়। সেই মজে যাওয়াই ক্রমান্বয়ে ভেতরগত বোধের সৃষ্টি করে। কোনো বিকেলে মমিনা তাদের বাড়িতে না এলে তার ভেতরে আনচান শুরু হয়ে যায়। বিনা কারণে সে তার কেরামত চাচার খোঁজ নিতে যায়।
মনসুর পাগলা মাঝেমধ্যে ভাবে, মমিনা কি তার মনের এই বোধটুকু বুঝতে পারে? তার সন্দেহ হয়। বুঝতে পারলে নিশ্চয়ই সে এত ঘন ঘন তাদের বাড়িতে আসত না। এছাড়া মমিনা যে তার স্বামীর প্রতীক্ষায় এখনও অধীর হয়ে বসে আছে, সেটা তার চোখ দেখেই বোঝা যায়।
মা’র সঙ্গেও মনসুর পাগলা সহজে আর খারাপ ব্যবহার করে না। দু-একবার কটুকথা মুখে এলেও সে নিজেকে সামলে নেয়। মীরবহরি বাজারে গেলে নিজ থেকেই বাজার করে নিয়ে আসে। হাটের দিন কী কী আনতে হবে সেটা সে মাকে জিজ্ঞেস করে। খেতে বসলে পাশে বসার জন্য ডাকে। যদিও কমলা খাতুন আগের মতোই ঠ্যাঁটামারার দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। খুব সহজে কথা বলে না। এতে মনসুর পাগলা বিরক্ত হলেও গা করে না। নিজের কথাগুলো বলে চলে যায়।
মনসুর পাগলা আজ বুইদ্দার খাল ধরে নৌকা নিয়ে বের হয়েছে। প্রথমে যায় গোমতী নদীর দিকে। এমনিই। অনেক দিন পর নৌকাটা বাইছে বলে শখেই বলা যায়। ফিরে এসে এখন বুইদ্দার বিলের দিকে যাচ্ছে। আকাশে কতক্ষণ আগেও খুব বৃষ্টি হচ্ছিল। এখন বৃষ্টিটা ধরে এসেছে থেমে গেছে। তবে আকাশ এখনও মেঘলা। এদিকে বিকেলটাও পড়ে এসেছে। আকাশ মেঘলা বলে সময়টা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। তার কোমরে মোবাইলটা গোঁজা। সে ইচ্ছে করলে সময়টা দেখতে পারে। কিন্তু লগি ছেড়ে তার মোবাইলে সময়টা দেখতে ইচ্ছে হলো না।
মনসুর পাগলা খাল ধরে নৌকা নিয়ে ভুঁইয়াবাড়ির পূর্বদিকে চলে এলো। বুইদ্দার বিলের দিকের একটা বাঁশের খুঁটিতে নৌকাটা বেঁধে আনিসের একটি জমি এগোতে শুরু করল। বশির আগে থেকেই সেখানে আছে। সে দূর থেকে বশিরকে দেখল। বশিরের সঙ্গে ছয়জন ছুটা কামলা জমিতে ধানের চারা সারি করে বুনছে। ধানের চারা লাগানোর মওসুমে কামলারা বিকেলেও কাজ করে। অনেকে সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত অনেক অব্ধি ক্ষেতে ধানের চারা লাগায়।
মনসুর পাগলা ওদের কাছাকাছি হতেই একজন কামলার গান শুনল। সে মনের সুখে গান গাইছে।
‘বুইদ্দার মা কানতাছে বইলা ধইঞ্চার মা হাসতাছে
কাইন্দা মরা বুইদ্দার মা হাসতে হাসতে মরতাছে
কাইন্দা মরে ধইঞ্চার মা—
হাইসা মরে বুইদ্দার মা—
আজব এই দিন-দুনিয়ায়, হাসতে হাসতে মরতাছে সবাই
হাইসা মরে কান্দার মানুষ, হাসার মানুষ কানতাছে।’
মনসুর পাগলার গানটা খুব ভালো লাগল। গানটা যে গাইছে সে উত্তর পাড়ার মোছলেম মিয়া। মাঝেমধ্যেই ক্ষেতে কাজ করতে করতে গান গায়। তার গানের গলা অবশ্য তেমন ভালো না। তবুও খোলা মাঠে তার গান শুনতে ভালোই লাগে।
মনসুর পাগলা আগে পুনোয়ারা মস্তানের দরগায় গেলে গান গাইতে গাইতে কেঁদে ফেলত। কাঁদতে কাঁদতে আবার গান গাইত। তার গানের গলাও ভালো নয়। তবুও হেরে গলায় গাইত। গানের কথা কোথায় থেকে যে তার ভেতরে এসে জমা হতো, সে জানে না। আজমত খাদেম তার কাঁধে হাত রেখে বলত, ‘পাগলা, গলা খুইলা গা। পরাণ খুইলা গা। তোর ভিতরটা পাতলা হইব...।’
মনসুর পাগলা আজকাল আর দরগায় গিয়ে পরাণ খুলে গান গায় না।
বশির জিজ্ঞেস করল, ‘ভাইজান, এই আইলা?’
আনিসের পাশাপাশি বশির আজকাল তাকেও ‘ভাইজান’ সম্বোধনে ডাকে। বশিরের এই ডাকটা তার বেশ ভালো লাগে। আগে সে তাকে ‘পাগলা’ বলে ডাকত। আনিসের কারণে শুধু আঁধারিয়া গ্রামে নয়, মীরবহরি বাজারেও তাকে কেউ কেউ সম্মান করে।
মনসুর পাগলা বলল, ‘হ, অখনই আইলাম। এইখানে কাম ক্যামুন চলতাছে?’
বশির বলল, ‘মাটি অখনও পুরাপুরি নরম হয় নাই।’
‘কী কও? দুইবার হাল দেওয়া হইল। তিনদিন ধইরা বিস্টি হইল।’
‘মাটি ভালা না। আডাইল্যা মাটি।’
‘হেইডা ঠিক কইছ। নতুন রাস্তাটা হওয়ার পর গাঙের পানি তো আর হেই পাশে যাইতে পারে না। প্যাক জইমা-জইমা আডাইল্যা হইয়া গেছে। তয় ধানগাছের চারা আরেকটু ঘন ঘন লাগাইবা।’
‘ক্যান? ধানগাছের চারা ঘন ঘন লাগাইলে কী হইব?’
‘আডাইল্যা মাটিতে গাছ বেশি মোটা হয় না। তাই ঘন লাগাইতে কইছি।’
‘ও, আইচ্ছা। হেই কথা!’
‘আর ধানগাছের চারা মাটির ভিতরে আরও ডাবাইয়া লাগাইতে কও।
‘ডাবাইয়া ক্যান?
‘এতে ধানগাছের রগ তাড়াতাড়ি বাইর হইব। বড় হইব তাড়াতাড়ি।
বশির মৃদু হেসে বলল, ‘ভাইজান, তোমার মাথায় তো অনেক বুদ্ধি হইছে!’
মনসুর পাগলা একটা আকর্ণ হাসি দিল— হেহে, হেহে। মুখে কিছু বলল না। বুইদ্দার বিলের এদিকওদিক তাকাল। কোনো কোনো জমিতে এরই মধ্যে ধানের চারা লাগানো হয়েছে। কোনো জমিতে সবে লাগানো হচ্ছে। অনেক জমি এখনও ফাঁকা। তবে আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই সব জমিতে ধানের চারা লাগানো হবে। উত্তরের জোয়ারের জল আসার আগেই ধানের চারাগুলো সতেজ হয়ে উঠতে হবে। তবেই না জোয়ার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ধানগাছগুলো গলা উজিয়ে বাড়বে।
মনসুর পাগলা বলল, ‘আমি অখন যাই।’
বশির জিজ্ঞেস করল, ‘সবে তো আইলা। অখনই যাইবা গা?
মনসুর পাগলা পাল্টা জিজ্ঞেস করল, ‘ক্যান, আমার এখানে কোনো কাম আছে?
বশির বলল, ‘না, না, কোনো কাম নাই। এমনই জিগাইলাম।
মনসুর পাগলা বলল, ‘ও।’ বলেই একটু থামল। তারপর কী ভেবে বলল, ‘আসলে বাড়িত যাইমু। বাড়িত কাম আছে।’
‘বাড়িত তোমার এত কী কাম?’
‘বাড়িত কত কামই তো থাকবার পারে।’
‘না মানে, বিলে আইলেই ঘন ঘন খালি বাড়িত যাও?’
