সংবাদ

মেঘের রাজ্যে রাজত্ব, নেপথ্যে চাঞ্চল্যকর তথ্য


মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম, চট্টগ্রাম
মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৩২ পিএম

মেঘের রাজ্যে রাজত্ব, নেপথ্যে চাঞ্চল্যকর তথ্য
পর্যটকদের এই স্বর্গের আড়ালেই চলছে পাহাড়ি দুই আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল- ইউপিডিএফ ও জেএসএসের (সন্তু গ্রুপ) মধ্যকার আধিপত্য বিস্তারের এক রক্তক্ষয়ী ও জটিল লড়াই

প্রকৃতির অনিন্দ্য সুন্দর রূপ, তুলার মতো ভেসে বেড়ানো মেঘের হাতছানি আর অপার সৌন্দর্যের জন্য সাজেক এখন দেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন স্পট। তবে পর্যটকদের এই স্বর্গের আড়ালেই চলছে পাহাড়ি দুই আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল- ইউপিডিএফ ও জেএসএসের (সন্তু গ্রুপ) মধ্যকার আধিপত্য বিস্তারের এক রক্তক্ষয়ী ও জটিল লড়াই। সম্প্রতি সাজেক ঘিরে গড়ে ওঠা ‘সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি’ এবং এর নেপথ্য কুশীলবদের কেন্দ্র করে পাহাড়ি জনপদে নতুন করে উত্তাপ ছড়াচ্ছে।

চাঁদার রাজ্য ও নিয়ন্ত্রণ পরিবর্তন

পর্যটন খাতকে কেন্দ্র করে সাজেকে প্রতি বছর শত কোটি টাকার বাণিজ্য এবং অন্তত ৩০ কোটি টাকার ট্যুরিস্ট পরিবহন ব্যবসা পরিচালিত হয়। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, প্রসীত খীসার নেতৃত্বাধীন ইউপিডিএফ দীর্ঘদিন ধরে সাজেকের পর্যটন ব্যবসা, পরিবহন, ঝরনার পানি এবং কৃষি ও বাঁশ-ফুলঝাড়ুর ব্যবসা থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায় করে আসছে।তবে সাম্প্রতিক সময়ে দৃশ্যপটে বড় পরিবর্তন এসেছে। সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন পিসিজেএসএস (জেএসএস) সাজেক দখলের কৌশল নেয় এবং বর্তমানে সাজেকের প্রায় ৭০ শতাংশ এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।

নেপথ্যে ‘তরু চাকমা’

সাজেক দখলে জেএসএসকে সামনে থেকে সহযোগিতা করছেন খাগড়াছড়ি সদরের বাসিন্দা তরু চাকমা। তিনি খাগড়াছড়ি শাখার ইউপিডিএফ (সংস্কার) দলের সশস্ত্র কমান্ডার। চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, তরু চাকমা ভারতের মিজোরামের আইজলের স্থায়ী নাগরিক এবং কিছুদিন আগে সেখানে অস্ত্রসহ পুলিশের হাতে আটকও হয়েছিলেন। পরবর্তীতে জেএসএসের ভারতীয় শাখার সহায়তায় ছাড়া পেয়ে তিনি রাঙামাটির বাঘাইছড়িতে এসে জেএসএসের সশস্ত্র শাখায় যোগ দেন। তার নেতৃত্বে সাজেকে একাধিক সফল অভিযান চালিয়ে ইউপিডিএফের এলাকা দখল করেন।

ইউপিডিএফের কৌশল বদল

অস্ত্রের মুখে এলাকা ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়ে ইউপিডিএফ রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে ছায়া সংগঠন হিসেবে মাঠে নামায় ‘সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি’। ২০২৪ সালের ১৮ জুন গঠিত এই সংগঠনের আহ্বায়কের দায়িত্বে রয়েছেন বাবুধন চাকমা। এক সময়ের ভাসমান কাপড় বিক্রেতা থেকে ইউপিডিএফের বিশ্বস্ত ও সাজেকের বিচার বিভাগের প্রধান হয়ে ওঠা বাবুধন চাকমা বর্তমানে পর্দার আড়াল থেকে সামনে এসে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। 

বন বিভাগের কার্যালয় ভাঙচুর মামলার পলাতক আসামি হয়েও তিনি কীভাবে প্রকাশ্যে সাজেকে অবরোধের মতো কর্মসূচি পরিচালনা করছেন- তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের নিরাপত্তা ও সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার দাবিতে গত ১১ অক্টোবর থেকে চলা এই অবরোধ কর্মসূচির নেপথ্যে ইউপিডিএফের প্রত্যক্ষ মদদ রয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।

কী বলছে পক্ষগুলো

ইউপিডিএফের কেন্দ্রীয় সংগঠক ও মুখপাত্র মাইকেল চাকমা বলেন, “সাজেক নিয়ে নিরাপত্তা বাহিনী নাটক করেছে। বল প্রয়োগ করে পর্যটক এনে অবরোধ ভাঙার চেষ্টা চলছে। যারা সাজেক নিয়ে আন্দোলন করছেন, তাদের সঙ্গে ইউপিডিএফের কোনো সাংগঠনিক সম্পৃক্ততা নেই; তবে এই আন্দোলনে আমাদের সংহতি রয়েছে।”

অন্যদিকে, পিসিজেএসএসের রাঙামাটি জেলা শাখার সভাপতি ডা. গঙ্গা মানিক চাকমার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মের কথা বলে দলের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক সজীব চাকমার সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন। পরবর্তীতে মেসেঞ্জারে যোগাযোগ করা হলেও তার তরফ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

সচেতন মহলের মতে, পাহাড়ের অন্যতম অর্থনৈতিক প্রাণকেন্দ্র সাজেককে ঘিরে আঞ্চলিক দলগুলোর এই দ্বিমুখী লড়াই কেবল ক্ষমতার মারপ্যাঁচ নয়, বরং এটি সমগ্র অঞ্চলের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে গভীর অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬


মেঘের রাজ্যে রাজত্ব, নেপথ্যে চাঞ্চল্যকর তথ্য

প্রকাশের তারিখ : ২৮ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

প্রকৃতির অনিন্দ্য সুন্দর রূপ, তুলার মতো ভেসে বেড়ানো মেঘের হাতছানি আর অপার সৌন্দর্যের জন্য সাজেক এখন দেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন স্পট। তবে পর্যটকদের এই স্বর্গের আড়ালেই চলছে পাহাড়ি দুই আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল- ইউপিডিএফ ও জেএসএসের (সন্তু গ্রুপ) মধ্যকার আধিপত্য বিস্তারের এক রক্তক্ষয়ী ও জটিল লড়াই। সম্প্রতি সাজেক ঘিরে গড়ে ওঠা ‘সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি’ এবং এর নেপথ্য কুশীলবদের কেন্দ্র করে পাহাড়ি জনপদে নতুন করে উত্তাপ ছড়াচ্ছে।

চাঁদার রাজ্য ও নিয়ন্ত্রণ পরিবর্তন

পর্যটন খাতকে কেন্দ্র করে সাজেকে প্রতি বছর শত কোটি টাকার বাণিজ্য এবং অন্তত ৩০ কোটি টাকার ট্যুরিস্ট পরিবহন ব্যবসা পরিচালিত হয়। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, প্রসীত খীসার নেতৃত্বাধীন ইউপিডিএফ দীর্ঘদিন ধরে সাজেকের পর্যটন ব্যবসা, পরিবহন, ঝরনার পানি এবং কৃষি ও বাঁশ-ফুলঝাড়ুর ব্যবসা থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায় করে আসছে।তবে সাম্প্রতিক সময়ে দৃশ্যপটে বড় পরিবর্তন এসেছে। সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন পিসিজেএসএস (জেএসএস) সাজেক দখলের কৌশল নেয় এবং বর্তমানে সাজেকের প্রায় ৭০ শতাংশ এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।

নেপথ্যে ‘তরু চাকমা’

সাজেক দখলে জেএসএসকে সামনে থেকে সহযোগিতা করছেন খাগড়াছড়ি সদরের বাসিন্দা তরু চাকমা। তিনি খাগড়াছড়ি শাখার ইউপিডিএফ (সংস্কার) দলের সশস্ত্র কমান্ডার। চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, তরু চাকমা ভারতের মিজোরামের আইজলের স্থায়ী নাগরিক এবং কিছুদিন আগে সেখানে অস্ত্রসহ পুলিশের হাতে আটকও হয়েছিলেন। পরবর্তীতে জেএসএসের ভারতীয় শাখার সহায়তায় ছাড়া পেয়ে তিনি রাঙামাটির বাঘাইছড়িতে এসে জেএসএসের সশস্ত্র শাখায় যোগ দেন। তার নেতৃত্বে সাজেকে একাধিক সফল অভিযান চালিয়ে ইউপিডিএফের এলাকা দখল করেন।

ইউপিডিএফের কৌশল বদল

অস্ত্রের মুখে এলাকা ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়ে ইউপিডিএফ রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে ছায়া সংগঠন হিসেবে মাঠে নামায় ‘সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি’। ২০২৪ সালের ১৮ জুন গঠিত এই সংগঠনের আহ্বায়কের দায়িত্বে রয়েছেন বাবুধন চাকমা। এক সময়ের ভাসমান কাপড় বিক্রেতা থেকে ইউপিডিএফের বিশ্বস্ত ও সাজেকের বিচার বিভাগের প্রধান হয়ে ওঠা বাবুধন চাকমা বর্তমানে পর্দার আড়াল থেকে সামনে এসে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। 

বন বিভাগের কার্যালয় ভাঙচুর মামলার পলাতক আসামি হয়েও তিনি কীভাবে প্রকাশ্যে সাজেকে অবরোধের মতো কর্মসূচি পরিচালনা করছেন- তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের নিরাপত্তা ও সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার দাবিতে গত ১১ অক্টোবর থেকে চলা এই অবরোধ কর্মসূচির নেপথ্যে ইউপিডিএফের প্রত্যক্ষ মদদ রয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।

কী বলছে পক্ষগুলো

ইউপিডিএফের কেন্দ্রীয় সংগঠক ও মুখপাত্র মাইকেল চাকমা বলেন, “সাজেক নিয়ে নিরাপত্তা বাহিনী নাটক করেছে। বল প্রয়োগ করে পর্যটক এনে অবরোধ ভাঙার চেষ্টা চলছে। যারা সাজেক নিয়ে আন্দোলন করছেন, তাদের সঙ্গে ইউপিডিএফের কোনো সাংগঠনিক সম্পৃক্ততা নেই; তবে এই আন্দোলনে আমাদের সংহতি রয়েছে।”

অন্যদিকে, পিসিজেএসএসের রাঙামাটি জেলা শাখার সভাপতি ডা. গঙ্গা মানিক চাকমার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মের কথা বলে দলের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক সজীব চাকমার সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন। পরবর্তীতে মেসেঞ্জারে যোগাযোগ করা হলেও তার তরফ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

সচেতন মহলের মতে, পাহাড়ের অন্যতম অর্থনৈতিক প্রাণকেন্দ্র সাজেককে ঘিরে আঞ্চলিক দলগুলোর এই দ্বিমুখী লড়াই কেবল ক্ষমতার মারপ্যাঁচ নয়, বরং এটি সমগ্র অঞ্চলের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে গভীর অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিচ্ছে।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত