সংবাদ

ধারাবাহিক সৌন্দর্য-ভাবনা ০১

গোধূলির নন্দনভাষ্য


মাহফুজ আল-হোসেন
মাহফুজ আল-হোসেন
প্রকাশ: ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ১২:২৪ এএম

গোধূলির নন্দনভাষ্য
চিত্র: এ. আই.

মানব সভ্যতার আদিম গুহাচিত্র থেকে সমকালীন শিল্পসাহিত্যের বহুমাত্রিক নন্দনবিশ্ব পর্যন্ত মানুষের সৌন্দর্যচেতনা, সৃজনপ্রবণতা ও অস্তিত্বজিজ্ঞাসার এক অভিনব অভিযাত্রা নিয়ে কবি ও নন্দনতাত্ত্বিক মাহফুজ আল-হোসেন-এর ধারাবাহিক নন্দনভাবনা ‘গোধূলির নন্দনভাষ্য’ আজ থেকে শুরু হয়ে প্রতি বৃহস্পতিবার ‘সংবাদ সাময়িকী’র সাপ্তাহিক সাহিত্যায়োজনে প্রকাশিত হবে। শিল্পের উৎস, সৌন্দর্যের দর্শন, মানুষের মৃত্যুচেতনা, অপরাধবোধ, প্রেম, রোমান্টিকতা এবং সৃজনশীলতার বিবর্তন এই নন্দনভাবনায় লাভ করেছে এক স্বতন্ত্র সৌন্দর্যতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সাহিত্য, দর্শন, চিত্রকলা, পুরাণ, মনস্তত্ত্ব ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের আন্তঃসম্পর্ক অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে লেখক নির্মাণ করেছেন তুলনামূলক নন্দন ভুবনের এক বিস্তৃত পরিসর। ক্লাসিক্যাল থেকে শুরু করে আধুনিক, উত্তরাধুনিক এবং  সমকালীন চিন্তকদের তাত্ত্বিক উত্তরাধিকার এখানে সংলাপ রচনা করেছে বাংলা ও বিশ্বসাহিত্যের কালজয়ী সৃষ্টিসম্ভারের সঙ্গে। ‘সংবাদ সাময়িকী’র পাঠকদের এই ব্যতিক্রমী মননযাত্রায় স্বাগত জানিয়ে আমরা প্রত্যাশা করি, গোধূলির আলো-আঁধারিতে উন্মোচিত হবে শিল্প, জীবন ও মানবসভ্যতার অন্তর্লীন সৌন্দর্যের এক অনিঃশেষ মহাবিশ্ব। —বি. স. 

***

অন্ধকার গুহায় সৌন্দর্যের প্রথম আলোকরেখা

এই মানুষটি কে ছিল সে সম্পর্কে আমরা কিছুই জানি না। কী ছিল তার নাম? “আর নামে কীইবা আসে যায়, গোলাপকে যদি অন্য নামে ডাকা হয় তবুও তো ছড়াবে তার সৌরভ।” না কোনো নাম ইতিহাস সংরক্ষণ করেনি, তার মুখের আদল কোনো পাথরে খোদাই হয়নি; কোন ভাষায় সে কথা বলত, আদৌ আমাদের মতো সুসংবদ্ধ কোনো ভাষার ভেতরে সে তার ভয়, ক্ষুধা, প্রেম কিংবা মৃত্যুচেতনাকে বিন্যস্ত করতে পারত কি না তাও রয়ে গেছে আমাদের জানার বাইরে। আমরা এটি জানি না কোন শীতে সে অসুস্থ হয়েছিল, কোন শিকারে প্রথম আহত হয়েছিল, কাকে প্রথম স্পর্শ করে তার শরীরের ভিতরে এক অদ্ভুত অনির্বচনীয় আলোড়ন টের পেয়েছিল, কিংবা কোন নির্জন রাতে হঠাৎ আকাশের দিকে তাকিয়ে মৃত্যুর পর নিজের অনুপস্থিতিকে কল্পনা করতে গিয়ে আতঙ্কিত হয়ে উঠেছিল। শুধু এটুকু জানি, বহু সহস্র বছর আগে কোনো এক সময়ে সে একটি অন্ধকার গুহার গভীরে প্রবেশ করেছিল। বাইরে হয়তো বরফশীতল বাতাস, দূরে অরণ্যের পশু, মাথার উপরে এমন এক নক্ষত্রভরা আকাশ যার জ্যোতির্বিদ্যা তার অজানা, অথচ যার দিকে তাকিয়ে বিস্মিত হওয়ার ক্ষমতা তার ছিল। জীবন তখন ছিল নির্মমভাবে প্রত্যক্ষ আর ভীষণ রকমের একরোখা আর একরৈখিক— ক্ষুধা, তৃষ্ণা, ভয়, শিকার, আগুন, প্রজনন, আঘাত, মৃত্যু। অথচ এই অনিবার্যতার মধ্যেই একদিন সে এমন কিছু করল যার তাৎক্ষণিক কোনো খাদ্যমূল্য ছিল না, কোনো চামড়া বা অস্ত্রের বিকল্প ছিল না, শীত থেকে রক্ষার কোনো কৌশলও নয়। হঠাৎ সে পাথরের গায়ে আরেকটি পাথর দিয়ে প্রথমে একটি রেখা টানল। তারপর আরেকটি, তারপর আরো একটি। রেখা বাঁক নিল, পাথরের স্বাভাবিক উঁচুনিচুতে শরীর পেল, কোনো প্রস্তরখণ্ডের ফোলা অংশ হয়ে উঠল বাইসনের কাঁধ, একটি গাঢ় দাগে জন্ম নিল চোখ, কোনো একটি বাঁক হয়ে উঠলো শিং, কোনো ছায়া পেট; অন্ধকার গুহার মৃত পাথরে যেন হঠাৎ প্রাণের গতি ফিরে এল। বাস্তবের পশু সেখানে নেই, অথচ তার উপস্থিতি আছে। সেখানেই সম্ভবত মানুষের আত্মপরিচয়ের এক মৌলিক পরিবর্তন ঘটে গেল। হোমো স্যাপিয়েন্স পৃথিবীতে শিকার করে খেয়ে দেয়ে বেঁচে থাকা প্রাণি আর রইল না; সে পৃথিবীকে পুনরায় নির্মাণ করার প্রাণি হয়ে উঠল।

স্পেনের আলতামিরা গুহায় সংরক্ষিত সেই প্রাগৈতিহাসিক শিল্প আমাদের আজও থমকে দেয়। লাল, কালো, বাদামি রঙের স্তরে স্তরে আঁকা বাইসন, ঘোড়া, হরিণ ও নানা সংকেতকে আমরা যতই ‘গুহাচিত্র’ বলে একাডেমিক নাম দিই, তাদের সামনে দাঁড়ালে আসলে মনে হয় আমরা মানুষের প্রথম সৌন্দর্য-অপরাধের সাক্ষী আর নৈমিত্তিক প্রয়োজনের কঠোর নিয়ম ভেঙে সে প্রথমবার কিছু ‘অপ্রয়োজনীয়’ সৃষ্টি করেছিল। অথচ এই অপ্রয়োজনীয়তাই পরে মানুষের সবচেয়ে জরুরি প্রয়োজন হয়ে উঠবে কে জানত। খাদ্য তাকে জীবিত রাখে, কিন্তু শিল্প তাকে বলে সে কেন বেঁচে আছে। আশ্রয় তাকে রক্ষা করে, কিন্তু শিল্প তাকে নিজের অন্তর্গত অন্ধকারে প্রবেশের পথ দেখায়। আগুন তাকে উষ্ণতা দেয়, কিন্তু রেখা তাকে স্মৃতি দেয়। এই দিক থেকে শিল্পের ইতিহাস সভ্যতার অলংকার নয়; সভ্যতার আত্মসচেতনতার ইতিহাস।

আলতামিরার সামনে দাঁড়ালে আমাদের প্রথম প্রশ্ন তাই সৌন্দর্য নিয়ে নয়, প্রয়োজন নিয়ে— মানুষ ছবি আঁকল কেন? যে মানুষ শিকার না পেলে অনাহারে মরবে, সে কেন অন্ধকার গুহার এমন গভীরে গিয়ে পশুর রেখা নির্মাণ করল, যেখানে বসবাসের সুবিধাও সীমিত? হতে পারে, এ ছিল শিকারের পূর্ববর্তী আচার; হতে পারে, বাস্তব পশুকে প্রতীকে বন্দী করে তার ওপর জাদুকরী কর্তৃত্ব অর্জনের চেষ্টা; হতে পারে, প্রজনন, মৃত্যু, প্রাণশক্তি ও অদৃশ্য জগতের সঙ্গে যোগাযোগের কোনো রিচুয়াল; হতে পারে, কোনো গোষ্ঠীগত স্মৃতির দৃশ্যরূপ। আবার এমনও হতে পারে যে কোনো এক বিস্ময়গ্রস্ত মানুষ কেবল দেখেছিল পশুটি কী আশ্চর্যভাবে দৌড়ায় এবং সেই গতিকে সে হয়তো হারিয়ে যেতে দিতে চায়নি। আমরা নিশ্চিত নই, আর সম্ভবত নিশ্চিত হতে না পারাই তো শিল্পের রহস্যময়তাকে বাঁচিয়ে রাখে। শিল্পের জন্মের পাশে একটি অনুলিখিত অন্ধকার থাকাই যেন তার নিয়তি।

তবে একটি ঘটনা সেখানে নিশ্চিতভাবে ঘটে গিয়েছিল, মানুষ যখন আবিষ্কার করেছিল representation, অনুপস্থিতকে চিহ্নের মাধ্যমে উপস্থিত করার ক্ষমতা। গুহার বাইসন তখন আর বাইসন নয়; সে রঞ্জক, রেখা, পাথর, আলো ও মানবহাতের সমন্বয়। অথচ আমরা  তার দিকে তাকিয়ে বলি এই তো বাইসন!  অথচ এই সহজ ঘটনাটি মানবচেতনার এক মহাবিপ্লব। একটি বস্তু অন্য একটি বস্তুকে নির্দেশ করতে পারে; একটি রেখা পশু হতে পারে, একটি শব্দ জল না হয়েও ‘জল’ জাগাতে পারে, একটি মুখ না থেকেও প্রতিকৃতি হতে পারে, মৃত কেউ গল্পে ফিরে আসতে পারে, হারানো প্রেমিকা কবিতায় আবার হাঁটতে পারে, শেষ হয়ে যাওয়া যুদ্ধ চিত্রকলায় আবার বিস্ফোরিত হতে পারে। মানুষের সাংকেতিক ক্ষমতার মহাদেশ যেন এই অন্ধকার গুহাতেই প্রথম দৃশ্যমান হয়।

হাজার হাজার বছর পরে গ্রিক দর্শন এই প্রক্রিয়ার একটি ধারণাগত নাম দেবে মিমেসিস। প্লেটো শিল্পকে সন্দেহের চোখে দেখেছিলেন, কারণ তাঁর কাছে দৃশ্যমান জগতই ছিল চিরন্তন আদিরূপের অসম্পূর্ণ প্রতিফলন; শিল্প যদি আবার সেই দৃশ্যমানতার অনুকরণ করে, তবে শিল্প সত্য থেকে যেন আরও এক ধাপ দূরে সরে যায়। কিন্তু আলতামিরার বাইসন প্লেটোর আপত্তিকে নীরবে জটিল করে তোলে। কারণ গুহাশিল্পী কি সত্যিই বাস্তব বাইসনের নিছক অনুলিপি নির্মাণ করেছিল? বাস্তব পশু চলছিল, দৌড়াচ্ছিল, শ্বাস নিচ্ছিল, কখনো সামনে, কখনো পাশ ফিরে ছিল; শিল্পীকে তার মধ্যে থেকে একটি ভঙ্গি বেছে নিতে হয়েছে, একটি রেখাকে স্থির করতে হয়েছে, অন্যটি বাদ দিতে হয়েছে, পাথরের একটি উঁচু অংশকে কাঁধ হিসেবে কল্পনা করতে হয়েছে। অর্থাৎ শিল্প শুরু থেকেই নির্বাচন, ব্যাখ্যা, পুনর্গঠন। এরিস্টটল তাই নিমেসিসকে কেবল নকল হিসেবে দেখেননি; মানুষের অনুকরণপ্রবণতার মধ্যে তিনি জ্ঞান, পরিচয় ও আনন্দের উৎস দেখেছিলেন। শিল্প বাস্তবের ফটোকপি নয়; বাস্তবের সম্ভাব্য, গভীরতর বা আদর্শ রূপকে প্রকাশ করার এক সৃষ্টিশীল পদ্ধতি। সেই মুহূর্ত থেকে নন্দনতত্ত্বের প্রশ্ন আর শুধু ‘এটি কীসের মতো’ থাকে না; বরং প্রশ্ন হয়ে ওঠে ‘এটি আমাদের কী দেখতে শেখায়?’

কিন্তু ‘নন্দনতত্ত্ব’ শব্দটির স্বতন্ত্র দার্শনিক প্রতিষ্ঠা আসতে আরও বহু শতাব্দী লেগেছে। আঠারো শতকে জার্মান দার্শনিক আলেকজান্ডার গটলিব বমগার্টেন ‘এস্থেটিকা’ গ্রন্থে ‘এসথেটিকস’ শব্দটিকে দার্শনিক শাস্ত্রের মর্যাদা দেন। গ্রিক ‘আইসথেসিস’ অর্থাৎ, ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য উপলব্ধি থেকে তিনি এমন এক জ্ঞানক্ষেত্রের কথা ভাবলেন, যেখানে সত্য শুধু বিমূর্ত বুদ্ধির মাধ্যমে নয়, সংবেদনশীলতা, অনুভব, রূপ ও সৌন্দর্যের মাধ্যমেও ধরা পড়ে। নন্দন তখন আর নিছক শোভা নয়; সংবেদনশীল জ্ঞানের এক স্বতন্ত্র ক্ষেত্র। এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে আলতামিরার নামহীন শিল্পী যেন বমগার্টেনের বহু হাজার বছর আগে এক অপ্রাতিষ্ঠানিক নন্দনতাত্ত্বিক ইশতেহার ঘোষণা করে রেখেছিল, সেটি হলো মানুষ শুধু চিন্তাই করে না, অনুভব করেও সে জানে; শুধু ধারণা নির্মাণ করে না, রেখা ও রঙের মাধ্যমেও জগতকে বোঝে। কোনো পশুর শারীরিক গঠন সম্পর্কে তথ্য ও তার দ্রুতবেগে দৌড়ে যাওয়ার মুহূর্তে সচল প্রাণশক্তির জীবন্ত অভিজ্ঞতা এক জিনিস নয়; শিল্প যেন সেই দ্বিতীয়টির ভাষা।

এর পরের ইতিহাস হলো সময় যতো গড়াবে সৌন্দর্যের পাঠ আর শিল্গের রূপ ক্রমশ তত্ত্বের আশ্রয় পাবে। বমগার্টেন-এর পরে নন্দনতত্ত্বের ধারণা আরও বিকশিত হবে। কান্ট সৌন্দর্যের বিচারে অনাসক্ত আনন্দের কথা বলবেন, হেগেল শিল্পে আত্মার ঐতিহাসিক প্রকাশ দেখবেন, পরবর্তীকালে বেনিয়ামিন প্রযুক্তিগত পুনরুৎপাদনের যুগে শিল্পের ‘aura’-র প্রশ্ন তুলবেন; কিন্তু এসব তত্ত্বের বহু আগে মানুষের চোখ ও হাতের মধ্যে যে সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল, তার মূল রহস্যটি  কিন্তু বদলায়নি। মানুষ দেখল, তারপর দেখাকে বদলে দিল। এই ‘বদলে দেওয়া’র মধ্যেই নিহিত রয়েছে প্রতিটি শিল্পের স্বাতন্ত্র্যিক সৌন্দর্য কিংবা শিল্পীর স্বাধীনতা।

মিশরের সমাধিচিত্রে মুখ দেখতে হয় পাশ থেকে অথচ চোখ তার সামনের দিকে; কারণ, তাদের লক্ষ্য আলোকচিত্রসম বাস্তবতার অনুকরণ নয়, বরং দৃশ্যমানতার একটি সাংকেতিক সম্পূর্ণতা। গ্রিক ভাস্কর আদর্শ মানবদেহ নির্মাণ করে বাস্তব শরীরের অনুলিপি নয়, শরীরের সম্ভাব্য পরিপূর্ণতা খুঁজেছে। রেনেসাঁ পার্সপেক্টিভ আবিষ্কার করে দ্বিমাত্রিক পৃষ্ঠে ত্রিমাত্রিক দৃষ্টির গাণিতিক ভ্রম রচনা করেছে। ভ্যান গঘের তারাভরা রাত বাস্তব আকাশের জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক মানচিত্র নয়; তা এক আহত মানুষের অন্তর্গত মহাকাশ। পিকাসোর মুখ একসঙ্গে সামনে ও পাশ থেকে দেখা যায়, কারণ কিউবিজম সেখানে প্রশ্ন তোলে— মানুষ কি শুধুমাত্র একটিমাত্র দৃষ্টিকোণ থেকে দৃশ্যমান? তখন শিল্প আর বাহ্য দৃষ্টির অনুকরণ নয়, অন্তর্দৃষ্টির বহুমাত্রিকতা বোধকরি সেইসব বহুকৌণিক উপলব্ধির সমবায়েই সংঘটিত হয় শিল্প-চেতনার স্ফুরণ ঘটাতে।

বাংলার শিল্পযাত্রায়ও এই পুনর্নির্মাণের শক্তি প্রবল। নন্দলাল বসু ঔপনিবেশিক একাডেমিক বাস্তবতার বাইরে ভারতীয় রেখা, পুরাণ, প্রকৃতি ও লোকজ অনুভবকে আধুনিকতার সঙ্গে যুক্ত করেন; যামিনী রায় পশ্চিমা প্রাতিষ্ঠানিক আঁকার ভাষা ছেড়ে পটচিত্রের সমতলতা, রেখার বলিষ্ঠতা ও লোকায়ত বর্ণভাষায় ফিরে এসে প্রমাণ করেন যে আধুনিক হওয়া মানে পশ্চিমা হওয়া নয়। জয়নুল আবেদিনের দুর্ভিক্ষ-রেখা আমাদের এ প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়— দুঃখ কি নন্দনের বিষয় হতে পারে? তাঁর আঁকা কঙ্কালসার মানুষ সুন্দর নয়; কিন্তু সেই অসুন্দরতার মধ্যে এমন এক নৈতিক তীব্রতা আছে, যা সৌন্দর্যের প্রচলিত সংজ্ঞাকে ভেঙে দেয়। ক্ষুধা সেখানে ব্যক্তিগত বিপর্যয় নয়, ইতিহাসের সাক্ষ্য। এস এম সুলতানের কৃষকের শরীর বাস্তব কৃষকের শারীরবিদ্যাগত অনুলিপি নয়; পেশিবহুল সেই দেহ মাটি, শ্রম ও জাতিগত অস্তিত্বের মহিমান্বিত রূপক। নভেরা আহমেদের ভাস্কর্যে শরীর ভেঙে গিয়ে আকার, সম্পর্ক, মাতৃত্ব, নিঃসঙ্গতা ও অস্তিত্বের বিমূর্ত নির্মাণে পরিণত হয়। শাহাবুদ্দিন আহমেদের ক্যানভাসে মুক্তিযোদ্ধা যেন স্থির দেহ নয়; এক বিস্ফোরিত গতি— মুক্তিযুদ্ধ সেখানে ইতিহাসের তারিখ নয়, শরীরী প্রতিরোধের পুনর্জাগরণ।

তাহলে আলতামিরার প্রথম রেখা কখনোই শেষ হয়নি। তার একটি প্রান্ত পাথরে, অন্য প্রান্ত রঙে, ভাস্কর্যে, চলচ্চিত্রে, আলোকচিত্রে, ডিজিটাল পর্দায়, আজ এমনকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নির্মিত ছবিতেও। প্রশ্ন বদলেছে, মাধ্যম বদলেছে, কিন্তু মৌলিক তাগিদ রয়ে গেছে অপরিবর্তিত, মানুষ দৃশ্যমান পৃথিবীর পাশাপাশি প্রগাঢ় অনুভব দিয়ে নির্মাণ করতে চায় এক সমান্তরাল পৃথিবী।

গুহাচিত্রের সঙ্গে রিচুয়ালের সম্ভাব্য সম্পর্ক আমাদের আরেকটি গভীর সত্যের সামনে আনে। শিল্প সম্ভবত জন্মের সময় আলাদা কোনো ‘শিল্প’ ছিল না। ছবি, নাচ, শব্দ, আগুন, শরীর, বিশ্বাস— সব একাকার। কেউ দেয়ালে আঁকছে, কেউ আগুন ধরে আছে, কেউ তাল দিচ্ছে, কেউ হয়তো পশুর চলন অনুকরণ করছে, এমন কোনো সমবায়ী ঘটনার সম্ভাবনাই আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে আদিম শিল্প ছিল জীবনের ভেতরে, জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। আধুনিক সভ্যতাই শিল্পকে মিউজিয়াম, গ্যালারি, থিয়েটার, লাইব্রেরিতে পৃথক কক্ষ দিয়েছে; তারপর আমরা নির্দিষ্ট সময়ে শিল্প ‘দেখতে’ যাই। আদিম মানুষের কাছে হয়তো এই বিভাজন ছিল না। শিল্প তার বিশ্বাসের মতোই, ভয়ের মতোই, শিকারের মতোই জীবনের অন্তর্গত এক ক্রিয়া।

সুতরাং শিল্পের ইতিহাস ‘সুন্দর’-এর ইতিহাসের চেয়ে বহুগুণ বৃহৎ। তা ভয়, ক্ষুধা, মৃত্যু, কামনা, ক্ষমতা, বিশ্বাস, প্রতিবাদ, স্মৃতি এ সবকিছুরই  ইতিহাস। সুন্দর মানেই মসৃণ নয়, আনন্দদায়কও নয়। আলতামিরার বাইসনের সঙ্গে শিকার ও মৃত্যুর সম্পর্ক আছে; জয়নুলের দুর্ভিক্ষচিত্র আমাদের আনন্দ দেয় না; মুঙ্কের ‘দ্য স্ক্রিম’ নন্দনকে আতঙ্কের মুখে দাঁড় করায়; পিকাসোর ‘গুয়ের্নিকা’ সৌন্দর্যকে ছিন্নভিন্ন শরীরের মধ্য দিয়ে পুনর্নির্মাণ করে। ফলে নন্দন আসলে আনন্দের চেয়েও বৃহত্তর এক অভিজ্ঞতার সঞ্চয়— সে কখনো আকর্ষণ, কখনো অভিঘাত, কখনো অসহনীয়তা, কখনো নৈতিক অস্বস্তি, কখনো সুনসান নীরবতা।

এইখানেই শিল্পের সঙ্গে মৃত্যুর গভীর সম্পর্ক। মানুষ মৃত্যুকে হয়তো শিল্পের বহু আগে চিনেছিল; কিন্তু শিল্প আবিষ্কারের পরে সে মৃত্যুর বিরুদ্ধে প্রথম বড় প্রতীকী অস্ত্র পেল সে মহত্তম অস্ত্রের নাম আর কিছু নয়, তা হলো স্মৃতি। যে বাইসন মারা গেছে, তার ছবি রয়ে গেল। যে হাত ছবিটি এঁকেছিল, সেই মানুষও বহু সহস্র বছর আগে বিলীন হয়ে গেছে মহাকালের গর্ভে; তার ভাষা নেই, সমাধিচিহ্ন নেই,  নেই কোনো মুখের স্মৃতিও। কিন্তু রয়ে গেছে তার আঁকা রেখা আর আঁচড় গুলো। এটি মানুষের একসঙ্গে পরাজয় ও বিজয়, যেটি জৈবিক মৃত্যুর কাছে হারে; চিহ্ন কখনো কখনো তাকে অতিক্রম করে যায় অচিন্তনীয় প্রবহমানতায়।

এই অতিক্রমণের আকাঙ্ক্ষা পরে গিলগামেশের মহাকাব্যে ফিরে আসবে। বন্ধুর মৃত্যু দেখে গিলগামেশ অমরত্বের সন্ধানে বের হবে; ফিরে এসে বুঝবে, মানুষ অমর নয়, কিন্তু তার নির্মাণ, স্মৃতি ও কাহিনি তার আয়ুকে অতিক্রম করতে পারে। আলতামিরার নামহীন শিল্পীও যেন বহু সহস্র বছর আগে একই কথা পাথরে লিখে রেখেছিল কোনো অক্ষর কিংবা শব্দ ছাড়াই। একদিকে গুহার রেখা, অন্যদিকে মাটির ফলকে গিলগামেশ; তারপর দীর্ঘ সময়ের নদী বেয়ে চর্যাপদের সন্ধ্যাভাষা, মঙ্গলকাব্যের লোকবিশ্বাস, বৈষ্ণব পদাবলির বিরহ, মাইকেলের মেঘনাদের মহিমান্বিত পরাজয়, বিহারীলালের নিঃসঙ্গ গীতস্বভাব, রবীন্দ্রনাথের অসীম, জীবনানন্দের কুয়াশা, মানিকের ক্ষুধা, বিভূতিভূষণের অরণ্য, কমলকুমারের দুরূহ ভাষা— সবই যেন সেই একই আদিম মানবিক আকাঙ্ক্ষার বিচিত্র উত্তর: আমি যা দেখেছি, যা অনুভব করেছি, যা হারিয়েছি, তা যেন সম্পূর্ণ হারিয়ে না যায়।

হাজার হাজার বছর পরে আজ আমরা যখন আলতামিরার দিকে তাকাই, দুটি সময় মুখোমুখি দাঁড়ায়। একদিকে অজানা প্রাগৈতিহাসিক মানুষ, অন্যদিকে স্মার্টফোন, স্যাটেলাইট, জিন-সম্পাদনা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় প্রবেশ করা বর্তমান মানুষ। প্রযুক্তির দূরত্ব অসীম, অথচ বিস্ময়ের দূরত্ব আশ্চর্যভাবে কম। সেও কোনো দৃশ্য দেখে থমকে গিয়েছিল, আমরাও যাই; সেও হারিয়ে যাওয়ার আগে কিছু ধরে রাখতে চেয়েছিল, আমরাও চাই; সেও বাস্তবের পাশাপাশি আরেকটি বাস্তব নির্মাণ করেছিল, আমরাও প্রতিদিন গল্প, কবিতা, চিত্র, চলচ্চিত্র, সংগীত, আলোকচিত্র, ডিজিটাল ইমেজের মধ্যে তাই করি।

কল্পনা করা যাক, আবার সেই গুহায় ফিরে গেছি আমরা। বাইরে রাত। ভিতরে ঘন অন্ধকার। ক্ষীণ আগুনের আলো পাথরের গায়ে কাঁপছে। নামহীন মানুষটি শেষবারের মতো তার আঁকা বাইসনের দিকে তাকায়। প্লেটো, এরিস্টটল, বমগার্টেন, কান্ট, হেগেল, বেনিয়ামিন কেউই তখন জন্মাননি; ‘শিল্প’, ‘নন্দনতত্ত্ব’, ‘মিমেসিস’, ‘রিপ্রেজেন্টেশন’ -এর মতো শব্দগুলোরও তখন কোনো অস্তিত্ব নেই,  নেই কোনো মানে। সে শুধু জানে, কিছুক্ষণ আগে এই পাথরটি ছিল পাথর; এখন সেখানে একটি প্রাণি আছে। সে আগুন নিয়ে ধীরে ধীরে গুহার বাইরে চলে যায়। অন্ধকার আবার ফিরে আসে, কিন্তু রেখাটি থেকে যায়। সহস্রাব্দ পরে সেই রেখা এখনও আমাদের দিকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয় মানুষ কেন ছবি আঁকে, কেন কবিতা লেখে, কেন গল্প বলে, কেন গান গায়? হয়তো কারণ সে জানে যে তার মৃত্যু আছে; আর তাই সে এমন কিছু সৃষ্টি করতে চায় যার মৃত্যু তার নিজের মৃত্যুর সঙ্গে একই দিনে ঘটবে না। আরও গভীরে গেলে হয়তো বলা যায়, মানুষ কখনো শুধু শুধু  খেয়ে পরে বেঁচে থাকতে চায়নি; সে তার বেঁচে থাকার অর্থও নির্মাণ করতে চেয়েছে। কোনো এক অজ্ঞাত গোধূলিতে অন্ধকার গুহার দেয়ালে প্রথম রেখাটি টেনে সে সম্ভবত সেই ঘোষণাটিই মহাকালের  চিরন্তনতার কাছে করেছিল ভয়ডরহীন নিদারুণ স্পর্ধায়। আর সেই রেখার মধ্যেই সুপ্ত ছিল ভবিষ্যতের মহাকাব্য, কবিতা, নাটক, ভাস্কর্য, উপন্যাস, চলচ্চিত্র, শিল্পদর্শন। এমনকি কিয়ৎকাল আগপর্যন্ত অকল্পনীয় ছিল  ডিজিটাল নন্দনের সম্ভাবনা।

আর তাই যখনই আমরা জানতে চাইব সৌন্দর্য কী, শিল্প কেন, মানুষ কেন কেবল জীবনেই সন্তুষ্ট নয়, আমাদেরকে তখন ফিরে যেতে হবে সেই প্রথম রেখাটির কাছে। ‘গোধূলির নন্দনভাষ্য’-এর যাত্রা তাই আলো থেকে নয়; শুরু হোক সেই আদিম অন্ধকার থেকে, যেখানে মানুষ প্রথমবারের মতো পাথরের গায়ে এঁকে দিয়েছিল বৌদ্ধিক আলোকরেখা আর তার মধ্য দিয়েই সে আবিষ্কার করেছিল নিজের মধ্যে সৌন্দর্যের এক সমান্তরাল মহাবিশ্ব।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬


গোধূলির নন্দনভাষ্য

প্রকাশের তারিখ : ১৫ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

মানব সভ্যতার আদিম গুহাচিত্র থেকে সমকালীন শিল্পসাহিত্যের বহুমাত্রিক নন্দনবিশ্ব পর্যন্ত মানুষের সৌন্দর্যচেতনা, সৃজনপ্রবণতা ও অস্তিত্বজিজ্ঞাসার এক অভিনব অভিযাত্রা নিয়ে কবি ও নন্দনতাত্ত্বিক মাহফুজ আল-হোসেন-এর ধারাবাহিক নন্দনভাবনা ‘গোধূলির নন্দনভাষ্য’ আজ থেকে শুরু হয়ে প্রতি বৃহস্পতিবার ‘সংবাদ সাময়িকী’র সাপ্তাহিক সাহিত্যায়োজনে প্রকাশিত হবে। শিল্পের উৎস, সৌন্দর্যের দর্শন, মানুষের মৃত্যুচেতনা, অপরাধবোধ, প্রেম, রোমান্টিকতা এবং সৃজনশীলতার বিবর্তন এই নন্দনভাবনায় লাভ করেছে এক স্বতন্ত্র সৌন্দর্যতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সাহিত্য, দর্শন, চিত্রকলা, পুরাণ, মনস্তত্ত্ব ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের আন্তঃসম্পর্ক অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে লেখক নির্মাণ করেছেন তুলনামূলক নন্দন ভুবনের এক বিস্তৃত পরিসর। ক্লাসিক্যাল থেকে শুরু করে আধুনিক, উত্তরাধুনিক এবং  সমকালীন চিন্তকদের তাত্ত্বিক উত্তরাধিকার এখানে সংলাপ রচনা করেছে বাংলা ও বিশ্বসাহিত্যের কালজয়ী সৃষ্টিসম্ভারের সঙ্গে। ‘সংবাদ সাময়িকী’র পাঠকদের এই ব্যতিক্রমী মননযাত্রায় স্বাগত জানিয়ে আমরা প্রত্যাশা করি, গোধূলির আলো-আঁধারিতে উন্মোচিত হবে শিল্প, জীবন ও মানবসভ্যতার অন্তর্লীন সৌন্দর্যের এক অনিঃশেষ মহাবিশ্ব। —বি. স. 

***

অন্ধকার গুহায় সৌন্দর্যের প্রথম আলোকরেখা

এই মানুষটি কে ছিল সে সম্পর্কে আমরা কিছুই জানি না। কী ছিল তার নাম? “আর নামে কীইবা আসে যায়, গোলাপকে যদি অন্য নামে ডাকা হয় তবুও তো ছড়াবে তার সৌরভ।” না কোনো নাম ইতিহাস সংরক্ষণ করেনি, তার মুখের আদল কোনো পাথরে খোদাই হয়নি; কোন ভাষায় সে কথা বলত, আদৌ আমাদের মতো সুসংবদ্ধ কোনো ভাষার ভেতরে সে তার ভয়, ক্ষুধা, প্রেম কিংবা মৃত্যুচেতনাকে বিন্যস্ত করতে পারত কি না তাও রয়ে গেছে আমাদের জানার বাইরে। আমরা এটি জানি না কোন শীতে সে অসুস্থ হয়েছিল, কোন শিকারে প্রথম আহত হয়েছিল, কাকে প্রথম স্পর্শ করে তার শরীরের ভিতরে এক অদ্ভুত অনির্বচনীয় আলোড়ন টের পেয়েছিল, কিংবা কোন নির্জন রাতে হঠাৎ আকাশের দিকে তাকিয়ে মৃত্যুর পর নিজের অনুপস্থিতিকে কল্পনা করতে গিয়ে আতঙ্কিত হয়ে উঠেছিল। শুধু এটুকু জানি, বহু সহস্র বছর আগে কোনো এক সময়ে সে একটি অন্ধকার গুহার গভীরে প্রবেশ করেছিল। বাইরে হয়তো বরফশীতল বাতাস, দূরে অরণ্যের পশু, মাথার উপরে এমন এক নক্ষত্রভরা আকাশ যার জ্যোতির্বিদ্যা তার অজানা, অথচ যার দিকে তাকিয়ে বিস্মিত হওয়ার ক্ষমতা তার ছিল। জীবন তখন ছিল নির্মমভাবে প্রত্যক্ষ আর ভীষণ রকমের একরোখা আর একরৈখিক— ক্ষুধা, তৃষ্ণা, ভয়, শিকার, আগুন, প্রজনন, আঘাত, মৃত্যু। অথচ এই অনিবার্যতার মধ্যেই একদিন সে এমন কিছু করল যার তাৎক্ষণিক কোনো খাদ্যমূল্য ছিল না, কোনো চামড়া বা অস্ত্রের বিকল্প ছিল না, শীত থেকে রক্ষার কোনো কৌশলও নয়। হঠাৎ সে পাথরের গায়ে আরেকটি পাথর দিয়ে প্রথমে একটি রেখা টানল। তারপর আরেকটি, তারপর আরো একটি। রেখা বাঁক নিল, পাথরের স্বাভাবিক উঁচুনিচুতে শরীর পেল, কোনো প্রস্তরখণ্ডের ফোলা অংশ হয়ে উঠল বাইসনের কাঁধ, একটি গাঢ় দাগে জন্ম নিল চোখ, কোনো একটি বাঁক হয়ে উঠলো শিং, কোনো ছায়া পেট; অন্ধকার গুহার মৃত পাথরে যেন হঠাৎ প্রাণের গতি ফিরে এল। বাস্তবের পশু সেখানে নেই, অথচ তার উপস্থিতি আছে। সেখানেই সম্ভবত মানুষের আত্মপরিচয়ের এক মৌলিক পরিবর্তন ঘটে গেল। হোমো স্যাপিয়েন্স পৃথিবীতে শিকার করে খেয়ে দেয়ে বেঁচে থাকা প্রাণি আর রইল না; সে পৃথিবীকে পুনরায় নির্মাণ করার প্রাণি হয়ে উঠল।

স্পেনের আলতামিরা গুহায় সংরক্ষিত সেই প্রাগৈতিহাসিক শিল্প আমাদের আজও থমকে দেয়। লাল, কালো, বাদামি রঙের স্তরে স্তরে আঁকা বাইসন, ঘোড়া, হরিণ ও নানা সংকেতকে আমরা যতই ‘গুহাচিত্র’ বলে একাডেমিক নাম দিই, তাদের সামনে দাঁড়ালে আসলে মনে হয় আমরা মানুষের প্রথম সৌন্দর্য-অপরাধের সাক্ষী আর নৈমিত্তিক প্রয়োজনের কঠোর নিয়ম ভেঙে সে প্রথমবার কিছু ‘অপ্রয়োজনীয়’ সৃষ্টি করেছিল। অথচ এই অপ্রয়োজনীয়তাই পরে মানুষের সবচেয়ে জরুরি প্রয়োজন হয়ে উঠবে কে জানত। খাদ্য তাকে জীবিত রাখে, কিন্তু শিল্প তাকে বলে সে কেন বেঁচে আছে। আশ্রয় তাকে রক্ষা করে, কিন্তু শিল্প তাকে নিজের অন্তর্গত অন্ধকারে প্রবেশের পথ দেখায়। আগুন তাকে উষ্ণতা দেয়, কিন্তু রেখা তাকে স্মৃতি দেয়। এই দিক থেকে শিল্পের ইতিহাস সভ্যতার অলংকার নয়; সভ্যতার আত্মসচেতনতার ইতিহাস।

আলতামিরার সামনে দাঁড়ালে আমাদের প্রথম প্রশ্ন তাই সৌন্দর্য নিয়ে নয়, প্রয়োজন নিয়ে— মানুষ ছবি আঁকল কেন? যে মানুষ শিকার না পেলে অনাহারে মরবে, সে কেন অন্ধকার গুহার এমন গভীরে গিয়ে পশুর রেখা নির্মাণ করল, যেখানে বসবাসের সুবিধাও সীমিত? হতে পারে, এ ছিল শিকারের পূর্ববর্তী আচার; হতে পারে, বাস্তব পশুকে প্রতীকে বন্দী করে তার ওপর জাদুকরী কর্তৃত্ব অর্জনের চেষ্টা; হতে পারে, প্রজনন, মৃত্যু, প্রাণশক্তি ও অদৃশ্য জগতের সঙ্গে যোগাযোগের কোনো রিচুয়াল; হতে পারে, কোনো গোষ্ঠীগত স্মৃতির দৃশ্যরূপ। আবার এমনও হতে পারে যে কোনো এক বিস্ময়গ্রস্ত মানুষ কেবল দেখেছিল পশুটি কী আশ্চর্যভাবে দৌড়ায় এবং সেই গতিকে সে হয়তো হারিয়ে যেতে দিতে চায়নি। আমরা নিশ্চিত নই, আর সম্ভবত নিশ্চিত হতে না পারাই তো শিল্পের রহস্যময়তাকে বাঁচিয়ে রাখে। শিল্পের জন্মের পাশে একটি অনুলিখিত অন্ধকার থাকাই যেন তার নিয়তি।

তবে একটি ঘটনা সেখানে নিশ্চিতভাবে ঘটে গিয়েছিল, মানুষ যখন আবিষ্কার করেছিল representation, অনুপস্থিতকে চিহ্নের মাধ্যমে উপস্থিত করার ক্ষমতা। গুহার বাইসন তখন আর বাইসন নয়; সে রঞ্জক, রেখা, পাথর, আলো ও মানবহাতের সমন্বয়। অথচ আমরা  তার দিকে তাকিয়ে বলি এই তো বাইসন!  অথচ এই সহজ ঘটনাটি মানবচেতনার এক মহাবিপ্লব। একটি বস্তু অন্য একটি বস্তুকে নির্দেশ করতে পারে; একটি রেখা পশু হতে পারে, একটি শব্দ জল না হয়েও ‘জল’ জাগাতে পারে, একটি মুখ না থেকেও প্রতিকৃতি হতে পারে, মৃত কেউ গল্পে ফিরে আসতে পারে, হারানো প্রেমিকা কবিতায় আবার হাঁটতে পারে, শেষ হয়ে যাওয়া যুদ্ধ চিত্রকলায় আবার বিস্ফোরিত হতে পারে। মানুষের সাংকেতিক ক্ষমতার মহাদেশ যেন এই অন্ধকার গুহাতেই প্রথম দৃশ্যমান হয়।

হাজার হাজার বছর পরে গ্রিক দর্শন এই প্রক্রিয়ার একটি ধারণাগত নাম দেবে মিমেসিস। প্লেটো শিল্পকে সন্দেহের চোখে দেখেছিলেন, কারণ তাঁর কাছে দৃশ্যমান জগতই ছিল চিরন্তন আদিরূপের অসম্পূর্ণ প্রতিফলন; শিল্প যদি আবার সেই দৃশ্যমানতার অনুকরণ করে, তবে শিল্প সত্য থেকে যেন আরও এক ধাপ দূরে সরে যায়। কিন্তু আলতামিরার বাইসন প্লেটোর আপত্তিকে নীরবে জটিল করে তোলে। কারণ গুহাশিল্পী কি সত্যিই বাস্তব বাইসনের নিছক অনুলিপি নির্মাণ করেছিল? বাস্তব পশু চলছিল, দৌড়াচ্ছিল, শ্বাস নিচ্ছিল, কখনো সামনে, কখনো পাশ ফিরে ছিল; শিল্পীকে তার মধ্যে থেকে একটি ভঙ্গি বেছে নিতে হয়েছে, একটি রেখাকে স্থির করতে হয়েছে, অন্যটি বাদ দিতে হয়েছে, পাথরের একটি উঁচু অংশকে কাঁধ হিসেবে কল্পনা করতে হয়েছে। অর্থাৎ শিল্প শুরু থেকেই নির্বাচন, ব্যাখ্যা, পুনর্গঠন। এরিস্টটল তাই নিমেসিসকে কেবল নকল হিসেবে দেখেননি; মানুষের অনুকরণপ্রবণতার মধ্যে তিনি জ্ঞান, পরিচয় ও আনন্দের উৎস দেখেছিলেন। শিল্প বাস্তবের ফটোকপি নয়; বাস্তবের সম্ভাব্য, গভীরতর বা আদর্শ রূপকে প্রকাশ করার এক সৃষ্টিশীল পদ্ধতি। সেই মুহূর্ত থেকে নন্দনতত্ত্বের প্রশ্ন আর শুধু ‘এটি কীসের মতো’ থাকে না; বরং প্রশ্ন হয়ে ওঠে ‘এটি আমাদের কী দেখতে শেখায়?’

কিন্তু ‘নন্দনতত্ত্ব’ শব্দটির স্বতন্ত্র দার্শনিক প্রতিষ্ঠা আসতে আরও বহু শতাব্দী লেগেছে। আঠারো শতকে জার্মান দার্শনিক আলেকজান্ডার গটলিব বমগার্টেন ‘এস্থেটিকা’ গ্রন্থে ‘এসথেটিকস’ শব্দটিকে দার্শনিক শাস্ত্রের মর্যাদা দেন। গ্রিক ‘আইসথেসিস’ অর্থাৎ, ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য উপলব্ধি থেকে তিনি এমন এক জ্ঞানক্ষেত্রের কথা ভাবলেন, যেখানে সত্য শুধু বিমূর্ত বুদ্ধির মাধ্যমে নয়, সংবেদনশীলতা, অনুভব, রূপ ও সৌন্দর্যের মাধ্যমেও ধরা পড়ে। নন্দন তখন আর নিছক শোভা নয়; সংবেদনশীল জ্ঞানের এক স্বতন্ত্র ক্ষেত্র। এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে আলতামিরার নামহীন শিল্পী যেন বমগার্টেনের বহু হাজার বছর আগে এক অপ্রাতিষ্ঠানিক নন্দনতাত্ত্বিক ইশতেহার ঘোষণা করে রেখেছিল, সেটি হলো মানুষ শুধু চিন্তাই করে না, অনুভব করেও সে জানে; শুধু ধারণা নির্মাণ করে না, রেখা ও রঙের মাধ্যমেও জগতকে বোঝে। কোনো পশুর শারীরিক গঠন সম্পর্কে তথ্য ও তার দ্রুতবেগে দৌড়ে যাওয়ার মুহূর্তে সচল প্রাণশক্তির জীবন্ত অভিজ্ঞতা এক জিনিস নয়; শিল্প যেন সেই দ্বিতীয়টির ভাষা।

এর পরের ইতিহাস হলো সময় যতো গড়াবে সৌন্দর্যের পাঠ আর শিল্গের রূপ ক্রমশ তত্ত্বের আশ্রয় পাবে। বমগার্টেন-এর পরে নন্দনতত্ত্বের ধারণা আরও বিকশিত হবে। কান্ট সৌন্দর্যের বিচারে অনাসক্ত আনন্দের কথা বলবেন, হেগেল শিল্পে আত্মার ঐতিহাসিক প্রকাশ দেখবেন, পরবর্তীকালে বেনিয়ামিন প্রযুক্তিগত পুনরুৎপাদনের যুগে শিল্পের ‘aura’-র প্রশ্ন তুলবেন; কিন্তু এসব তত্ত্বের বহু আগে মানুষের চোখ ও হাতের মধ্যে যে সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল, তার মূল রহস্যটি  কিন্তু বদলায়নি। মানুষ দেখল, তারপর দেখাকে বদলে দিল। এই ‘বদলে দেওয়া’র মধ্যেই নিহিত রয়েছে প্রতিটি শিল্পের স্বাতন্ত্র্যিক সৌন্দর্য কিংবা শিল্পীর স্বাধীনতা।

মিশরের সমাধিচিত্রে মুখ দেখতে হয় পাশ থেকে অথচ চোখ তার সামনের দিকে; কারণ, তাদের লক্ষ্য আলোকচিত্রসম বাস্তবতার অনুকরণ নয়, বরং দৃশ্যমানতার একটি সাংকেতিক সম্পূর্ণতা। গ্রিক ভাস্কর আদর্শ মানবদেহ নির্মাণ করে বাস্তব শরীরের অনুলিপি নয়, শরীরের সম্ভাব্য পরিপূর্ণতা খুঁজেছে। রেনেসাঁ পার্সপেক্টিভ আবিষ্কার করে দ্বিমাত্রিক পৃষ্ঠে ত্রিমাত্রিক দৃষ্টির গাণিতিক ভ্রম রচনা করেছে। ভ্যান গঘের তারাভরা রাত বাস্তব আকাশের জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক মানচিত্র নয়; তা এক আহত মানুষের অন্তর্গত মহাকাশ। পিকাসোর মুখ একসঙ্গে সামনে ও পাশ থেকে দেখা যায়, কারণ কিউবিজম সেখানে প্রশ্ন তোলে— মানুষ কি শুধুমাত্র একটিমাত্র দৃষ্টিকোণ থেকে দৃশ্যমান? তখন শিল্প আর বাহ্য দৃষ্টির অনুকরণ নয়, অন্তর্দৃষ্টির বহুমাত্রিকতা বোধকরি সেইসব বহুকৌণিক উপলব্ধির সমবায়েই সংঘটিত হয় শিল্প-চেতনার স্ফুরণ ঘটাতে।

বাংলার শিল্পযাত্রায়ও এই পুনর্নির্মাণের শক্তি প্রবল। নন্দলাল বসু ঔপনিবেশিক একাডেমিক বাস্তবতার বাইরে ভারতীয় রেখা, পুরাণ, প্রকৃতি ও লোকজ অনুভবকে আধুনিকতার সঙ্গে যুক্ত করেন; যামিনী রায় পশ্চিমা প্রাতিষ্ঠানিক আঁকার ভাষা ছেড়ে পটচিত্রের সমতলতা, রেখার বলিষ্ঠতা ও লোকায়ত বর্ণভাষায় ফিরে এসে প্রমাণ করেন যে আধুনিক হওয়া মানে পশ্চিমা হওয়া নয়। জয়নুল আবেদিনের দুর্ভিক্ষ-রেখা আমাদের এ প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়— দুঃখ কি নন্দনের বিষয় হতে পারে? তাঁর আঁকা কঙ্কালসার মানুষ সুন্দর নয়; কিন্তু সেই অসুন্দরতার মধ্যে এমন এক নৈতিক তীব্রতা আছে, যা সৌন্দর্যের প্রচলিত সংজ্ঞাকে ভেঙে দেয়। ক্ষুধা সেখানে ব্যক্তিগত বিপর্যয় নয়, ইতিহাসের সাক্ষ্য। এস এম সুলতানের কৃষকের শরীর বাস্তব কৃষকের শারীরবিদ্যাগত অনুলিপি নয়; পেশিবহুল সেই দেহ মাটি, শ্রম ও জাতিগত অস্তিত্বের মহিমান্বিত রূপক। নভেরা আহমেদের ভাস্কর্যে শরীর ভেঙে গিয়ে আকার, সম্পর্ক, মাতৃত্ব, নিঃসঙ্গতা ও অস্তিত্বের বিমূর্ত নির্মাণে পরিণত হয়। শাহাবুদ্দিন আহমেদের ক্যানভাসে মুক্তিযোদ্ধা যেন স্থির দেহ নয়; এক বিস্ফোরিত গতি— মুক্তিযুদ্ধ সেখানে ইতিহাসের তারিখ নয়, শরীরী প্রতিরোধের পুনর্জাগরণ।

তাহলে আলতামিরার প্রথম রেখা কখনোই শেষ হয়নি। তার একটি প্রান্ত পাথরে, অন্য প্রান্ত রঙে, ভাস্কর্যে, চলচ্চিত্রে, আলোকচিত্রে, ডিজিটাল পর্দায়, আজ এমনকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নির্মিত ছবিতেও। প্রশ্ন বদলেছে, মাধ্যম বদলেছে, কিন্তু মৌলিক তাগিদ রয়ে গেছে অপরিবর্তিত, মানুষ দৃশ্যমান পৃথিবীর পাশাপাশি প্রগাঢ় অনুভব দিয়ে নির্মাণ করতে চায় এক সমান্তরাল পৃথিবী।

গুহাচিত্রের সঙ্গে রিচুয়ালের সম্ভাব্য সম্পর্ক আমাদের আরেকটি গভীর সত্যের সামনে আনে। শিল্প সম্ভবত জন্মের সময় আলাদা কোনো ‘শিল্প’ ছিল না। ছবি, নাচ, শব্দ, আগুন, শরীর, বিশ্বাস— সব একাকার। কেউ দেয়ালে আঁকছে, কেউ আগুন ধরে আছে, কেউ তাল দিচ্ছে, কেউ হয়তো পশুর চলন অনুকরণ করছে, এমন কোনো সমবায়ী ঘটনার সম্ভাবনাই আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে আদিম শিল্প ছিল জীবনের ভেতরে, জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। আধুনিক সভ্যতাই শিল্পকে মিউজিয়াম, গ্যালারি, থিয়েটার, লাইব্রেরিতে পৃথক কক্ষ দিয়েছে; তারপর আমরা নির্দিষ্ট সময়ে শিল্প ‘দেখতে’ যাই। আদিম মানুষের কাছে হয়তো এই বিভাজন ছিল না। শিল্প তার বিশ্বাসের মতোই, ভয়ের মতোই, শিকারের মতোই জীবনের অন্তর্গত এক ক্রিয়া।

সুতরাং শিল্পের ইতিহাস ‘সুন্দর’-এর ইতিহাসের চেয়ে বহুগুণ বৃহৎ। তা ভয়, ক্ষুধা, মৃত্যু, কামনা, ক্ষমতা, বিশ্বাস, প্রতিবাদ, স্মৃতি এ সবকিছুরই  ইতিহাস। সুন্দর মানেই মসৃণ নয়, আনন্দদায়কও নয়। আলতামিরার বাইসনের সঙ্গে শিকার ও মৃত্যুর সম্পর্ক আছে; জয়নুলের দুর্ভিক্ষচিত্র আমাদের আনন্দ দেয় না; মুঙ্কের ‘দ্য স্ক্রিম’ নন্দনকে আতঙ্কের মুখে দাঁড় করায়; পিকাসোর ‘গুয়ের্নিকা’ সৌন্দর্যকে ছিন্নভিন্ন শরীরের মধ্য দিয়ে পুনর্নির্মাণ করে। ফলে নন্দন আসলে আনন্দের চেয়েও বৃহত্তর এক অভিজ্ঞতার সঞ্চয়— সে কখনো আকর্ষণ, কখনো অভিঘাত, কখনো অসহনীয়তা, কখনো নৈতিক অস্বস্তি, কখনো সুনসান নীরবতা।

এইখানেই শিল্পের সঙ্গে মৃত্যুর গভীর সম্পর্ক। মানুষ মৃত্যুকে হয়তো শিল্পের বহু আগে চিনেছিল; কিন্তু শিল্প আবিষ্কারের পরে সে মৃত্যুর বিরুদ্ধে প্রথম বড় প্রতীকী অস্ত্র পেল সে মহত্তম অস্ত্রের নাম আর কিছু নয়, তা হলো স্মৃতি। যে বাইসন মারা গেছে, তার ছবি রয়ে গেল। যে হাত ছবিটি এঁকেছিল, সেই মানুষও বহু সহস্র বছর আগে বিলীন হয়ে গেছে মহাকালের গর্ভে; তার ভাষা নেই, সমাধিচিহ্ন নেই,  নেই কোনো মুখের স্মৃতিও। কিন্তু রয়ে গেছে তার আঁকা রেখা আর আঁচড় গুলো। এটি মানুষের একসঙ্গে পরাজয় ও বিজয়, যেটি জৈবিক মৃত্যুর কাছে হারে; চিহ্ন কখনো কখনো তাকে অতিক্রম করে যায় অচিন্তনীয় প্রবহমানতায়।

এই অতিক্রমণের আকাঙ্ক্ষা পরে গিলগামেশের মহাকাব্যে ফিরে আসবে। বন্ধুর মৃত্যু দেখে গিলগামেশ অমরত্বের সন্ধানে বের হবে; ফিরে এসে বুঝবে, মানুষ অমর নয়, কিন্তু তার নির্মাণ, স্মৃতি ও কাহিনি তার আয়ুকে অতিক্রম করতে পারে। আলতামিরার নামহীন শিল্পীও যেন বহু সহস্র বছর আগে একই কথা পাথরে লিখে রেখেছিল কোনো অক্ষর কিংবা শব্দ ছাড়াই। একদিকে গুহার রেখা, অন্যদিকে মাটির ফলকে গিলগামেশ; তারপর দীর্ঘ সময়ের নদী বেয়ে চর্যাপদের সন্ধ্যাভাষা, মঙ্গলকাব্যের লোকবিশ্বাস, বৈষ্ণব পদাবলির বিরহ, মাইকেলের মেঘনাদের মহিমান্বিত পরাজয়, বিহারীলালের নিঃসঙ্গ গীতস্বভাব, রবীন্দ্রনাথের অসীম, জীবনানন্দের কুয়াশা, মানিকের ক্ষুধা, বিভূতিভূষণের অরণ্য, কমলকুমারের দুরূহ ভাষা— সবই যেন সেই একই আদিম মানবিক আকাঙ্ক্ষার বিচিত্র উত্তর: আমি যা দেখেছি, যা অনুভব করেছি, যা হারিয়েছি, তা যেন সম্পূর্ণ হারিয়ে না যায়।

হাজার হাজার বছর পরে আজ আমরা যখন আলতামিরার দিকে তাকাই, দুটি সময় মুখোমুখি দাঁড়ায়। একদিকে অজানা প্রাগৈতিহাসিক মানুষ, অন্যদিকে স্মার্টফোন, স্যাটেলাইট, জিন-সম্পাদনা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় প্রবেশ করা বর্তমান মানুষ। প্রযুক্তির দূরত্ব অসীম, অথচ বিস্ময়ের দূরত্ব আশ্চর্যভাবে কম। সেও কোনো দৃশ্য দেখে থমকে গিয়েছিল, আমরাও যাই; সেও হারিয়ে যাওয়ার আগে কিছু ধরে রাখতে চেয়েছিল, আমরাও চাই; সেও বাস্তবের পাশাপাশি আরেকটি বাস্তব নির্মাণ করেছিল, আমরাও প্রতিদিন গল্প, কবিতা, চিত্র, চলচ্চিত্র, সংগীত, আলোকচিত্র, ডিজিটাল ইমেজের মধ্যে তাই করি।

কল্পনা করা যাক, আবার সেই গুহায় ফিরে গেছি আমরা। বাইরে রাত। ভিতরে ঘন অন্ধকার। ক্ষীণ আগুনের আলো পাথরের গায়ে কাঁপছে। নামহীন মানুষটি শেষবারের মতো তার আঁকা বাইসনের দিকে তাকায়। প্লেটো, এরিস্টটল, বমগার্টেন, কান্ট, হেগেল, বেনিয়ামিন কেউই তখন জন্মাননি; ‘শিল্প’, ‘নন্দনতত্ত্ব’, ‘মিমেসিস’, ‘রিপ্রেজেন্টেশন’ -এর মতো শব্দগুলোরও তখন কোনো অস্তিত্ব নেই,  নেই কোনো মানে। সে শুধু জানে, কিছুক্ষণ আগে এই পাথরটি ছিল পাথর; এখন সেখানে একটি প্রাণি আছে। সে আগুন নিয়ে ধীরে ধীরে গুহার বাইরে চলে যায়। অন্ধকার আবার ফিরে আসে, কিন্তু রেখাটি থেকে যায়। সহস্রাব্দ পরে সেই রেখা এখনও আমাদের দিকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয় মানুষ কেন ছবি আঁকে, কেন কবিতা লেখে, কেন গল্প বলে, কেন গান গায়? হয়তো কারণ সে জানে যে তার মৃত্যু আছে; আর তাই সে এমন কিছু সৃষ্টি করতে চায় যার মৃত্যু তার নিজের মৃত্যুর সঙ্গে একই দিনে ঘটবে না। আরও গভীরে গেলে হয়তো বলা যায়, মানুষ কখনো শুধু শুধু  খেয়ে পরে বেঁচে থাকতে চায়নি; সে তার বেঁচে থাকার অর্থও নির্মাণ করতে চেয়েছে। কোনো এক অজ্ঞাত গোধূলিতে অন্ধকার গুহার দেয়ালে প্রথম রেখাটি টেনে সে সম্ভবত সেই ঘোষণাটিই মহাকালের  চিরন্তনতার কাছে করেছিল ভয়ডরহীন নিদারুণ স্পর্ধায়। আর সেই রেখার মধ্যেই সুপ্ত ছিল ভবিষ্যতের মহাকাব্য, কবিতা, নাটক, ভাস্কর্য, উপন্যাস, চলচ্চিত্র, শিল্পদর্শন। এমনকি কিয়ৎকাল আগপর্যন্ত অকল্পনীয় ছিল  ডিজিটাল নন্দনের সম্ভাবনা।

আর তাই যখনই আমরা জানতে চাইব সৌন্দর্য কী, শিল্প কেন, মানুষ কেন কেবল জীবনেই সন্তুষ্ট নয়, আমাদেরকে তখন ফিরে যেতে হবে সেই প্রথম রেখাটির কাছে। ‘গোধূলির নন্দনভাষ্য’-এর যাত্রা তাই আলো থেকে নয়; শুরু হোক সেই আদিম অন্ধকার থেকে, যেখানে মানুষ প্রথমবারের মতো পাথরের গায়ে এঁকে দিয়েছিল বৌদ্ধিক আলোকরেখা আর তার মধ্য দিয়েই সে আবিষ্কার করেছিল নিজের মধ্যে সৌন্দর্যের এক সমান্তরাল মহাবিশ্ব।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত