১৯৭৫ সাল। বাংলাদেশের ইতিহাসের এক ক্রান্তিলগ্ন। তবে রাষ্ট্রীয় রাজনীতির অস্থিরতার বাইরে, পুরোনো ঢাকার অলিগলিতে এবং নীলক্ষেত-আজিমপুরের সংযোগস্থলে অবস্থিত মিরপুর রোডে তখনো লেগে ছিল এক অদ্ভুত শান্ত, স্নিগ্ধ আবেশ। আজকের ঢাকার যে রূপ আমরা দেখি—গগনচুম্বী অট্টালিকা, অন্তহীন যানজট, আর কংক্রিটের জঙ্গল—সেটি তখনো অচেনা।
উপরের ছবিটি সেই শান্ত সময়েরই এক জীবন্ত দলিল। এই ছবিতে শুধু একটি রাস্তা বা একটি সিনেমা হল নেই, বরং ধারণ করা আছে সেই সময়ের সামগ্রিক জীবনযাত্রা। চোখ বুজলেই সেই স্মৃতিমাখা ছবির সূত্রে হারিয়ে যাওয়া যায় পুরনো ঢাকার সহজ-সরল জীবনে। ঘুরে আসা যায় সে সময়ের আর্থ-সামাজিক ও পরিবেশগত প্রেক্ষাপটের টাইম লাইমে।।
এক নির্মল চরাচর
ছবিটির দিকে তাকালে প্রথমেই যে বিষয়টি নজর কাড়ে, তা হলো এর নির্মল পরিবেশ। আকাশটা যেন আজকের চেয়ে বেশি নীল ছিল। মেঘগুলো ছিল তুলতুলে সাদা। বাতাস ছিল ধুলিকণামুক্ত। ১৯৭৫ সালের কাছাকাছি সময়ে ঢাকায় জনসংখ্যা আজকের তুলনায় ছিল নগণ্য। যানবাহন কম থাকায় বায়ুদূষণ বা শব্দদূষণ ছিল কল্পনাতীত। রাস্তার দুপাশে গাছপালার আধিক্য ছিল, যা পরিবেশকে ঠান্ডা ও সজীব রাখত।
জলবায়ুর দিক থেকে তখন ঋতুচক্রের স্বাভাবিকতা ছিল বেশি স্পষ্ট। গ্রীষ্মে যেমন প্রচণ্ড রোদ হতো, তেমনি বর্ষায় অঝোর ধারায় বৃষ্টি হতো। যা আজকের অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে সৃষ্ট জলাবদ্ধতার মতো ভয়াবহ রূপ ধারণ করত না। পরিবেশের প্রতি মানুষের সচেতনতা হয়তো প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আজকের মতো ছিল না, কিন্তু জীবনযাত্রা ছিল প্রকৃতির সাথে সহনশীল।
স্বয়ংসম্পূর্ণ ও মন্থর জীবন
অর্থনৈতিকভাবে দেশটি ছিল পুনর্গঠনের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ ও অর্থনৈতিক সংকটের রেশ তখনো কাটেনি। তবে পুরোনো ঢাকার স্থানীয় অর্থনীতি ছিল অনেকটা স্বয়ংসম্পূর্ণ। বড় বড় শপিং মল বা করপোরেট সংস্কৃতির বদলে ছোট ছোট দোকান, কুটির শিল্প এবং পারিবারিক ব্যবসায়ের প্রাধান্য ছিল।
মানুষের জীবন-জীবিকা ছিল আজকের মতো দ্রুতগতির নয়। কর্মসংস্থানের সুযোগগুলো ছিল স্থানীয়কেন্দ্রিক। ছবিতে দেখা যাচ্ছে, হাতে টানা রিকশা এবং সাইকেল। এটি প্রমাণ করে যে, তখনো যাতায়াতের জন্য মানুষ যান্ত্রিক যানবাহনের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল ছিল না। রিকশাচালক, সাইকেল মেরামতের মিস্ত্রি, হকার—এদের জীবন-জীবিকা এই মন্থর গতির সাথেই জড়িত ছিল।
আজকের মতো অ্যাপ-ভিত্তিক পরিবহন বা রাইড শেয়ারিংয়ের যুগে এসব পেশা এখন হারিয়ে যেতে বসেছে। রাস্তার ওপর বিজ্ঞাপন বা সাইনবোর্ডগুলোর ধরনও ছিল ভিন্ন—হাতে আঁকা পোস্টার এবং সাধারণ ফন্ট, যা সেই সময়ের অর্থনীতির সরলতার পরিচয় দেয়।
শান্ত রাজপথ
ছবিটি যখনকার, অর্থাৎ ১৯৭৫ সালের আগস্টের আগে বা পরে, তখন রাজনৈতিক অস্থিরতা ছিল চরমে। শেখ মুজিবুর রহমানের সরকার পরিবর্তন এবং পরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তন—সবই এই সময়ের ঘটনা। কিন্তু ছবিটির মধ্যে অদ্ভুত এক প্রশান্তি বিদ্যমান। এটি ইঙ্গিত দেয় যে, রাজনৈতিক উত্তালতা থাকলেও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন তার নিজস্ব গতিতে চলত।
রাজপথ আজকের মতো অবরুদ্ধ থাকত না। সাধারণ মানুষ নির্বিঘ্নে চলাচল করত। তবে বলাকা হলের বিশাল পোস্টার বা দেওয়ালচিত্রের আড়ালে হয়তো তৎকালীন রাজনৈতিক স্লোগান বা প্রচারণার কোনো ছাপ থাকত।
সহজ ও সুলভ
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার কাঠামো তখনো ছিল জনকল্যাণমুখী। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা কাছে হওয়ায়, নীলক্ষেত ও আজিমপুর এলাকাটি ছিল শিক্ষার্থীদের পদচারণায় মুখর। আজকের মতো কোচিং বা প্রাইভেট পড়ার দৌরাত্ম্য ছিল না। শিক্ষা ছিল জ্ঞানার্জনের মাধ্যম।
স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। বড় বড় হাসপাতাল বা ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বদলে পাড়ায় পাড়ায় চিকিৎসকের চেম্বার এবং সরকারি হাসপাতালগুলোর ওপর মানুষের নির্ভরতা ছিল। জীবনযাত্রা ছিল অনেক বেশি স্বাস্থ্যসম্মত, ভেজাল খাদ্য ও অস্বাস্থ্যকর প্রক্রিয়াজাত খাবারের ছড়াছড়ি ছিল না।
পারস্পরিক নির্ভরতা
১৯৭৫ সালের পুরোনো ঢাকার সামাজিক মূল্যবোধ আজকের তুলনায় ছিল অনেক বেশি অটুট। মানুষ ছিল একে অপরের প্রতি সহানুভূতিশীল ও নির্ভরশীল। প্রতিবেশীর খবর রাখা, বিপদে এগিয়ে আসা—এসব ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। যৌথ পরিবার প্রথা তখনো প্রবলভাবে বিদ্যমান।
সাংস্কৃতিক বিনোদনের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র ছিল সিনেমা হল। আজকের মাল্টিপ্লেক্সের যুগে আমরা ব্যক্তিগত বিনোদনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি, কিন্তু সে সময় ‘বলাকা সিনেমা হল’ ছিল একটি সামাজিক মিলনকেন্দ্র। পরিবার-পরিজন বা বন্ধুদের সাথে হলে গিয়ে ছবি দেখা, হলের সামনে দাঁড়িয়ে খোশগল্প করা—এটাই ছিল সংস্কৃতির অঙ্গ।
বলাকার বিশাল প্যানোরামিক দেওয়াল চিত্রটি যেন সেই সময়ের যৌথ আনন্দ ও উৎসবমুখর সংস্কৃতিরই প্রতীক। মানুষে মানুষে দূরত্ব ছিল কম, সামাজিক বন্ধন ছিল দৃঢ়।
সংস্কৃতির ধারক
রাস্তার ঠিক সামনে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা ‘বলাকা সিনেওয়ার্ল্ড’ (তৎকালীন বলাকা সিনেমা হল) শুধু একটি ভবন নয়, এটি ঢাকার সংস্কৃতির ইতিহাসের এক সাক্ষী। ১৯৬৪ সালের ১ মে এটি যাত্রা শুরু করে। এই সিঙ্গল-স্ক্রিন প্রেক্ষাগৃহটি সেই সময় থেকেই ঢাকা শহরের চলচ্চিত্রপ্রেমীদের কাছে এক আবেগের নাম। বিশেষ করে পুরোনো ঢাকার মানুষের বিনোদনের প্রধান কেন্দ্র ছিল এটি।
বলাকার অনন্য স্থাপত্যশৈলী এবং বিশাল হলরুম সেই সময়ের অভিজাত বিনোদনের কথা মনে করিয়ে দেয়। আজকের আধুনিক সিনেপ্লেক্সের ভিড়ে এই ঐতিহ্যবাহী হলটি যেন সেই পুরনো দিনের সোনালী সময়ের স্মৃতিকে আগলে রেখে আজও দাঁড়িয়ে আছে।
জীবন্ত স্মারক
১৯৭৫ সালের এক শান্ত দুপুরের এই ছবিটি কেবল একটি স্থিরচিত্র নয়, এটি আমাদের শেকড়, সংস্কৃতি এবং আমাদের বিবর্তনের এক জীবন্ত স্মারক। আজকের আধুনিক, কোলাহলপূর্ণ ও যানজটপূর্ণ ঢাকার ঠিক বিপরীত রূপ এটি। এই ছবিটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, যান্ত্রিক উন্নতির সাথে সাথে আমরা কীভাবে আমাদের নির্মল পরিবেশ, পারস্পরিক সামাজিক বন্ধন এবং জীবনের সহজ প্রশান্তি হারিয়েছি। পুরোনো ঢাকা ও বলাকার চত্বর আজো সেই স্মৃতি বুকে ধারণ করে কালের সাক্ষী হয়ে আছে।

মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
১৯৭৫ সাল। বাংলাদেশের ইতিহাসের এক ক্রান্তিলগ্ন। তবে রাষ্ট্রীয় রাজনীতির অস্থিরতার বাইরে, পুরোনো ঢাকার অলিগলিতে এবং নীলক্ষেত-আজিমপুরের সংযোগস্থলে অবস্থিত মিরপুর রোডে তখনো লেগে ছিল এক অদ্ভুত শান্ত, স্নিগ্ধ আবেশ। আজকের ঢাকার যে রূপ আমরা দেখি—গগনচুম্বী অট্টালিকা, অন্তহীন যানজট, আর কংক্রিটের জঙ্গল—সেটি তখনো অচেনা।
উপরের ছবিটি সেই শান্ত সময়েরই এক জীবন্ত দলিল। এই ছবিতে শুধু একটি রাস্তা বা একটি সিনেমা হল নেই, বরং ধারণ করা আছে সেই সময়ের সামগ্রিক জীবনযাত্রা। চোখ বুজলেই সেই স্মৃতিমাখা ছবির সূত্রে হারিয়ে যাওয়া যায় পুরনো ঢাকার সহজ-সরল জীবনে। ঘুরে আসা যায় সে সময়ের আর্থ-সামাজিক ও পরিবেশগত প্রেক্ষাপটের টাইম লাইমে।।
এক নির্মল চরাচর
ছবিটির দিকে তাকালে প্রথমেই যে বিষয়টি নজর কাড়ে, তা হলো এর নির্মল পরিবেশ। আকাশটা যেন আজকের চেয়ে বেশি নীল ছিল। মেঘগুলো ছিল তুলতুলে সাদা। বাতাস ছিল ধুলিকণামুক্ত। ১৯৭৫ সালের কাছাকাছি সময়ে ঢাকায় জনসংখ্যা আজকের তুলনায় ছিল নগণ্য। যানবাহন কম থাকায় বায়ুদূষণ বা শব্দদূষণ ছিল কল্পনাতীত। রাস্তার দুপাশে গাছপালার আধিক্য ছিল, যা পরিবেশকে ঠান্ডা ও সজীব রাখত।
জলবায়ুর দিক থেকে তখন ঋতুচক্রের স্বাভাবিকতা ছিল বেশি স্পষ্ট। গ্রীষ্মে যেমন প্রচণ্ড রোদ হতো, তেমনি বর্ষায় অঝোর ধারায় বৃষ্টি হতো। যা আজকের অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে সৃষ্ট জলাবদ্ধতার মতো ভয়াবহ রূপ ধারণ করত না। পরিবেশের প্রতি মানুষের সচেতনতা হয়তো প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আজকের মতো ছিল না, কিন্তু জীবনযাত্রা ছিল প্রকৃতির সাথে সহনশীল।
স্বয়ংসম্পূর্ণ ও মন্থর জীবন
অর্থনৈতিকভাবে দেশটি ছিল পুনর্গঠনের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ ও অর্থনৈতিক সংকটের রেশ তখনো কাটেনি। তবে পুরোনো ঢাকার স্থানীয় অর্থনীতি ছিল অনেকটা স্বয়ংসম্পূর্ণ। বড় বড় শপিং মল বা করপোরেট সংস্কৃতির বদলে ছোট ছোট দোকান, কুটির শিল্প এবং পারিবারিক ব্যবসায়ের প্রাধান্য ছিল।
মানুষের জীবন-জীবিকা ছিল আজকের মতো দ্রুতগতির নয়। কর্মসংস্থানের সুযোগগুলো ছিল স্থানীয়কেন্দ্রিক। ছবিতে দেখা যাচ্ছে, হাতে টানা রিকশা এবং সাইকেল। এটি প্রমাণ করে যে, তখনো যাতায়াতের জন্য মানুষ যান্ত্রিক যানবাহনের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল ছিল না। রিকশাচালক, সাইকেল মেরামতের মিস্ত্রি, হকার—এদের জীবন-জীবিকা এই মন্থর গতির সাথেই জড়িত ছিল।
আজকের মতো অ্যাপ-ভিত্তিক পরিবহন বা রাইড শেয়ারিংয়ের যুগে এসব পেশা এখন হারিয়ে যেতে বসেছে। রাস্তার ওপর বিজ্ঞাপন বা সাইনবোর্ডগুলোর ধরনও ছিল ভিন্ন—হাতে আঁকা পোস্টার এবং সাধারণ ফন্ট, যা সেই সময়ের অর্থনীতির সরলতার পরিচয় দেয়।
শান্ত রাজপথ
ছবিটি যখনকার, অর্থাৎ ১৯৭৫ সালের আগস্টের আগে বা পরে, তখন রাজনৈতিক অস্থিরতা ছিল চরমে। শেখ মুজিবুর রহমানের সরকার পরিবর্তন এবং পরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তন—সবই এই সময়ের ঘটনা। কিন্তু ছবিটির মধ্যে অদ্ভুত এক প্রশান্তি বিদ্যমান। এটি ইঙ্গিত দেয় যে, রাজনৈতিক উত্তালতা থাকলেও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন তার নিজস্ব গতিতে চলত।
রাজপথ আজকের মতো অবরুদ্ধ থাকত না। সাধারণ মানুষ নির্বিঘ্নে চলাচল করত। তবে বলাকা হলের বিশাল পোস্টার বা দেওয়ালচিত্রের আড়ালে হয়তো তৎকালীন রাজনৈতিক স্লোগান বা প্রচারণার কোনো ছাপ থাকত।
সহজ ও সুলভ
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার কাঠামো তখনো ছিল জনকল্যাণমুখী। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা কাছে হওয়ায়, নীলক্ষেত ও আজিমপুর এলাকাটি ছিল শিক্ষার্থীদের পদচারণায় মুখর। আজকের মতো কোচিং বা প্রাইভেট পড়ার দৌরাত্ম্য ছিল না। শিক্ষা ছিল জ্ঞানার্জনের মাধ্যম।
স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। বড় বড় হাসপাতাল বা ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বদলে পাড়ায় পাড়ায় চিকিৎসকের চেম্বার এবং সরকারি হাসপাতালগুলোর ওপর মানুষের নির্ভরতা ছিল। জীবনযাত্রা ছিল অনেক বেশি স্বাস্থ্যসম্মত, ভেজাল খাদ্য ও অস্বাস্থ্যকর প্রক্রিয়াজাত খাবারের ছড়াছড়ি ছিল না।
পারস্পরিক নির্ভরতা
১৯৭৫ সালের পুরোনো ঢাকার সামাজিক মূল্যবোধ আজকের তুলনায় ছিল অনেক বেশি অটুট। মানুষ ছিল একে অপরের প্রতি সহানুভূতিশীল ও নির্ভরশীল। প্রতিবেশীর খবর রাখা, বিপদে এগিয়ে আসা—এসব ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। যৌথ পরিবার প্রথা তখনো প্রবলভাবে বিদ্যমান।
সাংস্কৃতিক বিনোদনের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র ছিল সিনেমা হল। আজকের মাল্টিপ্লেক্সের যুগে আমরা ব্যক্তিগত বিনোদনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি, কিন্তু সে সময় ‘বলাকা সিনেমা হল’ ছিল একটি সামাজিক মিলনকেন্দ্র। পরিবার-পরিজন বা বন্ধুদের সাথে হলে গিয়ে ছবি দেখা, হলের সামনে দাঁড়িয়ে খোশগল্প করা—এটাই ছিল সংস্কৃতির অঙ্গ।
বলাকার বিশাল প্যানোরামিক দেওয়াল চিত্রটি যেন সেই সময়ের যৌথ আনন্দ ও উৎসবমুখর সংস্কৃতিরই প্রতীক। মানুষে মানুষে দূরত্ব ছিল কম, সামাজিক বন্ধন ছিল দৃঢ়।
সংস্কৃতির ধারক
রাস্তার ঠিক সামনে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা ‘বলাকা সিনেওয়ার্ল্ড’ (তৎকালীন বলাকা সিনেমা হল) শুধু একটি ভবন নয়, এটি ঢাকার সংস্কৃতির ইতিহাসের এক সাক্ষী। ১৯৬৪ সালের ১ মে এটি যাত্রা শুরু করে। এই সিঙ্গল-স্ক্রিন প্রেক্ষাগৃহটি সেই সময় থেকেই ঢাকা শহরের চলচ্চিত্রপ্রেমীদের কাছে এক আবেগের নাম। বিশেষ করে পুরোনো ঢাকার মানুষের বিনোদনের প্রধান কেন্দ্র ছিল এটি।
বলাকার অনন্য স্থাপত্যশৈলী এবং বিশাল হলরুম সেই সময়ের অভিজাত বিনোদনের কথা মনে করিয়ে দেয়। আজকের আধুনিক সিনেপ্লেক্সের ভিড়ে এই ঐতিহ্যবাহী হলটি যেন সেই পুরনো দিনের সোনালী সময়ের স্মৃতিকে আগলে রেখে আজও দাঁড়িয়ে আছে।
জীবন্ত স্মারক
১৯৭৫ সালের এক শান্ত দুপুরের এই ছবিটি কেবল একটি স্থিরচিত্র নয়, এটি আমাদের শেকড়, সংস্কৃতি এবং আমাদের বিবর্তনের এক জীবন্ত স্মারক। আজকের আধুনিক, কোলাহলপূর্ণ ও যানজটপূর্ণ ঢাকার ঠিক বিপরীত রূপ এটি। এই ছবিটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, যান্ত্রিক উন্নতির সাথে সাথে আমরা কীভাবে আমাদের নির্মল পরিবেশ, পারস্পরিক সামাজিক বন্ধন এবং জীবনের সহজ প্রশান্তি হারিয়েছি। পুরোনো ঢাকা ও বলাকার চত্বর আজো সেই স্মৃতি বুকে ধারণ করে কালের সাক্ষী হয়ে আছে।

আপনার মতামত লিখুন