যাকে বলে ধোঁয়া-ওঠা ভাত! একেবারে গরম গরম! অনুপম প্রকাশনীর অফিসে গিয়েছিলাম বিশেষ এক কাজে। অনুপমের স্বত্বাধিকারী মিলন নাথ একটা বই ধরিয়ে দিয়ে বললেন, ‘আপনি ইচ্ছা করলে এই বইটার প্রথম ক্রেতা ও পাঠক হতে পারেন... এইমাত্র বাঁধাই হয়ে এল...।’
ভাবলাম, মন্দ কী! কোনো কিছুতে প্রথম হওয়া আনন্দের ব্যাপার তো বটেই!
মাসুক হেলালের আঁকা সুন্দর প্রচ্ছদ। গালে হাত দেওয়া সেই পরিচিত ছবি। বইয়ের নাম, ‘সুকান্ত ভট্টাচার্য: জন্মশতবর্ষের শ্রদ্ধাঞ্জলি’। সম্পাদনা করেছেন মোরশেদ শফিউল হাসান ও মাইনুর নাহার। সম্পাদনায় সহযোগী অরবিন্দ পান্তি।
গ্রন্থটিতে পঁয়ত্রিশজন লেখকের বেশ কিছু ছোটবড় প্রবন্ধ, একটি সাক্ষাৎকার, সুকান্তকে নিয়ে কবিতা, ইংরেজিতে সুকান্তের কবিতার অনুবাদ যেমন স্থান পেয়েছে তেমনই সুকান্তের নিজ হাতে লেখা কবিতার পাণ্ডুলিপি ও বন্ধু অরুণাচল বসুকে লেখা চিঠিও স্থান পেয়েছে। কী গোটা গোটাই না হস্তলিপি!
নতুন লেখা এবং পুরনো লেখকদের পুনর্মুদ্রিত রচনায় সুকান্ত-সাহিত্যের ব্যবচ্ছেদ হয়েছে, আমার ধারণা, বিস্তারিতভাবেই।
গণমানুষের জন্য কবিতা। আরও স্পষ্ট করে বললে, মানবমুক্তির জন্য একটি কার্যকর হাতিয়ার হিসাবে কবিতাকে গণ্য করেছিলেন সুকান্ত। তাঁর কবিতার সহজবোধ্যতা উদ্দীপিত করেছে সাধারণ মানুষকে তাদের অধিকার আদায়ের লড়াই সংগ্রামে।
‘বস্তুত আধুনিক বাংলা কাব্যে গণমুখিনতা— এমনকি বিদ্রোহ-বিপ্লবের বাণীরূপের যে সূত্রপাত ও চূড়ান্ত সিদ্ধি নজরুলে, তারই ধারাবাহিকতায় সুভাষ-সুকান্তের আবির্ভাব।’ বইটির ভূমিকা থেকে উদ্ধৃত করছি। ‘আমাদের স্বাধিকার সংগ্রাম ও জাতীয় মুক্তির লড়াইয়েও প্রেরণা যুগিয়েছে সুকান্তের লেখা কবিতা ও গান। তাঁর ‘দুর্মর’ তো একাত্তরে আমাদের সংগ্রামের বাণীমূর্তি হয়ে দাঁড়িয়েছিল।’
গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত লেখাগুলোর মধ্যে তেরোটি নতুন লেখা। তার মধ্যে আবুল কাসেম ফজলুল হকের প্রবন্ধটি তাঁর মৃত্যুর আগে সুকান্তের একটি কবিতা সংগ্রহের ভূমিকা হিসাবে লেখা হলেও তাঁর অনুমতি নিয়েই এখানে ছাপা হয়েছে বলে সম্পাদকরা জানিয়েছেন।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী সুকান্তের ওপর আলোচনা করতে গিয়ে বলেন, ‘তারুণ্যের মধ্যে পূর্ণ আছে, কিন্তু ঋণও আছে একপ্রকার। তারুণ্য চপল হতে জানে, সে হতে পারে বুদ্ধিতে অপরিণত, আবেগে অশিক্ষিত। কিন্তু সুকান্তের তারুণ্যে ভরা আছে, ঋণ নেই। তার মধ্যে তারুণ্যের উদ্দীপনা উত্তেজনা আছে, কিন্তু উদ্দীপনা ও উত্তেজনাকে তিনি কাব্যের শৃঙ্খলার ভেতর রেখেছেন, যেমন রেখেছিরেন কাজী নজরুল ইসলাম, আরো অনেক বেশি সময় নিয়ে, আরো অনেক অধিক সংখ্যক কবিতায়।’ তিনি প্রগতিশীল সাহিত্যের সংজ্ঞা বিবেচনা করার বিষয়টিও উত্থাপন করেছেন।
আবুল কাসেম ফজলুল হক তাঁর লেখায় বলেন, ‘কবিতায় সুকান্ত যে রচনারীতি ও ছন্দ অবলম্বন করেছেন, তা আধুুনিকতাবাদীদের (বুদ্ধদেব বসু, জীবনানন্দ দাশ, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, অমিয় চক্রবর্তী, বিষ্ণু দে প্রমুখ) কাছাকাছি কিন্তু আধুনিকতাবাদীদের দৃষ্টিভঙ্গি ও চিন্তাচেতনার প্রতি তাঁর কোনো সমর্থন ছিল না। আধুনিকতাবাদীরা ছিলেন নৈরাশ্যবাদী ও গণবিচ্ছিন্ন, কখনো কখনো গণবিরোধী নানা বিভ্রান্তির শিকার।... সুকান্ত ছিলেন সত্যেন্দ্রনাথ ও নজরুলের সার্থক উত্তরসূরী।’
সুভাষ দে তাঁর নিবন্ধে সেই সময়ের বিশ্ববাস্তবতা, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, পঞ্চাশের মন্বন্তর, মন্বন্তরের ওপর লেখা সুকান্তের ৯৮ পঙ্ক্তির ‘বোধন’ কবিতার অংশবিশেষ উল্লেখ করেছেন। এই কবিতা সম্পর্কে বিশিষ্ট সমালোচক জগদীশ ভট্টাচার্য বলেছেন, ‘এই কবিতাটিকে আমি এ যুগের মহাকাব্য বলতে চাই। অন্তত ১৩৫০ থেকে ১৩৫৪’র মধ্যে এমন শক্তিশালী অথচ রসোত্তীর্ণ কবিতা যে আমার চোখে পড়েনি সে কথা মুক্ত কণ্ঠে স্বীকার করতে হবে...।’
সৈয়দ মোহাম্মদ শাহেদ তাঁর দীর্ঘ রচনায় সুকান্তের জীবনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেছেন; তাঁর কৌতুকপ্রিয়তা, গণিত ও ইতিহাসে খারাপ হওয়ার কারণে পরপর দুবার ম্যাট্রিক পরীক্ষায় ফেল, অথচ তখন তাঁর কবিতা ‘রানার’ পাটনা ও গৌহাটি বিভাগে দশম শ্রেণিতে পাঠ্য। তুলে ধরেছেন তাঁর কবিতা, ছড়া, গল্প, গান, প্রবন্ধ, কাব্যনাট্য, গীতিনাট্য, নাটিকা ও উপন্যাস এবং চেক, ফরাসি, ইংরেজি ভাষায় অনূদিত তাঁর কবিতার তালিকা।
মোবাশ্বেরা খানম বুশরার প্রবন্ধে সুকান্তের প্রেম ও বন্ধুদের কাছে লেখা পত্রের সম্বোধনের ভাষার বিষয়টি এসেছে। চিঠিগুলোর সম্বোধন তাঁর সূক্ষ্ম রসবোধের পরিচয় বহন করে, যেমন ‘সবুরে মেওয়াফলদাতাসু’, ‘প্রভূত আনন্দদায়কেষু’, ‘আশানুরূপেষু’ ইত্যাদি।
সোহরাব হাসানের লেখাতেও সুকান্তের প্রেম প্রসঙ্গ উঠে এসেছে। প্রেম এবং কিছু ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ নিয়ে বন্ধু অরুণাচল বসুর কাছে লেখা চিঠির উল্লেখ করেছেন সোহরাব হাসান। আবদুল মান্নান সৈয়দও সুকান্তের প্রেম নিয়ে কথা বলেছেন। তাঁর প্রেম চিঠিতেই ছিল সীমাবদ্ধ। কাব্যে প্রেম সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। সুকান্তের মতে, প্রেমে পড়ে কবিতা লেখা ন্যক্কারজনক!
ভীষ্মদেব চৌধুরীর নিবন্ধে আমরা পাই আহমদ শরীফের সেই উক্তি, রবীন্দ্রনাথ আমাদের ঐতিহ্য— সম্পদ নন, আমাদের প্রেরণার উৎস সুকান্ত। ভীষ্মদেব বলেন, দলিত সর্বহারার বাণীকণ্ঠরূপেই বাংলা কবিতায় সুকান্তের কবিপরিচয় স্বীকৃত। এ-কথা অজানা নয় যে, বাংলা কবিতায় সর্বহারার ঐকতান শিল্পিত সুরে প্রথম ধ্বনিত হয়েছিল কাজী নজরুল ইসলামের কবিতায়। কিন্তু মার্কসিস্ট ও কমিউনিস্টের মধ্যে যে পার্থক্য, দায়বদ্ধতার প্রশ্নে নজরুল ও সুকান্তের ব্যবধানটা অনেকটা সেরকমই।
ইসরাইল খান তাঁর লেখায় সুকান্তকে যথাযথ গুরুত্ব না দেওয়া, তাঁর প্রতি অবহেলা প্রদর্শনের বিষয়টি নিয়ে তাঁর ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন।
সৈয়দ আজিজুল হক সুকান্তের বয়সের ওপর বিস্তারিত আলোচনা দিয়ে তাঁর প্রবন্ধ শুরু করেন। কিশোর বয়সেই যে অনেক জগদ্বিখ্যাত কবি ও কথাসাহিত্যিক তাঁদের শ্রেষ্ঠ সাহিত্যকর্ম সৃষ্টি করেছিলেন সেই উদাহরণ তুলে ধরেন। সাম্রাজ্যবাদ, উপনিবেশবাদ, পুঁজিবাদ ও ফ্যাসিবাদবিরোধী লেখকদের সংগঠন ‘প্রগতি লেখক সঙ্ঘ’র সুকান্ত ছিলেন একজন অত্যন্ত সক্রিয় কর্মী।
আহমাদ মাযহার তাঁর প্রবন্ধে লিখেছেন, বাংলা কবিতায় তিরিশোত্তর কালে যে আধুনিকতাবাদের সূচনা তার প্রায় সমসাময়িক হওয়া সত্ত্বেও সুকান্তের কবিতা গুণগতভাবে আলাদা। পার্থক্য মূলত দৃষ্টিভঙ্গি, বিষয়বস্তু ও প্রকাশের ধরনে। সাধারণ আধুনিকবাদী কবিতায় ব্যক্তি সংকট, হতাশা ও জটিল রূপক প্রাধান্য পায়, কিন্তু সুকান্তের কবিতা প্রোজ্জ্বল গণমানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা, স্পষ্ট রাজনৈতিক চেতনা ও লড়াকু আশাবাদে। সাধারণ আধুনিক কবিতার উপজীব্য কবির একক মনস্তত্ত্ব, নিঃসঙ্গতা ও আত্মমগ্নতা। পক্ষান্তরে সুকান্তের কবিতার মূল লক্ষ্য ছিল শ্রেণিসংগ্রাম, শ্রমজীবি মানুষের অধিকার এবং শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা।
কুদরত-ই-হুদা তাঁর লেখায় সুকান্তের কমিউনিস্ট পার্টি ও ছাত্র আন্দোলনে জড়িত থাকা এবং খেয়ে-না-খেয়ে পার্টির কাজে ব্যস্ত থাকার চিত্র তুলে ধরেছেন। কমিউনিস্ট পার্টির সবচেয়ে কমবয়সী সদস্য ছিলেন সুকান্ত।
রাজীব সরকার তার প্রবন্ধে উদ্ধৃত করেছেন বুদ্ধদেব বসুর সুকান্ত মূল্যায়ন, যিনি মনে করতেন, ‘খবুরে কাগুজে পদ্য’ লিখে সুকান্ত আসলে তাঁর শক্তির অপচয় করছেন। আবার উদ্ধৃত করেছেন মার্কসীয় দর্শনে আস্থাশীল সুসাহিত্যিক যতীন সরকারের মন্তব্য, ‘একালের বাংলা কবিতা সুকান্তের উত্তরাধিকারকে সচেতনভাবেই অস্বীকার করে। একালের নামি দামি সমালোচক সুকান্তের প্রসঙ্গ পরিহার করে চলেন অতি সযতনে। আধুনিক বাংলা কবিতার উত্তরাধিকারের কথা বলতেই চোখ ফেরানো হয় কল্লোল কালিকলম বা তিরিশের যুগের ফসলের দিকে। ... উৎসাহের সঙ্গে সুকান্তের জন্ম-মৃত্যুবার্ষিকী পালনের স্রোতে অবশ্যি ভাটা পড়েনি... । কিন্তু এসব বার্ষিক কৃত্যের সঙ্গে সাহিত্যকর্মী বা সাহিত্যবোদ্ধারা প্রায় অসম্পৃক্ত, সুকান্তের স্মৃতিবাসর প্রায়শই পরিণতি পায় রাজনীতি আলোচনার ঘরোয়া আসরে।’
নীলিমা তাবাসসুম তাঁর প্রবন্ধে সুকান্তকে নিয়ে মানিক বন্দোপাধ্যাযের মন্তব্য উদ্ধৃত করেছেন, ‘জীবনে যেমন, কাব্য-সাহিত্যেও সরলতা বিশেষণটিতে রিক্ততার ইঙ্গিতটাই আমাদের কাছে বড় বেশি জোরালো। গভীরতা, ব্যাপ্তি, তীব্রতা, ভাবৈশ্বর্য ইত্যাদি সবকিছুর ধারক ও বাহক হিসেবে সাদামাটা স্পষ্টভাষী সার্থক কবিতা কল্পনা করতে আমরা অপটু ছিলাম, আমাদের অভিজ্ঞতা স্বীকৃত গীতিকবিতা পর্যন্ত। সুকান্তের কবিতায় তাই বাংলা কাব্য-সাহিত্যের নবজন্মের সূচনা ছিল।’
বিপ্লবে বিশ্বাসী একজন কমিউনিস্ট হয়েও সুকান্ত গভীর শ্রদ্ধা পোষণ করতেন রবীন্দ্রনাথ ও গান্ধীর প্রতি। আনিসুজ্জামানের লেখা পড়ে জানা যায়, সুকান্ত যেমন রবীন্দ্রনাথ ও গান্ধীকে নিয়ে কবিতা লিখেছেন তেমনই জিন্নাকে নিয়েও তাঁর কবিতা আছে।
পুনর্মুদ্রণ-এর নিবেদিত কবিতাগুচ্ছ অংশে স্থান পেয়েছে সুকান্তের হাতে লেখা ‘নিবৃত্তির পূর্বে’ শীর্ষক কবিতার পাণ্ডুলিপি, সুকান্তকে উদ্দেশ করে রচিত মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, অরুণ মিত্র, মনীন্দ্র রায়, বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী ও অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের কবিতা।
পুনর্মুদ্রণ-এর প্রবন্ধ-সাক্ষাৎকার-আলোচনা অংশে রয়েছে সুকান্তের ওপর মুজফ্ফর আহমদ, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, বুদ্ধদেব বসু, বিষ্ণু দে, রণেশ দাশগুপ্ত, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, আহমদ শরীফ (সাক্ষাৎকার), দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, বদরুদ্দীন উমর, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, আনিসুজ্জামান, আবদুল মান্নান সৈয়দ ও জীবনকুমার চক্রবর্তীর রচনা।
অনূদিত কবিতাগুচ্ছ অংশে সুকান্তের কিছু কবিতা ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন আফসান চৌধুরী, মোহীত উল আলম, আবেদীন কাদের ও মাইনুর নাহার।
বইটিতে কিছু মুদ্রণপ্রমাদ ও বানানবিভ্রাট চোখে পড়ে, এ ব্যাপারে সম্পাদকদের আরও সজাগ থাকা উচিত ছিল বলে মনে করি।
ইংরেজিতে সুকান্তের কবিতার অনুবাদ কী উদ্দেশ্য সাধন করবে, বিষয়টা জানার আগ্রহ রইল।
জন্মশতবর্ষে সুকান্তকৃতি তুলে ধরতে এই সংকলন গ্রন্থটি প্রকাশ করা হয়েছে। উঁচু মানের কাগজে মজবুত বাঁধাই-করা ২০৬ পৃষ্ঠার এই বইটি সুকান্ত সম্পর্কে আমাদের জ্ঞানের পরিধি বাড়াতে খুবই সহায়ক হবে বলে মনে করি। এই গ্রন্থটির ব্যাপক প্রচার ও পাঠ প্রত্যাশা করি।

বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৫ অক্টোবর ২০২৬
যাকে বলে ধোঁয়া-ওঠা ভাত! একেবারে গরম গরম! অনুপম প্রকাশনীর অফিসে গিয়েছিলাম বিশেষ এক কাজে। অনুপমের স্বত্বাধিকারী মিলন নাথ একটা বই ধরিয়ে দিয়ে বললেন, ‘আপনি ইচ্ছা করলে এই বইটার প্রথম ক্রেতা ও পাঠক হতে পারেন... এইমাত্র বাঁধাই হয়ে এল...।’
ভাবলাম, মন্দ কী! কোনো কিছুতে প্রথম হওয়া আনন্দের ব্যাপার তো বটেই!
মাসুক হেলালের আঁকা সুন্দর প্রচ্ছদ। গালে হাত দেওয়া সেই পরিচিত ছবি। বইয়ের নাম, ‘সুকান্ত ভট্টাচার্য: জন্মশতবর্ষের শ্রদ্ধাঞ্জলি’। সম্পাদনা করেছেন মোরশেদ শফিউল হাসান ও মাইনুর নাহার। সম্পাদনায় সহযোগী অরবিন্দ পান্তি।
গ্রন্থটিতে পঁয়ত্রিশজন লেখকের বেশ কিছু ছোটবড় প্রবন্ধ, একটি সাক্ষাৎকার, সুকান্তকে নিয়ে কবিতা, ইংরেজিতে সুকান্তের কবিতার অনুবাদ যেমন স্থান পেয়েছে তেমনই সুকান্তের নিজ হাতে লেখা কবিতার পাণ্ডুলিপি ও বন্ধু অরুণাচল বসুকে লেখা চিঠিও স্থান পেয়েছে। কী গোটা গোটাই না হস্তলিপি!
নতুন লেখা এবং পুরনো লেখকদের পুনর্মুদ্রিত রচনায় সুকান্ত-সাহিত্যের ব্যবচ্ছেদ হয়েছে, আমার ধারণা, বিস্তারিতভাবেই।
গণমানুষের জন্য কবিতা। আরও স্পষ্ট করে বললে, মানবমুক্তির জন্য একটি কার্যকর হাতিয়ার হিসাবে কবিতাকে গণ্য করেছিলেন সুকান্ত। তাঁর কবিতার সহজবোধ্যতা উদ্দীপিত করেছে সাধারণ মানুষকে তাদের অধিকার আদায়ের লড়াই সংগ্রামে।
‘বস্তুত আধুনিক বাংলা কাব্যে গণমুখিনতা— এমনকি বিদ্রোহ-বিপ্লবের বাণীরূপের যে সূত্রপাত ও চূড়ান্ত সিদ্ধি নজরুলে, তারই ধারাবাহিকতায় সুভাষ-সুকান্তের আবির্ভাব।’ বইটির ভূমিকা থেকে উদ্ধৃত করছি। ‘আমাদের স্বাধিকার সংগ্রাম ও জাতীয় মুক্তির লড়াইয়েও প্রেরণা যুগিয়েছে সুকান্তের লেখা কবিতা ও গান। তাঁর ‘দুর্মর’ তো একাত্তরে আমাদের সংগ্রামের বাণীমূর্তি হয়ে দাঁড়িয়েছিল।’
গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত লেখাগুলোর মধ্যে তেরোটি নতুন লেখা। তার মধ্যে আবুল কাসেম ফজলুল হকের প্রবন্ধটি তাঁর মৃত্যুর আগে সুকান্তের একটি কবিতা সংগ্রহের ভূমিকা হিসাবে লেখা হলেও তাঁর অনুমতি নিয়েই এখানে ছাপা হয়েছে বলে সম্পাদকরা জানিয়েছেন।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী সুকান্তের ওপর আলোচনা করতে গিয়ে বলেন, ‘তারুণ্যের মধ্যে পূর্ণ আছে, কিন্তু ঋণও আছে একপ্রকার। তারুণ্য চপল হতে জানে, সে হতে পারে বুদ্ধিতে অপরিণত, আবেগে অশিক্ষিত। কিন্তু সুকান্তের তারুণ্যে ভরা আছে, ঋণ নেই। তার মধ্যে তারুণ্যের উদ্দীপনা উত্তেজনা আছে, কিন্তু উদ্দীপনা ও উত্তেজনাকে তিনি কাব্যের শৃঙ্খলার ভেতর রেখেছেন, যেমন রেখেছিরেন কাজী নজরুল ইসলাম, আরো অনেক বেশি সময় নিয়ে, আরো অনেক অধিক সংখ্যক কবিতায়।’ তিনি প্রগতিশীল সাহিত্যের সংজ্ঞা বিবেচনা করার বিষয়টিও উত্থাপন করেছেন।
আবুল কাসেম ফজলুল হক তাঁর লেখায় বলেন, ‘কবিতায় সুকান্ত যে রচনারীতি ও ছন্দ অবলম্বন করেছেন, তা আধুুনিকতাবাদীদের (বুদ্ধদেব বসু, জীবনানন্দ দাশ, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, অমিয় চক্রবর্তী, বিষ্ণু দে প্রমুখ) কাছাকাছি কিন্তু আধুনিকতাবাদীদের দৃষ্টিভঙ্গি ও চিন্তাচেতনার প্রতি তাঁর কোনো সমর্থন ছিল না। আধুনিকতাবাদীরা ছিলেন নৈরাশ্যবাদী ও গণবিচ্ছিন্ন, কখনো কখনো গণবিরোধী নানা বিভ্রান্তির শিকার।... সুকান্ত ছিলেন সত্যেন্দ্রনাথ ও নজরুলের সার্থক উত্তরসূরী।’
সুভাষ দে তাঁর নিবন্ধে সেই সময়ের বিশ্ববাস্তবতা, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, পঞ্চাশের মন্বন্তর, মন্বন্তরের ওপর লেখা সুকান্তের ৯৮ পঙ্ক্তির ‘বোধন’ কবিতার অংশবিশেষ উল্লেখ করেছেন। এই কবিতা সম্পর্কে বিশিষ্ট সমালোচক জগদীশ ভট্টাচার্য বলেছেন, ‘এই কবিতাটিকে আমি এ যুগের মহাকাব্য বলতে চাই। অন্তত ১৩৫০ থেকে ১৩৫৪’র মধ্যে এমন শক্তিশালী অথচ রসোত্তীর্ণ কবিতা যে আমার চোখে পড়েনি সে কথা মুক্ত কণ্ঠে স্বীকার করতে হবে...।’
সৈয়দ মোহাম্মদ শাহেদ তাঁর দীর্ঘ রচনায় সুকান্তের জীবনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেছেন; তাঁর কৌতুকপ্রিয়তা, গণিত ও ইতিহাসে খারাপ হওয়ার কারণে পরপর দুবার ম্যাট্রিক পরীক্ষায় ফেল, অথচ তখন তাঁর কবিতা ‘রানার’ পাটনা ও গৌহাটি বিভাগে দশম শ্রেণিতে পাঠ্য। তুলে ধরেছেন তাঁর কবিতা, ছড়া, গল্প, গান, প্রবন্ধ, কাব্যনাট্য, গীতিনাট্য, নাটিকা ও উপন্যাস এবং চেক, ফরাসি, ইংরেজি ভাষায় অনূদিত তাঁর কবিতার তালিকা।
মোবাশ্বেরা খানম বুশরার প্রবন্ধে সুকান্তের প্রেম ও বন্ধুদের কাছে লেখা পত্রের সম্বোধনের ভাষার বিষয়টি এসেছে। চিঠিগুলোর সম্বোধন তাঁর সূক্ষ্ম রসবোধের পরিচয় বহন করে, যেমন ‘সবুরে মেওয়াফলদাতাসু’, ‘প্রভূত আনন্দদায়কেষু’, ‘আশানুরূপেষু’ ইত্যাদি।
সোহরাব হাসানের লেখাতেও সুকান্তের প্রেম প্রসঙ্গ উঠে এসেছে। প্রেম এবং কিছু ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ নিয়ে বন্ধু অরুণাচল বসুর কাছে লেখা চিঠির উল্লেখ করেছেন সোহরাব হাসান। আবদুল মান্নান সৈয়দও সুকান্তের প্রেম নিয়ে কথা বলেছেন। তাঁর প্রেম চিঠিতেই ছিল সীমাবদ্ধ। কাব্যে প্রেম সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। সুকান্তের মতে, প্রেমে পড়ে কবিতা লেখা ন্যক্কারজনক!
ভীষ্মদেব চৌধুরীর নিবন্ধে আমরা পাই আহমদ শরীফের সেই উক্তি, রবীন্দ্রনাথ আমাদের ঐতিহ্য— সম্পদ নন, আমাদের প্রেরণার উৎস সুকান্ত। ভীষ্মদেব বলেন, দলিত সর্বহারার বাণীকণ্ঠরূপেই বাংলা কবিতায় সুকান্তের কবিপরিচয় স্বীকৃত। এ-কথা অজানা নয় যে, বাংলা কবিতায় সর্বহারার ঐকতান শিল্পিত সুরে প্রথম ধ্বনিত হয়েছিল কাজী নজরুল ইসলামের কবিতায়। কিন্তু মার্কসিস্ট ও কমিউনিস্টের মধ্যে যে পার্থক্য, দায়বদ্ধতার প্রশ্নে নজরুল ও সুকান্তের ব্যবধানটা অনেকটা সেরকমই।
ইসরাইল খান তাঁর লেখায় সুকান্তকে যথাযথ গুরুত্ব না দেওয়া, তাঁর প্রতি অবহেলা প্রদর্শনের বিষয়টি নিয়ে তাঁর ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন।
সৈয়দ আজিজুল হক সুকান্তের বয়সের ওপর বিস্তারিত আলোচনা দিয়ে তাঁর প্রবন্ধ শুরু করেন। কিশোর বয়সেই যে অনেক জগদ্বিখ্যাত কবি ও কথাসাহিত্যিক তাঁদের শ্রেষ্ঠ সাহিত্যকর্ম সৃষ্টি করেছিলেন সেই উদাহরণ তুলে ধরেন। সাম্রাজ্যবাদ, উপনিবেশবাদ, পুঁজিবাদ ও ফ্যাসিবাদবিরোধী লেখকদের সংগঠন ‘প্রগতি লেখক সঙ্ঘ’র সুকান্ত ছিলেন একজন অত্যন্ত সক্রিয় কর্মী।
আহমাদ মাযহার তাঁর প্রবন্ধে লিখেছেন, বাংলা কবিতায় তিরিশোত্তর কালে যে আধুনিকতাবাদের সূচনা তার প্রায় সমসাময়িক হওয়া সত্ত্বেও সুকান্তের কবিতা গুণগতভাবে আলাদা। পার্থক্য মূলত দৃষ্টিভঙ্গি, বিষয়বস্তু ও প্রকাশের ধরনে। সাধারণ আধুনিকবাদী কবিতায় ব্যক্তি সংকট, হতাশা ও জটিল রূপক প্রাধান্য পায়, কিন্তু সুকান্তের কবিতা প্রোজ্জ্বল গণমানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা, স্পষ্ট রাজনৈতিক চেতনা ও লড়াকু আশাবাদে। সাধারণ আধুনিক কবিতার উপজীব্য কবির একক মনস্তত্ত্ব, নিঃসঙ্গতা ও আত্মমগ্নতা। পক্ষান্তরে সুকান্তের কবিতার মূল লক্ষ্য ছিল শ্রেণিসংগ্রাম, শ্রমজীবি মানুষের অধিকার এবং শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা।
কুদরত-ই-হুদা তাঁর লেখায় সুকান্তের কমিউনিস্ট পার্টি ও ছাত্র আন্দোলনে জড়িত থাকা এবং খেয়ে-না-খেয়ে পার্টির কাজে ব্যস্ত থাকার চিত্র তুলে ধরেছেন। কমিউনিস্ট পার্টির সবচেয়ে কমবয়সী সদস্য ছিলেন সুকান্ত।
রাজীব সরকার তার প্রবন্ধে উদ্ধৃত করেছেন বুদ্ধদেব বসুর সুকান্ত মূল্যায়ন, যিনি মনে করতেন, ‘খবুরে কাগুজে পদ্য’ লিখে সুকান্ত আসলে তাঁর শক্তির অপচয় করছেন। আবার উদ্ধৃত করেছেন মার্কসীয় দর্শনে আস্থাশীল সুসাহিত্যিক যতীন সরকারের মন্তব্য, ‘একালের বাংলা কবিতা সুকান্তের উত্তরাধিকারকে সচেতনভাবেই অস্বীকার করে। একালের নামি দামি সমালোচক সুকান্তের প্রসঙ্গ পরিহার করে চলেন অতি সযতনে। আধুনিক বাংলা কবিতার উত্তরাধিকারের কথা বলতেই চোখ ফেরানো হয় কল্লোল কালিকলম বা তিরিশের যুগের ফসলের দিকে। ... উৎসাহের সঙ্গে সুকান্তের জন্ম-মৃত্যুবার্ষিকী পালনের স্রোতে অবশ্যি ভাটা পড়েনি... । কিন্তু এসব বার্ষিক কৃত্যের সঙ্গে সাহিত্যকর্মী বা সাহিত্যবোদ্ধারা প্রায় অসম্পৃক্ত, সুকান্তের স্মৃতিবাসর প্রায়শই পরিণতি পায় রাজনীতি আলোচনার ঘরোয়া আসরে।’
নীলিমা তাবাসসুম তাঁর প্রবন্ধে সুকান্তকে নিয়ে মানিক বন্দোপাধ্যাযের মন্তব্য উদ্ধৃত করেছেন, ‘জীবনে যেমন, কাব্য-সাহিত্যেও সরলতা বিশেষণটিতে রিক্ততার ইঙ্গিতটাই আমাদের কাছে বড় বেশি জোরালো। গভীরতা, ব্যাপ্তি, তীব্রতা, ভাবৈশ্বর্য ইত্যাদি সবকিছুর ধারক ও বাহক হিসেবে সাদামাটা স্পষ্টভাষী সার্থক কবিতা কল্পনা করতে আমরা অপটু ছিলাম, আমাদের অভিজ্ঞতা স্বীকৃত গীতিকবিতা পর্যন্ত। সুকান্তের কবিতায় তাই বাংলা কাব্য-সাহিত্যের নবজন্মের সূচনা ছিল।’
বিপ্লবে বিশ্বাসী একজন কমিউনিস্ট হয়েও সুকান্ত গভীর শ্রদ্ধা পোষণ করতেন রবীন্দ্রনাথ ও গান্ধীর প্রতি। আনিসুজ্জামানের লেখা পড়ে জানা যায়, সুকান্ত যেমন রবীন্দ্রনাথ ও গান্ধীকে নিয়ে কবিতা লিখেছেন তেমনই জিন্নাকে নিয়েও তাঁর কবিতা আছে।
পুনর্মুদ্রণ-এর নিবেদিত কবিতাগুচ্ছ অংশে স্থান পেয়েছে সুকান্তের হাতে লেখা ‘নিবৃত্তির পূর্বে’ শীর্ষক কবিতার পাণ্ডুলিপি, সুকান্তকে উদ্দেশ করে রচিত মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, অরুণ মিত্র, মনীন্দ্র রায়, বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী ও অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের কবিতা।
পুনর্মুদ্রণ-এর প্রবন্ধ-সাক্ষাৎকার-আলোচনা অংশে রয়েছে সুকান্তের ওপর মুজফ্ফর আহমদ, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, বুদ্ধদেব বসু, বিষ্ণু দে, রণেশ দাশগুপ্ত, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, আহমদ শরীফ (সাক্ষাৎকার), দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, বদরুদ্দীন উমর, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, আনিসুজ্জামান, আবদুল মান্নান সৈয়দ ও জীবনকুমার চক্রবর্তীর রচনা।
অনূদিত কবিতাগুচ্ছ অংশে সুকান্তের কিছু কবিতা ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন আফসান চৌধুরী, মোহীত উল আলম, আবেদীন কাদের ও মাইনুর নাহার।
বইটিতে কিছু মুদ্রণপ্রমাদ ও বানানবিভ্রাট চোখে পড়ে, এ ব্যাপারে সম্পাদকদের আরও সজাগ থাকা উচিত ছিল বলে মনে করি।
ইংরেজিতে সুকান্তের কবিতার অনুবাদ কী উদ্দেশ্য সাধন করবে, বিষয়টা জানার আগ্রহ রইল।
জন্মশতবর্ষে সুকান্তকৃতি তুলে ধরতে এই সংকলন গ্রন্থটি প্রকাশ করা হয়েছে। উঁচু মানের কাগজে মজবুত বাঁধাই-করা ২০৬ পৃষ্ঠার এই বইটি সুকান্ত সম্পর্কে আমাদের জ্ঞানের পরিধি বাড়াতে খুবই সহায়ক হবে বলে মনে করি। এই গ্রন্থটির ব্যাপক প্রচার ও পাঠ প্রত্যাশা করি।

আপনার মতামত লিখুন