বাংলাদেশের ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, রাজস্ব আয় বাড়ানো এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে সংস্কারের বিকল্প নেই। ব্যাংককে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভায় সরকারের সংস্কার কর্মসূচির বিভিন্ন লক্ষ্য নিয়ে নীতিগত ঐকমত্য তৈরি হয়েছে। আর্থিক খাতের সংস্কার, কর-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধি, শিল্পায়ন, বন্ধ কলকারখানা চালু এবং সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণের মতো বিষয়গুলো দেশের মানুষেরও প্রত্যাশা। তবে এসব সংস্কার বাস্তবায়নের মূল দায়িত্ব সরকারের। আন্তর্জাতিক সংস্থার শর্ত পূরণের জন্য নয়, জাতীয় স্বার্থেই আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
আগের ঋণ কর্মসূচির আওতায় আইএমএফ ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশের জন্য ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ অনুমোদন করে। পরে কর্মসূচির আকার বাড়িয়ে ৫৫০ কোটি ডলারে উন্নীত করা হয়। সাত কিস্তিতে অর্থ পাওয়ার কথা থাকলেও পাঁচ কিস্তিতে এসেছে ৩৬৪ কোটি ডলার। বিনিময় হার বাজারভিত্তিক করা, করছাড় যৌক্তিক করা, রাজস্বনীতি ও রাজস্ব আদায়ের কার্যক্রম আলাদা করা এবং ভর্তুকি কমানোর মতো শর্তগুলো যথাসময়ে পূরণ হয়নি। পরিবর্তিত অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও কঠিন শর্তের কারণে বর্তমান সরকার পুরোনো কর্মসূচি এগিয়ে নিতে আগ্রহী হয়নি। এখন তিন বছর মেয়াদি নতুন কর্মসূচির আওতায় প্রায় ৪৫০ কোটি ডলারের ঋণ নিয়ে আলোচনা চলছে। শর্ত নিয়ে দর-কষাকষির পাশাপাশি সংস্কারের বাস্তব অগ্রগতি নিশ্চিত করাই সরকারের প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত।
পুরোনো কর্মসূচির যেসব সংস্কার অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে, সেগুলোর প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। রাজস্ব আদায় বাড়ানো, করব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনা, অযৌক্তিক করছাড় কমানো এবং সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা বাড়ানো জরুরি। একইভাবে ব্যাংক খাতের দুর্বলতা দূর করতে কার্যকর আইন ও তদারকি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আইএমএফের শর্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অতীতে দীর্ঘসূত্রতা দেখা গেছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সংস্কার, করছাড় যৌক্তিক করা এবং বিনিময় হার বাজারভিত্তিক করার মতো উদ্যোগ প্রত্যাশিত অগ্রগতি পায়নি। ফলে রাজস্ব আয়ের ঘাটতি ও সরকারি ব্যয়ের চাপ সামলাতে ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। এসব সংস্কার আবারও পিছিয়ে দিলে নতুন ঋণ কর্মসূচিও কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে না।
বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের সংকট আরও গভীর। অতীতে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা, দুর্বল তদারকি ও প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতাদের সুবিধা দেওয়ার কারণে ব্যাংক থেকে বিপুল অর্থ বেরিয়ে গেছে। এর ফলে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছয় লাখ কোটি টাকার বেশি হয়েছে, যা মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। খেলাপি ঋণের বড় অংশ মাত্র কয়েকটি ব্যাংকে কেন্দ্রীভূত। এই পরিস্থিতির দায় এড়াতে পারে না কেন্দ্রীয় ব্যাংক কিংবা সংশ্লিষ্ট সরকারগুলো। ব্যাংকের মালিকানা ও ঋণ বিতরণে রাজনৈতিক প্রভাব বন্ধ করা, ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া এবং আর্থিক অপরাধের তদন্ত নিশ্চিত করা এখন অপরিহার্য।
ব্যাংক খাতের ক্ষতি কাটিয়ে তুলতে সাধারণ মানুষের করের টাকা ব্যবহারের প্রসঙ্গটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের বক্তব্য অনুযায়ী, বিপর্যস্ত ব্যাংক খাতের ক্ষতি সামাল দিতে আগামী পাঁচ থেকে আট বছর প্রতিবছর প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে। অর্থাৎ ব্যাংকের অনিয়ম ও লুটপাটের বোঝা শেষ পর্যন্ত জনগণের ওপর পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। কিন্তু জনগণের অর্থ ব্যয় করার আগে প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে—এই ক্ষতির জন্য দায়ী ব্যক্তিদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের কী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে? ব্যাংক লুটের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের সম্পদ উদ্ধার, তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা এবং অপরাধের শাস্তি নিশ্চিত না করে সাধারণ মানুষের করের টাকা দিয়ে ক্ষতি পূরণ করা ন্যায়সংগত হতে পারে না।
বিশ্বব্যাংকের ৪৫ কোটি ডলারের একটি কর্মসূচিতে আমানত সুরক্ষা, বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি সক্ষমতা বৃদ্ধি ও ব্যাংক পুনর্গঠনের প্রস্তুতির মতো বিষয় রয়েছে। তবে ব্যাংক খাতের সব ক্ষতি মেটানোর জন্য এ অর্থ দেওয়া হচ্ছে না। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে সংস্কার ও জবাবদিহির শর্ত আরোপ করে। জনগণের অর্থ ব্যাংক পুনরুদ্ধারে ব্যয় করলেও একই ধরনের শর্ত থাকা উচিত। কোন ব্যাংককে কেন সহায়তা দেওয়া হচ্ছে, অর্থ কীভাবে ব্যবহার হবে, কী সংস্কার করা হবে এবং প্রত্যাশিত ফল না এলে কারা দায় নেবে—এসব বিষয় স্পষ্ট করতে হবে।
সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ব্যাংক রেজোল্যুশন অধ্যাদেশের পরিবর্তে বর্তমান সরকার যে আইন করেছে, তাতে পুরোনো মালিকদের আবার মালিকানা ফিরে পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টিকারী একটি ধারা যুক্ত হয়েছিল। সমালোচনার মুখে পরে তা বাতিল করা হয়। এ ঘটনা দেখিয়ে দেয়, ব্যাংক খাতের সংস্কারে রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক স্বার্থের সংঘাত কতটা গুরুত্বপূর্ণ। অতীতে বেসরকারি ব্যাংকে পরিবারতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীকে ঋণ দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছিল। সেই ব্যবস্থা ফিরে এলে সংস্কারের সুফল মিলবে না।
নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী আর্থিক খাত সংস্কার কমিশন গঠন এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ বিলুপ্ত করার বিষয়েও সরকারের অগ্রগতি দেখানো প্রয়োজন। ব্যাংক খাতের নীতিনির্ধারণ ও তদারকিতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ কমিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা ও সক্ষমতা বাড়াতে হবে। ঋণখেলাপি ও প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতাদের জবাবদিহির আওতায় আনা, ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং ঋণ বিতরণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। শুধু দুর্বল ব্যাংক একীভূত করলেই সংকটের সমাধান হবে না; ব্যাংকের সম্পদের মান, ব্যবস্থাপনা ও ঋণ আদায়ের সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
দেশ থেকে পাচার হওয়া সম্পদ উদ্ধারের ক্ষেত্রেও দৃশ্যমান অগ্রগতি প্রয়োজন। সরকারি হিসাবে, দেশে-বিদেশে প্রায় ৭৬ হাজার ৯৮৪ কোটি টাকা মূল্যের সম্পদ জব্দ, ক্রোক বা অবরুদ্ধ করার আদেশ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে দেশের সম্পদের পরিমাণ ৫৭ হাজার ৩২৫ কোটি টাকার বেশি। এসব সম্পদ আইনগত প্রক্রিয়ায় উদ্ধার করা গেলে ব্যাংক খাতের ক্ষতি সামাল দিতে সহায়তা পাওয়া সম্ভব। তবে শুধু টাস্কফোর্স গঠন বা সম্পদ জব্দের ঘোষণা যথেষ্ট নয়। অর্থ ফেরত আনা, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং উদ্ধার করা অর্থের ব্যবহার সম্পর্কে জনগণকে নিয়মিত তথ্য দিতে হবে।
মালয়েশিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়াসহ পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশ ১৯৯৭ সালের আর্থিক সংকটের পর ব্যাংক খাতে সংস্কার করে ঘুরে দাঁড়িয়েছিল। তাদের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া যেতে পারে। ব্যাংক পুনরুদ্ধারে অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করাই ছিল গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই নীতি অনুসরণ করা দরকার। ব্যাংক বাঁচাতে জনগণের অর্থ ব্যবহার করা হলে সেই অর্থের বিনিময়ে কী সংস্কার হবে, কত দিনে ফল পাওয়া যাবে এবং ব্যর্থতার দায় কার—তা আগে থেকেই নির্ধারণ করতে হবে।
ব্যাংক ও আর্থিক খাতের সংস্কার কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থার চাপের বিষয় নয়; এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও জনগণের স্বার্থের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। নতুন ঋণ নিয়ে সাময়িক চাপ সামাল দেওয়া যেতে পারে, কিন্তু কাঠামোগত দুর্বলতা দূর না করলে সংকট আবারও ফিরে আসবে। তাই ঋণচুক্তির পাশাপাশি খেলাপি ঋণ আদায়, পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধার, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ব্যাংক পরিচালনা নিশ্চিত করতে হবে। জনগণের অর্থে ব্যাংক খাতের ক্ষতি পূরণ করতে হলে তার আগে দায়ীদের জবাবদিহি ও সংস্কারের নিশ্চয়তা দিতে হবে। জাতীয় স্বার্থেই ব্যাংক ও আর্থিক খাতে কার্যকর সংস্কার এখন সময়ের দাবি।
[লেখক: অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার]

শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৬ অক্টোবর ২০২৬
বাংলাদেশের ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, রাজস্ব আয় বাড়ানো এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে সংস্কারের বিকল্প নেই। ব্যাংককে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভায় সরকারের সংস্কার কর্মসূচির বিভিন্ন লক্ষ্য নিয়ে নীতিগত ঐকমত্য তৈরি হয়েছে। আর্থিক খাতের সংস্কার, কর-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধি, শিল্পায়ন, বন্ধ কলকারখানা চালু এবং সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণের মতো বিষয়গুলো দেশের মানুষেরও প্রত্যাশা। তবে এসব সংস্কার বাস্তবায়নের মূল দায়িত্ব সরকারের। আন্তর্জাতিক সংস্থার শর্ত পূরণের জন্য নয়, জাতীয় স্বার্থেই আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
আগের ঋণ কর্মসূচির আওতায় আইএমএফ ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশের জন্য ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ অনুমোদন করে। পরে কর্মসূচির আকার বাড়িয়ে ৫৫০ কোটি ডলারে উন্নীত করা হয়। সাত কিস্তিতে অর্থ পাওয়ার কথা থাকলেও পাঁচ কিস্তিতে এসেছে ৩৬৪ কোটি ডলার। বিনিময় হার বাজারভিত্তিক করা, করছাড় যৌক্তিক করা, রাজস্বনীতি ও রাজস্ব আদায়ের কার্যক্রম আলাদা করা এবং ভর্তুকি কমানোর মতো শর্তগুলো যথাসময়ে পূরণ হয়নি। পরিবর্তিত অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও কঠিন শর্তের কারণে বর্তমান সরকার পুরোনো কর্মসূচি এগিয়ে নিতে আগ্রহী হয়নি। এখন তিন বছর মেয়াদি নতুন কর্মসূচির আওতায় প্রায় ৪৫০ কোটি ডলারের ঋণ নিয়ে আলোচনা চলছে। শর্ত নিয়ে দর-কষাকষির পাশাপাশি সংস্কারের বাস্তব অগ্রগতি নিশ্চিত করাই সরকারের প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত।
পুরোনো কর্মসূচির যেসব সংস্কার অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে, সেগুলোর প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। রাজস্ব আদায় বাড়ানো, করব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনা, অযৌক্তিক করছাড় কমানো এবং সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা বাড়ানো জরুরি। একইভাবে ব্যাংক খাতের দুর্বলতা দূর করতে কার্যকর আইন ও তদারকি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আইএমএফের শর্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অতীতে দীর্ঘসূত্রতা দেখা গেছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সংস্কার, করছাড় যৌক্তিক করা এবং বিনিময় হার বাজারভিত্তিক করার মতো উদ্যোগ প্রত্যাশিত অগ্রগতি পায়নি। ফলে রাজস্ব আয়ের ঘাটতি ও সরকারি ব্যয়ের চাপ সামলাতে ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। এসব সংস্কার আবারও পিছিয়ে দিলে নতুন ঋণ কর্মসূচিও কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে না।
বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের সংকট আরও গভীর। অতীতে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা, দুর্বল তদারকি ও প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতাদের সুবিধা দেওয়ার কারণে ব্যাংক থেকে বিপুল অর্থ বেরিয়ে গেছে। এর ফলে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছয় লাখ কোটি টাকার বেশি হয়েছে, যা মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। খেলাপি ঋণের বড় অংশ মাত্র কয়েকটি ব্যাংকে কেন্দ্রীভূত। এই পরিস্থিতির দায় এড়াতে পারে না কেন্দ্রীয় ব্যাংক কিংবা সংশ্লিষ্ট সরকারগুলো। ব্যাংকের মালিকানা ও ঋণ বিতরণে রাজনৈতিক প্রভাব বন্ধ করা, ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া এবং আর্থিক অপরাধের তদন্ত নিশ্চিত করা এখন অপরিহার্য।
ব্যাংক খাতের ক্ষতি কাটিয়ে তুলতে সাধারণ মানুষের করের টাকা ব্যবহারের প্রসঙ্গটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের বক্তব্য অনুযায়ী, বিপর্যস্ত ব্যাংক খাতের ক্ষতি সামাল দিতে আগামী পাঁচ থেকে আট বছর প্রতিবছর প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে। অর্থাৎ ব্যাংকের অনিয়ম ও লুটপাটের বোঝা শেষ পর্যন্ত জনগণের ওপর পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। কিন্তু জনগণের অর্থ ব্যয় করার আগে প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে—এই ক্ষতির জন্য দায়ী ব্যক্তিদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের কী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে? ব্যাংক লুটের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের সম্পদ উদ্ধার, তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা এবং অপরাধের শাস্তি নিশ্চিত না করে সাধারণ মানুষের করের টাকা দিয়ে ক্ষতি পূরণ করা ন্যায়সংগত হতে পারে না।
বিশ্বব্যাংকের ৪৫ কোটি ডলারের একটি কর্মসূচিতে আমানত সুরক্ষা, বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি সক্ষমতা বৃদ্ধি ও ব্যাংক পুনর্গঠনের প্রস্তুতির মতো বিষয় রয়েছে। তবে ব্যাংক খাতের সব ক্ষতি মেটানোর জন্য এ অর্থ দেওয়া হচ্ছে না। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে সংস্কার ও জবাবদিহির শর্ত আরোপ করে। জনগণের অর্থ ব্যাংক পুনরুদ্ধারে ব্যয় করলেও একই ধরনের শর্ত থাকা উচিত। কোন ব্যাংককে কেন সহায়তা দেওয়া হচ্ছে, অর্থ কীভাবে ব্যবহার হবে, কী সংস্কার করা হবে এবং প্রত্যাশিত ফল না এলে কারা দায় নেবে—এসব বিষয় স্পষ্ট করতে হবে।
সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ব্যাংক রেজোল্যুশন অধ্যাদেশের পরিবর্তে বর্তমান সরকার যে আইন করেছে, তাতে পুরোনো মালিকদের আবার মালিকানা ফিরে পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টিকারী একটি ধারা যুক্ত হয়েছিল। সমালোচনার মুখে পরে তা বাতিল করা হয়। এ ঘটনা দেখিয়ে দেয়, ব্যাংক খাতের সংস্কারে রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক স্বার্থের সংঘাত কতটা গুরুত্বপূর্ণ। অতীতে বেসরকারি ব্যাংকে পরিবারতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীকে ঋণ দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছিল। সেই ব্যবস্থা ফিরে এলে সংস্কারের সুফল মিলবে না।
নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী আর্থিক খাত সংস্কার কমিশন গঠন এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ বিলুপ্ত করার বিষয়েও সরকারের অগ্রগতি দেখানো প্রয়োজন। ব্যাংক খাতের নীতিনির্ধারণ ও তদারকিতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ কমিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা ও সক্ষমতা বাড়াতে হবে। ঋণখেলাপি ও প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতাদের জবাবদিহির আওতায় আনা, ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং ঋণ বিতরণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। শুধু দুর্বল ব্যাংক একীভূত করলেই সংকটের সমাধান হবে না; ব্যাংকের সম্পদের মান, ব্যবস্থাপনা ও ঋণ আদায়ের সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
দেশ থেকে পাচার হওয়া সম্পদ উদ্ধারের ক্ষেত্রেও দৃশ্যমান অগ্রগতি প্রয়োজন। সরকারি হিসাবে, দেশে-বিদেশে প্রায় ৭৬ হাজার ৯৮৪ কোটি টাকা মূল্যের সম্পদ জব্দ, ক্রোক বা অবরুদ্ধ করার আদেশ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে দেশের সম্পদের পরিমাণ ৫৭ হাজার ৩২৫ কোটি টাকার বেশি। এসব সম্পদ আইনগত প্রক্রিয়ায় উদ্ধার করা গেলে ব্যাংক খাতের ক্ষতি সামাল দিতে সহায়তা পাওয়া সম্ভব। তবে শুধু টাস্কফোর্স গঠন বা সম্পদ জব্দের ঘোষণা যথেষ্ট নয়। অর্থ ফেরত আনা, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং উদ্ধার করা অর্থের ব্যবহার সম্পর্কে জনগণকে নিয়মিত তথ্য দিতে হবে।
মালয়েশিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়াসহ পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশ ১৯৯৭ সালের আর্থিক সংকটের পর ব্যাংক খাতে সংস্কার করে ঘুরে দাঁড়িয়েছিল। তাদের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া যেতে পারে। ব্যাংক পুনরুদ্ধারে অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করাই ছিল গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই নীতি অনুসরণ করা দরকার। ব্যাংক বাঁচাতে জনগণের অর্থ ব্যবহার করা হলে সেই অর্থের বিনিময়ে কী সংস্কার হবে, কত দিনে ফল পাওয়া যাবে এবং ব্যর্থতার দায় কার—তা আগে থেকেই নির্ধারণ করতে হবে।
ব্যাংক ও আর্থিক খাতের সংস্কার কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থার চাপের বিষয় নয়; এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও জনগণের স্বার্থের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। নতুন ঋণ নিয়ে সাময়িক চাপ সামাল দেওয়া যেতে পারে, কিন্তু কাঠামোগত দুর্বলতা দূর না করলে সংকট আবারও ফিরে আসবে। তাই ঋণচুক্তির পাশাপাশি খেলাপি ঋণ আদায়, পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধার, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ব্যাংক পরিচালনা নিশ্চিত করতে হবে। জনগণের অর্থে ব্যাংক খাতের ক্ষতি পূরণ করতে হলে তার আগে দায়ীদের জবাবদিহি ও সংস্কারের নিশ্চয়তা দিতে হবে। জাতীয় স্বার্থেই ব্যাংক ও আর্থিক খাতে কার্যকর সংস্কার এখন সময়ের দাবি।
[লেখক: অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার]

আপনার মতামত লিখুন