সংবাদ

স্বপ্নের ঝাঁপি এবং রাজনীতির মানুষের সাপলুডু খেলা


শেখর ভট্টাচার্য
শেখর ভট্টাচার্য
প্রকাশ: ২৫ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:৪৫ পিএম

স্বপ্নের ঝাঁপি এবং রাজনীতির মানুষের সাপলুডু খেলা
দেয়ালের লেখায় ‘বৈষম্যবিরোধী বাংলাদেশ’-এর আকাঙ্ক্ষা

সৈয়দ আবুল মকসুদ  ‘সহজিয়া কড়চা’ শিরোনামে  ˆদনিক ‘প্রথম আলোতে’  গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে নিয়মিত লেখালেখি করতেন। বিশ্লেষণের স্বকীয়তার কারণে তিনি পাঠক প্রিয়তা পেয়েছিলেন। রাজনীতি ক্ষেত্রে সৌজন্য এবং শিষ্টাচারের উদাহরণ দিতে গিয়ে তিনি একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা উপস্থাপন করেন। উপমহাদেশের রাজনীতিতে সৌজন্য শিষ্টাচারের উদাহরণ খুব বেশি পাওয়া যায়না, এ কারণেই বোধ হয়  সৈয়দ আবুল মকসুদ বর্ণিত এই অসাধারণ ঘটানাটি অবচেতন মনে স্থায়ী হয়ে আছে। লেখাটির  পটভুমি তৈরির জন্য ‘সহজিয়া কড়চা’ থেকে এই ঘটনার উদ্ধৃতির লোভ সামলাতে পারছিনা। আশা করি পাঠক মনেও উদ্ধৃতিটি দাগ কাটবে এবং সৌজন্য শিষ্টাচারের রাজনিতি নিয়ে কিছুটা হলেও ভাবাবে।

‘পাকিস্তানের রিপাবলিকান-আওয়ামী লীগ কোয়ালিশন সরকারের প্রধানমন্ত্রী মালিক ফিরোজ খান নূন ভারতের প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুর আমন্ত্রণে ভারত সফরে গিয়েছিলেন। সেই সরকারি সফরে প্রধানমন্ত্রী নূনের সঙ্গী হয়েছিলেন তার পত্নী ভিকারুননিসা নূন। পিআইএর বিশেষ বিমানে তারা নয়াদিল্লি যান। প্রধানমন্ত্রী নেহরু পাকিস্তানি অতিথিদের পালাম বিমানবন্দরের গ্যাংওয়েতে গিয়ে অভ্যর্থনা জানান। মালিক ও ভিকারুননিসা বিমানের সিঁড়ি দিয়ে পাশাপাশি নামছিলেন। সিঁড়ির কয়েক ধাপ থাকতেই কীভাবে বেগম ভিকারুননিসার এক পাটি জুতা নিচে পড়ে যায়। নিশ্ছিদ্র সিকিউরিটির বহু কর্মকর্তা বিমান ঘিরে ছিলেন। তাদের কেউ নন, সিঁড়ির নিচ থেকে বেগম নূনের জুতাটি স্বয়ং জওহরলাল নেহরু তুলে আনেন। সিকিউরিটির লোকেরা ও অন্য শীর্ষ কর্মকর্তারা হতবাক। হতবাক পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীও। কিন্তু তাদের হতবাক হওয়ার মাত্রা সীমা ছাড়িয়ে যায় যখন তারা দেখেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী জুতাটি বেগম নূনের পায়ে পরিয়ে দিতে এগিয়ে গিয়ে নিচু হচ্ছেন। সে এক অকল্পনীয় দৃশ্য।

বেগম নূনের পায়ে জুতা পরিয়ে দিতে গিয়ে নেহরু ছোট হয়েছেন, সে-কথা নিতান্ত ছোটলোক কেউ ছাড়া দুনিয়ার মানুষ বলবে না। বরং প্রকাশ পেয়েছে নেহরুর ঔদার্য, পরম সৌজন্যবোধ ও শিষ্টাচার।’ (সহজিয়া কড়চা,  ফেব্রুয়ারি ২০১৫ )

উদাহরণটি আন্তঃদেশীয়। উপমহাদেশে এরকম শিষ্টাচারের উদাহরণ খুব বেশি যে নেই তা’ বলাই বাহুল্য। অভ্যন্তরীন রাজনীতিতে দক্ষিণ এশিয়ার দেশ গুলোতে উচ্চমানের সৌজন্য, শিষ্টাচার অনুশীলনের অনুপস্থিতি দেশগুলোর রাজনৈতিক অবস্থার করুণ  চিত্র তুলে ধরে।   রাজনীতি কেবল দল বা ক্ষমতার লড়াই নয়। এটি আচরণ, শিষ্টাচার এবং ˆনতিকতার প্রতিফলন। রাজনীতিবিদদের কাছ থেকে মানুষ মোটাদাগে কী চায়? প্রকৃত অর্থে সততা, সহনশীলতা ও দায়িত্বশীলতার উজ্জ্বল উদাহরণ দেখার অপেক্ষায় থাকে।রাজনীতিতে সৌজন্য ও শিষ্টাচার হলো প্রতিপক্ষের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ, মার্জিত ভাষা ব্যবহার এবং সহনশীল আচরণ, যা সুস্থ গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি বিনির্মাণে অপরিহার্য। গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির যথাযথ বিকাশ না ঘটায় আমাদের দেশে শিষ্টাচারের রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রত্যাশিত মাত্রায় গড়ে ওঠেনি। সৌজন্য ও শিষ্ঠাচারের রাজনীতির অভাবে অসৌজন্য এবং অশ্লীলতার রাজনীতি দ্রুত বিকশিত হতে থাকে। ভয়ের রাজনীতির বিকাশে আইনের শাসনের দৃশ্যমানতা থাকেনা।

১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর আমরা  সৌজন্য ও শিষ্টাচারের কিছু উদাহরণ দেখে বিস্মিত ও আশান্বিত হতে শুরু করেছি।  রাজনৈতিক সৌজন্য ও শিষ্টাচারের অংশ হিসেবে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের মাত্র একদিন পর ১৫ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের বাসভবনে গিয়ে  অনানুষ্ঠানিক পরিবেশে সৌজন্য সাক্ষাত করেন যা আমাদের দেশের প্রচলিত রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে প্রায় অনুপস্থিত। সৌজন্য সাক্ষাতকারটি শুধুমাত্র একটি সাক্ষাতকারই ছিলনা বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে একটি তাৎপর্যময় ঘটনা হিসেবে দল মত নির্বিশেষে সবাই বিবেচনা করেছেন। সাক্ষাৎকারের পূর্বের দিন রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত নির্বাচন পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে তারেক রহমান জাতীয় ঐক্য ও সহযোগিতার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন ‘একটি নিরাপদ, মানবিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার পথে আমি দল বা মত নির্বিশেষে সকলের সহযোগিতা কামনা করি।’ ওই সংবাদ সম্মেলনে আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা বলা হয়েছে। তারেক রহমান বলেছেন, ‘নির্বাচনে একে অপরের বিরুদ্ধে কিংবা একদল আরেক দলের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে গিয়ে নির্বাচনের মাঠে হয়তো কোথাও কোথাও নিজেদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়ে থাকতে পারে। তবে, এ ধরনের বিরোধ যেন প্রতিশোধ-প্রতিহিংসায় রূপ না নেয় সে ব্যাপারে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানাই।’ প্রতিদ্বন্দ্বিতা শেষে এই যে ঐক্য ও সংহতির আহ্বান এটি হলো গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি নির্মাণের আমন্ত্রণ এ কথাটি বুঝতে হবে।

ইউরোপ, আমেরিকার দেশ গুলোর অভ্যন্তরীন রাজনৈতিক শিষ্টাচার ও সৌজন্যবোধের ইতিবাচক দিক নিয়ে আমরা আলোচনা করি খুব কম। ইতিবাচক দিকের আলোচনা, ব্যাখ্যা, বিশ্লেষণ করলে দুটি নামে ট্যাগ দেয়ার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায় একটি হলো সাম্রাজ্যবাদের দোসর আর একটি পশ্চিমা ধর্ম সমূহের অনুসারী কিংবা আরও অশ্লীল শব্দের উচ্চারণ অযোগ্য কোন রাজনৈতিক ট্যাগ। আধুনিক  মনস্ক যে কোন সমাজ, রাষ্ট্র পৃথিবীর যে কোন দেশ থেকে ইতিবাচক অভিজ্ঞতা কিংবা অনুশীলন গ্রহণ করতে কুণ্ঠা বোধ করেননা। এ ক্ষেত্রে আমাদের আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি কে মধ্যযুগীয় হিসেবে অভিহিত করলে খুব ভুল বলা হবেনা । পশ্চিমা গণতন্ত্রান্তিক রাজনীতিতে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকলেও ব্যক্তিগত জীবনে একে অপরের প্রতি সম্মান ও সহানুভূতি বজায় রেখে চলতে দেখা যায়। ব্যক্তিগত আক্রমণকে সবাই এড়িয়ে যেতে চেষ্টা করেন  এবং নীতি ও আদর্শের ভিত্তিতে বিতর্ক করাকেই গণতান্ত্রিক আচরণ হিসেবে মনে করে থাকেন।  ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ প্রদর্শন করার অনুশীলন না থাকলে রাজনীতির মাঠে হিংসা, প্রতিশোধ, হানাহানি চলতেই থাকে। সৌজন্য শিষ্টাচারের রাজনীতির অনুশীলনের অভাবে গণতন্ত্র কখনো পরিপুষ্ঠ হতে পারেনা। বল প্রয়োগ, অশ্লীলতার রাজনীতির আধিপত্য সেখানে সহজেই প্রতিষ্ঠা পেয়ে যায়। পৃথিবীর কোন অঞ্চলে গায়ের জোরে, অশ্লীল স্লোগান, অস্লীল বক্তব্য প্রদান করে টেকসই গণতন্ত্র প্রতিষ্টা লাভ করেছে এমন উদাহরণ আমরা দেখতে পাইনা। আমাদের দেশের  উল্লেখযোগ্য সংখ্যক তরুণ, তরুণী মনে করে অশ্লীল স্লোগান অধিকার রক্ষার এক বড় অধিকার।

স্বাধীনতা সংগ্রামের উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশকে সত্যিকার অর্থে একটি গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক ও শোষণমুক্ত রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। আমাদের সংবিধানেও সব নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য এবং স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।

স্বাধীনতার ৫৫ বছরেও একটি গণতান্ত্রিক ও বৈষম্যমুক্ত সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা যায়নি। এর পেছনে সুশাসনের ঘাটতি যেমন দায়ী, তেমনি দায়ী রাজনৈতিক নেতৃত্বের ব্যর্থতাও। স্বাধীনতার পর থেকে যেসব রাজনৈতিক দল দেশ শাসনের ভার নিয়েছে, তারা জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। এই ব্যর্থতার ফল হিসেবেই গণআন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান আমাদের ইতিহাসে বারবার ফিরে এসেছে। আমরা যদি বিদ্যমান রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন সাধনে ব্যর্থ হই তাহলে অস্থিরতা, প্রতিহিংসা, হানাহানির রাজনীতি যে বহমান থাকবে এ কথা বলতে  নিকোলো মেকিয়াভেলি, ম্যাক্স ওয়েবার কিংবা জন লক হওয়ার প্রয়োজন নেই।

ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়ে দিলে যা হয়, আমাদের সামাজিক, রাজনৈতিক উন্নয়নের অবস্থা হয়েছে অনেকটা সেরকম। ঘোড়া টেনে নিয়ে যাওয়ার কথা গাড়িকে, এখন ঘোড়া যতোই চেষ্টা করুক না কেনো বড় জোর গাড়িকে পেছনে নিয়ে যেতে পারবে; অনেকটা ভুতের পশ্চাত-পদতার মতো। রাজনৈতিক সংস্কৃতি বিনির্মান না করে স্থাপনা নির্মানের উন্নয়নের ধারা ক্রমবহমান থাকলে নুন্যতম জাতীয় ঐক্যের সসম্ভাবনা থাকেনা। বিভেদ, বিভ্রান্তির রাজনীতি হিংসা, প্রতিহিংসা ছাড়া আর কিছু উপহার দিতে পারে বলে আমাদের জানা নেই।

১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর আমরা যতোটুকু সৌজন্য শিষ্টাচারের রাজনীতির সূচনা দেখালাম তা’ আমাদের কাছে ক্রান্তিকালে আলোর রেখার মতো মনে হয়েছে। প্রতিবাদ, প্রতিরোধ , ভিন্নমতের অবস্থান না থাকলে গণতন্ত্রের চর্চা সহজতর হয়না। ভিন্নমত, ভিন্ন পথ শাসকদের প্রদর্শন করা জরুরি। ক্ষমতাকে প্রশ্ন করা না হলে ক্ষমতা দাম্ভিক হয়ে যায়। দাম্ভিক ক্ষমতা পান্থজনের জন্য নয়, এটি ক্ষমতাধরদের আরও ক্ষমতাবান করে তুলে।

আমরা চাই জন-আকাঙ্ক্ষার ক্ষমতা। যে মাঝি জীবন বিপন্ন করে মুক্তিযুদ্ধাদের গভীর রাতে নদী পার করে দিয়েছিল ভোরের আলো দেখার প্রত্যাশায়, সেই মাঝির স্বপ্নের বাংলাদেশ আমরা দেখতে চাই। সৌজন্য , শিষ্টাচার যেনো লোক দেখানো না হয়। আন্তরিক ভাবে বৃত্তের বাইরে থাকা মানুষদের সামনে গিয়ে নতজানু হতে হবে। প্রান্তিক মানুষ যদি ধীরে ধীরে কেন্দ্রে আসতে  পারে তাহলে বৈষম্য হ্রাস পাবে। “বৈষম্যহীন বাংলাদেশ” এই শব্দ যুগলের মধ্যে জাদু আছে। ষাট, সত্তর দশক থেকে এই স্বপ্ন ঝাপির ভেতর রেখে রাজনীতিবিদেরা সাধারণ মানুষদের সাপের খেলা দেখিয়ে আসছেন। স্বপ্নকে নিয়ে বারবার খেলা দেখালে, ঝাপির ভেতরের সাপ ছোবল যে মারবে এ কথা মনে রাখা প্রয়োজন। মানবিক এবং কাঠামোগত উন্নয়নের জন্য চাই উপযুক্ত রাজনৈতিক সংস্কৃতি, যেখানে মানুষের ভালোবাসা, নিবেদন থাকবে নিখাদ, নির্ভেজাল।

[লেখক: প্রাবন্ধিক ও উন্নয়ন গবেষক]



আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

শনিবার, ২৫ এপ্রিল ২০২৬


স্বপ্নের ঝাঁপি এবং রাজনীতির মানুষের সাপলুডু খেলা

প্রকাশের তারিখ : ২৫ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

সৈয়দ আবুল মকসুদ  ‘সহজিয়া কড়চা’ শিরোনামে  ˆদনিক ‘প্রথম আলোতে’  গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে নিয়মিত লেখালেখি করতেন। বিশ্লেষণের স্বকীয়তার কারণে তিনি পাঠক প্রিয়তা পেয়েছিলেন। রাজনীতি ক্ষেত্রে সৌজন্য এবং শিষ্টাচারের উদাহরণ দিতে গিয়ে তিনি একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা উপস্থাপন করেন। উপমহাদেশের রাজনীতিতে সৌজন্য শিষ্টাচারের উদাহরণ খুব বেশি পাওয়া যায়না, এ কারণেই বোধ হয়  সৈয়দ আবুল মকসুদ বর্ণিত এই অসাধারণ ঘটানাটি অবচেতন মনে স্থায়ী হয়ে আছে। লেখাটির  পটভুমি তৈরির জন্য ‘সহজিয়া কড়চা’ থেকে এই ঘটনার উদ্ধৃতির লোভ সামলাতে পারছিনা। আশা করি পাঠক মনেও উদ্ধৃতিটি দাগ কাটবে এবং সৌজন্য শিষ্টাচারের রাজনিতি নিয়ে কিছুটা হলেও ভাবাবে।

‘পাকিস্তানের রিপাবলিকান-আওয়ামী লীগ কোয়ালিশন সরকারের প্রধানমন্ত্রী মালিক ফিরোজ খান নূন ভারতের প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুর আমন্ত্রণে ভারত সফরে গিয়েছিলেন। সেই সরকারি সফরে প্রধানমন্ত্রী নূনের সঙ্গী হয়েছিলেন তার পত্নী ভিকারুননিসা নূন। পিআইএর বিশেষ বিমানে তারা নয়াদিল্লি যান। প্রধানমন্ত্রী নেহরু পাকিস্তানি অতিথিদের পালাম বিমানবন্দরের গ্যাংওয়েতে গিয়ে অভ্যর্থনা জানান। মালিক ও ভিকারুননিসা বিমানের সিঁড়ি দিয়ে পাশাপাশি নামছিলেন। সিঁড়ির কয়েক ধাপ থাকতেই কীভাবে বেগম ভিকারুননিসার এক পাটি জুতা নিচে পড়ে যায়। নিশ্ছিদ্র সিকিউরিটির বহু কর্মকর্তা বিমান ঘিরে ছিলেন। তাদের কেউ নন, সিঁড়ির নিচ থেকে বেগম নূনের জুতাটি স্বয়ং জওহরলাল নেহরু তুলে আনেন। সিকিউরিটির লোকেরা ও অন্য শীর্ষ কর্মকর্তারা হতবাক। হতবাক পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীও। কিন্তু তাদের হতবাক হওয়ার মাত্রা সীমা ছাড়িয়ে যায় যখন তারা দেখেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী জুতাটি বেগম নূনের পায়ে পরিয়ে দিতে এগিয়ে গিয়ে নিচু হচ্ছেন। সে এক অকল্পনীয় দৃশ্য।

বেগম নূনের পায়ে জুতা পরিয়ে দিতে গিয়ে নেহরু ছোট হয়েছেন, সে-কথা নিতান্ত ছোটলোক কেউ ছাড়া দুনিয়ার মানুষ বলবে না। বরং প্রকাশ পেয়েছে নেহরুর ঔদার্য, পরম সৌজন্যবোধ ও শিষ্টাচার।’ (সহজিয়া কড়চা,  ফেব্রুয়ারি ২০১৫ )

উদাহরণটি আন্তঃদেশীয়। উপমহাদেশে এরকম শিষ্টাচারের উদাহরণ খুব বেশি যে নেই তা’ বলাই বাহুল্য। অভ্যন্তরীন রাজনীতিতে দক্ষিণ এশিয়ার দেশ গুলোতে উচ্চমানের সৌজন্য, শিষ্টাচার অনুশীলনের অনুপস্থিতি দেশগুলোর রাজনৈতিক অবস্থার করুণ  চিত্র তুলে ধরে।   রাজনীতি কেবল দল বা ক্ষমতার লড়াই নয়। এটি আচরণ, শিষ্টাচার এবং ˆনতিকতার প্রতিফলন। রাজনীতিবিদদের কাছ থেকে মানুষ মোটাদাগে কী চায়? প্রকৃত অর্থে সততা, সহনশীলতা ও দায়িত্বশীলতার উজ্জ্বল উদাহরণ দেখার অপেক্ষায় থাকে।রাজনীতিতে সৌজন্য ও শিষ্টাচার হলো প্রতিপক্ষের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ, মার্জিত ভাষা ব্যবহার এবং সহনশীল আচরণ, যা সুস্থ গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি বিনির্মাণে অপরিহার্য। গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির যথাযথ বিকাশ না ঘটায় আমাদের দেশে শিষ্টাচারের রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রত্যাশিত মাত্রায় গড়ে ওঠেনি। সৌজন্য ও শিষ্ঠাচারের রাজনীতির অভাবে অসৌজন্য এবং অশ্লীলতার রাজনীতি দ্রুত বিকশিত হতে থাকে। ভয়ের রাজনীতির বিকাশে আইনের শাসনের দৃশ্যমানতা থাকেনা।

১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর আমরা  সৌজন্য ও শিষ্টাচারের কিছু উদাহরণ দেখে বিস্মিত ও আশান্বিত হতে শুরু করেছি।  রাজনৈতিক সৌজন্য ও শিষ্টাচারের অংশ হিসেবে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের মাত্র একদিন পর ১৫ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের বাসভবনে গিয়ে  অনানুষ্ঠানিক পরিবেশে সৌজন্য সাক্ষাত করেন যা আমাদের দেশের প্রচলিত রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে প্রায় অনুপস্থিত। সৌজন্য সাক্ষাতকারটি শুধুমাত্র একটি সাক্ষাতকারই ছিলনা বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে একটি তাৎপর্যময় ঘটনা হিসেবে দল মত নির্বিশেষে সবাই বিবেচনা করেছেন। সাক্ষাৎকারের পূর্বের দিন রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত নির্বাচন পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে তারেক রহমান জাতীয় ঐক্য ও সহযোগিতার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন ‘একটি নিরাপদ, মানবিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার পথে আমি দল বা মত নির্বিশেষে সকলের সহযোগিতা কামনা করি।’ ওই সংবাদ সম্মেলনে আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা বলা হয়েছে। তারেক রহমান বলেছেন, ‘নির্বাচনে একে অপরের বিরুদ্ধে কিংবা একদল আরেক দলের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে গিয়ে নির্বাচনের মাঠে হয়তো কোথাও কোথাও নিজেদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়ে থাকতে পারে। তবে, এ ধরনের বিরোধ যেন প্রতিশোধ-প্রতিহিংসায় রূপ না নেয় সে ব্যাপারে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানাই।’ প্রতিদ্বন্দ্বিতা শেষে এই যে ঐক্য ও সংহতির আহ্বান এটি হলো গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি নির্মাণের আমন্ত্রণ এ কথাটি বুঝতে হবে।

ইউরোপ, আমেরিকার দেশ গুলোর অভ্যন্তরীন রাজনৈতিক শিষ্টাচার ও সৌজন্যবোধের ইতিবাচক দিক নিয়ে আমরা আলোচনা করি খুব কম। ইতিবাচক দিকের আলোচনা, ব্যাখ্যা, বিশ্লেষণ করলে দুটি নামে ট্যাগ দেয়ার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায় একটি হলো সাম্রাজ্যবাদের দোসর আর একটি পশ্চিমা ধর্ম সমূহের অনুসারী কিংবা আরও অশ্লীল শব্দের উচ্চারণ অযোগ্য কোন রাজনৈতিক ট্যাগ। আধুনিক  মনস্ক যে কোন সমাজ, রাষ্ট্র পৃথিবীর যে কোন দেশ থেকে ইতিবাচক অভিজ্ঞতা কিংবা অনুশীলন গ্রহণ করতে কুণ্ঠা বোধ করেননা। এ ক্ষেত্রে আমাদের আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি কে মধ্যযুগীয় হিসেবে অভিহিত করলে খুব ভুল বলা হবেনা । পশ্চিমা গণতন্ত্রান্তিক রাজনীতিতে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকলেও ব্যক্তিগত জীবনে একে অপরের প্রতি সম্মান ও সহানুভূতি বজায় রেখে চলতে দেখা যায়। ব্যক্তিগত আক্রমণকে সবাই এড়িয়ে যেতে চেষ্টা করেন  এবং নীতি ও আদর্শের ভিত্তিতে বিতর্ক করাকেই গণতান্ত্রিক আচরণ হিসেবে মনে করে থাকেন।  ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ প্রদর্শন করার অনুশীলন না থাকলে রাজনীতির মাঠে হিংসা, প্রতিশোধ, হানাহানি চলতেই থাকে। সৌজন্য শিষ্টাচারের রাজনীতির অনুশীলনের অভাবে গণতন্ত্র কখনো পরিপুষ্ঠ হতে পারেনা। বল প্রয়োগ, অশ্লীলতার রাজনীতির আধিপত্য সেখানে সহজেই প্রতিষ্ঠা পেয়ে যায়। পৃথিবীর কোন অঞ্চলে গায়ের জোরে, অশ্লীল স্লোগান, অস্লীল বক্তব্য প্রদান করে টেকসই গণতন্ত্র প্রতিষ্টা লাভ করেছে এমন উদাহরণ আমরা দেখতে পাইনা। আমাদের দেশের  উল্লেখযোগ্য সংখ্যক তরুণ, তরুণী মনে করে অশ্লীল স্লোগান অধিকার রক্ষার এক বড় অধিকার।

স্বাধীনতা সংগ্রামের উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশকে সত্যিকার অর্থে একটি গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক ও শোষণমুক্ত রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। আমাদের সংবিধানেও সব নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য এবং স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।

স্বাধীনতার ৫৫ বছরেও একটি গণতান্ত্রিক ও বৈষম্যমুক্ত সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা যায়নি। এর পেছনে সুশাসনের ঘাটতি যেমন দায়ী, তেমনি দায়ী রাজনৈতিক নেতৃত্বের ব্যর্থতাও। স্বাধীনতার পর থেকে যেসব রাজনৈতিক দল দেশ শাসনের ভার নিয়েছে, তারা জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। এই ব্যর্থতার ফল হিসেবেই গণআন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান আমাদের ইতিহাসে বারবার ফিরে এসেছে। আমরা যদি বিদ্যমান রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন সাধনে ব্যর্থ হই তাহলে অস্থিরতা, প্রতিহিংসা, হানাহানির রাজনীতি যে বহমান থাকবে এ কথা বলতে  নিকোলো মেকিয়াভেলি, ম্যাক্স ওয়েবার কিংবা জন লক হওয়ার প্রয়োজন নেই।

ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়ে দিলে যা হয়, আমাদের সামাজিক, রাজনৈতিক উন্নয়নের অবস্থা হয়েছে অনেকটা সেরকম। ঘোড়া টেনে নিয়ে যাওয়ার কথা গাড়িকে, এখন ঘোড়া যতোই চেষ্টা করুক না কেনো বড় জোর গাড়িকে পেছনে নিয়ে যেতে পারবে; অনেকটা ভুতের পশ্চাত-পদতার মতো। রাজনৈতিক সংস্কৃতি বিনির্মান না করে স্থাপনা নির্মানের উন্নয়নের ধারা ক্রমবহমান থাকলে নুন্যতম জাতীয় ঐক্যের সসম্ভাবনা থাকেনা। বিভেদ, বিভ্রান্তির রাজনীতি হিংসা, প্রতিহিংসা ছাড়া আর কিছু উপহার দিতে পারে বলে আমাদের জানা নেই।

১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর আমরা যতোটুকু সৌজন্য শিষ্টাচারের রাজনীতির সূচনা দেখালাম তা’ আমাদের কাছে ক্রান্তিকালে আলোর রেখার মতো মনে হয়েছে। প্রতিবাদ, প্রতিরোধ , ভিন্নমতের অবস্থান না থাকলে গণতন্ত্রের চর্চা সহজতর হয়না। ভিন্নমত, ভিন্ন পথ শাসকদের প্রদর্শন করা জরুরি। ক্ষমতাকে প্রশ্ন করা না হলে ক্ষমতা দাম্ভিক হয়ে যায়। দাম্ভিক ক্ষমতা পান্থজনের জন্য নয়, এটি ক্ষমতাধরদের আরও ক্ষমতাবান করে তুলে।

আমরা চাই জন-আকাঙ্ক্ষার ক্ষমতা। যে মাঝি জীবন বিপন্ন করে মুক্তিযুদ্ধাদের গভীর রাতে নদী পার করে দিয়েছিল ভোরের আলো দেখার প্রত্যাশায়, সেই মাঝির স্বপ্নের বাংলাদেশ আমরা দেখতে চাই। সৌজন্য , শিষ্টাচার যেনো লোক দেখানো না হয়। আন্তরিক ভাবে বৃত্তের বাইরে থাকা মানুষদের সামনে গিয়ে নতজানু হতে হবে। প্রান্তিক মানুষ যদি ধীরে ধীরে কেন্দ্রে আসতে  পারে তাহলে বৈষম্য হ্রাস পাবে। “বৈষম্যহীন বাংলাদেশ” এই শব্দ যুগলের মধ্যে জাদু আছে। ষাট, সত্তর দশক থেকে এই স্বপ্ন ঝাপির ভেতর রেখে রাজনীতিবিদেরা সাধারণ মানুষদের সাপের খেলা দেখিয়ে আসছেন। স্বপ্নকে নিয়ে বারবার খেলা দেখালে, ঝাপির ভেতরের সাপ ছোবল যে মারবে এ কথা মনে রাখা প্রয়োজন। মানবিক এবং কাঠামোগত উন্নয়নের জন্য চাই উপযুক্ত রাজনৈতিক সংস্কৃতি, যেখানে মানুষের ভালোবাসা, নিবেদন থাকবে নিখাদ, নির্ভেজাল।

[লেখক: প্রাবন্ধিক ও উন্নয়ন গবেষক]




সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত