রাজধানীর মহাখালীতে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) পরিচালক ডা. কাজী আহমেদ জাকির ওপর মব সৃষ্টি করে হামলার ঘটনায় নেপথ্যে থাকা নানা কাহিনি উঠে এসেছে বনানী থানায় দায়ের করা মামলার এজাহারে।
হামলার শিকার পরিচালক নিজেই বাদী হয়ে এই মামলা করেছেন, যেখানে সন্দেহভাজন আসামি ডা. জাহিদ হাসানসহ তিনজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে এবং অজ্ঞাতনামা হিসেবে আরও ২০ থেকে ২৫ জনের কথা বলা হয়েছে।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, আসামি ডা. জাহিদ হাসান আইইডিসিআরের একটি প্রকল্পের (বিপিএইচপি) সাবেক কর্মকর্তা। তার বাড়ি কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায়। এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে, তার সঙ্গে ডা. বাছেদ ও মঞ্জুরসহ অজ্ঞাত আরও ২০ থেকে ২৫ জন বহিরাগত দুর্বৃত্ত পরিচালকের ওপর হামলায় অংশ নিয়েছেন।
এজাহারে আরও বলা হয়েছে, আসামি ডা. জাহিদ হাসান ইতঃপূর্বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক সহায়তায় আইইডিসিআরের পরিচালিত একটি প্রকল্পে কর্মরত ছিলেন। গত ৩০ সেপ্টেম্বর তার কর্মকাল শেষ হয়। কিন্তু কর্মকাল শেষ হওয়ার পরও তিনি অবৈধভাবে আইইডিসিআরে অবস্থান করে প্রতিষ্ঠানের অন্যান্য প্রকল্পের কার্যক্রম ব্যাহত করছিলেন। এই কারণে তাকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সতর্ক করা হলে তিনি পরিচালকের প্রতি চরম ক্ষুব্ধ হন।
এজাহার অনুযায়ী, গত ২৮ অক্টোবর আইইডিসিআরে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কর্তৃক উদ্বোধনকৃত, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কারিগরি সহায়তায় আয়োজিত একাধিক সরকারি কর্মসূচি চলমান ছিল। ওই কর্মসূচিতে দেশের বিভিন্ন জেলার সিভিল সার্জন, বিভাগীয় পরিচালক ও দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞ গবেষকরা অংশ নেন।
কর্মসূচির অংশ হিসেবে পরিচালক ডা. জাকি তার অফিস কক্ষে দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞসহ প্রায় ১৫ জন নারী ও পুরুষ কর্মকর্তার সঙ্গে সকালে দাপ্তরিক সভা করছিলেন। এ সময় হঠাৎ করে আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে কয়েকটি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে আইইডিসিআরের তৃতীয় তলায় প্রবেশ করে মব সৃষ্টি করে।
প্রতিষ্ঠানের সিসিটিভি ক্যামেরার সময় অনুযায়ী, সকাল ১১টা ১৯ মিনিট ৯ সেকেন্ডে আসামিদের মধ্যে প্রায় ৮ থেকে ৯ জন অনুমতি ছাড়াই জোরপূর্বক তার কক্ষে প্রবেশ করে। এ সময় আসামি ডা. জাহিদ সরাসরি পরিচালকের দপ্তরে গিয়ে তাকে ধরে টেনে চেয়ার থেকে মেঝেতে ফেলে দেন।
পরবর্তীতে আরও দুই আসামি তাকে টানাহেঁচড়া, ধাক্কাধাক্কি ও মারধর করেন। অন্যান্য আসামিরা ডা. জাহিদ হাসানের সঙ্গে যোগ দিয়ে চরম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত বিশেষজ্ঞ ও কর্মকর্তারা তাকে রক্ষা করতে এগিয়ে গেলেও আসামিরা তার ওপর মব সৃষ্টি অব্যাহত রাখে। এতে একটি সরকারি জরুরি সভা পণ্ড হয়ে যায়।
এজাহারে বলা হয়েছে, আসামিরা প্রায় পাঁচ মিনিট পরিচালকের কক্ষ ও সংলগ্ন করিডোরে অবস্থান করেন এবং চলে যাওয়ার সময় পরিচালককে প্রাণনাশের হুমকি দেন।
আইইডিসিআরের সিসিটিভি ক্যামেরায় মব সৃষ্টি, মারধর ও হুমকির পুরো ঘটনা ধারণ করা হয়েছে। পরিচালকের কক্ষের ভেতরের ক্যামেরায় সকাল ১১টা ১৯ মিনিট ৮ সেকেন্ড থেকে ১১টা ২৪ মিনিট ৫৫ সেকেন্ড পর্যন্ত আসামিদের রুমে প্রবেশ, পরিচালককে চেয়ার থেকে টেনে ফেলা ও মারধরের দৃশ্য রয়েছে। ফুটেজের মূল কপি সংরক্ষিত আছে বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরিচালকের অভিযোগে বলা হয়েছে, আসামি ডা. জাহিদ হাসানসহ তিনজন ডাক্তারের নেতৃত্বে অজ্ঞাত বহিরাগত দুর্বৃত্তরা বেআইনি সমাবেশ করে অফিস রুমে দাঙ্গা সৃষ্টি, অপরাধমূলক অনধিকারে সরকারি দপ্তরে প্রবেশ, সরকারি কর্মচারীকে আইনসম্মতভাবে সরকারি কার্য সম্পাদনে বাধাদান, কর্তব্য পালনে বাধা দেওয়ার উদ্দেশ্যে আক্রমণ, অপরাধমূলক বলপ্রয়োগ, আঘাত ও প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে ভীতি প্রদর্শন করেছে। এ ঘটনায় দুইজন অধ্যাপককে সাক্ষী হিসেবে রাখা হয়েছে।
এদিকে, বিএনপি-সমর্থিত চিকিৎসকদের সংগঠন ড্যাবের সভাপতি ডা. হারুন-আল রশিদ মুঠোফোনে জানান, ড্যাবের পক্ষ থেকেও ঘটনাটি নিয়ে পৃথক তদন্ত শুরু হয়েছে। এ জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। সিনিয়র ড্যাব নেতারা বিষয়টি খোঁজখবর রাখছেন এবং ভবিষ্যতে যাতে এমন ঘটনা না ঘটে সে জন্য সতর্ক রয়েছেন।
আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, ‘ওই গবেষণাগারে উচ্চঝুঁকিসম্পন্ন ল্যাবরেটরি রয়েছে। এই জাতীয় প্রতিষ্ঠানে উচ্ছৃঙ্খল ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড খুবই দুঃখজনক। সেখানে আন্তর্জাতিক গবেষকও রয়েছেন। তাদের মধ্যে এ হামলা নিয়ে উৎকণ্ঠা সৃষ্টি হয়েছে।’
বানানী থানার ওসি সালাহ উদ্দিন জানান, মামলাটি এখনো তদন্ত পর্যায়ে আছে। আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।

বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৪ নভেম্বর ২০২৬
রাজধানীর মহাখালীতে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) পরিচালক ডা. কাজী আহমেদ জাকির ওপর মব সৃষ্টি করে হামলার ঘটনায় নেপথ্যে থাকা নানা কাহিনি উঠে এসেছে বনানী থানায় দায়ের করা মামলার এজাহারে।
হামলার শিকার পরিচালক নিজেই বাদী হয়ে এই মামলা করেছেন, যেখানে সন্দেহভাজন আসামি ডা. জাহিদ হাসানসহ তিনজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে এবং অজ্ঞাতনামা হিসেবে আরও ২০ থেকে ২৫ জনের কথা বলা হয়েছে।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, আসামি ডা. জাহিদ হাসান আইইডিসিআরের একটি প্রকল্পের (বিপিএইচপি) সাবেক কর্মকর্তা। তার বাড়ি কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায়। এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে, তার সঙ্গে ডা. বাছেদ ও মঞ্জুরসহ অজ্ঞাত আরও ২০ থেকে ২৫ জন বহিরাগত দুর্বৃত্ত পরিচালকের ওপর হামলায় অংশ নিয়েছেন।
এজাহারে আরও বলা হয়েছে, আসামি ডা. জাহিদ হাসান ইতঃপূর্বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক সহায়তায় আইইডিসিআরের পরিচালিত একটি প্রকল্পে কর্মরত ছিলেন। গত ৩০ সেপ্টেম্বর তার কর্মকাল শেষ হয়। কিন্তু কর্মকাল শেষ হওয়ার পরও তিনি অবৈধভাবে আইইডিসিআরে অবস্থান করে প্রতিষ্ঠানের অন্যান্য প্রকল্পের কার্যক্রম ব্যাহত করছিলেন। এই কারণে তাকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সতর্ক করা হলে তিনি পরিচালকের প্রতি চরম ক্ষুব্ধ হন।
এজাহার অনুযায়ী, গত ২৮ অক্টোবর আইইডিসিআরে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কর্তৃক উদ্বোধনকৃত, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কারিগরি সহায়তায় আয়োজিত একাধিক সরকারি কর্মসূচি চলমান ছিল। ওই কর্মসূচিতে দেশের বিভিন্ন জেলার সিভিল সার্জন, বিভাগীয় পরিচালক ও দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞ গবেষকরা অংশ নেন।
কর্মসূচির অংশ হিসেবে পরিচালক ডা. জাকি তার অফিস কক্ষে দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞসহ প্রায় ১৫ জন নারী ও পুরুষ কর্মকর্তার সঙ্গে সকালে দাপ্তরিক সভা করছিলেন। এ সময় হঠাৎ করে আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে কয়েকটি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে আইইডিসিআরের তৃতীয় তলায় প্রবেশ করে মব সৃষ্টি করে।
প্রতিষ্ঠানের সিসিটিভি ক্যামেরার সময় অনুযায়ী, সকাল ১১টা ১৯ মিনিট ৯ সেকেন্ডে আসামিদের মধ্যে প্রায় ৮ থেকে ৯ জন অনুমতি ছাড়াই জোরপূর্বক তার কক্ষে প্রবেশ করে। এ সময় আসামি ডা. জাহিদ সরাসরি পরিচালকের দপ্তরে গিয়ে তাকে ধরে টেনে চেয়ার থেকে মেঝেতে ফেলে দেন।
পরবর্তীতে আরও দুই আসামি তাকে টানাহেঁচড়া, ধাক্কাধাক্কি ও মারধর করেন। অন্যান্য আসামিরা ডা. জাহিদ হাসানের সঙ্গে যোগ দিয়ে চরম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত বিশেষজ্ঞ ও কর্মকর্তারা তাকে রক্ষা করতে এগিয়ে গেলেও আসামিরা তার ওপর মব সৃষ্টি অব্যাহত রাখে। এতে একটি সরকারি জরুরি সভা পণ্ড হয়ে যায়।
এজাহারে বলা হয়েছে, আসামিরা প্রায় পাঁচ মিনিট পরিচালকের কক্ষ ও সংলগ্ন করিডোরে অবস্থান করেন এবং চলে যাওয়ার সময় পরিচালককে প্রাণনাশের হুমকি দেন।
আইইডিসিআরের সিসিটিভি ক্যামেরায় মব সৃষ্টি, মারধর ও হুমকির পুরো ঘটনা ধারণ করা হয়েছে। পরিচালকের কক্ষের ভেতরের ক্যামেরায় সকাল ১১টা ১৯ মিনিট ৮ সেকেন্ড থেকে ১১টা ২৪ মিনিট ৫৫ সেকেন্ড পর্যন্ত আসামিদের রুমে প্রবেশ, পরিচালককে চেয়ার থেকে টেনে ফেলা ও মারধরের দৃশ্য রয়েছে। ফুটেজের মূল কপি সংরক্ষিত আছে বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরিচালকের অভিযোগে বলা হয়েছে, আসামি ডা. জাহিদ হাসানসহ তিনজন ডাক্তারের নেতৃত্বে অজ্ঞাত বহিরাগত দুর্বৃত্তরা বেআইনি সমাবেশ করে অফিস রুমে দাঙ্গা সৃষ্টি, অপরাধমূলক অনধিকারে সরকারি দপ্তরে প্রবেশ, সরকারি কর্মচারীকে আইনসম্মতভাবে সরকারি কার্য সম্পাদনে বাধাদান, কর্তব্য পালনে বাধা দেওয়ার উদ্দেশ্যে আক্রমণ, অপরাধমূলক বলপ্রয়োগ, আঘাত ও প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে ভীতি প্রদর্শন করেছে। এ ঘটনায় দুইজন অধ্যাপককে সাক্ষী হিসেবে রাখা হয়েছে।
এদিকে, বিএনপি-সমর্থিত চিকিৎসকদের সংগঠন ড্যাবের সভাপতি ডা. হারুন-আল রশিদ মুঠোফোনে জানান, ড্যাবের পক্ষ থেকেও ঘটনাটি নিয়ে পৃথক তদন্ত শুরু হয়েছে। এ জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। সিনিয়র ড্যাব নেতারা বিষয়টি খোঁজখবর রাখছেন এবং ভবিষ্যতে যাতে এমন ঘটনা না ঘটে সে জন্য সতর্ক রয়েছেন।
আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, ‘ওই গবেষণাগারে উচ্চঝুঁকিসম্পন্ন ল্যাবরেটরি রয়েছে। এই জাতীয় প্রতিষ্ঠানে উচ্ছৃঙ্খল ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড খুবই দুঃখজনক। সেখানে আন্তর্জাতিক গবেষকও রয়েছেন। তাদের মধ্যে এ হামলা নিয়ে উৎকণ্ঠা সৃষ্টি হয়েছে।’
বানানী থানার ওসি সালাহ উদ্দিন জানান, মামলাটি এখনো তদন্ত পর্যায়ে আছে। আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।

আপনার মতামত লিখুন