অফিসের টেবিলে বসে গুনে গুনে টাকা নিচ্ছেন, ক্যামেরাবন্দি সে দৃশ্য। সাংবাদিক জানতে চাইলে উল্টো হুমকি- ‘আমি একা নই, প্রকৌশলী থেকে ইউএনও সবাই খায়’। এর আগেও বারবার বদলি, তবু বদলায়নি অভ্যাস। দুর্নীতির সাম্রাজ্য গড়েছেন যেখানে সেখানেই। সাতক্ষীরার কালীগঞ্জের এলজিইডি অফিসের হিসাবরক্ষক মুস্তাফিজুর রহমানের যেন প্রকাশ্যে ঘুষ খাওয়াই নেশা।
অফিসের দাপ্তরিক টেবিল। সামনে বসে ইউনিয়ন পরিষদের সচিব। হিসাবরক্ষক মুস্তাফিজুর রহমান গুনে গুনে নিচ্ছেন টাকা। দশ হাজার টাকার কয়েকটি বান্ডিল। হাতে গোনা শেষে টেবিলের ওপর রাখা কাগজের ফাইলের ভেতর ঢুকিয়ে দিচ্ছেন। এ দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি হয়েছে কয়েক দিন আগেই।
বুধবার (১৫ এপ্রিল) সাতক্ষীরার কালীগঞ্জ উপজেলা এলজিইডি অফিসের এই ভিডিও হাতে পায় স্থানীয় সাংবাদিক ও সচেতন মহল। ভিডিওতে চাম্পাফুল ইউনিয়ন পরিষদের সচিব সাইদুর রহমান ও কুশুলিয়া ইউনিয়ন পরিষদের সচিব কামরুজ্জামানকে দেখা যায়, মুস্তাফিজের হাতে টাকা গুঁজে দিতে। প্রকল্পের বিল বানানোর জন্য এই টাকা, দাবি ভুক্তভোগীদের।
শুধু একটি ভিডিও নয়, একাধিক ভিডিও ফাঁস হয়েছে। বৃহস্পতিবার মৌতলা ইউনিয়ন পরিষদের সচিবের কাছ থেকেও একই দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি হয়েছে।
ভিডিও হাতে পাওয়ার পর মুস্তাফিজুর রহমানের কাছে ফোন করেন সাংবাদিকরা। নিজের পরিচয় জানাতেই তার আচরণ পাল্টে যায়। উল্টো জ্বলে ওঠেন তিনি। বলেন, “চাকরি অনেক হয়েছে, এ পর্যন্ত আমার কেউ কিছু করতে পারেনি। আমি একা না, উপজেলা প্রকৌশলী থেকে শুরু করে ইউএনও পর্যন্ত সবাই খায়। লিখে কোনো লাভ হবে না।”
হিসাবরক্ষক মুস্তাফিজুর রহমানের বাড়ি সাতক্ষীরা সদর থানার লাবসা গ্রামে। ২০০৫ সালে প্রকল্পভিত্তিক চাকরিতে যোগদান করেন। পরে ২০১৩ সালে হাইকোর্টের রায়ে চাকরি স্থায়ী হয়। এরপর থেকেই শুরু হয় দুর্নীতির পথচলা।
তালা উপজেলায় থাকার সময় উপজেলা প্রকৌশলীর নাম ভাঙিয়ে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল। সংবাদমাধ্যমে শিরোনাম হয়েছিলেন। সেখান থেকে বদলি হয়েছিলেন খুলনার রূপসা উপজেলায়। সেখানেও থামেনি অভিযোগ। বদলি হলেন সাতক্ষীরা সদর উপজেলায়। সেখানে মাত্র পাঁচ-সাত দিন থাকতে পেরেছিলেন।
এরপর তদবিরের মাধ্যমে গত বছর মে মাসে যোগ দেন কালীগঞ্জ উপজেলা এলজিইডি অফিসে। তার বদলির খবর পেয়ে ওই অফিসের প্রকৌশলী, সহকারী প্রকৌশলী ও ১৮ কর্মকর্তা-কর্মচারী গণস্বাক্ষর করে আবেদন করেন- ‘এই দুর্নীতিবাজ ব্যক্তি যেন এখানে যোগ দিতে না পারেন’।কিন্তু সে আবেদন বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে মোটা অঙ্কের তদবিরের মাধ্যমে মুস্তাফিজ কালীগঞ্জে যোগ দেন। এখন সেখানেই তাঁর ঘাঁটি।
ভুক্তভোগী ঠিকাদার ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মুস্তাফিজ যেন একচ্ছত্র অধিপতি এলজিইডি অফিসে। কোনো ঠিকাদারের বিল দিতে হলে প্রথমে হিসাবরক্ষকের কাছে যেতে হয়। তার ‘চাহিদা’ মেটানো না গেলে মাসের পর মাস বারান্দায় বসে থাকতে হয়।
নাম না প্রকাশের শর্তে এক ঠিকাদার জানান, “নতুন কাজের চুক্তি বা কার্যাদেশ পেতে ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা দিতে হয়। বরাদ্দ বেশি হলে ঘুষের অঙ্ক বেড়ে যায়।”
শুধু প্রকল্পের কাজ নয়, সাধারণ মানুষ বাড়ির প্ল্যান করাতেও মুস্তাফিজের দ্বারস্থ হন। অভিযোগ, প্ল্যান বানাতে ২০ হাজার টাকা আগাম দিতে হয়। পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, এসিল্যান্ড, উপজেলা প্রকৌশলী ও সহকারী প্রকৌশলীদের ঘুষ দেওয়ার নাম করে আরও ৫০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেন।
এ প্রতিনিধি নিজে পরিচয় গোপন করে প্ল্যানের জন্য কথা বললে মুস্তাফিজ জানান, “প্রতি বর্গফুটের টাকা ছাড়াও ইউএনও, এসিল্যান্ড, প্রকৌশলীদের দিতে হবে। সব মিলিয়ে ৫০ হাজার টাকা লাগবে।”এ যেন ঘুষের একটি চেইন। যার মূলে রয়েছেন এই হিসাবরক্ষক।
মুস্তাফিজুর রহমানের চাকরির বয়স প্রায় দুই দশক। এ সময় তিনি সাতক্ষীরার লাবসা গ্রামে গড়ে তুলেছেন আলিশান দ্বিতল ভবন। নামে বেনামে রয়েছে অঢেল সম্পদের পাহাড়। সেটা ঘুষ, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির মাধ্যমেই সম্ভব হয়েছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।
বারবার বদলি হয়েছেন, কিন্তু তার বিরুদ্ধে কোনো বিভাগীয় ব্যবস্থা হয়নি। বরং তদবিরের মাধ্যমে আবার নতুন জায়গায় যোগ দিয়েছেন। সেখানেও শুরু হয়েছে অভিযোগের একই ধারা।
এ বিষয়ে কালীগঞ্জ উপজেলা এলজিইডির প্রকৌশলী জাকির হোসেনের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, “মুস্তাফিজের বিরুদ্ধে আগেও অধিদপ্তরে জানানো হয়েছে। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো আমার জানা ছিল না। আপনাদের মাধ্যমে জেনেছি। উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৮ এপ্রিল ২০২৬
অফিসের টেবিলে বসে গুনে গুনে টাকা নিচ্ছেন, ক্যামেরাবন্দি সে দৃশ্য। সাংবাদিক জানতে চাইলে উল্টো হুমকি- ‘আমি একা নই, প্রকৌশলী থেকে ইউএনও সবাই খায়’। এর আগেও বারবার বদলি, তবু বদলায়নি অভ্যাস। দুর্নীতির সাম্রাজ্য গড়েছেন যেখানে সেখানেই। সাতক্ষীরার কালীগঞ্জের এলজিইডি অফিসের হিসাবরক্ষক মুস্তাফিজুর রহমানের যেন প্রকাশ্যে ঘুষ খাওয়াই নেশা।
অফিসের দাপ্তরিক টেবিল। সামনে বসে ইউনিয়ন পরিষদের সচিব। হিসাবরক্ষক মুস্তাফিজুর রহমান গুনে গুনে নিচ্ছেন টাকা। দশ হাজার টাকার কয়েকটি বান্ডিল। হাতে গোনা শেষে টেবিলের ওপর রাখা কাগজের ফাইলের ভেতর ঢুকিয়ে দিচ্ছেন। এ দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি হয়েছে কয়েক দিন আগেই।
বুধবার (১৫ এপ্রিল) সাতক্ষীরার কালীগঞ্জ উপজেলা এলজিইডি অফিসের এই ভিডিও হাতে পায় স্থানীয় সাংবাদিক ও সচেতন মহল। ভিডিওতে চাম্পাফুল ইউনিয়ন পরিষদের সচিব সাইদুর রহমান ও কুশুলিয়া ইউনিয়ন পরিষদের সচিব কামরুজ্জামানকে দেখা যায়, মুস্তাফিজের হাতে টাকা গুঁজে দিতে। প্রকল্পের বিল বানানোর জন্য এই টাকা, দাবি ভুক্তভোগীদের।
শুধু একটি ভিডিও নয়, একাধিক ভিডিও ফাঁস হয়েছে। বৃহস্পতিবার মৌতলা ইউনিয়ন পরিষদের সচিবের কাছ থেকেও একই দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি হয়েছে।
ভিডিও হাতে পাওয়ার পর মুস্তাফিজুর রহমানের কাছে ফোন করেন সাংবাদিকরা। নিজের পরিচয় জানাতেই তার আচরণ পাল্টে যায়। উল্টো জ্বলে ওঠেন তিনি। বলেন, “চাকরি অনেক হয়েছে, এ পর্যন্ত আমার কেউ কিছু করতে পারেনি। আমি একা না, উপজেলা প্রকৌশলী থেকে শুরু করে ইউএনও পর্যন্ত সবাই খায়। লিখে কোনো লাভ হবে না।”
হিসাবরক্ষক মুস্তাফিজুর রহমানের বাড়ি সাতক্ষীরা সদর থানার লাবসা গ্রামে। ২০০৫ সালে প্রকল্পভিত্তিক চাকরিতে যোগদান করেন। পরে ২০১৩ সালে হাইকোর্টের রায়ে চাকরি স্থায়ী হয়। এরপর থেকেই শুরু হয় দুর্নীতির পথচলা।
তালা উপজেলায় থাকার সময় উপজেলা প্রকৌশলীর নাম ভাঙিয়ে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল। সংবাদমাধ্যমে শিরোনাম হয়েছিলেন। সেখান থেকে বদলি হয়েছিলেন খুলনার রূপসা উপজেলায়। সেখানেও থামেনি অভিযোগ। বদলি হলেন সাতক্ষীরা সদর উপজেলায়। সেখানে মাত্র পাঁচ-সাত দিন থাকতে পেরেছিলেন।
এরপর তদবিরের মাধ্যমে গত বছর মে মাসে যোগ দেন কালীগঞ্জ উপজেলা এলজিইডি অফিসে। তার বদলির খবর পেয়ে ওই অফিসের প্রকৌশলী, সহকারী প্রকৌশলী ও ১৮ কর্মকর্তা-কর্মচারী গণস্বাক্ষর করে আবেদন করেন- ‘এই দুর্নীতিবাজ ব্যক্তি যেন এখানে যোগ দিতে না পারেন’।কিন্তু সে আবেদন বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে মোটা অঙ্কের তদবিরের মাধ্যমে মুস্তাফিজ কালীগঞ্জে যোগ দেন। এখন সেখানেই তাঁর ঘাঁটি।
ভুক্তভোগী ঠিকাদার ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মুস্তাফিজ যেন একচ্ছত্র অধিপতি এলজিইডি অফিসে। কোনো ঠিকাদারের বিল দিতে হলে প্রথমে হিসাবরক্ষকের কাছে যেতে হয়। তার ‘চাহিদা’ মেটানো না গেলে মাসের পর মাস বারান্দায় বসে থাকতে হয়।
নাম না প্রকাশের শর্তে এক ঠিকাদার জানান, “নতুন কাজের চুক্তি বা কার্যাদেশ পেতে ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা দিতে হয়। বরাদ্দ বেশি হলে ঘুষের অঙ্ক বেড়ে যায়।”
শুধু প্রকল্পের কাজ নয়, সাধারণ মানুষ বাড়ির প্ল্যান করাতেও মুস্তাফিজের দ্বারস্থ হন। অভিযোগ, প্ল্যান বানাতে ২০ হাজার টাকা আগাম দিতে হয়। পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, এসিল্যান্ড, উপজেলা প্রকৌশলী ও সহকারী প্রকৌশলীদের ঘুষ দেওয়ার নাম করে আরও ৫০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেন।
এ প্রতিনিধি নিজে পরিচয় গোপন করে প্ল্যানের জন্য কথা বললে মুস্তাফিজ জানান, “প্রতি বর্গফুটের টাকা ছাড়াও ইউএনও, এসিল্যান্ড, প্রকৌশলীদের দিতে হবে। সব মিলিয়ে ৫০ হাজার টাকা লাগবে।”এ যেন ঘুষের একটি চেইন। যার মূলে রয়েছেন এই হিসাবরক্ষক।
মুস্তাফিজুর রহমানের চাকরির বয়স প্রায় দুই দশক। এ সময় তিনি সাতক্ষীরার লাবসা গ্রামে গড়ে তুলেছেন আলিশান দ্বিতল ভবন। নামে বেনামে রয়েছে অঢেল সম্পদের পাহাড়। সেটা ঘুষ, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির মাধ্যমেই সম্ভব হয়েছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।
বারবার বদলি হয়েছেন, কিন্তু তার বিরুদ্ধে কোনো বিভাগীয় ব্যবস্থা হয়নি। বরং তদবিরের মাধ্যমে আবার নতুন জায়গায় যোগ দিয়েছেন। সেখানেও শুরু হয়েছে অভিযোগের একই ধারা।
এ বিষয়ে কালীগঞ্জ উপজেলা এলজিইডির প্রকৌশলী জাকির হোসেনের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, “মুস্তাফিজের বিরুদ্ধে আগেও অধিদপ্তরে জানানো হয়েছে। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো আমার জানা ছিল না। আপনাদের মাধ্যমে জেনেছি। উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

আপনার মতামত লিখুন