মনসুর পাগলা একটা লাজুক হাসি দিয়ে বলল, ‘বাড়িতে আমার কী কাম, তোমারে হেইডা বুঝাইতে পারমু না। ক্রমশ...

বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৫ অক্টোবর ২০২৬
দ্বিতীয় পর্ব: মমিনার জীবন
(পূর্ব প্রকাশের পর)
আট.
তিন দিনের টানা বৃষ্টির কারণে গোমতী নদীতে এখন ভরাট বান। গোমতীর জল ফুলে-ফেঁপে বুইদ্দার খালে উঠে এসেছে খালের শেষ অব্ধি। কিন্তু এখনও উত্তর থেকে আসা জোয়ারের জল এসে বুইদ্দার বিলে ওঠেনি। তবে হাল দেওয়ার পর জমিতে বৃষ্টির কারণে জল জমে ধানের চারা লাগাতে সুবিধা হচ্ছে। আনিসের জমির বর্গাদারেরা ধানের চারা লাগাচ্ছে। কিছু জমি আনিস এবার নিজেও চাষ করছে। বশির কাদাজল মাড়িয়ে সেগুলো ঘুরে ঘুরে দেখছে।
মনসুর পাগলাও এবার নিজেদের বেশ কিছু জমি নিজেই দেখাশোনা করছে। হালচাষ থেকে শুরু করে বৃষ্টিটির জল জমানোর জন্য ক্ষেতের আইল ঠিক করা, ছুটা কামলাদের নিয়ে সারি করে ধানের চারা লাগানো, চারা লাগানোর পরপর সার ছিটানো, সবই সে করছে। বাড়তি হিসেবে মাঝেমধ্যে বশিরে সঙ্গে গিয়ে আনিসের জমিগুলোরও তদারকি করে। আনিসই তাকে সেই দায়িত্ব দিয়ে গেছে।
আনিস এখন মাসে একবার হলেও বাড়িতে আসে। গ্রামের পাশ দিয়ে নতুন রাস্তাটা হওয়াতে তার বাড়িতে আসতে অনেক সুবিধা হয়েছে। মোটর সাইকেলে টেনে চলে আসতে পারে।
আনিস বাড়িতে এলে সবচেয়ে আনন্দে থাকে মনসুর পাগলা। সে তার মোটর সাইকেলে করে মীরবহরি বাজারে ঘোরে। একবার প্যান্ট-শার্ট পরে সে মোটর সাইকেল চড়ে আনিসের সঙ্গে উপজেলা সদরে পর্যন্ত গিয়েছিল। সদরে গিয়ে আনিস যখন থানার ওসি মহিউদ্দিন আহমেদের সঙ্গে হেসে হেসে সাহিত্য নিয়ে আলাপ করছিল, তখন পাশের চেয়ারে বসে তার ছাতি অনেক চওড়া হয়ে গিয়েছিল।
এদিকে নতুন রাস্তাটার কারণে আঁধারিয়া গ্রামেও বেশ পরিবর্তন এসেছে। আগে কেউ মধ্যপ্রাচ্য বা মালয়েশিয়া গেলে উপজেলা সদরের দিকে বাড়ি করার চিন্তা করত। এখন ওরা রাস্তাটার কারণে নিজ বাড়িতেই দালান তোলা শুরু করেছে। গ্রামের উত্তর পাড়ায় করিম শেখের পোলা আব্দু কুয়েত থেকে এসে বাড়িতে দালান তুলছে। উত্তর পাড়ার ছালেক মেম্বরের পোলা ইব্রাহীম দুবাই থেকে এসে পশ্চিম পাড়ায় দালান তুলবে বলে মাটি দিয়ে একটা জমি ভরাট করছে। সে নাকি দোতলা দালান তুলবে। ইব্রাহীম ছালেক মেম্বরের পোলা, দোতলা দালান তুলতেই পারে।
মনসুর পাগলার মধ্যেও বেশ পরিবর্তন এসেছে। তার মাথার পাগলামিটা অনেকটাই চলে গেছে। শুধু পুকুরের জলে নামলে সাঁতরে খুব বেশি এপার-ওপার করে। সে আর আগের মতো পুনোয়ারার মস্তানের দরগায় গিয়ে পড়ে থাকে না। পুরোনো অভ্যাসমতো মাঝেমধ্যে সেখানে যায়, খানিকক্ষণ থেকে আবার চলে আসে। দরগার আজমত খাদেম ডাকলে একটু বসে। অন্য খাদেম ডাকলে তাড়া দেখায়।
আজকাল মনসুর পাগলার অবশ্য আরেকটা নতুন নেশা পেয়ে বসেছে, যেটা সে এখনও কাউকে বলেনি। এমনকি আনিসকেও না। সে লুকিয়ে লুকিয়ে মমিনাকে দেখে। মমিনা যখন পুকুরের ঘাটে গোছল করতে নামে তখন সে পুকুরের অন্যদিকের ঘাটে বা গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে তা দেখে। সে অপেক্ষায় থাকে মমিনা কখন তার মা’র সঙ্গে দেখা করতে আসবে। সে কিছুই বলে না, শুধু মমিনার কথা শোনে। তার কাছাকাছি বসে থাকতে ভালো লাগে। তাকে যখন মমিনা টুকটাক এটাসেটা এগিয়ে দেয়, সেটাও তার ভালো লাগে।
বেশ অনেক দিন হয়ে গেল মনসুর পাগলা নারী সঙ্গিহীন। তিন-সাড়ে তিন বছর তো হবেই। আরও বেশি সময় হতে পারে। সে সেটা গুনে দেখেনি। কিন্তু তার কাছে সেটা আজকাল তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়। এর পেছনে প্রধান কারণ, তার মনে প্রেম জেগেছে। মনসুর পাগলা ভাবল, সে তার আগের দুই বউয়ের সঙ্গে খুব কি প্রেম-ভালোবাসা করেছিল? সে নিজে নিজেই মাথা নাড়ল, না, মোটেও নয়। জুলেখাকে সে বিয়ে করেছিল অতি অল্প বয়সে। প্রেম-ভালোবাসা বা এসব অনুভূতির কিছুই সে বোঝেনি। শরীরের চাহিদা ছিল শুধু। কিন্তু মন টানত না। এজন্য সে সারাদিন মস্তানের দরগায় গিয়ে পড়ে থাকত। সেতারা বেগমকে বিয়ের পরও তার একই হাল হয়েছিল। শরীর টানত, মন টানত না। যদিও তখন তার বুঝ হয়েছিল। তবে সেতারা বেগমকে যে তার একেবারে মনে ধরেনি, তা নয়। নাদুসনুদুস শরীর, মায়াবী চোখ, গোলাগাল ভরাট চেহারা তাকে কখনও কখনও নেশা ধরিরে দিত। কিন্তু শরীরের চাহিদা পূর্ণ হওয়ার পর কেন জানি তার সেই নেশাটা আর থাকত না। এজন্য সে মস্তানের দরগায় পড়ে থেকে হেরে গলায় গান বাঁধত। মনের সব হাহাকার উগলে দিত। তখন সে খানিকটা শান্তি পেত।
কিন্তু আজকাল তার কী হয়েছে? মনসুর পাগলা ঠিক জানে না। তবে তার যে কিছু একটা হয়েছে সে তা স্পষ্টই বুঝতে পারছে। মমিনা যখন মন খারাপ করে তার মা’র কাছে এসে হাউমাউ করে কাঁদে, তখন তার অনেক দুঃখ হয়। আবার কখনও মমিনা মন খারাপ করে উদাস হয়ে দূরে তাকিয়ে থাকে, তার মনটা তখন খারাপ হয়ে যায়। তখন মমিনার পিঠ আলতো স্পর্শ করে তার সান্ত্বনা দিতে ইচ্ছে করে।
মমিনার স্বামীটা ফিরছে না। সেই যে শ্বশুরের দুটো গরু চুরি করে তার স্বামী মাস ছয়েক আগে পালিয়েছে, এরপর আর কোনো খবর নেই। আজ অব্দি একটা ফোন পর্যন্ত করেনি। তার স্বামীর যে মোবাইল নম্বরটা ছিল, সেটা বন্ধ। মমিনার কষ্ট দেখে মনসুর পাগলার মাঝেমধ্যে ইচ্ছে হয়, তার স্বামীকে খুঁজে বের করে আনতে। কিন্তু সে ইচ্ছেটুকু সঙ্গে সঙ্গে দমন করে নেয়। ভাবে, জুলেখা ও সেতারা বেগম তাকে ঘরে টেনে রাখতে পারেনি। মমিনার ক্ষেত্রেও মনে হয় এমনটা হয়েছে। স্বামীকে মমিনা ঘরে টেনে রাখতে পারেনি।
তবে মনসুর পাগলা একটা বিষয় ঠিকই বুঝতে পারে, মমিনা আজকাল তাকে কেমন করে যেন ঘরে টেনে রাখে। সারাদিন ক্ষেতে-খামারে থাকলেও বিকেলে ঘরে ফিরে পেছনের দিঘল পুকুরটায় গোছল সেরে প্যান্টশার্ট পরে সে ফুলবাবু সাজে শুধুমাত্র মমিনার জন্যই। আজকাল মীরবহরি বাজারে গেলেই যোগেশ পোদ্দারের মিষ্টান্নভাণ্ডার থেকে মা’র জন্য গুড়ের জিলাপি কিনে নিয়ে আসে। জিলাপি মা’র জন্য নিলেও মূলত তার ইচ্ছে থাকে, মমিনা যাতে দু-একটা জিলাপি খায়। মাঝেমধ্যে সে জোর দিয়ে বলে, ‘খা তো, মমিনা, জিলাপি খা। এত্তগুলান জিলাপি মা কি একলা খাইতে পারবে? একটা নিতাছস ক্যান, বেশি কইরা খা।’
মমিনা হেসে বলে, ‘ভাইজান, বাজারে গেলেই তো তুমি জিলাপি আনো। এত কি খাওয়ন যায়?’
মনসুর পাগলা জিজ্ঞেস করে, ‘তাইলে তোর লাইগা কী আনমু ক দেখিনি?
মমিনা একটু নিষ্প্রভ হয়ে বলে, ‘আমার লাইগা কিচ্ছু আনতে হইব না।’
আনিস মনসুর পাগলাকে একটা মোবাইল ফোন কিনে দিয়েছে। স্মার্টফোন, তবে খুব বেশি দামের নয়। তারপরও সে খুব খুশি। চ্যাপ্টা মোবাইলটা মুঠো করে ধরে সে মীরবহরি বাজারে হাঁটে। অযথাই মোবাইল কানে ধরে ‘হ্যালো-হ্যালো’ বলে। কখনও হেডফোন কানে দিয়ে গান শুনতে শুনতে বাজারের দুই গলি ধরেই পুব থেকে পশ্চিমে যায়। বাড়িতে মমিনা কাছে থাকলে চ্যাপ্টা মোবাইলটায় স্ক্রিনে চোখ রেখে সে এটাসেটা ঘাঁটাঘাঁটি করে। মমিনাকে সে কিছু একটা দেখাতে চায়। কিন্তু সে পারে না। কী একটা জড়তা এসে বারবার তাকে জড়িয়ে ধরে।
মনসুর পাগলার এই জড়তার পেছনে কারণও আছে। মমিনা বিবাহিত। যদিও স্বামী নিখোঁজ, তারপরও তো ছাড়াছাড়ি হয়নি। এছাড়া মমিনা তার চেয়ে কমপক্ষে চৌদ্দ-পনেরো বছরের ছোট। এদিকে সে আবার তার আপন চাচাত বোন। ছোটবেলা থেকে পিচ্চি-থিনথিনে মেয়েটা কখন-কীভাবে বড় হয়ে গেছে, সে তা খেয়ালই করেনি। অথচ মমিনা তার চোখের সামনেই বড় হয়েছে। এমনকি সে যখন জেলে যায়, তখনও এমনভাবে চোখে পড়েনি। কিন্তু জেল থেকে বের হয়ে বাড়িতে এসে প্রথম যখন মমিনাকে দেখে তার চোখ আটকে যায়। কেমন ভরাট শরীর, গোলগাল চেহারা, চোখ দুটোও কেমন টানাটানা হয়েছে। ভরাট শরীরের সঙ্গে গায়ে ফর্সা রঙ। সে মজে যায়। সেই মজে যাওয়াই ক্রমান্বয়ে ভেতরগত বোধের সৃষ্টি করে। কোনো বিকেলে মমিনা তাদের বাড়িতে না এলে তার ভেতরে আনচান শুরু হয়ে যায়। বিনা কারণে সে তার কেরামত চাচার খোঁজ নিতে যায়।
মনসুর পাগলা মাঝেমধ্যে ভাবে, মমিনা কি তার মনের এই বোধটুকু বুঝতে পারে? তার সন্দেহ হয়। বুঝতে পারলে নিশ্চয়ই সে এত ঘন ঘন তাদের বাড়িতে আসত না। এছাড়া মমিনা যে তার স্বামীর প্রতীক্ষায় এখনও অধীর হয়ে বসে আছে, সেটা তার চোখ দেখেই বোঝা যায়।
মা’র সঙ্গেও মনসুর পাগলা সহজে আর খারাপ ব্যবহার করে না। দু-একবার কটুকথা মুখে এলেও সে নিজেকে সামলে নেয়। মীরবহরি বাজারে গেলে নিজ থেকেই বাজার করে নিয়ে আসে। হাটের দিন কী কী আনতে হবে সেটা সে মাকে জিজ্ঞেস করে। খেতে বসলে পাশে বসার জন্য ডাকে। যদিও কমলা খাতুন আগের মতোই ঠ্যাঁটামারার দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। খুব সহজে কথা বলে না। এতে মনসুর পাগলা বিরক্ত হলেও গা করে না। নিজের কথাগুলো বলে চলে যায়।
মনসুর পাগলা আজ বুইদ্দার খাল ধরে নৌকা নিয়ে বের হয়েছে। প্রথমে যায় গোমতী নদীর দিকে। এমনিই। অনেক দিন পর নৌকাটা বাইছে বলে শখেই বলা যায়। ফিরে এসে এখন বুইদ্দার বিলের দিকে যাচ্ছে। আকাশে কতক্ষণ আগেও খুব বৃষ্টি হচ্ছিল। এখন বৃষ্টিটা ধরে এসেছে থেমে গেছে। তবে আকাশ এখনও মেঘলা। এদিকে বিকেলটাও পড়ে এসেছে। আকাশ মেঘলা বলে সময়টা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। তার কোমরে মোবাইলটা গোঁজা। সে ইচ্ছে করলে সময়টা দেখতে পারে। কিন্তু লগি ছেড়ে তার মোবাইলে সময়টা দেখতে ইচ্ছে হলো না।
মনসুর পাগলা খাল ধরে নৌকা নিয়ে ভুঁইয়াবাড়ির পূর্বদিকে চলে এলো। বুইদ্দার বিলের দিকের একটা বাঁশের খুঁটিতে নৌকাটা বেঁধে আনিসের একটি জমি এগোতে শুরু করল। বশির আগে থেকেই সেখানে আছে। সে দূর থেকে বশিরকে দেখল। বশিরের সঙ্গে ছয়জন ছুটা কামলা জমিতে ধানের চারা সারি করে বুনছে। ধানের চারা লাগানোর মওসুমে কামলারা বিকেলেও কাজ করে। অনেকে সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত অনেক অব্ধি ক্ষেতে ধানের চারা লাগায়।
মনসুর পাগলা ওদের কাছাকাছি হতেই একজন কামলার গান শুনল। সে মনের সুখে গান গাইছে।
‘বুইদ্দার মা কানতাছে বইলা ধইঞ্চার মা হাসতাছে
কাইন্দা মরা বুইদ্দার মা হাসতে হাসতে মরতাছে
কাইন্দা মরে ধইঞ্চার মা—
হাইসা মরে বুইদ্দার মা—
আজব এই দিন-দুনিয়ায়, হাসতে হাসতে মরতাছে সবাই
হাইসা মরে কান্দার মানুষ, হাসার মানুষ কানতাছে।’
মনসুর পাগলার গানটা খুব ভালো লাগল। গানটা যে গাইছে সে উত্তর পাড়ার মোছলেম মিয়া। মাঝেমধ্যেই ক্ষেতে কাজ করতে করতে গান গায়। তার গানের গলা অবশ্য তেমন ভালো না। তবুও খোলা মাঠে তার গান শুনতে ভালোই লাগে।
মনসুর পাগলা আগে পুনোয়ারা মস্তানের দরগায় গেলে গান গাইতে গাইতে কেঁদে ফেলত। কাঁদতে কাঁদতে আবার গান গাইত। তার গানের গলাও ভালো নয়। তবুও হেরে গলায় গাইত। গানের কথা কোথায় থেকে যে তার ভেতরে এসে জমা হতো, সে জানে না। আজমত খাদেম তার কাঁধে হাত রেখে বলত, ‘পাগলা, গলা খুইলা গা। পরাণ খুইলা গা। তোর ভিতরটা পাতলা হইব...।’
মনসুর পাগলা আজকাল আর দরগায় গিয়ে পরাণ খুলে গান গায় না।
বশির জিজ্ঞেস করল, ‘ভাইজান, এই আইলা?’
আনিসের পাশাপাশি বশির আজকাল তাকেও ‘ভাইজান’ সম্বোধনে ডাকে। বশিরের এই ডাকটা তার বেশ ভালো লাগে। আগে সে তাকে ‘পাগলা’ বলে ডাকত। আনিসের কারণে শুধু আঁধারিয়া গ্রামে নয়, মীরবহরি বাজারেও তাকে কেউ কেউ সম্মান করে।
মনসুর পাগলা বলল, ‘হ, অখনই আইলাম। এইখানে কাম ক্যামুন চলতাছে?’
বশির বলল, ‘মাটি অখনও পুরাপুরি নরম হয় নাই।’
‘কী কও? দুইবার হাল দেওয়া হইল। তিনদিন ধইরা বিস্টি হইল।’
‘মাটি ভালা না। আডাইল্যা মাটি।’
‘হেইডা ঠিক কইছ। নতুন রাস্তাটা হওয়ার পর গাঙের পানি তো আর হেই পাশে যাইতে পারে না। প্যাক জইমা-জইমা আডাইল্যা হইয়া গেছে। তয় ধানগাছের চারা আরেকটু ঘন ঘন লাগাইবা।’
‘ক্যান? ধানগাছের চারা ঘন ঘন লাগাইলে কী হইব?’
‘আডাইল্যা মাটিতে গাছ বেশি মোটা হয় না। তাই ঘন লাগাইতে কইছি।’
‘ও, আইচ্ছা। হেই কথা!’
‘আর ধানগাছের চারা মাটির ভিতরে আরও ডাবাইয়া লাগাইতে কও।
‘ডাবাইয়া ক্যান?
‘এতে ধানগাছের রগ তাড়াতাড়ি বাইর হইব। বড় হইব তাড়াতাড়ি।
বশির মৃদু হেসে বলল, ‘ভাইজান, তোমার মাথায় তো অনেক বুদ্ধি হইছে!’
মনসুর পাগলা একটা আকর্ণ হাসি দিল— হেহে, হেহে। মুখে কিছু বলল না। বুইদ্দার বিলের এদিকওদিক তাকাল। কোনো কোনো জমিতে এরই মধ্যে ধানের চারা লাগানো হয়েছে। কোনো জমিতে সবে লাগানো হচ্ছে। অনেক জমি এখনও ফাঁকা। তবে আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই সব জমিতে ধানের চারা লাগানো হবে। উত্তরের জোয়ারের জল আসার আগেই ধানের চারাগুলো সতেজ হয়ে উঠতে হবে। তবেই না জোয়ার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ধানগাছগুলো গলা উজিয়ে বাড়বে।
মনসুর পাগলা বলল, ‘আমি অখন যাই।’
বশির জিজ্ঞেস করল, ‘সবে তো আইলা। অখনই যাইবা গা?
মনসুর পাগলা পাল্টা জিজ্ঞেস করল, ‘ক্যান, আমার এখানে কোনো কাম আছে?
বশির বলল, ‘না, না, কোনো কাম নাই। এমনই জিগাইলাম।
মনসুর পাগলা বলল, ‘ও।’ বলেই একটু থামল। তারপর কী ভেবে বলল, ‘আসলে বাড়িত যাইমু। বাড়িত কাম আছে।’
‘বাড়িত তোমার এত কী কাম?’
‘বাড়িত কত কামই তো থাকবার পারে।’
‘না মানে, বিলে আইলেই ঘন ঘন খালি বাড়িত যাও?’
মনসুর পাগলা একটা লাজুক হাসি দিয়ে বলল, ‘বাড়িতে আমার কী কাম, তোমারে হেইডা বুঝাইতে পারমু না। ক্রমশ...

আপনার মতামত লিখুন