ঘড়ির কাঁটায় তখন বিকেল। পবিত্র রমজান মাস, ইফতারের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন ধর্মপ্রাণ মুসলমানেরা। ঠিক তখনই মাত্র এক থেকে দুই মিনিটের এক প্রলয়ংকর তাণ্ডব লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছিল সাটুরিয়াকে। সেই ভয়াল ২৬ এপ্রিল। আজ মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ টর্নেডোর ৩৭ বছর পূর্ণ হলো।
দুই মিনিটে ধ্বংসস্তূপ ১২ গ্রাম: পাহাড়সম মেঘ আর প্রচণ্ড গর্জনে মুহূর্তেই সাটুরিয়া সদর, হাজীপুর, ভাটারা, হরগজ, তিল্লীসহ প্রায় ১২টি গ্রাম ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। সরকারি-বেসরকারি হিসেবে সেই এক মিনিটের আঘাতে প্রাণ হারান প্রায় ১ হাজার ৩০০ মানুষ। আহত হন ১২ হাজারের বেশি, গৃহহীন হন প্রায় এক লাখ মানুষ। সেদিনের আর্তনাদে ভারী হয়ে উঠেছিল সাটুরিয়ার বাতাস।
বেঁচে আছেন ক্ষত নিয়ে: ৩৭ বছর পেরিয়ে গেলেও সেই বিভীষিকা আজও তাড়া করে বেড়ায় বেঁচে থাকা মানুষদের। হরগজ পূর্ব নগর গ্রামের আবুল হোসেন, হরগজ মধ্যকান্দি গ্রামের ইব্রাহিম মাস্টার, হরগজ বাজারের বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. আব্বাস উদ্দিন জানান, আজও সাটুরিয়ার আকাশে মেঘ জমলে তাদের বুক কাঁপে। ঝড় মানুষকে উড়িয়ে নিয়ে দূরে আছাড় দিয়েছিল। উড়ন্ত টিনের আঘাতে পা হারিয়ে পঙ্গু হয়েছেন অনেকে। সাটুরিয়া বাজারের ব্যবসায়ী খসরু হারিয়েছেন তাঁর একটি হাত।
সবচেয়ে হৃদয়বিদারক স্মৃতি আয়েশার (৮০)। তিনি জানান, ছেলের বউ মনোয়ারাকে নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার সময় হঠাৎ ঘরের চালের বাটাম খুলে এসে বৌমার পেটে ঢুকে পড়ে। সারা রাত বৌমা ওইভাবেই যন্ত্রণায় চিৎকার করছিল। কেউ সাহস পাচ্ছিলাম না বাটামটি বের করতে।
সকালে ফজল নামের এক প্রতিবেশী বুকে লাথি মেরে বাটামটি বের করামাত্র রক্ত বের হয়ে যায়। এক সময় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে মনোয়ারা। এখনও বাজারের ব্যবসায়ীরা মেঘ দেখলেই দোকানের শাটার নামিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে ছোটেন।
ভোলা যায় না সেই দিন। ছবি: সংগৃহীত
নুরুল হক জানান, এই দুর্যোগ কাটিয়ে ওঠার জন্য তৎকালীন সরকারের একটি ক্যাবিনেট সভা হরগজ ঈদগাহ মাঠে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। তিনি ২৬ এপ্রিলকে ‘টর্নেডো দিবস’ হিসেবে জাতীয় দিবস ঘোষণার দাবি জানান।
পুনর্বাসনে আক্ষেপ: তৎকালীন সময়ে সেনা-নৌ-বিমান বাহিনীর সহায়তায় বড় ধরনের উদ্ধার অভিযান চললেও ক্ষতিগ্রস্তদের দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন নিয়ে আজও আক্ষেপ রয়েছে স্থানীয়দের। অনেকে নামমাত্র সাহায্য পেলেও নিজের শক্তিতেই লড়ে গেছেন।
প্রতিবছরের মতো এবারও ২৬ এপ্রিল ‘টর্নেডো দিবস’ পালন করছে স্থানীয় সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো। দিনটি উপলক্ষে সাটুরিয়ার বিভিন্ন মসজিদে নিহতদের আত্মার মাগফিরাত কামনায় দোয়া ও বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন করা হয়েছে।
সাটুরিয়াবাসীর কাছে ২৬ এপ্রিল মানেই এক দুঃসহ যন্ত্রণার নাম-যা চার দশক ছুঁইছুঁই সময়েও ফিকে হয়নি।

শনিবার, ২৫ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৫ এপ্রিল ২০২৬
ঘড়ির কাঁটায় তখন বিকেল। পবিত্র রমজান মাস, ইফতারের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন ধর্মপ্রাণ মুসলমানেরা। ঠিক তখনই মাত্র এক থেকে দুই মিনিটের এক প্রলয়ংকর তাণ্ডব লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছিল সাটুরিয়াকে। সেই ভয়াল ২৬ এপ্রিল। আজ মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ টর্নেডোর ৩৭ বছর পূর্ণ হলো।
দুই মিনিটে ধ্বংসস্তূপ ১২ গ্রাম: পাহাড়সম মেঘ আর প্রচণ্ড গর্জনে মুহূর্তেই সাটুরিয়া সদর, হাজীপুর, ভাটারা, হরগজ, তিল্লীসহ প্রায় ১২টি গ্রাম ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। সরকারি-বেসরকারি হিসেবে সেই এক মিনিটের আঘাতে প্রাণ হারান প্রায় ১ হাজার ৩০০ মানুষ। আহত হন ১২ হাজারের বেশি, গৃহহীন হন প্রায় এক লাখ মানুষ। সেদিনের আর্তনাদে ভারী হয়ে উঠেছিল সাটুরিয়ার বাতাস।
বেঁচে আছেন ক্ষত নিয়ে: ৩৭ বছর পেরিয়ে গেলেও সেই বিভীষিকা আজও তাড়া করে বেড়ায় বেঁচে থাকা মানুষদের। হরগজ পূর্ব নগর গ্রামের আবুল হোসেন, হরগজ মধ্যকান্দি গ্রামের ইব্রাহিম মাস্টার, হরগজ বাজারের বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. আব্বাস উদ্দিন জানান, আজও সাটুরিয়ার আকাশে মেঘ জমলে তাদের বুক কাঁপে। ঝড় মানুষকে উড়িয়ে নিয়ে দূরে আছাড় দিয়েছিল। উড়ন্ত টিনের আঘাতে পা হারিয়ে পঙ্গু হয়েছেন অনেকে। সাটুরিয়া বাজারের ব্যবসায়ী খসরু হারিয়েছেন তাঁর একটি হাত।
সবচেয়ে হৃদয়বিদারক স্মৃতি আয়েশার (৮০)। তিনি জানান, ছেলের বউ মনোয়ারাকে নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার সময় হঠাৎ ঘরের চালের বাটাম খুলে এসে বৌমার পেটে ঢুকে পড়ে। সারা রাত বৌমা ওইভাবেই যন্ত্রণায় চিৎকার করছিল। কেউ সাহস পাচ্ছিলাম না বাটামটি বের করতে।
সকালে ফজল নামের এক প্রতিবেশী বুকে লাথি মেরে বাটামটি বের করামাত্র রক্ত বের হয়ে যায়। এক সময় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে মনোয়ারা। এখনও বাজারের ব্যবসায়ীরা মেঘ দেখলেই দোকানের শাটার নামিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে ছোটেন।
ভোলা যায় না সেই দিন। ছবি: সংগৃহীত
নুরুল হক জানান, এই দুর্যোগ কাটিয়ে ওঠার জন্য তৎকালীন সরকারের একটি ক্যাবিনেট সভা হরগজ ঈদগাহ মাঠে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। তিনি ২৬ এপ্রিলকে ‘টর্নেডো দিবস’ হিসেবে জাতীয় দিবস ঘোষণার দাবি জানান।
পুনর্বাসনে আক্ষেপ: তৎকালীন সময়ে সেনা-নৌ-বিমান বাহিনীর সহায়তায় বড় ধরনের উদ্ধার অভিযান চললেও ক্ষতিগ্রস্তদের দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন নিয়ে আজও আক্ষেপ রয়েছে স্থানীয়দের। অনেকে নামমাত্র সাহায্য পেলেও নিজের শক্তিতেই লড়ে গেছেন।
প্রতিবছরের মতো এবারও ২৬ এপ্রিল ‘টর্নেডো দিবস’ পালন করছে স্থানীয় সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো। দিনটি উপলক্ষে সাটুরিয়ার বিভিন্ন মসজিদে নিহতদের আত্মার মাগফিরাত কামনায় দোয়া ও বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন করা হয়েছে।
সাটুরিয়াবাসীর কাছে ২৬ এপ্রিল মানেই এক দুঃসহ যন্ত্রণার নাম-যা চার দশক ছুঁইছুঁই সময়েও ফিকে হয়নি।

আপনার মতামত লিখুন