সংবাদ

রংপুর প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে উদ্ভট সব কাণ্ড, বিচিত্র অজুহাত


নিজস্ব বার্তা পরিবেশক, রংপুর
নিজস্ব বার্তা পরিবেশক, রংপুর
প্রকাশ: ১ নভেম্বর ২০২৬, ০৮:৫৬ পিএম

রংপুর প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে উদ্ভট সব কাণ্ড, বিচিত্র অজুহাত
রংপুর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে চরম নৈরাজ্য ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলার অবনতি

রংপুর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে চরম নৈরাজ্য ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলার অবনতির চিত্র উঠে এসেছে। অফিস শুরুর নির্ধারিত সময় সকাল ৯টা হলেও নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে নিজেদের খেয়ালখুশিমতো অফিসে আসচ্ছেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এর ফলে দূরদূরান্ত থেকে সেবা নিতে আসা সাধারণ শিক্ষক ও নাগরিকরা চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।

রোববার (১ নভেম্বর) সকালে নগরীর কাছারী বাজার এলাকার শিক্ষা কমপ্লেক্স চত্বরে অবস্থিত রংপুর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে সরেজমিন পরিদর্শনে এই চিত্র দেখা যায়।

সকাল ৯টায় গেট খোলা, টেবিলে কেউ নেই

সকাল ৯টা ৪ মিনিটে নাইটগার্ড এসে অফিসের প্রধান কলাপসিবল গেট খুলে দেন। ভেতরে গিয়ে দেখা যায়, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাসহ কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী তখনো অফিসে উপস্থিত হননি। এরপর সকাল ৯টা ২২ মিনিটে প্রথম আসেন ক্যাশিয়ার। একে একে প্রবেশ করেন অফিস সহকারী, কম্পিউটার অপারেটর ও অন্যান্য কর্মচারীরা।

দেরিতে আসার কারণ জানতে চাইলে তাদের মুখে শোনা যায় একেক রকম বিচিত্র অজুহাত। এক নারী কর্মচারী দাবি করেন, ‘দাঁতের ব্যথায় আসতে একটু বিলম্ব হয়েছে।’ আরেকজন বলেন, ‘মোটরসাইকেলের চাকা পাংচার হয়ে যাওয়ায় দেরি হলো।’

কম্পিউটার অপারেটর ও অফিস সহকারীর দাবি—প্রতিদিন ঠিক সময়েই অফিসে আসেন তারা, কেবল সেদিনই রিকশা পেতে দেরি হয়েছে। আরেক পুরুষ কর্মী অজুহাত দেন, ‘হার্টের রোগী, তাই ওষুধ খেয়ে অফিসে আসতে দেরি হলো।’ এমনকি এক নারী কর্মচারী সাফ জানিয়ে দেন, ‘৯টায় অফিস হলেও এত সকালে আসাটা ভীষণ কষ্টের।’

কর্মকর্তাদের সাফাই-ক্ষোভ

সকাল ৯টা ২৮ মিনিটে রিকশায় চড়ে হন্তদন্ত হয়ে অফিসে এসে পৌঁছান জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এ এম শাজাহান সিদ্দিক। বিলম্বে আসার বিষয়ে তিনি দাবি করেন, সকাল ৭টায় তিনি অফিসে এসেছিলেন একজন উপপরিচালককে রিসিভ করতে। তার সঙ্গে দেখা করে নিজের অফিসে ফিরতে কিছুটা দেরি হয়েছে।

তবে নাইটগার্ড সকাল ৯টা ৪ মিনিটে গেট খোলার সময় কেউ উপস্থিত না থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান এবং বলেন, “নাইটগার্ড কী বলল, সেটা শুনবেন না।” যদিও সে সময় অফিসের বাইরে সকাল সাড়ে আটটা থেকে বহু সেবাগ্রহীতা অপেক্ষা করছিলেন, সে বিষয়ে কোনো সদুত্তর দেননি তিনি।

এরপর সকাল পৌনে ১০টা পর্যন্ত সহকারী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার আনোয়ারুল ইসলামসহ চারজন কর্মকর্তা-কর্মচারী অফিসে আসেননি। ফাঁকা পড়ে ছিল তাদের টেবিলগুলো।

সেবাগ্রহীতাদের হয়রানি

অফিসের এই লেট-কালচার ও অব্যবস্থাপনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সেবা নিতে আসা শিক্ষকরা। রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার মিলনপুর থেকে আসা স্কুলশিক্ষক সোলায়মান আলী বলেন, “রংপুর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে চলছে তুঘলকি কারবার। এই অফিস কার্যত শুরু হয় বেলা ১১টার দিকে। তার আগে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা আসেন না। যারা আসেন, তারাও হাজিরা খাতায় সই করে ইচ্ছেমতো বাইরে চলে যান।”

তিনি জানান, গত সাত দিন ধরে একটি আবেদন জমা দিতে এসে তিনি চরম হয়রানির শিকার হচ্ছেন।

চেয়ার টেবিল সাজানো, নেই কর্মকর্তা

বদরগঞ্জ উপজেলার মধুপুর থেকে আসা অবসরে যাওয়া শিক্ষক সালমা বেগম অভিযোগ করেন, এক মাস আগে অবসরে গেলেও গত ১৫ দিন ধরে কাগজপত্রের জন্য তাকে ঘুরতে হচ্ছে। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এ এম শাজাহান সিদ্দিকের চেম্বারে কথা বলতে গেলে তিনি ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দেননি।

সালমাসহ অন্তত তিনজন সেবাগ্রহীতা অভিযোগ করেন, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা একজন অসৎ ব্যক্তি এবং টাকা ছাড়া কোনো ফাইলে সই করেন না।

সার্বিক বিষয়ে এসব অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের ব্যাপারে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এ এম শাজাহান সিদ্দিকের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি অভিযোগকারীদের মুখোমুখি করার চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেন। নিজেকে একজন সৎ ও দক্ষ অফিসার দাবি করে তিনি বলেন, এসব ‘আজগুবি কথার’ কোনো সত্যতা নেই।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

রোববার, ০১ নভেম্বর ২০২৬


রংপুর প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে উদ্ভট সব কাণ্ড, বিচিত্র অজুহাত

প্রকাশের তারিখ : ০১ নভেম্বর ২০২৬

featured Image

রংপুর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে চরম নৈরাজ্য ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলার অবনতির চিত্র উঠে এসেছে। অফিস শুরুর নির্ধারিত সময় সকাল ৯টা হলেও নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে নিজেদের খেয়ালখুশিমতো অফিসে আসচ্ছেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এর ফলে দূরদূরান্ত থেকে সেবা নিতে আসা সাধারণ শিক্ষক ও নাগরিকরা চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।

রোববার (১ নভেম্বর) সকালে নগরীর কাছারী বাজার এলাকার শিক্ষা কমপ্লেক্স চত্বরে অবস্থিত রংপুর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে সরেজমিন পরিদর্শনে এই চিত্র দেখা যায়।

সকাল ৯টায় গেট খোলা, টেবিলে কেউ নেই

সকাল ৯টা ৪ মিনিটে নাইটগার্ড এসে অফিসের প্রধান কলাপসিবল গেট খুলে দেন। ভেতরে গিয়ে দেখা যায়, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাসহ কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী তখনো অফিসে উপস্থিত হননি। এরপর সকাল ৯টা ২২ মিনিটে প্রথম আসেন ক্যাশিয়ার। একে একে প্রবেশ করেন অফিস সহকারী, কম্পিউটার অপারেটর ও অন্যান্য কর্মচারীরা।

দেরিতে আসার কারণ জানতে চাইলে তাদের মুখে শোনা যায় একেক রকম বিচিত্র অজুহাত। এক নারী কর্মচারী দাবি করেন, ‘দাঁতের ব্যথায় আসতে একটু বিলম্ব হয়েছে।’ আরেকজন বলেন, ‘মোটরসাইকেলের চাকা পাংচার হয়ে যাওয়ায় দেরি হলো।’

কম্পিউটার অপারেটর ও অফিস সহকারীর দাবি—প্রতিদিন ঠিক সময়েই অফিসে আসেন তারা, কেবল সেদিনই রিকশা পেতে দেরি হয়েছে। আরেক পুরুষ কর্মী অজুহাত দেন, ‘হার্টের রোগী, তাই ওষুধ খেয়ে অফিসে আসতে দেরি হলো।’ এমনকি এক নারী কর্মচারী সাফ জানিয়ে দেন, ‘৯টায় অফিস হলেও এত সকালে আসাটা ভীষণ কষ্টের।’

কর্মকর্তাদের সাফাই-ক্ষোভ

সকাল ৯টা ২৮ মিনিটে রিকশায় চড়ে হন্তদন্ত হয়ে অফিসে এসে পৌঁছান জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এ এম শাজাহান সিদ্দিক। বিলম্বে আসার বিষয়ে তিনি দাবি করেন, সকাল ৭টায় তিনি অফিসে এসেছিলেন একজন উপপরিচালককে রিসিভ করতে। তার সঙ্গে দেখা করে নিজের অফিসে ফিরতে কিছুটা দেরি হয়েছে।

তবে নাইটগার্ড সকাল ৯টা ৪ মিনিটে গেট খোলার সময় কেউ উপস্থিত না থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান এবং বলেন, “নাইটগার্ড কী বলল, সেটা শুনবেন না।” যদিও সে সময় অফিসের বাইরে সকাল সাড়ে আটটা থেকে বহু সেবাগ্রহীতা অপেক্ষা করছিলেন, সে বিষয়ে কোনো সদুত্তর দেননি তিনি।

এরপর সকাল পৌনে ১০টা পর্যন্ত সহকারী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার আনোয়ারুল ইসলামসহ চারজন কর্মকর্তা-কর্মচারী অফিসে আসেননি। ফাঁকা পড়ে ছিল তাদের টেবিলগুলো।

সেবাগ্রহীতাদের হয়রানি

অফিসের এই লেট-কালচার ও অব্যবস্থাপনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সেবা নিতে আসা শিক্ষকরা। রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার মিলনপুর থেকে আসা স্কুলশিক্ষক সোলায়মান আলী বলেন, “রংপুর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে চলছে তুঘলকি কারবার। এই অফিস কার্যত শুরু হয় বেলা ১১টার দিকে। তার আগে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা আসেন না। যারা আসেন, তারাও হাজিরা খাতায় সই করে ইচ্ছেমতো বাইরে চলে যান।”

তিনি জানান, গত সাত দিন ধরে একটি আবেদন জমা দিতে এসে তিনি চরম হয়রানির শিকার হচ্ছেন।

চেয়ার টেবিল সাজানো, নেই কর্মকর্তা

বদরগঞ্জ উপজেলার মধুপুর থেকে আসা অবসরে যাওয়া শিক্ষক সালমা বেগম অভিযোগ করেন, এক মাস আগে অবসরে গেলেও গত ১৫ দিন ধরে কাগজপত্রের জন্য তাকে ঘুরতে হচ্ছে। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এ এম শাজাহান সিদ্দিকের চেম্বারে কথা বলতে গেলে তিনি ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দেননি।

সালমাসহ অন্তত তিনজন সেবাগ্রহীতা অভিযোগ করেন, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা একজন অসৎ ব্যক্তি এবং টাকা ছাড়া কোনো ফাইলে সই করেন না।

সার্বিক বিষয়ে এসব অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের ব্যাপারে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এ এম শাজাহান সিদ্দিকের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি অভিযোগকারীদের মুখোমুখি করার চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেন। নিজেকে একজন সৎ ও দক্ষ অফিসার দাবি করে তিনি বলেন, এসব ‘আজগুবি কথার’ কোনো সত্যতা নেই।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত