সংবাদ

লবণাক্ত জমিতে কৃষি: জলবায়ু পরিবর্তনের নতুন সমাধান


প্রকাশ: ১৫ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:০৫ পিএম

লবণাক্ত জমিতে কৃষি: জলবায়ু পরিবর্তনের নতুন সমাধান

বর্তমান সময়ের বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে আলোচিত একটি বিষয় হলো জলবায়ু পরিবর্তন| জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পুরো বিশ্বের প্রায় প্রত্যেকটি দেশ খুব বাজেভাবে সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে| কিন্তু বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশ কিংবা অনুন্নত দেশগুলোর সমস্যার পরিমাণটা একটু বেশিই| অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, জলোচ্ছ্বাস খরা, সমুদ্র পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পেয়ে উপকূলীয় অঞ্চলকে তলিয়ে দেয়ার মতো ঘটনা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যেন নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে|

আর এই জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সমস্যার সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছে উপকূলীয় অঞ্চলের জেলাগুলো| দেশের উপকূলীয় ১৯ জেলায় প্রায় ১০ লাখ ৫৬ হাজার হেক্টর জমি এখন লবণের কবলে| ১৯৭৩ সালে ছিল ৮৩ হাজার হেক্টর| যতই সময় পার হচ্ছে জলবায়ুও ততই দ্রুত বদলাচ্ছে| ফলশ্রুতিতে লবণাক্ততাও ক্রমেই বাড়ছে|কয়েক দশক আগেও যেখানে বিস্তীর্ণ জমিতে ধান, শাকসবজি আর নানা ফসল ফলত, সেখানে এখন অনেক জায়গায় মাটিতে লবণের সাদা আস্তরণ দেখা যায়| অনেক কৃষক তাই বাধ্য হয়ে জমি ফেলে রেখেছেন বা অন্য পেশায় চলে গেছেন| কিন্তু এই সংকটের ভেতরেই লুকিয়ে আছে এক নতুন সম্ভাবনার বীজ| সেই সম্ভাবনাকে সঠিকভাবে বাস্তবায়িত করতে পারলেই লবণাক্ত জমির অভিশাপ থেকে নিস্তার পাওয়ার সম্ভব| সঠিক কৌশল জানা থাকলে এটিই হতে পারে জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে কৃষির নতুন পথ| লবণাক্ত জমিতে কৃষি শুধু খাদ্য উৎপাদনের নতুন দিগন্তই খুলে দিতে পারে না, বরং এটি উপকূলীয় অর্থনীতিকে নতুনভাবে দাঁড় করাতে পারে|

এক্ষেত্রে লবণাক্ত জমিতে কৃষির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হলো লবণসহনশীল ফসল নির্বাচন| কৃষি বিজ্ঞানীরা ইতোমধ্যে এমন অনেক ধানের জাত উদ্ভাবন করেছেন, যেগুলো লবণাক্ত মাটিতেও ভালো ফলন দিতে পারে| ব্রি ধান ৬৭, ব্রি ধান ৯৭, ব্রি ধান ৯৯, ব্রি ধান ১১২-এর মতো এই জাতগুলো ১০-১২ ডেসি সিমেন্স প্রতি মিটার লবণও সহ্য করতে পারে| তাছাড়া সাধারণ ধান যেখানে ৪-৫ টন ফলন দেয়, এগুলো সেখানে ফলন দেয় ৫-৬ টন পর্যন্ত| এখনই উপকূলের ৩৫ শতাংশ লবণাক্ত এলাকায় এই জাতগুলোর চাষ হচ্ছে| যার মাধ্যমে শুধু ব্রি-এর স্ট্রেস-টলারেন্ট জাতগুলো প্রতি বছর অর্থনীতিতে যোগ করছে প্রায় ১৫২৫ মিলিয়ন ডলার| এই ধারা অব্যাহত রেখে এবং এর মাত্রা আরো বাড়াতে পারলে অর্থনীতিতে এই উপকূলীয় অঞ্চলই লবণাক্ততার সঙ্গে যুদ্ধ করেও বড় অবদান রাখতে পারবে| তবে লবণাক্ত জমির কৃষি শুধু ধানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়| এখন এই ক্ষেত্রে ধীরে ধীরে নতুন নতুন পথ খুলছে| ডাচ বিজ্ঞানীদের সহযোগিতায় বাংলাদেশে শুরু হয়েছে সল্ট সল্যুশন প্রকল্প| এই প্রকল্পের মাধ্যমে উপকূলের কৃষকদের শেখানো হচ্ছে কীভাবে লবণাক্ত মাটিতেও ফলন বাড়ানো যায়| কৃষকরা এখন শিখছেন সারজান পদ্ধতি| যার মাধ্যমে উঁচু করে মাটির বিছানা বানিয়ে চাষ করা হয় |

মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখতে খড় দিয়ে মালচিং, অল্প পানিতে সেচ দেয়ার জন্য ড্রিপ সেচ, আর বৃষ্টির পানি ধরে রাখার পদ্ধতিও শেখানো হচ্ছে উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষকদেরকে | এখানেই শেষ নয়, মাটিতে লবণাক্ততার পরিমাণের পরীক্ষা করে, ঠিক করা হচ্ছে কোন জমিতে কোনো ফসল ভালো হবে| এর মাধ্যমে ফলও মিলছে বেশ দ্রুত| উপকূলীয় অঞ্চলে এখন আলু, গাজর, লাউ, পালং শাক, তরমুজ কিংবা সূর্যমুখীর মতো ফসলও চাষ হচ্ছে বেশ ভালোভাবেই| কৃষির এই পরিবর্তন এখানেই থেমে নেই| পাশাপাশি সরকার, বিভিন্ন এনজিও এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় ধীরে ধীরে একটি সহায়ক নেটওয়ার্ক তৈরি হচ্ছে| সেই ধারাবাহিকতায় অনেক কৃষক এখন নিজেরাই অন্য কৃষকদের শেখাচ্ছেন|

এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় সুফল পাচ্ছেন উপকূলের নারীরা| অনেক নারী কৃষক এখন নিজের জমিতে ফসল ফলিয়ে স্বাবলম্বী হচ্ছেন| এতে প্রতি বছর হাজার হাজার নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে| সরকারকে গবেষণা ও উন্নয়নে আরও বিনিয়োগ করতে হবে| ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট, কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে| কৃষকদের সহজ শর্তে ঋণ দেয়া, বাজার ব্যবস্থার উন্নয়ন করা এবং কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্প গড়ে তোলার উদ্যোগ নিতে হবে| একই সঙ্গে এনজিও এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থাগুলোর সহযোগিতাও অতিব জরুরি| আমাদের উপকূলের মাটি কেবল সাধারণ নোনা মাটিই নয়, এই মাটি আমাদের পূর্বপুরুষের স্মৃতি আর উত্তরসূরির ভবিষ্যতের মিশেল|

আর এই উপকূলীয় অঞ্চলের প্রত্যেকটা কৃষকই এক একজন যোদ্ধা| রাষ্ট্র, বিজ্ঞানী কিংবা সমাজের সচেতন নাগরিক হিসেবে আমরা সবাই যদি তাদের পাশে দাঁড়াই, তবে এই নোনা মাটিই হয়ে উঠবে বাংলাদেশের উন্নয়নের ভিত্তি| আর এই ভিত্তি থেকেই দেশ একদিন স্বর্ণশিখরে আহরণ করবে| সেদিন বাংলাদেশ পুরো পৃথিবীর সামনে হয়ে উঠবে লবণাক্ততাকে জয় করে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো এক সাহসী অর্থনীতির নাম|

প্রজ্ঞা দাস

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬


লবণাক্ত জমিতে কৃষি: জলবায়ু পরিবর্তনের নতুন সমাধান

প্রকাশের তারিখ : ১৫ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

বর্তমান সময়ের বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে আলোচিত একটি বিষয় হলো জলবায়ু পরিবর্তন| জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পুরো বিশ্বের প্রায় প্রত্যেকটি দেশ খুব বাজেভাবে সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে| কিন্তু বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশ কিংবা অনুন্নত দেশগুলোর সমস্যার পরিমাণটা একটু বেশিই| অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, জলোচ্ছ্বাস খরা, সমুদ্র পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পেয়ে উপকূলীয় অঞ্চলকে তলিয়ে দেয়ার মতো ঘটনা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যেন নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে|

আর এই জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সমস্যার সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছে উপকূলীয় অঞ্চলের জেলাগুলো| দেশের উপকূলীয় ১৯ জেলায় প্রায় ১০ লাখ ৫৬ হাজার হেক্টর জমি এখন লবণের কবলে| ১৯৭৩ সালে ছিল ৮৩ হাজার হেক্টর| যতই সময় পার হচ্ছে জলবায়ুও ততই দ্রুত বদলাচ্ছে| ফলশ্রুতিতে লবণাক্ততাও ক্রমেই বাড়ছে|কয়েক দশক আগেও যেখানে বিস্তীর্ণ জমিতে ধান, শাকসবজি আর নানা ফসল ফলত, সেখানে এখন অনেক জায়গায় মাটিতে লবণের সাদা আস্তরণ দেখা যায়| অনেক কৃষক তাই বাধ্য হয়ে জমি ফেলে রেখেছেন বা অন্য পেশায় চলে গেছেন| কিন্তু এই সংকটের ভেতরেই লুকিয়ে আছে এক নতুন সম্ভাবনার বীজ| সেই সম্ভাবনাকে সঠিকভাবে বাস্তবায়িত করতে পারলেই লবণাক্ত জমির অভিশাপ থেকে নিস্তার পাওয়ার সম্ভব| সঠিক কৌশল জানা থাকলে এটিই হতে পারে জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে কৃষির নতুন পথ| লবণাক্ত জমিতে কৃষি শুধু খাদ্য উৎপাদনের নতুন দিগন্তই খুলে দিতে পারে না, বরং এটি উপকূলীয় অর্থনীতিকে নতুনভাবে দাঁড় করাতে পারে|

এক্ষেত্রে লবণাক্ত জমিতে কৃষির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হলো লবণসহনশীল ফসল নির্বাচন| কৃষি বিজ্ঞানীরা ইতোমধ্যে এমন অনেক ধানের জাত উদ্ভাবন করেছেন, যেগুলো লবণাক্ত মাটিতেও ভালো ফলন দিতে পারে| ব্রি ধান ৬৭, ব্রি ধান ৯৭, ব্রি ধান ৯৯, ব্রি ধান ১১২-এর মতো এই জাতগুলো ১০-১২ ডেসি সিমেন্স প্রতি মিটার লবণও সহ্য করতে পারে| তাছাড়া সাধারণ ধান যেখানে ৪-৫ টন ফলন দেয়, এগুলো সেখানে ফলন দেয় ৫-৬ টন পর্যন্ত| এখনই উপকূলের ৩৫ শতাংশ লবণাক্ত এলাকায় এই জাতগুলোর চাষ হচ্ছে| যার মাধ্যমে শুধু ব্রি-এর স্ট্রেস-টলারেন্ট জাতগুলো প্রতি বছর অর্থনীতিতে যোগ করছে প্রায় ১৫২৫ মিলিয়ন ডলার| এই ধারা অব্যাহত রেখে এবং এর মাত্রা আরো বাড়াতে পারলে অর্থনীতিতে এই উপকূলীয় অঞ্চলই লবণাক্ততার সঙ্গে যুদ্ধ করেও বড় অবদান রাখতে পারবে| তবে লবণাক্ত জমির কৃষি শুধু ধানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়| এখন এই ক্ষেত্রে ধীরে ধীরে নতুন নতুন পথ খুলছে| ডাচ বিজ্ঞানীদের সহযোগিতায় বাংলাদেশে শুরু হয়েছে সল্ট সল্যুশন প্রকল্প| এই প্রকল্পের মাধ্যমে উপকূলের কৃষকদের শেখানো হচ্ছে কীভাবে লবণাক্ত মাটিতেও ফলন বাড়ানো যায়| কৃষকরা এখন শিখছেন সারজান পদ্ধতি| যার মাধ্যমে উঁচু করে মাটির বিছানা বানিয়ে চাষ করা হয় |

মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখতে খড় দিয়ে মালচিং, অল্প পানিতে সেচ দেয়ার জন্য ড্রিপ সেচ, আর বৃষ্টির পানি ধরে রাখার পদ্ধতিও শেখানো হচ্ছে উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষকদেরকে | এখানেই শেষ নয়, মাটিতে লবণাক্ততার পরিমাণের পরীক্ষা করে, ঠিক করা হচ্ছে কোন জমিতে কোনো ফসল ভালো হবে| এর মাধ্যমে ফলও মিলছে বেশ দ্রুত| উপকূলীয় অঞ্চলে এখন আলু, গাজর, লাউ, পালং শাক, তরমুজ কিংবা সূর্যমুখীর মতো ফসলও চাষ হচ্ছে বেশ ভালোভাবেই| কৃষির এই পরিবর্তন এখানেই থেমে নেই| পাশাপাশি সরকার, বিভিন্ন এনজিও এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় ধীরে ধীরে একটি সহায়ক নেটওয়ার্ক তৈরি হচ্ছে| সেই ধারাবাহিকতায় অনেক কৃষক এখন নিজেরাই অন্য কৃষকদের শেখাচ্ছেন|

এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় সুফল পাচ্ছেন উপকূলের নারীরা| অনেক নারী কৃষক এখন নিজের জমিতে ফসল ফলিয়ে স্বাবলম্বী হচ্ছেন| এতে প্রতি বছর হাজার হাজার নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে| সরকারকে গবেষণা ও উন্নয়নে আরও বিনিয়োগ করতে হবে| ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট, কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে| কৃষকদের সহজ শর্তে ঋণ দেয়া, বাজার ব্যবস্থার উন্নয়ন করা এবং কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্প গড়ে তোলার উদ্যোগ নিতে হবে| একই সঙ্গে এনজিও এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থাগুলোর সহযোগিতাও অতিব জরুরি| আমাদের উপকূলের মাটি কেবল সাধারণ নোনা মাটিই নয়, এই মাটি আমাদের পূর্বপুরুষের স্মৃতি আর উত্তরসূরির ভবিষ্যতের মিশেল|

আর এই উপকূলীয় অঞ্চলের প্রত্যেকটা কৃষকই এক একজন যোদ্ধা| রাষ্ট্র, বিজ্ঞানী কিংবা সমাজের সচেতন নাগরিক হিসেবে আমরা সবাই যদি তাদের পাশে দাঁড়াই, তবে এই নোনা মাটিই হয়ে উঠবে বাংলাদেশের উন্নয়নের ভিত্তি| আর এই ভিত্তি থেকেই দেশ একদিন স্বর্ণশিখরে আহরণ করবে| সেদিন বাংলাদেশ পুরো পৃথিবীর সামনে হয়ে উঠবে লবণাক্ততাকে জয় করে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো এক সাহসী অর্থনীতির নাম|

প্রজ্ঞা দাস


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত