বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা ও আলোচিত তরুণ এম তাহসিফ সৌরি হত্যা মামলায় নতুন মোড় এসেছে। প্রথম দফার চার দিনের পুলিশ রিমান্ড শেষে মামলার অন্যতম সন্দেহভাজন ও তাহসিফের ‘বন্ধুস্থানীয় ছোটভাই’ আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপকে আবারও তিন দিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছেন আদালত।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশ পরিদর্শক ফিরোজ উদ্দিন ৭ দিনের রিমান্ড আবেদন করলে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. হাসান শাহাদাত শুনানি শেষে এই আদেশ দেন। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী শামসুদ্দোহা সুমন ও প্রসিকিউটর মুহাম্মদ শামছুদ্দোহা সুমন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র ও রিমান্ড আবেদন থেকে জানা যায়, গত ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় ‘দীপের ডাকে’ বাসা থেকে নিজের বাইক নিয়ে বের হয়েছিলেন তাহসিফ। এরপর উত্তরা ১১ নম্বর সেক্টরের ‘নেস্ট রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বার’-এ তাদের সঙ্গে যোগ দেন মামলার আরেক সন্দিগ্ধ আসামি জেরিকা তাসনিম দিশা (১৯)।
সামনে আসা সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, ওইদিন রাত ১০টা ১৭ মিনিটে মোটরসাইকেলে করে তাহসিফ ও দিশা বারে প্রবেশ করেন। কিছুক্ষণ পর হেলমেট পরে সেখানে পৌঁছান দীপ। লিফটের সামনে একসঙ্গে অপেক্ষা করার পর তারা তিনজন বারের ভেতরে যান এবং প্রায় দেড় ঘণ্টা সেখানে অবস্থান করেন। এরপর বান্ধবী দিশাকে তার বাসায় পৌঁছে দেওয়া হয়। ঠিক এরপরেই শুরু হয় আসল রহস্য—তাহসিফ ও দীপ চলে যান টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকার দিকে।
জিজ্ঞাসাবাদে দীপ জানিয়েছেন, ২৮ অক্টোবর রাত ১২টা ৪০ মিনিটের দিকে তারা টঙ্গীর মাজার বস্তিতে পৌঁছান। সেখান থেকে তুরাগ নদীর তীরবর্তী একটি মাঠে যাওয়ার পর কয়েকজন লোক দেখতে পেয়ে তারা আলাদা হয়ে যান। অথচ মাদকস্পট হিসেবে পরিচিত ওই মধ্যরাতের এলাকা নিয়ে দীপের দেওয়া তথ্যেই গত ৩০ অক্টোবর সকালে মাজার বস্তি এলাকা থেকে তাহসিফের নিখোঁজ বাইকটি উদ্ধার করেছিল পুলিশ। এমনকি পরবর্তীতে পিবিআই কর্মকর্তারা তাকে নিয়ে ওই এলাকা পরিদর্শনও করেছিলেন।
কেন বারবার রিমান্ডে দীপ
পুলিশের পক্ষ থেকে আদালতে ৭ দিনের রিমান্ড চেয়ে আটটি সুনির্দিষ্ট কারণ দেখানো হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে— সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে দীপের উপস্থিতি এবং নেস্ট বারে অবস্থানের সময় তার ১৫-২০ মিনিট অন্যত্র সরে গিয়ে কার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল তা খতিয়ে দেখা। ভিকটিম ও আসামিদের মোবাইল ফোন কলের রেকর্ড (সিডিআর) সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা।
হত্যাকাণ্ডের মূল রহস্য উদঘাটন, মোটিভ অব মার্ডার (হত্যার উদ্দেশ্য) উদ্ঘাটন এবং প্রকৃত হত্যাকাণ্ডের স্থান নির্ধারণ করা। অজ্ঞাতনামা অপর আসামিদের গ্রেপ্তার ও আলামত উদ্ধার করা।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চার দিনের রিমান্ডে দীপ বেশ কিছু তথ্য দিলেও মামলার মূল রহস্যের বিষয়ে অনেক প্রশ্নের জবাব কৌশলে এড়িয়ে গেছেন এবং নীরবতা পালন করেছেন। মৃত্যুর আগে সর্বশেষ তাহসিফকে তাদের সঙ্গেই দেখা যাওয়ায় এই হত্যাকাণ্ডে তাদের সরাসরি কোনো সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
দীপের পক্ষে তার আইনজীবী মুতাসিম বিল্লাহ রিমান্ড বাতিল চেয়ে জামিন আবেদন করলেও আদালত উভয় পক্ষের শুনানি শেষে তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
উল্লেখ্য, গত বছরের জুলাই অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ‘ভিডিও ধারণকারী’ হিসেবে বেশ আলোচনায় এসেছিলেন তাহসিফ সাউরি। গত ২৮ অক্টোবর বিকেলে তুরাগ নদের রাজাবাড়ী ঘাটসংলগ্ন এলাকা থেকে তার ভাসমান মরদেহ উদ্ধার করে টঙ্গী নৌ-পুলিশ ফাঁড়ি। পরে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠানো হয়।
ঘটনার তিন দিন পর গত ৩১ অক্টোবর রাতে নিহতের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে উত্তরখান থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন এবং পরবর্তীতে বন্ধু দীপকে এই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
এছাড়া গত রোববার এই মামলায় তাহসিফের ‘বান্ধবী’ জেরিকা তাসনিম দিশাকেও চার দিনের রিমান্ডে দিয়েছেন আদালত। সব মিলিয়ে, চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের পেছনের আসল কুশীলব ও মোটিভ উদ্ঘাটনে এখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিবিড় নজর রয়েছে এই তিন তরুণ-তরুণীর ওপর।

মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৩ নভেম্বর ২০২৬
বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা ও আলোচিত তরুণ এম তাহসিফ সৌরি হত্যা মামলায় নতুন মোড় এসেছে। প্রথম দফার চার দিনের পুলিশ রিমান্ড শেষে মামলার অন্যতম সন্দেহভাজন ও তাহসিফের ‘বন্ধুস্থানীয় ছোটভাই’ আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপকে আবারও তিন দিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছেন আদালত।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশ পরিদর্শক ফিরোজ উদ্দিন ৭ দিনের রিমান্ড আবেদন করলে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. হাসান শাহাদাত শুনানি শেষে এই আদেশ দেন। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী শামসুদ্দোহা সুমন ও প্রসিকিউটর মুহাম্মদ শামছুদ্দোহা সুমন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র ও রিমান্ড আবেদন থেকে জানা যায়, গত ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় ‘দীপের ডাকে’ বাসা থেকে নিজের বাইক নিয়ে বের হয়েছিলেন তাহসিফ। এরপর উত্তরা ১১ নম্বর সেক্টরের ‘নেস্ট রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বার’-এ তাদের সঙ্গে যোগ দেন মামলার আরেক সন্দিগ্ধ আসামি জেরিকা তাসনিম দিশা (১৯)।
সামনে আসা সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, ওইদিন রাত ১০টা ১৭ মিনিটে মোটরসাইকেলে করে তাহসিফ ও দিশা বারে প্রবেশ করেন। কিছুক্ষণ পর হেলমেট পরে সেখানে পৌঁছান দীপ। লিফটের সামনে একসঙ্গে অপেক্ষা করার পর তারা তিনজন বারের ভেতরে যান এবং প্রায় দেড় ঘণ্টা সেখানে অবস্থান করেন। এরপর বান্ধবী দিশাকে তার বাসায় পৌঁছে দেওয়া হয়। ঠিক এরপরেই শুরু হয় আসল রহস্য—তাহসিফ ও দীপ চলে যান টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকার দিকে।
জিজ্ঞাসাবাদে দীপ জানিয়েছেন, ২৮ অক্টোবর রাত ১২টা ৪০ মিনিটের দিকে তারা টঙ্গীর মাজার বস্তিতে পৌঁছান। সেখান থেকে তুরাগ নদীর তীরবর্তী একটি মাঠে যাওয়ার পর কয়েকজন লোক দেখতে পেয়ে তারা আলাদা হয়ে যান। অথচ মাদকস্পট হিসেবে পরিচিত ওই মধ্যরাতের এলাকা নিয়ে দীপের দেওয়া তথ্যেই গত ৩০ অক্টোবর সকালে মাজার বস্তি এলাকা থেকে তাহসিফের নিখোঁজ বাইকটি উদ্ধার করেছিল পুলিশ। এমনকি পরবর্তীতে পিবিআই কর্মকর্তারা তাকে নিয়ে ওই এলাকা পরিদর্শনও করেছিলেন।
কেন বারবার রিমান্ডে দীপ
পুলিশের পক্ষ থেকে আদালতে ৭ দিনের রিমান্ড চেয়ে আটটি সুনির্দিষ্ট কারণ দেখানো হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে— সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে দীপের উপস্থিতি এবং নেস্ট বারে অবস্থানের সময় তার ১৫-২০ মিনিট অন্যত্র সরে গিয়ে কার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল তা খতিয়ে দেখা। ভিকটিম ও আসামিদের মোবাইল ফোন কলের রেকর্ড (সিডিআর) সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা।
হত্যাকাণ্ডের মূল রহস্য উদঘাটন, মোটিভ অব মার্ডার (হত্যার উদ্দেশ্য) উদ্ঘাটন এবং প্রকৃত হত্যাকাণ্ডের স্থান নির্ধারণ করা। অজ্ঞাতনামা অপর আসামিদের গ্রেপ্তার ও আলামত উদ্ধার করা।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চার দিনের রিমান্ডে দীপ বেশ কিছু তথ্য দিলেও মামলার মূল রহস্যের বিষয়ে অনেক প্রশ্নের জবাব কৌশলে এড়িয়ে গেছেন এবং নীরবতা পালন করেছেন। মৃত্যুর আগে সর্বশেষ তাহসিফকে তাদের সঙ্গেই দেখা যাওয়ায় এই হত্যাকাণ্ডে তাদের সরাসরি কোনো সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
দীপের পক্ষে তার আইনজীবী মুতাসিম বিল্লাহ রিমান্ড বাতিল চেয়ে জামিন আবেদন করলেও আদালত উভয় পক্ষের শুনানি শেষে তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
উল্লেখ্য, গত বছরের জুলাই অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ‘ভিডিও ধারণকারী’ হিসেবে বেশ আলোচনায় এসেছিলেন তাহসিফ সাউরি। গত ২৮ অক্টোবর বিকেলে তুরাগ নদের রাজাবাড়ী ঘাটসংলগ্ন এলাকা থেকে তার ভাসমান মরদেহ উদ্ধার করে টঙ্গী নৌ-পুলিশ ফাঁড়ি। পরে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠানো হয়।
ঘটনার তিন দিন পর গত ৩১ অক্টোবর রাতে নিহতের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে উত্তরখান থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন এবং পরবর্তীতে বন্ধু দীপকে এই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
এছাড়া গত রোববার এই মামলায় তাহসিফের ‘বান্ধবী’ জেরিকা তাসনিম দিশাকেও চার দিনের রিমান্ডে দিয়েছেন আদালত। সব মিলিয়ে, চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের পেছনের আসল কুশীলব ও মোটিভ উদ্ঘাটনে এখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিবিড় নজর রয়েছে এই তিন তরুণ-তরুণীর ওপর।

আপনার মতামত লিখুন