মোহাম্মদ রফিক ষাটের দশকের একজন গুরুত্বপূর্ণ কবি। কবি হিসেবে তাঁর বেড়ে ওঠার দশক কি তাঁর কবিতার বোধ, বিষয় বা আঙ্গিকে কোনো ছাপ ফেলেছিলো? বর্তমান লেখায় এই প্রশ্নেরই আমরা উত্তর খুঁজবো। আমাদের এই বাংলায় আধুনিক কবিতার ভিত্তি রচিত হয় মূলত পঞ্চাশের দশকে। কবিতার এই আধুনিকতা ছিলো তিরিশের কাব্য আন্দোলনের ফসল। আর তিরিশি প্রকরণগত নিরীক্ষা এবং কাব্যবোধ এসেছিলো ইউরোপ থেকে। তিরিশের আধুনিক কবিতার অনুষঙ্গ ছিলো নাগরিক বিচ্ছিন্নতা, হতাশা ও অবক্ষয়। নগরকেন্দ্রিক কৃত্রিম ও নিঃসঙ্গ জীবন ভাবনা কবিতায় স্থান পেয়েছিলো। কিন্তু তিরিশ পরবর্তী কবিতার বিষয়বস্তুতে বহু বিচিত্র বিষয়ের সন্নিবেশ ঘটে। আরেকটা কথা, তিরিশের আধুনিক কবিতা প্রকরণ ও ভাবনায় আধুনিক হলেও তার ভাষা তখনো আধুনিক ছিলো না যদিও ব্যতিক্রম ছিলেন জীবনানন্দ দাশ। চল্লিশের দশকে এসে বাংলা কবিতার ভাষা আধুনিক হয়ে ওঠে। কিন্তু কবিতায় সেই বিবর্তনের কেন্দ্র ছিলো কলকাতা। ঢাকা কেন্দ্রিক কবিতায় আধুনিকতার ছোঁয়া লাগে পঞ্চাশের দশকে। এবং এই দশকেই আধুনিক বাংলা কাব্যের প্রধান কবিদের আবির্ভাব হয়। পঞ্চাশের পরে ষাটের দশকেও অনেক মেধাবী কবির দেখা মেলে। পঞ্চাশের শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, শহীদ কাদরীর পরে ষাটের কবিরাই এখনো প্রবল প্রতাপে প্রভাব বিস্তার করে আছেন। ষাটের দশক ছিলো বাঙালির অধিকার আদায়ের আন্দোলনে ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ। রাজনৈতিক পরিমণ্ডলের পাশাপাশি শিল্প-সাহিত্যের অঙ্গনেও এই আন্দোলনের ঢেউ লাগে। ফলে এই দশকের অনেক তরুণ কবি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে নিজেদের জড়িয়ে ফেলেন।
মোহাম্মদ রফিকও ছিলেন সেই দলের অন্তর্ভুক্ত। তাঁর জন্ম ১৯৪৩ সালের ২৩ অক্টোবর বাগেরহাট জেলায়। খুলনা জেলা স্কুল থেকে ১৯৫৮ সালে তিনি ম্যাট্রিকুলেশন (মাধ্যমিক) পাস করেন। ১৯৬১ সালে ইন্টারমিডিয়েট পাস করে তিনি রাজশাহী সরকারি কলেজে ইংরেজি সাহিত্যে অনার্সে ভর্তি হন। রাজশাহী কলেজের ছাত্র থাকাকালীন তিনি আইয়ুব খান বিরোধী আন্দোলনে জড়িয়ে যান। সরকার বিরোধী সেই আন্দোলনের কারণে তাঁর দশ বছরের কারাদণ্ড হয়। কিছুদিন পালিয়ে বেড়ানোর পরে সরকারি বাহিনির হাতে ধরা পড়ে তিনি কারাবন্দি হন। অবশেষে মামলা থেকে মুক্ত হয়ে ১৯৬৫ সালে পাসকোর্সে বিএ পাশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ১৯৬৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে ইংরেজি সাহিত্যে তিনি এমএ ডিগ্রি লাভ করেন।
মোহাম্মদ রফিক একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে ১ নং সেক্টরে যোগদান করেন। পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে যুক্ত হন। পেশাগত জীবনের শুরুতে তিনি কয়েকটি কলেজে শিক্ষকতা করেছেন। অবশেষে ১৯৭৪ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। এবং এখান থেকেই তাঁর কর্মজীবনের অবসান ঘটে।
১৯৭০ সালে রফিকের প্রথম কাব্যগ্রন্থ “বৈশাখী পূর্ণিমা” প্রকাশিত হয়। প্রথম কাব্যেই তাঁর স্বাতন্ত্র্য চিহ্নিত হয়ে যায়। ষাটের দশকের সতীর্থ অন্যান্য কবির থেকে তাঁর কাব্যস্বর ভিন্ন। এমনকি কবিতার বিষয় নির্বাচনেও তাঁর স্বকীয়তা লক্ষণীয়। নরম, মেদহীন মাটিগন্ধি-শব্দগুচ্ছে তিনি কবিতার শরীর নির্মাণ করেন। কবি জীবনের শুরু থেকেই তিনি এ ব্যাপারে সচেতন ছিলেন। বৈশাখী পূর্ণিমা কাব্যে প্রকৃতির বিভিন্ন উপাদানের মধ্যে জীবনের একটা যোগসূত্র খুঁজে পেয়েছেন তিনি। এখানে তাঁর কাব্যস্বরে বেদনার একটা অনুরণন ধ্বনিত হয়। যেমন; “আজ রাতে দেখি আমি তন্দ্রায় বিবশ সবে/পাখিদের কোলাহল বৃক্ষের মর্মর/কী এক বৈদেহী সুরে/বিভাসিত চরাচর চাঁদ আর তারার প্রণয়ে” (বৈশাখী পূর্ণিমা-১)। বাংলাদেশের নদীবিধৌত পলিমাটি, নদী তীরবর্তী মানুষ, তাদের জীবন— জীবিকা, যুগ যুগ ধরে চলে আসা লোককথা ও পুরাণ রফিকের কবিতায় মূর্ত হয়ে ওঠে। চিরায়ত বাংলার বঞ্চিত, নিপীড়িত মানুষের জীবন— সংগ্রাম তাঁর কবিতায় প্রাণ সঞ্চার করে। এছাড়া গ্রাম বাংলার লোকজ ঐতিহ্য আজন্ম তাঁকে কাছে টেনেছে। ষাটের দশকের অন্য কোনো কবিকে এতোটা নিখাঁদভাবে মৃত্তিকা-সংলগ্ন দেখা যায়নি। জসীম উদ্দীনের কবিতায় অকৃত্রিম পল্লী জীবনের আখ্যান রচিত হয়েছে। কিন্তু তাঁর কাব্য প্রকরণে ত্রিশোত্তর আধুনিক কাব্যভাষার ছোঁয়া লাগেনি। জীবনানন্দ দাশের কবিতায় গ্রামীণ নিসর্গের যে চিত্র পাওয়া যায় তা অনেকটা রোমান্টিক ভাবালুতা- সঞ্জাত। অন্যদিকে আল মাহমুদের প্রথম দিককার কবিতায় গ্রামীণ সরল জীবন-যাপনের অনুপম চিত্র পাওয়া। এবং বিভিন্ন লোকজ উপাদান, পুরাণ ও মিথ সার্থকভাবে তাঁর কবিতায় ব্যবহৃত হয়েছে। কিন্তু সোনালি কাবিনের পরে তাঁর আগ্রহের অগ্রাধিকার পরিবর্তিত হয়ে যায়। অন্যদিকে মোহাম্মদ রফিকের সমগ্র কবি জীবনের ভরকেদ্র ছিলো লোকায়ত জনজীবন এবং লোকজ অনুষঙ্গ। সবকিছুর ঊর্ধ্বে ছিলো তাঁর হৃদয়উৎসারিত প্রেম। ১৯৭৯ সালে প্রকাশিত ‘কীর্তিনাশা’ রফিকের একটি উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ। এই কাব্যে তিনি নদীর চলমানতার সঙ্গে জীবনকে মিলিয়ে দেখেছেন। দুই পাড়ের সবকিছু ভেঙেচুরে কীর্তিনাশা বিরামহীন বয়ে চলে। সেই প্রবাহে ভেসে যায় মানুষের আশা, আশাহীনতা, স্বপ্ন, স্মৃতি আর ভবিষ্যৎ।
নদীকে তিনি শুধু রোমান্টিক কল্প-চোখে দেখেননি। একদিকে নদীর বুকে শেষ রাতের চাঁদ যেমন তার সৌন্দর্য নিয়ে ধরা দেয়,অন্যদিকে এই নদীর টানে ভেসে যায় কচুরিপানা, পচা-গলিত লাশ, মাতাল আর বেওয়ারিশ বেশ্যার শব। “এইভাবে ভিজে ভিজে কীর্তিনাশা কতদূর যাবে/ এই দেশে, বন্যার কি শেষ আছে? বৃষ্টি ও প্রেমের সারাপিঠে এলানো চুলের ঢেউ ভিজে ছপছপ/শীতার্ত বর্ষার ফলা বিধে ফেলে শরীর;/আজ রাতে লক্ষ-লক্ষ কামার্ত কুমির উঠে এসে/দুইপাড়ে পরস্পর খাবলে খাবে আশ্লেষে চুম্বনে/আজ রাতে লক্ষ লক্ষ উদ্দাম মাছেরা ঝাঁকে ঝাঁকে / তড়পায় সারা গ্যাং জান্তব ক্ষুধার হাহাকারে;/এইভাবে পুড়ে পুড়ে কীর্তিনাশা কতদূর যাবে।” (কীর্তিনাশা)
মোহাম্মদ রফিকের কবিত্ব শক্তির আরেকটা উজ্জ্বল উদাহরণ ১৯৮৩ সালে প্রকাশিত “কপিলা” কাব্যগ্রন্থ। এই কাব্যে তিনি অসাধারণভাবে গদ্য ও অক্ষরবৃত্ত ছন্দের ব্যবহার করেছেন। মহাভারত অনুসারে কপিলা হলেন দক্ষরাজের কন্যা। অন্যদিকে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ উপন্যাসের একটি চরিত্র কপিলা। এই কাব্যগ্রন্থে কবি কপিলা চরিত্রকে নামিয়ে এনেছেন সাধারণ মানুষের সমান্তরালে। কপিলা এখানে নদীতীরবর্তী নির্যাতিতা, অবহেলিত, শ্রমজীবী নারীর মুক্তির প্রতীক। এমনকি বাঙালির বীরত্বগাঁথার সখিনা এবং হীরামনে উল্লিখিত পতিতাদের জীবন সংগ্রামের সঙ্গে কপিলা চরিত্রের সাদৃশ্য অংকন করেছেন তিনি। এই কাব্যের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো, আখ্যান বর্ণনাতেও লোকজ শব্দ ও অনুষঙ্গের আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। “মেঘে কৈল অন্ধকার মেঘে কৈল অন্ধকার/ঈশানে উড়িল মেঘ সঘনে চিকুর/চারি মেঘে জল ঢালে অষ্টগজরাজ/সপ্তডিঙ্গা মধুকর আর্ত চিচিৎকারে/ঢেউ-এর পর্বত সওদাগর বুকে ভাঙ্গে বাজ/ এক ফাঁকে বেহুলার বাসর গলিয়ে/ফণা তোলে কালসাপ নিদ্রার গব্বরে/ভাগ্যলিপি লিখতে বইস্যা আটকে ওঠে কাক/ত্রাহি ত্রাহি ঝাপটা মারে কা-কা ক্যাক ক্যাক” (কপিলা)। কীর্তিনাশা এবং ‘কপিলা’র পরে ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত হয় ‘গাওদিয়া’ কাব্যগ্রন্থ। মোহাম্মদ রফিক এক সাক্ষাৎকারে এই কাব্যকে তাঁর খুবই পছন্দের একটি কাজ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। আধুনিক কাল চেতনার সঙ্গে গ্রামীণ জীবনের লোকজ অনুষঙ্গের মিশ্রণে এক অনন্য কাব্যিক দলিল এই গ্রন্থ। বাংলার নদী তীরবর্তী অববাহিকার লোকায়ত জীবন, ভেজা মাটির সোঁদা গন্ধ, প্রান্তিক মানুষের জীবন সংগ্রাম, তাদের স্বপ্ন-আকাঙ্ক্ষা এবং ভাঙ্গাগড়ার মধ্য দিয়ে টিকে থাকার লড়াই কথ্য ভাষার মিশ্রণে এবং আবহমান লৌকিক সুরের আশ্রয়ে, মাটিগন্ধি গদ্যছন্দের অনুপম শৈলীতে তিনি কবিতায় তুলে এনেছেন।’
‘কীর্তিনাশা’এবং ‘কপিলা’র সাথে ‘গাওদিয়া’ মিলে মোহাম্মদ রফিকের এক বিশেষ কাব্য যাত্রা পূর্ণ হয়। বাংলা সাহিত্যে তাঁর এই কাব্যত্রয়ী তাঁকে অমরতা দিবে। ছাত্র জীবনে মোহাম্মদ রফিক বামপন্থি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। এবং পরবর্তী জীবনেও সেই আদর্শ থেকে তিনি সরে আসেননি। ফলে একদিকে যেমন তিনি সাধারণ, অবহেলিত, শ্রমজীবী মানুষের অধিকারের ব্যাপারে ছিলেন সোচ্চার। অন্যদিকে যেকোনো অন্যায় এবং ভণ্ডামির বিরুদ্ধে ছিলেন প্রতিবাদ মুখর। তৎকালীন সামরিক শাসক এরশাদ ক্ষমতায় এসে কবি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। এই ঘটনা তিনি মেনে নিতে পারেননি। এ ব্যাপারে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, “আমার মনে একটা প্রচণ্ড ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল, মনে হচ্ছিল একজন ভুঁইফোঁড় জেনারেল এসে আমাদের কবিতার অপমান করছেন।” এর প্রতিবাদে ১৯৮৩ সালে প্রকাশ করেন তাঁর সারাজাগানো কাব্য “খোলা কবিতা”। কবিতাটি ১৯৮৩ সালের জুন মাসের এক রাতে এক বসাতেই তিনি লিখে ফেলেন। এই কবিতা চারদিকে প্রচণ্ড হইচই ফেলে দেয়। এবং আজও তাঁর নামের সঙ্গে কবিতাটি অবিচ্ছেদ্ধভাবে জড়িয়ে আছে। কবিতার সবচেয়ে আলোচিত দুটি লাইন ছিলো: “সব শালা কবি হবে; পিঁপড়ে গো ধরেছে, উড়বেই; / বন থেকে দাঁতাল শুয়োর রাজাসনে বসবেই;” (খোলা কবিতা)
মোহাম্মদ রফিক আজীবন কবিতার সাধনা করে গেছেন। ১৯৮৬ সালে কবিতার জন্য বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন। এবং ২০১০ সালে পান একুশে পদক। ১৯৭০ সালে প্রথম কাব্য প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে নিরবিচ্ছিন্নভাবে তাঁর কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। এবং এক্ষেত্রে একটা ব্যতিক্রমী ঘটনা লক্ষ্য করা যায়। অধিকাংশ কবি জীবনের প্রথমার্ধে সেরা কবিতাগুলি লিখে ফেলেন। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কবিতার শক্তি এবং আবেগ হ্রাস পেতে থাকে। কিন্তু মোহাম্মদ রফিকের মৃত্যুর মাত্র ছয় বছর পূর্বে ২০১৭ সালে প্রকাশিত “মানব পদাবলি” কাব্যগ্রন্থ প্রথম আলো বর্ষসেরা বই হিসেবে পুরস্কৃত হয়। এই ঘটনা এটাই প্রমাণ করে, কবিতার জন্য কতটা উৎসর্গিত ছিলো তাঁর জীবন। মানব পদাবলি কাব্যটি প্রবলভাবে প্রশংসিত হয়। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, “মানব পদাবলির কবিতাগুলো যখন লিখেছি, ছিলাম ঘোরগ্রস্ত। মাত্র ১৫ দিনে লেখা হয়েছে কবিতাগুলো।... মানব পদাবলি আমার পরিপূর্ণ জীবনের আরশি। এখানে যেটি বিশদ করে আছে— আগেই বলেছি— সেটি ভালোবাসা।” মানব পদাবলি কাব্যে ১ থেকে ৮৩ পর্যন্ত ক্রমিক নম্বর দিয়ে কবিতাগুলো সন্নিবেশিত হয়েছে, কোনো কবিতার আলাদা শিরোনাম নেই। মানব পদাবলি কাব্য-বীণায় একটাই সুর বাজে। সে সুর ভালোবাসার। এই ভালোবাসা অপ্রতিরোধ্য, অনির্বাণ। “তোমার আঙুলে আমি আছি/তোমার চুলের ভিড়ে ঘুম যাই/তুমি হাঁটো চলো কথা বলো/আমার পাঁজরে জ্বলে-নেভে আলো,” (মানব পদাবলি-৭)।
একটা জন্মের ভালোবাসায় যেন কবির তৃষ্ণা মেটে না। প্রিয়তমার ভালোবাসার জন্য তিনি পুনর্বার এই পৃথিবীতে জন্ম নিতে চান। সেই জন্মে মানুষ না হোক, প্রিয়তমার আদরের পশু অথবা প্রিয় ফুল হয়ে পৃথিবীতে আসতে চান তিনি। “ফের জন্ম নেব,জানি,/কুকুর,বিড়াল/আতঙ্কের/কিন্তু ধরো, তুমি পুষলে,/কোলে তুলে নিলে,/ভাবতেও সুখ।/ফের জন্ম হবে/বৃক্ষ/ফুল ফুটবে থরে-থরে,/তুমি বলবে আহ, কী সুন্দর/সেটাই যা আনন্দের/ফিরে-ফিরে, ফের জন্ম নিতে চাই) এই পৃথিবীতে।” (মানব পদাবলি৩৬)।
মোহাম্মদ রফিক ষাটের দশকের একজন উল্লেখযোগ্য কবি। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, তাঁর অধিকাংশ বই দুষ্প্রাপ্য। এটা হওয়া উচিত নয়। তাঁর বই পাঠাকের হাতে পৌঁছানো দরকার। ২০২৩ সালের ৬ আগস্ট তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তাঁর বিখ্যাত একটি কবিতার কয়েকটি পংক্তি উদ্ধৃত করে এই লেখাটা শেষ করবো। গভীর রাতে একদল মুক্তিযোদ্ধা ট্রাকে করে সড়কের ওপর দিয়ে ছুটে চলেছে শত্রু হননের উদ্দেশ্যে। প্রিয় স্বদেশ নিয়ে অকুতোভয় যোদ্ধাদের সেই মুহূর্তের অনুভব ঋদ্ধ শিল্প সুষমায় ফুটে উঠেছে এই কবিতায়: “তোমার দেহের মতো, খর-কৃপাণের মতো/দীর্ঘ ও উদ্যত ঋজু/সারি সারি/শাল-তরু শ্রেণি/দাঁড়িয়ে রয়েছে দুই পাশে;/দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর চুমু খেলে/ভয়ে ও বিহ্বলতায়/যেমন কম্পন জাগে/তোমার দু গালে ঠোঁটে, আজকে রাত্রেও তেমনি/উদগ্রিব অপেক্ষার/রুদ্র শিহরন সাড়া/শাখে শাখে; শকুনের ডানার ঝাপটে যেন/ঢেউ উঠে ভয়াল সাগরে;/তোমার গায়ের রং যেন/তপ্ত কাঞ্চনের মতো/লেগে আছে সড়কের প্রতি ধূলিকণা সাথে,/চোখের মণির মতো সজল নিবিড় কালো/জমছে খণ্ড খণ্ড মেঘ/সারাটা আকাশময়/ হয়তো নামবে বৃষ্টি একটু পরে,/যেমন শোণিত চাঁদ চুঁয়ে চুঁয়ে/পড়ছে তোমার পথে পথে/তাল তমাল শাখে”, (হে স্বদেশ হে আমার বাংলাদেশ)।

বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৯ অক্টোবর ২০২৬
মোহাম্মদ রফিক ষাটের দশকের একজন গুরুত্বপূর্ণ কবি। কবি হিসেবে তাঁর বেড়ে ওঠার দশক কি তাঁর কবিতার বোধ, বিষয় বা আঙ্গিকে কোনো ছাপ ফেলেছিলো? বর্তমান লেখায় এই প্রশ্নেরই আমরা উত্তর খুঁজবো। আমাদের এই বাংলায় আধুনিক কবিতার ভিত্তি রচিত হয় মূলত পঞ্চাশের দশকে। কবিতার এই আধুনিকতা ছিলো তিরিশের কাব্য আন্দোলনের ফসল। আর তিরিশি প্রকরণগত নিরীক্ষা এবং কাব্যবোধ এসেছিলো ইউরোপ থেকে। তিরিশের আধুনিক কবিতার অনুষঙ্গ ছিলো নাগরিক বিচ্ছিন্নতা, হতাশা ও অবক্ষয়। নগরকেন্দ্রিক কৃত্রিম ও নিঃসঙ্গ জীবন ভাবনা কবিতায় স্থান পেয়েছিলো। কিন্তু তিরিশ পরবর্তী কবিতার বিষয়বস্তুতে বহু বিচিত্র বিষয়ের সন্নিবেশ ঘটে। আরেকটা কথা, তিরিশের আধুনিক কবিতা প্রকরণ ও ভাবনায় আধুনিক হলেও তার ভাষা তখনো আধুনিক ছিলো না যদিও ব্যতিক্রম ছিলেন জীবনানন্দ দাশ। চল্লিশের দশকে এসে বাংলা কবিতার ভাষা আধুনিক হয়ে ওঠে। কিন্তু কবিতায় সেই বিবর্তনের কেন্দ্র ছিলো কলকাতা। ঢাকা কেন্দ্রিক কবিতায় আধুনিকতার ছোঁয়া লাগে পঞ্চাশের দশকে। এবং এই দশকেই আধুনিক বাংলা কাব্যের প্রধান কবিদের আবির্ভাব হয়। পঞ্চাশের পরে ষাটের দশকেও অনেক মেধাবী কবির দেখা মেলে। পঞ্চাশের শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, শহীদ কাদরীর পরে ষাটের কবিরাই এখনো প্রবল প্রতাপে প্রভাব বিস্তার করে আছেন। ষাটের দশক ছিলো বাঙালির অধিকার আদায়ের আন্দোলনে ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ। রাজনৈতিক পরিমণ্ডলের পাশাপাশি শিল্প-সাহিত্যের অঙ্গনেও এই আন্দোলনের ঢেউ লাগে। ফলে এই দশকের অনেক তরুণ কবি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে নিজেদের জড়িয়ে ফেলেন।
মোহাম্মদ রফিকও ছিলেন সেই দলের অন্তর্ভুক্ত। তাঁর জন্ম ১৯৪৩ সালের ২৩ অক্টোবর বাগেরহাট জেলায়। খুলনা জেলা স্কুল থেকে ১৯৫৮ সালে তিনি ম্যাট্রিকুলেশন (মাধ্যমিক) পাস করেন। ১৯৬১ সালে ইন্টারমিডিয়েট পাস করে তিনি রাজশাহী সরকারি কলেজে ইংরেজি সাহিত্যে অনার্সে ভর্তি হন। রাজশাহী কলেজের ছাত্র থাকাকালীন তিনি আইয়ুব খান বিরোধী আন্দোলনে জড়িয়ে যান। সরকার বিরোধী সেই আন্দোলনের কারণে তাঁর দশ বছরের কারাদণ্ড হয়। কিছুদিন পালিয়ে বেড়ানোর পরে সরকারি বাহিনির হাতে ধরা পড়ে তিনি কারাবন্দি হন। অবশেষে মামলা থেকে মুক্ত হয়ে ১৯৬৫ সালে পাসকোর্সে বিএ পাশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ১৯৬৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে ইংরেজি সাহিত্যে তিনি এমএ ডিগ্রি লাভ করেন।
মোহাম্মদ রফিক একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে ১ নং সেক্টরে যোগদান করেন। পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে যুক্ত হন। পেশাগত জীবনের শুরুতে তিনি কয়েকটি কলেজে শিক্ষকতা করেছেন। অবশেষে ১৯৭৪ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। এবং এখান থেকেই তাঁর কর্মজীবনের অবসান ঘটে।
১৯৭০ সালে রফিকের প্রথম কাব্যগ্রন্থ “বৈশাখী পূর্ণিমা” প্রকাশিত হয়। প্রথম কাব্যেই তাঁর স্বাতন্ত্র্য চিহ্নিত হয়ে যায়। ষাটের দশকের সতীর্থ অন্যান্য কবির থেকে তাঁর কাব্যস্বর ভিন্ন। এমনকি কবিতার বিষয় নির্বাচনেও তাঁর স্বকীয়তা লক্ষণীয়। নরম, মেদহীন মাটিগন্ধি-শব্দগুচ্ছে তিনি কবিতার শরীর নির্মাণ করেন। কবি জীবনের শুরু থেকেই তিনি এ ব্যাপারে সচেতন ছিলেন। বৈশাখী পূর্ণিমা কাব্যে প্রকৃতির বিভিন্ন উপাদানের মধ্যে জীবনের একটা যোগসূত্র খুঁজে পেয়েছেন তিনি। এখানে তাঁর কাব্যস্বরে বেদনার একটা অনুরণন ধ্বনিত হয়। যেমন; “আজ রাতে দেখি আমি তন্দ্রায় বিবশ সবে/পাখিদের কোলাহল বৃক্ষের মর্মর/কী এক বৈদেহী সুরে/বিভাসিত চরাচর চাঁদ আর তারার প্রণয়ে” (বৈশাখী পূর্ণিমা-১)। বাংলাদেশের নদীবিধৌত পলিমাটি, নদী তীরবর্তী মানুষ, তাদের জীবন— জীবিকা, যুগ যুগ ধরে চলে আসা লোককথা ও পুরাণ রফিকের কবিতায় মূর্ত হয়ে ওঠে। চিরায়ত বাংলার বঞ্চিত, নিপীড়িত মানুষের জীবন— সংগ্রাম তাঁর কবিতায় প্রাণ সঞ্চার করে। এছাড়া গ্রাম বাংলার লোকজ ঐতিহ্য আজন্ম তাঁকে কাছে টেনেছে। ষাটের দশকের অন্য কোনো কবিকে এতোটা নিখাঁদভাবে মৃত্তিকা-সংলগ্ন দেখা যায়নি। জসীম উদ্দীনের কবিতায় অকৃত্রিম পল্লী জীবনের আখ্যান রচিত হয়েছে। কিন্তু তাঁর কাব্য প্রকরণে ত্রিশোত্তর আধুনিক কাব্যভাষার ছোঁয়া লাগেনি। জীবনানন্দ দাশের কবিতায় গ্রামীণ নিসর্গের যে চিত্র পাওয়া যায় তা অনেকটা রোমান্টিক ভাবালুতা- সঞ্জাত। অন্যদিকে আল মাহমুদের প্রথম দিককার কবিতায় গ্রামীণ সরল জীবন-যাপনের অনুপম চিত্র পাওয়া। এবং বিভিন্ন লোকজ উপাদান, পুরাণ ও মিথ সার্থকভাবে তাঁর কবিতায় ব্যবহৃত হয়েছে। কিন্তু সোনালি কাবিনের পরে তাঁর আগ্রহের অগ্রাধিকার পরিবর্তিত হয়ে যায়। অন্যদিকে মোহাম্মদ রফিকের সমগ্র কবি জীবনের ভরকেদ্র ছিলো লোকায়ত জনজীবন এবং লোকজ অনুষঙ্গ। সবকিছুর ঊর্ধ্বে ছিলো তাঁর হৃদয়উৎসারিত প্রেম। ১৯৭৯ সালে প্রকাশিত ‘কীর্তিনাশা’ রফিকের একটি উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ। এই কাব্যে তিনি নদীর চলমানতার সঙ্গে জীবনকে মিলিয়ে দেখেছেন। দুই পাড়ের সবকিছু ভেঙেচুরে কীর্তিনাশা বিরামহীন বয়ে চলে। সেই প্রবাহে ভেসে যায় মানুষের আশা, আশাহীনতা, স্বপ্ন, স্মৃতি আর ভবিষ্যৎ।
নদীকে তিনি শুধু রোমান্টিক কল্প-চোখে দেখেননি। একদিকে নদীর বুকে শেষ রাতের চাঁদ যেমন তার সৌন্দর্য নিয়ে ধরা দেয়,অন্যদিকে এই নদীর টানে ভেসে যায় কচুরিপানা, পচা-গলিত লাশ, মাতাল আর বেওয়ারিশ বেশ্যার শব। “এইভাবে ভিজে ভিজে কীর্তিনাশা কতদূর যাবে/ এই দেশে, বন্যার কি শেষ আছে? বৃষ্টি ও প্রেমের সারাপিঠে এলানো চুলের ঢেউ ভিজে ছপছপ/শীতার্ত বর্ষার ফলা বিধে ফেলে শরীর;/আজ রাতে লক্ষ-লক্ষ কামার্ত কুমির উঠে এসে/দুইপাড়ে পরস্পর খাবলে খাবে আশ্লেষে চুম্বনে/আজ রাতে লক্ষ লক্ষ উদ্দাম মাছেরা ঝাঁকে ঝাঁকে / তড়পায় সারা গ্যাং জান্তব ক্ষুধার হাহাকারে;/এইভাবে পুড়ে পুড়ে কীর্তিনাশা কতদূর যাবে।” (কীর্তিনাশা)
মোহাম্মদ রফিকের কবিত্ব শক্তির আরেকটা উজ্জ্বল উদাহরণ ১৯৮৩ সালে প্রকাশিত “কপিলা” কাব্যগ্রন্থ। এই কাব্যে তিনি অসাধারণভাবে গদ্য ও অক্ষরবৃত্ত ছন্দের ব্যবহার করেছেন। মহাভারত অনুসারে কপিলা হলেন দক্ষরাজের কন্যা। অন্যদিকে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ উপন্যাসের একটি চরিত্র কপিলা। এই কাব্যগ্রন্থে কবি কপিলা চরিত্রকে নামিয়ে এনেছেন সাধারণ মানুষের সমান্তরালে। কপিলা এখানে নদীতীরবর্তী নির্যাতিতা, অবহেলিত, শ্রমজীবী নারীর মুক্তির প্রতীক। এমনকি বাঙালির বীরত্বগাঁথার সখিনা এবং হীরামনে উল্লিখিত পতিতাদের জীবন সংগ্রামের সঙ্গে কপিলা চরিত্রের সাদৃশ্য অংকন করেছেন তিনি। এই কাব্যের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো, আখ্যান বর্ণনাতেও লোকজ শব্দ ও অনুষঙ্গের আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। “মেঘে কৈল অন্ধকার মেঘে কৈল অন্ধকার/ঈশানে উড়িল মেঘ সঘনে চিকুর/চারি মেঘে জল ঢালে অষ্টগজরাজ/সপ্তডিঙ্গা মধুকর আর্ত চিচিৎকারে/ঢেউ-এর পর্বত সওদাগর বুকে ভাঙ্গে বাজ/ এক ফাঁকে বেহুলার বাসর গলিয়ে/ফণা তোলে কালসাপ নিদ্রার গব্বরে/ভাগ্যলিপি লিখতে বইস্যা আটকে ওঠে কাক/ত্রাহি ত্রাহি ঝাপটা মারে কা-কা ক্যাক ক্যাক” (কপিলা)। কীর্তিনাশা এবং ‘কপিলা’র পরে ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত হয় ‘গাওদিয়া’ কাব্যগ্রন্থ। মোহাম্মদ রফিক এক সাক্ষাৎকারে এই কাব্যকে তাঁর খুবই পছন্দের একটি কাজ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। আধুনিক কাল চেতনার সঙ্গে গ্রামীণ জীবনের লোকজ অনুষঙ্গের মিশ্রণে এক অনন্য কাব্যিক দলিল এই গ্রন্থ। বাংলার নদী তীরবর্তী অববাহিকার লোকায়ত জীবন, ভেজা মাটির সোঁদা গন্ধ, প্রান্তিক মানুষের জীবন সংগ্রাম, তাদের স্বপ্ন-আকাঙ্ক্ষা এবং ভাঙ্গাগড়ার মধ্য দিয়ে টিকে থাকার লড়াই কথ্য ভাষার মিশ্রণে এবং আবহমান লৌকিক সুরের আশ্রয়ে, মাটিগন্ধি গদ্যছন্দের অনুপম শৈলীতে তিনি কবিতায় তুলে এনেছেন।’
‘কীর্তিনাশা’এবং ‘কপিলা’র সাথে ‘গাওদিয়া’ মিলে মোহাম্মদ রফিকের এক বিশেষ কাব্য যাত্রা পূর্ণ হয়। বাংলা সাহিত্যে তাঁর এই কাব্যত্রয়ী তাঁকে অমরতা দিবে। ছাত্র জীবনে মোহাম্মদ রফিক বামপন্থি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। এবং পরবর্তী জীবনেও সেই আদর্শ থেকে তিনি সরে আসেননি। ফলে একদিকে যেমন তিনি সাধারণ, অবহেলিত, শ্রমজীবী মানুষের অধিকারের ব্যাপারে ছিলেন সোচ্চার। অন্যদিকে যেকোনো অন্যায় এবং ভণ্ডামির বিরুদ্ধে ছিলেন প্রতিবাদ মুখর। তৎকালীন সামরিক শাসক এরশাদ ক্ষমতায় এসে কবি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। এই ঘটনা তিনি মেনে নিতে পারেননি। এ ব্যাপারে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, “আমার মনে একটা প্রচণ্ড ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল, মনে হচ্ছিল একজন ভুঁইফোঁড় জেনারেল এসে আমাদের কবিতার অপমান করছেন।” এর প্রতিবাদে ১৯৮৩ সালে প্রকাশ করেন তাঁর সারাজাগানো কাব্য “খোলা কবিতা”। কবিতাটি ১৯৮৩ সালের জুন মাসের এক রাতে এক বসাতেই তিনি লিখে ফেলেন। এই কবিতা চারদিকে প্রচণ্ড হইচই ফেলে দেয়। এবং আজও তাঁর নামের সঙ্গে কবিতাটি অবিচ্ছেদ্ধভাবে জড়িয়ে আছে। কবিতার সবচেয়ে আলোচিত দুটি লাইন ছিলো: “সব শালা কবি হবে; পিঁপড়ে গো ধরেছে, উড়বেই; / বন থেকে দাঁতাল শুয়োর রাজাসনে বসবেই;” (খোলা কবিতা)
মোহাম্মদ রফিক আজীবন কবিতার সাধনা করে গেছেন। ১৯৮৬ সালে কবিতার জন্য বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন। এবং ২০১০ সালে পান একুশে পদক। ১৯৭০ সালে প্রথম কাব্য প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে নিরবিচ্ছিন্নভাবে তাঁর কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। এবং এক্ষেত্রে একটা ব্যতিক্রমী ঘটনা লক্ষ্য করা যায়। অধিকাংশ কবি জীবনের প্রথমার্ধে সেরা কবিতাগুলি লিখে ফেলেন। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কবিতার শক্তি এবং আবেগ হ্রাস পেতে থাকে। কিন্তু মোহাম্মদ রফিকের মৃত্যুর মাত্র ছয় বছর পূর্বে ২০১৭ সালে প্রকাশিত “মানব পদাবলি” কাব্যগ্রন্থ প্রথম আলো বর্ষসেরা বই হিসেবে পুরস্কৃত হয়। এই ঘটনা এটাই প্রমাণ করে, কবিতার জন্য কতটা উৎসর্গিত ছিলো তাঁর জীবন। মানব পদাবলি কাব্যটি প্রবলভাবে প্রশংসিত হয়। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, “মানব পদাবলির কবিতাগুলো যখন লিখেছি, ছিলাম ঘোরগ্রস্ত। মাত্র ১৫ দিনে লেখা হয়েছে কবিতাগুলো।... মানব পদাবলি আমার পরিপূর্ণ জীবনের আরশি। এখানে যেটি বিশদ করে আছে— আগেই বলেছি— সেটি ভালোবাসা।” মানব পদাবলি কাব্যে ১ থেকে ৮৩ পর্যন্ত ক্রমিক নম্বর দিয়ে কবিতাগুলো সন্নিবেশিত হয়েছে, কোনো কবিতার আলাদা শিরোনাম নেই। মানব পদাবলি কাব্য-বীণায় একটাই সুর বাজে। সে সুর ভালোবাসার। এই ভালোবাসা অপ্রতিরোধ্য, অনির্বাণ। “তোমার আঙুলে আমি আছি/তোমার চুলের ভিড়ে ঘুম যাই/তুমি হাঁটো চলো কথা বলো/আমার পাঁজরে জ্বলে-নেভে আলো,” (মানব পদাবলি-৭)।
একটা জন্মের ভালোবাসায় যেন কবির তৃষ্ণা মেটে না। প্রিয়তমার ভালোবাসার জন্য তিনি পুনর্বার এই পৃথিবীতে জন্ম নিতে চান। সেই জন্মে মানুষ না হোক, প্রিয়তমার আদরের পশু অথবা প্রিয় ফুল হয়ে পৃথিবীতে আসতে চান তিনি। “ফের জন্ম নেব,জানি,/কুকুর,বিড়াল/আতঙ্কের/কিন্তু ধরো, তুমি পুষলে,/কোলে তুলে নিলে,/ভাবতেও সুখ।/ফের জন্ম হবে/বৃক্ষ/ফুল ফুটবে থরে-থরে,/তুমি বলবে আহ, কী সুন্দর/সেটাই যা আনন্দের/ফিরে-ফিরে, ফের জন্ম নিতে চাই) এই পৃথিবীতে।” (মানব পদাবলি৩৬)।
মোহাম্মদ রফিক ষাটের দশকের একজন উল্লেখযোগ্য কবি। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, তাঁর অধিকাংশ বই দুষ্প্রাপ্য। এটা হওয়া উচিত নয়। তাঁর বই পাঠাকের হাতে পৌঁছানো দরকার। ২০২৩ সালের ৬ আগস্ট তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তাঁর বিখ্যাত একটি কবিতার কয়েকটি পংক্তি উদ্ধৃত করে এই লেখাটা শেষ করবো। গভীর রাতে একদল মুক্তিযোদ্ধা ট্রাকে করে সড়কের ওপর দিয়ে ছুটে চলেছে শত্রু হননের উদ্দেশ্যে। প্রিয় স্বদেশ নিয়ে অকুতোভয় যোদ্ধাদের সেই মুহূর্তের অনুভব ঋদ্ধ শিল্প সুষমায় ফুটে উঠেছে এই কবিতায়: “তোমার দেহের মতো, খর-কৃপাণের মতো/দীর্ঘ ও উদ্যত ঋজু/সারি সারি/শাল-তরু শ্রেণি/দাঁড়িয়ে রয়েছে দুই পাশে;/দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর চুমু খেলে/ভয়ে ও বিহ্বলতায়/যেমন কম্পন জাগে/তোমার দু গালে ঠোঁটে, আজকে রাত্রেও তেমনি/উদগ্রিব অপেক্ষার/রুদ্র শিহরন সাড়া/শাখে শাখে; শকুনের ডানার ঝাপটে যেন/ঢেউ উঠে ভয়াল সাগরে;/তোমার গায়ের রং যেন/তপ্ত কাঞ্চনের মতো/লেগে আছে সড়কের প্রতি ধূলিকণা সাথে,/চোখের মণির মতো সজল নিবিড় কালো/জমছে খণ্ড খণ্ড মেঘ/সারাটা আকাশময়/ হয়তো নামবে বৃষ্টি একটু পরে,/যেমন শোণিত চাঁদ চুঁয়ে চুঁয়ে/পড়ছে তোমার পথে পথে/তাল তমাল শাখে”, (হে স্বদেশ হে আমার বাংলাদেশ)।

আপনার মতামত লিখুন