সংবাদ

রাজনীতিবিদ-ব‍্যবসায়ীরা মিলে অপরাধ সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন: মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম


প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৪৪ পিএম

রাজনীতিবিদ-ব‍্যবসায়ীরা মিলে অপরাধ সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন: মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম ও রাশেদ আহমেদ

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম। একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাবেক সভাপতি। স্বাধীনতা উত্তর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ-ডাকসুর প্রথম ভিপি ছিলেন। যেকোনো প্রগতিশীল আন্দোলনে এই এই ব্যক্তিত্ত্বকে সবসময় দেখা গেছে। দেশের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তার সঙ্গে কথা বলেছেন সংবাদ ডিজিটাল বিভাগের প্রধান রাশেদ আহমেদ। আলাপচারিতা হুবহু তুলে ধরা হলো।

রাশেদ আহমেদ: সংগ্রামী জীবনের দীর্ঘ পথচলা আপনার। স্বাধীনতা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, তারপর যেকোনো গণতান্ত্রিক আন্দোলনেই আপনাকে দেখা গেছে। বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থা আপনি কেমন দেখছেন?

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম: শুরু করতে হয় মাঝখানের জায়গা থেকে। ৭১ সাল। ৭১ সালটা ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধ বলে চিহ্নিত করা হয় ঠিকই এবং কেউ কেউ বলার চেষ্টা করে এটা হলো একটা ৯ মাসের সামরিক অভিযান। এটা সত্য নয়। হঠাৎ করে ৭১ আসে নাই। হঠাৎ করে মার্চ থেকে ডিসেম্বরে অস্ত্র হাতে আমরা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে পরাজিত করে দেশকে স্বাধীন করলাম- এইভাবে হয়নি। আইয়ুব শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করেছি। কত অত্যাচার, কত হামলা, কত জেল। আমি প্রথম জেলে যাই ১৯৬৬ সালে। তখন কত বয়স আমার? তখনো ইন্টারমিডিয়েট ফার্স্ট ইয়ারের ছাত্র। তারপরে তো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম।আমরা আন্দোলন করতাম কোন প্রেরণা থেকে? আমরা বামপন্থীরা বলতাম সমাজতন্ত্র চাই। কিন্তু সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হলে জাতীয় অধিকার যদি না থাকে এবং পাকিস্তানের সাম্প্রদায়িকতা থেকে যদি দেশকে মুক্ত করতে না পারি, শ্রমজীবী মানুষের অধিকারের প্রশ্নটাকে আমি সামনে আনতে পারব না। সুতরাং শ্রমজীবী মানুষকে আমরা বলতাম, তোমরা জেগে ওঠো, দুনিয়ার মজদুর এক হও। শোষকের জিঞ্জির ভাঙবই। কিন্তু সেটা করতে হলে ওই যে মানুষটা বলল যে আগে ওদের কাছ থেকে, পশ্চিম পাকিস্তানিদের কাছ থেকে, পাঞ্জাবিদের কাছ থেকে প্রথমে হিস্যাটা বের করে নিয়ে আসি, পরেরটা পরে দেখা যাবে।

রাশেদ আহমেদ: আপনারা তো পাকিস্তানের কবল থেকে নিয়ে আসতে পারলেন বাংলাদেশকে। বাঙালিদের শাসন কায়েম হলো। কিন্তু এখন পরিস্থিতিটা কেমন দেখছেন?

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম: এখানেই আমি বলছিলাম। আমার দুঃখটা এখানেই। আমরা যখন যুদ্ধ করেছি এই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় একটা গান গাইতাম। একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি, একটি মুখের হাসির জন্য অস্ত্র ধরি। কতগুলো বছর পার হয়ে গেছে। কোথায় সেই মুখের হাসি? কোথায় সেই ফুল? আজকে ফুল নাই, আজকে ছোটবাচ্চার হাসি নাই। আজকে দেশকে ক্যাসিনো অর্থনীতিতে আটকে ফেলা হয়েছে। লুটপাটকারী শোষকরা কেবলমাত্র অর্থসম্পদ বৃদ্ধি করেছে তাই না, তারা এমন লোভী যে তারা যাতে চিরদিন এই লুটপাট চালিয়ে যেতে পারে, তার জন্য রাষ্ট্র ক্ষমতা শুধু সাময়িকভাবে না, যেটাকে আজকাল রাজনীতিতে বলা হয় ‘ডিপ স্টেট’, অর্থাৎ সমস্ত রাষ্ট্রযন্ত্র, রাজনীতিবিদের একটা বিরাট অংশ, ব্যবসায়ীদের একটা বিরাট অংশ মিলে একটা ক্রিমিনাল সিন্ডিকেট দাঁড় করিয়ে ফেলেছে। তারাই ভেতর থেকে সমস্ত কলকাঠি নিয়ন্ত্রণ করে, দেশের রাজনীতি কোন দিকে যাবে না যাবে, এসব নিয়ন্ত্রণ করছে। স্বাধীনতার পর প্রথম অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ যে বাজেট দিয়েছিলেন, সেই বাজেটের পরিমাণ ঠিক এক্সাক্ট পরিমাণটা আমার মনে পড়ছে না। কিন্তু সেটা সম্ভবত ১০০০ কোটি টাকারও কম ছিল। সেই তুলনায় আজকের বাজেট ১০০ গুণেরও বেশি হয়েছে। কিন্তু মানুষের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি। গেল কোথায় এই টাকা? লুটপাটের ভেতর দিয়ে চলে গেছে মুষ্টিমেয় মানুষের কাছে। ঋণখেলাপি, বিদেশে অর্থ পাচার, তথ্য দিয়ে মানুষকে নতুন করে বোঝানোর কিছু প্রয়োজন হয় না। সবার সামনে আমরা দেখতে পাচ্ছি, কীভাবে এই লুটপাটগুলো খেয়েছে। কিন্তু মানুষ খুবই ক্ষুব্ধ। ক্ষুব্ধ হয়ে মাঝে মাঝে লাফিয়ে ওঠে। লাফিয়ে ওঠে তারা মনে করে যে এই পুরোনো যে সরকার এটাই হলেঅ সবকিছুর জন্য দায়ী। ফেলাও এই সরকারকে। সরকারকে ফেলানোর জন্য, যেমন এইবারের গণঅভ্যুত্থান।

রাশেদ আহমেদ: আপনি ছিলেন সেই আন্দোলনে দ্রোহের পথযাত্রা যেটি হলো ২ তারিখে প্রেসক্লাব থেকে শহীদ মিনার পর্যন্ত, আপনিও সেখানে ছিলেন। তো সেই আন্দোলনে থাকলেন, কিন্তু গণঅভ্যুত্থান পরবর্তীতে দেখা গেল আপনাদের কোনো অবস্থান সেখানে নাই। আপনাদের হাতছাড়া হয়ে গেল সবকিছু। কীভাবে হলো?

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম: আমি আমার মতো করে ভাবলে তো হবে না। আমরা যেই লক্ষ্যে পৌঁছতে চাই, যেই মুখের হাসি আনতে চাই, যেই ফুলকে ফোটাতে চাই, সেটা করতে হলে প্রকৃত জনগণের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে হবে। জনগণের নিজস্ব সরকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ইতিহাসের আরেকটা ঘটনা বলি। তখনও বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানে আটক ৭১ সালে। তাজউদ্দীন সাহেব প্রাইম মিনিস্টার। এখানে এসে তিনি একটা নির্দেশ জারি করলেন। এখন থেকে দেশ পরিচালনা করবে মুক্তিযোদ্ধারা। সার্কুলার আমার কাছে এখনো আছে। তাজউদ্দিন বললেন, আমি সব মিলিশিয়া ক্যাম্প করেছি, ওখানে সবাই নাম লেখান। ওই যে যারা মুক্তিযোদ্ধা তাদের ভেতর থেকে মিলিটারি রিক্রুট হবে, আর্মি, পুলিশ রিক্রুট হবে, ব্যুরোক্রেসি রিক্রুট হবে, ব্যাঙ্ক অফিসার রিক্রুট হবে, যারা শিক্ষা অর্ধেকটা করেছে বাকিটা করে নাই তাদের তাড়াতাড়ি শিক্ষিত করে সমস্ত রাষ্ট্র তাদের দ্বারা পরিচালিত হবে। আমরা কমিউনিস্ট পার্টি বলেছিলাম, খুব ভালো প্রস্তাব। এটা করতে হলে আপনি অস্থায়ী বিপ্লবী সরকার করেন। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সবাইকে নিয়ে যাতে আমরা এই স্বাধীন দেশ গড়ে তুলতে পারি, সেইভাবে পদক্ষেপ নেন।

বঙ্গবন্ধু ফিরে আসলেন। জাতির সর্বোচ্চ পর্যায়ের সম্মানিত নেতা। আমার বিবেচনায় প্রথম স্ট্র্যাটেজিক ভুল ছিল এখানে। তিনি এসে বললেন, এগুলা চিন্তা বাদ দাও। আমাদের দেশের মানুষ ওয়েস্ট মিনিস্টার ডেমোক্রেসিতে অভ্যস্ত। ওই ধারার বাইরে যাওয়া যাবে না। বৈদেশিক শক্তিকে খুশি করার জন্য। সুতরাং তিনি প্রেসিডেন্ট থেকে প্রাইম মিনিস্টার হয়ে গেলেন আবু সাইদ চৌধুরীকে প্রেসিডেন্ট বানিয়ে। ওয়েস্টমিনিস্টার স্টাইলে শাসন পরিচালনা করার জন্য তিনি ব্যবস্থা গ্রহণ করলেন। যার ফলে পুরোনো ব্যুরোক্রেসি, আমলাতন্ত্র আবার কিন্তু ফিরে আসলো।

আমি আরেকটা নিজের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা বলছি। আমি তখন ডাকসুর ভিপি। ৭২ সালের শেষ দিকে হবে। তখনো কনস্টিটিউশন বোধহয় প্রবর্তিত হয়নি। আমি পুরোনো গণভবনে বসে আছি। বঙ্গবন্ধু কখন আসবেন। ক্যাবিনেট মিটিং করে আসতেছেন। গাড়ি রওনা দিছে। কালো গাড়ি থেকে নামলেন। পাঞ্জাবিটা ঝেড়ে এসে বললেন সেলিম ভালো খবর আছে। কী খবর? এইমাত্র সই করে দিয়ে আসলাম পরিত্যক্ত সমস্ত কারখানা জাতীয়করণ করা হবে। আর যদি ৭ দিন দেরি করতাম সেলিম তুমি তো জানো না এই আমলারা কি শয়তান, তারা এমনভাবে কলকাঠি নাড়তো যে এটা আর করা যেত না। তারপরে একটা কথা বললেন, শোনো আরও বড় খবর আছে, চলো ভেতরে। ভেতরে নিয়ে যেয়ে আমাকে বললো সেলিম আরেকটা বড় কাজ করছি।

সমস্ত বড় বড় অফিসারদের ডেকে নিয়ে আমি বলে দিছি আমার আওয়ামী লীগের কর্মীরা জেল খাটসে কষ্ট করসে ওদের দিকে একটু দেখেন, একটু ব্যবসা বাণিজ্য দিয়েন। সর্বনাশ হয়ে গেল এই নীতির ফলে। আওয়ামী লীগের কর্মীদের ডিসি, এসপি সবাই লাইসেন্স পারমিট দেওয়া শুরু করলো। একহাতে লাইসেন্স নিয়ে আরেক হাতে বিক্রি করে দেয়। এটার ভেতর দিয়েই কিন্তু আর্নড ইনকাম যেটা বলে অর্থনীতির চ্যাপ্টারে বুঝবে, অনুপার্জিত আয় এবং লুটপাটকারী, প্যারাসাইটিক যে ক্যাপিটাল যেটাকে আমরা লুটপাটের সম্পদ বলি সেই জিনিসটা গড়ে উঠলো। বিশাল শক্তিশালী হয়ে উঠলো। আমার ধারণা বাংলাদেশ যে অন্য কোনো সৃজনশীল পথে অগ্রসর না হয়ে এই লুটপাটতন্ত্রের ওপর নির্ভর করে সমস্ত কিছু চলতে থাকলো, সেটার পেছনে এইসব ঘটনাগুলো যোগ হতে হতে, হতে হতে এই জায়গায় উপনীত হয়েছে।

রাশেদ আহমেদ: আপনারা কেন পারলেন না এটাকে ঠেকাতে?

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম: আমরা পারলাম না একাধিক কারণে। বামপন্থীদেরই কিন্তু এইখানে লিডারশিপ নেওয়ার কথা ছিল। এইটা হয়তো আপনি বললেন না কিন্তু আমি পাঠকদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই, ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের আগ পর্যন্ত বাংলাদেশে দুইটা মূল রাজনৈতিক ধারা ছিল। একটা হলো বামপন্থী ধারা গোপন কমিউনিস্ট পার্টি, সামনে ন্যাপ। আরেকটা হলো বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদী ধারা, আওয়ামী লীগ। এই দুই দলের জন্ম ও বিকাশের ভেতরেও নানা ঘটনাবলী আছে। কিন্তু আমি যখন রাজনীতিতে সক্রিয় তখন এই দুইটা হলো মূল। সত্য কথা বলতে মুজিব জেলে আটক ছিলেন। “শেখ মুজিবের মুক্তি চাই” স্লোগান গলা ফাটানো। কিন্তু আমি চ্যালেঞ্জ করে বলব ওই সময় সেই স্লোগানের চেয়ে আরো বেশি উচ্চকণ্ঠে স্লোগান উচ্চারিত হতো “জেলের তালা ভাঙব, মণি সিংহকে আনব”। ঢাকা ইউনিভার্সিটির ইতিহাস দেখেন ডাকসুতে আ স ম আব্দুর রব আসার আগ পর্যন্ত আগাগোড়া অধিকাংশ ডাকসু কিন্তু জয়লাভ করেছে ছাত্র ইউনিয়ন। বামপন্থী ধারা। কিন্তু ফাইনালে যখন সময় আসলো তখন আমরা পারলাম না দুইটা কারণে। একটা হলো ভাগ হয়ে গেল। ছাত্র ইউনিয়ন বিভক্ত, কৃষক সমিতি বিভক্ত, কমিউনিস্ট পার্টি দুইভাগ হয়ে গেল, ন্যাপ দুইভাগ হয়ে গেল। ভাগ হলে পরেই তো শক্তি দুর্বল হয়ে যায়।

রাশেদ আহমেদ: স্বার্থটা এক জায়গায় থাকলো না কেন আপনাদের?

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম: বিভ্রান্তি। প্রধানত আমি এটা বলব না যে কে কার টাকা খেয়ে এজেন্টের কাজ করেছে। আমার কাছে সেরকম কোনো প্রমাণ নাই। আমার বিশ্লেষণে এটাই ধরে নিতে হবে রাজনৈতিক বিভ্রান্তি। তার ভিতরে চীন-রাশিয়ার একটা মতাদর্শগত বিরোধ হয়েছে। সেইখানেও এমন কতগুলো ভুল তথ্য দেওয়া হলো যে তোমাদের নিজেদের ভেতরে যদি বিরোধ তৈরি হয় তাহলে পরে ডিফারেন্স লিডিং টু স্প্লিট। স্প্লিট লিডিং টু ফারদার ব্যাটল অফ আইডিয়াজ, অ্যান্ড দেন ওয়ান্স এগেইন ইউনিটি অন অ্যা নিউ বেসিস। সুতরাং মতে তার পার্থক্য হচ্ছে, ঠিক আছে আমি আলাদা পার্টি করে ফেলবো। কমিউনিস্ট পার্টির যে কেন্দ্রীয় কমিটি ছিল, কেন্দ্রীয় কমিটিতে দুইজন ছিল যারা চীনপন্থার পক্ষে, তারা বললো একদিন এসে আমাদের অন্য নেতাদের যে আমরা তো অন্য দল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

রাশেদ আহমেদ: কে কে ছিল তখন?

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম: তখন তোয়াহা সাহেব এবং সুখেন্দু দস্তিদার। মণি সিং তাদের বলেছিল তোমরা যে এটা করতেছো, মনে রেখ গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা মানলা না তো, তোমাদের দল টুকরো টুকরো হয়ে যাবে। যাই হোক সেগুলো হলো আমাদের নিজেদের ভেতরের ব্যাপার। এই কারণে আমাদের শক্তি দুর্বল হয়ে গেল।

রাশেদ আহমেদ: ৯০ তে যখন সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গেল তখনও আপনারা বিভক্ত হলেন দুই ধারায়?

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম: সেটা হলো আমাদের মস্কোপন্থীদের ভেতরে। আমি এটাকে বিভক্ত বললে ঠিক বোঝা যাবে না। কারণ তারা কিন্তু আরেকটা কমিউনিস্ট পার্টি করেনি। চীনপন্থীরা কিন্তু এই একই আদর্শের ভিত্তিতে আলাদা পার্টি করেছিল। তারা রূপান্তরিত কমিউনিস্ট পার্টির নাম করে পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও আমরা কিন্তু তখনই সবাইকে সতর্ক করেছিলাম যেটা কিন্তু শেষ পর্যন্ত বুর্জোয়া দলে যোগদান করবে। একটা অংশ চলে গেল আওয়ামী লীগে, একটা অংশ চলে গেল বিএনপিতে, অল্প কিছু। আরেকটা বড় অংশ গণফোরামে গেল। ড. কামাল হোসেনের সঙ্গে যেয়ে সেইখানে সেই দলটাকে গড়ে তোলার জন্য নেমে পড়লো। সাইফুদ্দিন আহমেদ মানিক তখন আমাদের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। আমি তখন তাদের বলেছিলাম, এটা করতে গেলেন কেন? আপনি আমাদের পার্টির উপরে বিশ্বাস হারায়ে ফেলছেন ঠিক আছে এটা তো কোনো অপরাধ না। আপনি বলবেন খোলাখুলি যে আমি এটাতে আর বিশ্বাস রাখতে পারতেছি না গুডবাই। আমরা আপনাকে ফুল দিয়ে চোখের পানি ফেলবো যে আপনি চলে যাচ্ছেন। আপনাকে তো আমরা বিদায় জানাতাম। কিন্তু আপনি পেছন থেকে ছুরি দিয়ে আঘাত করলেন, কমরেডদের বিভ্রান্ত করেন যে না এটাই কমিউনিস্ট পার্টির রূপান্তরিত ফর্ম এবং এটার কোনো শ্রেণিভিত্তি থাকবে না, এটার কোনো চূড়ান্ত লক্ষ্য থাকবে না, এটার কোনো মতাদর্শগত ভিত্তি থাকবে না। এটা কর্মসূচিগতভাবে মানুষকে, সব শ্রেণির মানুষকে নিয়ে অগ্রসর হবে। এই তিনটা যদি না থাকে তাহলে সেটাকে কমিউনিস্ট পার্টির নাম দিলে কি আর কমিউনিস্ট পার্টি হয়? সুতরাং আপনারা এই বিভ্রান্তির ভেতরে কেন যাচ্ছেন? কামাল হোসেনও যখন আওয়ামী লীগ থেকে বেরিয়ে আসে, গণফোরাম করেন, তিনি কিন্তু আওয়ামী লীগ থেকে পদত্যাগ করে তারপরে গণফোরামে গেছেন। আপনাদের না এইটা করা উচিত ছিল। 

যাই হোক এইগুলো পুরানো কথা। সেগুলোর ভেতরে আমি যেতে চাই না। আমরা কেন আমাদের স্বপ্ন অনুযায়ী দেশ গড়ে তুলতে পারলাম না? তার মৌলিক কারণ একটা আছে। ওই যে বললাম তাজউদ্দীন সাহেব সার্কুলার দিয়েছিল, সেই পথে আমরা অগ্রসর হইনি। আজও কিছুতে, যতই এই যে ২৪ এর গণঅভ্যুত্থান বলেন অমুক বলেন কোনো কিছুতেই কিচ্ছু হবে না। যতদিন পর্যন্ত না জনগণের ক্ষমতায়ন আমরা নিশ্চিত করতে পারি। জনগণ পুরানো সরকারকে ফেলে দিতে পারে, কিন্তু নিজেরাই যে শাসন ক্ষমতা পরিচালনা করতে হবে এই আত্মবিশ্বাস এবং এই অভিজ্ঞতা এই উপলব্ধি এই চেতনা এখনো তারা সেই জায়গায় যায় নাই। কিন্তু আমি খুবই আশাবাদী। আস্তে আস্তে তাদের ভেতরে এই চিন্তাটা একটু একটু করে জেগে উঠতেছে।

আমরা যে সমাজ রূপান্তর, সমাজ পরিবর্তনের কথা ভাবি, অর্থনৈতিক সামাজিক ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন করে শোষণমুক্ত নতুন মানবিক পৃথিবী গড়ে তোলার জন্য যে সংগ্রামে আমরা নিয়োজিত, সেখানে এই শ্রমজীবী মেহনতি মানুষ তারাই কিন্তু এটার প্রধান চালিকাশক্তি হবে বা হতে পারে। ইতিহাস এই কথাই বলে। দেখুন না আমাদের অভিজ্ঞতা, এই যে অগাস্ট বিপ্লব বলে বলা হয় অগাস্ট গণঅভ্যুত্থান, এটা অবশ্যই এটা বিপ্লব না, এটা একটা জনগণের জাগরণ। এটা বিরাট ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থান। মানুষ সাহসের সঙ্গে সৃজনশীলতা নিয়ে তারা এগিয়ে এসেছে। কিন্তু নেতৃত্বের দাবিদার একদল তরুণ তারা এসে নেতৃত্বটা হাইজ্যাক করে নিয়ে গেল অন্য একটা গোষ্ঠীর। সেইটা বামপন্থীরা যদি সক্রিয় থাকতে পারতো তাহলে এতখানি হতো না এটা আমার, আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে আমি, কিন্তু আমাদের ভেতরে হেজিটেশন ছিল। আমি যেকোনো গণঅভ্যুত্থানের দুইটা আসপেক্ট থাকে। একটা হলো জনগণের ভূমিকা, আমি সেই জনগণের সঙ্গে আছি, তার পক্ষ হয়ে যদি আমি ক্ষমতাটাকে সেই অনুযায়ী সাজাইতে পারি সেখানে আমার কর্তব্য আমি এই কর্তব্য পালন করার জন্য এখনো যথেষ্ট শক্তিশালী হই নাই। সেই কারণে জনগণের সৃজনশীল আকাঙ্ক্ষা যে আমরা ফ্যাসিবাদীদের হাত থেকে মুক্ত হই, আমি এটার সঙ্গে থাকব না? থাকতে হবে। থাইক্যা ওদের বলতে হবে যে ভাই আমি কিন্তু আছি তোমার সঙ্গে, তবে সাবধান করতেছি এই ষড়যন্ত্রকারীদের চিনে রাখো, ওরা কিন্তু উল্টা দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

রাশেদ আহমেদ: ইন্টেরিম গভর্নমেন্ট শেষের দিকে এসে আমেরিকার সাথে একটি চুক্তি করলো। বাণিজ্য চুক্তির নামে সেখানে অনেক কিছুই তো আছে সেটা আপনি পড়ে দেখেছেন হয়তো। ইলেকশনের তিনদিন আগে। ইলেক্টেড গভর্নমেন্টও কিন্তু সেটা কন্টিনিউ করছে। এইটা নিয়ে আপনার অবজারভেশনটা কী?

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম: আপনি যে চুক্তিটার কথা বললেন আমার মন্তব্য খালি এইটা দিয়েই বলব, আমি এটা প্রকাশ্যেই বলেছি, যারা বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে এই চুক্তিতে যাচ্ছেন তারা জেনে রাখেন এটা একটা অবৈধ চুক্তি। এই গভর্নমেন্টের কোনো অধিকার নাই এই ধরনের চুক্তি সই করার। সুতরাং আপনারা বুঝে শুনে কইরেন।আমার মন্তব্য খালি এইটা দিয়েই বলব, আমি এটা প্রকাশ্যেই বলেছি, যারা বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে এই চুক্তিতে যাচ্ছেন তারা জেনে রাখেন এটা একটা অবৈধ চুক্তি। এই গভর্নমেন্টের কোনো অধিকার নাই এই ধরনের চুক্তি সই করার। সুতরাং আপনারা বুঝে শুনে কইরেন।

রাশেদ আহমেদ: কিন্তু তার পরবর্তীতে এই বিএনপির সরকারও...

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম: হ্যাঁ বিএনপিও করেছে। বিএনপিও একই ধারায় অগ্রসর হচ্ছে। আমি বিএনপি কেন করছে সেই এক্সপ্লানেশনে যেতে চাই না। কিন্তু অবজেক্টিভলি যেটা আমাদের জাতির স্বার্থের বিরুদ্ধে যায় এবং আমাদের জাতির সার্বভৌমত্বকে সমর্পণ করে দেয় অন্য একটা বিদেশি শক্তির কাছে এর চেয়ে ডেঞ্জারাস গেম আর কিছু হতে পারে না। খালি ট্রেড এগ্রিমেন্ট না, বন্দর নিয়ে এগ্রিমেন্ট এবং অন্যান্য করিডোর নিয়ে একবার কথা উঠেছিল হিউম্যানিটারিয়ান করিডোর, এই সমস্ত কিছুই কিন্তু এইটার পাঁয়তারার একটা অংশ।

রাশেদ আহমেদ: চব্বিশের ৫ আগস্টের পরে দেশ পরিচালনার জন্য একটা ইন্টেরিম গভর্নমেন্ট গঠন করা হবে, সেখানে কিন্তু আপনাদের ডাকা হলো না। এটি একটি বিষয়। তার পরবর্তীতে একটা গভর্নমেন্ট হলো ইউনূস সরকারের নেতৃত্বে। সেখানে কয়েকটা মিটিংয়ে আপনাকে বলা হয়েছিল আপনি গিয়েছিলেন। পরিস্থিতিটা যে তখন অন্য একটা উগ্রবাদী গোষ্ঠীর হাতে চলে গেছে দেশ, সেটি তো আপনারা অনুধাবন করছিলেন। সেটা নিয়ে কি বলার চেষ্টা করেছেন, বাধা দেয়ার চেষ্টা করেছেন ওই সময়?

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম: ইউনূস সাহেবের সঙ্গে প্রথম বৈঠকেই আমি বলেছি। আপনাকে আমি সাবধান করে দিচ্ছি, আপনের যেটা ম্যান্ডেট এই ম্যান্ডেটের বাইরে যাইয়েন না। আপনার ম্যান্ডেট হলো অবিলম্বে যত দ্রুত সম্ভব একটা ফ্রি ফেয়ার ইলেকশন দিয়ে সেই নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করে দেওয়া। আরও সত্য কথা তাকে বলেছি, এর বাইরে যদি করতে চান কিছু, আরেকটা গণঅভ্যুত্থান কিন্তু আপনার জন্য অপেক্ষা করতেছে।

রাশেদ আহমেদ: কত তারিখে এটা বললেন?

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম: প্রথম একবার একটা বৈঠকে আমাকে আমন্ত্রণ জানাল আমাদের বামপন্থী দলগুলো ছিল, আমি তো তখন পার্টির অফিশিয়াল কোনো লিডার না। কিন্তু তারা অনুরোধ করেছিল প্রেসিডেন্ট সেক্রেটারি আসেন আর সিনিয়র লিডার আছে সেলিম ভাই তাকেও একটু রিকুয়েস্ট আসতে বলেন। আমি গেছি। কিন্তু অনেকে বলে যে না গেলেই তো হইতো। না গেলে তো হবে না। হোল জিনিসটা কালমিনেট করে যাচ্ছে টু দ্য পয়েন্ট, যেখানে কনস্টিটিউশন হাতে নিয়ে এবং মুজিবের ছবির নিচে দাঁড়ায়ে বিদ্যমান রাষ্ট্রপতির কাছে শপথ নিয়ে তারা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিচ্ছে। সুতরাং এটা তো কন্টিনিউটি। কনস্টিটিউশনাল কন্টিনিউটি মেনটেইন করে তারা করেছে। আর তারা যদি বলতো যে এটা বিপ্লব আমরা নতুন কিছু করবো, তাহলে পরে অবশ্যই আমরা চ্যালেঞ্জ করতাম। বিপ্লব করতেছ বলছ মানুষকে এই বিপ্লবের উদ্দেশ্য কী? মানুষের কাছ থেকে সমর্থন নিছ? সমর্থন তো নাও নাই। তোমরা নিজের মতো করে আপন মনের মাধুরী মিশায়ে এইটার কতগুলো ক্যারেক্টারিস্টিক দিলা সেটা তো হবে না।

রাশেদ আহমেদ: আপনাদের চোখের সামনে মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্যগুলো ভাঙা হলো, ৩২ নম্বর ভাঙা হলো, নানা জায়গায় মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধের অবস্থানটা বেশ দেখা গেল। তখন এটার প্রতিবাদ ঐভাবে আপনাদের করতে দেখি নাই।

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম: আমি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মিটিংয়ে নিজে বক্তৃতায় কিন্তু খুবই তীক্ষ্ণভাবে প্রতিবাদ করেছি। একটু ব্যাখ্যা করেছি। ব্যাখ্যা করেছিলাম এইভাবে যে যারা মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে আমাদের ইতিহাসকে নিয়ে যেতে চাচ্ছেন, তারা হলো আমাদের দেশকে মধ্যযুগে নিয়ে যেতে চান। তখনই বলেছিলাম, কিন্তু জেনে রাখবেন আমরা অস্ত্র জমা দিয়েছি ট্রেনিং জমা দেই নি।

রাশেদ আহমেদ: একটা জিনিস বুঝিনা যে বাংলাদেশের মানুষের মগজে একটা পচন ধরেছে, পচন বলবো নাকি কী বলবো বিশাল পরিবর্তন হয়েছে তাদের মধ্যে, উগ্রবাদিতা আস্তানা গেড়েছে। সেই জায়গাটায় কিন্তু আপনারা কাজ করতে পারেন নাই, পারলে কিন্তু এই অবস্থায় আসতো না।

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম: বর্তমান সময়ে প্রচারযন্ত্র মিডিয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা যখন রাজনীতি শুরু করেছি তখন চোঙ্গা দিয়ে বক্তৃতা করে মানুষের ঘরে ঘরে যেয়ে কিন্তু আমরা প্রচার করতাম। এখন যেহেতু উন্নত মিডিয়া টেকনোলজি ডেভলপ করেছে এবং সেই টেকনোলজির যারা মালিক তারা নির্ধারণ করে দেয় এটার কন্টেন্ট কী হবে। এইরকম একটা অবস্থায় আমাদের জন্য অবস্থা কিন্তু আরো প্রতিকূল হয়ে গেছে। জামায়াতে ইসলাম যে বক্তৃতা করে “ভাই সবাইকে দেখেছেন আমাদের তো কোনোদিন দেখেন নাই একবার একটু সুযোগ দিয়ে দেখেন আমরা কীভাবে সৎভাবে দেশ চালাই”। “হারামজাদা”, সরি ওয়ার্ডটার জন্য, তোরা দেশ চালাস নাই? ৭১ সালে মন্ত্রী ছিলি না? পূর্ব পাকিস্তান মালেক সরকারের। পাকিস্তান সরকারের সঙ্গে আজ্ঞাবহ ছিলি না?যে আত্মসমর্পন দলিল যেখানে নিয়াজী আর জগজিৎ সিং সই করেছে সেই ডকুমেন্ট দেখেন ভালো করে। ওইখানে লেখা আছে “উই, দা আর্মড ফোর্সেস, নেভাল ফোর্সেস, এয়ার ফোর্সেস অফ পাকিস্তান অ্যালং উইথ অল অক্সিলারি পলিটিক্যাল এন্ড প্যারামিলিটারি ফোর্সেস আনকন্ডিশনালি সারেন্ডার টু ইউ”। তার মানে কী? পাকিস্তানের সেনাবাহিনী আত্মসমর্পণ করেছে, সেই সেনাবাহিনীর ঢাকায় কোনো ক্যান্টনমেন্ট করার অধিকার আছে? অফিস করার অধিকার আছে? তার অক্সিলারি রাজনৈতিক দল হলো জামায়াতে ইসলাম, অক্সিলারি প্যারামিলিটারি ফোর্স হলো আলবদর রাজাকার। তাদের কোনো তৎপরতা চালানোর অধিকার থাকতে পারে? থাকতে পারে না। কি রকম মিথ্যাচার করে ফেলতেছে যে আমাদের কোনোদিন দেখেন নাই। আরও এখান থেকে ৩০ লক্ষ মানুষের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তোমরা জড়িত এবং মানুষের সম্পদ লুটপাট করে কোন জায়গায় নিয়ে গেছো?

রাশেদ আহমেদ: তারা তো অস্বীকার করে, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় তারা এগুলো করে নাই।

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম: কে বললো তাদের ছবি আছে না, তারা মন্ত্রিসভায় শপথ নিসে না? ইস্ট পাকিস্তান মন্ত্রিসভায়। অল পাকিস্তান মন্ত্রিসভায় হয়তো কোনো মন্ত্রিত্ব নেয় নাই কিন্তু তার সঙ্গে যে বৈঠকগুলো হয়েছে টপ আর্মি জেনারেলস এবং ইয়েদের সেটা কি এই কথা প্রমাণ করে না? মুক্তিযুদ্ধের আগে পরে পাকিস্তানের সংহতি বজায় রাখার জন্য সমস্ত দেশ থেকে সাহায্য সহযোগিতা নিয়ে তারা যে এটার পাল্টা প্রতিরোধ করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু তারা মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে পারল কীভাবে? আমি বলব শর্টসাইটেডনেস অফ আওয়ামী লীগ এন্ড বিএনপি। কীভাবে? এই দুইটা দলই যেকোনো মূল্যে ক্ষমতায় থাকতে হবে। ক্ষমতায় থাকতে হলে এই ইসলামিক ফোর্সকে কনটেইন করতে হবে। কনটেইন করতে হলে সিগনাল দিতে হবে যে আমিও কিন্তু তোমার দলের ব্যানার না কিন্তু আমিও তোমার ব্যবস্থাগুলো আমার হাত দিয়েই করে ফেলতে পারি। সমস্ত উপজেলায় উপজেলায় মডেল মসজিদ হইতে পারে মডেল লাইব্রেরি হয় নাই কেন? মডেল বিজ্ঞান চর্চা কেন্দ্র হয় নাই কেন? হেফাজত হাসিনার কাছে যেয়ে দাবি করল ৫ দফা না কয় দফা দাবি। আব্দুল জলিল সাহেব জেনারেল সেক্রেটারি, সে চোখের পানি ফেলসে। আমরা তো এটার প্রত্যক্ষভাবে সাক্ষী, কি করবো নেত্রী আমাকে বললো আমাকে সই করতেই হবে। ৫ দফা চুক্তি সই করলো।

রাশেদ আহমেদ: আপনি এই বামপন্থী রাজনীতিতে আসলেন কার আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে... এবং কত সালে সেটা?

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম: এটা একটা লম্বা ব্যাপার। আমি বলব আমার একেবারে শৈশব থেকেই কিন্তু... না না ঘটনায় আমি ধীরে ধীরে কমিউনিজমের পথে আমার চেতনাটা বিকশিত হয়। অনেক ঘটনা বলতে হবে। ছোটবেলায় বাজার করতে পাঠাইত। ২০ মিনিটে চলে আসা যায় চকবাজার থেকে। আমার লেগে যেত ৪০ মিনিট। কেন? কিরে দেরি করলি ক্যান? ওইখানে কামারের দোকানের সামনে একটু দাঁড়ায়ে বসে একটু দেখতেছিলাম কি সুন্দর কাজ করে, কিংবা ঝালাই করে যে কেমিক্যালস দিয়ে রংটা আরেকরকম হয়ে গেল, আমি অবাক বিস্ময়ে দেখতাম যে কীভাবে কাজ করে। কাঠমিস্ত্রি, রাজমিস্ত্রি তাদের কাজগুলো দেখতাম শ্রমের প্রতি একটা মর্যাদা ছোটবেলা থেকেই এভাবে গড়ে উঠছে। আরেকটা বলি, আমার সৌভাগ্য হয়েছিল সেন্ট গ্রেগরি স্কুলের ছাত্র। আমি স্কাউটিং করতাম। সঙ্গে সঙ্গে রেড ক্রসের কাজও করতাম। রেড ক্রসের সেন্টিনারি ১০০ বছর উপলক্ষে আমেরিকায় একটা গেট টুগেদার হবে জুনিয়র রেড ক্রস, ইয়াং রেড ক্রস। পাকিস্তান থেকে ৫ জনের ডেলিগেশন। পূর্ব পাকিস্তান থেকে ২ জন, পশ্চিম পাকিস্তান থেকে ৩ জন। ওরা পপুলেশনে বেশি আমরা পপুলেশনে কম। তখনই বুঝে গেছি এবং আমার ভেতরে জেদ আরো বেড়ে গেছে যে আমরা সংখ্যায় বেশি হওয়া সত্ত্বেও আমাদের ২ জন দিল আর ওরা ৩ জন নিল। এটা কেমন কথা। বৈষম্যটা আমি বুঝতে পারছি হাড়ে হাড়ে। সেখান থেকে আমার আসা। সেইখানে যেয়ে আমেরিকান সোসাইটির অনেক কিছু আছে শিক্ষণীয়, আমরা কিন্তু আমেরিকান জনগণের বিরুদ্ধে না কোনোসময়। আমি বিশ্বাস করি একদিন না একদিন আমেরিকাও সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র হবে।

রাশেদ আহমেদ: আপনার আদর্শের পুরুষ কে?

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম: আমি এটাই বলতে চাই আমার কোনো আদর্শের পুরুষ নেই। আমি কারো মুখ দেখে কমিউনিজম গ্রহণ করিনি। আমার খালাত ভাই পার্টিরও প্রেসিডেন্ট ছিলেন মনজুরুল আহসান খান, নটরডেম কলেজ থেকে, লাইব্রেরি থেকে একটা বই এনে আমাকে দিল। ওই বইটার ভেতরে মার্ক্স এঙ্গেলসের লেখা কমিউনিস্ট মেনিফেস্টো, 'ইউরোপ ভূত দেখেছে কমিউনিজমের', এটা দিয়ে শুরু প্রথম লাইন। এ সময় পর্যন্ত মানব সভ্যতার ইতিহাস হলো শ্রেণি সংগ্রামের ইতিহাস বলে পুরা বিবরণ। সন্ধ্যার সময় পড়া শুরু করছি একটানা পড়ে সেটার ভেতর দিয়ে কিন্তু আমি খুঁজে পেলাম যে আমার মনের ভেতরে যে প্রশ্নগুলো ঘুরপাক খাচ্ছিল, যে চিন্তাগুলো আবর্তিত হচ্ছিল, সেটার একটা প্রকাশিত রূপ এটার ভেতরে পেলাম। সেদিন মুজিব ভাইয়ের জন্মদিনের অনুষ্ঠানে আমি বলতেছিলাম, নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ ‘আজি এ প্রভাতে রবির কর কেমনে পশিল প্রাণের 'পর’, ইত্যাদি এই যে হঠাৎ করে কোন জায়গা থেকে যেন একটা আলো এসে আমাকে আচ্ছন্ন, প্রচ্ছন্ন একটা ইয়ের ভেতরে চেতনার ভেতরে নিয়ে গেল। যতদিন যাচ্ছে আমি পরীক্ষা করে দেখছি, এটা কি কারেক্ট?আপনারাও পরিচয় করে দিলেন ছাত্রনেতা। আমি যতদিন ছাত্র ইউনিয়ন করছি তার চেয়ে বেশিদিন আমি ক্ষেতমজুর সমিতি করছি। কিন্তু ক্ষেতমজুর সমিতি আন্দোলন হিসেবে গড়ে তোলার পেছনে যে অবদান সেটা অনেকে হয়তো খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে করে না। নেংটি পরা ক্ষেতমজুরদের জন্য করছি, করছি। কিন্তু ওই সময় আমি কিন্তু ক্ষেতমজুরদের ভেতর থেকে মার্ক্সবাদ শিখেছি। দাজ ক্যাপিটাল আমি একেবারে ইন্টারমিডিয়েট আমলেই পড়েছি ওই যে বললাম কমিউনিস্ট মেনিফেস্টো পড়ার পর খালি খুঁজো বই পড়ো দেখো যুক্তি বের করো কোন জায়গায় এটার সঙ্গে মিলায়ে দেখো বাস্তবতায়। ক্ষেতমজুরদের ভেতরে আলোচনা করতে করতে আমার মার্ক্সবাদটাকে আরো গভীরতর উপলব্ধির ভেতরে নিতে পারল। এখনো আমি মনে করি যে সব কিছু আমি বুঝতে পারছি তা কিন্তু না। প্রত্যেকটা মুহূর্তে হলো শিক্ষণীয়।

রাশেদ আহমেদ: একটা পরিণত বয়সে আপনার এখন যদি জিজ্ঞেস করি যে অর্জনটা কী, বাংলাদেশকে আপনি কী দিতে পেরেছেন, যেটি নিয়ে আপনি সন্তুষ্ট।

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম: বাংলাদেশ সৃষ্টি এমন একটা ব্যাপার যেটা ইতিহাস থেকে যেমন মুছে যাবে না মানুষের চেতনা থেকেও মুছে যাবে না। আমি অনেক সময় এইভাবে বলার চেষ্টা করি, বাংলাদেশের সৃষ্টি হলো জনগণের নির্মাণ। জনগণ যেহেতু অমর বাংলাদেশও অমর। যেটা অমর কারো দ্বারা নির্মিত হয় সেই নির্মাতারা নিঃশেষ না হওয়া পর্যন্ত তার নির্মাণ কাজ ও কেউ ধ্বংস করতে পারে না।

রাশেদ আহমেদ: ৭১ সালে পাকিস্তান বাহিনী আত্মসমর্পণের পর ১৭ ডিসেম্বর আপনারা ঢাকায় প্রবেশ করলেন। পাকিস্তানিদের ভেঙে দেয়া শহীদ মিনারে গেলেন। শপথ পড়েছিলেন কোনো?

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম: আমি গেরিলা বাহিনীর কমান্ডার ছিলাম। ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টি ছাত্র ইউনিয়নের গেরিলা বাহিনী। আমরা ঢাকার অদূরে চলে এসেছি। আমি কেরাণীগঞ্জ আর মাহবুব জামানকে বলেছিলাম তুমি গজারিয়া দিয়ে প্রবেশ করবে। ১৬ ডিসেম্বর বিকেলে যখন আত্মসমর্পণের কথা শুনলাম, তখন সেখানেই উল্লাস করেছি। রাতে ঢাকায় রওনা না হয়ে ফজরের নামাজের পর রওনা দিলাম। বুড়িগঙ্গা নদী পার হয়ে জেলখানার পাশ দিয়ে যখন আসি দেখি জেল থেকে বের হচ্ছে ইকবাল আহমদ, সরদার ফজলুল করিম। বুকে জড়িয়ে ধরলাম। কি আনন্দ! তার মধ্যে বেদনা আছে অমুক মারা গেছে, তমুক মারা গেছে। হেঁটে হেঁটেই শহীদ মিনারে এলাম। একটা প্রতিজ্ঞা করলাম দেশটাকে গড়ে তুলবো। তারপর বাসায় যাওয়ার অর্ডার দিয়েছি। সায়েন্স এনেক্স ভবনে ক‍্যাম্প অফিস করে অস্ত্রগুলো রেখেছি। নয়াপল্টনের আমার বাসায় শেখর দত্ত, মাহবুব জামান এসে দুপুরের খাওয়া দাওয়া করেছি। তারপর দেশ গড়ার সংগ্রামে নামলাম। ২ জানুয়ারি বা ৩ জানুয়ারি ছাত্র ইউনিয়নের সেন্ট্রাল কমিটির মিটিং করেছি। এজেন্ডা ঠিক করেছি। অন্যান্য সব কর্মসূচির মধ‍্যে একটি ছিলো শিক্ষানীতি তৈরি করা। সেটি করেছিলাম।

রাশেদ আহমেদ: এরপর তো ড.কুদরত ই খুদার শিক্ষা কমিশন হয়েছিলো?

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম: সেই কমিশনে আমাদের সুপারিশ নেয়া হয়েছিল। শিক্ষা কমিশনের সুন্দর একটি রিপোর্ট দেয়া হয়েছিল। যা বাস্তবায়ন হয়নি।

রাশেদ আহমেদ: আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ আমাদের এই দীর্ঘ সময়ে কথা বলার জন্য এবং সময় দেয়ার জন্য।

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম: ধন্যবাদ আপনাকে এবং যারা দর্শক, শ্রোতা, সবাই সুখে এবং শান্তিতে থাকুক, এটা আন্তরিকভাবে কামনা করি। দেশ যদি সুন্দর করতে হয়, আবার সেই কথাটা আমি মনে করিয়ে দেবো, মনে রাখবেন, জমি বর্গা দেওয়া যায়, স্বার্থ বর্গা দেওয়া যায় না। দেশের দায়িত্বটা আমাদের নিজেদের জনগণকেই নিতে হবে, সেইভাবে জনগণকে তৈরি হতে হবে, সেই কাজে সবাই এগিয়ে আসবেন, এটা আন্তরিকভাবে কামনা করি।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬


রাজনীতিবিদ-ব‍্যবসায়ীরা মিলে অপরাধ সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন: মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম

প্রকাশের তারিখ : ২৭ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম। একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাবেক সভাপতি। স্বাধীনতা উত্তর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ-ডাকসুর প্রথম ভিপি ছিলেন। যেকোনো প্রগতিশীল আন্দোলনে এই এই ব্যক্তিত্ত্বকে সবসময় দেখা গেছে। দেশের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তার সঙ্গে কথা বলেছেন সংবাদ ডিজিটাল বিভাগের প্রধান রাশেদ আহমেদ। আলাপচারিতা হুবহু তুলে ধরা হলো।

রাশেদ আহমেদ: সংগ্রামী জীবনের দীর্ঘ পথচলা আপনার। স্বাধীনতা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, তারপর যেকোনো গণতান্ত্রিক আন্দোলনেই আপনাকে দেখা গেছে। বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থা আপনি কেমন দেখছেন?

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম: শুরু করতে হয় মাঝখানের জায়গা থেকে। ৭১ সাল। ৭১ সালটা ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধ বলে চিহ্নিত করা হয় ঠিকই এবং কেউ কেউ বলার চেষ্টা করে এটা হলো একটা ৯ মাসের সামরিক অভিযান। এটা সত্য নয়। হঠাৎ করে ৭১ আসে নাই। হঠাৎ করে মার্চ থেকে ডিসেম্বরে অস্ত্র হাতে আমরা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে পরাজিত করে দেশকে স্বাধীন করলাম- এইভাবে হয়নি। আইয়ুব শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করেছি। কত অত্যাচার, কত হামলা, কত জেল। আমি প্রথম জেলে যাই ১৯৬৬ সালে। তখন কত বয়স আমার? তখনো ইন্টারমিডিয়েট ফার্স্ট ইয়ারের ছাত্র। তারপরে তো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম।আমরা আন্দোলন করতাম কোন প্রেরণা থেকে? আমরা বামপন্থীরা বলতাম সমাজতন্ত্র চাই। কিন্তু সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হলে জাতীয় অধিকার যদি না থাকে এবং পাকিস্তানের সাম্প্রদায়িকতা থেকে যদি দেশকে মুক্ত করতে না পারি, শ্রমজীবী মানুষের অধিকারের প্রশ্নটাকে আমি সামনে আনতে পারব না। সুতরাং শ্রমজীবী মানুষকে আমরা বলতাম, তোমরা জেগে ওঠো, দুনিয়ার মজদুর এক হও। শোষকের জিঞ্জির ভাঙবই। কিন্তু সেটা করতে হলে ওই যে মানুষটা বলল যে আগে ওদের কাছ থেকে, পশ্চিম পাকিস্তানিদের কাছ থেকে, পাঞ্জাবিদের কাছ থেকে প্রথমে হিস্যাটা বের করে নিয়ে আসি, পরেরটা পরে দেখা যাবে।

রাশেদ আহমেদ: আপনারা তো পাকিস্তানের কবল থেকে নিয়ে আসতে পারলেন বাংলাদেশকে। বাঙালিদের শাসন কায়েম হলো। কিন্তু এখন পরিস্থিতিটা কেমন দেখছেন?

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম: এখানেই আমি বলছিলাম। আমার দুঃখটা এখানেই। আমরা যখন যুদ্ধ করেছি এই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় একটা গান গাইতাম। একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি, একটি মুখের হাসির জন্য অস্ত্র ধরি। কতগুলো বছর পার হয়ে গেছে। কোথায় সেই মুখের হাসি? কোথায় সেই ফুল? আজকে ফুল নাই, আজকে ছোটবাচ্চার হাসি নাই। আজকে দেশকে ক্যাসিনো অর্থনীতিতে আটকে ফেলা হয়েছে। লুটপাটকারী শোষকরা কেবলমাত্র অর্থসম্পদ বৃদ্ধি করেছে তাই না, তারা এমন লোভী যে তারা যাতে চিরদিন এই লুটপাট চালিয়ে যেতে পারে, তার জন্য রাষ্ট্র ক্ষমতা শুধু সাময়িকভাবে না, যেটাকে আজকাল রাজনীতিতে বলা হয় ‘ডিপ স্টেট’, অর্থাৎ সমস্ত রাষ্ট্রযন্ত্র, রাজনীতিবিদের একটা বিরাট অংশ, ব্যবসায়ীদের একটা বিরাট অংশ মিলে একটা ক্রিমিনাল সিন্ডিকেট দাঁড় করিয়ে ফেলেছে। তারাই ভেতর থেকে সমস্ত কলকাঠি নিয়ন্ত্রণ করে, দেশের রাজনীতি কোন দিকে যাবে না যাবে, এসব নিয়ন্ত্রণ করছে। স্বাধীনতার পর প্রথম অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ যে বাজেট দিয়েছিলেন, সেই বাজেটের পরিমাণ ঠিক এক্সাক্ট পরিমাণটা আমার মনে পড়ছে না। কিন্তু সেটা সম্ভবত ১০০০ কোটি টাকারও কম ছিল। সেই তুলনায় আজকের বাজেট ১০০ গুণেরও বেশি হয়েছে। কিন্তু মানুষের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি। গেল কোথায় এই টাকা? লুটপাটের ভেতর দিয়ে চলে গেছে মুষ্টিমেয় মানুষের কাছে। ঋণখেলাপি, বিদেশে অর্থ পাচার, তথ্য দিয়ে মানুষকে নতুন করে বোঝানোর কিছু প্রয়োজন হয় না। সবার সামনে আমরা দেখতে পাচ্ছি, কীভাবে এই লুটপাটগুলো খেয়েছে। কিন্তু মানুষ খুবই ক্ষুব্ধ। ক্ষুব্ধ হয়ে মাঝে মাঝে লাফিয়ে ওঠে। লাফিয়ে ওঠে তারা মনে করে যে এই পুরোনো যে সরকার এটাই হলেঅ সবকিছুর জন্য দায়ী। ফেলাও এই সরকারকে। সরকারকে ফেলানোর জন্য, যেমন এইবারের গণঅভ্যুত্থান।

রাশেদ আহমেদ: আপনি ছিলেন সেই আন্দোলনে দ্রোহের পথযাত্রা যেটি হলো ২ তারিখে প্রেসক্লাব থেকে শহীদ মিনার পর্যন্ত, আপনিও সেখানে ছিলেন। তো সেই আন্দোলনে থাকলেন, কিন্তু গণঅভ্যুত্থান পরবর্তীতে দেখা গেল আপনাদের কোনো অবস্থান সেখানে নাই। আপনাদের হাতছাড়া হয়ে গেল সবকিছু। কীভাবে হলো?

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম: আমি আমার মতো করে ভাবলে তো হবে না। আমরা যেই লক্ষ্যে পৌঁছতে চাই, যেই মুখের হাসি আনতে চাই, যেই ফুলকে ফোটাতে চাই, সেটা করতে হলে প্রকৃত জনগণের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে হবে। জনগণের নিজস্ব সরকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ইতিহাসের আরেকটা ঘটনা বলি। তখনও বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানে আটক ৭১ সালে। তাজউদ্দীন সাহেব প্রাইম মিনিস্টার। এখানে এসে তিনি একটা নির্দেশ জারি করলেন। এখন থেকে দেশ পরিচালনা করবে মুক্তিযোদ্ধারা। সার্কুলার আমার কাছে এখনো আছে। তাজউদ্দিন বললেন, আমি সব মিলিশিয়া ক্যাম্প করেছি, ওখানে সবাই নাম লেখান। ওই যে যারা মুক্তিযোদ্ধা তাদের ভেতর থেকে মিলিটারি রিক্রুট হবে, আর্মি, পুলিশ রিক্রুট হবে, ব্যুরোক্রেসি রিক্রুট হবে, ব্যাঙ্ক অফিসার রিক্রুট হবে, যারা শিক্ষা অর্ধেকটা করেছে বাকিটা করে নাই তাদের তাড়াতাড়ি শিক্ষিত করে সমস্ত রাষ্ট্র তাদের দ্বারা পরিচালিত হবে। আমরা কমিউনিস্ট পার্টি বলেছিলাম, খুব ভালো প্রস্তাব। এটা করতে হলে আপনি অস্থায়ী বিপ্লবী সরকার করেন। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সবাইকে নিয়ে যাতে আমরা এই স্বাধীন দেশ গড়ে তুলতে পারি, সেইভাবে পদক্ষেপ নেন।

বঙ্গবন্ধু ফিরে আসলেন। জাতির সর্বোচ্চ পর্যায়ের সম্মানিত নেতা। আমার বিবেচনায় প্রথম স্ট্র্যাটেজিক ভুল ছিল এখানে। তিনি এসে বললেন, এগুলা চিন্তা বাদ দাও। আমাদের দেশের মানুষ ওয়েস্ট মিনিস্টার ডেমোক্রেসিতে অভ্যস্ত। ওই ধারার বাইরে যাওয়া যাবে না। বৈদেশিক শক্তিকে খুশি করার জন্য। সুতরাং তিনি প্রেসিডেন্ট থেকে প্রাইম মিনিস্টার হয়ে গেলেন আবু সাইদ চৌধুরীকে প্রেসিডেন্ট বানিয়ে। ওয়েস্টমিনিস্টার স্টাইলে শাসন পরিচালনা করার জন্য তিনি ব্যবস্থা গ্রহণ করলেন। যার ফলে পুরোনো ব্যুরোক্রেসি, আমলাতন্ত্র আবার কিন্তু ফিরে আসলো।

আমি আরেকটা নিজের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা বলছি। আমি তখন ডাকসুর ভিপি। ৭২ সালের শেষ দিকে হবে। তখনো কনস্টিটিউশন বোধহয় প্রবর্তিত হয়নি। আমি পুরোনো গণভবনে বসে আছি। বঙ্গবন্ধু কখন আসবেন। ক্যাবিনেট মিটিং করে আসতেছেন। গাড়ি রওনা দিছে। কালো গাড়ি থেকে নামলেন। পাঞ্জাবিটা ঝেড়ে এসে বললেন সেলিম ভালো খবর আছে। কী খবর? এইমাত্র সই করে দিয়ে আসলাম পরিত্যক্ত সমস্ত কারখানা জাতীয়করণ করা হবে। আর যদি ৭ দিন দেরি করতাম সেলিম তুমি তো জানো না এই আমলারা কি শয়তান, তারা এমনভাবে কলকাঠি নাড়তো যে এটা আর করা যেত না। তারপরে একটা কথা বললেন, শোনো আরও বড় খবর আছে, চলো ভেতরে। ভেতরে নিয়ে যেয়ে আমাকে বললো সেলিম আরেকটা বড় কাজ করছি।

সমস্ত বড় বড় অফিসারদের ডেকে নিয়ে আমি বলে দিছি আমার আওয়ামী লীগের কর্মীরা জেল খাটসে কষ্ট করসে ওদের দিকে একটু দেখেন, একটু ব্যবসা বাণিজ্য দিয়েন। সর্বনাশ হয়ে গেল এই নীতির ফলে। আওয়ামী লীগের কর্মীদের ডিসি, এসপি সবাই লাইসেন্স পারমিট দেওয়া শুরু করলো। একহাতে লাইসেন্স নিয়ে আরেক হাতে বিক্রি করে দেয়। এটার ভেতর দিয়েই কিন্তু আর্নড ইনকাম যেটা বলে অর্থনীতির চ্যাপ্টারে বুঝবে, অনুপার্জিত আয় এবং লুটপাটকারী, প্যারাসাইটিক যে ক্যাপিটাল যেটাকে আমরা লুটপাটের সম্পদ বলি সেই জিনিসটা গড়ে উঠলো। বিশাল শক্তিশালী হয়ে উঠলো। আমার ধারণা বাংলাদেশ যে অন্য কোনো সৃজনশীল পথে অগ্রসর না হয়ে এই লুটপাটতন্ত্রের ওপর নির্ভর করে সমস্ত কিছু চলতে থাকলো, সেটার পেছনে এইসব ঘটনাগুলো যোগ হতে হতে, হতে হতে এই জায়গায় উপনীত হয়েছে।

রাশেদ আহমেদ: আপনারা কেন পারলেন না এটাকে ঠেকাতে?

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম: আমরা পারলাম না একাধিক কারণে। বামপন্থীদেরই কিন্তু এইখানে লিডারশিপ নেওয়ার কথা ছিল। এইটা হয়তো আপনি বললেন না কিন্তু আমি পাঠকদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই, ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের আগ পর্যন্ত বাংলাদেশে দুইটা মূল রাজনৈতিক ধারা ছিল। একটা হলো বামপন্থী ধারা গোপন কমিউনিস্ট পার্টি, সামনে ন্যাপ। আরেকটা হলো বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদী ধারা, আওয়ামী লীগ। এই দুই দলের জন্ম ও বিকাশের ভেতরেও নানা ঘটনাবলী আছে। কিন্তু আমি যখন রাজনীতিতে সক্রিয় তখন এই দুইটা হলো মূল। সত্য কথা বলতে মুজিব জেলে আটক ছিলেন। “শেখ মুজিবের মুক্তি চাই” স্লোগান গলা ফাটানো। কিন্তু আমি চ্যালেঞ্জ করে বলব ওই সময় সেই স্লোগানের চেয়ে আরো বেশি উচ্চকণ্ঠে স্লোগান উচ্চারিত হতো “জেলের তালা ভাঙব, মণি সিংহকে আনব”। ঢাকা ইউনিভার্সিটির ইতিহাস দেখেন ডাকসুতে আ স ম আব্দুর রব আসার আগ পর্যন্ত আগাগোড়া অধিকাংশ ডাকসু কিন্তু জয়লাভ করেছে ছাত্র ইউনিয়ন। বামপন্থী ধারা। কিন্তু ফাইনালে যখন সময় আসলো তখন আমরা পারলাম না দুইটা কারণে। একটা হলো ভাগ হয়ে গেল। ছাত্র ইউনিয়ন বিভক্ত, কৃষক সমিতি বিভক্ত, কমিউনিস্ট পার্টি দুইভাগ হয়ে গেল, ন্যাপ দুইভাগ হয়ে গেল। ভাগ হলে পরেই তো শক্তি দুর্বল হয়ে যায়।

রাশেদ আহমেদ: স্বার্থটা এক জায়গায় থাকলো না কেন আপনাদের?

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম: বিভ্রান্তি। প্রধানত আমি এটা বলব না যে কে কার টাকা খেয়ে এজেন্টের কাজ করেছে। আমার কাছে সেরকম কোনো প্রমাণ নাই। আমার বিশ্লেষণে এটাই ধরে নিতে হবে রাজনৈতিক বিভ্রান্তি। তার ভিতরে চীন-রাশিয়ার একটা মতাদর্শগত বিরোধ হয়েছে। সেইখানেও এমন কতগুলো ভুল তথ্য দেওয়া হলো যে তোমাদের নিজেদের ভেতরে যদি বিরোধ তৈরি হয় তাহলে পরে ডিফারেন্স লিডিং টু স্প্লিট। স্প্লিট লিডিং টু ফারদার ব্যাটল অফ আইডিয়াজ, অ্যান্ড দেন ওয়ান্স এগেইন ইউনিটি অন অ্যা নিউ বেসিস। সুতরাং মতে তার পার্থক্য হচ্ছে, ঠিক আছে আমি আলাদা পার্টি করে ফেলবো। কমিউনিস্ট পার্টির যে কেন্দ্রীয় কমিটি ছিল, কেন্দ্রীয় কমিটিতে দুইজন ছিল যারা চীনপন্থার পক্ষে, তারা বললো একদিন এসে আমাদের অন্য নেতাদের যে আমরা তো অন্য দল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

রাশেদ আহমেদ: কে কে ছিল তখন?

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম: তখন তোয়াহা সাহেব এবং সুখেন্দু দস্তিদার। মণি সিং তাদের বলেছিল তোমরা যে এটা করতেছো, মনে রেখ গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা মানলা না তো, তোমাদের দল টুকরো টুকরো হয়ে যাবে। যাই হোক সেগুলো হলো আমাদের নিজেদের ভেতরের ব্যাপার। এই কারণে আমাদের শক্তি দুর্বল হয়ে গেল।

রাশেদ আহমেদ: ৯০ তে যখন সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গেল তখনও আপনারা বিভক্ত হলেন দুই ধারায়?

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম: সেটা হলো আমাদের মস্কোপন্থীদের ভেতরে। আমি এটাকে বিভক্ত বললে ঠিক বোঝা যাবে না। কারণ তারা কিন্তু আরেকটা কমিউনিস্ট পার্টি করেনি। চীনপন্থীরা কিন্তু এই একই আদর্শের ভিত্তিতে আলাদা পার্টি করেছিল। তারা রূপান্তরিত কমিউনিস্ট পার্টির নাম করে পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও আমরা কিন্তু তখনই সবাইকে সতর্ক করেছিলাম যেটা কিন্তু শেষ পর্যন্ত বুর্জোয়া দলে যোগদান করবে। একটা অংশ চলে গেল আওয়ামী লীগে, একটা অংশ চলে গেল বিএনপিতে, অল্প কিছু। আরেকটা বড় অংশ গণফোরামে গেল। ড. কামাল হোসেনের সঙ্গে যেয়ে সেইখানে সেই দলটাকে গড়ে তোলার জন্য নেমে পড়লো। সাইফুদ্দিন আহমেদ মানিক তখন আমাদের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। আমি তখন তাদের বলেছিলাম, এটা করতে গেলেন কেন? আপনি আমাদের পার্টির উপরে বিশ্বাস হারায়ে ফেলছেন ঠিক আছে এটা তো কোনো অপরাধ না। আপনি বলবেন খোলাখুলি যে আমি এটাতে আর বিশ্বাস রাখতে পারতেছি না গুডবাই। আমরা আপনাকে ফুল দিয়ে চোখের পানি ফেলবো যে আপনি চলে যাচ্ছেন। আপনাকে তো আমরা বিদায় জানাতাম। কিন্তু আপনি পেছন থেকে ছুরি দিয়ে আঘাত করলেন, কমরেডদের বিভ্রান্ত করেন যে না এটাই কমিউনিস্ট পার্টির রূপান্তরিত ফর্ম এবং এটার কোনো শ্রেণিভিত্তি থাকবে না, এটার কোনো চূড়ান্ত লক্ষ্য থাকবে না, এটার কোনো মতাদর্শগত ভিত্তি থাকবে না। এটা কর্মসূচিগতভাবে মানুষকে, সব শ্রেণির মানুষকে নিয়ে অগ্রসর হবে। এই তিনটা যদি না থাকে তাহলে সেটাকে কমিউনিস্ট পার্টির নাম দিলে কি আর কমিউনিস্ট পার্টি হয়? সুতরাং আপনারা এই বিভ্রান্তির ভেতরে কেন যাচ্ছেন? কামাল হোসেনও যখন আওয়ামী লীগ থেকে বেরিয়ে আসে, গণফোরাম করেন, তিনি কিন্তু আওয়ামী লীগ থেকে পদত্যাগ করে তারপরে গণফোরামে গেছেন। আপনাদের না এইটা করা উচিত ছিল। 

যাই হোক এইগুলো পুরানো কথা। সেগুলোর ভেতরে আমি যেতে চাই না। আমরা কেন আমাদের স্বপ্ন অনুযায়ী দেশ গড়ে তুলতে পারলাম না? তার মৌলিক কারণ একটা আছে। ওই যে বললাম তাজউদ্দীন সাহেব সার্কুলার দিয়েছিল, সেই পথে আমরা অগ্রসর হইনি। আজও কিছুতে, যতই এই যে ২৪ এর গণঅভ্যুত্থান বলেন অমুক বলেন কোনো কিছুতেই কিচ্ছু হবে না। যতদিন পর্যন্ত না জনগণের ক্ষমতায়ন আমরা নিশ্চিত করতে পারি। জনগণ পুরানো সরকারকে ফেলে দিতে পারে, কিন্তু নিজেরাই যে শাসন ক্ষমতা পরিচালনা করতে হবে এই আত্মবিশ্বাস এবং এই অভিজ্ঞতা এই উপলব্ধি এই চেতনা এখনো তারা সেই জায়গায় যায় নাই। কিন্তু আমি খুবই আশাবাদী। আস্তে আস্তে তাদের ভেতরে এই চিন্তাটা একটু একটু করে জেগে উঠতেছে।

আমরা যে সমাজ রূপান্তর, সমাজ পরিবর্তনের কথা ভাবি, অর্থনৈতিক সামাজিক ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন করে শোষণমুক্ত নতুন মানবিক পৃথিবী গড়ে তোলার জন্য যে সংগ্রামে আমরা নিয়োজিত, সেখানে এই শ্রমজীবী মেহনতি মানুষ তারাই কিন্তু এটার প্রধান চালিকাশক্তি হবে বা হতে পারে। ইতিহাস এই কথাই বলে। দেখুন না আমাদের অভিজ্ঞতা, এই যে অগাস্ট বিপ্লব বলে বলা হয় অগাস্ট গণঅভ্যুত্থান, এটা অবশ্যই এটা বিপ্লব না, এটা একটা জনগণের জাগরণ। এটা বিরাট ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থান। মানুষ সাহসের সঙ্গে সৃজনশীলতা নিয়ে তারা এগিয়ে এসেছে। কিন্তু নেতৃত্বের দাবিদার একদল তরুণ তারা এসে নেতৃত্বটা হাইজ্যাক করে নিয়ে গেল অন্য একটা গোষ্ঠীর। সেইটা বামপন্থীরা যদি সক্রিয় থাকতে পারতো তাহলে এতখানি হতো না এটা আমার, আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে আমি, কিন্তু আমাদের ভেতরে হেজিটেশন ছিল। আমি যেকোনো গণঅভ্যুত্থানের দুইটা আসপেক্ট থাকে। একটা হলো জনগণের ভূমিকা, আমি সেই জনগণের সঙ্গে আছি, তার পক্ষ হয়ে যদি আমি ক্ষমতাটাকে সেই অনুযায়ী সাজাইতে পারি সেখানে আমার কর্তব্য আমি এই কর্তব্য পালন করার জন্য এখনো যথেষ্ট শক্তিশালী হই নাই। সেই কারণে জনগণের সৃজনশীল আকাঙ্ক্ষা যে আমরা ফ্যাসিবাদীদের হাত থেকে মুক্ত হই, আমি এটার সঙ্গে থাকব না? থাকতে হবে। থাইক্যা ওদের বলতে হবে যে ভাই আমি কিন্তু আছি তোমার সঙ্গে, তবে সাবধান করতেছি এই ষড়যন্ত্রকারীদের চিনে রাখো, ওরা কিন্তু উল্টা দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

রাশেদ আহমেদ: ইন্টেরিম গভর্নমেন্ট শেষের দিকে এসে আমেরিকার সাথে একটি চুক্তি করলো। বাণিজ্য চুক্তির নামে সেখানে অনেক কিছুই তো আছে সেটা আপনি পড়ে দেখেছেন হয়তো। ইলেকশনের তিনদিন আগে। ইলেক্টেড গভর্নমেন্টও কিন্তু সেটা কন্টিনিউ করছে। এইটা নিয়ে আপনার অবজারভেশনটা কী?

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম: আপনি যে চুক্তিটার কথা বললেন আমার মন্তব্য খালি এইটা দিয়েই বলব, আমি এটা প্রকাশ্যেই বলেছি, যারা বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে এই চুক্তিতে যাচ্ছেন তারা জেনে রাখেন এটা একটা অবৈধ চুক্তি। এই গভর্নমেন্টের কোনো অধিকার নাই এই ধরনের চুক্তি সই করার। সুতরাং আপনারা বুঝে শুনে কইরেন।আমার মন্তব্য খালি এইটা দিয়েই বলব, আমি এটা প্রকাশ্যেই বলেছি, যারা বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে এই চুক্তিতে যাচ্ছেন তারা জেনে রাখেন এটা একটা অবৈধ চুক্তি। এই গভর্নমেন্টের কোনো অধিকার নাই এই ধরনের চুক্তি সই করার। সুতরাং আপনারা বুঝে শুনে কইরেন।

রাশেদ আহমেদ: কিন্তু তার পরবর্তীতে এই বিএনপির সরকারও...

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম: হ্যাঁ বিএনপিও করেছে। বিএনপিও একই ধারায় অগ্রসর হচ্ছে। আমি বিএনপি কেন করছে সেই এক্সপ্লানেশনে যেতে চাই না। কিন্তু অবজেক্টিভলি যেটা আমাদের জাতির স্বার্থের বিরুদ্ধে যায় এবং আমাদের জাতির সার্বভৌমত্বকে সমর্পণ করে দেয় অন্য একটা বিদেশি শক্তির কাছে এর চেয়ে ডেঞ্জারাস গেম আর কিছু হতে পারে না। খালি ট্রেড এগ্রিমেন্ট না, বন্দর নিয়ে এগ্রিমেন্ট এবং অন্যান্য করিডোর নিয়ে একবার কথা উঠেছিল হিউম্যানিটারিয়ান করিডোর, এই সমস্ত কিছুই কিন্তু এইটার পাঁয়তারার একটা অংশ।

রাশেদ আহমেদ: চব্বিশের ৫ আগস্টের পরে দেশ পরিচালনার জন্য একটা ইন্টেরিম গভর্নমেন্ট গঠন করা হবে, সেখানে কিন্তু আপনাদের ডাকা হলো না। এটি একটি বিষয়। তার পরবর্তীতে একটা গভর্নমেন্ট হলো ইউনূস সরকারের নেতৃত্বে। সেখানে কয়েকটা মিটিংয়ে আপনাকে বলা হয়েছিল আপনি গিয়েছিলেন। পরিস্থিতিটা যে তখন অন্য একটা উগ্রবাদী গোষ্ঠীর হাতে চলে গেছে দেশ, সেটি তো আপনারা অনুধাবন করছিলেন। সেটা নিয়ে কি বলার চেষ্টা করেছেন, বাধা দেয়ার চেষ্টা করেছেন ওই সময়?

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম: ইউনূস সাহেবের সঙ্গে প্রথম বৈঠকেই আমি বলেছি। আপনাকে আমি সাবধান করে দিচ্ছি, আপনের যেটা ম্যান্ডেট এই ম্যান্ডেটের বাইরে যাইয়েন না। আপনার ম্যান্ডেট হলো অবিলম্বে যত দ্রুত সম্ভব একটা ফ্রি ফেয়ার ইলেকশন দিয়ে সেই নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করে দেওয়া। আরও সত্য কথা তাকে বলেছি, এর বাইরে যদি করতে চান কিছু, আরেকটা গণঅভ্যুত্থান কিন্তু আপনার জন্য অপেক্ষা করতেছে।

রাশেদ আহমেদ: কত তারিখে এটা বললেন?

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম: প্রথম একবার একটা বৈঠকে আমাকে আমন্ত্রণ জানাল আমাদের বামপন্থী দলগুলো ছিল, আমি তো তখন পার্টির অফিশিয়াল কোনো লিডার না। কিন্তু তারা অনুরোধ করেছিল প্রেসিডেন্ট সেক্রেটারি আসেন আর সিনিয়র লিডার আছে সেলিম ভাই তাকেও একটু রিকুয়েস্ট আসতে বলেন। আমি গেছি। কিন্তু অনেকে বলে যে না গেলেই তো হইতো। না গেলে তো হবে না। হোল জিনিসটা কালমিনেট করে যাচ্ছে টু দ্য পয়েন্ট, যেখানে কনস্টিটিউশন হাতে নিয়ে এবং মুজিবের ছবির নিচে দাঁড়ায়ে বিদ্যমান রাষ্ট্রপতির কাছে শপথ নিয়ে তারা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিচ্ছে। সুতরাং এটা তো কন্টিনিউটি। কনস্টিটিউশনাল কন্টিনিউটি মেনটেইন করে তারা করেছে। আর তারা যদি বলতো যে এটা বিপ্লব আমরা নতুন কিছু করবো, তাহলে পরে অবশ্যই আমরা চ্যালেঞ্জ করতাম। বিপ্লব করতেছ বলছ মানুষকে এই বিপ্লবের উদ্দেশ্য কী? মানুষের কাছ থেকে সমর্থন নিছ? সমর্থন তো নাও নাই। তোমরা নিজের মতো করে আপন মনের মাধুরী মিশায়ে এইটার কতগুলো ক্যারেক্টারিস্টিক দিলা সেটা তো হবে না।

রাশেদ আহমেদ: আপনাদের চোখের সামনে মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্যগুলো ভাঙা হলো, ৩২ নম্বর ভাঙা হলো, নানা জায়গায় মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধের অবস্থানটা বেশ দেখা গেল। তখন এটার প্রতিবাদ ঐভাবে আপনাদের করতে দেখি নাই।

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম: আমি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মিটিংয়ে নিজে বক্তৃতায় কিন্তু খুবই তীক্ষ্ণভাবে প্রতিবাদ করেছি। একটু ব্যাখ্যা করেছি। ব্যাখ্যা করেছিলাম এইভাবে যে যারা মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে আমাদের ইতিহাসকে নিয়ে যেতে চাচ্ছেন, তারা হলো আমাদের দেশকে মধ্যযুগে নিয়ে যেতে চান। তখনই বলেছিলাম, কিন্তু জেনে রাখবেন আমরা অস্ত্র জমা দিয়েছি ট্রেনিং জমা দেই নি।

রাশেদ আহমেদ: একটা জিনিস বুঝিনা যে বাংলাদেশের মানুষের মগজে একটা পচন ধরেছে, পচন বলবো নাকি কী বলবো বিশাল পরিবর্তন হয়েছে তাদের মধ্যে, উগ্রবাদিতা আস্তানা গেড়েছে। সেই জায়গাটায় কিন্তু আপনারা কাজ করতে পারেন নাই, পারলে কিন্তু এই অবস্থায় আসতো না।

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম: বর্তমান সময়ে প্রচারযন্ত্র মিডিয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা যখন রাজনীতি শুরু করেছি তখন চোঙ্গা দিয়ে বক্তৃতা করে মানুষের ঘরে ঘরে যেয়ে কিন্তু আমরা প্রচার করতাম। এখন যেহেতু উন্নত মিডিয়া টেকনোলজি ডেভলপ করেছে এবং সেই টেকনোলজির যারা মালিক তারা নির্ধারণ করে দেয় এটার কন্টেন্ট কী হবে। এইরকম একটা অবস্থায় আমাদের জন্য অবস্থা কিন্তু আরো প্রতিকূল হয়ে গেছে। জামায়াতে ইসলাম যে বক্তৃতা করে “ভাই সবাইকে দেখেছেন আমাদের তো কোনোদিন দেখেন নাই একবার একটু সুযোগ দিয়ে দেখেন আমরা কীভাবে সৎভাবে দেশ চালাই”। “হারামজাদা”, সরি ওয়ার্ডটার জন্য, তোরা দেশ চালাস নাই? ৭১ সালে মন্ত্রী ছিলি না? পূর্ব পাকিস্তান মালেক সরকারের। পাকিস্তান সরকারের সঙ্গে আজ্ঞাবহ ছিলি না?যে আত্মসমর্পন দলিল যেখানে নিয়াজী আর জগজিৎ সিং সই করেছে সেই ডকুমেন্ট দেখেন ভালো করে। ওইখানে লেখা আছে “উই, দা আর্মড ফোর্সেস, নেভাল ফোর্সেস, এয়ার ফোর্সেস অফ পাকিস্তান অ্যালং উইথ অল অক্সিলারি পলিটিক্যাল এন্ড প্যারামিলিটারি ফোর্সেস আনকন্ডিশনালি সারেন্ডার টু ইউ”। তার মানে কী? পাকিস্তানের সেনাবাহিনী আত্মসমর্পণ করেছে, সেই সেনাবাহিনীর ঢাকায় কোনো ক্যান্টনমেন্ট করার অধিকার আছে? অফিস করার অধিকার আছে? তার অক্সিলারি রাজনৈতিক দল হলো জামায়াতে ইসলাম, অক্সিলারি প্যারামিলিটারি ফোর্স হলো আলবদর রাজাকার। তাদের কোনো তৎপরতা চালানোর অধিকার থাকতে পারে? থাকতে পারে না। কি রকম মিথ্যাচার করে ফেলতেছে যে আমাদের কোনোদিন দেখেন নাই। আরও এখান থেকে ৩০ লক্ষ মানুষের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তোমরা জড়িত এবং মানুষের সম্পদ লুটপাট করে কোন জায়গায় নিয়ে গেছো?

রাশেদ আহমেদ: তারা তো অস্বীকার করে, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় তারা এগুলো করে নাই।

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম: কে বললো তাদের ছবি আছে না, তারা মন্ত্রিসভায় শপথ নিসে না? ইস্ট পাকিস্তান মন্ত্রিসভায়। অল পাকিস্তান মন্ত্রিসভায় হয়তো কোনো মন্ত্রিত্ব নেয় নাই কিন্তু তার সঙ্গে যে বৈঠকগুলো হয়েছে টপ আর্মি জেনারেলস এবং ইয়েদের সেটা কি এই কথা প্রমাণ করে না? মুক্তিযুদ্ধের আগে পরে পাকিস্তানের সংহতি বজায় রাখার জন্য সমস্ত দেশ থেকে সাহায্য সহযোগিতা নিয়ে তারা যে এটার পাল্টা প্রতিরোধ করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু তারা মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে পারল কীভাবে? আমি বলব শর্টসাইটেডনেস অফ আওয়ামী লীগ এন্ড বিএনপি। কীভাবে? এই দুইটা দলই যেকোনো মূল্যে ক্ষমতায় থাকতে হবে। ক্ষমতায় থাকতে হলে এই ইসলামিক ফোর্সকে কনটেইন করতে হবে। কনটেইন করতে হলে সিগনাল দিতে হবে যে আমিও কিন্তু তোমার দলের ব্যানার না কিন্তু আমিও তোমার ব্যবস্থাগুলো আমার হাত দিয়েই করে ফেলতে পারি। সমস্ত উপজেলায় উপজেলায় মডেল মসজিদ হইতে পারে মডেল লাইব্রেরি হয় নাই কেন? মডেল বিজ্ঞান চর্চা কেন্দ্র হয় নাই কেন? হেফাজত হাসিনার কাছে যেয়ে দাবি করল ৫ দফা না কয় দফা দাবি। আব্দুল জলিল সাহেব জেনারেল সেক্রেটারি, সে চোখের পানি ফেলসে। আমরা তো এটার প্রত্যক্ষভাবে সাক্ষী, কি করবো নেত্রী আমাকে বললো আমাকে সই করতেই হবে। ৫ দফা চুক্তি সই করলো।

রাশেদ আহমেদ: আপনি এই বামপন্থী রাজনীতিতে আসলেন কার আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে... এবং কত সালে সেটা?

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম: এটা একটা লম্বা ব্যাপার। আমি বলব আমার একেবারে শৈশব থেকেই কিন্তু... না না ঘটনায় আমি ধীরে ধীরে কমিউনিজমের পথে আমার চেতনাটা বিকশিত হয়। অনেক ঘটনা বলতে হবে। ছোটবেলায় বাজার করতে পাঠাইত। ২০ মিনিটে চলে আসা যায় চকবাজার থেকে। আমার লেগে যেত ৪০ মিনিট। কেন? কিরে দেরি করলি ক্যান? ওইখানে কামারের দোকানের সামনে একটু দাঁড়ায়ে বসে একটু দেখতেছিলাম কি সুন্দর কাজ করে, কিংবা ঝালাই করে যে কেমিক্যালস দিয়ে রংটা আরেকরকম হয়ে গেল, আমি অবাক বিস্ময়ে দেখতাম যে কীভাবে কাজ করে। কাঠমিস্ত্রি, রাজমিস্ত্রি তাদের কাজগুলো দেখতাম শ্রমের প্রতি একটা মর্যাদা ছোটবেলা থেকেই এভাবে গড়ে উঠছে। আরেকটা বলি, আমার সৌভাগ্য হয়েছিল সেন্ট গ্রেগরি স্কুলের ছাত্র। আমি স্কাউটিং করতাম। সঙ্গে সঙ্গে রেড ক্রসের কাজও করতাম। রেড ক্রসের সেন্টিনারি ১০০ বছর উপলক্ষে আমেরিকায় একটা গেট টুগেদার হবে জুনিয়র রেড ক্রস, ইয়াং রেড ক্রস। পাকিস্তান থেকে ৫ জনের ডেলিগেশন। পূর্ব পাকিস্তান থেকে ২ জন, পশ্চিম পাকিস্তান থেকে ৩ জন। ওরা পপুলেশনে বেশি আমরা পপুলেশনে কম। তখনই বুঝে গেছি এবং আমার ভেতরে জেদ আরো বেড়ে গেছে যে আমরা সংখ্যায় বেশি হওয়া সত্ত্বেও আমাদের ২ জন দিল আর ওরা ৩ জন নিল। এটা কেমন কথা। বৈষম্যটা আমি বুঝতে পারছি হাড়ে হাড়ে। সেখান থেকে আমার আসা। সেইখানে যেয়ে আমেরিকান সোসাইটির অনেক কিছু আছে শিক্ষণীয়, আমরা কিন্তু আমেরিকান জনগণের বিরুদ্ধে না কোনোসময়। আমি বিশ্বাস করি একদিন না একদিন আমেরিকাও সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র হবে।

রাশেদ আহমেদ: আপনার আদর্শের পুরুষ কে?

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম: আমি এটাই বলতে চাই আমার কোনো আদর্শের পুরুষ নেই। আমি কারো মুখ দেখে কমিউনিজম গ্রহণ করিনি। আমার খালাত ভাই পার্টিরও প্রেসিডেন্ট ছিলেন মনজুরুল আহসান খান, নটরডেম কলেজ থেকে, লাইব্রেরি থেকে একটা বই এনে আমাকে দিল। ওই বইটার ভেতরে মার্ক্স এঙ্গেলসের লেখা কমিউনিস্ট মেনিফেস্টো, 'ইউরোপ ভূত দেখেছে কমিউনিজমের', এটা দিয়ে শুরু প্রথম লাইন। এ সময় পর্যন্ত মানব সভ্যতার ইতিহাস হলো শ্রেণি সংগ্রামের ইতিহাস বলে পুরা বিবরণ। সন্ধ্যার সময় পড়া শুরু করছি একটানা পড়ে সেটার ভেতর দিয়ে কিন্তু আমি খুঁজে পেলাম যে আমার মনের ভেতরে যে প্রশ্নগুলো ঘুরপাক খাচ্ছিল, যে চিন্তাগুলো আবর্তিত হচ্ছিল, সেটার একটা প্রকাশিত রূপ এটার ভেতরে পেলাম। সেদিন মুজিব ভাইয়ের জন্মদিনের অনুষ্ঠানে আমি বলতেছিলাম, নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ ‘আজি এ প্রভাতে রবির কর কেমনে পশিল প্রাণের 'পর’, ইত্যাদি এই যে হঠাৎ করে কোন জায়গা থেকে যেন একটা আলো এসে আমাকে আচ্ছন্ন, প্রচ্ছন্ন একটা ইয়ের ভেতরে চেতনার ভেতরে নিয়ে গেল। যতদিন যাচ্ছে আমি পরীক্ষা করে দেখছি, এটা কি কারেক্ট?আপনারাও পরিচয় করে দিলেন ছাত্রনেতা। আমি যতদিন ছাত্র ইউনিয়ন করছি তার চেয়ে বেশিদিন আমি ক্ষেতমজুর সমিতি করছি। কিন্তু ক্ষেতমজুর সমিতি আন্দোলন হিসেবে গড়ে তোলার পেছনে যে অবদান সেটা অনেকে হয়তো খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে করে না। নেংটি পরা ক্ষেতমজুরদের জন্য করছি, করছি। কিন্তু ওই সময় আমি কিন্তু ক্ষেতমজুরদের ভেতর থেকে মার্ক্সবাদ শিখেছি। দাজ ক্যাপিটাল আমি একেবারে ইন্টারমিডিয়েট আমলেই পড়েছি ওই যে বললাম কমিউনিস্ট মেনিফেস্টো পড়ার পর খালি খুঁজো বই পড়ো দেখো যুক্তি বের করো কোন জায়গায় এটার সঙ্গে মিলায়ে দেখো বাস্তবতায়। ক্ষেতমজুরদের ভেতরে আলোচনা করতে করতে আমার মার্ক্সবাদটাকে আরো গভীরতর উপলব্ধির ভেতরে নিতে পারল। এখনো আমি মনে করি যে সব কিছু আমি বুঝতে পারছি তা কিন্তু না। প্রত্যেকটা মুহূর্তে হলো শিক্ষণীয়।

রাশেদ আহমেদ: একটা পরিণত বয়সে আপনার এখন যদি জিজ্ঞেস করি যে অর্জনটা কী, বাংলাদেশকে আপনি কী দিতে পেরেছেন, যেটি নিয়ে আপনি সন্তুষ্ট।

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম: বাংলাদেশ সৃষ্টি এমন একটা ব্যাপার যেটা ইতিহাস থেকে যেমন মুছে যাবে না মানুষের চেতনা থেকেও মুছে যাবে না। আমি অনেক সময় এইভাবে বলার চেষ্টা করি, বাংলাদেশের সৃষ্টি হলো জনগণের নির্মাণ। জনগণ যেহেতু অমর বাংলাদেশও অমর। যেটা অমর কারো দ্বারা নির্মিত হয় সেই নির্মাতারা নিঃশেষ না হওয়া পর্যন্ত তার নির্মাণ কাজ ও কেউ ধ্বংস করতে পারে না।

রাশেদ আহমেদ: ৭১ সালে পাকিস্তান বাহিনী আত্মসমর্পণের পর ১৭ ডিসেম্বর আপনারা ঢাকায় প্রবেশ করলেন। পাকিস্তানিদের ভেঙে দেয়া শহীদ মিনারে গেলেন। শপথ পড়েছিলেন কোনো?

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম: আমি গেরিলা বাহিনীর কমান্ডার ছিলাম। ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টি ছাত্র ইউনিয়নের গেরিলা বাহিনী। আমরা ঢাকার অদূরে চলে এসেছি। আমি কেরাণীগঞ্জ আর মাহবুব জামানকে বলেছিলাম তুমি গজারিয়া দিয়ে প্রবেশ করবে। ১৬ ডিসেম্বর বিকেলে যখন আত্মসমর্পণের কথা শুনলাম, তখন সেখানেই উল্লাস করেছি। রাতে ঢাকায় রওনা না হয়ে ফজরের নামাজের পর রওনা দিলাম। বুড়িগঙ্গা নদী পার হয়ে জেলখানার পাশ দিয়ে যখন আসি দেখি জেল থেকে বের হচ্ছে ইকবাল আহমদ, সরদার ফজলুল করিম। বুকে জড়িয়ে ধরলাম। কি আনন্দ! তার মধ্যে বেদনা আছে অমুক মারা গেছে, তমুক মারা গেছে। হেঁটে হেঁটেই শহীদ মিনারে এলাম। একটা প্রতিজ্ঞা করলাম দেশটাকে গড়ে তুলবো। তারপর বাসায় যাওয়ার অর্ডার দিয়েছি। সায়েন্স এনেক্স ভবনে ক‍্যাম্প অফিস করে অস্ত্রগুলো রেখেছি। নয়াপল্টনের আমার বাসায় শেখর দত্ত, মাহবুব জামান এসে দুপুরের খাওয়া দাওয়া করেছি। তারপর দেশ গড়ার সংগ্রামে নামলাম। ২ জানুয়ারি বা ৩ জানুয়ারি ছাত্র ইউনিয়নের সেন্ট্রাল কমিটির মিটিং করেছি। এজেন্ডা ঠিক করেছি। অন্যান্য সব কর্মসূচির মধ‍্যে একটি ছিলো শিক্ষানীতি তৈরি করা। সেটি করেছিলাম।

রাশেদ আহমেদ: এরপর তো ড.কুদরত ই খুদার শিক্ষা কমিশন হয়েছিলো?

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম: সেই কমিশনে আমাদের সুপারিশ নেয়া হয়েছিল। শিক্ষা কমিশনের সুন্দর একটি রিপোর্ট দেয়া হয়েছিল। যা বাস্তবায়ন হয়নি।

রাশেদ আহমেদ: আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ আমাদের এই দীর্ঘ সময়ে কথা বলার জন্য এবং সময় দেয়ার জন্য।

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম: ধন্যবাদ আপনাকে এবং যারা দর্শক, শ্রোতা, সবাই সুখে এবং শান্তিতে থাকুক, এটা আন্তরিকভাবে কামনা করি। দেশ যদি সুন্দর করতে হয়, আবার সেই কথাটা আমি মনে করিয়ে দেবো, মনে রাখবেন, জমি বর্গা দেওয়া যায়, স্বার্থ বর্গা দেওয়া যায় না। দেশের দায়িত্বটা আমাদের নিজেদের জনগণকেই নিতে হবে, সেইভাবে জনগণকে তৈরি হতে হবে, সেই কাজে সবাই এগিয়ে আসবেন, এটা আন্তরিকভাবে কামনা করি।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত